দেবব্রত দত্ত গুপ্ত অধ্যাপক, চৌমুহনী কলেজ; উপ-পরিচালক ও প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী ইয়ুথ ক্যাম্প ডাইরেক্টরেট, পূর্বাঞ্চলীয় জোন

Posted on Posted in 15

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্রের ১৫তম খণ্ডের ২০৫ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত ২২ নং দলিল থেকে বলছি…

দেবব্রত দত্ত গুপ্ত

১৯৭১ সনের ২৩শে মার্চ পর্যন্ত আমি নোয়াখালীর চৌমুহনী কলেজে অধ্যাপনা করেছি। ২৩শে মার্চ সন্ধ্যায় আমি তৎকালীন কিছু স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছ হতে জরুরী নির্দেশ পেয়ে কুমিল্লা শহরে চলে আসি এবং ২৫শে মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার অব্যাহতির পরেই , শহর ছেড়ে কুমিল্লার মুরাদনগর থানার চুড়লিয়া গ্রামে চলে যাই। গ্রামে স্বাধীনতার স্বপক্ষে জনমত গঠন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাজ শেষ করে ১৫ই এপ্রিল’৭১ কুমিল্লার গ্রামাঞ্চলের বেশ কিছুসংখ্যক যুবক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ বুড়িচং থানার নাইঘর নয়নপুর হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বক্সনগরে গিয়ে পৌঁছি। তারপর বক্সনগর হতে সোনামুড়া হয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলাতে যাই এবং সেখানে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ মিশন ও প্রশাসনিক দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করি। সে সময় বাংলাদেশ সরকারের পূর্বাঞ্চলীয় বেসামরিক প্রশাসনিক দপ্তর ছিল আগরতলা কৃষ্ণনগর এলাকায় কয়েকটি বাড়িতে। অবশ্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের একতি উল্লেখযোগ্য অংশ তখন আগরতলা শহরের ‘কুঞ্জবন’ এলাকায় এবং ছাত্র নেতৃবৃন্দের অধিকাংশই অবস্থান করতেন আগরতলার গোলবাজারের ‘শ্রীধর ভিলায়’।

যেহেতু আমি অধ্যাপনা জীবনে বাংলাদেশের ভাষা-সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত ছিলাম সুতরাং তৎকালীন স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী রাজনৈতিক ও অন্যান্য পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ আমাকে ডঃ হাবিবুর রহমানসহ পূর্বাঞ্চলের যুব প্রশিক্ষণ, সমন্বয় সাধন এবং পরিচালনার দায়িত্বের সাথে জড়িত থাকতে অনুরোধ করেন। আমিও এই ধরণের একটি পবিত্র সুযোগের সন্ধানেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। সুতরাং সুযোগ যখন এল, তখন এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে সানন্দে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লুম। সময়টা ছিল তখন ১৫ই মে, ১৯৭১ ইং।

১৯৭১ সনের মার্চ মাসে, দেশের ভিতরে স্বাধীনতা সংগ্রাম তীব্র হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের ছাত্র, শিক্ষক, যুবক, কৃষক, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের আবাল বৃদ্ধ বনিতা নির্বিশেষে, হাজার হাজার মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে, সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে প্রবেশ করতে আরম্ভ করে। বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে এটা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায় যে, ভৌগলিক দিক দিয়ে ত্রিপুরা রাজ্য ও বাংলাদেশের সীমান্তের অবস্থান অত্যন্ত সন্নিকটবর্তী এবং সহজগম্য। ফলে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীগণ তুলনামূলকভাবে অন্যান্য অঞ্চল হতে এই অঞ্চল দিয়ে অতি সহজেই স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন বনাঞ্চলে এবং গ্রামে, আশ্রয় নিতে আরম্ভ করে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ত্রিপুরা রাজ্যের ভৌগলিক অবস্থান, রাস্তা-ঘাটের দুর্গমতা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সুযোগ-সুবিধা মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীদেরকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় এই অঞ্চলে আগমন করতে উৎসাহিত করেছিল। তাই যুদ্ধ আরম্ভ হবার অব্যবহিত পরে অর্থাৎ ১৯৭১ সনের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতেই পূর্বাঞ্চলীয় বাংলাদেশ সরকার এবং তৎকালীন লিবারেশন কাউন্সিল ভারত সরকারের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনা করে শরণার্থীদের জন্য আশ্রয় শিবির স্থাপন করার সাথে সাথে বাংলাদেশ ভেতর হতে আগত বিভিন্ন পর্যায়ের অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক যুবকদের জন্য ৩ ধরণের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছিল। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ

১. অভ্যর্থনা কেন্দ্র ( Reception Camp)

২. যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ( Youth Training Camp)

৩. সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ( Army Training Camp)

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক এবং প্রশিক্ষণার্থী বিভিন্ন শ্রেনীর যুবকদের মধ্যে যে সব যুবক সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে নি বা সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে ইচ্ছুকও নয়, সে সব যুবককে উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে , যুদ্ধ চলাকালে এবং পরবর্তীকালে যুদ্ধ ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ গড়ার সৈনিকরূপে ‘ ভিত্তি ফৌজ’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে একটি স্কীম প্রণয়নের দায়িত্ব তৎকালীন গণপ্রজাতন্তী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নিম্নে উল্লেখিত ব্যক্তিদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলঃ

জনাব ড. হাবিবুর রহমান ওরফে ড. আবু ইউসুফ (যুদ্ধের সময় ডঃ হাবিবুর রহমান, যুদ্ধের সময় ডঃ আবু ইউসুফ, এই ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন), জনাব মাহবুব আলম, জনাব তাহের উদ্দিন ঠাকুর, অধ্যাপক দেবব্রত দত্ত গুপ্ত।

উপরোক্ত এই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করেছেন ড. হাবিবুর রহমান। ড. রহমান স্বাধীনতা পূর্ববর্তীকালে তিতাস গ্যাসের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের গ্যাস, ওয়েল ও মিনারেল রিসোর্সের ১৯৭৫ সব পর্যন্ত চেয়ারম্যান এবং সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জনাব মাহবুব আলম যুদ্ধের সময় পররাষ্ট্র সচিব এবং পরবর্তীকালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ সচিব, স্বনির্ভর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জনাব ঠাকুর যুদ্ধের সময় এম, এন, এ এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন পরিচালক ছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও বেতার দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন।

যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে পরিচালনার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ( মুজিব নগর ) একটি ‘ইয়থ ট্রেনিং কন্টোল বোর্ড’ গঠন করেছিলেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই বোর্ডের তত্ত্বাবধানে মুজিবনগর, পূর্বাঞ্চল (ত্রিপুরা রাজ্যকেন্দ্রিক) ও পশ্চিমাঞ্চলের ( পশ্চিম বঙ্গকেন্দ্রিক ) এই দুইটিই ইয়থ ক্যাম্প ডাইরেকটরেট গঠন করা হয়েছিল। তবে, এই সময়ের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো বিভিন্ন কারণে তেমন ‘শক্ত’ এবং ‘মজবুত’ হয়ে গড়ে উঠতে পারে নি। পশ্চিম অঞ্চলের যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জনাব আহমদ রেজা।

ইয়থ ট্রেনিং ক্যাম্পগুলোর দৈনন্দিন কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য নিম্নে উল্লেখিত পদগুলো সৃষ্টি করা হয়েছিলঃ

ক্যাম্প প্রধান (১)

উপ-ক্যাম্প প্রধান (১);

ক্যাম্প তত্ত্বাবধায়ক (২);

ছাত্র প্রতিনিধি (২);

স্বাস্থ্য অফিসার(২);

পলিটেকিলে মটিভেটর (৪);

ফিজিকেল ইনস্ট্রাকটর (৪)।

তাছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে ইয়থ ক্যাম্প ডাইরেকটরেট যে সব ব্যক্তিকে নিয়ে গঠন করা হয়েছিল, তাঁদের নামও এখানে উল্লেখ করা হলঃ

সর্বজনাব মাহবুব আলম , প্রকল্প সমন্বয়কারী; ড. হাবিবুর রহমান, পরিচালক (প্রশিক্ষণ); অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী, এম,এন,এ; জনাব মুজাফফর আহমদ, এম,পি,এ; জনাব খালেদ মুহম্মদ আলী, এম,এন,এ; জনাব বজলুর রহমান, রাজনৈতিক নেতা; অধ্যাপক দেবব্রত দত্ত গুপ্ত, উপ-পরিচালক এবং প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী; জনাব মোশারফ হোসেন, হিসাব রক্ষণ অফিসার।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে, উপরোক্ত কার্যকরম, পরিচালনা ব্যবস্থা ও আনুষঙ্গিক নীতি-পদ্ধতির মধ্যে পরবর্তীকালে কিছুটা কিছুটা পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন করা হয়েছিল। কিন্তু সে সব পরিবর্তন তেমন উল্লেখযোগ্য নয় বলে এখানে উল্লেখ করা হল না।

১। অভ্যর্থনা কেন্দ্রঃ (Reception Centre)

স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্যে বিভিন্ন নদী, নালা, খাল-বিলসহ দুর্গম রাস্তা-ঘাট পায়ে হেঁটে ও নৌকাযোগে অতিক্রম করে ক্লান্ত, শ্রান্ত ও অবসন্ন অবস্থায় যখন হাজার হাজার যুবক ত্রিপুরা রাজ্যে প্রবেশ করত, তখন এই সমস্ত রিসিপশন ক্যাম্পের মধ্যে যুবকদেরকে ৭ দিনের জন্য ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হত। এই সময় যুবকেরা বিশ্রাম, খাওয়া, সাধারণ পোশাক, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সুযোগ লাভ করত। এইসব ক্যাম্পের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার সার্বিক দায়-দায়িত্ব সাধারণত বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের প্রতিনিধিদের ওপরই ন্যস্ত ছিল। তবে, অধিকাংশ দেশেই বাংলাদেশের পক্ষ হতে একজন এম,পি-এ/এম,এন,এ-কে, ক্যাম্প প্রধান/উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হত।

২। যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রঃ (Youth Training Camp):

অভ্যর্থনা কেন্দ্রগুলোতে ৭ দিনের বিশ্রাম, খাওয়া ও চিকিৎসার পর একটি সুনির্দিষ্ট প্রোফরমার মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানে ইচ্ছুক যুবকদেরকে ৪৫ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করে, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে সাধারণত তিন ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এই প্রশিক্ষণ কোর্সগুলো নিম্নরূপ ছিলঃ

ক। পলিটিকেল মটিভেশনঃ (Political Motivation):

এই ধরনের প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল, যুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছুক যুবকদেরকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করা।

খ। উৎপাদন ও উন্নয়নমূলক কাজের প্রশিক্ষণঃ (Base work Training):

এই প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল, স্থানীয় সম্পদ, শক্তি ও সঙ্গগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাপনাসহ উৎপাদন এবং উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে দেশের যুবশক্তি কি ভূমিকা পালন করতে পারে, সে সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দান করা। তাছাড়া, এই স্বাধীনতা সংগ্রাম যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে যাতে বাঙালী একটি জাতি হিসেবে টিকে থাকার জন্যে নিজস্ব সম্পদ , শক্তি, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব, কর্মপ্রচেষ্টা, ও কঠোর শ্রমের দ্বারা আপাতত শহুরে অর্থনীতি বাদ দিয়ে ( যেহেতু শহরগুলো শ্ত্রুদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল ) নিজেরাই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে উপযুক্ত করে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়াও এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।

গ। হালকা অস্ত্রের প্রশিক্ষণঃ (Light Arms training):

এই প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এই প্রশিক্ষণার্থী যুবকদেরকে পি,টি, করানো, ‘গ্রেনেড’ নিক্ষেপ, দেশের ভিতরে শত্রুদের যাতায়াতে বিঘ্ন সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ‘মাইন’ পোঁতা, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ‘গেরিলা’সহ বিভিন্ন পর্যায়ের সংগ্রামী যুবক, সৈনিক, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য পর্যায়ের লোকদের সাথে গোপন এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগসহ তত্ত্ব এবং তথ্য সরবরাহের কাজে ( রেকি এবং ওপি করা) সহযোগিতা করা ইত্যাদি।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল একটা জনযুদ্ধ। সুতরাং এই জনযুদ্ধের প্রধান শক্তির উৎস ছিল দেশের আপামর সাধারণ মানুষ। যেহেতু আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা বিভিন্ন কারণে গেরিলা পদ্ধতির যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিলাম সুতরাং এই যুদ্ধে দেশের জনগণের সক্তিয় সহযোগিতা ছাড়া জয়লাভ করা কোন অবস্থাতেই সম্ভবপর ছিল না। কারণ জনতা হলো ‘পানি’ এবং গেরিলারা হলো ‘মাছ’। সুতরাং পানি দূষিত হলে যেমন মাছ বেঁচে থাকতে পারে না, তেমনি জনতার সহযোগিতা না পেলেও ‘গেরিলা’ পদ্ধতির জনযুদ্ধ কোন অবস্থাতেই সাফল্যমণ্ডিত হয় না। আমাদের পরম সৌভাগ্য এই যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের সাধারণ মানুষ, যে কোন মূল্যের বিনিময়ে নিজেদের গেরিলারূপী দামাল ছেলেদেরকে আশ্রয়, প্রশ্রয়, খাদ্য ও বিভিন্নমুখী সহযোগিতা প্রদান করতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেনি। সুতরাং দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি ও সম্পদ ছিল এই দেশের সাধারণ মানুষ।

ভিত্তি ফৌজ ( V.F ) এবং যুব প্রশিক্ষণ

 

দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়, দেশের ভিতর হতে লক্ষ লক্ষ ছাত্র যুবক ও কৃষকেরা যখন প্রয়োজনীয় অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোওতে উপস্থিত হচ্ছিল, তখন বিভিন্ন যুক্তিসঙ্গত কারণেই শিবিরে অবস্থানকারী সব শ্রেনীর লোকদেরকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভবপর ছিল না। তাছাড়া বিদেশে থেকে যেমন এক বিপুলসংখ্যক অস্ত্র প্রার্থীর জন্য তাদের ইচ্ছানুযায়ী প্রয়োজনীয় অস্ত্র সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য ছিল, তেমনি Arms without command and control-অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি এবং ঘটনার সৃষ্টি করতে পারে, এইসব ধারণায় ভাবান্বিত হয়ে সবাইকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ না দেবারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল।

যেহেতু আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রাথমিক পর্যায়ে গেরিলা পদ্ধতির ছিল সুতরাং কোন অবস্থাতেই গতানুগতিক আর্মির সাথে সরাসরি মোকাবেলা করা যুদ্ধ-বিজ্ঞান সম্মত হতো না। দ্বিতীয়ত, একটি যুবককে হালকা (লাইট) এবং মাঝারি ধরনের অস্ত্র পরিচালনায় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করতে হলেও কমপক্ষে ৬ মাস সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু তৎকালীন পরিবেশ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী, সব যুবককে অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য এর সময় দেয়া আমাদের পক্ষে কোনো অবস্থাতেই সম্ভবপর ছিল না। তাছাড়া এখানে উল্লেখিত এইসব সমস্যা ব্যতীত তৎকালে অন্যান্য বহুবিধ রাজনৈতিক,প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আদর্শগত সমস্যা এবং কারণ ছিল, যার জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে অবস্থানকারী সব মানুষকে ‘অস্ত্র’ প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করা তৎকালীন নেতৃবৃন্দ এবং কর্মকর্তাগণ প্রয়োজন মনে করেননি। সুতরাং ‘অভ্যর্থনা শিবির’ হতে যে সমস্ত যুবককে ৪৫ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রিক্রুট করা হত, সে সব যুবকের মাঝ থেকে একমাত্র তাদেকেরি ‘সামরিক’ প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের বিভিন্ন সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হতো যাদের শিক্ষাসহ শারীরিক, মানসিক ও প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক যোগ্যতা ছিল। এই পদ্ধতি ও ব্যবস্থার ফলে যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর যে হাজার হাজার যুবকজের সরাসরি সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হতো না, সে সব যুবকদের ওপরে উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘ভিত্তি ফৌজ’ ( সামরিক ও অর্থনৈতিক ) হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হত। এখানে ‘ভিত্তি’ বলতে মাটিকে এবং ফৌজ বলতে সামজিক চেতনা সম্পন্ন এবং তৎকালে ভিত্তি ফৌজকে দেশের ভিতরে ও বাহিরে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করার জন্য যে আইডেন্টিটি কার্ডের নমুনা নিম্নে উল্লেখ করা হল।

বিপদের আশংকায় নষ্ট কর

বাংলাদেশ ভিত্তি-ফৌজ বাহিনীর নির্দেশ পত্র

এতদ্বারা জানান যাইতেছে যে, নাম…………….. বয়স………….. পিতা ……………… গ্রাম ……………….. থানা…………… জিলা…………….. কে বাংলাদেশ ভিত্তি-ফৌজ বাহিনীর …………… নং স্বেচ্ছাসেবক কর্মী হিসেবে গ্রহুণ করা হইল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অপর নির্দেশ অনুসারে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে স্বাবলম্বী- কর্মশৃংখলার ভিত্তিতে এবং পঞ্চায়েতী শাসনের মাধ্যমে মুক্তিকামী জীবন যাপন (ও) সমাজ শৃঙ্খলার দূর্গ গঠনের প্রশিক্ষণ নির্দ্দেশ এই কর্মীকে দেওয়া হইল।

 

মোহর                                                                                                বাংলাদেশ মুক্তি পরিষদের পক্ষ হইতে

স্বাক্ষর………………………….

তারিখ…………………………

 

যুব অভ্যর্থনা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর নাম ও স্থান

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর নামস্থান
১। ইছামতি ওয়াই/টিদূর্গা চৌধুরী পাড়া অঞ্চল
২। একীনপুর ওয়াই/টি
৩। বিলুনিয়া ওয়াই/টিবিলুনিয়া মহকুমা
৪। সাবরুম ওয়াই/টিসাবরুম
৫। সোনার বাংলা ওয়াই/টিহাঁপানিয়া
৬। মড়াটিলা ওয়াই/টি
৭। মাছিমা ওয়াই/টিসোনামুড়া মহকুমা
৮। বঙ্গবন্ধু ওয়াই/টিহাঁপানিয়া
৯। কাঁঠালিয়া ওয়াই/টিসোনামুড়া মহকুমা
১০। বঙ্গশার্দ্দুল ওয়াই/টিহাঁপানিয়া
১১। কৈশাশহর ওয়াই/টিকৈলাশপুর মহকুমা
১২। রাজনগর ওয়াই/টিউদয়পুর মহকুমা
১৩। যমুনা ওয়াই/টিহাঁপানিয়া
১৪। বড়মুড়া ওয়াই/টিসোনামুড়া মহকুমা
১৫। হাতীমাড়া ওয়াই/টি
১৬। গোমতী ওয়াই/টিদুর্গা চৌধুরী পাড়া
১৭। পালাটোনা ওয়াই/টিউদয়পুর মহকুমা
১৮. শ্রীনগর ওয়াই/টিবেলুনিয়া মহকুমা
১৯। শীল ছড়া ওয়াই/টিসাররুম মহকুমা
২০। সোনাক্ষিরা ওয়াই/টিকরীমগঞ্জ মহকুমা
২১। *হারিমা ওয়াই/টিবেলুনিয়া মহকুমা
২২। বক্সনগর ওয়াই/টিসোনামুড়া মহকুমা
২৩। তিতাস ওয়াই/টিহাঁপানিয়া
২৪।* বিজনা ওয়াই/টি
২৫। ব্রক্ষপুত্র ওয়াই/টি
২৬। গোমতী ওয়াই/টি
২৭। *চড়াই লাল ওয়াই/টিউদয়পুর মহকুমা
২৮। *গকুল নগর ওয়াই/টিসদর মহকুমা
২৯। ১ নং মিলিটারি হোল্ডিং ক্যাম্পদুর্গা চৌধুরী পাড়া
৩০। ২ নং মিলিটারি হোল্ডিং ক্যাম্প
৩১। ৩ নং মিলিটারি হোল্ডিং   ক্যাম্প

* তারকা চিহ্নিত ক্যাম্পগুলোকে ২ ভাগে ভাগ করে, এক একটি ভাগের নামকরণ বিভিন্ন নদীর নামে করা হয়েছিল।

যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সাথে সরাসরি জড়িত এম,পি

ও এম, এস* , এদের নাম

 ক্রমিক ক্যাম্পের নাম স্থানের নাম দায়িত্বপ্রাপ্ত এম পি এ এবং এম এন এ দের নাম
১। গোমতী-২দূর্গা চৌধুরী পাড়াজনাব আমীর হোসেন, এম পি এ
২। বিজনাজনাব সৈয়দ এমদাদুল বারী, এম পি এ
৩। ইছামতিজনাব জামাল উদ্দিন আহমদ, এম পি এ
৪। ব্রক্ষ্মপুত্রহাঁপানিয়াজনাব আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়া , এম পি এ
৫। তিতাসজনাব কাজী আকবর উদ্দিন, এম পি এ
৬। গোমতী-১জনাব আলী আজম, এম পি এ
৭। মুনাজনাব সফীউদ্দিন , এম পি এ
৮। সোনার বাংলাজনাব শামসুল হুদা, এম পি এ
৯। বঙ্গ সারদুলজনাব দেওয়ান আবুল আব্বাস , এম এন
১০। এম এ আজিজ*হরিণাজনাব মির্জা আবুল মনসুর, এম পি এ
১১। হরিনা ওয়াই/সিজনাব এম এ হান্নান, সাধারণ সম্পাদক চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগ
১২। পালাটোনাউদয়পুরক্যাপ্টেন মুহম্মদ সুজাত আলী, এম এন এ
১৩। রাজনগররাজনগরঅধ্যাপক এ হানিফ, এম এন এ
১৪। বড়মুড়াকাঁঠালিয়াজনাব জালাল উদ্দিন আহমদ, এম পি
১৫। চড়ইলাম-১চড়ইলামজনাব সাখাওয়াত উল্লাহ, এম পি এ
১৬। চড়ইলাম-২জনাব ওয়ালি উল্লাহ নওজোয়ান, এম এন এ
১৭। পদ্মাগকুল নগরজনাব এস হক, এম পি এ
১৮। কৈলাশহরকৈলাশহরজনাব তৈবুর রহীম, এম পি এ
১৯। আশারাম্বাড়িখোয়াইজনাব মোস্তাফা শহিদ, এম পি এ
২০। ধর্মনগরধর্মনগরজনাব তাইমুজ আলী, এম পি এ
২১। এম এ আজিজ ওয়াই/সি-২হরিণাজনাব মোশাররফ হোসেন, এম পি এ এ
২২। চোতাখোলাবিলোনিয়াজনাব এ বি এম তালেব আলী এম, পি,এ 
২৩। মিলিটারী হোল্ডিংক্যাম্পডি সি পাড়াজনাব সিরাজুল ইসলাম, এম, পি, এজনাব রফিক উল্লাহ, এম পি এ
২৪। কাঁঠালিয়াকাঁঠালিয়াজনাব আলহাজ আলী আকবর, এম পি এ
২৫। একীনপুরএকীনপুরজনাব মোঃ আঃ সোবহান, এম পি এ
২৬। পালাটোনা-২উদয়পুরজনাব আবদুল্লা আল হারুন, এম পি এ
২৭। মনুখোয়াইজনাব মোঃ ইলিয়াস, এম পি এ
২৮। বাগাফাবিলোনিয়াজনাব আবু নাসের চৌধুরী, এম পি এ

 

* তারকা চিহ্নিত ক্যাম্পগুলোকে ২ ভাগে ভাগ করে, এক একটি ভাগের নামকরণ বিভিন্ন নদীর নামে করা হয়েছিল।

 

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ব্যবহৃত ছদ্ম নামের তালিকাঃ

স্বাধীনতা যুদ্ধাকালে, বিশেষত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে, এই যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কয়েকটির নাম, অবস্থান, কর্মতৎপরতা এবং আনুষঙ্গিক ঘটনাবলীর খবরাখবর কিছুটা শত্রুপক্ষের গোচরীভূত হয়ে পড়ে। ফলে কিছু সংখ্যক যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে ‘ছদ্মনাম’ ধারণ করতে হয়। নিম্নে যে সব যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে ‘ছদ্মনাম’ ধারণ করতে হয়েছিল, সেগুলোর নাম উল্লেখ করা হলঃ

ক্রমিকপুরাতন নামস্থাননতুন নাম
১।পদ্মাচড়ইলামক্রিকেট
২।মেঘনাগলফ
৩।গঙ্গাগকুল নগরটেনিস
৪।যমুনাহকি
৫।মুহুড়ীহরিণাফুটবল
৬।তিস্তাবিজনাপলো
৭।কল্যাণপুরখোয়াইসুইমিং

*বিশেষ প্রয়োজনে ক্যাম্পগুলোর ‘ছদ্ম নাম’ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদনদীর নামানুসারে রাখা হয়েছিল।

*মরহুম জনাব এম, এ আজিজ চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের একজন জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। সুতরাং যুদ্ধের সময় তাঁর নাম অনুসারে দু’টি যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নামকরণ করা হয়েছিল।

যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর যেসব

কর্মকর্তা সরাসরিভাবে জড়িত ছিলেন তাঁদের নামঃ

ব্রিগেডিয়ার মাস্টার-সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং সহযোগিতা; ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং- সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং সহযোগিতা; মেজর সুব্রামননিয়াম- সহকারী পরিচালক, সেন্ট্রাল রিলিফ; ক্যাপ্টেন বিভুরঞ্জন চ্যাটার্জী- চড়াইলাম যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; মেজর মিত্র- তত্ত্বাবধায়ক; ক্যাপ্টেন ডি পি ধর- কল্যাণপুর যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ক্যাপ্টেন আর পি সিং – গকুল নগর যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ক্যাপ্টেন এস কে শর্মা- চড়ইলাম যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ক্যাপ্টেন ডি এস মঈনী- বাগাফা যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ক্যাপ্টেন জি এস রাওয়াত – গকুল নগর যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; ক্যাপ্টেন নাগ- চোতাখোলা যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাথে জড়িত ভারত সরকারের

বেসামরিক প্রতিনিধিদের নামঃ

ড. শ্রী ত্রিগুনা সেন, শিক্ষামন্ত্রী (ভারত); শ্রী সচীন্দ্রলাল সিং, মুখ্যমন্ত্রী (ত্রিপুরা রাজ্য); শ্রী কে পি দত্ত, পরিচালক, শিক্ষা দপ্তর, (ত্রিপুরা রাজ্য); শ্রী মনুভাই বিমানী, বাংলাদেশ এসিস্টেন্স কমিটি (ভারত)।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে একসাথে সাধারণত পাঁচশত থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত যুবককে প্রশিক্ষণ দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই সময় বিভিন্ন অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও সর্বমোট প্রায় এক লক্ষ যুবককে প্রাথমিক ভাবে প্রশিক্ষণ দেবার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু এদের মধ্যে মাত্র পঞ্চাশ হাজার যুবকদেওরকে প্রয়োজনীয় সময়। অর্থ, সম্পদ ও উপকরণের অভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হয় নি।

যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাথে জড়িত বাংলাদেশের সামরিক

কর্মকর্তাদের নামঃ

ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম ইসলাম – ১নং সেক্টর; ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম- ১নং সেক্টর; মেজর আবদুল মতিন- ১নং সেক্টর; মেজর খালেদ মোশাররফ- ২নং সেক্টর; মেজর সফিউল্লাহ- ৩নং সেক্টর; ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামান-৩নং সেক্টর; মেজর সি আর দত্ত-৪ নং সেক্টর।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সাথে জড়িত ছাত্র ও যুব নেতৃবৃন্দঃ*

জনাব আ স ম আবদুর রব, প্রাক্তন সহ –সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন, জনাব শেখ ফজলিল হক মনি, তৎকালীন যুব নেতা; জনাব আবদুল কুদ্দুস মাখন, প্রাক্তন যুব ও ছাত্র নেতা; জনাব নূরে আলম সিদ্দিকী, প্রাক্তন যুব ও ছাত্র নেতা; জনাব সৈয়দ রোজউর রহমান, ছাত্র নেতা, কুমিল্লা, জনাব মাইনুল হুদা, ছাত্র নেতা, কুমিল্লা, শহীদ স্বপন কুমার চৌধুরী, যুব ও ছাত্র নেতা; জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, ছাত্র নেতা, নোয়াখালী।

*এখানে উল্লিখিত বাংলাদেশী সামরিক কর্মকর্তাগণ ব্যতীত আরও যে সব সামরিক অফিসার যুব-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সাথে জড়িত ছিলেন, তাঁদের নামের তালিকা বিবরণ দাতাদের কাছে না থাকার দরুণ এখানে উল্লেখ করতে পারেন নি বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে

জড়িত বাংলাদেশের ব্যক্তিবর্গের নামঃ

 
জনাব জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এন এ ( চট্টগ্রাম), অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, এম এন এ (চট্টগ্রাম), অধ্যাপক ইউসুফ আলী, এম এন এ (দিনাজপুর), প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর পরিচালক মণ্ডলীর সভাপতি; অধ্যাপক খোরশেদ আলম, এম এন এস (কুমিল্লা), অধ্যক্ষ আবুল কালাম মজুমদার, এম এন এ (কুমিল্লা); জনাব এহমদ আলী, এম এন এ (নোয়াখালী), জনাব নুরুল হক, এম এন এ (নোয়াখালী) জনাব খালেদ মোহাম্মদ আলী, এম এন এ ( নোয়াখলী), জনাব লুৎফুন হাই সাচ্চু, এম এন এ ( ব্রাক্ষ্ণণবাড়ীয়া), জনাব আলী আজম, এম এন এ ( ব্রাক্ষণবাড়ীয়া), জনাব মুহাম্মদ রাজা মিয়া, এম পি এ ( কুমিল্লা), জনাম মোঃ আবদুল আউয়াল, এম এন এ (কুমিল্লা) , জনাব হাজী আবুল হাসেম এম পি এ (কুমিল্লা), জনাব আবদুর রউফ, রাজনৈতিক নেতা (কুমিল্লা), জনাব মুহাম্মদ আফজাল খান, রাজনৈতিক নেতা,(কুমিল্লা),জনাব কাজী জহিরুল কাইয়ুম, এম এন এ (কুমিল্লা), ফ্লাইট লেফটেনান্ট এ বি সিদ্দিকী, এম পি এ (কুমিল্লা), জনাব খাজা আহমদ, এম এন এস (নোয়াখালী), জনাব আবদুল মালেক উকিল, এম এন এ (নোয়াখালী), জনাব আবদুল করিম বেপারী (মুন্সিগঞ্জ), এডভোকেট হামিদুর রহমান, রাজনৈতিক নেতা (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া); কর্ণেল আবদুর রব, জনাব এইচ টি ইমাম, প্রাক্তন জেলা প্রশাসক, রাঙ্গামাটি, জনাব রকিব উদ্দীন আহমদ, প্রাক্তন এস ডি ও (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া), জনাব এম আর সিদ্দিকী, এম এন এ (চট্টগ্রাম); জনাব সাইদুর রহমান, সমাজকর্মী,(কুমিল্লা), জনাব আবু মিয়া, সমাজকর্মী, নেপোরমা, কুমিল্লা, শ্রী রাখাল ভট্টাচার্য, সরকারী কর্মচারী, বাংলাদেশ সরকার, ডা. আবদুছ ছাত্তার এম পি এ, জনাব জাবেল আলী মোক্তার (চাঁদপুর), জনাব মকবুল আহমদ এডভোকেট (চাঁদপুর); জনাব মীর হোসেন চৌধুরী (কুমিল্লা); জনাব আমীর হোসেন এম পি এ (কুমিল্লা), জনাব বিসমিল্লাহ মিয়া, এম পি এ (নোয়াখালী), জনাব শহীদ উদ্দিন ইস্কান্দার এম পি এ (নোয়াখালী), জনাব জালাল আহামদ, এম পি এ (কুমিল্লা), অধ্যাপক মুহাম্মদ খালেদ, এম পি এ (চট্টগ্রাম), ক্যাপ্টেন আবুল কাসেম, এম পি এ (চট্টগ্রাম), জনাব মীর্জা আবুল মনসুর, এম পি এ (চট্টগ্রাম) , জনাব আবদুর রশিদ ইঞ্জিনিয়ার এ পি এ; ড. এ কে হাসান, আঞ্চলিক প্রশাসক, মুজিব নগর, জনাব মোশারফ হোসেন চৌধুরী, উপ-পরিচালক (একাউন্টস); জনাব গোলাম রফিক, (শিল্পী), জনাব শহীদ কাদরী, প্রোগ্রাম অফিসার, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব আলোয়ার হোসেন স্তাফ অফিসার, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব মুকতুল হোসেন, পিয়ন, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব শাহাব উদ্দিন, ড্রাইভার, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব আজিত কুমার নন্দি, হিসাব রক্ষক, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব সঞ্জীব কুমার রায়, স্টেনোগ্রাফার, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জনাব গাজী গোলাম মোস্তাফা, রাজনৈতিক নেতা, শ্রী সুখলাল সাহা ( পলিটিক্যাল মটিভেটর) , জনাব আজিজুল হক, সমাজ কর্মী (কসবা), জনাব অহীদ মিয়া, ড্রাইভার, অধ্যাপক আবু আহমদ (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া), জনাব কুতুবুর রহমান, ছাত্র নেতা।

আমাদের দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিভিন্ন কারণে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের মাটিতে থেকে আরম্ভ করা সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমাদের যুদ্ধের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহেরও অত্যন্ত অভাব ছিল। এতদসত্ত্বেও বীর বাঙালীরা এবং তাঁদের অকুতোভয় সন্তানেরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সামান্য কয়েকদিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশের আপামর জনসাধারণের সক্রিয় সহযোগিতা ও প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছে তা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ ঘটনা। সুতরাং বাঙালি জাতির ত্যাগ, তিতিক্ষা ও শ্রমের তাৎপর্যকে বেঁচে থাকা দেশের অবশিষ্ট মানুষগুলো গভীরভাবে উপলদ্ধি করুক, ইহাই বোধ হয় শহীদানের আত্মার একমাত্র আকুতি।

-দেবব্রত দত্ত গুপ্ত

অক্টোবর,১৯৮২