দক্ষিণ-পুর্ব জোন-এর মুক্তিবাহিনীর লড়াইয়ের খবর

Posted on Posted in 11
শিরোনামসূত্রতারিখ
১০। দক্ষিণ পূর্ব জোন এর মুক্তিবাহিনীর লড়াইয়ের খবরপ্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়য়, মুজিব নগরের দলিলপত্র১২-১৪ নভেম্বর ১৯৭১

 

কম্পাইল্ড বাইঃ Fazla Rabbi Shetu

<১১, ১০, ১৯০-১৯১>

 

দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলঃ ১৪ নভেম্বর ১৯৭১

 

পহেলা নভেম্বরে শত্রুসেনারা যখন কুমিল্লার কসবা এলাকার মুক্তি শিবিরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন মুক্তিবাহিনী ব্যাপক গুলিবর্ষণ করতে শুরু করে। হঠাৎ এই আক্রমণে হতচকিত হয়ে শত্রুসেনারা পালাতে শুরু করে। কিন্তু এই সময়ে শত্রুবাহিনীর ৯ জন নিহত এবং অনেকেই আহত হয়। ঐদিনই মুক্তিবাহিনী পাকসেনাদের একটি টহল দলের উপর অতর্কিত হামলা করে ২ পাকসেনাকে ঘায়েল করে।

 

২ নভেম্বরে মুক্তিবাহিনী কসবার কাছাকাছি এক পাক শিবিরে আক্রমণ চালিয়ে ২ পাকসেনা, ১ মিলিশিয়া এবং ৫ রাজাকারকে খতম করে। ৩ নভেম্বর লাশগুলো খোলা আকাশের নীচে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেদিন সন্ধ্যায় পানচারা এলাকায় পাক শিবিরে হামলা করে ৩ পাকসেনাকে হত্যা করে এবং ৪ জন আহত হয়।

 

 

৭ নভেম্বরে নোয়াখালীর পরশুরাম এবং ছাগলনাইয়ার পাকসেনা শিবিরে আক্রমণ চালায়। মুক্তিবাহিনী কিছু হালকা ধরণের অস্ত্রশস্ত্র এবং ৩ ইঞ্চি মর্টার নিয়ে ভারী গুলিবর্ষণ করতে থাকে। সেসময় পাকসেনারাও ৩ ইঞ্চি মর্টার দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অনেকক্ষণ ধরে গুলি বিনিময় চলে। পয়ত্রিশ জন পাকসেনা এই মুখোমুখি যুদ্ধে নিহত হয়।

 

 

৩০ অক্টোবর শত্রুবাহিনী কুমিল্লার গাইয়ারবঙ্গ মুক্তিশিবিরে আক্রমণ চালায়। মুক্তিবাহিনী ব্যাপক সাহসিকতার সাথে এই আক্রমণ প্রতিরোধ করে এবং পাকসেনাদের হটিয়ে দেয়। পাকসেনাদের ২৫ জন ঘায়েল হয় এ পাল্টা আক্রমণে এবং দুজন মুক্তিবাহিনীর সদস্য শহীদ হন। ঐ একই দিন সিলেটের রানীরগাঁ অঞ্চলের পাকসেনাদের শিবিরে আক্রমণ করে মুক্তিবাহিনী ৬ জনকে ঘায়েল করে। মৃতদেহগুলো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল। মুক্তি সদস্যরা এখান থেকে অনেক থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিজেদের দখলে নেয়।

 

৩১ অক্টোবর কুমিল্লার কোটেশ্বরে ভারী অস্ত্রশস্ত্র এবং ৩ ইঞ্চি মর্টার নিয়ে পাকশিবিরে আক্রমণ করে মুক্তিবাহিনী। পাকসেনারা ২ ইঞ্চি মর্টার এবং কামান দিয়ে পাল্টা আক্রমণ করে। ১ ঘণ্টা ধরে চলা এই ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধে ৭ পাকসেনা নিহত এবং আমাদের ১ মুক্তি সদস্য সামান্য আহত হন।

 

নোয়াখালী, বাংলাদেশ ১৩ নভেম্বর। সম্প্রতি মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা কুমিল্লা ও নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন স্থানে বহু রাজাকার ও হানাদার পাক বাহিনীর সহায়তাকারীদের হত্যা করেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

 

গত ১২ অক্টোবর মুক্তিবাহিনীর ক’জন গেরিলা লাকসাম থানার অন্তর্গত গরুয়া গ্রামের আবদুল হক বেপারীর পুত্র আলী আকবর রাজাকারকে তার শ্বশুরালয় থেকে এনে হত্যা করেছে। এই রাজাকারের অত্যাচারে অতিষ্ট গ্রামবাসী তার মৃত্যু খবর পেয়ে আনন্দে উল্লসিত হয়ে ওঠে। মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা গত ১৫ অক্টোবর নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার অন্তর্গত কুতুবপুর গ্রামের রাজাকার ওয়ালিউল্লাহ, সেনবাগ থানার অন্তর্গত ছাতারপাইয়া গ্রামের আনোয়ার আলীর পুত্র দলিলুর রহমানকে হানাদার বাহিনীর গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে হত্যা করেছে। একই দিনে গেরিলারা লক্ষীপুর থানার পূর্ব রাজাপুর গ্রামের বদু মিঞার পুত্র আবুল খায়ের এবং সেনবাগ থানার অন্তর্গত বসন্তপুর গ্রামে অন্তর্গত বসন্তপুর গ্রামে আনা মিয়ার পুত্র মুখলেছুর রহমানকে হত্যা করেছে।

 

 

গত ২৮ অক্টোবর পাক হানাদার বাহিনী নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ থানা পার্শ্ববর্তী অন্যান মুক্ত এলাকা দখল করার উদ্দ্যেশ্যে নানা ধরনের অস্ত্রসহ রামগঞ্জের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শত্রুদলের এ অতর্কিত আগমনের খবর পেয়ে মুক্তিবাহিনী তাদেরকে লক্ষীপুর-রামগঞ্জ সড়কের উপর কাপিলাতলী, রামগঞ্জ, মীরগঞ্জের নিকট বাধা প্রদান করে। ফলে উভয় দলের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এই সংঘর্ষে ৩০ জন হানাদার সৈন্য নিহত হয়। এই ঘটনার পর হানাদার বাহিনীর আর একটি দল সেখানে আসে এবং নিরীহ জনসাধারণের ঘর-বাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই সময়ে তারা কয়েকজন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে।

 

গত ১৯ অক্টোবর চৌমুহনী ও সেতুভাঙ্গার কিছুসংখ্যক রাজাকার একদল হানাদার সৈন্যসহ বেগমগঞ্জ থানার অন্তর্গত কাজীরহাট নামক বাজারে এসে বহু দোকানপাট লুণ্ঠন করে এবং পরে পুড়িয়ে দেয়। শত্রুদের এ দলটি আম্বরনগরের মুক্তিবাহিনী অবস্থানের উপর আক্রমনের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু মুক্তিবাহিনী পূর্বাহ্নে এ খবর পেয়ে প্রস্তুত হয়ে থাকে এবং শত্রুরা কাছাকাছি এসে তাদের উপর প্রচন্ড আক্রমন চালায়। এ আক্রমণের ফলে বহুসংখ্যক রাজাকার নিহত এবং ৬ জন ধৃত হয়।

 

জয়াগ গান্ধী আশ্রমের দু’জন কর্মী শ্রী দেবেন্দ্র নারায়ণ সরকার (৭০) এবং শ্রী মদন মোহন চট্টোপাধ্যায় (৬৮) সম্প্রতি পাকসৈন্যদের হাতে নিহত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, গত ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় মহাত্মা গান্ধী স্থাপনের জন্য এখানে যখন আগমন করেছিলেন তখন এ দুজন দেশসেবক শান্তি মিশনে যোগ দেন এবং তখন থেকে দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ তারা নোয়াখালীর এই জায়গায় গান্ধী আশ্রমে অবস্থান করছিলেন।

 

১২ নভেম্বরে মুক্তিবাহিনী একই সময়ে কুমিল্লার লক্ষ্মীপুর এবং কাইয়ুমপুর এলাকার পাকশিবিরে হামলা চালায়। কামান এবং মর্টারের মাধ্যমে পরিচালিত এই আক্রমণগুলোতে ৯ পাকসেনা নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়। এরপর মুক্তিবাহিনী সালদা নদী পার হয়ে বাজার এবং রেলস্টেশনে অবস্থিত পাকসেনা বাঙ্কারে ১০৬ আরসিএল বন্দুক ব্যবহার করে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। হঠাৎ হামলায় পর্যদুস্ত হয়ে কিছু পাকসেনা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে পালায়। আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পাকসেনা কমান্ডার বিমানবাহিনীর সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠান, কিন্তু কোন সাহায্য আসেনি। বরং এই গোপন বার্তাটির অর্থ সফলভাবে বের করে ফেলেন মুক্তিযোদ্ধারা। একই সময় মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা করে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে একই সাথে সালদানদী রেলস্টেশনের পূর্ব, উত্তর এবং পশ্চিম দিক দিয়ে ত্রিমুখী আক্রমণ চালায়। আবার ঐ সময়েই মর্টার হামলা চালিয়ে সালদানদী বাজার এবং নয়নপুর বাজারের পাকসেনাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করে। পাকসেনারা কিছু হালকা অস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ করে। একদিনব্যাপী এই যুদ্ধ চলতে থাকে। এইসময়ে পাকসেনাদের বাঙ্কারগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং মুক্তিবাহিনীর ভারী শেল বর্ষণে টিকতে না পেরে পাকবাহিনী ঐ এলাকা ছেড়ে পলায়ন করে। মুক্তিবাহিনী এলাকাগুলোর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিন পাঞ্জাবী সেনার মৃতদেহ এবং এক রেঞ্জারকে আহত অবস্থায় আটক করে। আহত রেঞ্জার নিশ্চিত করে, পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ৩০ সদস্য এই যুদ্ধে নিহত হয়েছে। মুক্তিবাহিনীর ২ সদস্য শহীদ এবং ৬ জন আহত হন। মুক্তিবাহিনী এই এলাকা থেকে ৩০,০০০ রাউন্ড গুলি, ৩টি এলএমজি রাইফেল, ৫টি টমি বন্দুক, ১টি আরসিএল, ১২টি চাইনিজ রাইফেল, শতাধিক কম্বল এবং বিশাল পরিমাণ খাদ্যভাণ্ডার নিজেদের দখলে নেয়।