বাংলাদেশের অবস্থা ব্যাখ্যা করে বিশ্ব বুদ্ধিজীবি মহলের প্রতি বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের আবেদন

Posted on Posted in 4

<৪,২৪৫,৫৫২-৫৫৪>

অনুবাদকঃ পল্লব দাস

শিরোনামসূত্রতারিখ
২৪৫। বাংলাদেশের অবস্থা ব্যাখ্যা করে বিশ্ব বুদ্ধিজীবি মহলের প্রতি বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের আবেদনবাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ।১৯৭১

 

বাংলাদেশের অবস্থা ব্যাখ্যা করে বিশ্ব বুদ্ধিজীবি  মহলের প্রতি বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের আবেদন

বাংলাদেশের যেসব বাস্তুচ্যুত শিক্ষক, বিজ্ঞানী, কবি, চিত্রশিল্পী, লেখক, সাংবাদিক ও অভিনেতা  পৃথিবীর ইতিহাসের একটি নিকষতম গণহত্যা এবং সহিংসতার জন্য দায়ী পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ক্রোধ থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁদের নিয়ে  বাংলাদেশবুদ্ধিজীবী মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছে। 

কাউন্সিলটির উদ্দেশ্য হল- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সমর্থন করা, আমাদের স্বাধীনতার জন্য বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করা, পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অপরাধ লিপিবদ্ধ করা, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে শিক্ষামূলক কাজ করা এবং আমাদের সদস্যরা যখন স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য কাজ করে তখন তাদের সত্ত্বা অনুধাবন করানো।

আমাদের সম্প্রদায়ের সদস্যদের ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকেই সামরিক কর্মযজ্ঞের বিশেষ টার্গেট করা হয়। সেনাবাহিনীর বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন আচরণের একটি উদাহরণ হচ্ছে বিশ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদেরকে তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের সামনে ঠান্ডা মাথায় খুন করা। তাদের পাপগুলো গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ, একনায়কতন্ত্র বিরোধী, বাঙ্গালীর ভাষা ও সাংস্কৃতিক নিজস্বতার বিরুদ্ধে তাদের জেদ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং বাংলাদেশ আন্দোলনের দার্শনিক ভিত্তির বিরুদ্ধে তাদের স্পষ্ট উচ্চারণের প্রতি সমর্থন প্রদান করে। বাঙ্গালিদের জন্য বৃহত্তর স্বায়ত্বশাসনের দাবিকে কণ্ঠরোধ করার উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি একটি শ্রেণী হিসেবে বুদ্ধিজীবীদেরকে একেবারেই নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিল।

 

স্বায়ত্বশাসনের দাবি উঠেছে ২৩ বছর ধরে শোষিত ও বঞ্চনার শিকার পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের কাছ থেকে, যারা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও এর সমৃদ্ধিতে পরিমিত পরিমানে অবদান রেখেছে। সশস্ত্র বাহিনী এবং বেসামরিক উচ্চপদে তাদের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল এবং তাদের উৎপাদিত পাট থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে ব্যয় করা হত এবং একই সময়ে বাংলাদেশ পশ্চিম পাকিস্তানী পণ্যের সংরক্ষিত বাজার হিসেবে কাজ করত। বাঙ্গালীরা ঔপনিবেশিক ধারার শোষণের ইতি টানতে চেয়েছিল এবং তাদের অর্থনৈতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়নের অধিকার দাবী করেছিল। এটি পুজিবাদী-আমলাতান্ত্রিক-সামরিক ভিত্তিক পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক চক্রের বিশেষাধিকারকে হুমকির মুখে ফেলেছিল, যার ২২টি ধনী পরিবার জাতীয় সম্পদের আশি ভাগ নিয়ন্ত্রণ করত।

গত ডিসেম্বরে জনগণের চাপে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে দেখা যায় যে, বাঙ্গালীদের দাবি প্রায় সর্বসম্মত, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া শেখ মুজিবর রহমান- বাংলাদেশের জনগণের নেতা, যার দল আওয়ামীলীগ জাতীয় পরিষদের ১৯৬টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে এবং জাতীয় অধিবেশনে পরিষ্কারভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে – এর সাথে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য ভন্ডামিপূর্ণ আলোচনায় মিলিত হয়।

 

আবরণে আচ্ছাদিত ও দীর্ঘায়িত এই নামে মাত্র আলোচনার পিছনে ইয়াহিয়া খান অসভ্য সহিংসতার মাধ্যমে সাংবিধানিক দাবি দমনের দুই বছরের পুরাতন চক্রান্তের চূড়ান্ত রূপ প্রদান করেন। ২৫শে মার্চ মাঝরাতে আধুনিক অস্ত্র নিয়ে ইয়হিয়ার মধ্যযুগীয় বর্বর দল বাংলাদেশের নিরীহ জনগণের উপর অমানবিক অত্যাচার শুরু করে। ঐ রাতের গণহত্যা ও বিধ্বস্ততা ইতিহাসের কোনোকিছুর সাথে তুলনা চলে না। ইয়াহিয়ার বিশ্বাসভঙ্গের লক্ষ্য হল  বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক শক্তি চিরস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অগ্রাহ্য করা যা সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার। এই লক্ষ্যের অগ্রসর ভাগ হল- সমস্যাটি মিটানোর জন্য ইসলামাবাদ সতর্কতার সাথে গণহত্যাকে একটি পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করে। তার সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙ্গালী, নারী, শিশু, অসুস্থ ও বৃদ্ধদের উন্মাদের মতন হত্যা করছে। এরা এ পর্যন্ত ১০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে এবং এর নৃশংসতা থেকে বাঁচার জন্য সত্তর লাখের বেশি মানুষকে ভারত ও বার্মা পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। এরা গোটা শহরে বর্জ্য ছড়িয়ে দিয়েছে এবং সব গ্রাম লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। সন্ত্রাসের তাদের একটি প্রিয় কৌশল হল- সমস্ত গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়া এবং দুঃখজনকভাবে পলায়নরত পুরুষদের বেপরোয়াভাবে হত্যা করে ও মেয়েদের অপহরণ করে তাদের অত্যাচার ও সম্ভ্রমহানি করা। সংক্ষেপে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যা,ধর্ষণ ও লুটের এতই বড় মিশন চালিয়ে যাচ্ছে যে স্বয়ং হিটলার কিংবা অ্যাটিলিয়া দেখলে লজ্জা পেত। বাংলাদেশের মানুষের উপর পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকান্ড চলছেই। আমরা বিশ্বাস করি যে, বুদ্ধিজীবীদের মানবতার প্রতি দায়িত্ব রয়েছে এবং বাংলাদেশে মানবতা নিদারুণ যন্ত্রণায় ভুগছে। আমরা সারা বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের কাছে আবেদন জানাইঃ

(১) বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধ করার জন্য তাঁদের নিজ দেশে আন্দোলন সংগঠিত করা।

(২)পাকসেনাদের মানবতা বিরোধী কাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং আন্তর্জাতিক আইনজীবী কমিশন ও জাতিসঙ্ঘের কাছে বাংলাদেশ ইস্যু তুলে ধরা।

(৩)একনায়কতন্ত্র এবং উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রামকে সমর্থন দেয়া- যা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীনতার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

(৪)গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য তাঁদের নিজ নিজ সরকারের প্রতি চাপ তৈরি করা।

(৫) শেখ মুজিবর রহমান ও অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির জন্য পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষের উপর চাপ তৈরি করা।

(৬) আমাদের এই উদ্দেশ্যে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা।

 

সভাপতি

ডঃ এ. আর. মল্লিক, ভাইস-চ্যান্সেলর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

সহ-সভাপতিবৃন্দ

ডঃ কে. এস. মুরশিদ, বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক এস. আলি আহসান, বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

কামরুল হাসান – চিত্রশিল্পী

রণেশ দাসগুপ্ত – সাংবাদিক

সাধারণ সম্পাদক

জহির রায়হান, ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক

যুগ্ম সম্পাদক

ডঃ এম. বিলায়েত হোসেন, অধ্যাপক, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নির্বাহী সচিববৃন্দ

হাসান ইমাম, অভিনেতা

সাদেক খান, শিল্প সমালোচক

মউদুদ আহমেদ, ব্যারিস্টার

ডঃ মতিলাল পাল, অর্থনীতিবিদ

ব্রজেন দাস, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদ

ওয়াহিদুল হক, সংগীতজ্ঞ ও সাংবাদিক

আলমগীর কবির, সমালোচক ও সাংবাদিক

অনুপম সেন, সমাজবিজ্ঞানী

ফয়েজ আহমেদ, সাংবাদিক

এম. এ. খায়ের, চলচ্চিত্র  প্রণেতা

কামাল লোহানী- সাংবাদিক

মুস্তফা মনোয়ার- চিত্রশিল্পী ও টিভি প্রযোজক

 

বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ
৯, সার্কাস অ্যাভিনিউ,কলকাতা- ১৬, ভারত.