বরিশালের রণাঙ্গন

Posted on Posted in 10
শিরোনামসূত্রতারিখ
১৭। ৯নং সেক্টরে সংঘটিত যুদ্ধের বিবরণমেজর (অবঃ) এম এ জলিল রচিত ‘সীমাহীন সমর’ (১৯৭৪)১৯৭১

প্রতিবেদনঃ মেজর (অবঃ) এম. এ. জলিল
বরিশালের রণাঙ্গন

 

১০ই এপ্রিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বরিশাল, পটুয়াখালি, ফরিদপুর ও খুলনা এই চারটি জেলার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে সেক্টর কমান্ডার ঘোষণা করা হয়। ঘোষণায় আরও উল্লেখ করা হয় যে, যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীফ কর্নেল এম এ জি ওসমানীর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশকে ৬টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। মিঃ তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট করে চার সদস্যের একটি অস্থায়ী সরকার ‘মুজিব নগরে’ গঠন করার কথাও স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে ঘোষণা করা হয়। ব্যাপার যাই হোক না কেন, এই ঘোষণার ফলে বাংলার জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য অন্ততঃ একটা ভিত খুঁজে পেল। শুরু হল পাকিস্তানী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ। ইতিমধ্যে ১৭ই এপ্রিল একজন পাকিস্তানী গোয়েন্দা বরিশালে গ্রেফতার হয়। আমাদের অবস্থানগুলো ও প্রস্তুতির খবরাখবর সংগ্রহ করার জন্য পাক-সামরিক বাহিনীর লেঃ কর্নেল শামস উক্ত গোয়েন্দাকে খুলনা থেকে বরিশালে পাঠায়। উক্ত গোয়েন্দাকে যে পুরস্কার দিতে পেরেছিলাম সেটা হলো কঠিন মৃত্যু। বরিশাল স্টেডিয়ামে জনতার সামনে প্রকাশ্যে তাকে গুলি করে হত্যা করা হল। তার অপরাধ ছিল ক্ষমার অযোগ্য।

বোধ হয় ১৭ই এপ্রিলের ঘটনার ফলশ্রুতিস্বরুপ পাক-বিমান বাহিনীর দু’খানা স্যাবর-জেট ফাইটারকে বরিশালের আকাশ দেখা গেল। এই প্রথমবারের মতো হিংস্র সামরিক জান্তা আমাদের যুদ্ধ প্রস্তুতির উপর আঘাত আনার সাহস পেল। ওই জঙ্গী বিমানগুলোকে ঠেকাবার মতো আমাদের হাতে অনেক কিছু ছিল না। তবুও আমাদের সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা সামান্য রাইফেল দিয়ে গুলি করার অনেক চেষ্টা করলো। শহরের বিভিন্ন বেসামরিক অবস্থানের ওপর নির্বিচারে গোলাবর্ষণ করলো। বেলস পার্কের উত্তর দিকে ইংরেজ আমলের একটি উঁচু কাঠের ঘরে হেডকোয়ার্টার। এই ঘর ও বেলস পার্কের উপর প্রচণ্ড গোলা এসে পরতে লাগলো। এই পার্কের মধ্যেই ছেলেরা ট্রেনিং নিত। ছেলেরা ট্রেঞ্চের ভিতরে ঢুকে আত্মরক্ষা করলো। দু’একটি ছোটখাট আঘাত ছাড়া আমাদের তেমন বিশেষ কোন ক্ষতি হয়নি। জঙ্গি বিমান দুটো যখন ঘুরপাক খেয়ে গুলিবর্ষণ করার জন্য নিচে নেমে আসে তখন বেসামরিক লোকজন বাইরে লাফিয়ে এসে মজা দেখতে থাকে। এই সরল মানুষগুলো এর আগে কখনও ভাবতে পারেনি যে, ওই সুন্দর সুন্দর বিমানগুলো এমন নির্মমভাবে দংশন করতে পারে। অজ্ঞতা ও সরলতার জন্য ওরা অনেক ভুগছে। বেসামরিক ডাক্তাররা ভয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে লাগলো। মুহূর্তের ভেতরে গ্রামের দিকে ছুটে চললো মানুষের কাফেলা। ভয়ে সব ফেলে শহর খালি করে উন্মাদের মত দৌড়াতে লাগলো শহরতলীর দিকে। কি মর্মান্তিক দৃশ্য।

১৮ই এপ্রিল রাত্রে বিষাদের কালোছায়া শহরের সারা আকাশটা গুমোট করে ফেললো। শহরের রাস্তাগুলো জনমানবশূন্য। ভীষণ নীরব। কোথাও জীবনের স্পন্দন নেই। যেন ঘুমন্ত প্রেতপুরী। রাতে ভয়ানক অস্বস্তিবোধ করলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটা বেশ বড় বাহিনী তৈরি করলাম। কিন্তু সামান্য কিছু রাইফেল জোগাড় করেছিলাম। এসব হালকা অস্ত্র দিয়ে শুধু আত্মরক্ষা করা চলে। যা হোক, এপ্রিল মাসের ২২ তারিখে মিঃ মঞ্জু সুন্দরবনের গোপন পথ দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভারত হতে কিছু অস্ত্রপাতি নিয়ে এলেন। তিনি জানালেন যে, আরো ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাকে গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছ থেকে ওগুলো নিয়ে আসতে হবে। সংবাদটা শুনে খুবই উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। এই সুযোগে সুন্দরবন, বঙ্গোপসাগর হয়ে ভারত থেকে অস্ত্র নিয়ে আসা সম্ভব হবে। এই দুর্যোগময় মুহূর্তেও আমার ছোট্ট মনটি অপার উৎসাহে চোখ ফাঁকি দিয়ে অস্ত্র নিয়ে আসবো। লেফটেন্যান্ট মেহেদী, লেঃ জিয়া এবং লেঃ নাসেরকে যথাক্রমে পটুয়াখালী, বরিশাল ও খুলনায় যুদ্ধ চালিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়ে ক্যাপ্টেন হুদাকে সাথে নিয়ে ভারত রওনা হলাম।