বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন

Posted on Posted in 5
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন

 

……..ডিসেম্বর, ১৯৭১

বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিশ্বের ইতিহাসে এক যুগান্তরকারী ঘটনা। এর পটভূমিতে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্ত ও জীবনদানের করুণতম গাথা। অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মত ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী স্বাধীন ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠা হয়নি। বিশ্বের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র সজ্জিত নৃশংসতম ও বর্বর পাক-সৈন্যদের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে আমাদের এ স্বাধীনতার সূর্যোদয় সম্ভবপর হয়েছে। অন্যান্য স্বাধীনতা আন্দোলনের মতই আমাদের মুক্তিযুদ্ধও প্রথমদিকে কতগুলি অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল। যেমন- পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্রের অভাব, প্রয়োজনীয় সামরিক প্রশিক্ষণের অভাব প্রভৃতি। এই সমস্ত কারণে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম স্তরে গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চলেছিল। এই গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালানোর উদ্দেশ্য হলো শত্রুকে বিভিন্ন দিক দিয়ে নাজেহাল করা। মূলত কতগুলি ফ্রন্টে বিভক্ত করে শত্রুকে কোণঠাসা করে আনা গেরিলা যুদ্ধের মূলনীতি। এই ফ্রন্টগুলি হলো অর্থনৈতিক, সামরিক, মনস্তাত্ত্বিক প্রভৃতি। তাই নিতান্ত অনিচ্ছা ও ক্ষতি সত্ত্বেও শত্রুকে কোণঠাসা করার জন্য বাংলাদেশ গেরিলাদের বিভিন্ন পুল, রেলওয়ে, ব্রিজ, কালভাট, প্রধান প্রধান সড়ক প্রভৃতির ধ্বংসসাধন করতে হয়। শত্রুর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আঘাত হানার জন্যে মুক্তিবাহিনী গেরিলাদের অনেক শিল্পকারখানাও নষ্ট করতে হয়।

পরে শত্রুমুক্ত করার তথা স্বাধীনতা অর্জনের চরম মুহুর্তে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে নিশ্চিত পরাজয় বর্বর হার্মদ পাক-সৈন্যরা ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে বহু বছর পিছিয়ে

দেবার মানসে ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের উপর ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয় এবং সার্বিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। তাই বিজয়ের পরে আজ আমাদের প্রধান কর্তব্য ও দায়িত্ব হবে বাংলাদেশের পুনর্গঠনে সব মন-প্রাণ নিয়োগ করা।

মুক্তিসংগ্রামের থেকে মুক্ত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন আরো কঠিন ও কঠোর । এ বিরাট দায়িত্ব স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এবং সরকারও এ ব্যাপারে পূর্ণ প্রতিশ্রুত ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তানী হার্মাদ নরপিশাচরা স্বেচ্ছায় হাতের অস্ত্র ছাড়েনি। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। তারা পরাজয়ের শেষ মুহুর্তে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের কল-কারখানাগুলি নষ্ট করে দিয়ে গেছে। এছাড়া দেশের এই অস্বাভাবিক অবস্থায কৃষকরা ঠিকমত চাষাবাদ করতে পারেনি। শিল্প ও কৃষি দেশের প্রধান দুইটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের উপর মারাত্মক আঘাত পড়ায় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। গত নয় মাস যাবৎ বাংলাদেশের অধিবাসীদের ওপর যে দুর্যোগ ও কালরাত্রি নেমে আসে তাতে ১২ লক্ষাধিক লোক নিহত হয়, ১ কোটি লোক ভারতে আশ্রয় নেয় এবং লক্ষ লক্ষ লোক দেশের অভ্যন্তরেই গৃহহারা হয়। এই ছিন্নমূল অধিবাসীদের মানসিক অবস্থা কৃষিকার্যে মনোনিবেশ করার অনুকূলে ছিল না। অন্যান্য সকল লোকমাত্রেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। সুতরাং কল-কারখানা, কৃষিকার্য, স্কুল, কলেজ, কোর্টকাচারী প্রভৃতি সবকিছু বন্ধ অবস্থায় ছিল।

বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল স্বর্ণতন্তু পাট। এই পাটচাষের প্রতি কৃষকদের আবার দ্বিগুণ উৎসাহে মনোনিবেশ করতে হবে। বিশ্বে এর অসম্ভব চাহিদা অনস্বীকার্য। এছাড়া চাও বাংলাদেশের রপ্তানীযোগ্য ফসলের মধ্যে অন্যতম। এ দুটি ব্যবসায় বৃটেনের বাংলাদেশের সহযোগিতার অত্যন্ত প্রয়োজন। এবং এমন ধারণা নিত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, এই দুটি শিল্পে ব্যাঘাত না সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই বৃটেন বাংলাদেশ সমস্যায় পাক-জাঙ্গীশাহীকে শেষের দিকে সমর্থন করেনি।

এছাড়া ধ্বংসপ্রাপ্ত শিল্পের পুনর্গঠনে বহু অর্থের প্রয়োজন। এটা কিছু সময়সাপেক্ষও বটে। বাংলাদেশে সম্পদের অভাব নেই। আর বাংলাদেশ সরকারের বিরাট ও নিরঙ্কুশ জনসমর্থন আছে। তাই মনে হয় বাংলাদেশে এই সমস্ত সমস্যা অচিরেই দূর হয়ে যাবে। দেশের সাংগঠনিক কার্যে মানুষ চরম নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, ত্যাগ ও সহনশীলতা দ্বারা দেশকে গড়ে তুলবেন।

দেশের সাংগঠনিক কার্যে প্রথম পদক্ষেপ স্বরূপ দেশের যাতায়াত ব্যবস্থাকে পুনরায় চালু করতে হবে। শুধু দেশের অভ্যন্তরেই এ ব্যবস্থা সীমিত রাখলে চলবে না। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সমর্থন ও সাহায্য তর্কাতীত। তাই রণবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠনে ভারতকেই এগিয়ে আসতে হবে সবচেয়ে আগে। ভারত সরকার ইতিমধ্যেই সাধ্যানুযায়ী সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে জল, নৌ ও বিমানপথের যোগাযোগ স্থাপন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। অবশ্য ইতিমধ্যেই বনগাঁ, বেনাপোল, শিয়ালদহ ও যশোরের মধ্যে ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা হয়েছে, তথাপি তা আরো প্রসারিত করার আমু ব্যবস্থা দুই সরকারকেই করতে হবে- যদিও তা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। স্থলপথ ও জলপথের এই অসুবিধাগুলি আকাশপশে বিমান চলাচলের ব্যবস্থা করে অনেকাংশে দূর করা যায়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলির সঙ্গে সত্বর বিমান যোগাযোগ একান্ত প্রয়োজনীয়। অবশ্য এটা ঠিক, যুদ্ধে অনেক বিমানক্ষেত্রে রানওয়েগুলির ক্ষতি হয়েছে, তথাপি সেগুলির সংস্কার খুব বেশী সময়সাপেক্ষ নয়।

বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পরিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গড়ে তোলার জন্যে বদ্ধপরিকর, দেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখায় যা উপস্থাপিত হয়েছে তাতে কায়েমী স্বার্থের কোন স্থান থাকবে না, পুঁজিবাদ বা আমলাতান্ত্রিকতা কোন অসুবিধা করতে পারবে না, নতুন করে কোন সুবিধাবাদী চক্রকে গড়ে উঠতে দেয়া হবে না। সরকার এটা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন যে, সংগঠন ও পুনর্গঠনের জন্যে রয়েছে যেটা সেটা

হলো দেশের সর্বত্র অসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা প্রসারিত করে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপন করা। ইতিমধ্যেই সরকার দেশের অগ্রগতির প্রতিবন্ধক সম্প্রদায়িক দলগুলিকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন, বাংলাদেশে আর কোন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থাকবে না। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাম্পে দেশ আর কলুষিত হতে পারবে না। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা যুবকদেরও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাদের ভূমিকা সর্বগ্রগণ্য।

পশ্চিম পাকিস্তানী রক্তলোভী হার্মাদরা বাংলাদেশের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, অধ্যাপক, রাজনৈতিক কর্মী, সাহিত্যিক প্রভৃতি বাঙালী বুদ্ধিজীবীরাই দেশের পুনর্গঠনে অধিকতর সহায়ক হবে জানতে পেরেই ইয়াহিয়ার লুটেরারা বেছে বেছে এদের হত্যা করে। কাজেই নানা দিক দিযে সরকারের অসুবিধা হবে। অবশ্য যতই বাধা থাকুক না কেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন চরম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আবার দেশ গঠনেও আত্মনিয়োগ করতে পারবে। সাংগ্রামের মধ্য দিয়ে শোণিতমূল্যে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি- এই স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্যে এবং দেশের আর্থিক পুনর্গঠনের জন্যেও আমরা তেমনি প্রাণ পণ করব। এ ব্যাপারেও আমরা বিশ্বে নতুন বিস্ময় সৃষ্টি করতে সক্ষম হব।

(নাসিম চৌধুরী রচিত)