‘পূর্ব পাকিস্তানে সন্ত্রাস’

Posted on Posted in 7

৭.১৩৩.৩০৯ ৩১৯

শিরোনামঃ ১৩৩। পুর্ব পাকিস্তানে সন্ত্রাস

সূত্রঃ সরকারী প্রচার পুস্তিকা 

তারিখঃ মে, ১৯৭১

 

পুর্ব পাকিস্তান ডকুমেন্টেশন সিরিজ

আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগীদের দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতার উপর বিদেশী সংবাদপত্রের প্রতিবেদন

 

পুর্ব পাকিস্তানে সন্ত্রাস

ডেইলি মেইল, লন্ডন, ৩ এপ্রিল ১৯৭১:

ব্রায়ান রাইমারঃ

হতভাগ্য মানুষগুলো ছিলো ১৪ জন পাঞ্জাবী ব্যবসায়ী যারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসে পূর্বাঞ্চলের যশোর শহরে বসবাস করত।

যশোরে পৌঁছে বিবিসি প্যানারোমা দলের তোলা ছবিতে দেখা যাওয়া এই ব্যবসায়ীদের মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যেরা একত্রিত করে একসাথে বেঁধে হাঁটিয়ে নিয়ে যায়।

 

কিছুক্ষণ পর পশ্চিমা প্রতিবেদকেরা তাদের লাশ খুঁজে পায়।

তাদের দেহে মারধোর এবং ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। একজন তখনো মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল।

 

সানডে টাইমস লন্ডন, ৪ এপ্রিল ১৯৭১:

নিকোলাস টমালিনঃ

আমি সেখানে বিবিসি প্যানারোমার সাংবাদিক এলান হার্ট এবং একজন বাংলাভাষী চিত্রগ্রাহক মোহাম্মাদ আমিন এর সাথে ছিলাম।

 

আমরা ভেবেছিলাম যে সৈন্যরা এবং স্থানীয় জনগণ আক্রমণ শুরু করবে কিন্তু তাদের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।

 

সদর দপ্তরে আসা প্রতিটি বহরেই লম্বা, সাধারণত দাঁড়িওয়ালা পাঞ্জাবীরা ছিল। তাদের হাত ছিল বাঁধা এবং বন্দুকের বাট দিয়ে নৃশংসভাবে ঠেলে ঠেলে তাদের এগিয়ে নেয়া হচ্ছিল।

 

আমরা ভেবেছিলাম পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যরা আক্রমণ করেছে এবং সে হিসেবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। কিন্তু রাস্তার পাশে সবুজ ফালিতে তাজা ছুরিকাঘাত এবং মুগুর পেটার শিকার মানুষদের তখনো বহমান রক্তের পুকুরে পড়ে থাকতে দেখি।

তাদের মাঝে চারজন তখনো জীবিত ছিল এবং পাশ ফিরে হাত পা ছুঁড়ছিল। কিন্তু কেউ কোন শব্দ করছিল না।

এমতাবস্থায় আমাদের আওয়ামী লীগ গাইড হিস্টিরিয়া গ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং আমাদের দ্রুত ফেরত নিয়ে যেতে চায়। সে বলল যে এই জায়গাটা নিরাপদ নয়, পশ্চিম পাকিস্তানিরা আক্রমণ করছে। সে আমাদেরকে প্রায় ঠেলেই মৃতদেহগুলোর কাছ থেকে সরিয়ে নিল।

কিন্তু হঠাৎ করেই আমি, এলান হার্ট এবং মোহাম্মাদ বুঝতে পারলাম যে এই মৃত এবং মৃতপ্রায় লোকগুলো আসলে কারা। তারা বাঙ্গালী ছিলো না। আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে এক ঘন্টা আগে আমরা যেসকল বন্দী পাঞ্জাবীদেরকে দেখেছিলাম, এরাই তারা।

এই নিহতদেরকে স্থানীয় বাঙালি অনিয়মিতদের কেউই হত্যা করেছিল কারণ ঐদিন কেন্দ্রীয় যশোরে একমাত্র তাদেরই উপস্থিতি ছিল।

আওয়ামী রাজনীতিক ও জনতার সন্ত্রাস ও আচরণ অবস্থানগত প্রমাণ হিসেবে কাজ করে এবং আমাদের চিত্রগ্রাহক আমিন, যে পাকিস্তানিদের ধরণ জানত, সেও নিশ্চিত করে যে নিহত ব্যাক্তিরা পাঞ্জাবীই ছিল।

স্থানীয় লোকেরা আমাদের হুমকি দেয়া শুরু করলে আমরা সেই স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হই। তবে চলে আসবার সময়েও আমরা দেখতে পাই আরও ৪০ জন পাঞ্জাবী `গুপ্তচর’ কে সারিবদ্ধভাবে সে একই সবুজ ফালির দিকে হাত মাথার উপর তুলে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

 

হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড, কলকাতা,  ৪ এপ্রিল ১৯৭১:

তুষার পাত্রানাভিসঃ

দর্শনা চিনি কারখানার প্রায় ৫০০ অবাঙ্গালী শ্রমিক এখন একটি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী আছে।

 

স্টেটসম্যান, নয়াদিল্লি, ৪ এপ্রিল ১৯৭১:

পিটার হ্যাজেলহার্ট:

এখন পূর্বাংশে আটকে পড়া লক্ষ লক্ষ অবাঙালি মুসলমান সর্বদাই পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যেকার উত্তেজনার ফলে ভোগান্তির স্বীকার হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আশংকা করা হচ্ছে যে বাঙ্গালীরা এই সুবিশাল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

 

দ্যা টাইমস, লন্ডন, ৬ এপ্রিল ১৯৭১:

দেশ বিভাগের সময় যে হাজার হাজার অসহায় মুসলিম উদ্বাস্তু বাংলায় স্থায়ী হয়েছিল খবরে প্রকাশ গত এক সপ্তাহ ধরে তারা ক্ষিপ্ত বাঙালিদের হাতে গণহত্যার স্বীকার হচ্ছে।

এ সপ্তাহে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে ঢুকে পড়া বিহারী মুসলিম উদ্বাস্তু আজ হিলি দিয়ে ইন্দো-পাকিস্তান ফ্রন্টিয়ার অতিক্রম করা এক কমবয়সী ব্রিটিশ টেকনিশিয়ান গণহত্যার খবরটি নিশ্চিত করেছে।

টেকনিশিয়ান ছেলেটি গৃহযুদ্ধ শুরু হলে বাংলার উত্তরাঞ্চলে আটকা পড়ে গিয়েছিল। সে তার নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চায়নি কারণ তাকে বাংলায় ফিরতে হবে।

তার কথামতে কেবলমাত্র উত্তর-পশ্চিমের এক শহর দিনাজপুরেই শত শত অবাঙালি মুসলমানের মৃত্যু ঘটেছে। “সৈন্যরা চলে যাবার পর ক্ষুদ্ধ জনতা বিহার থেকে আগত অবাঙালি মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমি জানিনা কতজন মারা গিয়েছে, কিন্তু আমি সারারাত ধরে তাদের আর্তচিৎকার শুনতে পেয়েছি।”

 

ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ৭ এপ্রিল ১৯৭১:

স্টাফ রিপোর্টারঃ

তিনি (ডান্ডির একজন অধিবাসী) বর্ণনা দেন ইয়াহিয়ার ২৫ মার্চের ভাষণের পর কেমন করে ক্ষুদ্ধ জনতা কারখানায় প্রবেশ করে।

“গুন্ডারা তাণ্ডলীলা শুরু করে। তারা কারখানা ও অফিসে লুটপাট চালায়, সামনে পেয়েছে এমন সকল পশুকে হত্যা করে এবং তারপর তারা মানুষ হত্যা করতে শুরু করে।”

“তারা আমার ৪ জন পশ্চিম পাকিস্তানী পরিচালকের বাড়িতে যায়, সেখানে আগুন লাগিয়ে দিয়ে তাদেরকে পরিবারসহ(সব মিলিয়ে ৩০ জন) জীবন্ত পুড়িয়ে মারে। যারা দৌড়ে পালিয়ে যেতে চাচ্ছিল, তাদেরকে খুন করা হয়।”

 

নর্দান ইকো, ডার্লিংটন, ডারহাম, ৭ই এপ্রিল ১৯৭১:

গতকাল কোলকাতায় নোঙ্গর করা একটি বৃটিশ জাহাজের যাত্রীরা পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম বন্দরে সংগঠিত গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের বিবরণ দেন।

ইউএস এইড প্রোজেক্টে কর্মরত লিওন লামসডেন নামক একজন আমেরিকান প্রকৌশলী বলেন যে গত সপ্তাহে সেনাবাহিনী এসে পৌঁছার আগের দুই সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রামের বাঙালি অধ্যুষিত জনগোষ্ঠী বন্দর এলাকায় পশ্চিম পাকিস্তানীদের জবাই করে হত্যা করছিল।

 

 

ডেইলি রেকর্ড গ্লাসগো, ৯ই এপ্রিল ১৯৭১:

স্টাফ রিপোর্টারঃ

পূর্ব পাকিস্তানে সংগঠিত একটি হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া স্কটল্যান্ডের একজন নাগরিক গত রাতে বর্ণনা করেন কিভাবে তার চোখের সামনেই ক্ষুদ্ধ জনতা তার সকল কর্মীদের পিটিয়ে মারে।

“আমার মিলের কর্মীরা কোনো বাহিনীর সদস্যদের হাতে নয়, বরং কিছু লাগামছাড়া দুষ্কৃতকারীদের হাতে নিহত হয়।”

“তারা আমার লোকেদের লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে মারে। হঠাৎ করে লক্ষ করলাম পুরো মিলের মাঝে আমিই একমাত্র জীবিত ব্যাক্তি।”

 

নিউজ লেটার, বেলফাস্ট, ৯ এপ্রিল ১৯৭১:

আর এবারনিথিঃ

 

আমি খুশি হব যদি আপনি আমাকে আপনার সংবাদপত্রের মাধ্যমে ২ এপ্রিল ১৯৭১, শুক্রবার রাত ৯ টার বিবিসি সংবাদের প্রতি সাধারণভাবে জনগণের এবং বিশেষভাবে স্কার-ম্যান ট্রাইব্যুনালের মনোযোগ আকর্ষণের অনুমতি প্রদান করেন।

 

সংক্ষেপে বলতে গেলে, সেদিন টিভির খবরে দেখা যায় পূর্ব পাকিস্তানের যশোর শহরে দাঙ্গাবাজ জনতা ঘুরে বেড়াচ্ছে। শহরটি সম্পূর্ণভাবে তাদের দখলে ছিল এবং নিরপরাধ প্রতীয়মান হয় এমন একটি বড় সংখ্যক পশ্চিম পাকিস্তানী নাগরিকদের একসাথে জড়ো করে ক্যামেরা কর্মীদের সামনেই কেটে টুকরা টুকরা করে ফেলা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ক্যামেরা ঘোরানো ছাড়া এই অনাচার প্রতিরোধের কোনো চেষ্টাই তারা সেদিন করেনি।

 

সিনার হারাপান, জাকার্তা, ২৪ এপ্রিল, ১৯৭১:

জপি লাস্যুটঃ

 

বিহারীরা হল সবচাইতে বড় ভুক্তভোগী। তাদের সংখ্যা প্রায় ৮ মিলিয়ন এবং বিশ্বাসের দিক থেকে তারা মুসলিম। দেশ বিভাগের দিনে মানুষগুলো ভারত ছেড়ে চলে আসে। এখন এ মানুষগুলোর জীবন ঝুঁকির সম্মুখীন, কারণ পূর্ব বাংলার লোকেরা এদেরকে গুপ্তচর বলে মনে করছে।

পূর্ব বাংলার লোকেরা প্রতিশোধ নিতে উদগ্রীব, কিন্তু তুলনামূলক ভারী অস্ত্রসমৃদ্ধ পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের হত্যা করবার খুব বেশি সুযোগ তারা পায় না। সবচেয়ে সহজ উপায় হল বেসামরিক পাঞ্জাবী এবং বিহারীদের পিছু ধাওয়া করা। এমনকি পার্সিয়ানরাও তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

 

একবার সীমান্ত অঞ্চলে আমার এক পার্সিয়ান পরিবারের সাথে পরিচয় হয়। তারা ভারতীয় অভিবাসন চেকপয়েন্ট বেনাপোলের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল। পূর্ব বাংলার লোকেরা তাদের পিছু করছিল এবং তাদের হাতে পরিবারটির মৃত্যুর সম্ভাবনাও ছিল।

 

ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ, হংকং, ২৪ এপ্রিল ১৯৭১:

টি আই এস জর্জ

যখন ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) বিদ্রোহ করে তখন তাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল তাদের নিজেদের মধ্যেকার অবাঙালিদের সরিয়ে দেয়া।

১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ সদস্য নিয়ে গঠিত এই ইপিআর এর শতকরা ৪০ শতাংশ সদস্য ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানী, বেশীরভাগ কর্মকর্তাই সেখান থেকে এসেছিলেন।

 

একদিন রাতে সীমান্তের ওপারে ভারতীয় চেকপয়েন্ট শহর হরিদাসপুরের কাছাকাছি ইপিআর এর সদস্যরা এক ঠেলাগাড়ি ভর্তি লাশ ফেলে রেখে যায়।

 

সংখ্যায় কয়েক মিলিয়ন বিহারীরা অবাঙালি হবার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারের সমর্থক তথা গুপ্তচর হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

তাদের মাঝে অনেকেই বাঙালিদের হাতে খুন হয়। অনেককে সম্ভবত পশ্চিম পাকিস্তানে রয়ে যাওয়া বাঙালিদের জন্য জিম্মি হিসাবে বন্দীশিবিরে আটক রাখা হয়।

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস. নিউ ইয়র্ক, ২৮ এপ্রিল ১৯৭১:

এরিক পেস:

পশ্চিম পাকিস্তানের হিসাব মতে বাঙালি সেনা, পুলিশ ও জঙ্গি বেসামরিক নাগরিকদের হাতে ৩৫,০০০ বিহারি, বেশ কয়েক হাজার পাঠান ও অন্যান্য অ-বাঙ্গালী জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিহত হয়।

এদের অধিকাংশ ২৫ মার্চের আগেই মৃত্যুবরণ করে।

 

 

ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ২৯ এপ্রিল ১৯৭১:

কূটনৈতিক স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থনকারীরা চট্টগ্রামে বহু পূর্ব পাকিস্তানীকে জবাই করে হত্যা করেছে।

এক ঘটনায় একটি পাটকলের অন্তত ২৬ জন শ্রমিককে একটি আঙ্গিনার ভেতরে গুলি করে হত্যা করা হয়। কিছু পশ্চিম পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী এবং সন্তানদেরকেও হত্যা করা হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ পেয়েছে।

 

ফাইনানশিয়াল টাইমস, লন্ডন, ৭ মে ১৯৭১:

হার্ভি স্টকউইনঃ

ঢাকা বিমানবন্দরে ঢুকবার মুখে বেশকিছু ছোট ছোট পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত জনবসতি দেখা যায়। এই এলাকাটি একটি বিহারি আবাসিক এলাকা ছিল এবং ক্ষয়ক্ষতি সাম্প্রদায়িক সহিংসতারই প্রমাণ দেয়।

 

অটোয়া জার্নাল এবং টরেন্টো ডেইলি স্টার, ৮ মে ১৯৭১:

এ পি এ রিপোর্ট

দায়িত্বশীল সরকারী ও অন্যান্য সূত্রের হিসাব মতে পূর্ব পাকিস্তানে জাতিগত দাঙ্গায় ১ মার্চ থেকে কমপক্ষে ৩০ হাজার লোক নিহত হয়েছে।

 

যশোর থেকে পাওয়া এসোসিয়েটেড প্রেস রিপোর্ট  – ওয়াশিংটন পত্রিকায় ছাপানো

৮ মে, ১৯৭১:

 

খুলনায় ভ্রমণকালে সংবাদকর্মীরা আজ এমন এক জায়গায় আসেন যে জায়গাকে একজন অবাঙালি অধিবাসী মানুষ জবাইয়ের স্থান হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান এখানের ছাউনিগুলোতে মার্চ ও এপ্রিলের প্রথম দিকে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু বাঙালিরা ভারত থেকে আসা বিহারি অভিবাসী, পশ্চিম পাকিস্তানী ও অন্যান্য অবাঙ্গালিদের গণহত্যা সংগঠন করত।

 

সংবাদকর্মীদেরকে কাঠের ফ্রেমের উপরে বেঁধে রাখা শিকল দেখানো হয় যেখানে মহিলা ও শিশুদের ছুরি দিয়ে শিরচ্ছেদ করা হত বলে খবর রয়েছে।

 

লাশগুলোকে একটি নিচু দেয়ালের ওপর দিয়ে পাশে বয়ে চলা নদীতে ফেলে দেয়া হত।

নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউ ইয়র্ক, ৯ মে, ১৯৭১

 

মেলকম ডব্লিউ ব্রাউনঃ

যখন সহিংসতার সূত্রপাত হয় বাঙালিরা পূর্ব পাকিস্তানে কম সংখ্যায় বিদ্যমান পশ্চিম পাকিস্তানীদের মুখোমুখি দাঁড়ায়।

 

সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং ব্যক্তিবর্গের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় যে  নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার অবাঙালি অধিবাসী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে নিহত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হত্যার পূর্বে তাদের নির্যাতনও  করা হয়েছে।

 

খুলনায় সংবাদকর্মীদের এমন কিছু স্থাপনা দেখানো হয়েছে যেখানে বন্দীদের শিরচ্ছেদের সুবিধার জন্যে কাঠামো তৈরী করা ছিল। সেখানে রক্তাক্ত পোশাক এবং নারীদের চুলের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়।  জায়গাগুলো বাঙালি বিদ্রোহীরা হাজার হাজার অবাঙালি বাসিন্দাদের হত্যার জন্য ব্যবহার করেছে বলে জানা যায়।

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউ ইয়র্ক, ১০ মে ১৯৭১:

মেলকম ডব্লিউ ব্রাউন

 

শত শত সাক্ষীর সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে এই ধারণা হয় যে যখন বোঝা গেল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে তখন কিছু কিছু সম্প্রদায়ের বাঙালিরা বিহারীদের ঘরবাড়িতে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করে এবং তাদের অধিবাসীদের জবাই করে।

 

 

সান, সিঙ্গাপুর, ৯ মে ১৯৭১:

মরিছ কুয়ান্টান্স

 

সেনাবাহিনী যখন ময়মনসিংহে পৌঁছায় তখন তথ্যদাতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে তারা একটি স্থানীয় মসজিদের ভেতর আশ্রয় নেয়া প্রায় ১৫০০ বিধবা ও অনাথদের খুঁজে পায়।

 

ময়মনসিংহের সহকারী পোস্টমাস্টার হিসেবে শনাক্ত হওয়া একজন ব্যক্তি তার ঘাড়ে আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে বলেন যে তাকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো হয়েছে।

 

লোকটি জানায় যে সে শান্তি নামে পরিচিত একটি কলোনিতে বাস করত। এপ্রিলের ১৭ তারিখের গণহত্যায় সেখানে বসবাসরত ৫০০০ অবাঙালির মধ্যে মাত্র ২৫ জন বেঁচে যায়। নিজের পরিবারের হত্যাকাণ্ড ও অঙ্গচ্ছেদের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি হঠাৎ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আর সাক্ষাৎকার চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

 

ময়মনসিংহ জেলার কমান্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বে থাকা জেনারেল বলেন হত্যাকাণ্ড শুরু হয় মার্চের দ্বিতীয়ার্ধে। এসকল হত্যা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আওয়ামী পার্টির সশস্ত্র শাখা আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক এর কাজ।

 

পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস এবং রেজিমেন্টের যেসকল সেনা বিচ্ছিন্নতাবাদী কাজে জড়িয়ে পড়েছে তারাও এতে জড়িত ছিল।

 

অবাঙালি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতায় দক্ষ মানুষদের ধারাবাহিকভাবে জবাই করা হয় বলে তিনি জানান।

 

 

ব্যাংকক ওয়ার্ল্ড, ব্যাংকক, ১০ মে ১৯৭১:

 

খুলনা, পূর্ব পাকিস্তানের দ্বিতীয় প্রধান বন্দর এবং তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এখানে প্রতিবেদকেরা একজন স্থানীয় অবাঙালি অধিবাসীর বর্ণনানুসারে একটি মানুষের জবাইঘরের সম্মুখীন হন।

 

মার্চ এবং এপ্রিলের শুরুতে এইসব ঘর, ছাউনি এবং নির্যাতনের যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে বাঙালিরা ভারত থেকে আগত বিহারি অভিবাসী, পশ্চিম পাকিস্তানী এবং অন্যান্য অবাঙালি অভিবাসীদের ব্যাপক সংখ্যায় হত্যা করে।

 

সাংবাদিকদের যেখানে একটি কাঠের ফ্রেমের সাথে বাঁধা শিকল দেখানো হয় যেখানে তথ্য অনুযায়ী নারী ও শিশুদের ছুরি দিয়ে শিরচ্ছেদ করা হত।

 

সেখানে একটি গাছের সাথে শ্বাসরোধকারী একপ্রকার যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছিল। অধিবাসী ব্যক্তিটির দেয়া তথ্য অনুযায়ী এখানে ধরে আনা মানুষদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হত। একটি গাছের গায়ে লাগানো দড়িকে ঝুলন্ত ফাঁস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

 

বলা হয় যে লাশগুলোকে একটি নিচু পাঁচিলের ওপর দিয়ে পাশে বয়ে চলা নদীতে ফেলে দেয়া হত।

 

প্রাচীরের পাশে একটি গাছে প্রচুর পরিমাণ মানুষের চুল পাওয়া যায়। রক্তাক্ত কাপড়-চোপড় এবং বাচ্চাদের জুতা পুরো আঙ্গিনা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।

গার্ডিয়ান, লন্ডন, ১০ মে ১৯৭১:

একজন সংবাদ দাতাঃ

 

একজনের কানে সবচাইতে ভয়ঙ্কর গল্পগুলো আসে। এত বিশাল আকারে হত্যা, ধর্ষণ, ধ্বংস ও লুটতরাজ ঘটেছে আর তার পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে এসকল ভয়ঙ্কর গল্প কোনো ভাবাবেগ না দেখিয়েই শুনে যেতে হয়। অবধারিতভাবে এই রক্তাক্ত নাটকের মূল চরিত্র ছিল অসহায় বিহারীরা।

 

কিন্তু বিহারি সম্প্রদায়ের জন্য আসল ট্র্যাজেডি নিহত মানুষের হত্যার সংখ্যা নয় বরং হত্যার বিভীষিকাময় পদ্ধতিগুলো। ২টি আতঙ্কের রাতের মধ্যেই একটি শহরের দশ হাজার মানুষের হত্যা এমন একটি গল্প যা এক সপ্তাহ স্থায়ী হবে।

 

বিহারীদের তাদের ঘর থেকে ধরে টেনে বা লোভ দেখিয়ে কসাইখানাতে নিয়ে গিয়ে ছুরি দিয়ে তাদের ধীরে ধীরে জবাই করা হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা এ ঘটনার সত্যতা বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত।

 

ময়মনসিংহে একজন পূর্ব পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা পশ্চিম পাকিস্তানী এক সেনা কর্মকর্তার পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সকালের নাস্তা করা শেষে পরিবারের সদস্যদের গুলি করে হত্যা করে।

 

মানুষজনকে পা থেকে শুরু করে কুপিয়ে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানী এক গর্ভবতী মহিলাকে দুর্বৃত্তরা রাস্তায় টেনে এনে তার পেট কাটে এবং অনাগত সন্তানকে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। মহিলাটি বেঁচে আছে কিন্তু তার বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছাই আর অবশিষ্ট নেই।

 

এক মহিলাকে হত্যা করা হয় কিন্তু তার তিন মাস বয়সী শিশুটিকে এক হাত কেটে নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।

 

একজন ডাক্তার একটি সিরিঞ্জ দিয়ে লোকের শরীর থেকে রক্ত বের করে নিয়ে তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

 

ময়মনসিংহে বিহারিদের শরণার্থী শিবিরের একজন ব্যক্তি তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন। এসময় শিবিরের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। অশ্রু লুকাতে তিনি তার মুখ ফিরিয়ে নেন।

 

পরবর্তীতে এই কর্মকর্তা, যিনি ময়মনসিংহে প্রবেশ করাদের মধ্যে একদম প্রথম দিকেই ছিলেন, আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে ফিস ফিস করে বলেন “ঐ লোকটি যা বলেছে তা ময়মনসিংহে আমার দেখা ঘটনার শতভাগের এক ভাগও নয়।”

 

 

 

 

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউ ইয়র্ক, ১১ মে, ১৯৭১:

ম্যালকম ব্রাউনঃ

 

সেনাবাহিনী পৌঁছার পূর্বে চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্নতাবাদী আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র বাঙালি শ্রমিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ভারত থেকে আসা বিহারী অভিবাসীদের অধিকতর উন্নতিতে ক্ষুদ্ধ হয়ে তারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিহারীকে হত্যা করেছে বলে জানানো হয়।

 

কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামের বৃহত্তম কারখানা, চট্টগ্রাম পাট উৎপাদন কারখানায় বাঙালি শ্রমিকদের হাতে বিহারী তত্ত্বাবধায়ক ও তাদের পরিবারের নিহত হবার কথা জানিয়েছে। সংবাদকর্মীদের কবর দেখিয়ে বলা হয় যে সেখানে আক্রান্ত ১৫২ জনের লাশের দাফন হয়েছে।

স্থানীয় একটি ব্যাংকের এক ইউরোপীয় পরিচালক বলেন “এখানে কর্মরত প্রত্যেক ইউরোপিয়ানের কাছে সেনা বাহিনীর পৌঁছানোটা সৌভাগ্যের প্রতীক। তারা সময় মত না আসলে আমি এই কথাগুলো বলার জন্যে বেঁচে থাকতাম না।”

 

 

ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াশিংটন, ১২  মে ১৯৭১

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস রিপোর্ট:

 

গতকাল এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি পরিদর্শন করা সংবাদকর্মীরা বলেন যে সেখানে প্রচুর গোলার আঘাত ও আগুনে পুড়ে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমান ছিল। বিদ্রোহীদের দ্বারা বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচারে গণহত্যার প্রমাণও তারা পান।

 

প্রভাবশালী ইস্পাহানী পরিবারের মালিকানাধীন পাটকলে সংবাদকর্মীরা ১৫২ জন নিহত অবাঙালি নারী ও শিশুদের গণকবর দেখতে পান যাদের মিলের বিনোদন ক্লাবে গত মাসে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীরা হত্যা করেছে বলে খবর পাওয়া যায়।

 

গুলিতে ঝাঁঝরা মেঝেতে তখনো রক্তাক্ত পোশাক ও খেলনা পড়ে ছিল। দায়িত্বশীল সূত্র জানায় ২৫ মার্চ পশ্চিম অংশ থেকে স্বাধীনতা লাভের উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্রোহ শুরু হবার পর থেকে ১১ এপ্রিল সেনাবাহিনী শহরটি পুনর্দখলের আগ পর্যন্ত হাজার হাজার পশ্চিম পাকিস্তানী এবং ভারতীয় অভিবাসীদের হত্যা করা হয়।

 

অধিবাসীরা একটি পোড়া অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের দিকে নির্দেশ করে বলে যে সেখানে বাঙালিরা প্রায় ৩৫০ জন পশ্চিম পাকিস্তানী পাঠানকে পুড়িয়ে মেরেছে।

 

 

 

ওয়াশিংটন, ইভিনিং স্টার, ওয়াশিংটন, ১২ মে ১৯৭১:

মর্ট রোজারব্লান্ট

 

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে একটি পাটকলের বিনোদন ক্লাবে পোশাক ও মল-মূত্রের স্তুপের মাঝে একটি রক্তমাখা পুতুল পড়ে রয়েছে। এই ক্লাবটিতে বাঙালিরা ১৮০ জন নারী ও এবং শিশুকে জবাই করে।

 

উগ্র জাতীয়তাবাদের অকস্মাৎ জাগরণে বাঙালিরা কিছু পশ্চিম পাকিস্তানীকে হত্যা করে।

 

বেসামরিক বাঙালি ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের সৈনিকেরা ভারতের বিহার থেকে আসা প্রচুর মোহাজির (ভারতীয় অভিবাসী) দের হত্যা করে। তারা হাট-বাজার ও বাড়ীঘরের মধ্যে দিয়ে ছুরিকাঘাত, গুলিবর্ষণ ও অগ্নি সংযোগ করতে করতে ছুটে যায়; কখনো কখনো থামে কেবল ধর্ষণ এবং লুটতরাজের উদ্দেশ্যে।

 

 

ইন্দোনেশীয়ান অবজারভার, জাকার্তা, ১২ মে ১৯৭১:

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস রিপোর্ট:

 

প্রতিবেদকেরা পরে ঢাকায় একটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে যেখানে ময়মনসিংহ থেকে আগত ৩,০০০ গৃহহীন লোক আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

 

ডাক্তাররা তাদের মতে বিগত সপ্তাহগুলোতে বাঙালিদের হাতে গুলি, ছুরি এবং কুঠারে আহত হওয়া অবাঙালি ২৫ জন পুরুষ ও ১৫ জন মহিলাকে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন।

 

একটি সাত বছর বয়সী ছেলে তার চার বছর বয়সী ভাইয়ের সঙ্গে হাসপাতালের একটি বিছানায় চুপ করে বসে আছে। ডাক্তাররা জানান যে তাদের পরিবারে আর কেবলমাত্র তাদের ১৩ বছর বয়সী আরেকটি ভাই জীবিত আছে।

 

এক নারীর শরীরে গুরুতর ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। অন্য আরেকজনের হাত কুড়ালের আঘাতে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

 

তারা দুজনেই বলেন যে বাঙালি যুবকেরা তাদের এই অবস্থা করেছে।

 

এক উনিশ বছর বয়সী বিহারী ছাত্রের পেটের মধ্যে দিয়ে গুলি গিয়েছে। সে বলে যে বাঙালি গুন্ডারা সে শান্তির যে অঞ্চলে থাকত সেখানকার সকল পুরুষ সদস্যকে বাইরে আসতে বলে। আর তারপর তারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে।

 

সে তিনবার আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। বিদ্রোহীরা তাকে মৃত ভেবে চলে গেলে সে বেঁচে যায়।

 

আরো অনেকের শরীরে গুলির আঘাতের চিহ্ন ছিল।

 

ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াশিংটন, ১৩ মে ১৯৭১:

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস রিপোর্ট:

দৃঢ়ভাবে একটি পৃথক পূর্ব পাকিস্তানের দাবী করা বাঙালিরা সে অঞ্চলের প্রায় ৬ মিলিয়ন অবাঙালি জনসংখ্যার অনেককে হত্যা করেছে।

 

 

দ্যা টাইমস, লন্ডন, ১৫ মে ১৯৭১:

পিটার হ্যাজেলহার্স্ট:

 

এটা সমানভাবেই স্পষ্ট যে বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে গত মাসের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিশোধ হিসেবে, যেখানে বাঙালিরা ধারাবাহিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের অবাঙালি মুসলমান অভিবাসী (বিহারী)দের উপর গণহত্যা চালায়।

 

“কোন বিহারী উদ্বাস্তু নেই” একজন বাঙালি সমাজ কর্মী আমাকে নিঃসংকোচে বলেন, “দুদিন আগে তাদের চৌদ্দ জন পশ্চিমবঙ্গে আসতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু বাঙ্গালীরা তাদের বর্শা ও পাথর মেরে হত্যা করে।”

 

 

 

সিলন, ডেইলি নিউজ, কলম্বো, ১৫ মে ১৯৭১:

মরিস কুয়াইনট্যানস:

 

প্রমাণ আছে যে অবাঙালি জনগোষ্ঠী, যাদের বেশিরভাগই ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারত থেকে অভিবাসী হিসেবে এসে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের উপর আক্রমণ চলছে; তাদের কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে এবং তাদের ঘরবাড়ি ক্ষুদ্ধ জনতা পুড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন যে উত্তরের ময়মনসিংহে অস্ত্রধারী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে তাদের স্বামী ও পিতা নিহত হলে প্রায় ১৫০০ বিধবা এবং অনাথ একটি মসজিদে পালিয়ে যেয়ে আশ্রয় নেয়।

 

একজন কারখানা ব্যবস্থাপক সাংবাদিকদের একটি গণকবর দেখান যেখানে তিনি বলেন যে ১০০ এরও বেশি নারী ও শিশুর দাফন করা হয়েছে।

 

সেনাবাহিনীর আসার ঠিক আগে আগে কারখানাটির বিনোদন হলে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ সপ্তাহে যেদিন সাংবাদিকেরা জায়গাটি দেখেন, সেখানে মৃত্যুর তীব্র গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। মানুষের চুল এবং রক্তের দাগ পুরো ভবনের চারপাশে ছড়িয়ে ছিল।

 

ময়মনসিংহের সহকারী পোস্টমাস্টার সাংবাদিকদের তার ঘাড়ে ক্ষত এবং বেয়নেটের আঘাতের চিহ্ন দেখান।

 

অশ্রু সংবরণ করতে করতে তিনি বলেন যে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সেনাবাহিনীর পক্ষত্যাগীদের দ্বারা আক্রান্ত ৫,০০০ অবাঙ্গালির মাঝে যে ২৫ জন কেবল বেঁচে ফিরতে পারে, তিনি তাদের একজন।

 

এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ সামান্য যে বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলো দ্বারা এরূপ কিছু নিষ্ঠুরতা সংঘটিত হয়েছে। সাধারণত এই ধরনের হত্যাকাণ্ড দোকানের প্রধান কর্মী বা জুটমিলের প্রশাসকদের ওপর ক্ষোভ পুষে রাখা বাঙালি কর্মীদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছে। এদের অনেকেই ছিল বিহারী – ভারত থেকে আসা মুসলিম অভিবাসী। তারা পূর্ব পাকিস্তানে ভালভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল এবং তা তুলনামূলকভাবে কম সফল বাঙালিদের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

মেজর ওসমান চৌধুরী, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা যুদ্ধের দক্ষিণ-পশ্চিম ভাগের কমান্ডার আজ বিকেলে স্বীকার করেন যে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও বাঙালি স্বেচ্ছাসেবকেরা সংখ্যালঘু বিহারি মুসলমাদের আক্রমণ ও হত্যা করছিল “কারণ তারা গুপ্তচর ও পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করেছে”।

 

ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর মেজর চৌধুরী এখানে ইন্দো-পাকিস্তান সীমান্তে সাংবাদিকদের সাথে দেখা করেন। তিনি বলেন যে বিহারি মুসলমানরা যারা ভাষাগত ও জাতিগত ভাবে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে চিহ্নিত হয়, তারা বাঙালি গণহত্যার কাজে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সৈন্যদের সাহায্য করেছিল। বাঙালি এই কর্মকর্তাকে এরূপ সংবাদ প্রতিবেদন ও আশঙ্কার আলোকে প্রশ্ন করা হচ্ছিল যে প্রায় ৫০ লক্ষ জনসংখ্যার অবাঙালি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেককে প্রতিহিংসামূলক কারণে হত্যা করা হয়েছে।

 

বিহারিদের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানের কোন প্রশ্নই উঠে নি। তিনি বলেন “যদি আমরা একজন বিহারিকে পাই, তবে তাকে আমরা হত্যা করি। এছাড়া আমরা বিহারীদের ঘরবাড়ি আক্রমণ করেও তাদের হত্যা করি।”

 

 

নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউ ইয়র্ক, ২০  মে  ১৯৭১ :

হোমার এ জ্যাক

 

পূর্ব অংশে হত্যাকাণ্ডের শিকার ছিল বিহারীরা, বিহার ও অন্যান্য ভারতীয় রাজ্য থেকে দেশ বিভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসা মুসলিম যারা এখনো বাংলা সংস্কৃতির মধ্যে একাত্ম হয়ে যেতে পারেনি।

 

করাচিতে সবাই সেনাবাহিনী নয়, বরং স্বায়ত্তশাসন তথা বিচ্ছিন্নতাবাদী আওয়ামী লীগের কিছু সদস্যের দ্বারা সংগঠিত বিহারিদের গণহত্যায় মর্মাহত। তবে প্রায় সকলেই সেনাবাহিনীর হাতে বাঙালিদের যে গণহত্যা চলছে তা অস্বীকার করেন।

 

এই সেনা কর্মকাণ্ডের পূর্বে ও পরে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু অংশ খুব কম সময়েই অহিংস এই উপমহাদেশে নিজেরাই গণহত্যায় মেতে উঠেছে।

 

 

দ্যা ফাইনানশিয়াল টাইমস, লন্ডন, ২১ মে ১৯৭১:

হার্ভে স্টকউইন:

 

আঞ্চলিক স্বাধীনতার বাঙালি আদর্শের অন্ত হয়েছে খুব বিয়োগান্তক ভাবে এবং অবাঙালিদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বর্বরতার মূর্খতার কালিমা জড়িয়ে।

 

দীর্ঘদিন ধরে লালিত বাঙালি স্বকীয়তাবোধ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্ত করে গড়ে ওঠা এসব মনোভাব পূর্বাংশে ২৫ মার্চের আগেকার বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরীর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। এরা বাঙালি-বিহারী ভ্রাতৃঘাতী সম্পর্কের উদ্ভবেরও ব্যখ্যা দেয় যা ছিল এই বিপর্যয়ের এক অবিচ্ছেদ্য কিন্তু উপেক্ষিত অংশ।

 

এটা বলতেই হয় যে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডই বাঙালি সেনাদের বিপরিত পথে চলতে বাধ্য করেছে। আর এরাই পরবর্তীতে মোহাজির ও অন্যান্য অবাঙালি অভিবাসীদের হত্যাকাণ্ডে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে।

 

এ সবই এখন যা দেখা যাচ্ছে তার পটভূমি মাত্র। আর বর্তমান ঘটনাবলি কেবলমাত্র একটি সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ বা গৃহযুদ্ধের ঘটনা নয়; বরং এটি ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের সময়কার দাঙ্গার এক নতুন সংস্করণ মাত্র। এভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রচেষ্টা, যদি তা কোনকালে বর্তমান থেকে থাকে, কখনো ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানী কর্তৃত্ব গ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধস্পৃহায় আবার কখনো বা মুখোমুখি সংঘর্ষে পরাজয়ের হতাশা থেকে সাম্প্রদায়িক রক্ত-পিপাসায় পরিবর্তিত হয়।

 

কারণ ও প্রভাবের নির্ভুল ক্রম হিসেব করলে অবশ্য তা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পরিবর্তিত হয়। সাধারণভাবে বলা যায়, ঢাকার বাইরে বাঙালিরাই এই হত্যাকাণ্ড শুরু করে।

 

অন্যদিকে বিদ্রোহীরা তাদের নিজস্ব শক্তি সম্পর্কে অতি উচ্চ ধারণা ধারণ করত। ফলে তারা একই সাথে সেনাবাহিনী এবং পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হানবার মরণঘাতী ভুলটি করেছে।

 

 

দ্যা সানডে টাইমস, লন্ডন, ২ মে ১৯৭১:

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস:

 

সশস্ত্র আওয়ামী লীগ সদস্য ও ছাত্র সমর্থিত ১,৭৬,০০০ অস্ত্র ও ট্রেনিং সম্বলিত বিদ্রোহী বাঙালি আর্মি ইউনিট, প্যারা মিলিটারি ফোর্স, পুলিশ বাহিনী সকলে মিলে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগের মিছিলের স্লোগান “বাংলাদেশ খালি কর, পাঞ্জাবী মারো” কে একটি ভয়ানক বাস্তবতায় রূপ দিতে চেষ্টা করেছে।

 

৮০ টিরও বেশি সাক্ষাৎকারে প্রত্যক্ষদর্শীরা নারী ও পুরুষের ধর্ষণ, নির্যাতন, চোখ উপড়ে ফেলা, জনসম্মুখে মারধোর; নারীদের স্তন ছিঁড়ে ফেলা এবং গুলি করে বা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করার আগে হাত-পা কেটে ফেলার ভয়ঙ্কর সব বিবরণ দিয়েছেন।

 

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় পাঞ্জাবী সেনা ও সরকারী কর্মচারী এবং তাদের পরিবারকে বিশেষভাবে নির্যাতনের জন্য নির্বাচিত করা হচ্ছে।

 

চট্টগ্রামে মিলিটারি একাডেমীর দায়িত্বে থাকা কর্নেলকে হত্যা করা হয়। তার আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে  ধর্ষিত হন এবং তার পেটে বেয়নেট চার্জ করা হয়।

 

চট্টগ্রামের অন্য আরেকটি অংশে একজন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস কর্মকর্তার ছাল জীবন্ত অবস্থাতেই ছাড়িয়ে নেয়া হয়। তার দুই পুত্রের শিরচ্ছেদ করা হয়, তার স্ত্রীকে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করা হয় এবং তারপর তার ছেলের কাটা মাথা তার নগ্ন শরীরের উপর স্থাপন করে তাকে মারা যাবার জন্যে ফেলে রেখে যাওয়া হয়।

 

অনেক তরুণী মেয়েদের লাশ পাওয়া যায় যেখানে তাদের যোনিতে বাংলাদেশের পতাকা গেঁথে দেয়া অবস্থায় ছিল।

 

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলো ছিল চট্টগ্রাম ও খুলনা, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানীরা কেন্দ্রীভূত ছিল। চট্টগ্রামের জন্য সরকারি ভাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ৯,০০০ এবং খুলনাতে তার চেয়ে কিছু কম।

 

তবে অন্যান্য স্থানেও গণহত্যার খবর মিলেছে। দিনাজপুরের কাছাকাছি ঠাকুরগাঁও এ প্রায় ৩,০০০ নারী ও শিশুর লাশ পাওয়া যায়। যশোরের কাছাকাছি ঈশ্বরদীতে সংখ্যাটি প্রায় ২০০০, ঢাকার উত্তর-পূর্ব দিকে ভৈরব বাজারে ৫০০ এবং কালুরঘাটে পাটকল এলাকায় ২৫৩ টি লাশ পাওয়া যায়।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এর সীমান্তের এপারে যার অবস্থান, আমি ৮২ টি শিশুর মরদেহ দেখতে পাই যাদের লাইন করে দাঁড়া করিয়ে গুলি করা হয়েছে। বাঙালি আসামিরা মুক্ত হয়ে যাবার পরে অবাঙালিদের যে জেলে এসে বসতি স্থাপনে বাধ্য করা হয় তার চারপাশে প্রায় ৩০০ অবাঙালির লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল। আসন্ন পশ্চিম পাকিস্তানী আগ্রাসনের হাত থেকে পালিয়ে যাবার সময় বিদ্রোহীরা এদেরকে গুলি করে হত্যা করে গিয়েছে।

 

পাকিস্তান পাবলিকেশন্স

পি ও বক্স ১৮৩

করাচী