পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রের জন্য ১৭ দফা প্রস্তাব

Posted on Posted in 2

<2.177.700-702>

            শিরোনাম                 সূত্র                     তারিখ
পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রের জন্য

১৭ দফা প্রস্তাব

        ন্যাশনাল আওয়ামী

        (মোজাফফর) পার্টি         

      ৭ মার্চ, ১৯৭১

 

        গনতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র রচনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করুন :

                  বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নেই

 

     আজ দেশবাসীকে মনে রাখিতে হইবে যে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী খুশী হইয়া নির্বাচনে রাজী হয় নাই- আন্দোলনের চাপে পড়িয়াই নির্বাচন অনুষ্ঠান করিতে বাধ্য হইয়াছে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছে, জাতীয় পরিষদ ডাকা হইয়াছে। কিন্তু এখনও শাসনতন্ত্র রচনা ও জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্ততের পথে বাধা সৃষ্টি করিবার জন্য শাসকগোষ্ঠী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহ নানা প্রকার ষড়যন্ত্র করিতেছে। সম্প্রতি এই ষড়যন্ত্র আত্মপ্রকাশ করিয়াছে বিভিন্নভাবে- জনাব ভূট্টো জাতীয় পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে যোগদান করিবেন না বলিয়া বিবৃতি দিয়া ঐ ষড়যন্ত্রকে পাকাপোক্ত করিতেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে মাথাচাড়া দিয়া উঠতে সাহায্য করিতেছে। পাক-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটাইয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা, বিভিন্ন জাতির অধিকার, কৃষক-শ্রমিক প্রভৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি জনতার অধিকার নস্যাৎ করিবার যে ষড়যন্ত্র চলিতেছে উহাতে জনাব ভূট্টো অংশীদার হইয়াছেন। এই সমস্ত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে সজাগ থাকিবার এবং উহাকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখিয়া দাঁড়াইবার জন্য ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি উদাত্ত আহবান জানাইতেছে।

 

     ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) মনে করে যে, পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ভিতর দিয়া জনগণের যে রায় প্রকাশ পাইয়াছে তাহাকে মানিয়া নিয়া পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিম্নলিখিত নীতির ভিত্তিতে রচিত হওয়া উচিতঃ-

 

  • পাকিস্তান রাষ্ট্রে ৫টি ভাষাভাষী জাতি- বাঙ্গালী, পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধী ও বেলুচ বাস করে। পাকিস্তান দুইটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চল লইয়া গঠিত। এই বাস্তব সত্য মানিয়া নিয়া শাসনতন্ত্র প্রত্যেকটি জাতির সমান অধিকার ও প্রত্যেকটি জাতির বিচ্ছিন্ন হইবার অধিকারসহ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নীতিগতভাবে স্বীক্রৃত হইবে।

 

      শাসনতন্ত্রে এই নীতি স্বীকৃত হইলে পাকিস্তানের প্রত্যেকটি জাতির অধিকারগুলি নিশ্চিত হইবে, বিভিন্ন  

জাতির বিদ্বেষ, সংশয়, ভয়-নীতি ও ভূল বুঝাবুঝি দূর হইবে, তাহাদের ভিতর প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্ব গড়িয়া       উঠিবে।

 

  • শাসনতন্ত্রে এই নীতি স্বীকার করিয়া নিয়া বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে (১১ দফা কর্মসূচীর ২ ও ৩ নং ধারা বা ন্যাপের কর্মসূচী মোতাবেক) দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র (রাজনৈতিক) ও মুদ্রা- এই তিনটি বিষয় ন্যস্ত হইবে। বাদবাকী সমস্ত বিষয় (অবশিষ্টাত্মক ক্ষমতাসহ) পাঁচটি অঞ্চলের পাঁচটি জাতির নির্বাচিত সরকারের হাতে ন্যস্ত হইবে।

 

  • কেন্দ্রীয় আইনসভা হইবে এক কক্ষবিশিষ্ট। আইন সভার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের সুযোগে বিশেষ একটি প্রদেশের উপর ইহার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাহাতে কিছু চাপাইয়া না দেওয়া হয়, তাহার জন্য শাসনতন্ত্রে একটি বিশেষ রক্ষা ব্যবস্থা রাখিতে হইবে।

 

  • রাষ্ট্র পরিচালনার সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিমূলক আইনসভার হাতে ন্যাস্ত রাখিতে হইবে। রাষ্ট্রপ্রধানকে সব সময় মন্ত্রী পরিষদের পরামর্শ মতে করিতে হইবে।

 

  • যুক্ত নির্বাচন, প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটাধিকার ও এক লোক এক ভোট নীতির ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন চালু থাকিবে।

 

  • নগর, শহর ও গ্রামের স্থানীয় বিষয় ও কাজসমূহ পরিচালনার জন্য জনগণের নির্বাচিত স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান থাকিবে,

 

  • শাসনতন্ত্রে জনগণের মৌলিক অধিকারসহ সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করিতে হইবে- ব্যক্তিস্বাধীনতা রাজনৈতিক দল ও সংঘ গঠনের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সভা-সমিতি, শোভাযাত্রা পরিচালনা ও ধর্মঘট পালনের পূর্ণ নিশ্চয়তা দান করিতে হইবে। শ্রমিক-কৃষক ও ছাত্রজনতা যাহাতে এই সকল অধিকার চোগ করিতে পারেন তাহার ব্যবস্থা থাকিবে। বিদেশে যাতায়াতের জন্য প্রত্যেক নাগরিকের পাসপোর্ট পাইবার অধিকার থাকিবে,

 

  • সকল প্রকার দমনমূলক আইন রহিত করিতে হইবে, বিনা বিভারে কাহাকেও আটক রাখা চলিবে না।

 

  • বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ হতে পৃথক করিতে হইবে।

 

  • রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দু ছাড়া নিম্নলিখিত ভাষাসমূহকে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষার মর্যাদা দিতে হইবে- যেমন, সিন্ধী, পাঞ্জাবী, বেলুভ ও পশতু।

 

  • প্রদেশগুলির নাম হইবে বাংলা, পাঞ্জাব, পাকতুনিস্তান এবং বেলুচিস্তান।

 

  • আইন পরিষদের কোন দলের পক্ষ হইতে নির্বাচিত কোন সদস্য দল পরিবর্তন করিলে তাহাকে পরিষদের আসন হইতে পদত্যাগ করিতে হইবে এবং পুনরায় নির্বাচনের সম্মুখীন হইতে হইবে।

 

  • কোন সদস্য তাহার নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার নির্বাচকমন্ডলীর আদেশ (ম্যান্ডেট) ভঙ্গ করিলে তাহার সদস্যপদ বাতিল করিবার অধিকার উক্ত নির্বাচকমন্ডলীর থাকিবে।

 

  • জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও স্ত্রী- পুরুষ নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিক রাষ্ট্রের চোখে সমান বলিয়া বিবেচিত হইবে। ধর্মবিশ্বাস ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল নাগরিক যাহাতে অবাধে নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও নিয়মকানুন পালন করিতে পারে তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে। ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য কোন নাগরিকের প্রতি কোন ক্ষেত্রেই কোন প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ করা চলিবে না। দেশ শাসনের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করিতে সমস্ত নাগরিকের সমান অধিকার থাকিবে।

 

  • পাকিস্তানকে ধর্মনিরপেক্ষ (সেকুলার) গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলিয়া ঘোষণা করিতে হইবে।

 

  • শিল্প, ব্যাংক, বীমা বা বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি জাতীয়করণের পথে বাধা হইতে পারে এমন কোন বিধান শাসনতন্ত্রে থাকিবে না।

 

  • পাকিস্তানকে একটি পূর্ণ স্বাধীন, সার্বভৌম ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করিতে হইবে।

 

উপরোলিখিত ঐরূপ একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র রচনার পথে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক ঘোষিত আইনগত কাঠামো আদেশ হইল এক বিরাট বাধা। অতএব, আমরা উপরোক্ত নীতির ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক  

 

শাসনতন্ত্র রচনার দাবীর সঙ্গে সঙ্গে আইনগত কাঠামো আদেশের অগণতান্ত্রিক ধারাসমূহ প্রত্যাহার ও শাসনতন্ত্র রচনার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিষদের সার্বভৌমত্বের দাবী করিতেছি।

 

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ

সভাপতি                                                                                                সৈয়দ আলতাফ হোসেন

                                                                                                          সাধারণ সম্পাদক 

 

                                                 পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)

 

 

                     *পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রচার সম্পাদক বজলুর রহমান কর্তৃক

                            ১০/২১, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট হইতে প্রকাশিত।