পাকিস্তানে গৃহ যুদ্ধ

Posted on Posted in 14
শিরোনামসূত্রতারিখ
১৪। পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধনিউইয়র্ক নিউজ৫ এপ্রিল,১৯৭১

 

Tanuja Barua

<14, 14, 29-34>

 

নিউজউইক , এপ্রিল ৫, ১৯৭১

গৃহযুদ্ধে নিজেকে নিক্ষেপ করলো পাকিস্তান

 

“মুজিব এবং তাঁর দল/পার্টি পাকিস্তানের শত্রু। এই অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য । কিছু ক্ষমতালোভী এবং দেশদ্রোহী মানুষকে আমরা কখনোই এই দেশ ধ্বংস করতে দেবো না। দেবো না বারো কোটি জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে”।

  • রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান

 

তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়েই ঘরের বাইরে বেড়িয়ে এসো। শত্রুপক্ষের শেষ সৈন্যটি নির্মুল হয়ে পিছু না হটা পর্যন্ত যেকোন মূল্যেই লড়াই চালিয়ে যাও এবং এই দেশকে বাঁচাও পশ্চিম পাকিস্তানি নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকের হাত থেকে।

  • শেখ মুজিবুর রহমান

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এটা মনে হচ্ছিলো যে পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ধারক দুইজন দাম্ভিক ব্যাক্তি মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়িয়ে যাবে । পূর্ব –পাকিস্তান রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতি মোহহাম্মদ ইয়াহিয়া খান এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী পূর্ব-পাকিস্তানের নেতা মুজিব বিষয়টি নিয়ে সমঝোতা করবেন। কিন্তু অনেকটা আকস্মিকভাবেই বদলে গেলো পাকিস্তানের জটিল রাজনৈতিক ধাঁধাঁর পটভূমি। পূর্ব-পাকিস্তানে অবস্থিত রংপুর এবং চট্টগ্রাম শহরে সামরিক বাহিনী আন্দোলনরত বাঙালীদের উপর মেশিনগান দিয়ে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। ইয়াহিয়া তার সৈন্যদের আন্দোলন বানচাল করে সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপনের নির্দেশ দেন। এদিকে মুজিব পূর্ব-পাকিস্তানকে ‘স্বাধীন , স্বার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’  হিসেবে ঘোষণা দেন। এবং এর মাধ্যমেই পাকিস্তান নিজেকে নিক্ষেপ করলো গৃহযুদ্ধে।

 

২৪ বছরব্যাপি  পাকিস্তানের পূর্ব এবং পশ্চিম অংশের মধ্যে গড়ে ওঠা এই ভঙ্গুর  সম্পর্ক আচমকা ভেঙ্গে পড়লো।  কারণ পাকিস্তান সরকার , পূর্ব- পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন এবং বাহ্যিক যোগাযোগব্যবস্থায়  তাৎক্ষণিকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলো  এবং প্রাথমিক রিপোর্ট / প্রতিবেদনে কি ছিল তাও কুয়াশাচ্ছন্ন। এরপরেও প্রতিবেশী দেশ ভারত হতে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের খন্ডচিত্র উঠে আসছে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদনে যেখানে দেখা গেছে সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত বিদ্রোহীদের যুদ্ধাস্ত্রের ঘাটতি থাকার স্বত্বেও আবেগ এবং দেশীয় অস্ত্র হাতেই তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত নিরাশার সাথে বলতে হচ্ছে যে, পূর্ব-পাকিস্তানের গেরিলা যোদ্ধারা নির্বিচারে নিহত হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু এই সপ্তাহান্তে যদিও অনুমান করা হচ্ছে যে  মূলত দুর্ধর্ষ পাঞ্জাবী সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত সামরিক বাহিনী  তাদের প্রতিপক্ষ বাঙালিদের দ্বারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হয়েছে। খুব কম লোকই মনে করে যে যে পাকিস্তানের দুই বিচ্ছিন্ন অংশকে পুনরায় কার্যকরিভাবে একীভূতকরণ সম্ভব হবে।

 

পাকিস্তানের এই পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত ছিল কারণ তখন মুজিব এবং ইয়াহিয়া একটি সমঝোতার মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন। রংপুর এবং চট্টগ্রামের গণহত্যা / ধ্বংসযজ্ঞের খবরে/রিপোর্ট সম্পর্কে অবগত হয়েই ক্ষুব্ধ মুজিব সামরিক বাহীনিকে অভিযুক্ত করেন। এর প্রেক্ষিতে ইয়াহিয়া দ্রুত আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা করে গোপনে পশ্চিম- পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। নিজের এলাকা পশ্চিমে ফিরেই তিনি জাতীয় বেতারের মাধ্যমে মুজিবের দল আওয়ামীলীগকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা প্রদান করেন, যা ছিল পূর্ব-পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন। তিনি শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলনকে “দেশদ্রোহী/বিশ্বাসঘাতকের কাজ” বলে ঘোষণা দিলেন।

 

ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগের অল্প সময়ের মধ্যে ল্যাফটেনেন্ট জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব-পাকিস্তানের প্রশাসনের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞাওসহ মার্শাল ল জারি করেন। সকল বিদেশী প্রতিনিধিকে হোটেলের মধ্যেই আটকে রাখা হয় এবং পরবর্তিতে সামরিক বাহিনী তাদের গুরুত্বপূর্ন তথ্য –উপাত্ত এবং স্থির-চিত্রসমূহকে ছিনিয়ে নেয় এবং সকল প্রতিবেদককে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। বিদেশী সেসব প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন নিউজউইক এর প্রতিবেদক লরেন জারকিন্স , যিনি এই রিপোর্ট/প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন।

 

ঢাকা মডার্ন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের জানালা থেকে আমরা দেখতে পেলাম সৈন্যভর্তি একটা জীপ একটি বিপনী কেন্দ্রে প্রবেশ করছে এবং ভীড়ের মধ্যে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র যোগে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।  যখন গোলাগুলি চলছিলো তখন তার ২০০ গজের মধ্যেই হঠাৎ করে ১৫ জন বাঙালী তরুণ সৈন্যদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে করতে আবির্ভুত হলো। তরুণদের দেখে মনে হলো তারা খালি হাতেই এসেছে। কিন্তু সৈন্যরা তাদেরকে লক্ষ্য করেই মেশিনগান চালনা করলো। এরপর সৈন্যরা  রওনা হলো পাশের গলিতে অবস্থিত মুজিবের পক্ষে অবস্থান নেওয়া গণমুখী সংবাদপত্রের অফিসের দিকে যারা খুব কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিল সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের। সৈন্যদল অধিকাংশ বাঙালিরা যে ভাষা বুঝেনা সেই উর্দু ভাষায় চিৎকার করে সতর্ক করে বলছিলো যাতে তারা আত্মসমর্পন করে নাহয় তাদের উপর গুলি চালানো হবে। কেউ বেড়িয়ে এলো না। তারা সম্পূর্ন ভবন বিস্ফোরণ এবং অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিল। এবং এই ধংসযজ্ঞের পরে তারা “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” বলে উল্লাস করতে করতে বেড়িয়ে আসলো।

 

এই সপ্তাহের শেষের দিকে, ১০৫ মিলিমিটার কামানের সহায়তায় সমস্ত শহরে গোলাগুলি চলছিল  এবং হাউইটজারের গোলাবর্ষণের মুহুর্মুহু শব্দ শোনা যাচ্ছিল যেগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস অভিমুখে নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল।  এক সকালে আমার ঘুম ভেঙে গেলো বিমানবন্দর এলাকায় রাস্তার উদ্দ্যশে রওনা হওয়া ছয়টি টি-৫৪ চাইনিজ হালকা ট্যাংকের গর্জন শুনে। ধূসর ধোঁয়ার কুণ্ডলী মেঘলা করে রেখেছিল আকাশ। এবং প্রায় সাথে সাথেই পুরান ঢাকার দিকে অগ্নিসংযোগ এবং বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা গেল। পুরান ঢাকা এলাকাটিতে দেখা খুবই সরু কিছু গলি , একমুখী খোলা সড়ক এবং যেখানে অধিকাংশ মানুষ বাস করে এক কামরার বদ্ধ পরিবেশে।

 

ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীদের দেখেই অনুমিত হয় যে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তারা উৎফুল্ল । সামান্য শব্দেই তারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি চালাচ্ছে। যখন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অবস্থানরত কিছু প্রতিবেদক/ রিপোর্টার্রত/সাংবাদিকগণ শহরের পরিস্থিতি জানতে হোটেলের বাইরে বের হবার চেষ্টা করায় , হোটেলের সামনে প্রহরারত সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন আমাদের গুলি করার হুমকি দেয়। সে আমাদের হোটেলের ভেতর প্রবেশ করতে নির্দেশ দিলো। সে ক্রোধের সাথে চিৎকার করে বলছিলো – “যদি আমি আমার নিজের লোককে হত্যা করতে পারি, তোমাদেরকেও হত্যা করতে পারবো”।

 

এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী আন্দোলনরত সকল সরকারী কর্মাচারীদের কাজে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয় নতুবা তাদেরকে সামরিক আইনে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং এর সাথে তারা ২৪ ঘন্টা কার্ফিউ জারি করে। এমতাবস্থায় ট্রাকভর্তি সৈন্যদল ঢাকা শহরে প্রবেশ করে এবং যেসব বাড়িতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ-হলুদ পতাকা উড়ছে , প্রত্যেকটি বাড়ির সম্মুখে গাড়ি থামায় তারা। এবং প্রতিটি বাড়ির বাসিন্দাদের পতাকা নামানোর নির্দেশ দেয় হানাদার বাহিনী। হোটেলের আশেপাশের এলাকার তিন তলা একটি ভবনের ছাদে একজন শাড়ি পরিহিতা মহিলার ধীরে ধীরে ছাদে উঠে সৈন্যদের মেশিনগানের মুখে নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বে পতাকা নামিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

 

জেনকিন্স সহ অন্যান্য বিদেশী সাংবাদিক এবং প্রতিবেদকদের পূর্ব-পাকিস্তান থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হলো। সমগ্র বিশ্ব তখন বেতার থেকে সম্প্রচারিত কিছু প্রশ্নবিদ্ধ সংবাদ/তধ্যের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়েছে।  করাচীর প্রধান বেতারকেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হলো যে , সৈন্যবাহিনী মুজিবকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু ঢাকা্র একটি গোপন বেতারকেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত একটি গোপন সংবাদে বলা হয়েছে যে মুজিব তাঁর গোপন কার্যালয়ে নিরাপদে আছেন। সেই বিদ্রোহী সংবাদঘোষক বলেন যে,  “মুজিবের নেতৃত্বেই বাংলাদেশের জনগণ প্রয়োজনে আরো রক্ত দেবে …”।

 

যদি পাকিস্তানকে বৈষম্য এবং সহিংসতার মাধ্যমে বিভাজিত করা হয় তবে বলা যায় শতাব্দীর চারভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যেই সে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে গেল। ১৯৪৭ সালে এই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে বিভাজন এবং দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। মূলত পাকিস্তান গঠিত/ সৃষ্টি হয়েছিল  ব্রিটিশ ভারতের মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে , যার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়া মুসলমানদের জন্য  আলাদা ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন করা। হিন্দু ও মুসলমানের দীর্ঘ ছয়মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলস্বরূপ ভারত হতে বিচ্ছিন্ন হয় পাকিস্তান এবং প্রায় পাঁচ লক্ষ  মানুষ প্রাণ হারায়। এবং সৃষ্টি হয় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের , যার দুটো প্রদেশের মাঝে ছিল ১১০০ মাইলের একটি দীর্ঘ ভারতীয় এলাকা।

 

ভৌগলিক বৈচিত্র্য এক্ষেত্রে যথেষ্ট সমস্যাপূর্ণ ছিল। কিন্তু  অবস্থা আরও জটিল হয় এই কারণে যে দুই অংশের মধ্যে একমাত্র মিল ছিল  ইসলামের প্রতি আনুগত্য।  পশ্চিম পাকিস্তান মরুভুমি এবং পর্বতময় শুস্ক আবহাওয়ার অঞ্চল অপরদিকে পূর্বাংশ আর্দ্র বনানী এবং পাললিক সমভূমির  অধিকতর জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি জনগোষ্ঠী এবং পূর্ব -পাকিস্তানের বাঙালিদের মধ্যে জাতিগত ব্যক্তিত্বে পার্থক্য অনেক বেশী ছিল। গর্বিত পাঞ্জাবীরা বাঙ্গালীদের দেখতো হীন দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং  বছরের পর বছর তারা শোষণ করেছে তাদেরই পূর্বাংশের জনসাধারণকে।

 

 

প্রশ্নাতীতভাবে পরাজয়

 

পরিহাসের সাথে বলতে হয় যে ইয়াহিয়া খান হলেন পরথম পশ্চিম পাকিস্তানি যিনি জনসমক্ষে স্বীকার করেছেন যে, দুই পাকিস্তান একত্রিত হবার পর পূর্ব-পাকিস্তান রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কখনোই সমতা পায়নি। এই বিষয়গুলোকে সংশোধনের লক্ষ্যে ইয়াহিয়া  এক ব্যক্তি , এক ভোট এই মর্মে কঠোর পরিচালনায় পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা দেন । কিন্তু গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের ফলাফল খুবই চমকপ্রদ ছিল। পূর্ব-পাকিস্তানে , মুজিবের আওয়ামীলীগ ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।  এবং যেহেতু জনসংখ্যার দিকে পূর্ব – অংশ অনেক এগিয়ে, মুজিবের নেতৃত্বে জাতীয় পরিষদে তারা সবচেয়ে বেশী আসন বরাদ্দ পায় এবং দৃশ্যত  সংসদেও লাভ করে সর্বোচ্চ আসন।

 

নির্বাচনী প্রচারণার সময় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার বন্টন এবং দুটো প্রদেশের স্বায়ত্বশাসন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে মুজিব ছয়-দফা কর্মসূচীর ঘোষণা দেন। পশ্চিম পাকিস্তানে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান বাম-ঘেঁষা রাজনীতিবিদ, প্রাক্তন- পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো যে এমন কিছু কখনোই মেনে নেবেন না এটা মোটেও আশ্চর্যজনক ছিল না। যখন ভূট্টোর সমর্থকরা জাতীয় পরিষদের নতুন সভায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানালো, তখন ইয়াহিয়া  উদ্বোধনি অধিবেশন পিছিয়ে দিতে বাধ্য হলেন।  এর ফলে মুজিব অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিতে বাধ্য হলেন যার ফলে পূর্ব-পাকিস্তানে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কার্যত অবলুপ্ত হয় এবং মুজিবই শাসকে পরিণত হন।  শেষ পর্যন্ত ইয়াহিয়ার কাছে অবশেষে বাঙালির দাবী মঞ্জুর করা নতুবা  ক্ষমতার বলে তা আন্দোলন প্রতিহত করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।

 

ইয়াহিয়া মুজিবকে একজন আইন ভঙ্গকারী বলে অভিযুক্ত করেন এবং সেই সাথে তিনি সকল আলোচনার পথ রুদ্ধ করে দিলেন। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সামরিক শক্তিকে বেছে নেন। পূর্ব-পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সম্মলিত শক্তি (যার সৈন্য সংখ্যা ২০ হাজার থেকে ৭০ হাজারের মধ্যে ছিল বলে অনুমান করা হয়) প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রসস্ত্রে শত্রুপক্ষের থেকে অনেকটাই উন্নত ছিল, তারপরেও পশ্চিমারা বেশকিছু গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হয়। পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব-পাকিস্তানে স্থলপথে সরাসরি কোন যোগাযোগব্যবস্থা ছিলনা , উপরন্তু ভারতীয় আকাশপথের উপর দিয়ে যাবতীয় বিমান চলাচল নিষিদ্ধ থাকায় যৌথ বাহিনীর কমান্ডারদের নিজেদের সৈন্য , বেশ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে  শ্রীলঙ্কা হয়ে  ভারতের দক্ষিণাংশ দিয়ে পার করতে হচ্ছিলো। যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিশ্লেষক জানালেন “পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী স্বল্প মেয়াদে হয়তো বাংলার ভূখণ্ড ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাকে ভয়াবহ কৌশলগত সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে”।

 

গেরিলা যোদ্ধাদের অভয়ারণ্য

 

কেন্দ্রীয় বাহিনীর শক্তির বিপরীতে বাঙালি বাহিনী ছিল মাত্র ১৫০০০ হাজার গেরিলা যোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত। যাদের বেশীরভাগই ছিল বেসামরিক যোদ্ধা এবং তাদের হাতে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত বেশ পুরানো কিছু অস্ত্র। কিন্তু যদিও শহরে বাঙালিদের তুলনায় কেন্দ্রীয় বাহিনী শক্তিমত্তায় অনেক এগিয়ে ছিল, সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে গ্রামে বাস করতো পাকিস্তানের প্রায় ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠি এবং এইসব প্রত্যন্ত এলাকা ছিল গেরিলা যোদ্ধাদের স্বর্গরাজ্য। জলমগ্ন ধানের বিস্তৃত মাঠ , চা-বাগান , পাটক্ষেত এবং ঘন কলার বাগান , প্রতিপক্ষকে গোপনে লুকিয়ে থেকে  অতর্কিত হামলা করার মতো উপযুক্ত একটি দেশ যা দক্ষিণ ভিয়েতনামি মেকং উপত্যকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অধিকাংশ প্রবাসী সামরিক যুদ্ধ বিশ্লেষকদের মতে পূর্বাংশের এইসব সুবিধা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর জন্য একটি দুঃসহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।

 

এতদসত্বেও ইয়াহিয়া যদি এই নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে যেতেন তবে সাময়িক  ভাবে হলেও আন্দোলনকে দমন করতে সক্ষম হতেন। যদি মুজিবকে গ্রেফতার করার সংবাদ যদি সত্য হয় তাহলে বাংলাদেশের জন্য হবে এটি একটি সাংঘাতিক আঘাত হিসেবে পরিগণিত হবে। কেন্দ্রীয়বাহিনীর দমন-পীড়ন যতোই কঠিন হোক না কেন, বাঙালিরা অসহযোগ আন্দোলন বা ভিয়েত কং কৌশলের গেরিলা আক্রমণের মাধ্যমে যেকোন মূল্যেই পশ্চিমাদের আক্রমণকে প্রতিহত করতে থাকবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ইয়াহিয়া নিজের দেশেই ঔপনেবিশিক শাসক হওয়ার কদর্য ইচ্ছা নিয়ে এগোতে চাইছেন। গত সপ্তাহে যৌথ বাহিনী যখন ঢাকায় ট্যাংক এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সহযোগে আক্রমণ করে বসলো , তখনি মনে হয়েছে পাকিস্তানের এই দুই ভিন্ন প্রদেশের সম্প্রীতিতে বসবাস করার সকল সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করে দিলো।

 

 

ভিন্ন মতাদর্শঃ বাঙালির জটিল মনস্তত্ব

 

বাঙালিদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যারা অবগত আছেন , তারা অবশ্যই ধারণা করতে পারেন এটিই অবশ্যম্ভাবী যে একদিন তারা নিজেদের জন্য একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করতে চেষ্টা করবে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কর্তৃক উপমহাদেশের বিভাজিত  দুটো রাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্তানের অংশ হবার স্বত্বেও , প্রায় ১২ কোটি বাঙালি ( পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত সাত কোটি এবং বাকী অংশ ছিল ভারতের পূর্ব-বাংলায়) এবং তারা নিজেদের প্রতিবেশী থেকে ভিন্ন জাতিস্বত্বা বলে মনে করে । আবেগপ্রবণ এবং সদালাপী, বাদামী চামড়ার বাঙালি,তাদের মতোই  হিন্দু এবং মুসলমান ধর্ম বিশ্বাসী এবং  স্বদেশী ভারত এবং পাকিস্তান থেকে আলাদা জাতি হিসেবে নিজেদের মধ্যেই সপ্রতিভ। পাশ্চাত্যের একজন বিশেষজ্ঞের মতে “ তারা নিজেদের প্রথমেই ভাবে বাঙালি, দ্বিতীয়তে হিন্দু বা মুসলমান এবং সর্বশেষে পাকিস্তানি বা ভারতীয়”।

 

সংস্কৃতিগত ,জাতিগত, ভাষাগত এবং আত্মিক দিক থেকে, বাঙালি জাতি পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ভিন্ন। বাংলার পন্ডিতদের মতে এর কারণস্বরূপ বলা যায় যে , খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর প্রাচীন রাজ্য বংগ থেকে উদ্ভব হয়েছে বাংলা নামটি।  এই বাংলায় এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন সাহিত্যের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে , যার আছে হাজার বছরের ইন্দো-আর্য ভাষা এবং সুপ্রাচীন ইতিহাস। সুদীর্ঘ গৌরবময় সাহিত্যের ঐতিহ্য , পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গের আবাসভূমি যার আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিস্ববিজয়ী আধুনিক সাহিত্যিক । একজন সুরকার এবং গীতিকার হবার পাশাপাশি , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে ছিলেন  একজন বাঙালী কবি, ঔপন্যাসিক এবং নাট্যকার । ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

 

আলোচন/ বৈঠক

 

যেখানে লেখার ভাষায় আছে ঐতিহ্য, অপরদিকে কথ্য ভাষা বোঝা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে । কলকাতা এবং ঢাকার ক্যাফেগুলোতে , বাঙ্গালিরা ব্যস্ত অন্তহীন আলোচনায় এবং আকাশ-কুসুম জ্ঞানগর্ভ আলোচনা এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে। ভারতীয় একটি প্রবাদে বলা হয় যে “ প্রতিটি বাঙালি কমিটিতে চারজন সদস্য অবশ্যই থাকবেঃ একজন মুখোপাধ্যায় , একজন বন্দ্যোপাধ্যায়, একজন চট্টোপাধ্যায় ( সবগুলোই বাঙালি নাম ) এবং একজন সিং”। শিখদের নাম হয় সিং দিয়ে। শিখরা বাঙালিদের মতো নয় , তারা পরিচিত তাদের কাজের জন্য। এবং এটিই প্রচলিত যে ঐ একজন শিখই মূল কাজটি  করবে।

 

একটি জাতি , যারা ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ/ইংরেজদের শাসনসহ , শত শত আক্রমণ , যুদ্ধের শিকার হয়েছে , সে বাঙালি জাতি দীর্ঘ পরিক্রমায় শিখে নিয়েছে টিকে থাকার শিল্প। অহংকারী পাঞ্জাবির মত না হয়ে বাঙালিরা নমনীয় হতে পারে। সে ধুতি পরিধান করবে, সুভাষিত বক্তব্যে কথা বলবে , অস্ত্র বলতে আছে কেবল ছাতা , বাঙালিকে একজন দক্ষ এবং বিশ্বস্ত কেরানী হিসেবেই ভাবা হয়। যুদ্ধ করা সামরিক বাহিনীর কাজ , বাঙালির নয়। 

 

বাংগালিদের সম্পর্কে গতানুগতিক যে ধারণা প্রচলিত সুযোগ পেলে তারা তাদের সাথী/ সহযাত্রীদের ডিঙিয়ে যেতে বেশ পারদর্শী। একজন ব্যবসায়ী বলতেই পারেন যে “ খেয়াল রেখো । সে কিন্তু বাঙালি”। তার মানে এই যে সে কেবলই ধুর্ত নয় বরং সে কূটবুদ্ধি্তে পরিপূর্ণ।

 

সুচতুর এবং শান্ত হিসেবে বাঙালির পরিচয় থাকার স্বত্বেও তাদেরকে একাধিকবার উপস্থাপন করা হয়েছে  কূটবুদ্ধি এবং ধ্বংসাত্মক মানসিকতার মানুষ হিসেবে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বাংলার আন্দোলনকারীরাই সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে  দূর্ধর্ষ লড়াই করেছে । এবং বাংলা অঞ্চল বিভক্ত হবার পর থেকেই ভারত এবং পাকিস্তান দুটো দেশের বাংলা অঞ্চলেই নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নতুন বিপ্লবের সূচনা হয়েছে। একজন আমেরিকান পণ্ডিতের মতে “ তাদের শান্ত মনে হলেও , তারা সহিংস হয়ে উঠতে জানে, কিন্তু তা সাধারণত ভুল পথে। তিনি আরো যোগ করেন যে- “ বাঙ্গালি মানসের একটি দিক আছে যা গোলমালকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়।”

 

 

কবি বা রাজনীতি

 

গত সপ্তাহে শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন , তার সমালোচকেরা বলতে শুরু করলেন , মুজিব তাঁর চরমপন্থি সমর্থকদের চাপে এই ঘোষণা দিয়েছেন, স্রোতে ডুবে যাওয়ার বদলে স্রোতের টানে চলার কৌশল নিয়েছেন।  কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মুজিবের উত্থান হয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাঙালি জাতির একজন নেতা হিসেবে । জাতীয়তাবাদের জন্য বাঙালিরা যৌক্তিকভাবে লড়াই করে যাচ্ছিলো দীর্ঘদিন ধরে। যদিও বা মনে হতে পারে মুজিব স্রোতের টানে চলছেন, কিন্তু আদতে তার উত্থান কাকতালীয় নয়। ৫১ বছর আগে ঢাকার নিকটবর্তী একটি গ্রামে একজন স্বচ্ছল জমির মালিকের ঘরে জন্ম নেওয়া মুজিব বিরাট কোন শিক্ষাগত অর্জন ছাড়াই প্রাথমিক লেখাপড়া শেষ করেন। সময়ের সাথে সাথে তিনি একজন জনপ্রিয় ছাত্রে পরিণত হলেন ।  মানুষের সাথে কথা বলতে পছন্দ করতেন। চলনে বলনে খেলাধুলায় তিনি সময়ের সাথে হয়ে উঠলেন অসামান্য। কলকাতার ইসলামিক কলেজে যখন তিনি লিবারেল আর্টস ডিগ্রীর জন্য পড়াশুনা করতে গেলেন তখন সেখানকার মুসলিম লীগের কিছু জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীর নজ্রে আসেন।  তাঁর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন তখন এইচ এস সোহরাওয়ার্দী, যিনি  ব্রিটিশরাজের অধীনে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, পরবর্তীতে, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এক বছর দায়িত্ব পালন করেন. মুজিব আইন বিষয়েও পড়াশুনা করেন । কিন্তু সোহরাওয়ার্দী, যিনি ছিলেন মধ্যপন্থী, মুজিব তার পদাঙ্ক অনুসরণ না করে সরাসরি পদক্ষেপের দিকে ঝুঁকে পড়েন । চল্লিশ দশকের শেষ দিকে তাঁরা দুজনেই অনুধাবন করলেন যে, নব গঠিত পাকিস্তানের  অন্যতম প্রধান বাংলা প্রদেশকে নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ১৯৪৯ সালে  সোহরাওয়ার্দী  সুসংগঠিত “বাংলার বাঙালিদের জন্য” আওয়ামী লীগ নামের নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। মুজিব রাজপথে নেমে গেলেন এবং তাকে দুইবার গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হলো অবৈধ হরতাল এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার অপরাধে।

জেল হতে বের হয়েই মুজিব হয়ে গেলেন আওয়ামী লীগে সোহরাওয়ার্দীর ডান-হাত।  কিন্তু অন্যান্য দলের সাথে জোট গঠন করে তার নেতৃত্ব দেবার সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়া হলো। ১৯৫৬ সালে মুজিব সাফল্যের সাথে নব গঠিত পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। সাত মাস কৃতিত্বের সাথে তিনি শিল্প ও বানিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর মুজিব  অনেকটা বিনা বাঁধায় তাঁর কিছু পুরানো আদর্শিক রীতিনীতিতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন । তিনি আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন। রাজনীতিতে যুক্ত করেন  “স্বতস্ফুর্ততার” শৈলী এবং দাবী করেন আভ্যন্তরীন নিজস্ব শাসন ব্যবস্থার । পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে.  ১৯৬৬ সালে আইয়ুব খান সরকার তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে । পূর্ব-পাকিস্তানে তখন বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠালো । ফলস্রুতিতে আইয়ুব খান পদত্যাগ করে মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো।  জনগণের চোখে মুজিব জাতির নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হলেন ।

 

একজন গড়পড়তা বাঙালির তুলনায় লম্বা ( তাঁর উচ্চতা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি) , চুলে রুপালো আভা , পুরু গোঁফ এবং কালো চোখের অধিকারী মুজিব খুব সহজেই লাখো মানুষের র‍্যালিকে আকর্ষণ করতে পারেন। তাঁর উদ্দীপ্ত ভাষণের মাধ্যমে জনগণকে আপ্লুত করার অসীম ক্ষমতা ছিল তাঁর । একজন কূটনৈতিকের মতে –“ তুমি তাঁর সাথে একাকী আলাদাভাবে কথা বললেও তাই হবে এবং তিনি এমনভাবে কথা বলেন মনে হবে তিনি ৬০ হাজার মানুষের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন’। একাধারে উর্দু , বাংলা এবং ইংরেজী – পাকিস্তানের এই তিন ভাষায় তিনি সমান পারদর্শী। মুজিবের মাঝে চিন্তাবিদ হবার ভান নেই তিনি প্রকৌশলী নন বরং তিনি রাজনীতির কবি। কিন্তু সচরাচর বাঙালিরা কৌশলী নয়, বরং কিছুটা চিন্তক, এবং সেজন্যই হয়তো তাঁর রাজনৈতিক কৌশলই দরকার ছিল সকল অঞ্চলের ভিন্ন মতাদর্শ এবং নানা শ্রেণীর মানুষকে একত্রীকরণের জন্য।

 

নিউজ উইক পত্রিকার লরেন জেনকিন্সকে এক মাস আগে এক গোপন সাক্ষাৎকারে মুজিব জানান যে “দেশটিকে এই অবস্থা থেকে বাঁচানোর কোন আশার দেখা মিলছে না। যে দেশটিকে আমরা চিনতাম সেটি এক অর্থে ধ্বংস হয়েই গেছে”। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের পিছিয়ে যাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন । তিনি বলেন “ আমরা সংখ্যায় গরিষ্ঠ, আমরা বিচ্ছিন্ন হতে পারবো না । কিন্তু তারা পশ্চিমারা সংখ্যায় কম , তাই তাদের উপর নির্ভর করছে তারা একত্রে থাকতে চান কিনা”।

 

দুই সপ্তাহ পরে এই আশংকা আরো ঘনীভূত হলো। শত শত বাঙালী জড়ো হলো মুজিবের ঢাকাস্থ বাড়ির হলঘরে। পাইপে ধোঁয়া উঠিয়ে ( “একমাত্র বিদেশি জিনিস যা আমি ব্যবহার করি”), তিনি হাসিমুখে সবার সাথে কথা বললেন। এই উৎসাহী  জনসমাবেশে বক্তব্যকালে পশ্চিমা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেনঃ “ভোর পাঁচটা থেকে আমাকে এর মধ্যেই থাকতে হয়। কোন ম্যাশিনগানের কি সাধ্য আছে এই অদম্য শক্তিকে রোহিত করার”? কিছুদিন পর কেউ একজন চেষ্টা করছিলো।