দেয়ালের লিখন

Posted on Posted in 5
দেয়ালের লিখন

১৭ নভেম্বর, ১৯৭১

সব ভালো, যার শেষ ভালো। আর সব খবরের সেরা খবর শেষ খবর। সেই শেষ সংবাদটা কোন কোন ক্ষেত্রে আসলে দেয়ালের লিখন। বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা, বিবেচক ব্যক্তিরা, বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তিরা আগেভাগেই দেয়ালের লিখন পড়তে পারেন, পড়ে সাবধান হতে পারেন।

দেয়ালের এই লিখনকে কেউ কেউ হয়তো বলবেন ভবিতব্য, আমি কিন্তু বলি- ইতিহাসের মার।

মরণকালে যাদের বুদ্ধি নষ্ট হয়, সংকীর্ণ আত্মস্বার্থে যারা কাণ্ডাকাণ্ড, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে, তাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। দেয়ালের লিখন তারা পড়তে পারে না।

ইতিহাসের চরম মারের হাত থেকে তাদের কেউ বাঁচতে পারবে না।

ইতিহাসের মার দুনিয়ার বার। সেই মারের রকমটা কেমন, শুনবেন? ইতিহাসের সেই মারের চোটে দখলীকৃত বাংলাদেশে একটা নতুন ছুতোর-শিল্প গড়ে উঠেছে। ঢালাও কারবার চলছে সেই ছুতোর-শিল্পের। তার নাম হচ্ছে কফিন-শিল্প। ঢাকা, যশোর, ময়নামতি, ক্যান্টনমেন্টে দিনরাত তৈরী হচ্ছে শুধু কফিনের বাক্স। কফিনের বাক্সের যোগাড় দিতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে ছুতোর-মিস্ত্রিরা। পাক হানাদারদের কর্নেল জাঁদরেলরাই

বেনামীতে কফিন সাপ্লাইয়ের ঠিকাদারী নিয়ে বেশ টু-পাইস কামাতে শুরু করেছে। আর কামাইয়ের এই নতুন রাস্তাটা যাতে চালু থাকে, নতুন নতুন লাশ সরবরাহের রাস্তাটাও তারা তৈরী করে রেখেছে। মৃত্যুর এই ঠিকাদাররা সহজে তো আ এমন লাভের কারবার ছাড়তে পারে না? পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যেসব তরতাজা জল্লাদ আমদানী করা হয়েছে মুক্তিবাহিনীর কবল থেকে, তাদের তো আর বিদেশে জ্যান্ত ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তাদের লাশগুলো কফিনের বাক্সে পুরে তাদের স্বদেশে পাঠানো হবে।

বলিহারী আশা।

বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধকে যখন এই জল্লাদরা নির্বিচারে হত্যা করেছে, পুড়িয়ে মেরেছে, নৃশংস হত্যার নব নব কৌশল উদ্ভাবন করে চরম নির্যাতনের ভেতর দিয়ে হত্যা করেছে, তখন তারা এদেশের সেই শহীদদের দাফনের কথা ভাবেনি, মৃত্যুর পরে তাদের কবরে ঠাঁই মেলেনি। পথে-ঘাটে-ভাগাড়ে এদেশের বাপ, মা-ভাই, বোনের মৃতদেহ পড়ে থেকে পচেছে, শেয়াল-শকুনের খোরাক হয়েছে- কবরের কোলে তাই ঠাই দেয়া হয়নি, ইয়াহিয়ার জল্লাদরা সে সুযোগটুকুও দেয়নি। নিরপরাধ সদ্য বিবাহিত হারুনকে হত্যা করে ঠাটারী বাজারের পথের ওপারে ফেলে গিয়েছিল জল্লাদরা। হুকুম দিয়ে গিয়েছিল চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কেউ সেই লাম ছুতে পর্যন্ত পারবে না। তেমনি পড়ে থেকেছে যুবক হারুনের মৃতদেহ, ঠাটারী বাজারের পথের ওপরে। জল্লাদদের জীপ বার বার সেই মৃতদেহের ওপর দিয়ে গিয়েছে, এসেছে। আর দানবীয় তুলে নিয়ে গিয়ে ফেলে এসেছে ভাগাড়ে।

এ ইতিহাস শুধু এক হারুনের ইতিহাস নয়। ইয়াহিয়ার জল্লাদদের হাতে নিহত বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ বাবা-মা, ভাই-বোনকে তারা শেয়াল-শুকুনের খোরাকে পরিণত করেছে।

আজ তারা আশা করে করে তাদের জল্লাদের দেহ কফিনের  বাক্সে পুরে স্বদেশ পাঠাবে দাফনের জন্যে। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হবার নয়। বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী জল্লাদদের কাউকেই স্বদেশের মাটিতে যেতে দেবে না- জ্যান্ত অথবা মৃত কোন অবস্থাতেই না। এই বাংলাদেশের মাটিতেই নির্বান্ধব জল্লাদের অন্তিমশয্যা রচিত হবে। কফিনের বাক্স যেমনকার তেমনি পড়ে থাকবে। অনেক বিলম্বে হলেও এই অনিবার্য পরিণতির কথা জল্লাদদের প্রভুরা বোধ হয় কিছু কিছু অনুমান করতে পারছে। তাই তাদের এবং তাদের ভাড়াটিয়াদের কণ্ঠে ইদানিং যেন দরদের বান ডাকছে। তাই তারা বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর তরুণদের উদ্দেশে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদুনী গাইছে। আহা, কুলোকের কুপরামর্শে বাংলাদেশের এইসব সরল-নিরীহ ছেলেরা না-হক প্রাণ দিচ্ছে। ওহো, কি দুঃখের কথা!

একেই বলে গরুর শোকে শুকনের কান্না। বাংলাদেশের তরুণদের জন্যে জল্লাদ ইয়াহিয়া গোষ্ঠী আর তার দালালদের কি দরদ।

বলি বেহায়া খান, বাং র এই তরুণদের, তাদের মা-বাপ, ভাই-বোনকে কিভাবে তোমরা হত্যা করেছো। সে কথা আমরা ভুলে যাব ভেবেছ? ভুলে যাব ভেবেছ মা-বোনের সন্ত্রমহানির কথা? তোমরা ঘাতকরা হঠাৎ এক-একটা জায়গা ঘেরাও করে শিশু-কিশোর-যুবকদের ট্রাকে উঠিয়ে পাগলায় নিয়ে গিয়ে বেয়নেট দিয়েছো। শিশু-কিশোর-যুবকদের চোখ বেঁধে ট্রাকে তুলে নিয়ে গিয়ে তাদের দেহ থেকে নিঃশেষ রক্ত শুষে নিয়ে হত্যা করেছ তোমরা। তারপর ফেলে এসেছ ভাগাড়ে। শকুনে শকুনে সেখানকার আকাশ ছেয়ে গিয়েছিল। আজ তোমাদের কণ্ঠে দরদের বান ডাকছে। তোমরা বেহায়া, তোমরা পশুরও অধম, দানবের চেয়েও নৃশংস।

ততোধিক ঘৃণ্য তাদের দাদালেরা, যারা আজ ইনিয়ে বিনিয়ে মুক্তিবাহিনীর বীর যোদ্ধাদের জন্যে মায়াকান্না কাঁদছে।

ঢাকার রেডিও ষ্টেশন পাগলার সেই বধ্যভূমি দূরে নয়, যেখানে হাজার হাজার নিরপরাধ শিশু, কিশোর ও যুবককে বেয়নেটের খোঁচায় আর রক্ত নিংড়ে নিয়ে ইয়াহিয়ার ঘাতকরা হত্যা করেছে। বধ্যভূমির আকাশে শুধু শকুন আর শকুন। সে বীভৎস নারকীয় হাহিনী জানে ঢাকার প্রতিটি মানুষ, শকুন-ছাওয়া আকাশ সকলে দেখেছে আর শিউরে উঠেছে। কিন্তু শিউরে ওঠেনি ইয়াহিয়ার ভাড়াটে দালালরা। তাই দিনের পর দিন মুক্তিশপথে দৃপ্ত বাংলাদেশের দামাল ছেলেদের জন্যে মায়াকান্না কাঁদতে কণ্ঠটাও একটু কাঁপে না।

কোন্দিন কি তোমরা পাগলার কাছে বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে পাবে হাজার হাজার শিশু-কিশোর তরুণ কণ্ঠের চাপা গোঙানি। আরও কান পেতে থাকলে শুনতে পাবে শান্ত বুড়িগঙ্গার প্রাণের অশান্ত চাপা গর্জন। শুনতে পাবে বুড়িগঙ্গার আকাশ, পাগলার বাতাস সারা বাংলাদেশের দামাল ছেলেদের ডাক দিয়ে বলেছে –

তোমরা এর প্রতিশোধ নিয়ো,

তোমরা এর প্রতিশোধ নিয়ো।

সেই চাপা অথচ বজ্রনিৰ্ঘোষ, সেই অবরুদ্ধ লাঞ্ছিত পরাধীন প্রাণের ক্রুদ্ধ হাহাকার যদি তোমরা শুনতে পেতে তাহলে বুঝতে-বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণপ্রাণ শত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেও কেন জানোয়ার হত্যার শপথ গ্রহণ করেছে। শুনলে বুঝতে পারবে তোমাদের জন্যে শেষ সংবাদে কোন বার্তা অপেক্ষা করছে।

(আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী রচিত)