পূর্ব পাকিস্থান রেনেসাঁ সোসাইটি

Posted on Posted in 1

শিরোনামঃ পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি সংক্রান্ত দলিল

সুত্রঃ বুদ্ধির মুক্তি ও রেনেসাঁ আন্দোলনঃ মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ

তারিখঃ ১৯৪৩ সাল

 

বুদ্ধির মুক্তি ও রেনেসাঁ আন্দোলন

          (সাবেক) পাকিস্তান- পূর্বকালের মুজীবর রহমান খাঁ তাঁর ‘পাকিস্তান’ শীর্ষক গ্রন্থে পাকিস্তানের (সাবেক) রাষ্ট্র ভাষা সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করেন। হাবিবুল্লাহ বাহার,তালেবুর রহমান প্রমুখের পাকিস্তান-সম্পর্কিত গ্রন্থে এবং আব্দুল হক, ফররুখ আহমদ প্রমুখ আরও অনেকের রচনায় বিভাগ-পূর্বকালেই (সাবেক) পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছিল। এ সম্পর্কে ১৩৫০ সালে (১৯৪৩) একটি অত্যন্ত মূল্যবান প্রবন্ধ আবুল মনসুর আহমদ।  ১৩৫০ সালের কার্ত্তিক সংখ্যা “মাসিক মোহাম্মদী”তে প্রকাশিত “পূর্ব পাকিস্তানের জবান” নামক শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটিতে তিনি বিভাগ পূর্ব-কালেই বলেন

          “মুসলিম লীগ রাজনীতিতে “জাতীয়তা” যে সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে, তাতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত ও সম্ভব হয়ে উঠেছে।”

           এই প্রেক্ষিতে উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় ভাষারূপে চাপিয়ে দেওয়ার বিপদ ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ঐতিহাসিক ,সামাজিক, সাংস্কৃতিক ,ভাষাতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করে আবুল মনসুর আহমদ ১৯৪৩ সালেই বলেছিলেনঃ

            “এত করেও বাংলার চার কোটি বাঙলাভাষী মুসলিম জনসাধারণ হাজার বছরেও উর্দুভাষী হবে না… লাভের মধ্যে হবে একশ্রেণীর অভিজাত সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। এদের সাথে জনসাধারনের কোন যোগ থাকবে না, একথাও আগে বলেছি। কিন্তু এ’রা পশ্চিমাদের গলার সুর মিলিয়ে উর্দুর মাহাত্ম্য গেয়ে যাবেন।কারণ এরাই হবেন পশ্চিমাদের এদেশীয় আত্মীয় ও পূর্ব পাকিস্তানের এাংলো-ইন্ডিয়ান শাসক শ্রেণী।শাসক শ্রেণীর ভাষা থেকে জনসাধারণের ভাষা পৃথক থাকার মধ্যে মস্ত বড় একটি সুবিধে আছে। তাতে অলিগার্কী ভেঙ্গে প্রকৃত গণতন্ত্র কোনদিন আসতে পারেনা; সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রোকাওট হিসাবে রাজনৈতিক মতলবে এই অভিজাত শ্রেণী উর্দুকে বাঙলার ঘাড়ে চাপিয়ে রাখবেন।শুধু চাকরীতেই নয়, আইনসভার মেম্বরগিরিতেও যোগ্যতার মাপকাঠি হবে উর্দু-বাগ্মিতা। সুতরাং সেদিক দিয়েও এই ভাষাগত আভিজাত্যের স্টীলফ্রেম ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনা থাকবে না। উর্দুকে পূর্ব-পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা করবার চেষ্টার বিপদ এইখানেই।… অথচ উর্দুকে নিয়ে এই ধস্তাধস্তি না করে আমরা সোজাসুজি বাঙলাকেই যদি পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় ভাষারূপে গ্রহন করি তবে পাকিস্তান প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মুসলিম বাঙলার শিক্ষিত সম্প্রদায় নিজেরাই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও শিল্পগত রুপায়নে হাত দিতে পারবো। আমাদের নিজেদের বৃদ্ধি, প্রতিভা ও জীবনাদর্শ দিয়েই আমাদের জনসাধারণকে উন্নত ও আধুনিক জাতিতে পরিণত করবে। জাতির যে অর্থ শক্তি , সময় ও উদ্যম উর্দু প্রবর্তনে অপব্যয় হবে, তা যদি আমরা শিক্ষা-সাহিত্য, শিল্প-বানিজ্যে নিয়োজিত করি, তবে পূর্ব পাকিস্তানকে শুধু ভারতের নয়, সমগ্র মুসলিম জগতের এমনকি গোটা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত করতে পারবো”।

( পূর্ব-পাকিস্তানের জবান, মাসিক মোহাম্মদী, কার্ত্তিক,১৩৫০)

   ‘পূর্ব পাকিস্তানের জবান’ শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটিতে তিনি বলেন, “জিন্না-নেতৃত্বের বাস্তববাদী দূরদর্শিতার গুণে মুসলিম লীগ রাজনীতিতে ‘জাতীয়তা’র যে সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে , তাতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের স্বাতন্ত্র‍্য ও স্বাধীনতা সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত ও সম্ভব হয়ে উঠেছে। কাজেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত রুপায়নের ভাবী রূপ নিয়ে মুসলিম বাঙলার চিন্তা নায়কদের মধ্যে এখন থেকেই আন্দোলন আলোচনা খুব স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে।… পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক রুপায়ণ নিয়ে যথেষ্ট না হলেও অনেক আলোচনা এরা করেছেন, আমরাও সে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা কি হবে , এ নিয়ে সোজাসুজি আলোচনা এঁরা আজো করেননি। করেননি বোধ হয় এই জন্য যে, পূর্ব পাকিস্তানের ‘জাতীয় দৈনিক আজাদ’ বাঙলা ভাষার কাগজ এবং এরাও তাই ধরে নিয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা যে বাঙলা হবে, এ সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েই আছে। হয়েই ছিল সত্য, বাঙলার মুসলমানদের মাতৃভাষা বাঙলা হবে কি উর্দু হবে এ তর্ক খুব জোরেশোরেই একবার উঠেছিল। মুসলিম বাঙলার শক্তিশালী নেতাদের বেশীর ভাগ উর্দুর দিকে জোর দিয়েছিলেন , নবাব আবদুর রহমান মরহুম, স্যার আব্দুর রহিম, মৌঃ ফজলুল হক, ডাঃ আবদুল্লাহ , সোহরাওয়ার্দী, মৌলভী আবুল কাসেম মরহুম প্রমুখ প্রভাবশালী নেতা উর্দুকে বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা করবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মুসলিম বাঙলার সৌভাগ্য এই যে, উর্দুর প্রতি যাদের বেশী সমর্থন থাকার কথা সেই আলেম সমাজই এই অপচেষ্টায় বাধা দিয়েছিলেন। বাঙলার আলেম সমাজের মাথার মণি মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, মওলানা আবদুল্লাহেল বাকী, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী উর্দু বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব করেছিলেন। এঁদের প্রয়াসে শক্তি যুগিয়েছিলেন মরহুম নবাব আলী চৌধুরী সাহেব। সে লড়াইয়ে এঁরাই জয়লাভ করেছিলেন। বাঙলার উপর উর্দু চাপাবার সে চেষ্টা তখনকার মত ব্যর্থ হয়। কিন্তু নির্মূল হয়নি। বাঙলার বিভিন্ন শহরে বিশেষত কোলকাতায় মাঝে মাঝে উর্দুওয়ালারা নিজেদের আন্দোলনকে জিইয়ে রেখেছিলেন। সম্প্রতি পাকিস্তান আন্দোলনের ফলে মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদ তাদের রাজনৈতিক আদর্শের বুনিয়াদে পরিণত হওয়ায় উর্দুওয়ালারা আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন। সম্প্রতি ‘মর্নিং নিউজ’ ও ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ এ ব্যাপারে কলম ধরেছেন। জনকতক প্রবন্ধ লেখকও তাতে জুটেছেন। এরা বলেছেন ‘পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা স্বভাবতই উর্দু হবে’।

     ১৩৫২ সালে (১৯৪৪) রচিত ও ‘মাসিক মোহাম্মদী’তে প্রকাশিত একটি ব্যঙ্গ কবিতায় ফররুখ আহমদ উর্দুপ্রেমিকদের প্রতি তীব্র কটাক্ষ ও বিদ্রুপবান হেনে লিখেছিলেনঃ

দুই শো পশ্চিম মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন                                                                         
 বাংলাকে তালাক দিয়ে উর্দুকেই করিয়াছি নিকা,                                                                  
 (বাপান্ত শ্রমের ফলে উড়েছে আশার চামচিকা)                                                                    
উর্দুনীল আভিজাত্যে (জানে তা নিকট বন্ধুগণ) ।                                                                      
খাটি শরাফতি নিতে ধরিয়াছি যে অজানা বুলি                                                                        
 তার দাপটে চমকাবে একসাথে বেয়ারা ও কুলি                                                                     
সঠিক পশ্চিমা ধাঁচে যে মুহূর্তে করিব তর্জন ।

পূর্ণ মোগলাই ভাব তোর সাথে দু’পুরুষ পরে                                                                       
বাবরের বংশ দাবী-জানি তা অবশ্য সুকঠিন                                                                           
কিন্তু কি লাভ বল হাল ছেড়ে দিলে এ প্রহরে                                                                       
আমার আবাদী গন্ধ নাকে পায় আজো অর্বাচীন ।                                                                   
পূর্বোক্ত তালাক সূত্রে শরাফতি করিব অর্জন;                                                                         
নবাবী রক্তের ঝাঁজ আশা করি পাবে পুত্রগণ।

 

(উর্দু বনাম বাংলা)

‘ভারতের রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে বিদ্বজ্জনের আলোচনা’ সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা যায় কিনা, এ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা হয়। উপরোক্ত বিদ্বজ্জনের আলোচনা সভার বিবরণ ১৩৪৫ সালের ফাল্গুন সংখ্যা ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সম্ভবতঃ এটাই বাংলার রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে প্রথম দাবী। এখানে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হল।

             “গত ১৯শে ভারতের রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে আলোচনা করার নিমিত্ত বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদ ভবনে একটি সভার অধিবেশন হয়। সুপণ্ডিত হিরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। তিনি এবং অতুলচন্দ্র গুপ্ত, অর্ধেন্দ্র কুমার গঙ্গোপাধ্যয় , উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, খগেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রফুল্লকুমার সরকার, সুন্দরী মোহন দাস ও দ্বিজেন্দ্র নাথ মৈত্র আলোচনায় যোগদান করেন। আলোচনাটি কলিকাতার অন্ততঃ একখানি দৈনিক কাগজে বিস্তারিতভাবে বাহির হওয়া উচিত ছিল। তাহা না হওয়ায় বাঙ্গালী বিদ্বান ও সাহিত্যিকগণের এ-বিষয়ে মত ও যুক্ত সেদিন কি বিবৃত হইয়াছিল সে বিষয়ে অবাঙালীরা সাধারণতঃ অজ্ঞ থাকিবেন। ইহা বাঞ্ছনীয় নহে।

      নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলি গৃহীত হইয়াছিলঃ

      ১। এই সভার মতে বাংলা ভাষার বহুলতর প্রচারের জন্য নিম্নলিখিত ও অন্যান্য উপায় অবলম্বন করা উচিতঃ 

             (ক) বিশেষ প্রয়োজন ভিন্ন বাঙ্গালী মাত্রই দৈনন্দিন কার্য ও ব্যবহারে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা কর্তব্য।

   (খ) বাংলাদেশে প্রবাসী অন্য ভাষাভাষী ব্যক্তিগণের সহিত যতদূর সম্ভব বাংলা ভাষায় কথোপকথন ও  চিন্তার বিনিময় কর্তব্য। 

   (গ) অ-বাঙ্গালীদের মধ্যে ও বাংলার বাহিরে যাহাতে বঙ্গ-সাহিত্যের প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধি হয় তজ্জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করা কর্তব্য। যথা- পরীক্ষা গ্রহণ, পুরস্কার বিতরণ, বাংলা সাহিত্যের আলোচনা প্রতিষ্টান স্থাপন ও প্রতিযোগিতা নির্ধারণ প্রভৃতি।

২। এই সভার মতে ভারতীয় রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থায় রাষ্ট্রীয় ভাষা নির্ধারণের চেষ্টা কালোচিত নহে এবং অসমীচীন। ভারতবর্ষে পুরন-স্বরাজ প্রতিষ্ঠিত হইবার পর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত সমগ্র প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিবর্গ কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ভাষা নির্ধারিত হওয়া উচিত।

৩। বর্তমানে যদি রাষ্ট্রভাষা নির্দিষ্ট করিতেই হয়, তবে বঙ্গ-সাহিত্যের সম্পদ ও সমৃদ্ধি এবং ঐ ভাষা বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা দ্বারা প্রভাবান্বিত মনে রাখিয়া বঙ্গভাষাকেই রাষ্ট্রীয় ভাষারূপে নির্ধারণ করা উচিত।

৪। এই সভা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, বঙ্গীয় সাহিত্য-সম্মেলন, মুসলিম সাহিত্য-সম্মেলন, প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য-সম্মেলন ও অন্যান্য বঙ্গ সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানকে এ সম্বন্ধে একযোগে কার্য করিবার জন্য অনুরোধ ও আহবান করিতেছেন।

৫। উপরোক্ত প্রস্তাবগুলি কার্যে পরিণত করবার জন্য যথোচিত ব্যবস্থা করিবার ভার নিম্নলিখিত ভদ্রলোকদিগকে লইয়া গঠিত কমিটির উপর অর্পণ করা হইল। কমিটি প্রয়োজনমত সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করিতে পারিবেনঃ

                       সভাপতি শ্রীযুক্ত হিরেন্দ্রনাথ দত্ত। আহ্বানকারী শ্রীযুক্ত জ্যোতিশচন্দ্র ঘোষ। সভ্যঃ শ্রীযুক্ত অতুলচন্দ্র   গুপ্ত,  শ্রীযুক্ত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শ্রীযুক্ত খগেন্দ্রনাথ মিত্র, শ্রীযুক্তা  অনুরূপা দেবী, শ্রীমতী কল্যাণী মল্লিক, শ্রীযুক্ত প্রফুল্লকুমার সরকার, পন্ডিত অমূল্যচরণ 

বিদ্যাভূষণ, শ্রীযুক্ত উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রীযুক্ত অর্ধেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রীযুক্ত মন্মাথ নাথ বসু ও শ্রীযুক্ত শৈলেন্দ্র কৃষ্ণ লাহা প্রমুখ।

    বাংলার রাষ্ট্রভাষা হইবার সম্ভাবনা সম্বন্ধে বক্তাদের মধ্যে একমাত্র অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়  সন্দেহ প্রকাশ করেন। এইজন্য তাঁহার বক্তৃতার তাৎপর্য নীচে দেওয়া হইলঃ

    “ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করিবার সম্ভাবনা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, সাহিত্যের গৌরব থাকিলেই ভাষার প্রসার হয় না। ইংরেজ জাতির আত্মপ্রসারের শক্তির ফলে ইংরেজ ভাষা প্রসার হইয়াছে। কয়লাওয়ালা, চাউলওয়ালা, মুদী দারোয়ান প্রভৃতি নিম্নশ্রেণীর লোকের কথাবার্তার ভিতর দিয়া হিন্দী ভাষার প্রসার ঘটিয়াছে। কিন্তু কংগ্রেস উহাকে রাষ্ট্রভাষা করিতে সাহসী নহে। কারণ মুসলমানেরা কিছুতেই উর্দু ছাড়িবে না। সেই জন্য হিন্দুস্তানীর সৃষ্টি হইয়াছে। হিন্দুস্তানী একাডেমী ও পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেষ্টায় অদ্ভুত হিন্দুস্তানী সৃষ্টি হইতেছে। তাহারা জোড়া জোড়া শব্দ ব্যবহার করিতেছে- একটি হিন্দী ও আর একটি উর্দু শব্দ। ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটির শেষে ‘নৈতিক’ শব্দের পরিবর্তে উর্দু ‘কৌম’ শব্দ দিয়া তাহারা হিন্দুস্তানী ‘অন্তরাকৌম’ শব্দের সৃষ্টি করিয়াছে। এই ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা হওয়ার সম্পূর্ণ অযোগ্য। বক্তা মনে করেন যে, বাঙ্গালীদের এই সকল গোলমালে গিয়া কাজ নাই। কিন্তু যুক্ত প্রদেশ ও বিহারে বাংলা ভাষাকে দাবাইয়া রাখিবার যে চেষ্টা চলিয়াছে তাহার প্রতিবাদস্বরূপ বাংলাদেশেও হিন্দুস্তানী চালু করিবার চেষ্টায় আপত্তি হওয়া উচিত। ডঃ চট্টোপাধ্যায় আরও বলেন যে, গয়ার ভাষা ও মৈথিলীর ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার অনেক মিল আছে। কিন্তু লিখিবার সময় সেখানকার হিন্দুরা হিন্দী ও মুসলমানেরা উর্দু ভাষা ব্যবহার করে। প্রকৃতপক্ষে উর্দু ও হিন্দী ভাষা ছাড়া ভারতের সব ভাষার গতি ও প্রকৃতি এক। কারণ গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী প্রদেশ হইতে যে ভাষার সৃষ্টি হইয়াছে তাহাই ভারতের সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে।”

     বাংলার স্বাতন্ত্র্যের এই ধ্যান-ধারনার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি গঠিত হয়েছিল। রেনেসাঁ আন্দোলনের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও চারিত্র্য সম্পর্কে ১৯৪২ সালে বলা হয়েছিলঃ

      “পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি চায় পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীর বুদ্ধির মুক্তি তার চিন্তারাজ্যে অরাজকতার অবসান১ আপনারা নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না যে, বুদ্ধির মুক্তি না ঘটলে ও চিন্তারাজ্যের অরাজকতার অবসান না হলে, মানে আভ্যন্তরীণ মুক্তি না ঘটলে কোন জাতির বহিরাঙ্গিক মুক্তিও সাধিত হয় না। তাই পূর্ব পাকিস্তানের বহিরাঙ্গিক মুক্তি, মানে রাজনৈতিক আজাদী সত্যিকারভাবে আসতে পারে না। ততক্ষণ, যতক্ষণ না তার অধিবাসীর মনের মুক্তি, মানে চিন্তারাজ্যের অরাজকতা দূর হচ্ছে।

      আমাদের সোসাইটি জাতির এই মনের মুক্তি আনবারই সাধনা করছে। এই যে মনের মুক্তি, এ হচ্ছে রেনেসাঁর ব্যাপার। জাতির চিন্তারাজ্যে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সংঘটনের নাম রেনেসাঁ। অতীতে প্রত্যাবর্তনের নাম রেনেসাঁ নয়, আবার অতীতকে সমূলে বর্জন করার কল্পনাও রেনেসাঁর নেই। অতীতের যা ভালো ও স্থায়ী তাই নিঃসন্দেহে রেনেসাঁর ভিত্তিভূমি। অতীতের এই ভিত্তিভূমির উপরে দাঁড়িয়ে বর্তমানের অভিজ্ঞতার আলোকে রেনেসাঁ ভবিষ্যতকে বরন করে। তাই রেনেসাঁ চিন্তারাজ্যের বিপ্লব। আমরা পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অধিবাসীর চিন্তারাজ্যে এই বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনই চাই। তাই আমাদের সঙ্ঘের নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’। জাতির রাজনৈতিক মুক্তির সর্বাঙ্গীণ জাতীয় আজাদী নয়। কাজেই জাতির রাজনৈতিক মনের মুক্তি বিজ্ঞানসম্মত পন্থা-নির্দেশই রেনেসাঁর একমাত্র কাজ নয়। তামদ্দুনিক, সাহিত্যিক, আর্থিক, শৈক্ষিক মুক্তি না ঘটলে শুধু রাজনৈতিক আজাদী লাভ করে কোনো জাতি সত্যিকার আজাদী লাভের অধিকারী হয় না। রেনেসাঁ

 

১ বিভাগ পূর্ব কালেই ধরে নেওয়া হয়েছিল যে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ‘পূর্ব পাকিস্তান হবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সত্তা ও স্বাধীন সার্বভৌম অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত  হয়েছে।

তাই সাহিত্য, তমদ্দুন, শিক্ষা, অর্থনীতি, শিল্প প্রভৃতি সম্পর্কেও জাতিকে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করে।… পলাশীর বিপর্যয়ের পরে ভারতের এই পূর্বাঞ্চলে অধিবাসীদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা এ যাবত ভুল পথেই প্রবাহিত হয়ে এসেছে। প্রথমে আমরা অতীতে প্রত্যাবর্তনের উৎকট প্রয়াস করেছিলাম। আমাদের সে চেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ অতীতে প্রত্যাবর্তনের বাণী সত্যিকার আজাদীর কথা- রেনেসাঁর নয়। সে ব্যর্থতার পরে আমরা গ্রহণ করেছিলাম অনুকরণের পথ। পরের দেখানো পথে আজাদী মেলে না। আমরা ভুল পথে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। এই সব ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা জাতিকে দিয়েছে সত্যিকার পথের সন্ধান। জাতির চিত্তলোক ফুঁড়ে উত্থিত হয়েছে পাকিস্তানের বাণী। একমুহুর্তে জাতি আপন স্বচ্ছতা ফিরে পেয়েছে- পুরানুকরনের আলেয়ার পশ্চাদ্ধাবন ত্যাগ করে সে স্বকীয়তাকে বরণ করেছে। সাহিত্যেও প্রায় একই ব্যাপার অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিজস্ব পুঁথি সাহিত্য ও লোক-সাহিত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে আমরা অতীতমুখী হয়ে কিছু দিন বিজাতীয় উর্দু ভাষার মোহে কাটিয়েছি। তারপর শুরু হ’ল অনুকরণের পালা। সে অদ্ভুত কসরৎ এখনো চলছে। তবে সে কসরতের হাস্যকরতার উপলব্ধি ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে হচ্ছে। পুরব-পাকিস্তান রেনেসাঁ-সোসাইটি আমাদের সাহিত্যে স্বচ্ছতা ও স্বকীয়তা আসবে না- কারণ ওটা অতীতে প্রত্যাবর্তনের কথা-রেনেসাঁর কথা নয়। তবে পুঁথি ও লোক-সাহিত্যের ভিত্তিতে আমাদের সাহিত্যকে দাঁড় করাতে হবে নিশ্চয়ই। সে ভিত্তির উপর বর্তমানের ব্যর্থ সাহিত্য কসরতের অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতের প্রয়োজনে আমাদের ভাবী সাহিত্যের সৌধ রচনা করতে হবে। তমদ্দুন, শিক্ষা, ইতিহাস, অর্থনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রেও (সাবেক) পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীর স্বকীয় বিশিষ্টতাকে খুঁজে বার করতে হবে- তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পলাশীর বিপর্যয়ের জাতি হিসাবে জীবন্মৃত হয়ে পড়ার ফলে আমরা আত্মবিস্মৃত হয়েছিল। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম আমাদের গৌরবময় অতীতের ইতিহাস, ভুলে গিয়েছিলাম আমাদের তমদ্দুনিক বৈশিষ্ট্যের কথা, ভুলেছিলাম আমাদের শিক্ষানীতির গণতান্ত্রিক এবং অর্থনীতি সমাজতান্ত্রিক ভিত্তির বিশিষ্টতার কথা। এসব ক্ষেত্রেও আমরা স্বকীয়তা হারিয়ে অনুকরণের বাঁদরে পরিণত হয়েছিলাম। কাজেই রেনেসাঁর সোনার কাটির স্পর্শে আমাদের এ বাঁদরত্ব ঘোচাতে হবে।”

          [আবুল কালাম শামসুদ্দীন, রেনেসাঁ সম্মেলনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির ভাষণ,মাসিক মোহাম্মদী, শ্রাবণ ও ভাদ্র, ১৩৫১।]

       দেশ বিভাগ ও সাবেক পাকিস্তান প্রতিষ্টার অনেক আগেই ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র উদ্যোগে আয়োজিত ১৩৫১ সালে কলিকাতায় অনুষ্ঠিত রেনেসাঁ-সম্মেলনে মূল সভাপতির অভিভাষণ দিতে গিয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ স্পষ্টতই বলেছিলেনঃ

      “রাজনীতিকের বিচার (সাবেক) ‘পাকিস্তানের’ অর্থ যাই হোক না কেন সাহিত্যের কাছে তার অর্থ তমদ্দুনী আজাদী, সাংস্কৃতিক স্বরাজ, কালচারে অটনমী। রাজনৈতিক আজাদী ছাড়া কোনো জাতি বাঁচতে পারে কিনা সে প্রশ্নের জবাব পাবেন আপনারা রাষ্ট্র নেতাদের কাছে। আমরা সাহিত্যিকরা শুধু এই কথাটাই বলতে পারি যে, তমদ্দুনী আজাদী ছাড়া কোনো সাহিত্য-বাঁচানো পরের কথা- জন্মাতেই পারে না। -পাকিস্তান (সাবেক) ও একটা বিপ্লব। এ বিপ্লব আনতে হলে সাহিত্যের ভিতর দিয়েই তা করতে হবে। কিন্তু কোথায় পাকিস্তানের সাহিত্য? (সাবেক) পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলা ও আসামের সাহিত্য বলতে আমরা যা বুঝি, তা বিদ্যাসাগর- বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্র যুগের সাহিত্যিকদের সাহিত্য। এটা খুবই উন্নত সাহিত্য। বিশেষতঃ রবীন্দ্রনাথ এ সাহিত্যকে বিশ্ব-সাহিত্যের দরবারে স্থান দিয়ে গিয়েছিলেন। তবুও এ-সাহিত্য পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য নয়। এ সাহিত্যে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোনো দান নেই। শুধু তা নয়, মুসলমানদের প্রতিও এ-সাহিত্যের কোনো দান নেই। অর্থাৎ এ সাহিত্য থেকে মুসলিম সমাজ-প্রাণ প্রেরণা পায়নি এবং পাচ্ছে না। এর কারণ

 

 

২ ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব ও তৎকালীন ‘পাকিস্তান পরিকল্পনা’ অনুযায়ী ‘পূর্ব পাকিস্তান’ স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে, এটাই ছিল নিশ্চিত।

আছে। সে কারণ এই যে, এ সাহিত্যের স্রষ্টাও মুসলমান নয়; এর স্পিরিটও মুসলমানী নয়; এর ভাষাও মুসলমানের নয়। প্রথমঃ এ-সাহিত্যের স্পিরিটের কথাই ধরা যাক। এ-সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। ঠিকই তাঁরা করেছেন। নইলে ওটা জীবন্ত সাহিত্য হতো না- কিন্তু সত্যি কথা এই যে, এই সাহিত্যকে মুসলমানেরা জাতীয় সাহিত্য মনে করে না। কারণ, ত্যাগ বৈরাগ্য ভক্তিপ্রেম যত উঁচুদরের আর্দশ হোক, মুসলমানদের জীবনার্দশ তা নয়। -সাহিত্যের স্পিরিটের সম্বন্ধে যা বলেছি, বিষয়বস্তু সম্বন্ধেও তাই বলতে হয়। সাহিত্যের নায়ক-নায়িকা যদি আমরা না হলাম, সাহিত্যের পটভূমি যদি আমার কর্মভূমি না হলো, সাহিত্যের বাণী যদি আমার মর্মবাণী না হলো তবে সে সাহিত্য আমার সাহিত্য হয় কিরুপে? আমার ঐতিহ্য আমার ইতিহাস আমার ইতিকথা এবং আমার উপকথা যে সাহিত্যের উৎস নয়, সে-সাহিত্য আমার জীবন-উৎস হবে কেমন করে?… সব জাতীয় চেতনাই তার ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে। যতদিন সে ঐতিহ্যকে বুনিয়াদ করে সাহিত্য রচিত না হবে, ততদিন সে-সাহিত্য থেকে কোনো জাতি প্রেরণা পাবে না। একটা অতি আধুনিক নজীর দিচ্ছি। ইংরেজ সাহিত্য খুবই উন্নত ও সম্পদশালী সাহিত্য। ওটা মিলটন, শেক্সপিয়র, স্কট, শেলীর সাহিত্য। কিন্তু অত বড় সাহিত্যও আইরিশ জাতির প্রেরণা জাগাতে পারেনি। সুইফট, বার্কলে, গোল্ড স্মিথ ও বার্নার্ডশ’র মত অনেক আইরিশ এই ইংরেজী সাহিত্যের সেবা করেছেন, বিশ্বজোড়া নামও করেছেন। কিন্তু তাদের সাহিত্যসেবা হয়েছে লন্ডনে বসে- আয়র্লন্ডের মাটিতে নয়। – আয়র্লন্ডবাসীর জাতীয় জীবনে সে সাহিত্য কোন স্পন্দন সৃষ্টিও করতে পারেনি । তাই পার্নলে, ড্যাভিট, রেড-মন্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রনেতার বিপুল ত্যাগ, কঠোর সাধনা কিছুই আইরিশ জাতির মুক্তির আন্দোলন সফল করতে পারেনি। অথচ যেদিন – আয়র্লন্ডের জাতীয় কবি ডব্লিউ বি, ইয়েটস ইংরেজী প্রভাবমুক্ত স্বাধীন আইরিশ সাহিত্য সৃষ্টি করলেন, ইংরেজী কালচারের অনুকরণমুক্ত করে তিনি যেদিন আইরিশ সাহিত্যসাধনাকে কেলটিক সংস্কৃতির বুনিয়াদে নিজস্ব রুপদান করলেন, সেদিন আইরিশ গণ-মন নিজের হারানো ধন ফিরে পেল; নবজন্মের আনন্দে সে মেতে উঠলো; নিজের ভাগ্য-নির্মাণে সে কর্মোন্মত্ত হয়ে গেল, তার ফল এই হল যে, আইরিশ জাতির দু’শো বছরের ব্যর্থ স্বাধীনতা আন্দোলন ডিভেলেরার নেতৃত্বে কুড়ি বছরে জয়যুক্ত হলো।”