‘নির্বাচন নস্যাৎ হলে প্রয়োজনে আন্দোলন হবে’- সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ মুজিব

Posted on Posted in 2

<2.133.579-580>

 

শিরোনামসূত্রতারিখ
“নির্বাচন নস্যাৎ হলে প্রয়োজনে আন্দোলন হবে”- সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান।

 

মর্নিং নিউজ২৭ নভেম্বর,১৯৭০

 

 

নির্বাচন পরাভূত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক করলেন মুজিবুর রহমান

১৯৭০ সালের ২৬ শে নভেম্বর ঢাকায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে মন্তব্য করেন

 

গতকাল ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন “নির্বাচন যদি ভেস্তে যায়, তাহলে তা বাংলাদেশের লক্ষাধিক শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে আরও লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের আহবান হবে, যাতে প্রয়োজনে আমরা মুক্ত মানুষ হিসেবে বাস করতে পারি এবং বাংলাদেশ যেন হতে পারে তার নিজের ভাগ্য বিধাতা”। এটাকে “স্বাধীনতার ডাক” হিসেবে নেওয়া যায় কিনা বিদেশী এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব বলেন, “না, এখন নয়”।

 

লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালীর আত্মত্যাগের কথা বলে শারীরিক প্রতিরোধের ইঙ্গিত করা হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করা হলে আওয়ামীলীগ প্রধান বলেন, “এটা আমি এখন বলব না। আমার দল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু করব। যদি তারা অসাংবিধানিক কিছু করে তাহলে জনগন তার নিজস্ব রাস্তায় হাঁটবে।”

 

বিদেশী সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান উপকূলীয় অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকায় তার সাম্প্রতিক সফরের চিত্র তুলে ধরেন।

 

দুর্যোগের কারনে সামগ্রিক ভাবে সাধরন নির্বাচন স্থগিত করার তিনি কঠোর বিরোধিতা করেন। তবে অবশ্য বলেন, বিপর্যস্ত আট আসনের নির্বাচন কয়েক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা যেতে পারে।

 

নির্বাচন স্থগিত করা হলে তিনি কি করবেন এমন এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামীলীগ প্রধান বলেন , তিনি তার দলের লোকদের সাথে আলোচনা করে ভবিষ্যৎ করনীয় নির্ধারণ করবেন।” তবে, কোন কিছুতেই ছাড় দেওয়া হবে না”, তিনি যোগ করেন।

 

বিপর্যয়ের কারনে নির্বাচন স্থগিত করার জন্য কিছু রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া বিবৃতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “এই নেতারা কারা”? তিনি বলেন যে, যেটিকে তিনি ছয় দফা কর্মসুচিতে গণভোট হিসেবে অভিহিত করেছেন সে নির্বাচন স্থগিত চেয়ে, এই রাজনৈতিক নেতারা শুধু সামরিক সরকার কে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা করছে।

“তারা তাদের নেতৃত্ব রক্ষা করতে সামরিক আইন চান। সর্বশেষ বন্যার পর কিছু নেতা একটা রঙ্গ শুরু করছে এবং নির্বাচন স্থগিত করার জন্য কান্নাকাটি করছে।কিন্তু বন্যা পীড়িত মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য তখন তারা কি করেছিল”, তিনি জিজ্ঞাসা করেন।

 

এই সময় শেখ মুজিবুর রহমান অভিযোগ করেন যে মওলানা ভাসানী, পীর মোহসেন উদ্দিন এবং তিনি ছাড়া সেসব নেতাদের কেউ তখন বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শনে যায়নি বিশেষ করে বিছিন্ন উপকূলীয় দ্বীপ সমুহে।

কিছু নেতাদের নির্বাচন পিছানোর দাবিতে শেখ মুজিব আরও বলেন, “খারাপ ছাত্ররা সবসময় পরীক্ষা পিছানোর দাবি করে”। তিনি বলেন নির্বাচন ডিসেম্বরের ৭ তারিখ হতে দিন, এই নেতাদের অনেক কে এবং তাদের দল খুজে পাওয়া যাবে না এমনকি তারা বিবৃতি দেওয়ার ক্ষমতাও হারাবে।

 

বাংলার বেঁচে থাকা কে তিনি সমগ্র পাকিস্তানের বেঁচে থাকার চেয়ে বেশী অগ্রাধিকার দিচ্ছেন এমন প্রশ্নে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন আমরা সংখ্যা গরিষ্ঠ। আমরা পাকিস্তানি, সংখ্যা গরিষ্ঠদের উপেক্ষা করা যাবে না।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যদি সবার স্বার্থের স্বীকৃতি দেওয়া হয় তবেই শুধুমাত্র দেশে ঐক্য হতে পারে। তিনি বলেন , “তারা যদি আমাদের স্বার্থ অবহেলা এবং উপেক্ষা করে , আমাদের সাথে উপনিবেশ ও বাজার হিসেবে আচরন করে সেখানে ঐক্য হয় কিভাবে। আমরা মনে করি আমাদেরকে বাজার হিসেবে গন্য করা হচ্ছে”।

 

ছয় দফা দাবি পাকিস্তান আলাদা করার ডাক বলে পচ্চিমের কিছু নেতার অভিযোগে শেখ মুজিবুর রহমান কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমরা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন চাচ্ছি, স্বাধীনতা নয়।

 

ছয় দফার উপর ভিত্তি করে নির্বাচনের মাধ্যমে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন সম্ভব কিনা জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন যদি জনগন ছয় দফার পক্ষে রায় দেয় তাহলে অবশ্যই সম্ভব। আওয়ামীলীগ প্রধানকে নির্বাচন বানচাল করার বিষয়ে কোন তথ্য আছে কিনা জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন “আমি একজন রাজনীতিবিদ, আমি অনুমান করতে পারি”।ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন “কায়েমি স্বার্থের জন্য ক্ষমতাসীন চক্র, আমলা আর একটি বিশেষ গোষ্ঠী মিলে গত ২২ বছর ধরে বাংলাদেশের জনগনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে চলছে। এইবার যদি তাদের পুরানো খেলা আবার খেলে তবে তাদের জানা উচিত তারা আগুন নিয়ে খেলতেছে”।

 

আওয়ামীলীগ প্রধান বারবার উল্লেখ করেন যে আগামী নির্বাচন হল “ছয় দফার উপর গণভোট”, আরও বলেন তিনি মনে করেন না ঘোষিত সময়ুনাসারে নির্বাচন হলে সেটা ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকায় ত্রান বিতরনে কোন ধরনের প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন ত্রান বিতরনের জন্য হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছে, এমনকি দুর্গত এলাকা থেকে ও দশ হাজার স্বেচ্ছাসেবক নেওয়া হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং সকল রাজনৈতিক মামলা প্রত্যহারের দাবী জানান। এমনকি যদি তারা (সরকার কর্তৃক) তা নাও করে তবুও তার দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বলে জানান। তিনি ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে জানান তখন ৩৫০০ রাজনৈতিক কর্মী বন্দি ছিল।