পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত

Posted on Posted in 14
শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৯। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিনিউইয়র্ক টাইমস৩০শে জুন, ১৯৭১

 

Zulkar Nain

<১৪, ৫৯, ১২৭-১২৯>

 

দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস, বুধবার, ৩০শে জুন, ১৯৭১

পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি বিপুল ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত

সিডনী এইচ. শনবার্গ

 

 

ঢাকা, পাকিস্তান, ২৬শে জুন – পুর্ব পাকিস্তান অংশে খাদ্য ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে, গ্রামাঞ্চলে নগদ টাকার পরিমাণ কমে গেছে, পাটকল বিকল হয়ে গেছে, এবং গেরিলারা প্রতিনিয়ত প্রধান রাস্তা এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করছে।

 

তা সত্ত্বেও, অধিকাংশ বিদেশী অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, বাঙালি স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন দমন করার সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পূর্বাঞ্চল দখলে সেনাবাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার জন্য নিদারুণ অর্থনৈতিক মূল্য দিতে সরকার ইচ্ছুক, অন্ততপক্ষে তাৎক্ষণিক ভবিষ্যতের জন্য হলেও।

 

জ্ঞাত বিদেশী সূত্র রিপোর্ট দেয় যে তাদের ভ্রমণে কিছু এলাকায় খাদ্য ঘাটতি উঠে এসেছে যা মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যদি না বিঘ্নিত পরিবহন ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়।

 

একটা সমস্যাঘটিত এলাকা হলো উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, সাধারণত এটা একটি চাল উদ্বৃত্ত অঞ্চল যেখান থেকে প্রতিবেশী জেলায় সরবরাহ করা হয়।

 

বিদেশী অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, কিছু কৃষক ছাড়া উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল নির্জন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যারা ২৫শে মার্চ থেকে বাঙালিদের দমন করার চেষ্টা করছে, বেশিরভাগ তাদের হাত থেকে বাচতে ভারতে পালিয়েছে।

 

 

ধ্বংস, লুটপাট, অপসারণ

 

বৈদেশিক সূত্র জানায়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মজুদ খাদ্য লুটপাট, ধ্বংস করা হয়েছে, অথবা দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে। পরিস্থিতি অনাহার পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তারা আরও বলেন, কিন্তু মানুষের খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত খাবার নেই, এবং দুই বা তিন মাসের মধ্যে খাদ্য সমস্যা দেখা দিবে।

 

একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, এই মুহূর্তে সেখানে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা সবথেকে বেশি তারপর মৃত মানুষের সংখ্যা।

 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সমগ্র পুর্ব পাকিস্তানের জন্য দুই মাসের খাদ্যশস্য মজুত ছিল এবং সমস্যা হলো খাদ্য ঘাটতি অঞ্চলগুলোতে এগুলো বিতরণ করা।

 

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা রেলপথ, যেটা পুর্ব পাকিস্তানের প্রধান বন্দর, এখনো বিচ্ছিন্ন এবং জানা যাচ্ছে এসব অঞ্চলে গেলিরা তাণ্ডব এখনো চলমান। স্বাভাবিক অবস্থায় এই পথে পূর্ব পাকিস্তানের আমাদানিকৃত খাদ্যশস্যের ৭০ শতাংশ আসে। রাস্তার প্রধান সেতুগুলো উড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

 

অঞ্চলের স্বাভাবিক চাল ঘাটতি বছরে প্রায় দুই লাখ টন: এই বছর এটা সম্ভবত প্রায় তিন মিলিয়ন হবে।

 

 

ঘাটের শ্রমিকরা আবদ্ধ

 

পরিবহণ বিশৃঙ্খলা ছাড়াও, শ্রম স্বল্পতা এবং গুদামঘরে জায়গার অভাবে বিভিন্ন বন্দর, যেমন চট্টগ্রাম এবং চালনা, ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কারণ বেশিরভাগ শ্রমিক দেশের অভ্যন্তরে অথবা ভারতে পালিয়েছে।

 

বন্দরে অত্যধিক ভিড়ের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে তাদের চালান স্থগিত করেছে যারা সাধারণত প্রতিবছর পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় এক মিলিয়ন টনের মত খাদ্য সরবরাহ করে।

 

অন্য প্রধান খাদ্য-দুষ্প্রাপ্য এলাকা হলো বঙ্গোপসাগরের বদ্বীপ অঞ্চল যেটা গত নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছিল যাতে কয়েকশত হাজার লোক নিহত হয় এবং অধিকাংশ ধানের ফসল ধ্বংস হয়। দ্বীপ ও উপকূলবর্তী অঞ্চলে খাদ্যমজুদ কম হলেও অবস্থা যতটা ভাবা হচ্ছিল ততটা আশঙ্কা মূলক নয় কারণ কিছু ত্রাণ খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে।

 

যাহোক, বৈদেশিক সূত্র জানায়, যদি বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতি নাহয় তাহলে এই অঞ্চল একটি দুর্ভিক্ষ এলাকায় পরিণত হতে পারে।

 

সূত্র জানায়, গাঙ্গেয় বদ্বীপের খুলনা জেলাতেও একটা খাদ্য সমস্যা দেখা দিয়েছে কারণ অনেক হিন্দু কৃষক ও খামার শ্রমিক পালিয়ে গেছে। হিন্দু সংখ্যালঘুরা সেনাবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য যাদেরকে তারা ভারতের এজেন্ট এবং এই মোসলেম জাতির শক্তি মনে করে।

 

ছয়লক্ষ বাঙালি যারা ভারতে পালিয়ে গেছে তাদের দেশ ত্যাগের দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব আরেকটি অজানা বিষয়। তাদের প্রস্থান খাদ্য ও কলকারখানার উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি খরচও কমিয়ে দিয়েছে।

 

এমনকি এলাকায় যেখানে কারণবশত ধানের সরবরাহ ভালো, সেখানে নগদ অর্থ স্বল্প এবং অনেক গ্রামবাসীর কেনার যথেষ্ট সামর্থ্য নেই, এমনকি পলাতক হিন্দু কৃষকরা কম দামে বিক্রি করলেও না।

 

এই অর্থ অভাবের প্রধান কারণ সরকারের গ্রামীণ গণপূর্ত কর্মসূচি প্রায় স্থগিত করা হয়েছে। শ্রমিকরা যারা সড়ক নির্মাণ, সেচ খাল ও খানা খনন করে প্রতিদিন ৬০ সেন্ট করে আয় করত তারা এখন বেকার।

 

সকল উন্নয়ন কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি কৃষি প্রযুক্তিবিদরা এবং বেসরকারি সেচ-খাল ঠিকাদাররা অভ্যন্তরে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে। ঢাকা অফিসে বিদেশী পরামর্শদাতারা এবং প্রকৌশলীরা তাদের সময় নষ্ট করছে। সরকারি অফিসগুলো খোলা থাকলেও কর্মকর্তা নাই এবং কোন কর্ম-পরিকল্পনা করছেনা তারা।

 

পাট কারখানাগুলো পূর্বের তুলনায় খুব কম চলছে। পূর্বাঞ্চলের পাট জাতীয় অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন এবং পাকিস্তানের সবথেকে বড় রপ্তানি এবং বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী শিল্প।

 

সম্প্রতি পূর্ব পাকিস্তান ঘুরতে এসে এরকম অর্থনৈতিক চিত্র দেখতে পেয়েছে বিশ্ব ব্যাংকের দল যারা পূর্ণমাত্রায় সাহায্য করার পূর্ব শর্ত হিসাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে এসেছিল।

 

বিদেশী অর্থনীতিবিদরা মর্মাহত এবং ম্রিয়মাণ হয়ে বর্ণনা করেছেন যে, দলটিকে সুপারিশ করা হয়েছিল যাতে একটা বৈধ রাজনৈতিক সমাধান এবং মার্শাল-ল সরকার দ্বারা একটি বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত যেন সাহায্য বন্ধ রাখা হয়।

 

এগারোটি জাতির সাথে বিশ্ব ব্যাংকের যোগসূত্র আছে যারা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার সরবরাহ করে প্রতিবছর যার উপর পাকিস্তান ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই সাহচর্যের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সাহায্যের অধিকাংশ তথা প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের ব্যবস্থা করে।

 

বিদেশী সাহায্য ছাড়া কতক্ষণ পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনী কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে সেটা এখানে বিদেশী সম্প্রদায়ের কাছে ব্যাপক আলোচনার বিষয়।

 

বিদেশী মুদ্রার সঞ্চয় কম হলেও অবস্থা যতটা খারাপ ভাবা হয়েছিল ততটা খারাপ না। বিশাল আন্তর্জাতিক ঋণ প্রদান স্থগিত রাখার ব্যাপারে পাকিস্তানের একতরফা ঘোষণা এর একটি কারণ। আরেকটি দিক হচ্ছে, যুদ্ধ শুরু হওয়াতে কোন আমদানিই পুর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করেনি, তাই সরকার বৈদেশিক মুদ্রা জমিয়েছেন। সর্বশেষ কারণ, সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই কাকতালীয়ভাবে পশ্চিম পাকিস্তানে উৎপাদনের জন্য কাঁচামালের উদ্ভাবন প্রচুর বেড়েছে।

 

সংক্ষেপে, বিদেশী অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থান একেবারে শেষ পর্যায়ে হলেও এটা মোটেই পুর্ব দখল অগত্যা শেষ হওয়ার পূর্বলক্ষণ নয়।

 

————————————————————————