পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে

Posted on Posted in 5

পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে

২৫শে আগষ্ট, ১৯৭১

রোগাগ্রস্ত ভদ্রলোকের অপচেষ্টা

বিদ্রোহের অগ্নিতে ভষ্মীভূত ইয়াহিয়ার পাকিস্তানে বিশ্বের বৃহত্তম উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠানের অয়োজন চলছে। পৃথিবীতে এতো ব্যাপক উপ-নির্বাচন বোধ হয় আর কোন দেশে হয়নি। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের দখলীকৃত

এলাকায় মূক ও শঙ্কিত নাগরিকগন অস্ত্রের হুঙ্কারে একটি তথাকথিত সাধারণ নির্বাচনের স্বাদ পেতে হয়তো চলছেন। বন্দী নাগরিকদের অন্ধকূপের মধ্যে নিক্ষেপ করে ইয়াহিয়া যে উপ-নির্বাচনের ফাঁদ পেতেছেন, গণহত্যার মতোই সেটা হবে তার আর একটি ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রমূলক রেকর্ড-প্রবঞ্চকের ডাইরীতে নতুন অধ্যায়ের সংযোজন।

        ভদ্রলোক রোগগ্রস্ত। মনস্তত্ত্ববিদগণ যেমন কোন কোন রোগীর মধ্যে বিশেষ জৈবিক প্রবণতা সন্ধান পান, মনোবিজ্ঞানের চেম্বারে উপস্থিত করলে ইয়াহিয়ার মধ্যেও রক্তপাতের প্রবল উন্মাদনা পরীক্ষাযন্ত্রে ধরা পড়বে।

        জীবনে অন্ততঃ একটা বিজয় তার আছে- তা হচ্ছে অস্ত্রের ঝঙ্কারে বলপূর্বক পাকিস্তান দখল, রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা কুক্ষিগত। অঙ্গুলি হেলনে তিনি নির্বাচন করেছেন, অঙ্গুলি আস্ফালনে তিনি গণহত্যার পৈশাচিক তাণ্ডবে সেনাদের লেলিয়ে দিয়েছেন। আবার খেয়াল-খুশী মতো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আসনচ্যুত করার নির্দেশ দিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন। এই তোঘলকী হঠকারিতার উত্তরাধিকারী শৈলনিবাসী ভদ্রলোক ইয়াহিয়া জানেন না যে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশ তিনি দিয়ে থাকতে পারেন; কিন্তু প্রতিনিধিদের সদস্যপদ খারিজের অধিকার তার নেই। কারণ, পরিষদ সদস্যগণ নির্বাচিত হয়েছেন জনগণের ভোটে, তার ভোটে নয়। এক্ষেত্রে ধনুক থেকে তীর তার নাগালের বাইরে চলে গেছে। তার এই উচ্ছৃঙ্খল চরিত্রটি একটি মাত্র অভিপ্রায় বা মনোবাসনা দ্বারা পরিচালিত, তা হচ্ছে অস্ত্রবলে বেআইনীভাবে ক্ষমতার মসনদ আইনানুগ ও চিরস্থায়ী করার অভিপ্রায়। পাগলাগারদের চিকিৎসকগণ এ রোগের একটা নাম দিয়েছেন। আপাতঃদৃষ্টিতে সুস্থ-সবল দেখতে, এমন কি মাত্রাধিক অমৃত রসধারা পান করেও লোকটি স্বাভাবিক মাতালের মতো ব্যবহার করে। কিন্তু বিশেষ বিশেষ আকাঙ্খা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে সে অকস্মাৎ অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে- তখন যেকোন ব্যক্তিকে সে হত্যা করতে পারে। বিশষজ্ঞগণ এ রোগকে “প্যারানাইয়া” বলেন। উন্মাদদের শ্রেণীবিন্যাস।

        নরহত্যার জেনারেল এই ইয়াহিয়া কলমের এক খোঁচায় আওয়ামী লীগের ৭৯ জন জাতীয় পরিষদ সদস্যের নির্বাচন বাতিল করেছেন। তিনি প্রাদেশিক পরিষদের ১৯৫ জন আওয়ামী লীগ সদস্যের পদ খারিজ করে আত্মতুষ্টি লাভ করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজেই আবার আওয়ামী লীগ প্রধানরূপে অবশিষ্ট পরিষদ সদস্যদের উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করে স্বপ্নরাজের ভবিষ্যৎ পরিষদে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে আসন গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ “প্যারানাইয়া রোগে আক্রান্ত এই ভদ্রলোকের এক অস্বাভাবিক খেয়ালে দু’টি পরিষদে আওয়ামী লীগের মোট ৪৫৫ জন সদস্যপদ হারিয়েছেন এবং মোট যে ১৮১ জন সদস্যপদ হারাননি, তাদের ইয়াহিয়া খান নিজেই শেখ মুজিবের পক্ষে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করেছেন! এ যেন টোগোল্যাণ্ডের কোন এক ক্লাউন অধিনায়ক কর্তৃক ইংল্যাণ্ডের প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার নির্দেশের মতো। ইয়াহিয়ার এই স্বেচ্ছাচারমূলক অধিকারটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে উন্মাদের কার্যকলাপ বলেই পরিগণিত হচ্ছে, একথা আজ সত্যের মতো উজ্জ্বল।

        যে ২৭৪ জনকে অপরাধী বলে উল্লেখ করে সদস্যপদ খারিজ করেছেন, তাদেরই আবার বিচারের জন্যে কোর্টে উপস্থিত হতে বলেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি শাস্তি আগে দিয়েছেন, বিচার পরে হতে চলছে। শরীরের রক্তপ্রবাহ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে; কিন্তু মানুষ যদি রক্ত পান করে, তবে তার কার্যক্রমে অস্বাভাবিক ব্যতিক্রম ও অসঙ্গতি দেখা যায়- এ তারই দৃষ্টান্ত।

        এতো সামঞ্জস্যহীন কার্যপদ্ধতির মধ্যেও ইয়াহিয়া একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সফল করতে চাচ্ছেন- এক ঢিলে দুই পাখী। অন্ততঃ কাল্পনিক পরিষদে আওয়ামী লীগকে এভাবে সদস্যপদ থেকে বঞ্চিত করা যাবে এবং গণহত্যার সহচরও ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী চক্রান্তকারী ভূট্টোকে সংখ্যালঘু দলের নেতার নেতারূপে পঙ্গু করা সম্ভব হবে।

জাতীয় পরিষদে মাত্র ৮৮ জন এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৯৩ জন আওয়ামী লীগ নেতার সদস্যপদ বাতিল হয়নি বলে পিণ্ডি সরকার ঘোষণা করে স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত বাংলাদেশের নাগরিকদের বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে, উক্ত মোট ১৮১ জন আওয়ামী লীগ পরিষদ সদস্য ইয়াহিয়া ও তার উন্মাদ জেনারেলদের পাশে রয়েছেন। এমন কি বাংলাদেশে গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিকাণ্ড, ও নারী নির্যাতন তারা সমর্থন করেন। পরিষদ সদস্যদের একটা বিরাট অংশ স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্বাস করেন না। অপরদিকে এমন একটা ভ্রান্ত ধারণা দিতে চেষ্টা করা হয়েছে যে, উক্ত ১৮১ জন সদস্য ইয়াহিয়ার কোটের পকেটে রয়েছেন। বিশ্ববাসীর কাছে তিনি এই বিভ্রান্তিকর চিত্র সাময়িককালের জন্যে তুলে ধরেছেন। কারণ মিথ্যাশ্রয়ী এই জেনারেল জানেন যে, ১৮১ জন সদস্য তার মুঠোর মধ্যে নেই। এদের প্রায় সব ক’জনই বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকা পালন করতে যাননি। তিনি সদস্যপদ বাতিল না করে শুধুমাত্র প্রলোভন দেখিয়েছেন।

        এতো ব্যাপকসংখ্যক আওয়ামী লীগ সদস্যকে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তা বিশ্বাস করতে পারে না। অবস্থার প্রেক্ষিতে পরিষদের মধ্যেও তারা বিদ্রোহীর ভূমিকা নিতে পারেন। যারা বিশ্বাসঘাতক, ‘বিশ্বাস’ শব্দটি তাদের অভিধানে থাকে না। চক্রান্তের প্রথম পর্বেই হচ্ছে সন্দেহ। রক্তপিপাসুদের হাতে নিহত হবার জন্যে মুষ্টিমেয় দু’চারজন ছাড়া কেহই যখন ইয়াহিয়ার বন্দীশালায় পা বাড়াবেন না, তখন তিনি পর্যায়ক্রমে বাতিলকৃত সদস্যদের তালিকার কলেবর বৃদ্ধি করবেন এবং সে সংখ্যা চার শতাধিক হয়ে দাঁড়ালে আশ্চর্য হবার কিছু থাকবে না। আর সে ক্ষেত্রে যুদ্ধবিধ্বস্ত দক্ষিণ ভিয়েতনামের নির্বাচনের রূপ নেবে ইয়াহিয়ার সর্বব্যাপী উপ-নির্বাচন।

        এই সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে “কম্পিউটারকে” ও জিজ্ঞেস করলে একই উত্তর পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে হত্যাভিযানে যিনি প্রধান সেনাপতির দায়িত্বভার নিয়েছেন, সেই ইয়াহিয়া জানেন যে, যতো প্রলোভনই থাকুক না কেন লক্ষ লক্ষ দেশপ্রেমিকের মৃতদেহ মাড়িয়ে ইতিপূর্বে নির্বাচিত কোন সদস্য পরিষদকক্ষে প্রবেশ করবেন না। তিনি জানেন যে, মা-বাপ, ভাই-বোন, স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে যারা হত্যা করেছে নির্বিচারে, তাদের সাথে সহযোগিতা করে দেশবাসীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্যে কেউ এগিয়ে যাবেন না। তিনি জানেন যে, দেশপ্রেমিকদের রক্তে কলম চুবিয়ে কেউ ইয়াহিয়ার পরিষদের হাজিরা খাতায় দস্তখত করবেন না। সেই দানব শক্তিটি জানেন যে, দস্যু-হানাদারদের কবল থেকে সমগ্র বাংলাদেশকে উদ্ধার করার জন্য এরা সবাই স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত।

        এই রোগগ্রস্ত ভদ্রলোক এ-ও জানেন যে, বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করার তার এই অপচেষ্টা নিদারুণভাবে ব্যর্থ হবে।

(ফয়েজ আহমদ রচিত)

২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

ছদ্মবেশীর ময়ূরপুচ্ছ খসে পড়েছে

        সামরিক ডিক্টেটর আয়ুব খানকে তাড়িয়ে নাঙ্গা তলোয়ার হাতে তারই প্রধান সেনাপতি ইয়াহিয়া ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চের রাত্রে যখন পিণ্ডির সিংহাসনে বসলেন, সে সময় এই মিথ্যাশ্রয়ী জেনারেল বিক্ষুব্ধ জনসাধারণকে শান্ত করার জন্যে সভ্য জগতের শাসকদের অনুকরণে কোমল ভাষায় দর্শনসম্মত বাণী উচ্চারণ করতে শুরু করেন। গণতান্ত্রিক নির্বাচন, জনগণের আশা-আকাঙ্খা প্রতিফলিত শাসনতন্ত্র ও ন্যায়নীতির শাসন প্রতিষ্ঠার কথা তিনি অহরহ প্রচার করতেন। এমন কি, “আমি জনগণের প্রতিনিধি নই- সৈনিক; জনগণের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাবো এবং সামরিক সরকার হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন”- এ সমস্ত বক্তব্য ফলাও প্রচার করে জনগণের চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখতেন।

দেশী-বিদেশী নেতৃবর্গ, অফিসার ও সাংবাদিকদের কাছে সবচাইতে প্রিয় আলোচ্য বিষয় ছিল নির্বাচন ও শাসনতন্ত্র। অর্থাৎ বন্দুকধারী মানুষটির মধ্যে গণতন্ত্রের এক সুকুমার মূর্তি বিরাজ করছে, এটাই ছিল সমগ্র কিছুর প্রতিপাদ্য বিষয়। এক কথায় তিনি দানবের কাছ থেকে মানবীয় গুণাগুণ লাভের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তবুও ঈশপের গল্পের সত্য তার মধ্য প্রকাশ পেতে থাকে। বিশেষ বিশেষ পশু বা পক্ষী ছদ্মবেশ ধারণ করে দীর্ঘ সময় যেমন নিজেকে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হয় না, কণ্ঠস্বরই তার জন্যে অভিশাপ হয়ে ওঠে, তার পরিচয়কে ঘোষণা করে-ইয়াহিয়ার ব্যাপারেও তাই ঘটল। ক্রমবিকাশমান পাশবিক রূপটি সকলের কাছে স্পষ্ট হতে থাকে। তবে তিনি সুচতুরের ন্যায় বাক্যব্যয়ে শিক্ষিত।

        তখন পিণ্ডিতে ট্যাঙ্কগুলো ক্যান্টনমেন্টে ফিরে গিয়েছিল, রাস্তার মোড়ের কামানগুলোর নল মাথা নত করে স্তব্ধ। অসামরিক ও সামরিক স্টারধারী আমলদের রাজনৈতিক শাসনগত কাঠামো তখন অনেকটা সুপ্রতিষ্ঠিত। সে সময় ইয়াহিয়া সিভিলিয়ান পোশাকে ঢাকা সফরে আসলেন। হাতের ব্যাটন আর মূখনিঃসৃত সৌরভ বাদ দিলে তাকে সেদিন অন্ততঃ একজন মোনাফেক রাজনীতিকের মতো মনে হয়েছিল। সাংবাদিকরা বিমানবন্দরে তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট দ্য গলের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে- দেশব্যাপী এক রেফারোণ্ডামে দ্য গল পরাজিত হয়ে সেদিনকার পত্রিকাতেই পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেছিলেন।

প্রশ্ন ছিলঃ দ্য গলের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

জেনারেল ইয়াহিয়া খান হাতের ব্যাটন বাঁ হাতের তালুতে দু’বার ঠুকে বিজ্ঞের ন্যায় মন্তব্য করেনঃ যে কোন সম্মানীয় নেতার পক্ষে এটাই হচ্ছে গৌরবজনক পথ।

আবার প্রশ্নঃ পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও কি এ কথা প্রযোজ্য?

এ প্রশ্ন যে তির্যকভাবে তাকেই আঘাত করছে, তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। ক্রোধ সংবরণ করে প্রশ্নকারী রিপোটারের কাঁধে হাত রেখে দ্রুত উত্তর দেন ‘ইয়েস’ -মানে ‘হ্যাঁ’।

এটা যে তার দিক থেকে প্রতিশ্রুতি ছিল, সে কথা এই সিপাহীর মস্তিষ্কে আসেনি। কিন্তু রিপোর্টারগণ বুঝতে পেরেছিলেন কোথায় তার আঘাত লাগে।

 ক্রমান্বয়ে ক্ষণিকের এই ছদ্মবেশীর ময়ূরপুচ্ছ খসে পড়তে থাকে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রবঞ্চনাপূর্ণ বাক্যসম্ভারের ছিদ্রপথে তিনি জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র চালানোর তথ্য প্রকাশ করতে থাকেন- রিপোর্টারের কাঁধে তিনি হাত রেখে “গৌরবজনক পথ অবলম্বনের’’ প্রতিশ্রুতি তখন থেকেই তার কানে ব্যঙ্গ’র মতো শোনাতে ।

পিণ্ডির এক সংবর্ধনা সভায় ঘনিষ্ঠ মহলের আলোচনায় ইয়াহিয়া অস্ত্রে শান দেওয়ার তথ্য সগৌরবে ফাঁস করেন। তিনি বা হাতের অমৃত্যাধার উর্ধ্বে তুলে ডান হাতের অঙ্গুলি নির্দেশে বলেনঃ আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেছিলেন মুষ্টিবদ্ধ হাতে- বিদায়ের সময় মুষ্টি খুলে তাকে চলে যেতে হয়েছে। আর আমি এসেছি মুষ্টি খুলে, কালক্রমে আমার হাত মুষ্টিবদ্ধ হবে। কথাটা শুনে জী-হুজুর পরিষদ নিম্প্রয়োজনে হেসে উঠেছিলেন, সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক নেতারা বিচলিত হয়ে পড়বেন- কিন্তু জনসাধারণ তার এই বক্তব্যে মোটেই বিস্মিত হননি। তারা জানতেন ডিক্টেটর সেনাপতি কোন পথ নেবেন, তার শাসনের পথ কোনটি, ক্ষমতায় স্থির থাকার জন্যে তার হাতের অস্ত্রের নাম কি। আর এক দস্যু জেনারেলের ‘‘অস্ত্রের ভাষা” সম্পর্কে তারা সচেতন।

নির্বচনের আয়োজন ও বিলম্বিত ব্যবস্থার পরও জনগণ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকগণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে ইয়াহিয়াকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতেন না। তবুও সামরিক আইনের মধ্যেই জনগণ ইয়াহিয়ার স্বপ্নকে চুরমার করে এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। সামরিক শাসকগোষ্ঠীর গুপ্ত বাহিনীর রিপোর্ট ছিল আওয়ামী লীগ

শতকরা ৬০ বা ৬৫টির অধিক আসন লাভ করতে পারবে না। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল শত্রুর শানিত অস্ত্রের ন্যায় ইয়হিয়ারে বক্ষে প্রোথিত হল। এই পরিস্থিতিটা ছিল সামরিক শাসকদের বিদায়ের ইঙ্গিতবাহী। কিন্তু সামরিক শাসক কোনদিন সম্মানের সাথে বিদায় নেন না- বিতাড়িত পশুদের ন্যায় পরাজয় হয়ে পলায়নই তার চরিত্র। ডিক্টেটরের চরিত্রের নির্দেশে ইয়াহিয়া প্রচণ্ড রূপ নিয়ে হত্যার অভিযানে বের হলেন বাংলাদেশের নগরে-বন্দরে-গ্রামে-গঞ্জে। বিদ্রোহের অগ্নিতে প্রজ্বলিত হয়ে উঠলো সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুখমণ্ডল। বিপ্লবী প্রত্যেকটি মানুষের লৌহ-পেশী বাহু দৃঢ়তর হয়ে উঠলো ঘৃণ্য আক্রমণকারী ভাড়াটিয়া সৈন্যবাহিনীর ধ্বংসের তাড়নায়। এতো হত্যা, এতো ধ্বংস আর নির্যাতনের বিভীষিকার মধ্যে তারা আজ দৃঢ়তর ক্ৰন্দনরত নয়, নয় স্থবির। তারা আজ স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ, নবচেতনায় উদ্ভাসিত মুক্তির দিশারী।

 তাই আজ পরিস্থিতিটা হত্যাকারীর বিরুদ্ধে চলছে। বিশ্বের সচেতন রাষ্ট্র ও নাগরিকগণ সোচ্চার কন্ঠে বর্বর শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর। কিন্তু এর পরও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রবঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে ইয়াহিয়া নানান অপকৌশল অবলম্বনে পথ বেছে নিয়েছেন। চক্ষু চিকিৎসককে করেছেন ক্রীড়নক গভর্নর, আর মন্ত্রী করেছেন দশজন ধিকৃত ও জনগণের আঘাত থেকে পলাতক পশুকে। তদুপরি নির্বাচিত ১৮৪ জন সদস্যের পদ খারিজ করে উপ-নির্বাচনের নির্দেশে দিয়েছেন। ২৫শে নভেম্বর থেকে ৯ই ডিসেম্বর পর্যন্ত এই উপ-নির্বাচনে হবে। আর এরই মধ্যে তিনি সামরিক নির্দেশে রচিত শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রকাশ করবেন। তার মতের বাইরে উক্ত খসড়ার কোন ধারাই প্রস্তাবিত তথাকথিত পার্লামেন্টে বাতিল সংশোধন করার ক্ষমতা থাকবে না। সম্ভবত ১৯৭২ সালের জানুয়ারীর পূর্বে তিনি পার্লামেন্ট আহবান করতে সাহসী হবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু তার এই স্বেচ্ছাচারমূলক শাসনতন্ত্র রচনা ও অধিবেশন সবকিছুই একটা বিরাট ”যদি”র উপর ঝুলছে।

কার রাজত্ব তিনি শাসন-নির্যাতন-হত্যা অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে এইসব বিভ্রান্তির আয়োজন করার ঘোষণা করছেন, সে কথা পিণ্ডির “ব্রাসহ্যাট” গোষ্ঠী হয়তো জানেন। কিন্তু তার চাইতে ও সুস্পষ্টভাবে এই শ্রেণীর চক্রান্তের ফলাফল সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন বাংলাদেশের সংগ্রামরত নাগরিকগণ। ইয়াহিয়ার প্রতিশ্রুতি আর দেশদ্রোহীদের সমাবেশ দ্বারা অস্ত্রধারী সংগ্রামীদের স্তব্ধ করা যাবে না-সমগ্র নব-চক্রান্ত আজ সূর্যের মতো প্রখর।

যার জীবনেতিহাস প্রবঞ্চনার বিষধারায় আচ্ছন্ন, মুক্তিকামী মানুষের ক্রুদ্ধ অস্ত্রের বর্ষণেই কেবল তার চক্রান্তের ফলপ্রসূ উত্তর।

(ফয়েজ আহমদ রচিত)