ন্যাপের ১৪ দফা

Posted on Posted in 2

<02.48.257-260>

 

শিরোনামঃ ন্যাপের ১৪ দফা

সূত্রঃ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি

তারিখঃ ৫ জুন, ১৯৬৫

ন্যাপের ১৪ দফা-জাতীয় মুক্তির কর্মসূচী

(ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ৪ঠা, ৫ই, ৬ই ও ৭ই জুনের সভায় গৃহীত)

স্বাধীনতা লাভের ১৮ বছর পর পাকিস্তান আজ বিগত দিনের পুঞ্জীভূত সমস্যায় জর্জরিত হইয়া এক যুগসন্ধিক্ষণে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। একটির পর আরেকটি সরকার আসিয়াছে, কিন্তু তাহারা সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে প্রত্যেকেই পুরাতনের সহিত নতুন সমস্যা যোগ করিয়াছে। ফলে শেষ পর্যন্ত কোন সমস্যাই দূর হয় নাই, উহা আরও বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং দেশের সম্মুখে এক ভয়াবহ ইঙ্গিত বহনকারী সংকটের উদ্ভব হইয়াছে। এই সংকটের গুরুত্ব আরও প্রকটিত হইয়াছে সেপ্টেম্বরের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়। যুদ্ধের সময় আমরা যে পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়াছিলাম তাহার ফলে আমাদের বহু ভুল ধারনা পরিবর্তন হইয়াছে, বহু ধারনার সম্পূর্ণ বিপরীত ফল ফলিয়াছে। ক্ষমতাসীনেরা জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন যে-সমস্ত মৌলিক সমস্যা হিমাগারে নিক্ষেপ করিয়া রাখিয়াছিল তাহা নূতন গুরুত্ব লইয়া অকস্মাৎ প্রকট হইয়া উঠিয়াছে এবং অবসাদগ্রস্ত সমগ্র জাতিকে নাড়া দিয়াছে। বিগত সময়ের যে সকল সমস্যা সমাধান তো দূরের কথা স্পর্শই করা হয় নাই, উহা আজ অধিকতর গুরুত্ব লইয়া হাজির হইয়াছে। সংক্ষেপে বলিতে গেলে বলা যায় যে, সমস্যা আজ সমগ্র জাতির মুখোমুখি আসিয়া দাঁড়াইয়াছে এবং সমাধানের বাস্তব কর্মপন্থা গ্রহণের আওয়াজ তুলিয়াছে।

পূর্বের যে-কোন সময় অপেক্ষা এখন আমাদের জাতীয় জীবনের অন্তর্নিহিত ত্রুটি ও বৈসাদৃশ্যসমূহ প্রকটভাবে প্রকাশিত হইয়াছে। তাই আজিকার অত্যন্ত জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হইল আমাদের সামগ্রিক জাতীয় গঠন প্রকৃতির একটি নির্দিষ্ট রূপ প্রদান করা। এবার দেশের অর্থনৈতিক পদ্ধতি, প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং পররাষ্ট্রনীতি, প্রত্যেকটিই সত্যকার পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়াছে এবং প্রমানিত হইয়াছে যে, বর্তমানে অনুসৃত নীতির কোনটাই আমাদের প্রয়োজনের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বর্তমান সরকার পদ্ধতি

বর্তমান পদ্ধতির সরকার পাকিস্তানের জনগণের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী; এমনকি মারাত্মক ক্ষতিকর বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছে। পাকিস্তানে যে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি চালু রহিয়াছে, তাহা আমাদের দেশের প্রয়োজনের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। এক হাজার মাইল বিদেশী রাষ্ট্রের দ্বারা বিচ্ছিন্ন ইহার দুইটি অংশ লইয়া পাকিস্তান এমন একটি প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি চালু রাখিতে পারে না, যেখানে সমস্ত ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হস্তে কেন্দ্রীভূত থাকে। ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল-এর মতো অবিকল একটি কেন্দ্রীয় সরকার, বাজেট ও আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত ক্ষমতাহীন একটি জাতীয় পরিষদ, প্রেসিডেন্টের মনোনীত ব্যাক্তি হিসাবে দুইজন প্রাদেশিক গভর্নর ও তাঁহাদের নিজস্ব বাছাই করা ব্যক্তিবর্গকে লইয়া গঠিত মন্ত্রীপরিষদদ্বয় ও কার্যতঃ ক্ষমতাহীন দুইটি প্রাদেশিক পরিষদ পাকিস্তানের প্রয়োজন মিটাইতে মোটেই সক্ষম নহে। বর্তমানে যে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি চালু রহিয়াছে তাহা পাকিস্তানের অদ্ভুত ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য ও ইহার বিভিন্ন ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সত্ত্বাকে সুষ্ঠুভাবে শাসন করিতে পারে না; কারণ ইহা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপান্তরিত করিতে অক্ষম; যেহেতু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় পরিষদ এমন ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত নির্বাচকমণ্ডলী কর্তৃক নির্বাচিত হন, যাঁহারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার পরিবর্তে একপেশে, উপজাতীয়, পারিবারিক ও অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর স্থানীয় অবস্থার ভিত্তিতে নির্বাচন হইয়া থাকেন, সেহেতু রাজনৈতিক দিক দিয়া প্রেসিডেন্ট কিংবা জাতীয় পরিষদ পাকিস্তানের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন, এমন কথা বলা যায় না।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা

১। খাদ্য সমস্যাঃ পাক-ভারত যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তান খাদ্য ঘাটতির সম্মুখীন হইয়াছে, এবং এই খাদ্য পরিস্থিতি এখন এত তীব্র রূপ ধারন করিয়াছে যে, প্রদেশব্যাপী বিশেষ করিয়া গ্রাম অঞ্চলে প্রায় দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করিতেছে। চাউল প্রতিমণ ৪০ টাকা ও তদূর্ধ্ব মূল্যে বিক্রয় হইতেছে- যাহা শতকরা অন্ততঃপক্ষে ৯৫ জন লোকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। গ্রাম অঞ্চলের জনসাধারণ আরও অতিরিক্ত দুর্দশার সম্মুখীন হইয়াছে লেভী ব্যবস্থার ফলে। লেভী ব্যবস্থা এমনভাবে কার্যকরী করা হইয়াছে যে, ইহা জুলুকে পরিনত হয়েছে এবং ইহার সহিত সার্টিফিকেট প্রথা মিলিত হইয়া এই জুলুমকে গ্রামীণ জনসাধারণের নিকট আরও অসহনীয় করিয়া তুলিয়াছে। এই সব কিছুই খাদ্য সমস্যাকে আরও তীব্রতর করিয়াছে এবং জনসাধারণের দুর্দশাকে বহুমুখী করিয়া তুলিয়াছে।

২। পাটচাষী প্রসঙ্গেঃ পাটচাষিদের উপর শোষণ অবাধভাবে অব্যাহত রহিয়াছে, উপরন্তু ইহা আরও তীব্র হইয়াছে। তাদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য তাহারা পাইতেছে মণপ্রতি ১৩ টাকা। ইহা তাহাদের উৎপাদন ব্যয় অপেক্ষা অনেক কম। ইহার ফলে পাটচাষীরা কোনক্রমে তাহাদের শ্রমমূল্য লাভ করিতে পারে- বাঁচার মত মজুরী তাহারা পায় না। পাটের ন্যায্য মূল্য বাধিয়া দেওয়া উহা কার্য্যকরী করার ব্যাপারে বাস্তব কোন কিছু করা হয় নাই। ফলস্বরূপ, পাট চাষীরা ১৮ বৎসর আগে যেখানে ছিল বস্তুতঃ এখনও সেই একইস্থানে রহিয়াছে-পক্ষান্তরে, জীবন ধারনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর ব্যয় মাত্র কয়েক বৎসর পূর্বের তুলনায়ও বর্তমানে বহুগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে। পাটের বর্ধিত মূল্য হইতে পাটচাষীরা বঞ্চিত হইতেছে, কিন্তু পক্ষান্তরে মুনাফা করিতেছে ফড়িয়া, মিল মালিক ও রফতানীকারকরা।

৩। পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষকদের অবস্থাঃ সামরিক শাসনামলে বহুল প্রচারিত ভূমি সংস্কার আজ অতীতের গর্ভে বিলীন হইয়াছে। প্রাক্তন ভূ-স্বামীরা সামরিক শাসনামলের এই সংস্কারকালে হারানো তাহাদের অধিকাংশ জমির উপর অধিকার পুনরায় ফিরিয়া পাইয়াছে এবং তাহারা পূর্বের ন্যায় উৎপন্ন শস্য নির্ভয়ে ও অবাধে নিজেদের গোলায় লইয়া তুলিতেছে। শত শত বৎসর ধরিয়া ভূমি মালিকেরা যেভাবে ভূমিহীন কৃষকদের উপর শোষণ চালাইয়া আসিতেছে সেই শোষণ অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তাহারা এখনও পূর্ব অধিকার ভোগ করিতেছে।

ভূমিহীন কৃষকদের এই দুর্দশার সহিত যোগ হইয়াছে ‘অদৃশ্য ভূস্বামী’ হিসাবে আমলাতন্ত্রীদের নির্যাতন। বাঁধ এলাকায় বা অন্যান্য সরকারী জমি এই সকল সরকারী কর্মচারীদের সুবিধাজনক দামে বা ‘ইনাম’ হিসাবে প্রদান করা হইতেছে। এইভাবে একটি ‘অদৃশ্য ভূস্বামী’ গোষ্ঠী সৃষ্টি করিয়া চিরন্তন ভূমিহীন চাষীদের উপর তাহাদের চাপাইয়া দেওয়া হইতেছে। এবং তাহারাও এই ‘অদৃশ্য ভূস্বামী’ ক্রীতদাসে পরিনত হইতেছে।

ইক্ষুচাষীদের অবস্থা

পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশেই ইক্ষুচাষীরা শোষিত হইতেছে। চিনি মিল মালিকেরা উচ্চ মূল্যে চিনি বিক্রয় করিয়া যখন প্রচুর অর্থ উপার্জন করিতেছি তখন ইক্ষুচাষীরা বিভিন্ন ধরনের শোষণের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হইয়া তাহাদের ন্যায্য উপার্জন হইতে বঞ্চিত। মিল মালিকেরা তাহাদের মর্জিমাফিক ইক্ষুর মূল্য নিয়ন্ত্রন করিয়া থাকে। ইক্ষুর উপর তাহারা তাহাদের নিজেদের নির্ধারিত মূল্য চাপাইয়া দেয়। বেশী মূল্যে তাহারা ইক্ষু ক্রয় করিতে অস্বীকার করিয়া ইক্ষুচাষীদের বাধ্য করে কম মূল্যে তাহাদের পন্য বিক্রয় করিতে। ইক্ষুচাষীদের বাধ্য করিবার জন্য তাহারা কৃষকের পণ্য বিক্রয়ের উপর নানবিধ বাধানিষেধ আরোপ করে। ইক্ষুর পরিবর্তে তাহারা মিলে কাঁচামাল হিসেবে ‘গুড়’ ব্যবহার করে। এইভাবে বিভিন্ন পন্থায় তাহারা ইক্ষুচাষীদের অনাহারে এবং করুণার পাত্র করিয়া রাখে। এই অবস্থায় মিল মালিকরা যে শর্ত আরোপ করে তাহা মানিয়া লইয়া নতি স্বীকার করা ভিন্ন ইক্ষুচাষীদের আর কোন গত্যন্তর থাকে না। ইক্ষুচাষীদের এই অবস্থার প্রতিকার বিধানের ব্যাপারে কাহারও মাথাব্যথা আছে বলিয়া মনে হয় না। ডেপুটি কমিশনাদের ন্যায় সরকারী কর্মচারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরিণত বুদ্ধি সম্পন্ন ও অযোগ্য হইয়া থাকে এবং তাহারা প্রায়শঃই মিল মালিকদের লোভের শিকারে পরিণত হইয়া তাহাদের প্রতি সমর্থন প্রদান করিয়া থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিদিনই কৃষকদের অবস্থার অবনতি ঘটিতেছে। জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততায় বিনষ্ট হাজার হাজার একর জমি চাষের অনুপযোগী হইয়া পড়ায় পশ্চিম পাকিস্তানের বিশেষ করিয়া পাঞ্জাবের বিভিন্ন জেলার কৃষকরা এই ভয়াবহ ভবিষ্যতের সম্মুখীন হইয়াছে। অসংখ্য কৃষক আজ এই দুর্যোগময় ভবিষ্যতের মুখোমুখি হইয়াছে। ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে। পূর্ব পাকিস্তানে বন্যা ও অনাবৃষ্টি কৃষকদের একইরূপ অভিশাপের মত কাজ করে। ইহারই ফলশ্রুতি দুইটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেখিতে পাওয়া যাইবে। প্রথম ক্ষেত্রে, কৃষি উৎপাদন বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। দ্বিতীয়তঃ কৃষক অধিক হারে ভূমিহীন ও কর্পদহীন হওয়ার দরুন শিল্পোন্নয়নের সাথে সাথে অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণের পরিবর্তে দ্রুত সংকুচিত হইতেছে- যাহার ফলে গুরুতর জাতীয় সংকটের সৃষ্টি হইতেছে।

শ্রমিকদের অবস্থা

 নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অগ্নিমূল্যের ফলে শ্রমজীবী জনসাধারণের জীবনধারণ ক্রমশঃ কষ্টসাধ্য হইয়া উঠিতেছে। কল-কারখানার মালিকগণ স্বাধীনভাবে ও নির্ভয়ে শ্রমিকদের শোষণ করিয়া প্রচুর মুনাফা অর্জন করে। কিন্তু শ্রমিকগণ কয়েক বছর আগে যে বেতন পাইতেন, এখনও কার্য্যতঃ সেই বেতনই পাইতেছেন। ধর্মঘট ও যৌথ দরকষাকষির মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া শ্রমিকদিগকে মালিকেরা খেয়ালখুশীর তাঁবেদার একক ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠীতে পরিনত করা হইয়াছে। তাঁহাদের দুঃখ-দুর্দশা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাইয়া চলিয়াছে, অথচ তাঁহাদের বেতনের হারের কোন পরিবর্তন ঘটে নাই, তদুপরি তাঁহাদের অধিকারসমূহকে খর্ব ও পদদলিত করা হইয়াছে। বিড়ি শ্রমিকগণ বিশেষভাবে দুর্দশাগ্রস্ত। টেন্ডু পাতার ব্যবহার ও আমদানী নিষিদ্ধকরণের ফলে তাঁহারা বেকারত্ব ও অনাহারের সম্মুখীন হইয়াছে।

ছাত্রদের অবস্থা

 শিক্ষা ক্রমবর্ধমান হারে ব্যবসায় পরিণত হইতেছে। স্কুল-কলেজের বেতন প্রদান করা অধিকাংশ পিতামাতার ক্ষমতার বাইরে চলিয়া গিয়াছে। অধিকহারে স্কুল, কারিগরি ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের ব্যাপারে দৃষ্টি না দেওয়ার ফলে অধিকাংশ পিতা-মাতা তাহাদের সন্তান-সন্ততিকে বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ভর্তি করাতে পারেন না। পাঠ্য পুস্তকের ব্যবসায় চরম জালিয়াতি চলিতেছে। প্রতি বছর পাঠ্য-পুস্তক বদল করার ফলে পুরানো বই আর ব্যবহার করা যায় না। বহু অর্ডিন্যান্স ও অন্যান্য নিয়মকানুনের মাধ্যমে ছাত্রদের স্বাধীন ও অবাধ বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের পথে প্রতিনন্ধকতা সৃষ্টি করিয়া এবং দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনে তাহাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের সুযোগ হইতে বঞ্চিত করিয়া তাহাদিগকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করা হইতেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলশিক্ষকগণ এক বিশেষ দুর্দিনের মধ্যে কালযাপন করিতেছেন, তাহাদের কার্যকলাপের উপর গোপন খবর রাখা হইতেছে ও বুদ্ধিবৃত্তির স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হইতেছে।

শিল্পখাত

একচেটিয়াবাদ ও কার্টেলের স্বার্থে পুঁজির একত্রীকরণ আরও বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহা পাকিস্তানের জন্য শুভ ইঙ্গিত নয়। ইহা আরও বেশী ভয়াবহ এই কারণে যে, এই নতুন ধারাটি সরকারের আনুকূল্য ও উৎসাহ লাভ করিতেছে। ইহা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক যে, সম্প্রতি অনুমোদিত ৪৮টি নতুন শিল্প রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য মঞ্জুর করা হইয়াছে। এই সকল উপকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে মুখচেনা রাজনীতিক, আমলা, বর্তমান ও অতীতের বহু মন্ত্রী ও পরিষদ সদস্য রহিয়াছেন। এই সমগ্র নীতিটিকে রাজনৈতিক ঘুষ বলিয়া মনে হয়। ইহা সকলেই জানেন যে, এই সকল শিল্প স্থাপনের জন্য যাঁহাদিগকে অনুমোদন দেওয়া হইয়াছে তাঁহারা সকলেই এই পারমিটগুলো খোলা বাজারে বিক্রি করিতেছেন এবং পুঁজিপতিগোষ্ঠী একটি টেক্সটাইল মিলের (সুতা কল) পারমিটের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা প্রদান করিতেও কুণ্ঠিত নয়। সরকারী খাত হইতে ব্যক্তিগত মালিকানার শিল্প প্রতিষ্ঠান হস্তান্তর মনোপলির স্বার্থে কাজ করিতেছে। জরুরী সম্পত্তি আইনের সাহায্যে দখলকৃত চা-বাগানসমূহ বিশেষ সুবিধাভোগী একচেটিয়া পুঁজির মালিকদিগকে প্রদান করা হইয়াছে।

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরের যুদ্ধ

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পাক-ভারত যুদ্ধের অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফল পাইয়াছে। ইহা একদিকে আমাদের সকলের মধ্যেকার দেশপ্রেমের চেতনা প্রকাশ করিবার পূর্ণ সুযোগ প্রদান করিয়াছিল। তুরখাম হইতে টেকনাফ পর্যন্ত সর্বত্র প্রতিটি পাকিস্তানী দেশ রক্ষার কাজে সামিল হইয়াছিল। ৬ই সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রতি ইঞ্চি ভূমির স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষাকল্পে মহতী ত্যাগের প্রস্তুতিতে জনগণ নতুন সত্ত্বা লইয়া আত্মপ্রকাশ করিয়াছে।

পাকিস্তানের উভয়াংশে ও ইহার দূর অঞ্চলের জনগণ ইহা প্রমাণ করিয়াছেন যে, তাঁহারা পাকিস্তান, ইহার সংহতি ও ঐক্যের স্বপক্ষে। সাধারণ মানুষের কোন রাজনৈতিক চেতনা নাই- জনগণের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকারের মাধ্যমে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করিয়া ব্যক্তিগত শাসন চিরস্থায়ী ও সীমাহীন সম্পদ কুক্ষিগত করিতে যাহারা অভিলাষী জনগণ তাহাদের এই হীন এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করিয়াছেন। আর বেশী দিন জনগণের মৌলিক অধিকারসমূহকে অস্বীকার করা যাইবে না এবং জনগণ আর অধিক দিন স্বৈরতন্ত্রকে সহ্য করিবে না কিংবা এক-নায়কত্ববাদকেও গ্রহণ করিবে না।

দ্বিতীয়তঃ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, এই অঞ্চলের শাসকগোষ্ঠীর অধীনে পাক-ভারত উপ-মহাদেশে একটি যৌথ প্রশাসন ব্যবস্থা সৃষ্টি করিয়া আমেরিকার টাকা ও অস্ত্রের সাহায্যে আমাদের উত্তর অঞ্চলের প্রতিবেশীগণকে প্রতিহত করিবার এবং তদ্বারা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে নির্ণয়ের সাম্রাজ্যবাদীদের মহাপরিকল্পনা নিদারুণভাবে মার খাইয়াছে।

পাকিস্তান ও ইহার জনগণ সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করিয়াছে। ভারতের সাথে সরাসরি একত্রীকরণ বা কনফেডারেশন গঠন কিংবা যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অথবা যৌথ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কার্যকরীকরণের সম্ভাব্যতার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে সন্দেহের উদ্ভব হইয়াছিল সাময়িকভাবে হইলেও তাহার অবসান ঘটিয়াছে।

ইহা দুর্ভাগ্যজনক যে, সরকারের বিভিন্ন প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রচারের সাথে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টি করিয়া দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহাওয়াকে বিষাক্ত করিয়া তোলা হইয়াছিল। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্বিচারে আক্রমণের শিকারে পরিণত হইয়াছিল।

<2.48.261-266>

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

১৯৫৮ সালে কতিপয় সমর নেতা কতৃক পাকিস্তানের মৌলিক প্রতিষ্ঠানসমূহের বাতিল , আমাদের পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন , জাতীয় চিন্তার ক্ষেত্রে ভারতের সাথে সেপ্টেম্বরের যুদ্ধের ফলাফল , রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগনের মধ্যে পুঞ্জীভূত অসন্তোষ এবং এই অবস্থা পরিবর্তনের ইচ্ছা সহ ১৯৫৭ সালে ন্যাপের জন্মলগ্ন হইতে এ যাবত সংঘটিত ঘটনাবলী সম্পর্কে ১৯৫৭ সালে আমরা সুস্পষ্টভাবে যে বক্তব্য তুলিয়া ধরিয়াছিলাম , তাহার সত্যতাই প্রমান হইয়াছে। ইতিহাস আমাদের চিন্তা ধারার যৌক্তিকতা ও ঘটনাপ্রবাহ জাতীয় সমস্যাবলী সম্পর্কে আমাদের বিশ্লেষণ নির্ভুল বলিয়া প্রমান করিয়াছে।

প্রত্যক্ষ নির্বাচন ও সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত জনগণের প্রতিনিধিদলের লইয়া গঠিত ফেডারেল সরকারের সাথে জনগনের সরাসরি যোগাযোগকে অস্বীকার করার ফলে সেপ্টেম্বর যুদ্ধের পরে এক গুরুতর অবস্থার সৃষ্টি হয়।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ও তাঁহার দলের যে কোন জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র নাই তাহা উদঘাটিত হইয়াছে। এবং জনগনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার ভীতি প্রদর্শন ব্যাতিরেকে কোন বিস্ফোরনোন্মুখ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করিতে তাহারা অক্ষম। ইহা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, গত ৮ বছর যাবত দেশ যে গন প্রতিনিধিত্ববিহীন স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার যাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট হইতেছে, ইহা তাঁহারই প্রত্যক্ষ ফল।

খাদ্যের ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান সংকট আমাদের অর্থনীতির দুর্বল চরিত্র কে প্রকট করিয়া তুলিয়া ধরিয়াছে। চড়া হারের সুদে কোটি কোটি ডলারের সাহায্যে গ্রহন করিয়াও সরকার জনসাধারণের অর্থনৈতিক সম্পদ দ্রুত ও ক্রমবর্ধমানভাবে পুঞ্জীভূত হইয়া ওঠা এবং আমলাতন্ত্রের একটি নূতন ও শক্তিশালী ভূস্বামী ও শিল্প অভিজাত শ্রেণীতে রুপান্তর এমন এক বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করিয়াছে সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে ছাড়া যাহার মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

বহুদিন পূর্বেই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ইহা উপলব্ধি করিয়াছিল যে, পাকিস্তানের দুইঅংশের অর্থনৈতিক জীবনের উন্নতি সাধনে ব্যর্থ হইয়াছে। মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবারের হাতে দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য দুরীভুত হওয়া এবং পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পোন্নয়ন ত্বরান্বিত করা উচিত। শিল্প উন্নয়নের সুফলগুলি ও অর্থনৈতিক উন্নতি কতিপয় এলাকায় অথবা মুষ্টিমেয় পরিবারের মধ্যে যেন সীমাবদ্ধ না হয় ,তাহার নিশ্চয়তা বিধানও একান্ত আবশ্যক। যাহাদের বুঝিবার সদিচ্ছা আছে তাহাদের প্রত্যেকের জন্য আমাদের পার্টির পক্ষ হইতে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রুপরেখা বর্ণিত রহিয়াছে।চীন , ইন্দোনেশিয়া, ইরান তুরস্ক,ও অন্যান্য এশীয় দেশ প্রমাণ করিয়াছে যে , পাকিস্তান তাহাদের মৈত্রীক উপর নির্ভর করিতে পারে। সাম্রাজ্যবাদীদের স্বরূপ উদঘাটিত হওয়ার সাথে সাথে আমাদের বৈদেশিক সম্পর্কের এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা ঘেঁষা রুপরেখা নূতন করিয়া অনুমোদিত হইয়াছে । ঘটনাপ্রবাহ বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ভূমিকা অকাট্য যৌক্তিকতা হাজির করিয়াছে।

অনেক মূল্যের বিনিময়ে দেশ আজ বুঝিতে পারিয়াছে যে রাওয়ালপিণ্ডি হইতে পাকিস্তানকে রক্ষা করা হইবে , উচ্চ স্বরে ঘোষিত এই তত্ত্ব বাস্তব অথবা কার্যোপযোগী নয়। পাকিস্তানের দুই অংশের প্রতিরক্ষার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহনের এবং প্রতিরক্ষা নীতির সমন্বয় সাধন জনিত প্রয়োজনাদি সাপেক্ষে পূর্ব পাকিস্তানে নৌ-সদর দপ্তর স্থানান্তরের অত্যাবশ্যকতার কথা ১৯৫৭ সালের প্রনীত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির গঠনতন্ত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। আমরা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সরকারী খাতে মূল ও ভারী শিল্প স্থাপনের দাবী ও করেছিলাম। যদি আমাদের প্রস্তাব গ্রহন করা হইত এবং আমলাতন্ত্র উহাকে উপেক্ষা না করিত তবে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের অপেক্ষাকৃত অসহায় অবস্থা এবং অস্ত্র নির্মান কারখানা স্থাপন করিয়া দেশের উভয় অংশ কতৃক অস্ত্রশস্ত্র নিজ নিজ চাহিদা পূরনের ব্যাপারে অক্ষমতা, যাহা সেপ্টেম্বরের যুদ্ধের সময় প্রকট হইয়া পড়িয়াছিলো্‌, এড়ান সম্ভব হইত।

পাকিস্তানের উভয়াঞ্চলের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তা সেপ্টেম্বরের যুদ্ধের ফলশ্রুতি হিসেবে যাহা প্রকটভাবে দেখা দিয়াছে , আমরা শুরু হইতেই উপলব্ধি করিয়াছি।আমরা ১৯৫৭ সালে দাবি করিয়াছিলাম যে ,পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসিত দুইটি ইউনিটের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি পূর্ন স্বাধীন ও সার্বভৌম এবং জনকল্যানমূলক ফেডারেল রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া তোলা উচিত। আমরা পাকিস্তানকে এইরূপ একটি রাষ্ট্র হিসাবে দেখিয়াছি যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার জনসাধারনের ওপরই ন্যস্ত থাকিবে এবং সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ ও যুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত গন পরিষদ উহা প্রয়োগ করিবে।আমরা পশ্চিম পাকিস্তানকে একটি আঞ্চলিক ফেডারেশন হিসাবে পুনর্গঠনের দাবি করিয়াছি, যাহার আইন পরিষদে কোন একটি প্রদেশ অন্য প্রদেশ অপেক্ষা অধিক সংখ্যক আসনের অধিকারী হইবে না এবং ভাষা ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিতে প্রদেশ সমূহ পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করিয়াছি।

পাকিস্তানের উভয়াঞ্চলের জনসাধারণ দরিদ্র নির্যাতিত এবং রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার স্বাধীনতা ও মর্যাদা হইতে বঞ্চিত।আমরা মনে করি সমাজতান্ত্রিক সমাজকে গ্রহন করাই ইহার জবাব।বিভিন্ন দেশে মানুষের অর্জিত শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া উচিত।মুষ্টিমেয় ব্যক্তির স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি পরিহার করা উচিত। সকল পাকিস্তানীকেই আমাদের জাতীয় সম্পদের অংশীদার বলিয়া গণ্য করা উচিত। ইহাদের পূর্ণ আত্মবিকাশের অধিকার রহিয়াছে এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির অধীনে সম সুযোগের অধিকার রহিয়াছে।

বর্তমানে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার কতৃক আরোপিত শাসনতন্ত্র ও সরকারী নীতিসমূহ শুধু যে একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী এক ব্যক্তির হাতের সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করিয়া দিয়াছে তাহাই নয় ইহা জনসাধারণের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তির স্বাধীনতাকে অস্বীকার করিয়াছে। সম্পদ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হইয়াছে। এই অবস্থায় আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হইবে এমন একটি প্রতিনিধিত্বশীল ও গনতান্ত্রিক কাঠামো গড়িয়া তোলা যেখানে ক্ষমতা একটি সম্পূর্ণ সার্বভৌম আইন পরিষদে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনগণের প্রতিনিধিদের হস্তে ন্যস্ত থাকিবে। পাকিস্তানে সকল অংশের ঐক্য রক্ষায় ও সকল পাকিস্তানীর অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামের ব্যাপারে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সকল নাগরিকের সমান সুযোগ, বিভিন্ন এলাকা ও জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ হইতেছে আমাদের সামনে যে সমস্যাবলী রহিয়াছে উহার প্রত্যুত্তরে আমাদের জবাব। সকল পাকিস্তানির জন্য জনগনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক আমাদের লক্ষ্য। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমস্যার সমাধান অবশ্যই করিতে হইবে এবং উহার জনগণের উপর বিদেশী, পূর্ব পাকিস্তানী বা পশ্চিম পাকিস্তানী পুঁজিপতি যেই হউক না কেন তাহাদের শোষন খর্ব ও নিয়ন্ত্রিত করিতে হইবে। দেশের সকল অংশকে যথাযথ ভাবে রক্ষার ব্যবস্থা করিতে হইবে এবং সকল অঞ্চলের জনসাধারণকে জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীতে যোগদানের পরিপূর্ণ সুযোগ প্রদান করিতে হইবে। সেনাবাহিনীকে জাতীয় ভিত্তিতে গঠন করিতে হইবে এবং ক্রমশ উহার গঠন জনসংখ্যার আনুপাতিক হইতে হইবে। জাতীয় প্রতিরক্ষা , পররাষ্ট্রনীতি ও মুদ্রা এবং এই সকল বিষয়ে কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ফেডারেল সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকিবে। এবং এইগুলি ছাড়া অপরাপর সকল বিষয়কেই প্রাদেশিকীকরন করিতে হইবে । পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত সেনাবাহিনীকে ভিত্তি করিয়া পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রদানকে প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হইবে। গনতন্ত্র , স্বায়ত্তশাসন ও সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে ঐক্য ও স্বাধীনতার পথে আগাইয়া চল -ইহাই হইতেছে আমাদের শ্লোগান।

সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণ

আমরা একথা বলিতে পারিনা যে ,একটা দেশের মধ্যে যেমন একদল বঞ্চিত ও একদল বিত্তশালী রহিয়াছে তেমনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও মুষ্টিমেয় কয়েকটি রাষ্ট্র সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করিয়াছে। সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইহার তাবেদার রাষ্ট্রগুলি সহ একটি নতুন ধরনের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়িয়া তুলিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্র অর্থ ও ক্ষমতার উপর তাঁহার একচেটিয়া অধিকার কায়েম রাখার জন্য মনুষ্যজাতীর ওপর একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চাপাইয়া দেওয়ার চেষ্টা করিতেছে। ভিয়েতনামে যুদ্ধ সম্প্রসারন চীনের বিরুদ্ধে নয়া মোকাবেলা, ভারতকে দ্রুত অস্ত্রসজ্জিতকরন , সেন্টো ও সিয়েটো ধরনের সংস্থা গঠনের নয়া প্রচেষ্টা এইসবকিছুই ঐ অভিসন্ধি নির্দেশ করে।পাকিস্তান সম্প্রতি উহার বাণিজ্যকে বহুমুখী করার এবং চীন , সোভিয়েথ ইউনিয়ন, অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও আফ্রো-এশিয়- লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্রগুলির সহিত সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করিতেছে ; কিন্তু আমরা এখনো সেন্টো-সিয়েটো হইতে বাহির হইয়া আসি নাই। এবং এখনো আমাদের দেশে মার্কিন সরকারের ঘাটি বিদ্যমান রহিয়াছে । বিদেশী পুঁজিপতিদের শোষণ ইহারা আমাদের দেশের পুঁজিপতিদের মধ্যে উৎসুক মিত্র খুজিয়া পায়, বর্তমানে এক নতুন রুপ পরিগ্রহ করিতেছে। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার জন্য পূর্বাহ্ণে পরিশ্রুত অর্থ সাহায্য করিয়া যুক্তরাষ্ট্র আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করিতেছে। পাকিস্তানের পুঁজিপতি ও আমলাতন্ত্রিরা এই সকল ব্যাপারে গভীর উৎকণ্ঠিত এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থ আরএকবার বিক্রয় করিবার হুমকি দিতেছে। ইহাকে প্রতিহত করার জন্য জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ হইতে হবে এবং আমাদের পরিকল্পনাবিদদের অবশ্যই আমাদের জাতীয় সম্পদের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতে হইবে। আমাদের ত্যাগ স্বীকার এবং নুতন উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোকে রাষ্ট্রীয় খাতে স্থানান্তকরন মার্কিনী হুমকির প্রতিক্রিয়াকে আংশিকভাবে ঠেকাইতে সক্ষম হইবে।

সঠিকভাবে আমাদের ভবিষ্যৎনীতি ও কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য অবশ্যই আমাদের শত্রুদের অবস্থান , তাহাদের বর্তমান রণনীতি ও কৌশল সম্পর্কে অবহিত হইতে হবে। আমরা এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে সাম্রাজ্যবাদই আমাদের প্রধান শত্রু আর তাই তাহাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সাম্রাজ্যবাদ কি রণনীতি ও কৌশল গ্রহন করিতেছে সে সম্পর্কে আমাদের ওয়াকিবহাল থাকিতে হইবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত কয়েক বৎসর এশিয়া ও আফ্রিকার বহু স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হইয়াছে। এই সকল নতুন রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন,চীন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক দেশের সহায়তায় অনেকটা স্বাধীন অর্থনীতি গড়িয়া তুলিতেছে। কিছু ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র মুক্তি অর্জনের জন্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতেছে। বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি ইতিমধ্যেই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সহিত এক তীব্র অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হইয়াছে। এই সবই পুঁজিবাদের সাধারন সংকটকে গভীরতর করিতেছে এবং পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যকার বিরোধকে তীব্রতর করিয়া তুলিতেছে। এই অবস্থা হইতে নিজেদের রক্ষা করার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা, মূলতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদীচক্র , বারবার যুদ্ধোন্মদনাসহ বিভিন্ন ধরনের উদ্ধৃত প্ররোচনার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। তাহারা লাওসে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করিতেছে এবং কম্বোডিয়াকে হুমকি প্রদান করিতেছে। দক্ষিন ভিয়েতনামে বারংবার নাজেহাল হইয়া তাহারা মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে।তাহারা যুদ্ধকে আরো বিস্তৃত করিতে চায়। তাহাদের লক্ষ্য হইতেছে চীন।চীনা ভূখণ্ডের উপর সাম্প্রতিককালের মার্কিন বিমানের বেআইনী উড্ডয়ন ইহার একটি জ্বলন্ত প্রমান। এ ব্যাপারে ভারতের বর্তমান শাসক শ্রেণী যুক্তরাষ্ট্রের সহিত হাত মিলাইয়াছে।“নেফা” কে শক্তিশালী করার ব্যাপারে সামরিক দিক দিয়া পূর্ব পাকিস্তানের গুরুত্ব সমধিক।সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের দৃষ্টি পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পতিত হওয়ার কথা।অধিকন্তু, যখনই সম্ভব সাম্রাজ্যবাদীরা সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশসমূহের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দকে ব্যবহার করিতে চেষ্টা করে। তাঁহার বিভিন্ন সামাজিক,জাতীয় ও উপজাতীয়দের মধ্যে সংঘর্ষের প্ররোচনা দেয় এবং বিভিন্ন রাজনীতিককে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করিয়া সব চাইতে প্রতিক্রিয়াশীল ও দুর্নীতি পরায়ন এমনসকল রাজনীতিককে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করায়, যাহাদের উন্নতি বৈদেশিক পুঁজির সাথে সহযোগিতা ও সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। পাকিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা প্রকাশ্যে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি দরদ প্রকাশ করিতে শুরু করিয়াছে। কিছুকাল পূর্বে তদানীন্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিঃ ম্যাকনগী পূর্ব পাকিস্তান সফরকালে প্রকাশ্যে পূর্ব পাকিস্তানীদের সাহায্য করার প্রস্তাব করিয়াছিলেন।

দক্ষিন ভিয়েতনামে একদা মার্কিন শিখন্ডী নগো দিন দিয়েমের অপসারন ও হত্যা ইহাই প্রমান করে যে, যদি তাঁবেদার তাহাদের উদ্দেশ্য হাসিল করিয়া দিতে ব্যর্থ হয়, তাহা হইলে সেই তাঁবেদারকে হত্যা করিতেও সাম্রাজ্যবাদীরা এতটুকু দ্বিধা করে না।ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, বিশ্বের এই অঞ্চলে মার্কিন বিশ্বরণপরিকল্পনাকে সাহায্য না করার জন্য বর্তমান সরকারের প্রধানের ওপর মার্কিনীরা সন্তুষ্ট নয়।

শত্রুর বিপক্ষে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের নিজস্ব শক্তি সম্পর্কে ধারনা রাখা প্রয়োজন।

আমাদের জনগণ সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে ততটা সচেতন নহে। বিগত পাক ভারত যুদ্ধে জনগণকে অন্তত মার্কিনবিরোধী করিয়াছে। অবশ্য ইহার অর্থ এই নয় যে, তাহারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হইয়া গিয়াছেন। কিন্তু এখন এই মার্কিনবিরোধী মনোভাবকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মনোভাবে পরিনত করা সহজতর হইয়াছে। আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদী অবস্থানের ফলশ্রুতি হিসেবে জনগণ অধিক ট্যাক্স, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অগ্নিমূল্য, বিভিন্ন ফসলের নিম্নমূল্য ও চরম দুর্নীতির চাপ নিশ্চয় অনুভব করিয়া থাকেন। ট্যাক্স, ব্যাবসায় একচেটিয়া আধিপত্য, দুর্নীতি প্রভৃতি সমস্যার উপর আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণকে বর্তমান অদৃশ্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে সামিল করার ও তাঁহাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী করিয়া তোলার যথেষ্ট সুযোগ রহিয়াছে।

কাশ্মীর

এই সমস্যার দ্বারা যে ব্যাপক আবেগের সৃষ্টি হইয়াছে এই কমিটি তাহা পরিপূরণরুপে আনুধাবন করে এবং তাহার সহিত ঐকমত্য। কাশ্মীরবাসীর আত্ননিয়ন্ত্রণাধিকার সমর্থন বিশ্বের স্বাধীনতা ও শান্তির সংগ্রামের একটি অবিচ্ছদ্য অংশ বলিয়াই আমরা মনে করি। জে পর্যন্ত কাস্মীরবাসি তাহাঁদের নিকত গ্রহনযোগ্য নহে আমন একটি সরকারি ব্যবস্থার অধিনে নিষ্পিষ্ট হইতে থাকিবেন এবং তাহাদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার প্রদান সম্পর্কে ১৯৪৯ সালে ভারত,পাকিস্তান ও জাতিসংঘের মধে জে ঐকমত্য প্রতিস্থা হইয়াছিল তাহা অস্বীকার করা হইবে ততদিন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়া অনিশ্চয়তা বিরাজ করিবে এবং ভারত ও পাকিস্তান তাহাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনা করিয়া তাহাদের জনগনের দুখ- দুর্দশা অবসানকল্পে সর্বতোভাবে তাহাদের শক্তি নিয়োগ করিতে পারিবে না।

উপসংহার

জনগনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপাইয়া দেওয়া একটি অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতাণ্ত্রিক শাসনের অধিনে দেশ আজ নিষ্পিষ্ট হইয়াচে। দুর্নীতি জাতির অস্থিমজ্জা প্রবেশ করিয়াচে। পুঁজিপতি ও সমাজবিরোধীরা তাহাদের জীবনে চরম সুযোগ লাভ করিতেচে। এক রাজনৈতিক শাসরুদ্ব্ধকর ও বুদ্ধি বৃত্তির স্থবিরতার পরিবেশে মানুষের মন আজ দ্বিধাগ্রস্ত, মৌলিক স্বাধীনতার অস্বীকৃতি দেশের মূলে আঘাত হানিতেছে এবং সন্দেহ ও হতাশার এক পরিবেশে সম্রাজ্যবাদী সক্তিসম্মুহ আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের সুযোগ লাভ করিতেছে ।

ন্যাশনাল আওমালিগ পার্টির কেন্দ্রিও কার্যনির্বাহী সংসদ জনগনের ঐক্য ,প্রদেশ সমূহের স্বায়ত্ত শাসন ,পাকিস্তানের সংহতি , ফেডারেল ধরনের পারলামেন্টারী গনতন্ত্র, বর্তমান স্বৈরাচারী একনায়কত্বের উচ্ছেদ সাধন ও সমাজতন্ত্রের দিকে অগ্রগতির স্বার্থে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের উদ্দেশে নিজেদেরকে, পার্টি ও জনগণকে সংগঠিত করার জন্য পার্টির সকল সদস্যের প্রতি আহবান জানাইতেছে । এই উদ্দেশে আমরা নিন্ম লিখিত দাবীসমূহ আদায়ের জন্য সমাজতন্ত্র ও গনতন্ত্রে বিশ্বাসী সকল পাকিস্থানিকে ঐক্যবদ্ধ গণ আন্দোলন গড়িয়া তোলার আহবান জানাইতেছিঃ

১। বর্তমান আইন পরিষদগুলি ভাঙ্গিয়া দিয়া প্রত্যক্ষ ও প্রাপ্তবয়স্কের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নূতন আইন পরিষদ নির্বাচন করিতে হইবে এবং অনুরূপভাবে নির্বাচিত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নিন্মোদ্ধৃত বিষয়গুলির ব্যবস্থা করার জন্য শাসনতন্ত্র সংশোধন করিবেনঃ

(ক) ফেডারেল শাসন ব্যবস্থার অধিনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনসাধারনের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান। কেবলমাত্র দেশরক্ষা,বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রা এই তিনটি বিষয়ের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের উপর ন্যস্ত থাকিবে।

(খ)সংস্কৃতি ও ভাষার সমতা এবং ভৌগলিক সংলগ্নতার ভিত্তিতে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশসমুহকে স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হিসেবে পুনরগথন।

পশ্চিম পাকিস্থানের পুনর্গঠিত প্রদেশসমুহের গনতান্ত্রিক গঠন কাঠামো একইরূপ হইবে এবং তাহারা (প্রদেশসমুহ) একটি আঞ্চলিক ফেডারেশনে ঐক্যবদ্ধ হইবে। এই ফেডারেশনের আইন পরিষদে কোন প্রদেশই নিজের সংখ্যাধিক্যের বলে একত্রে অবশিষ্ট প্রদেশসমূহের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ যে সকল বিষয়ে একমত হইবেন, পরিষদ সেই সকল সাধারণ বিষয় কার্যকর করিবে। একটি আঞ্চলিক ফেডারেশনের দ্বারা বর্তমান এক- ইউনিট ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার উপরোক্ত লক্ষ্য শাসনতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধ্তির মাধ্যমে অর্জন করা হইবে। বর্তমান উপজাতীয় এলাকা, দেশীয় রাজ্য , ইজারাধিন এলাকা, এজেন্সী সমূহ ও অনুরূপভাবে এলাকা সমুহকে সন্নিহিত প্রদেসগুলির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে যুক্ত করিতে হইবে। যাযাবর, আধা- যাযাবর ও উপজাতীয় জনসাধারণকে বৃহত্তর জীবনের সহিত সম্পৃক্ত করিতে হইবে যাহাতে তাহার উন্নত নাগরিক জীবনের সুযোগ- সুবিধাদি ভোগ করিতে পারে।

সকল পাকিস্তানীর মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ব বোধের বিকাশকে উৎসাহিত ও শক্তিশালী করিতে হইবে।সামাজিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়কে উৎসাহিত করিতে হইবে।এবং উভয়াঞ্চলীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও স্বল্পব্যয়সাধ্য করিতে হইবে।

(গ) পরিষদগুলিকে আইন ও বাজেট পাশের পূর্ন ক্ষমতা প্রদান করিতে হইবে এবং প্রেসিডেন্ট ও গভর্নরগনের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রহিত করিতে হইবে।

(ঘ)জনগনকে মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা দিতে হইবে এবং জাতিসংঘ কতৃক ১৯৪৮ সালে গৃহীত মানবাধিকার সনদে স্বীকৃত সকল অধিকার ভোগ করিতে দিতে হইবে।

২। পূর্ন ব্যক্তি স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ঘোষিত জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করিতে হইবে।সকল দমনমূলক আইন প্রত্যাহার করিতে হইবে।

৩। প্রিন্স করিম, আব্দুস সামাদ খান আচাকযাই, আতাউল্লাহ খান মেঙ্গল,সেনমনিকৃষ্ণ, আব্দুল হালিমসহ রাজনৈতিক কারনে সাজাপ্রাপ্ত ও বিনাবিচারে আটক পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সকল বন্দীকে আজ মুক্তি দিতে হইবে। রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে সকল বিচারাধীন মামলা ও গ্রেফতারী পরোয়ানা প্রত্যাহার করিতে হইবে এবং রাজনৈতিক কারণে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি ও জরিমানা প্রত্যর্পণ করিতে হইবে।

৪।পাকিস্তানকে “সিয়াটা” ও ‘সেন্টো’ হইতে সদস্য পদ প্রত্যাহার করিতে হইবে। পাকিস্তানে সকল মার্কিন ঘাঁটির বিলোপ সাধন করিতে হইবে এবং এই ধরনের আর কোন জড়িত হওয়া চলবেনা।

৫।পাকিস্তান প্রতিরক্ষা কাঠামোকে পুনর্গঠন করিতে হইবে। প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে আত্ননিভরশীল করিয়া তুলিতে হইবে। নৌ-বাহিনীর সদর দফতর পূর্ব পাকিস্তানকে স্থানান্তরিত করিতে হইবে।

৬।পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও শিল্প সংক্রান্ত নীতির প্রধান লক্ষ্য হইবে এখানকার জনসাধারনের কল্যাণ সাধন। পূর্ব পাকিস্থান হইতে পুঁজি পাচার বন্ধ করিতে হইবে। পূর্ব পাকিস্তান বা পশ্চিম পকিস্তান যেখানেই হউক না কেন, জনসাধারণকে শোষণের এবং গুটিকয়েক পরিবার কতৃক দেশের সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত করার চেস্তাকে বন্ধ করিতে হইবে।সকল গুরুত্বপূর্ণ ও মুল শিল্পগুলি সরকারী খাতে প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।

৭।দেশের শিল্প সরকারী খাতে সিমাবদ্ধ রাখিতে হইবে এবং উহা দেশের উভয়াংসে স্থাপন করিতে হইবে।

৮।আমলাতান্ত্রিক ও সম্রাজ্জবাদি পুঁজি এবং বাঙ্ক,বিমা কোম্পানি ও পাট ব্যবসায় জাতীয়করণ করিতে হইবে।