বাংলাদেশের পুর্নগঠন-৩

Posted on Posted in 5
বাংলাদেশের পুনর্গঠন-৩

২৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১

ধর্মের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে জাগতিক তথা রাজনৈতিক কাজে লাগানো হয়েছিল বলেই ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান টেকিনি। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির পটভূমি ছিল ধর্ম। সাম্প্রদায়িকতা; কিন্তু বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ লক্ষ প্রাণের রক্তে অর্জিত হলো- তার সংগ্রামী পটভূমিতে যে সত্যটি সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল তা হলো দেশপ্রেম। দেশের মাটির প্রতি দেশবাসীর ভালোবাসা- দেশের সংগ্রামী শাসনক্ষমতার সংগে দেশবাসীর প্রাণের মিলন। আজ স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি নবজাত রাষ্ট্রের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সামনে নতুন স্বপ্নের হাতছানি- কলপনার অজস্র বিস্তার।

এদেশ কেমন হবে- এ প্রশ্নের উত্তরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুন্দর জবাব দিয়েছিলেন। আপনারা কিভাবে এ দেশকে গড়ে তুলতে চান- এর উপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশ কেমন হবে। সত্যিই অনেক ধ্বংসস্তুপের মধ্যে মাথা তুলে যে নতুন রাষ্ট্র আজ এলোমেলো, এবড়োথেবড়ো, বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত হয়ে আছে তাকে আমাদের মনের মতো করে সাজাতে হবে- রূপায়িত করতে হবে আমাদের প্রতিটি স্বপ্নকে।

এই স্বপ্নকে রূপায়িত করার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো নিষ্ঠা, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সহযোগী চেতনার। হানাদার বাহিনীর চলাচলের পথ দুর্গম করে তোলার জন্য একদিন যে পুল, কালভার্ট আমরা ভেঙে দিয়েছিলাম- আজ সেই পথেই আমাদের নিত্যদিনের যাত্রা। এই বাড়ির পাশের পুলটির পুনঃনির্মার্ণের জন্য আপনি কি সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকবেন? নিশ্চয়ই নয়। আপনার কাজ হবে প্রাথমিকভাবে পার্শ্ববর্তী মানুষের মধ্যে এমন এক চেতনার জন্ম দেয়া- এমন এক নতুন কর্মপ্রেরণাকে সঞ্চারিত করা, যাতে শারীরিক সাধ্যের অন্তর্গত পরিশ্রমে দেশের যে কোনো পুনর্গঠন কাজে নিদ্বিধায় অংশ নিতে সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসে। এ ভাঙা পুলটি আপনারাই পুনঃনির্মাণ করতে পারেন। অর্থের সংগে কর্মের নিষ্ঠা যুক্ত না হলে অপচয়কে রোধ করা যায় না।

বিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে সর্বপ্রথম এই ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থাকে যতশীঘ্র সম্ভব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মেঘনা নদীর ওপর ভৈরব রেলব্রিজ, হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মতো বড়ো বড়ো সেতুগুলোর ব্যবস্থাধীনেই তুরান্বিত হবে- কিন্তু বাড়ি পাশের, গ্রাম-গঞ্জের ছোটখাট পুলগুলো গ্রামীণ স্থানীয় চেষ্টায় মেরামত করা অসম্ভব কিছু নয়। এ ব্যাপারে অগ্রণী হতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

আপনার বাড়ির পাশের যে স্কুলটি কিম্বা আপনার বাড়ির পাশের মসজিদটি, যা কিছুদিন আগে হানাদার বাহিনীর কামানের গোলা বা বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আপনাদের দায়িত্ব নিজেদের প্রচেষ্টায় তার প্রয়োজনীয় পুনঃনির্মাণ। সরকারকে ছোটখাটো  পুনর্গঠনের দায়িত্বের দিকে টেনে না এনে বৃহত্তর ক্ষেত্রে সরকারী প্রচেষ্টাকে কাজে লাগাতে দেয়া। আজকে অর্থনৈতিকও সামাজিক জীবনের নিশ্চয়তা বিধান প্রভৃতি যে মহান দায়িত্ব সরকারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সমবেতভাবেই সেই দায়িত্ব পালনে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।

দীর্ঘদিন শত্রুকবলিত বাংলাদেশে শিল্প উৎপাদন অসম্ভব রকম হাস পাওয়ায় এবং বহিঃবিশ্বের সংগে যোগাযোগহীন হয়ে পড়ায় গ্রামে গ্রামে তেল, কেরোসিন, লবণ, সাবান, কাপড়, ঔষধপত্র প্রভৃতি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের নিদারুণ অভাব দেখা দিয়েছে। যোগাযোগের অব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কালোবাজারী-মুনাফাখোর ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মাথা তুলে দাঁড়াবে। স্থানীয়ভাবেই গ্রামে গ্রামে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, অসামরিক প্রশাসন গ্রামে গ্রামে চালু হবার সময় এসে গেছে। সুযোগসন্ধানী যারা সময়ের সুযোগ নিতে চাইবে- দেশদ্রোহিতার অপরাধে শাস্তিই তাদের প্রাপ্য হবে।

আগামী শুভ নববর্ষের পদার্পণের সংগে সংগেই পূর্ণ উদ্যমে শুরু হবে বাংলাদেশ সরকারের তথা বাংলাদেশবাসীর পবিত্র দায়িত্ব- শরণার্থীদের পুনর্বাসন। এই পবিত্র মানবিক দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সাহায্য, সহানুভূতি ও সশ্রম আত্মত্যাগ অপরিহার্য। এ দায়িত্ব সরকারের নয়- এই পুনর্বাসনের নৈতিক ও মানসিক দায়িত্ব আপনার আমার সকলের। হানাদার বাহিনীর প্ররোচনায় যে সমস্ত দালাল অনেক ভাবে অপরের সম্পত্তি, বাড়িঘর ও অস্থাবর মালামাল নিজেদের দখলে রেখেছিল- সরকারী হস্তক্ষেপের পূর্বেই সবকিছু ফিরিয়ে দিয়ে তাদের কর্তব্য হবে পুনর্বাসনের কাজকে তুরান্বিত করা। অবৈধভাবে অপরের সম্পদ ভোগ-দখলের যে কোন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। আপনার বাড়ির পাশেই তার নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে নিঃস্ব হয়ে দীর্ঘ দশ মাসের অনিশ্চিত জীপনযাপনের পর আজ শরণার্থীদের দিকে বন্ধুত্বের কোমল হাতকেই প্রসারিত করা। ভাই, বন্ধু ও সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ পরস্পরের সহযোগী, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। জনসাধারণের মধ্যে এই শুভবুদ্ধির প্রসার ঘটাতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী বলে ঘৃণা নয়, প্রতিবেশী বলে বুকে টেনে নিতে হবে পরস্পরকে।

 এ ব্যাপারে সরকারের প্রচেষ্টার সফলতা জনসাধারণের সহযোগিতা নির্ভর। যাদের বাড়িঘর ভেঙে গেছে, তাদের জন্য ঘর তুলতে হবে- প্রয়োজনবোধে অর্থ, প্রয়োজনীয় আসবাব দিয়ে সাহায্য করতে হবে আমাদের যে অশুভ শক্তি একদিন তার অসহনীয় বর্বরতা দিয়ে এক কোটি মানুষকে দেশছাড়া করেছিলঅনেক রক্তের বিনিময়ে, অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়েই আমরা সেই শক্তিকে পরাজিত করেছি। সেই ত্যাগের মহান আদর্শ, সেই সহযোগিতার ঐতিহ্যই বাংলাদেশের প্রতিটি পুনর্গঠনে আমাদের সরকারের হাতকে শক্তিশালী করুক, ধ্বংসস্তুপের মধ্য থেকেই আমাদের সরকারের হাতকে শক্তিশালী করুক। ধ্বংসস্তুপের মধ্য থেকেই আমাদের আকাংক্ষিত সোনার বাংলাদেশ নতুন আলোয় স্নাত হবে।

(নির্মলেন্দু গুণ রচিত)