অধ্যাপক রহমান সোবহান কর্তৃক দুই প্রদেশের জন্য দুই অর্থনীতির সুপারিশ

Posted on Posted in 2

<2.016.130-131>

 

                   দুই প্রদেশের সমতার উন্নয়ন দরকার

 

অধ্যাপক রহমান সোবহান  কর্তৃক দুই প্রদেশের দুই অর্থনীতির সুপারিশ

লাহোর ২২শে সেপ্টেম্বর, ১৯৬১,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রহমান সোবহান সুপারিশ করেন  যে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের এক অর্থনীতি এবং ” দুই প্রদেশের সম্পদ বন্টন নিয়ে নিয়মিত ঝগড়ার বদলে ” এটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী  দুইটি ভিন্ন অর্থনীতিতে ভাগ করা যেতে পারে।

ব্যুরো অফ ন্যাশনাল  রিকন্সট্রাকশন কর্তৃক আয়োজিত  পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনীতির অদৃশ্যতা বিষয়ে অধ্যাপক রহমান সোবহান প্রবন্ধ পড়ছিলেন।

সারা দেশের বিদ্বান ব্যক্তিবর্গ সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।  লায়াল্লপুর  কৃষি কলেজের অধ্যাপক বরকত আলী কুরেশী  এবং ড. এস.এম.আকতারও সেমিনারে অংশগ্রহণ  করেছিলেন।

অধ্যাপক রহমান সোবহান সুপারিশ করেন যে,  ভিন্ন অর্থনীতির নীতি -নির্ধারণ  আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের কাঠামোর মধ্যে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে যা দুই প্রদেশকে ইহার সকল  দেশীয় ও বৈদেশিক সম্পদের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রদান করবে। আঞ্চলিক ও বৈদেশিক বিনিময় হতে সম্পূর্ণ উপার্জন আঞ্চলিক প্রশাসনের অধীনে থাকবে এবং  অধ্যাপক রহমান সোবহান কর্তৃক সুপারিশকৃত কর্ম-পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রদেশ দুটি পররাষ্ট্র দপ্তর, প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনীর রক্ষনাবেক্ষনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে অর্থ প্রদান করবে।

তিনি বলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার কারণে প্রথম কিছু বছর পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বেশ কম অর্থ কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রদান করবে। কিন্তু  স্বাভাবিকভাবেই  বিনিয়োগ বহুগুণে  বৃদ্ধি পেলে ও উপার্জন বিস্তৃত হলে পূর্ব পাকিস্তান বাজেটের ৫০ শতাংশ সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ করতে পারবে।

অধ্যাপক রহমান সোবহান তার বিতর্ক ব্যাখ্যা করে বলেন যে, তার বক্তব্যের প্রথমার্ধ দেশের অভিন্ন অর্থনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যার সাথে বিভিন্ন প্রাকৃতিক অবস্থা হতে উদ্ভুত অর্থনৈতিক ভিন্নতা জড়িত।  এটি দেশের  দুই প্রদেশের কৃষি ও শিল্পের উৎপাদনের কৌশলে বিবেচনাযোগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে।  পূর্ব পাকিস্তানে প্রতি বর্গমাইলে  ৯৩০ জন ও পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতি বর্গমাইলে ১৪০ জন বাস করে।  প্রাথমিক দর্শনের প্রমাণ অনুযায়ী তিনি জমিতে জনসংখ্যার অত্যধিক চাপের প্রতিষেধক হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে ত্বরান্বিত শিল্পায়নের সুপারিশ করেন।

 

অধ্যাপক রহমান সোবহান বলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানকে বিনিয়োগ অঞ্চল হিসেবে বিভিন্ন ফ্যাক্টর যোগ করা হয় যা নতুন বিনিয়োগ ও দক্ষতা আকৃষ্ট করে এবং পূর্ব পাকিস্তানর ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে  উপার্জিত লাভ অসাধারণ আকর্ষণের কারণে  পুনরায় পশ্চিম পাকিস্তানে বিনিয়োগ করা হয়।

 

          উপকারিতা

প্ল্যানিং কমিশন ঘোষণা করে – “পশ্চিম পাকিস্তানের উৎকর্ষের সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব পাকিস্তান লাভবান হবে “, যা অধ্যাপক রহমান সোবহান দ্বিমত পোষণ করেন। তিঁনি বলেন,  পশ্চিম পাকিস্তানে বিনিয়োগের ফলে শেষ পর্যন্ত  পূর্ব পাকিস্তানই সরাসরি লাভবান হবে এমন চিন্তা করার মতন কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই।

 

একচেটিয়া অধিকার

 

পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়নের কারণগুলো দেখিয়ে অধ্যাপক সোবহান বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের আমদানি করার লাইসেন্স দেয়ার নীতি পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের একটি কৃত্রিম একচেটিয়া অধিকার তৈরী করেছে  এবং  খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পদের পাহাড় বানিয়ে দিয়েছে।

 

এই অগাধ সম্পদ তারা প্রধানত টেক্সটাইল শিল্পে বিনিয়োগ করে এবং সরকারের পশ্চিম পাকিস্তানে মিল প্রতিস্থাপনের ইচ্ছা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তিনি সুনিশ্চিতভাবে বলেন, সরকার যদি আগে থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে ৫০ শতাংশ মিল প্রতিষ্ঠা করত তাহলে আজকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অন্যরকম হত,  একইভাবে সরকার যখন তার নিজস্ব বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা পরিকল্পনা করেন তখনও সরকারের মনোযোগ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি থাকে।

 

তিনি সম্মতির সাথে বলেন, দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে কিন্তু বিনিয়োগের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে শুধুমাত্র ৯৫০ কোটি রুপি এবং চুক্তি অনুসারে  পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ১,৩৫০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে।

এই পরিমান অর্থের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিস্থাপিত কাজের জন্য ৫০০ কোটি রুপি এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে ও স্যানিটারি প্রচারণার জন্য ৫১৭ কোটি রুপি ব্যয় করা হবে।

তিনি বলেন যে, দেশ দ্বিতীয় পরিকল্পনায় ঢোকার সাথে সাথে দুই প্রদেশের বৈষম্য আরও প্রকটভাবে দৃশ্যমান হবে।

তিনি উদ্বিগ্নস্বরে বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের সিংহভাগ বরাদ্দ রাখার ফলে দুই প্রদেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েই চলেছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের চলমান কাজগুলো চালিয়ে রাখার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার আগের মনোভাব বজায় রাখছে।