প্রতিবেদনঃ মোহাম্মদ মোদাব্বের

Posted on Posted in 9

<৯, ১৬, ৪৫৯-৪৬৪>

কাদের বাহিনী সম্পর্কিত আরো বিবরণ-৩

(কাদেরিয়া বাহিনীর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে এই বিবরণ গৃহীত হয়েছে মোহাম্মদ মোদাব্বের রচিত ও শিরিন প্রেস, ঢাকা থেকে প্রকাশিত “মুক্তি সংগ্রামে বাঘা সিদ্দিকী” (১৬ ডিসেম্বর ১৯৭৩) গ্রন্থ থেকে। কাদের বাহিনী সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যের জন্য গ্রন্থটি দ্রষ্টব্য)

 

১৪ ই মে বহেরাতৈল গ্রামে মুক্তিবাহিনীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর কয়েকজন প্রতিভাবান দেশভক্ত ছাত্র কাদের সিদ্দিকীর সাথে এসে যোগ দিলেন এবং দেশমাতৃকার মুক্তি সাধনে জীবন গঠন করার শপথ নিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল আলম শহীদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের শেষ পর্বের ছাত্র নূরুন্নবী, টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এনায়েত করিম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম। রঞ্জু, মুসা ও ফজলু নামক তিনজন ছাত্রও এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। অছাত্রদের মধ্যে সামরিক বাহিনী থেকে দলত্যাগী ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান এবং লোকমান, গফুর, লাবিবুর রহমান, লাল্টু ও সরওয়ার মুক্তি সংগ্রামে যোগদান করে। লাবিবুর রহমান পরে এক সম্মুখ সংঘর্ষে শাহাদাৎ বরণ করেন।

 

প্রকৃতপক্ষে চারান সংঘর্ষ সাফল্যের পর দেশবাসির মনে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হল। ব্যাপকভাবে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে আমাদের জয় যে সুনিশ্চিত, এ কথা দেশের তরুণদের মধ্যে প্রত্যয় সৃষ্টি করলো। তাই দলে দলে তরুণ, যুবক ও ছাত্ররা কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য পাহাড় এলাকায় মুক্তিবাহিনী ঘাঁটির তল্লাসে বেড়িয়ে পড়লো। যথারীতি পরীক্ষার পর তাদের মুক্তি বাহিনীতে ভর্তি করা হলো। ..

 

মুক্তিবাহিনীর সদর দফতরসহ মুক্ত এলাকা ছিল উত্তরে মধুপুর ময়মনসিংহ সড়কের দক্ষিন থেকে কালিয়াকৈর-এর উত্তর পর্যন্ত ৫০ মাইল জঙ্গল এলাকা, পূর্বে ভালুকা, গফরগাঁও ও শ্রীপুর। পশ্চিমে টাঙ্গাইল মধুপুর সড়ক ৩০ মাইল। অর্থাৎ এই ১৫০০ বর্গমাইল এলাকা কাদেরিয়া বাহিনীর করায়ত্ত নিরাপদ ছিল। এই অঞ্চল রক্ষার জন্য প্রাণপণ সংগ্রাম করতে হবে, সে জন্য এই এলাকাকে এক শক্তিশালী বৃত্তাকারে প্রতিষ্ঠিত রক্ষাব্যূহ দ্বারা পরিবেষ্টিত করা প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে অধিনায়ক সিদ্দিকী বিচক্ষন সেনানয়কের ন্যায় নিন্মলিখিতভাবে ঘাঁটি পত্তন করলেন এক একজন দক্ষ নায়কের অধীনেঃ-

 

১। বহেরা ৪ নং কোম্পানী। অধিনায়ক ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান, সহকারী গোলাম মোস্তফা।

২। মরিচা – নং কোম্পানী। কমান্ডার নবী নেওয়াজ খান।

৩। দেওয়াপাড়া ১ নং কোম্পানী। কমান্ডার লোকমান হোসেন।

৪। রাঙ্গামাটি ১ নং (কো) কোম্পানী। কমান্ডার আবদুল হাকিম।

৫। আসিম ১১ নং কোম্পানী। কমান্ডার লালু, সহকারী সারোয়ার হোসেন।

৬। রাঙ্গামাটি ১২ নং কোম্পানী। কমান্ডার মুনির হোসেন।

৭। ভালুকা- শ্রীপুর ৬ নং কোম্পানী। কমান্ডার আফসারুদ্দিন আহম্মদ।

৮। হতেয়া ১২ নং কোম্পানী। কমান্ডার হাবিবুর রহমান, সহকারী ইউনুস আলী।

৯। পাথারঘাটা ৩ নং কোম্পানী। কমান্ডার মোকাদ্দেস আলী খান। সহকারী মতিউর রহমান।

 

সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি মুক্তাঞ্চল গড়ে ওঠে টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ সড়কের পশ্চিম দিক থেকে যমুনার পার পর্যন্ত বিরাট চরভর এলাকা, উত্তরে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট থেকে দক্ষিণে নাগরপুর পর্যন্ত ধলেশ্বরী যমুনার চরঅঞ্চল মিলে গড়ে ওঠে এই মুক্ত এলাকা। এই অঞ্চলের আঞ্চলিক সদর হল ভূয়াপুর থানায়।

 

এই নতুন মুক্তাঞ্চলের জন্য নিন্মরূপে তিন কোম্পানী মুক্তিযোদ্ধা স্থায়ীভাবে মোতায়েন করা হয়।

১ নং (খ) কোম্পানী-নায়ক- আবদুল গফুর।

১ নং (গ) কোম্পানী- নায়ক- খুরশিদ আলম।

 

বাঘা কোম্পানী     নায়ক হাবিবুর রহমান। এই বাঘা কোম্পানীর উপর বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয় নদী পথ পাহারা দেওয়ার। ছোট ছোট টাপুরে নৌকা সব সময়ে প্রস্তুত রাখা হত নদীতে টহল দেওয়া ও দুশমনের লঞ্চ ও গানবোট এ্যামবুশ করার জন্য।

 

এ সব কোম্পানী ছাড়া রেজাউল কোম্পানী, হুমায়ন কোম্পানী, বেনু কোম্পানী, আমানুল্লাহ কোম্পানী প্রভৃতি ছোট ছোট মুক্তিসেনা দল এই অঞ্চলে অভিযান চালাতো।

 

’৭১ সালের ৭ই জুলাইয়ের মধ্যে মুক্তাঞ্চলের চারিদিকে এই দুর্ভেদ্য ঘাঁটি স্থাপন শেষ হলো। বাঘা সিদ্দিকী প্রতিদিন এক ঘাঁটি থেকে অন্য ঘাঁটিতে ঘুরে ঘুরে বীর সৈনিকদের নিয়ম শৃঙ্খলা ও কর্তব্য নিষ্ঠা পরীক্ষা করে ফিরতে লাগলেন। তার সঙ্গে রাখলেন ৩০/৩৫ জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। এঁরা রণকৌশল অতি নিপুণভাবে আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। যখনই কোন অঞ্চলে যুদ্ধ লেগেছে, এই দল উল্কার মতো ছুটে গিয়েছে এবং যুদ্ধরত স্থানীয় সেনাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। সেজন্য বাঘা সিদ্দিকী এই দলটিকে বলা হতো ফাইটিং প্লাটুন বা লড়ুয়ে দল।

 

গ্রেনেড পার্টি বা সুসাইড স্কোয়াডঃ মুক্তিযুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে গ্রেনেড বা হাতবোমা নিক্ষেপকারী দল। এরা হানাদার সেনাদের আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কাদেরিয়া বাহিনীতে এই রকম গ্রেনেড নিক্ষেপকারীদের শক্তিশালী দল গড়ে তোলা হয়। এদের বলা হত সুসাইড স্কোয়াড যাকে যুদ্ধের পরিভাষায় বলা হয় জানবাজ। জীবনকে বাজি রেখে এরা জীবনের সন্ধান দেয়। এই শাখায় যারা বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় রেখেছেন তাঁদের মধ্যে বাকু সালাহউদ্দিন (শহীদ), আবুল কালাম ও মিনুর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

 

সদর দফতরঃ মুক্তিবাহিনীর হেড কোয়ার্টার বা সদর দফতরের অবস্থান ও কার্যপ্রণালী বিবৃত করা প্রয়োজন। শালগজারী আবৃত গভীর জঙ্গলের মধ্যে এই সদর দফতর স্থাপন করা হয়। এই দফতরটির পাঁচটি বিভাগ, যথা-

(১) অস্ত্রাগার

(২) বেসামরিক দফতর

(৩) বেতার যোগাযোগ ও টেলিফোন

(৪) হাসপাতাল ও

(৫) জেলখানা।

 

সদর দফতরের আবাসিক অধিনায়ক হলেন আনোয়ারুল আলম শহীদ। অস্ত্রাগার বেতার যোগাযোগ ও টেলিফোন দফতরটি কড়া প্রহরাধীনে রাখা হয়। এগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর। স্বয়ং অধিনায়ক সিদ্দিকীর অনুমোদন ব্যতীত অন্য কারো এই দফতরে প্রবেশের অধিকার ছিল না। গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক মাইল এলাকা জুড়ে এই সব দফতর স্থাপন করা হয়। প্রত্যেকটি বিভাগই টেলিফোন দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত করা হয়।

 

সদর দফতরের অন্তর্ভুক্ত করা হয় ট্রেনিং ক্যাম্প বা শিক্ষা শিবির ও ট্রানজিট ক্যাম্প। ট্রেনিং ক্যাম্পটি খোলা হয় সখীপুর থেকে দুই মাইল উত্তরে আন্দি নামক স্থানে। এই স্থানটিও ছিল গভীর জঙ্গলের মধ্যে। তিন একর পরিমাণ জমির উপর টিনের ছাপড়া ঘর তুলে মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। জঙ্গল গাছপালার ডালপাতা টিনের ছাদের উপর স্বাভাবিক আচ্ছাদন সৃষ্টি করেছিল। ফলে পৃথক ছদ্মাবরণের প্রয়োজন হয়নি। দুশমনের বিমান কখনো এই অঞ্চলের সন্ধান পায়নি। শিবির এলাকায় কুপ খনন করে পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়। সর্বাধিক সিদ্দিকীর অনুপস্থিতিতে রিক্রুটিং অফিসার খোরশেদ আলম নতুন লোক ভর্তি করতেন। রেশন সরবরাহের দায়িত্ব তাঁর উপর দেওয়া হয়। সদর দফতরের পাঁচ বর্গমাইল এলাকা বাঘা সিদ্দিকীর নির্দেশে সংরক্ষিত এলাকা বলে গণ্য হতো।

 

বেসামরিক দফতরঃ এই দফতরের অধিনায়ক আনোয়ারুল আলম শহীদ তাঁর দফতর স্থাপন করেন মহানন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। সংরক্ষিত এলাকার বাইরে এই দফতর স্থাপন করার কারণ হলো, জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। এটাই এদের অন্যতম কর্তব্য। সংরক্ষিত এলাকায় থেকে এটা সম্ভব নয়। শহীদ সাহেব তার দফতরের কাজ ভাগ করে কয়েকজনের উপর ন্যস্ত করেন। অর্থ ও হিসাব বিভাগের ভার পেলেন আনোয়ার হোসেন। ইনি বেঙ্গল রেজিমেন্টের নন কমিশনড অফিসার ছিলেন। হিসাব সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রচুর অভিজ্ঞতার অধিকারী এই হোসেন সাহেব অতি দক্ষতার সঙ্গে অর্থ সংরক্ষণ ও ব্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের জন্য সাহায্য ও দালালদের জরিমানার মাধ্যমে যে অর্থ পাওয়া যেত তার সবটাই প্রথমে সদর দফতরে পাঠানো হতো। বাঘা সিদ্দিকীর অনুমোদনক্রমে এই অর্থই পরে বিভিন্ন কোম্পানীর জন্য বরাদ্দ করা হতো। শাসন বিভাগের অন্যান্য কাজের জন্যও এই অর্থ বরাদ্দ দেয়া হতো। দখল আমলের নয় মাসে যে অর্থ আয় হয়েছে এবং বিভিন্ন কাজে ব্যয় হয়েছে তার প্রতিটি কপর্দকের হিসেব নিখুঁতভাবে রক্ষা করায় মুজিবনগরে তাঁর কাজ প্রশংসিত হয়েছে। আনোয়ারুল আলম শহীদ মুজিবনগরের বাংলাদেশ সরকারের নিকট যখন আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব দাখিল করেন তখন তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে বলেছিলেন, তোমাদের এই কাজে আমি মুগ্ধ হয়েছি। একদিকে রক্তক্ষয়ী যদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, অপরদিকে পাই পয়সার হিসেব রাখা অসম্ভব ব্যাপার। তোমরা এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছো।

 

স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীঃ সদর দফতরে এই বাহিনীর বিভাগীয় অধিকর্তা নিযুক্ত হন। প্রাক্তন ছাত্রনেতা সোহরাব আলী খান আরজু। একে সহায়তা করেন দাউদ খান, আলী হোসেন, আবদুল লতিফ ও অধ্যাপক আতোয়ার কাজী।

 

খাদ্য দফতরঃ খাদ্য দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হয় পাহাড়িয়া অঞ্চলের ছেলে করটিয়া সাদত কলেজের ছাত্র ওসমান গনির উপর। সদর দফতরের সকলের খাদ্য সরবরাহ করতেন ইনি। মুক্তিবাহিনীর খাদ্যসামগ্রী পূর্বাঞ্চলীয় মুক্ত এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হতো এবং তা গনির ভান্ডারে জমা থাকত। গনির বড় ভাই আলী এই খাদ্য সংগ্রহের ব্যাপারে খুবই সাহায্য করেছেন।

 

ইনটেলিজেন্স বিভাগঃ এই বিভাগ এক কথায় গোয়েন্দা বিভাগ বলা যায়। নুরুন্নবী ও হামিদুল হকের উপর এই অতি প্রয়োজনীয় ও গুরুতবপূর্ণ বিভাগের কাজ দেওয়া হয়। এই বিভাগের কাজ দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-

 

(১) দুশমনের সম্পর্কে তথ্য, পাকবাহিনীর গতিবিধি ও তাদের শক্তি, অবস্থান এবং বাঙালি রাজাকার প্রভৃতি স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সংবাদ সংগ্রহ।

(২) মুক্তিবাহিনীর কেউ কোন অন্যায় কাজ করে কিনা। দলীয় ঐক্য ও শৃঙ্খলা নষ্ট হয় এমন কোন কাজ করে কিনা, অধিনায়কের নির্দেশ অমান্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিনা, সে সবের বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ সংগ্রহ করা।

 

নুরুন্নবী ও হামিদুল হক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এই বিভাগে বাছাই করে লোক ভর্তি করেন। অচিরে এটি একটি শক্তিশালী বিভাগরুপে গড়ে ওঠে। অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে প্রত্যেক কোম্পানীতে একজন করে গোয়েন্দা নিয়োগ করা হয়। যেমন ৪ নং কোম্পানীতে গোয়েন্দা অফিসার হিসাবে ঢুকে পড়লেন জনাব নজরুল ইসলাম। তিনি পূর্বে একজন ব্যবসায়ী ছিলেন।

 

শত্রু কবলিত এলাকায় একটু বেশী বয়সের লোকদের গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ করা হয়। কারণ বেশী বয়সের লোকদের হানাদার বাহিনী একটু কম সন্দেহ করতো। প্রায় তিন গ্রামে একজন করে গোয়েন্দা মোতায়েন করা হয় এবং তারা নিয়মিতভাবে দুশমনের সব সংবাদ যথাস্থানে পৌঁছে দিতো। শুনলে অনেকে আশ্চর্য হবেন যে, শান্তি কমিটির কয়েকজন সদস্য মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দার কর্তব্য সম্পাদন করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, ভূয়াপুর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল বারী তালুকদার মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দার কাজ করেছেন। গোয়েন্দা বিভাগের আর একজন নামকরা অফিসার ছিলেন ছাত্রনেতা সোহরাওয়ার্দী। তিনি পাকবাহিনীর হাতে বন্দী হন। মুক্তিবাহিনী থেকে তার উপর আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের সব সংবাদ মুক্তিবাহিনীর কাছে পাচার করতে থাকেন।

 

বেতার ও টেলিফোন বিভাগঃ এই বিভাগের দায়িত্বে নিযুক্ত হন আবদুল আজিজ বাঙ্গাল। ভূয়াপুর কলেজের ছাত্র ও একজন ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি সুপরিচিত। বেসামরিক দফতর থেকে এক মাইল দূরে গভীর জঙ্গলের মধ্যে ইংরেজ নামক এক কাঠুরিয়ার বাড়ীতে আজিজের টেলিফোন ও বেতার দফতর খোলা হয়। এখান থেকেই সদর দফতরের সকল বিভাগে টেলিফোন যোগাযোগ সাধিত হয়। ফোনের রিসিভার, তার, বেতার ট্রান্সমিটার ও রিসিভার সেটগুলো বিভিন্ন থানা লুট করে সংগ্রহ করা হয়। এই দফতরের সঙ্গে আরো দুটি অঞ্চলের বেতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়- একটি পশ্চিমাঞ্চলে ভূয়াপুরের গ্রাম এলাকায় এবং অপরটি ধলাপাড়ায়। এই দফতরে আজিজের সহকারী হিসাবে কাজ করেন আব্দুল্লাহ, শামসু রশীদ, ইমাম, আবদুল ও হাকিম। কাঠুরিয়া ইংরেজ এই দফতরের বাবুর্চির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

 

অনেক দুঃসাহসিক কাণ্ডকারখানার নায়ক ছিলেন এই দফতরের কর্মীরা। তারা পাক হানাদারদের বেতার যোগাযোগ কেন্দ্রের সঙ্গে অদ্ভূত রকমে যোগাযোগ স্থাপন করে। টাঙ্গাইল অয়ারলেস কেন্দ্রের কয়েকজন অপারেটরকে এরা দলে ভিড়িয়ে ফেলে। এই অপারেটররা সুযোগ পেলেই দুশমনদের সব গোপন খবর মুক্তিবাহিনীর বেতার কেন্দ্রে জানিয়ে দিতো নিজেদের ট্রান্সমিটারের সাহায্যে। বলাবহুল্য, এই সময় খান সেনাদের বেতার যোগাযোগ কেন্দ্রে সর্বদা কড়া প্রহরাধীনে থাকতো। তার মধ্যেই কয়েকজন দেশপ্রেমিক অফিসার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ জানিয়ে দিতেন। এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল বেতার কেন্দ্রের আবদুর রাজ্জাক অভূতপূর্ব দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি প্রায়ই গভীর রাত্রে মুক্তিবাহিনীর বেতার কেন্দ্রের আজিজ বাঙ্গালের সঙ্গে কথা বলতেন। এমনিভাবে মানিকগঞ্জের অপারেটর জিল্লুর রহমান, জামালপুরের মুজিবর রহমান, গোড়াই ক্যাডেট আবু বকর সিদ্দিক এবং সিরাজগঞ্জের একজন অপারেটর নিয়মিতভাবে তাদের ট্রান্সমিটার যন্ত্রের সাহায্যে মুক্তিবাহিনীকে সকল সংবাদ পাচার করতেন।

 

সিগন্যাল বিভাগঃ বেতার যোগাযোগ ও টেলিফোন ছাড়াও বার্তা বিনিময়ের জন্য সদর দফতরে সিগন্যাল বিভাগ খোলা হয়। প্রথমদিকে মুসা ও খালেকের উপর এই বিভাগের ভার দেওয়া হয়। কিছুদিন পরে সদর দফতরে শহীদ সাহেব স্বয়ং এই বিভাগের ভার গ্রহণ করেন। মুসা ও খালেককে অন্য বিভাগে বদলি করা হয়। মুক্তিবাহিনীর মধ্যে থেকে বাছাই করা লোক নিয়ে এই বিভাগে কর্মঠ লোক নিয়োগ করা হয়। এদের কাজ ছিল যে কোন উপায়ে হোক সংবাদ যথাস্থানে পৌঁছে দেয়া এবং সংগ্রহ করা। এ জন্য এরা পায়ে হেঁটে, সাইকেলে, ঘোড়ায় চড়ে, স্পিডবোটে বা নৌকায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতো। শত্রু কবলিত এলাকার মধ্য দিয়ে চলাফেরা করতে হলে এরা সাধারণ পায়ে হেঁটে, সাইকেল অথবা নৌকার সাহায্য নিত।

 

সদর দফতর ছাড়াও প্রতি কোম্পানীতে দুইজন করে সংকেতদানকারী বা সিগন্যালম্যান থাকতো। সদর দফতরের সিগন্যালম্যান আবু হেনা মোস্তফা কামাল (করটিয়া কলেজের ছাত্র) ও আবদুল গণি (কচুয়া হাই স্কুলের ছাত্র) ছিল দক্ষ ঘোড়সওয়ার। ঘোড়ায় চড়ে এরা সংবাদ আদান-প্রদান করতো। এদের কাজ ছিল পূর্বাঞ্চলীয় মুক্ত এলাকার চারিদিকে রক্ষা ঘাঁটির সাথে প্রাত্যহিক যোগাযোগ রক্ষা করা। অপর সিগন্যালম্যান কাসেম সপ্তাহে দুইবার ভূয়াপুর ও সদর দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতো।

 

জেলখানাঃ মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ সংগ্রাম তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাসঘাতক রাজাকার, দালাল ও ধৃত খানসেনাদের রাখার জন্য জেলখানায় প্রয়োজন হয়। এ জন্য বেসামরিক সদর দফতর থেকে এক মাইল দূরে একটি জেলখানা খোলা হয়। এ জন্য একটি বেশ বড় ধরনের বাড়ি নেওয়া হয়। এক প্লাটুন মুক্তিসেনা নিয়োগ করা হল এই জেলখানা পাহারা দেওয়ার জন্য। এই প্লাটুনের কমান্ডার ছিল আনসার। আর জেলার দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা হয় মহু নামক এক দুর্ধর্ষ লোককে।

 

হাসপাতালঃ সামরিক প্রয়োজনে ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্টা অপরিহার্য কর্তব্য। অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ প্রভৃতি সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তাকে যেমন অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাকেও তেমনি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কাজের পরিকল্পনা দিলে তা কার্যকরী করতে মানুষের অভাব হয় না। মুক্তিযুদ্ধে এটা প্রমানিত হয়েছে। বাঘা সিদ্দিকী হাসপাতাল খোলার নির্দেশ দিলেন আর তা কার্যকরী করতে এগিয়ে এলেন কাউলজানির একজন মেডিক্যাল ছাত্র শাহাজাদা চৌধুরী। ইনি ময়মনসিংহ চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের শেষ বর্ষ এমবিবিএস-এর ছাত্র। সিদ্দিকী এই তরুণের উপর হাসপাতাল খোলার গুরুদায়িত্ব দিলেন। সদর দফতরের শিক্ষা শিবিরের কাছে আন্দি নামক স্থানে বড় বড় তিনটি টিনের ছাপড়া ঘর তৈরী হল। রোগীদের জন্য বিছানাপত্র ও খাটিয়া এলো। ডাঃ শাহাজাদার সঙ্গে যোগ দিলেন সখিপুর সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার এবং কম্পাউন্ডার রতন। সব রকমের সক্রিয় সাহায্য দিলেন স্কুল শিক্ষক আমজাদ হোসেন। গোয়েন্দা বিভাগের সহায়তায় ঢাকা থেকে হাসপাতালের জন্য ওষুধ ও অস্ত্রোপাচারের যন্ত্রপাতি আমদানি করা হলো। রোগীদের আরামের জন্য হাসপাতাল বেডের উপর কেরোসিনচালিত দুইটি পাখা টাঙ্গিয়ে দেওয়া হলো। এমনি করে ২০ বিছানার একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হাসপাতাল গড়ে উঠলো। আর রোগীদের সেবার সার্বিক দায়িত্ব নিলেন হামিদ সাহেব। হাসপাতাল ছাড়াও প্রত্যেকটি কোম্পানীতে একজন করে ডাক্তার রাখার ব্যবস্থা করা হয়।

 

সদর দফতরের নিরাপত্তা রক্ষাঃ সদর দফতরের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হলো। নৌবাহিনীর প্রাক্তন সৈনিক খলিলুর রহমানের অধিনায়কত্বে ১৩ নং কোম্পানী ক শাখাকে এই দফতরের তদারকির ভার দেওয়া হয়। সদর দফতরের কাছেই ছিল অধিনায়ক খলিলের বাড়ী। সর্বাধিনায়ক সিদ্দিকীর বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে তার কর্তব্যপরায়নতা ছিল পরীক্ষিত। তার কোম্পানীর একটি প্লাটুনকে সদর দফতরের বেসামরিক বিভাগের রক্ষনায় নিয়োগ করা হয়। এই প্লাটুনের কমান্ডে দেওয়া হয় কালিহাতী ছাত্রলীগের  সভাপতি আবদুর রাজ্জাককে। গভীর জঙ্গলের মধ্যে যে সব বেপরোয়া তরুণ মুক্তিযোদ্ধা আরামকে হারাম করে ও রাতের ঘুম ত্যাগ করে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সদর দফতরের নিরাপত্তা রক্ষা করেছিল তাদের মধ্যে ঢাকা কলেজের সানু, কালিহাতির মান্নান, শহীদ সালু, পাহাড়িয়া উপজাতীয় ছেলে লক্ষন চন্দ্র বর্মণ ও কচুয়ার আবদুল্লাহর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য।