পিলখানার আরও কথা সাক্ষাৎকারঃ মোঃ আশরাফ আলী সরদার

Posted on Posted in 9

পিলখানার আরও কথা

সাক্ষাৎকারঃ মোঃ আশরাফ আলী সরদার

১২-৪-১৯৭৪

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস ছিল। ঐ দিন আমরা প্রস্তুত ছিলাম কোন একটা নির্দেশ পাবার অপেক্ষায়। কিন্তু দুভার্গ্যবশত কোন নির্দেশ পাই নি। তারপর ২৪শে মার্চ আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে পিলখানার প্যারেড গ্রাউন্ডের বটবৃক্ষের শীর্ষে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এবং সে পতাকার উর্দুতে লেখা ছিল, “ পশ্চিমারা আবি বাংলা ছোড়কে ভাগ যাও, নেহি ত এধারই তোম লোগ ভাগ যাও, নেহি ত এ ধারই তোম লোগ কা কবর বানায়েগা।”

পশ্চিম পাকিস্তানীরা এ পতাকা দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং ঐ পতাকা নামিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে পাঠিয়ে দেয়। এই পতাকা উত্তোলন সংবাদ সিগনালের বেতার মারফত সমস্ত সেক্টর, উইং এবং চৌকিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এবং তারাও বিকেলে খবর দিল যে তারাও পতাকা উত্তোলন করেছে। যশোর থেকে বেতারে খবর আসলো যে, সেখানকার বাঙালি ইপিআররা যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে সাময়িক সালাম (গার্ড অব অনার) দিয়ে পতাকা উত্তোলন করেছে।

২৪শে মার্চ রাতে পিলখানায় অবস্থিত সমস্ত বাঙালি ইপিআরকে নিরস্ত্র করা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানীরা আমাদের বলে যে, শেখ সাহেবের ৭ই মার্চের ঘোষিত চার দফা ইয়াহিয়া খান মেনেছে এবং শিগগিরিই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। দেশে এখন শান্তি বিরাজ করছে। সুতরাং সবাই অস্ত্র জমা দিয়ে বিশ্রাম করুন।

২৫শে মার্চ বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত আমরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের উপোরোক্ত ভূয়া আশ্বাসে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু যখন শুনতে পারলাম যে, নরখাদক ইয়াহিয়া তার দলবল নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই ঢাকা ত্যাগ করেছে তখন আমি নায়েক সুবেদার শহীদ শামসুল হক সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি সেদিন কোয়াটার গার্ড ডিউটি অফিসার ছিলেন। তিনি আমাকে বাইরে গিয়ে সংবাদ নিতে নির্দেশ দিলেন। তখন রাত প্রায় আটটা। আমি সরাসরি ইকবাল হলে যাই। কিন্ত সেখানে কোন ছাত্রনেতাকে পেলাম না। আমি সেখান থেকে সুবেদার শহীদ জহীরউদ্দিন মুন্সির বাড়ীতে যাই। তাকে সমস্ত বিষয় অবগত করি। তিনি আমার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস না করে নায়েক নূর হোসেনের সঙ্গে শেখ সাহেবের বাড়ির দিকে রওনা হন। তিনি আমাকে কি করতে হবে না হবে পরে জানাবেন বলে বললেন। আমি এবং হাবিলদার শহীদ বেলায়েত হোসেন রাত এগারোটা পর্যন্ত তাদের অপেক্ষায় সিগনাল ওয়ার্কশপে বসে থাকি। আমরা দুজন আমাদের সিগনালের লোকজনকে কিছু একটা খবর আসবে বলে সর্তক করে দিয়েছিলাম। এবং ১৫ শাখার জনৈক সিপাহীকে এ সংবাদ পৌছে দেই। এছাড়া আমরা উভয়ে আমাদের অস্ত্রাগারের ভারপ্রাপ্ত এনসিও শহীদ নায়েক হাসেমকে জিজ্ঞাসা করি যে, অস্ত্রাগারের কোন ডুপ্লিকেট চাবি তৈরী হয়েছে কি না যা আগে আপনাকে বলা হয়েছিল। তিনি বললেন যে, তার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে। এই সংবাদ আমরা শহীদ নায়েক সুবেদার শামসুল হক সাহেবকে কোয়াটার গার্ডে গিয়ে জানাই। তিনি আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, কোন রকম হামলা হলে প্রত্যোকে অনতিবিলম্বে অস্ত্রাগারে চলে আসবে। এখানে আমি উপস্থিত থাকবো তোমরা লাইনে গিয়ে বিশ্রাম নাও এবং দুজন প্রহরী নিয়োগ কর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সে সুযোগ আসে নি।

২৫শে মার্চ দিবাগত রাত ১টা পাঁচ মিনিটে প্রথম গুলির আওয়াজ হয়। আমরা প্রত্যেকেই সামরিক পোশাকে ব্যারাকে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। আমাদের প্রহরী আমাদেরকে সর্তক করে দিয়ে বলে যে, পশ্চিমারা আমাদেরকে আমক্রম করেছে। তখন আমরা সবাই পূর্ব নির্দেশ মতো অস্ত্রাগারে যাবার জন্য বের হয়ে পড়ি। কিন্ত দেখতে পেলাম গুলির আগেই তারা সমস্ত পিলখানাকে অস্ত্রাগারে যাবার জন্য বের হয়ে পড়ি। কিন্তু দেখতে পেলাম গুলির আগেই তারা সমস্ত পিলখানাকে অস্ত্রাগারসহ দখলে নিয়ে নিয়েছে। আমরা যখন বাইরে আসলাম তখন চারিদিক থেকে এলএমজি/এসএমজি ব্রাশ ফায়ার আমাদের উপর আসতে থাকে। তখন আমরা অনন্যপায় হয়ে এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকি। অল্প সংখ্যক পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বাকি সবাই বন্দী হয়ে যায়। রাত ৪টার সময় আত্মসর্মপণ করায়।

৩নং গেটে কর্তব্যরত কয়েকজন বাঙালি ইপিআর পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। একজন লেফটেন্যান্টসহ ৬ জন পশ্চিম পাকিস্তানী বেলুচ রেজিমেন্টের লোক নিহত হয়। এই খণ্ড যুদ্ধে বাঙালিদের সঙ্গে কর্তব্যরত একজন পাঞ্জাবী ইপিআর মোহাম্মদ খানকেও হত্যা করা হয়। এই খণ্ড যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল গার্ড কমান্ডার নায়েক জহিরুল হক। সে তার সহকর্মীদের নিয়ে বেড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঢাকায় অবস্থিত সিগনালের প্রধান বেতার কেন্দ্রে খবর পৌঁছে দেয়া হয় যে, উইং কমান্ডের লেফটেন্যান্ট কর্ণেল আব্দুর রহমান আওয়ান আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছে সমস্ত বেতার যোগাযোগ বন্ধ রাখার জন্য। আমাদের কর্তব্যরত অপারেটররা সংকেতের সাহায্যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বাইরে কর্তব্যরত সেক্টর/উইং/বিওপি পযর্ন্ত সমস্ত ইপিআরকে জানিয়ে দেন। ২৬ শে মার্চ সকাল দশটা পর্যন্ত আমাদের এইচ-এফ (হাই ফ্রিকোয়েন্সি সেট) চালু থাকে যার মাধ্যমে ২৬শে মার্চের ঘটনা নায়েক শহীদ বাশার বাইরের সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তার শেষ সংবাদে চট্টগ্রামকে বলেছিলেন যে, আমাদের সবাই বন্দী হয়ে গেছে। হয়তো কিছুক্ষণ পর আমিও বন্দী হয়ে যাব আর নির্দেশ দেবার সময় পাবনা। তোমরা সমস্ত পশ্চিমাদের খতম কর। চট্টগ্রাম থেকে হাবিলদার বাহার উক্ত সংবাদ সীমান্তের চৌকি পযর্ন্ত পৌঁছে দেয় এবং আমাদের লোকজনকে অনুপ্রাণিত করার জন্য সে বলেছে যে, আমি ঢাকা থেকে বলছি। সম্পূর্ণ ঢাকা আমাদের নিয়ন্ত্রাণাধীন চলে এসেছে এবং ইপিআর- এর ডাইরেক্টর জেনারেল বিগ্রেডিয়ার নেসার আহমদ বন্দী হয়েছেন। তোমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড় এবং সমস্ত পশ্চিম পাকিস্তানীদের বন্দী করে রির্পোট দাও।