বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের ওপর একটি প্রতিবেদন

Posted on Posted in 7

৭.০২..০০৫

শিরোনামঃ ২। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের ওপর একটি প্রতিবেদন সূত্রঃ উইটনেস টু সারেন্ডার- সিদ্দিক সালেক   

তারিখঃ ২৬ মার্চ- ২ মে

 

অপারেশন সার্চলাইট -১

 

২৫ শে মার্চ সকাল এগারটার দিকে সবুজ টেলিফোনটি বেজে উঠে। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন তখন রাজনৈতিক সংলাপের ফলাফল নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তামগ্ন ছিলেন।  ফোনের অপর প্রান্তে ছিলেন লেফটেনেন্ট জেনারেল টিক্কা খান। তিনি বললেন ‘খাদিম, আজ রাতেই’।

 

এই খবরটি খাদিমকে উত্তেজিত করেনি। বরং এই আদেশটির জন্যেই তিনি অপেক্ষা করছিলেন। প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তটি এমন একটি দিনে এসেছিল যেদিন ছিল তার ক্ষমতা গ্রহনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। জেনারেল খাদিম আদেশটি তার স্টাফদের বাস্তবায়ন করতে বললেন। খবরটি যত নিচে যাচ্ছিল তত বেশী প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছিল। আমি কতিপয় জুনিয়র অফিসারদেরকে কিছু পরিমান অতিরিক্ত স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ও গোলাবারুদ তাড়াহুড়ো করে জড়ো করতে দেখলাম। ট্যাংক ক্রু’রা রাতে ব্যাবহারের জন্যে ৬টি বিবর্ণ এম-২৪ ট্যাংকে তেল ভরে নিল, যাদেরকে আগে থেকেই রংপুর থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ঢাকার রাস্তায় আওয়াজ তোলার জন্যে সেগুলো যথেষ্ট।

 

 জেনারেল স্টাফ অফ হেডকোয়াটার্স, ১৪ ডিভিশন থেকে ফোন মারফত সকল সৈন্যদলকে অপারেশনের সময় জানানো হয়। ম্যাসেজটি ছড়ানোর জন্যে একটি বিশেষ কোড উদ্ভাবন করা হয়েছিল। সব সৈন্যদলকে একই সময়ে অপারেশন শুরু করতে নির্দেশ দেয়া ছিল। অপারেশনের সময় নির্ধারিত হয় ২৬শে মার্চ এর প্রথম ঘন্টা। এটা হিশেব করেই অপারেশনের সময় নির্ধারিত হয়েছিল যে ততক্ষনে প্রেসিডেন্ট নিরাপদে করাচী পৌছে যাবেন।

 

‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর পরিকল্পনা দুটি হেডকোয়ার্টার তৈরির ব্যাপারটিকে দৃশ্যমান করে। ঢাকা শহর ও তার আশেপাশের অপারেশনের দায়িত্ব ছিল ৫৭ ব্রিগেডের অধীনে, যার দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল ফরমান ও বিগ্রেডিয়ার আরবাব। অন্যদিকে প্রদেশের বাকী অংশের দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল খাদিম। উপরন্তু, লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ও তার সহকর্মীরা ঢাকার ভেতর ও বাহিরের অপারেশনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষনের জন্যে রাত্রি যাপন করছিলেন দ্বিতীয় রাজধানীর মার্শাল ল’ হেডকোয়াটার্সে।

 

খাদিম এবং ফরমান এই ‘ক্র‍্যাক ডাউন’ এর সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করতে পারে এই সম্ভাবনার বশবর্তী হয়ে কিছুদিন আগেই জেনারেল ইয়াহিয়া তাদের বদলি হিশেবে মেজর জেনারেল জাঞ্জুয়া ও মেজর জেনারেল মিট্টা’ কে বদলি হিশেবে ঢাকা পাঠিয়েছিলেন। তদুপরি তারা জেনারেল ইয়াকুব এর টিমকেও তৈরি করেছিলেন এবং তিনি হয়ত তার আইডিয়া শেয়ারও করেছেন। এমনকি জেনারেল হামিদ এই অপারেশনের ব্যাপারে খাদিম এবং ফরমানের স্ত্রী’দের কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। দুই জেনারেল ই হামিদকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে আদেশ যথাযথ ভাবে পালন করা হবে।

 

রাত দশটা নাগাদ আমার মত জুনিয়র অফিসার’রা মার্শাল ল’ হেডকোয়াটার্স এ জড়ো হতে শুরু করল। তারা বাগানে সোফা ও আরামদায়ক চেয়ারের ব্যবস্থা করেছিল, সারা রাত কাটানোর জন্যে চা-কফির ব্যবস্থাও ছিল। যে কোন সময়ের জন্যে প্রস্তুত থাকা ছাড়া আমার আর কোন কাজ ছিল না। ‘আউটডোর অপারেশনস রুম’ এর পাশেই ওয়্যারলেস লাগানো একটি জিপ পার্ক করা হয়েছিল। সারা শহর ছিল নক্ষত্রের আলোয় আবৃত এবং সবাই ছিল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বসন্তে রাতের ঢাকা যতটা সুন্দর হতে পারে, রাতটি ছিল ঠিক ততটাই সুন্দর। যে কোন কাজের জন্যেই সকল প্রস্তুতি ছিল একেবারে নিখুঁত,  কিন্তু এটা ছিল রক্তাক্ত হত্যাযজ্ঞ।

 

সেনাবাহিনী ছাড়াও সেই রাতে কতিপয় লোক ব্যস্ত সময় পার করছিল। তারা ছিল আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ এবং তাদের বেসামরিক বাহিনী- যেখানে ছিল বাংগালী সৈন্য, পুলিশ, অবসরপ্রাপ্ত চাকুরিজীবিগণ, ছাত্র এবং বিভিন্ন দলের স্বেচ্ছাসেবক। তাদের সাথে মুজিব, কর্ণেল ওসমানী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাংগালী অফিসারদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তারা সর্বোচ্চ প্রতিরোধের জন্যে তৈরি হচ্ছিল। ঢাকা শহরে সেনাবাহিনীর যাত্রা রোধ করার জন্যে প্রচুর রোড ব্লক তৈরি করা হয়েছিল।

 

জিপ গাড়িতে যেই ওয়্যারলেস সেট স্থাপন করা হয়েছিল সেটা প্রথম আওয়াজ করে উঠে রাত ১১:৩০ মিনিটে। ঢাকার লোকাল কমান্ডার সেই কাং্খিত সময়ে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি চাইল, কেননা অপরপক্ষ তখন কঠোর প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সবাই ঘড়ির দিকে তাকাল। প্রেসিডেন্ট তখনো পৌছাননি, বরং ছিলেন কলম্বো (শ্রীলংকা) ও করাচীর মাঝামাঝি।  জেনারেল টিক্কা আদেশ দিলেন- ‘ববি’কে (আরবাব) বল যত বেশিক্ষন সম্ভব অপেক্ষা করতে।

 

উল্লেখিত সময়ে ব্রিগেডিয়ার আরবাব এর ব্রিগেড নিম্নলিখিত ভাবে কাজ করে-

 

-১৩ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এ রিজার্ভ হিশেবে অবস্থান করতে বলা হয় এবং প্রয়োজন হলে ক্যান্টনমেন্টকে রক্ষা করবে এই মর্মে নির্দেশনা দেয়া হয়।

-আকাশসীমা ব্যবহারে ভারতের প্রতি নিষেধাজ্ঞা ছিল বিধায় ৪৩- হালকা বিমান বিধ্বংসী রেজিমেন্ট’কে বিমানবন্দরে স্থাপন করা হয়, বিমানবন্দর এলাকায় নজরদারীর জন্যে।

-২২ বেলুচ, যারা আগে থেকেই পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর ব্যারাকে অবস্থান করছিল, প্রায় ৫০০০ ইপিআর সদস্যের অস্ত্র এবং ওয়্যারলেস বাজেয়াপ্ত করে।

-৩২ পাঞ্জাব, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স এ প্রায় ১০০০ পুলিশ সদস্যকে নিরস্ত্র যারা স্বাধীনতার চেতনায় অত্যন্ত অনুপ্রাণিত এবং আওয়ামীলীগের সশস্ত্র জনবল হিশেবে তীব্র সন্দেহভাজন ছিল।

-১৮ পাঞ্জাব নিয়োজিত ছিল নওয়াবপুর এবং পুরোন শহরে। কথিত আছে সেখানে প্রচুর হিন্দু বাড়িতে অস্ত্রের মজুদ করা হয়েছিল।

-ফিল্ড রেজিমেন্ট ছিল দ্বিতীয় রাজধানী ও তদসংলগ্ন বিহারী এলাকা (মোহাম্মদপুর, মিরপুর) নিয়ন্ত্রনের দায়িত্বে।

-১৮ পাঞ্জাব, ২২ বেলুচ, ও ৩২ পাঞ্জাব এর প্রতিটি থেকে একটি করে কোম্পানী নিয়ে তৈরি একটি মিশ্র বাহিনী আক্রমন চালায় বিশ্ববদ্যালয় এলাকায় বিশেষত ইকবাল হল এবং জগন্নাথ হলে,  যেখানে ছিল সবচেয়ে বেশী সং্খ্যক আওয়ামীলীগের বিদ্রোহীরা।

-একটি স্পেশাল কমান্ডো প্লাটুন মুজিব’কে জীবিত ধরতে তার বাড়িতে হানা দেয়।

-এক স্কোয়াড্রন এম-২৫ ট্যাংক সূর্যোদয়ের আগে রাস্তায় নামে, মূলত শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। তবে প্রয়োজন হলে গোলা ছুড়বার অনুমতি তাদের ছিল।

 

উল্ল্যেখিত সেনাদের মূল দায়িত্ব ছিল তাদের নিজেদের স্থানে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পাহাড়া দেয়া, পথে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকলে সেটাকে ধ্বংস করা এবং চিহ্নিত রাজনৈতিক নেতাদেরকে তাদের বাসা থেকে গ্রেফতার করা।

 

 

রাত একটার আগেই সৈন্যদের লক্ষ্যস্থানে পৌছে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়।  সৈন্যদের কোন কোন দল পথে দেরী হবার ধারনা থেকে রাত সাড়ে এগারটা নাগাদ ক্যান্টনমেন্ট থেকে রওনা দেয়। যারা আগে থেকেই শহরের ভেতরে অবস্থান করছিল তারা আক্রমনের জন্যে উল্ল্যেখিত সময়ের আগেই রেডিও ও টেলিভিশন স্টেশন, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, বিদ্যুত কেন্দ্র, স্টেট ব্যাংক ইত্যাদি এলাকায় পাহাড়ার জন্যে পৌছে যায়।

 

সৈন্যদের প্রথম দলটি প্রথম প্রতিবন্ধকতার সম্মূখীন হয় ক্যান্টনমেন্ট থেকে এক কিলোমিটার দূরে ফার্মগেইট এলাকায়। দলটি প্রথম বাধাপ্রাপ্ত হয় রাস্তায় ফেলে রাখা গাছের গুড়ির কারনে, যেগুলো কিছুক্ষন আগেই কাটা হয়েছে। রাস্তার পাশের ফাকা স্থানে নষ্ট হওয়া কিছু গাড়ি এবং একটি অকেজো স্টিম-রোলার রাখা ছিল। রাস্তার ব্যারিকেডের পাশে শত শত আওয়ামীলীগার দাড়িয়ে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিচ্ছিল। জেনারেল টিক্কা’র হেডকোয়ার্টার এর বারান্দায় দাড়িয়ে আমি তাদের সাহসী চিতকার শুনছিলাম। হঠাতই রাইফেলের শব্দ জয় বাংলা শ্লোগানের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। কিছুক্ষন পর স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ছোড়া আগুনের গোলা বাতাসে মিলিয়ে যেতে দেখা গেল। তারপর শুধু ছিল গোলাগুলি আর আগুনের শ্লোগান, যার উতস হালকা মেশিনগান। ১৫ মিনিট পর সকল অস্ত্র আর শ্লোগানের আওয়াজ ঝিমিয়ে গেল। এটা মূলত ছিল অস্ত্রের জয়ধ্বনি।  সৈন্যদল শহরের ভেতর এগোতে শুরু করল।

 

এভাবেই আক্রমন শুরু হয়ে গিয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের আগেই। এখন আর সেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে অপেক্ষা করার কোন মানে নেই। জাহান্নামের দরজা এখন খোলা। যখন প্রথম গুলিটি ছোড়া হয়েছিল, ঠিক সেই মুহুর্তে শেখ মুজিবর রহমানের কন্ঠস্বরের একটি দুর্বল তরংগ পাকিস্তানের অফিসিয়াল রেডিওতে ধরা পড়ে। সেখানে ছিল একটি প্রি-রেকোর্ডেড ম্যাসেজ, যেখানে শেখ ইস্ট পাকিস্তান কে ‘পিপলস রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ’ বলে ঘোষণা করেন। পূর্ণাংগ ঘোষণাটি পরবর্তীতে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় কতৃক ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টস’ এ প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়-‘এটা হয়ত আমার শেষ আদেশ। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের সব মানুষকে আদেশ দিচ্ছি যে যেখানে আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত শত্রু-সৈন্যের মোকাবিলা করবে। তোমাদের যুদ্ধ ততক্ষন পর্যন্ত চলবে যতক্ষন পর্যন্ত না শেষ সৈন্যটি দেশ থেকে বিতাড়িত হয় ও বিজয় অর্জিত হয়।’

 

আমি এই বেতারবার্তাটি শুনি নাই। বরং আমি শুনেছিলাম কমান্ডোদের ছোড়া রকেট লাঞ্চার এর তীব্র আওয়াজ,  যেগুলো তারা ছুড়ছিল মুজিবের বাসায় যাওয়ার পথের বাধা দূর করতে। লেফটেন্যান্ট কর্ণেল জেড এ খান, কমান্ডিং অফিসার ও মেজর বিল্লাল, কোম্পানী কমান্ডার,  এই সৈন্যদলের দায়িত্বে ছিলেন।

 

কমান্ডো দল মুজিবের বাসায় পৌছুনোর সাথে সাথে বাড়ির সকল গার্ডদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়া হল। দ্রুতই তারা নিরস্ত্র হয়ে পড়ল। প্রায় ৫০ জন শক্তিশালী সৈনিক ক্ষিপ্রতার সাথে বাড়ির চার ফুট উচু দেয়াল বেয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। সৈন্যরা তাদের উপস্থিতি জানান দেয়ার জন্যে স্টেনগান থেকে গুলি করে এবং চিতকার করে মুজিবকে বেরিয়ে আসতে বলে। কিন্তু সেখানে কোন সাড়াশব্দ ছিল না। বারান্দা এবং সিড়ি পেরিয়ে সৈন্যরা মুজিবকে তার শোবার ঘরে খুজে পায়। ঘরটি ছিল বাহির থেকে তালাবদ্ধ। একটি বুলেট তালাটি ভাংগার জন্যে ছিল যথেষ্ট।  সেখানে মুজিবকে আত্মসমর্পণ এর জন্যে আহবান জানানো হয়। মনে হচ্ছিল তিনি এর জন্যে প্রস্তুত ই ছিলেন। সৈন্যদল বাড়ির সকলকে গ্রেফতার করে দ্বিতীয় রাজধানী তে নেয়ার জন্যে জিপে তুলল। মিনট খানেক পর রেডিওতে আসল ৫৭ ব্রিগেড এর ব্রিগেড মেজর, মেজর জাফর। আমি তার শক্ত কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম যেখানে সে বলছিল- ‘বিগ বার্ড ইন দ্য কেইজ… আদার’স নট ইন দেয়ার নেস্টস… ওভার।’

ম্যাসেজটি শেষ হওয়া মাত্রই আমি দেখলাম সাদা জামা পরিহিত সেই ‘বিগ বার্ড’ কে নিয়ে একটি আর্মি জিপ নিরাপদ জিম্মায় নেবার উদ্দ্যেশ্যে ক্যান্টনমেন্টে ঢুকল। কেউ একজন তাকে জেনারেল টিক্কা’র সামনে নিয়ে আসার অনুমতি চাইলে তিনি শক্ত ভাবে জবাব দেন ‘আমি তার মুখ দেখতে চাই না।’

 

নিশ্চিত হবার পর মুজিবের বাড়ির চাকর-বাকরদের সেই রাতেই ছেড়ে দেয়া হয়। আর মুজিবকে সেই রাতের জন্যে নেয়া হয় আদমজী স্কুলে। পরদিন তাকে পতাকাবাহী স্টাফ-হাউজে স্থানান্তর করা হয়। যেখান থেকে পরবর্তীকালে মুজিবের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তিনদিনের মাথায় তাকে করাচী পাঠিয়ে দেয়া হয়। গ্রেফতারের সময়ই কেন তাকে মেরে ফেলা হল না- এই কথা জানতে চাইলে আমার মেজর বন্ধু জবাব দিয়েছিল ‘জেনারেল মিঠঠা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে তাকে জীবিত ধরতে আদেশ করেছিলেন।

 

মুজিবকে আদমজী স্কুলে আটক রেখে ঢাকা শহরকে একটি গৃহযুদ্ধের মুখে ফেলা হয়। আমি চার ঘন্টা যাবত সেই রাতের বীভতস দৃশ্য বারান্দায় দাড়িয়ে দেখছিলাম। সেই রক্তাক্ত রাতের সবচাইতে সাধারন দৃশ্য ছিল আকাশ ছোয়া আগুনের ফুলকি। সেই সময়ে শোকাতুর ধোয়ার মেঘ আর আগুনের গোলা ছিল মিলেমিশে একাকার, কিন্তু দ্রুতই তারা নতুন আগুনের গোলায় আবিষ্ট হয়ে যায়, যেগুলো আকাশের তারা ছুতে চাচ্ছিল। মানুষের তৈরি সেই বৃহত আগ্নিকান্ডের সামনে রাতের চাদের আলো ছিল একেবারেই ম্লান। আগুন ও ধোয়ার সবচেয়ে বড় কুন্ডলীটি উঠছিল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে। অন্যদিকে শহরের অন্য অংশ, যেখানে সবসময় হাজারো মানুষের আনাগোনা থাকে, সেখানে এই ভয়াল অগ্নিকান্ডের কোন ছিটেফোটাও ছিল না।

 

রাত দুইটা নাগাদ জিপে স্থাপিত ওয়্যারলেস সেটটি আবার আমাদের মনযোগ আকর্ষণ করে। আমাকে ফোন কলটি ধরার জন্যে আদেশ দেয়া হয়। অপর প্রান্ত থেকে একজন ক্যাপ্টেন জানায় তারা ইকবাল হল ও জগন্নাথ হল থেকে প্রচন্ড প্রতিরোধের সম্মূখীন হচ্ছে। ততক্ষনাত একজন সিনিয়র স্টাফ আমার হাত থেকে হ্যান্ডসেটটি ছিনিয়ে নিয়ে চিতকার করে বলেন- ‘সবাইকে প্রতিরোধ করতে তোমার কত সময় লাগবে?… ওকে, প্রত্যেককেই ব্যবহার করে আগামী দুই ঘন্টার মধ্যেই পুরো এলাকা দখল করে নাও।’

 

ভোর চারটা নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয় বিল্ডিং দখল করা যায়। কিন্তু বাংগালী জাতীয়তাবাদের যে আদর্শ বছরের পর বছর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তা দমনে আরো সময় প্রয়োজন। সম্ভবত আদর্শকে জয় করা যায় না।

 

শহরের বাকী অংশে বাহিনী তার উদ্দ্যেশ্য সম্পাদন করে, এর মাঝে ছিল রাজারবাগ এর সকল পুলিশ ও পিলখানা ইপিয়ার এর সকলকে নিরস্ত্র করা। শহরের বাকি অংশে তারা শুধুমাত্র ভীতি প্রদর্শনের জন্যে এখানে সেখানে ফাকা গুলি ছোড়ে ও আগুন দেয়। সৈন্যদল শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট বাড়ি (রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে) বা যে সকল জায়গা দুস্কৃতিকারীদের আশ্রয়স্থল হিশেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন জায়গা ছাড়া অন্য কোন বাড়িতে প্রবেশ করে নি।

 

২৬শে মার্চ ভোরের আলো ফোটার আগেই সৈন্যদল তাদের মিশন পূর্ণ হবার রিপোর্ট করে। জেনারেল টিক্কা খান ভোর পাচটার দিকে তার আসন ত্যাগ করে কিছুক্ষনের জন্যে তার অফিসে প্রবেশ করেন। তিনি রুমালে তার চশমা পরিস্কার করতে করতে পায়চারী করতে থাকেন। বারান্দায় দাড়িয়ে তিনি বোলেণ- ‘আহ, একটি প্রাণও নাই সেখানে।’ আমি তার স্বগতোক্তি শুনে নিশ্চিত হবার জন্যে আশেপাশে তাকালাম। সেখানে শুধু একটি দলছাড়া কুকুর তার লেজটি দুই পায়ের মাঝে গুটিয়ে শহরের দিকে পালাবার পথ খুজছিল।

পরদিন সকালে ভুট্টোকে হোটেল থেকে সেনা পাহাড়ায় বিমানবন্দরে পৌছে দেয়া হয়। বিমানে ওঠার পূর্বে তিনি সেনাবাহিনী’কে আগের রাতের কাজের জন্যে ধন্যবাদ ও তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। সেনা প্রহরা’র প্রধান বিগ্রেডিয়ার আরবাব’কে তিনি বলেন- ‘ উপরওয়ালাকে ধন্যবাদ। পাকিস্তান রক্ষা পেল।’ করাচী পৌছবার পর তিনি আবার তার বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করেছিলেন।

 

 ভুট্টো যখন তার আশাবাদী মন্তব্য করছিল, আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গণকবরের মাপজোক করছিলাম। সেখানে আমি তিনটি গণকবর দেখলাম যার প্রতিটি ছিল ৫ থেকে ১৫ মিটার ব্যাসার্ধের। সেগুলো সদ্য চাপা দেয়া মাটি দিয়ে পূর্ণ ছিল। কিন্তু কোন অফিসারই হতাহতের সঠিক সং্খ্যা জানাতে আগ্রহী ছিল না। আমি বিভিন্ন বিল্ডিং, বিশেষ করে ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলের আশেপাশে ঘুরতে লাগলাম। ইকবাল হলে স্পষ্টত দুটো এবং জগন্নাথ হলে চারটি রকেট ছোড়া হয়েছিল। রুমের বেশীরভাগই ছিল দগ্ধ কিন্তু অক্ষত। কিছু ডজন খানেক আধপোড়া রাইফেল এবং ইতস্তত কাগজপত্র থেকে তখনও ধোয়া উড়ছিল। ক্ষয়ক্ষতি ছিল ভয়াবহ, কিন্তু ততটা ভয়াল নয় যতটা আমি দেখেছিলাম হেডকোয়ার্টারে জেনারেল টিক্কা খানের বারান্দা থেকে।

 

বিদেশী সংবাদমাধ্যম কয়েক হাজার মৃত্যুর (বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়) খবর ছাপল। সেখানে আর্মি অফিসাররা শ’খানেক এর কথা জানায়। অফিসিয়ালি, মাত্র ৪০ জন।

 

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে আমি ঢাকা শহরের প্রধান সড়কগুলো ঘুরতে থাকি। সেখানে দেখলাম ফুটপাত ও রাস্তার মোড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাশ পড়ে আছে। সেখানে লাশের কোন স্তুপ ছিল না, যেমনটা পরবর্তীতে দাবী করা হয়। তবে আমার এক অদ্ভুত ও অশুভ অনুভূতি হতে থাকে। আমি জানি না সেটা কেন হচ্ছিল, কিন্তু সেখানে আর বেশিক্ষন থাকতে পারি নি। আমি গাড়ি নিয়ে অন্য এলাকায় চলে আসি।

 

পুরোনো শহরে তখনও ব্যারিকেড দেয়া ছিল, কিন্তু জনমানবশূন্য।  সবাই নিজ নিজ বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে ছিল। রাস্তার পাশে আমি একটি ছায়া দেখলাম, দ্রুতই সেটা অন্যদিকে সরে গেল। শহর একবারপ প্রদক্ষিনের পর আমি ধানমন্ডি পৌছে সেখানে মুজিবের বাড়িতে ঢুকলাম। বাড়িটি জনমানবশূন্য। বাড়ির বিক্ষিপ্ত অবস্থা দেখে বোঝা যায় এখানে তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর একটি দীর্ঘকায় ছবি ব্যাতীত মনে রাখার মত আর কিছু সেখানে আমি পাই নি। ফ্রেমটি কয়েক কয়েক টুকরো থাকলেও ছবিটি ছিল অক্ষত।

 

বাড়ির বাহিরের গেইটটিও তার সৌন্দর্য্য হারিয়েছে। মুজিবের সময় তারা বাংলাদেশের একটি রেপ্লিকা মানচিত্র টানিয়েছিল যেখানে তারা ছয়টি তারকা চিহ্নও স্থাপনে করেছিল। ছয়টি তারকা আওয়ামীলীগের ছয় দফা’কে নির্দেশ করে। কিন্তু এখন সেখানে ছিদ্র হওয়া কিছু লোহার শিক ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নাই। গৌরবের যে ইতিহাস শুরু হয়েছিল তা দ্রুতই নি:শেষ হয়েছে।

 

দুপুরের খাবারের জন্যে আমি দ্রুতই ক্যান্টনমেন্ট ফিরে আসি। সেখানে এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশ দেখতে পেলাম।  সারা শহরের ট্রাজেডী সেনাকর্মকর্তা ও তাদের অধীনস্তদের কে স্বস্তি দিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়েছিল তা অবশেষে শেষ হয়েছে। কমলালেবুর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে ক্যাপ্টেন চৌধুরী বলে ‘বাংগালীদের উপযুক্তভাবে শায়েস্তা করা গিয়েছে- কমপক্ষে একটা প্রজন্ম পর্যন্ত।’ ‘ হ্যা, তারা শুধু শক্তির ভাষা জানে, তাদের ইতিহাস তাই বলে’- মেজর মালিক যোগ করলেন।

 

অপারেশন সার্চলাইট – ২

 

যদিও ঢাকা রাতারাতি অসাড় হয়েছিল, প্রদেশের অন্যান্য অংশও সময়ের সাথে স্বাভাবিক হতে থাকে। নির্দিষ্ট ভাবে চট্টগ্রাম,  রাজশাহী ও পাবনা এই তিনটি অঞ্চল এর জন্যে আমরা কিছুদিন পর্যন্ত উদ্বিগ্ন সময় কাটাই।

 

চট্টগ্রামে বাংগালী এবং পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যসং্খ্যা ছিল যথাক্রমে প্রায় ৫০০০ এবং ৬০০। আগেই গঠিত হওয়া ইস্ট বেংগালী সেন্টার (২৫০০), নতুন গঠিত ৮ ইস্ট বেংগল, ইপিআর এর একাংশ ও সেক্টর হেডকোয়ার্টার এবং পুলিশ। অন্যদিকে আমাদের সৈন্যদলের মূল অংশ ২০ বেলুচ এর একাংশ, যাদের অগ্রবর্তী দলটি পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত গিয়েছিল। একজন সিনিয়র অ-বাংগালী অফিসার, লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ফাতিমি, তাকে আদেশ দেয়া হয় কুমিল্লা থেকে সাহায্য আসার আগ পর্যন্ত যেন দখল ধরে রাখা হয়।

 

বিদ্রোহীরা প্রাথমিকভাবে প্রচুর সাফল্য পায়। ফেনীর কাছাকাছি শুবাপুর ব্রীজ ধ্বংস করে কুমিল্লা থেকে আগত সৈন্যদলের যাত্রা সার্থকভাবে প্রতিহত করে। চট্টগ্রাম শহর ও ক্যান্টনমেন্ট এর অধিকাংশ এলাকাও তারা নিয়ন্ত্রন করছিল। সরকারের নিয়ন্ত্রনাধীন একমাত্র জায়গা ছিল ২০ বেলুচ এলাকা ও নেভাল বেইজ। বিগ্রেডিয়ার মজুমদার (যাকে উদ্দ্যেশ্যমূলক ভাবে কিছুদিন আগেই ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়) এর অনুপস্থিতিতে মেজর জিয়াউর রহমান, ৮ম ইস্ট বেংগল রেজিমেন্ট এর সেকেন্ড ইন কমান্ড, বিদ্রোহীদের নেতৃত্বভার গ্রহণ করে। সরকারী সৈন্যদল যখন রেডিও স্টেশনের বিল্ডিং পাহারা দেবার জন্যে ঘিরে রেখেছিল, মেজর জিয়া তখন কাপ্তাই রোডে আলাদাভাবে স্থাপিত ট্রান্সমিটার এর দখল নিয়ে নেয়। সেখানে সে সহজলভ্য সব যন্ত্রপাতি দিয়ে বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষনা’ প্রচার করে। চট্টগ্রামে সাহায্য পৌছোনোর আগ পর্যন্ত আর কিছুই করার ছিল না।

 

জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেইন সেনাদের অগ্রগতি থেমে যাবার খবর পান পরদিন মাঝরাত থেকে আরো ৫০ মিনিট পর। তিনি বিগ্রেডিয়ার ইকবাল শফি’কে জলপথ ধরে, ব্রীজ ছেড়ে দ্রুততম সময়ের মাঝে চট্টগ্রাম অভিমূখে অগ্রসর হতে বলেন। কেননা এলাকাটি ছিল প্রচন্ড শত্রুভাবাপন্ন। কিন্তু বিগ্রেডিয়ার শফি অগ্রসর হতে পারেন নি। তিনি পরদিন সকাল ১০ টা নাগাদ এগোতে শুরু করেন। কিন্তু পুনরায় কুমীরা’য়, চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গোলাগুলির সম্মূখীন হন। অগ্রগামী দলের কমান্ডিং অফিসার সহ প্রায় ১১ জন হতাহত হয়। সেনাদলটি ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার (কুমিল্লা) ও ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টার (ঢাকা) উভয় স্থানের সাথেই যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে।

 

সৈন্যদলের ব্যাপারে তথ্যের ঘাটতি ঢাকায় প্রচন্ড উদ্বেগের জন্ম দেয়। তাদেরকে কি নৃশংস ভাবে হত্যা করা হল? যদি তাই হয় তাহলে চট্টগ্রামের ভবিষ্যত কি? এটা কি বিদ্রোহীদের দখলেই থাকবে? শত্রুদের দখলেই যদি থাকে, তাহলে কি পাওয়া গেল ‘অপারেশন সার্চলাইট’ থেকে?

 

পরদিন জিওসি আর্মি হেলিকপ্টার নিয়ে নিজেই হারিয়ে যাওয়া সৈন্যদলটি খুজতে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি প্রথমে চট্টগ্রাম যাবেন সেখান থেকে চট্টগ্রাম-কুমিল্লা রোড অনুসরন করবেন। এর মাঝে সেনাদলটি যদি অগ্রসর হতে পারে, সেটা হয়ত তিনি চট্টগ্রামের আশপাশে দেখতে পাবেন। তার হেলিকপ্টারটি উড়ে ২০ বেলুচ এলাকায়, চট্টগ্রামে পাহাড়ের উপর নামার মুহুর্তে বিদ্রোহীদের অস্ত্রের সম্মুখীন হয়, যারা উচু স্থানে অবস্থান নিয়েছিল। হেলিকপ্টারটি আঘাতপ্রাপ্ত হলেও কোন ক্ষতি হয় নি। এটি নিরাপদেই অবতরণ করে। জিওসি’কে নামিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ফাতিমি চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত ব্রিফ করেন। কর্ণেল বিজয়ীর মত ইস্ট বেংগল সেন্টারে তার সাফল্য বর্ননা করতে থাকেন, যেখানে প্রায় ৫০ জনকে হত্যা ও ৫০০ বিদ্রোহীকে আটক করা হয়। যদিও চট্টগ্রামের বাকী অংশ বিদ্রোহীদের সাথেই ছিল।

 

জিওসি যখন খোজ চালানোর উদ্দ্যেশ্যে হেলিকপ্টারে ফিরছিলেন তখন বাচ্চা কোলে নিয়ে এক ভয়ার্ত মহিলাকে দেখেন। মহিলাটি ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের একজন অফিসার এর স্ত্রী, যিনি উদ্ধার পেয়ে ঢাকা যেতে চাচ্ছিলেন। তাকে সাথে নেয়া হয়।

 

হেলিকপ্টারটি ছিল অন্যতম সেরা পাইলট মেজর লিয়াকত বোখারী’র দক্ষ হাতে, আর তার সহকারী ছিল মেজর পিটার। তারা জিওসি’কে নিয়ে কুমিল্লা রোড বরাবর উড়ে যায়, কিন্ত মেঘের কারনে নিচে কিছুই দেখা যায় নি। কুমীরা’র ঠিক উপরে পৌছানোর পর জিওসি একটি কোয়ার্টার ইঞ্চি ম্যাপ হাটুর উপর বিছিয়ে নিয়ে পাইলটকে আদেশ দেন হেলিকপ্টারটিকে মেঘের নিচে নামানোর জন্যে। হেলিকপ্টারটি নিচে নামার সময় জিওসি তার ঘাড় বাহিরে বের করা মাত্রই একঝাক বুলেট নীচ থেকে ছুটে আসে। পাইলট অভ্যাসবশতই উপরে উঠে আসে। যদিও তার যানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি বুলেট কপ্টারটির লেজ ঘেষে চলে যায়, অন্যটি ঠিক পেট বরাবর এসে লাগে, যেটা ছিল ফুয়েল ট্যাংক থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। মেজর বোখারী এই ঘটনায় একেবারেই অবিচলিত থেকে জিওসি’কে জিজ্ঞেস করলেন- ‘স্যার, আপনি কি আমাকে আরেকবার চেষ্টা করতে বলবেন?’ ‘না, সরাসরি ঢাকা ফিরে চল।’ মিশনটি ব্যার্থ হয়েছে। সেনাদলটিকে খুজে পাওয়া যায় নি।

 

অন্যদিকে জেনারেল মিট্টা একটি কমান্ডোদল (পুরোনো ৩ কমান্ডো ব্যাটালিয়ন) আকাশপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে প্রেরণ করেন, যাদের উদ্দ্যেশ্যে ছিল সেই সেনাদলটির সাথে একত্রিত হওয়া। তারা হারিয়ে যাওয়া সেনা বা বিদ্রোহীদের অবস্থান, কারো সম্পর্কেই জানত না। এ কারনে তাদেরকে শুধু নিজেদের সংবাদ দাতাদের উপরই নির্ভর করতে হচ্ছিল। হঠাতই ক্যাপ্টেন হামিদ নামে একজন বাংগালী অফিসার উদয় হয়। সে এসে কমান্ডো দলের কমান্ডিং অফিসারকে বলে ‘আমি আমার বাবা-মা’র খোজে এসেছি। তারা চট্টগ্রামে থাকেন। আমি ঐ এলাকাটা ভাল ভাবে চিনি। আমি কি গাইড হিশেবে আপনাদের সাথে যেতে পারি?’ তার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

 

২৭ শে মার্চ কমান্ডোদল লিংক আপ অপারেশন শুরু করে। জিওসি তার ট্যাকটিকাল হেডকোয়ার্টার চট্টগ্রামে স্থানান্তর করেন।  সেখান থেকেও ২০ বেলুচ এর একটি দলও একই উদ্দ্যেশ্যে পাঠানো হয়, কিন্তু ভিন্ন রাস্তায়। তিনটি সৈন্যদলের একত্রিত হবার উপরেই এই অপারেশনের সাফল্য নির্ভর করছিল।  ২০ বেলুচ তাদের নিজেদের এরিয়া ছাড়ার কিছুক্ষনের মাঝেই বিদ্রোহীদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কমান্ডোদল উদ্দ্যেশ্যের কাছে গিয়ে প্রচন্ড সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তাদের সাথে বাংগালী অফিসারটিও ছিল। তবে চট্টগ্রাম কুমিল্লা রোডে পাহার থেকে গুলি শুরু হবার পর তারা আর বেশী অগ্রসর হতে পারে নি। কমান্ডিং অফিসার সহ ১৩ জন সেখানে নিহত হয়। এর মাঝে ছিল ২ জন ইয়াং অফিসার, ১ জন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার, ও ৯ জন অন্যান্য র‍্যাংক এর সদস্য। অপারেশনটি প্রচন্ড ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়।

 

অন্যদিকে কুমীরা ঘটনার পর বিগ্রেডিয়ার ইকবাল শাফি সেনাদলের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। কুমিল্লা থেকে প্রেরিত মর্টার তার কাছে পৌছায় ২৭শে মার্চ। ২৮শে মার্চ ভোরে তিনি আক্রমনের পরিকল্পনা করেন। সেই আক্রমনটি সফল হয়েছিল। তিনি সকল বাধা ভেংগে চট্টগ্রামে অগ্রসর হতে সক্ষম হন। শেষপর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরের প্রান্তে হাজী ক্যাম্পে তিনি তার উপস্থিতি জানান দেন, যেখানে হজযাত্রার উদ্দ্যেশ্যে আগে থেকেই জাহাজ প্রস্তুত ছিল।

 

হাজী ক্যাম্পের পাশেই ছিল ইস্পাহানী জুট মিলস। সেখানে আমাদের সেনারা পৌছবার আগেই বিদ্রোহীদের দ্বারা রক্তের এক নির্মম খেলা মঞ্চায়িত হয়ে যায়। তারা সেখানে ক্লাব বিল্ডিং এর ভেতরে অ-বাংগালী পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের জড়ো করে নির্মম ভাবে হত্যা করে। আমি কয়েকদিন পর সেই বীভতস দৃশ্য পরিদর্শন করে সেখানে দেয়াল ও মেঝেতে রক্তের দাগ দেখেছিলাম। মহিলাদের পরিধেয় বস্ত্র ও শিশুদের খেলনা সেখানকার রক্তে ভিজে চুপসে গিয়েছিল। পাশের বিল্ডিং এ আমি জমাট বাধা রক্তে শক্ত হয়ে যাওয়া বিছানার চাদর ও ম্যাট্রেস দেখতে পাই।

 

এতসব ঘটনা যখন ঘটছিল, পাকিস্তান আর্মি তখনও তিনটি সেনাদলের একত্রিত হবার চেষ্টায় রত ছিল। শেষপর্যন্ত ২৯ শে মার্চ তারিখে তারা একত্রিত হয়। এই সুখবরটি রেডিও মারফত ঢাকা পৌছলে অপারেশন রুমে সবার মাঝে স্বস্তির ফিরে আসে। কিন্তু ইস্পাহানী মিলে নির্যাতন হাউজে হতাহতদের জন্যে এটা ছিল অনেক দেরীতে।

 

চট্টগ্রামে এতক্ষন পর্যন্ত একমাত্র সাফল্য হল আওয়ামীলীগ এর নেতাকর্মীদের দ্বারা ঘেরাও করে রাখা জাহাজ থেকে প্রায় ৯০০০ টন গোলাবারুদ আনলোড করা। ঢাকা থেকে আসা বিগ্রেডিয়ার এম এইচ আনসারী হাতের কাছে থাকা সকল রিসোর্স একত্রিত করেন। এর মাঝে ছিল একটি ইনফ্যান্ট্রি প্লাটুন, কিছু মর্টার, ও দুটি ট্যাংক। এদের সকলকে নিয়ে একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়। নেভী একটি ডেস্ট্রয়ার ও কিছু গানবোট দিয়ে সাহায্য করে। অবিশ্বাস্য দক্ষতার মাধ্যমে তিনি এই সাফল্য অর্জন করেন। পরবর্তীতে আরো একটি ব্যাটালিয়ন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গিয়ে যোগ দেয়।

 

যদিও রিসোর্স জড়ো করার ব্যাপারে অবস্থার উন্নতি ঘটছিলি,  চট্টগ্রামের মূল যুদ্ধ এখনও বাকী রয়ে গিয়েছে। কেননা তখনও রেডিও ট্রান্সমিটারস, ইপিআর সেক্টর হেডকোয়াটার্স ও জেলা জজ এলাকায় রিজার্ভ পুলিশ লাইন খালি করা বাকি ছিল। এই এলাকাগুলোতে পুলিশ, সাবেক চাকুরিজীবিগণ ও সশস্ত্র নেতাকর্মীরা জড়ো হয়েছিল।

 

জেনারেল মিট্টা প্রথম ব্যাক্তি যিনি ট্রান্সমিটার বিল্ডিং এ যাবার প্রয়োজনীতা অনুভব করেন। বিল্ডিংটি উড়িয়ে দেবার জন্যে তিনি একটি কমান্ডো দল পাঠান। তার দলটি লক্ষ্যের উদ্দ্যেশ্যে নদীপথে পাশ থেকে অগ্রসর হয়। নৌকায় থাকা অবস্থায়ই তারা প্রচন্ড গোলাগুলির সম্মুখীন হন। ১৬ জন সেখানে মারা যায়। মিট্টা’র দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ক্ষয়ক্ষতির সম্মূখীন হয়ে শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়।

 

এরপর মেজর জেনারেল খাদিম, লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ফাতিমি’র নেতৃত্বে ২০ বেলুচ এর একটি দল প্রেরণ করেন। ফাতিমি যাত্রাপথে আবারও বিদ্রোহীদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পরে আর কখনই তিনি ট্রান্সমিটার বিল্ডিং এ পৌছুতে পারেন নি। অবশেষে ঢাকা থেকে আসা এফ-৮৬ এর সাহায্যে সেটা উদ্ধার করা হয়। আমি কয়েকদিন পর স্থানটি পরিদর্শন করেছিলাম। I found the building well fortified with pillboxes and foxholes-all are interconnected with a fine network of trenches. বিল্ডিংটি অক্ষত ছিল।

 

আরেকটি অন্যতম প্রধান টার্গেট ছিল ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস হেডকোয়ার্টার, যেখানে প্রায় ১০০০ সশস্ত্র বিদ্রোহী সুরক্ষিত অবস্থানে ছিল। জমি থেকে উচু স্থানে ঢাল বরাবর আড়ায়াড়ি ভাবে হালকা অস্ত্র ব্যবহারের উপযোগী ছিদ্র করে তারা দুর্দান্ত ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। আমাদের বাহিনী এ ব্যাপারটি জানত, তাই তাদের প্রতিহতের জন্যে সর্বোচ্চ প্রস্তুতিই নিয়েছিল। আক্রমনের জন্যে বাহিনীটি ছিল প্রায় এক ব্যাটালিয়নের সমপরিমান শক্তিশালী।  তাদের সাথে সাপোর্ট হিশেবে ছিল নেভাল ডেস্ট্রয়ার, দুটি গানবোট, দুটি ট্যাংক ও একটি হেভী মর্টার। বেপরোয়া সেই বিদ্রোহীদের দমন করতে প্রায় তিনঘণ্টা যুদ্ধ করতে হয়। এটা ঘটে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর ৬ষ্ঠ দিন, ৩১শে মার্চ তারিখে।

 

আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল রিজার্ভ পুলিশ লাইন্স, যেখানে বিদ্রোহীদের ব্যবহারের জন্যে প্রায় ২০,০০০ হাজার রাইফেল সংগ্রহ করার খবর পাওয়া যায়। সেখানেও একটি পূর্ণাংগ ব্যাটালিয়নের সমপরিমান শক্তি নিয়ে আক্রমন করা হয়। এক্ষেত্রে বিদ্রোহীরা ইপিআর সদস্যদের মত দক্ষতার পরিচয় দিতে পারে নি। দ্রুতই তারা কাপ্তাই রোড বরাবর পিছিয়ে যায়।

 

উল্ল্যেখিত স্থানগুলোতে প্রতিরোধ দমনের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন বিগ্রেডিয়ার আনসারী। তার এই সাহসীকতার জন্যে তাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বের পদক ‘হিলাল-ই-জুরুত’ পদকে ভূষিত করা হয়। এবং পরবর্তীতে তাকে পদোন্নতি দিয়ে ‘মেজর জেনারেল’ করা হয় (যদিও ইতোপূর্বে তাকে দমিয়ে রাখা হয়েছিল)।

 

চট্টগ্রামের মূল অপারেশন শেষ হয় মার্চ এর শেষ নাগাদ, কিন্তু পুরো একশন চলে ৬ই এপ্রিল পর্যন্ত। কুষ্টিয়া ও পাবনা ছিল অন্য দুটি শহর যেখানে তখনও বিদ্রোহীদের প্রাধান্য ছিল। চলুন দেখা যাক সেখানে আমাদের সেনারা কিভাবে অগ্রসর হয়েছিল।

 

কুষ্টিয়া, যশোর থেকে প্রায় ৯০ কিমি দূরবর্তী, সড়ক ও রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। আমাদেএ সেনারা সেখানে স্থায়ীভাবে ছিল না। আমাদের অবস্থান সেখানে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে পরদিন ২৭-বেলুচ একটি কোম্পানি সেখানে পাঠানো হয়। আমাদের কোম্পানি তখন শুধুমাত্র কিছু হালকা অস্ত্র, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ও সীমিত পরিমান গোলাবারুদ সাথে নেয়। তারা ভেবেছিল এটা ছিল শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ডিউটি। সেনাদের কেউ ভারী সংঘর্ষে জড়ানোর কথা চিন্তা করেনি।

 

কোম্পানি কমান্ডার তার জনবলকে দুটি ছোট ভাগে ভাগ করে দেন। এবং তাদেরকে রেডিও স্টেশন ও ভিএইচএফ স্টেশন পাহাড়ায় পাঠান। এছাড়া একটি ছোট দলকে তিনি স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাদের গ্রেফতার করতে পাঠান, যদিও সেই সব নেতাদের সবাই পালিয়ে গিয়েছিল। প্রথম দিনেই পাচজন বিদ্রোহীকে হত্যা করে তিনি তার উপস্থিতি জানান দেন। পরবর্তীতে শুধুই কার্ফিউ প্রয়োগ ও বেসামরিক লোকদের কাছ থেকে অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়। দুই দিন শান্তিপূর্ণভাবে কেটে গেল।

 

২৮শে মার্চ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে স্থানীয় পুলিশের সুপারিটেন্ডেন্ট ভয় ও আতংকে ফ্যাকাশে চেহারা নিয়ে কোম্পানী কমান্ডার এর নিকট হাজির হয়। মেজর শোয়েব জানায় বিদ্রোহীরা কুষ্টিয়া থেকে ১৬ কিমি দূরে সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলায় জড়ো হয়ে আক্রমনের পরিকল্পনা করছে। এমনকি তারা সহযোগীদেরকেও হত্যার হুমকি দিচ্ছিল। কোম্পানী কমান্ডার এই খবর তার প্লাটুনের সবার মাঝে পৌছে দিলেও সেনারা এটাকে গুরুত্ব দেয় নি। এমনকি তারা তাদের নিরাপত্তা পরিখাও খনন করে নি।

 

আক্রমনটি শেষ পর্যন্ত করা হয় ভোর পৌনে চারটায় (২৯শে মার্চ), সাথে ছিল ভারী মর্টার এর গোলা।  এই ঘটনা আমাদের সেনাদের নিরাপত্তা বিভ্রমকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দেয়।

 

দ্রুতই তারা বুঝতে পারে আক্রমনকারীরা আর কেউ নয় বরং ১ম ইস্ট বেংগল। তাদেরকে কিছুদিন আগেই যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাঠানো হয়। তারা চুয়াডাঙ্গা গিয়ে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এর সাথে যোগ দেয়। (যশোর ও সিলেটের কাছ থেকে যথাক্রমে ৪জন ও ২ জন বিএসএফ সদস্যকে আটক করা হয়)

 

যুদ্ধের চেহারা এমন ছিল যে আমাদের সেনারা আগেই পুলিশ অস্ত্রাগার দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু বিদ্রোহীরা পাশেই স্থানীয় জজের তিন তলা লাল বিল্ডিং বেয়ে উঠে পড়ে, এবং সেটাকেই একটা সুবিধাজনক অবস্থান হিশেবে ব্যবহার করে। সেখান থেকে তারা পুলিশ বিল্ডিং এর দিকে একনাগাড়ে গুলি ছুড়তে থাকে। ভোর হতে হতে পাচ জন নিহত হয়। সকাল ৯টা নাগাদ নিহতের সং্খ্যা দাড়ায় ১১তে। পরবর্তী আধঘন্টায় মারা যায় আরো ৯জন। অল্প কয়েকজন তখন সেখান থেকে হাফ-কিলোমিটার দূরে কোম্পানি হেডকোয়ার্টারে বেচে ফিরতে পেরেছিল। গোলাবারুদের স্বল্পতা ও সাহায্যের অভাবই ছিল এই ক্ষয়ক্ষতির মূল কারন।

 

অন্যদিকে কুষ্টিয়া শহরেও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও ভিএইচএফ এক্সচেঞ্জ একইভাবে প্রচন্ড আক্রমনের সম্মূখীন হয়। তাই কোন অংশই অপর দলকে সাহায্য করতে পারেনি। কোম্পানি হেডকোয়াটার্সে এক জায়গায় ১১ জন ও অন্য জায়গায় ১৪ জন মারা যায়। সর্বোপরি ৬০ জন সেনার মাঝে ২৫ জন নির্মমভাবে মারা যায়। যশোরের উদ্দ্যেশ্যে তীব্র সাহায্য এমনকি এয়ার স্ট্রাইক’ও চেয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু কুষ্টিয়ায় কিছুই পৌছে নি। যশোর থেকে সর্বশেষ যেই ম্যাসেজটি আসে তার শেষ কথাগুলো ছিল- ‘এখানকার সেনারা এখন দৃড়প্রতিজ্ঞ। আপাতত কোন সাহায্য সম্ভব নয়। পরিস্কারভাবে দেখা না যাবার দরুন এয়ার স্ট্রাইক বাতিল করা হয়েছে… খোদা হাফিজ।’

 

মেজর শোয়েব তার সেনাদের বাকী সকলকে জড়ো করেন। তিনি দেখতে পেলেন তার ১৫০ জন সেনার মাঝে মাত্র ৬৫ জন বেচে ফিরতে পেরেছিল। তিনি কুষ্টিয়া ছেড়ে বেচে ফেরত আসা সকলকে নিয়ে যশোর যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তার সাথে একটি ৩টনী ট্রাক, ১টি ডজ ও ৬টি জিপ সাথে নেন। বহরটি রাতে রওনা দেয়, আর তার নেতৃত্বে একদম প্রথম জিপে অবস্থান নেন কোম্পানি কমান্ডার। বহরটি কেবলমাত্র ২৫ কিমি যাবার পরই, মেজর শোয়েবকে বহনকারী গাড়িটি সহ সামনের সারির গাড়িগুলো একটি কালভার্টে গিয়ে আটকে পড়ল। কেননা সেটি আগে থেকেই বিদ্রোহীরা কেটে রাখে। বহরটি থামামাত্রই এটি প্রচন্ড গুলির সম্মূখীন হয়। আমাদের সেনারা সাথে সাথে মাটিতে নেমে লুটিয়ে পড়লেও বৃষ্টির মত গুলি আসতেই থাকে। ৬৫ জনের মাঝে মাত্র ৯জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও তাদের অধিকাংশদের পরে আটক করে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়।

 

অন্যদিকে পাবনায় ঘটনার অনেক কিছুই কুষ্টিয়ার ক্ষয়ক্ষতির সাথে মিলে যাচ্ছিল। এখানে ২৫ পাঞ্জাব এর একটি কোম্পানি পাঠানো হয় রাজশাহী থেকে। তাদের প্রধান কাজ ছিল শুধু নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়া। তিন দিনের রেশন আর ফার্স্ট লাইন কিছু অস্ত্র নিয়ে ১৩০ জনের একটি দল পাবনা পৌছে। পাবনা পৌছেই কোম্পানিটি ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পাওয়ার হাউজ, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ এর মত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অবস্থান নেয়। তারা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বাসায় হানা দিলেও কাউকেই খুজে পায় নি। কোম্পানিটি কোন প্রতিরোধ ছাড়াই সেখানে অবস্থান নিশ্চিত করেছিল, আর প্রথম ৩৬ ঘন্টা নিরাপদেই কাটিয়ে দেয়। কিন্তু ২৭শে মার্চ সন্ধ্যা ৬টার দিকে সকল পোস্টের উদ্দ্যেশে প্রচন্ড গুলি শুরু হয়। বিদ্রোহীদের দলে ছিল ইপিআর (৯০০জন), ৩০ জন পুলিশ ও আওয়ামীলীগের ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবক। তারা আমাদের শক্তিমত্তা সম্পর্কে জানত না। তাই কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তারা আমাদের উপর আঘাত করতে থাকে। আমাদের পক্ষ পাল্টা জবাব দিলেও গোলাবারুদের স্বল্পতার কারনে সে বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল। একজন এনসিও (নন কমিশন্ড অফিসার) ও অন্য র‍্যাংকের আরো দুইজন প্রাথমিক সংঘর্ষে মারাত্মকভাবে আহত হয়।

 

ক্যাপ্টেন আসগর’কে অনবরত একজন বিদ্রোহী হালকা মেশিনগান থেকে গুলি করে যাচ্ছিল। ক্যাপ্টেন তাকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কয়েকজনকে সাথে নিয়ে সে তার অবস্থান পরিবর্তন করে। সে একটি হ্যান্ড গ্রেনেড ছোড়ার চেষ্টা করলে সেটি পোস্টের ভেতরেই বিস্ফোরিত হয়। একইসাথে মেশিনগান এর একটি গুলি তাকে আঘাত করে। মারাত্মকভাবে আহত হয়ে গেইটের পিলার এর পেছনে আশ্রয় নিলে সেটি তার উপরই ভেংগে পড়ে। আক্রমনটি গুটিয়ে ফেলা হয়। লেফটেন্যান্ট রশিদ এর এমন আরো একটি প্রচেষ্টাও তার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে ব্যার্থ হয়ে যায়।

 

এদিকে একমাত্র টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ব্যাতীত সকল পোস্টই আক্রমনের শিকার হয়। বিদ্রোহীরা পুনরায় একত্রিত হয়ে সেখানে সর্বশক্তি নিয়ে আক্রমন করে। আমাদের প্রতিরোধকারী সেনারা তাদের বোকামী বুঝতে পারলেও ততক্ষনে অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। তাদের মারাত্মক মূল্য দিতে হয়েছিল সেখানে। ২জন অফিসার, ৩ জন জেসিও ও অন্যান্য পদবীর ৮০ জন সেখানে প্রান হারায়। আরো একজন অফিসার ও অন্যান্য পদবীর প্রায় ৩২ জন মারাত্মক আহত হয়। বারবার সাহায্য চাইবার প্রেক্ষিতে আহতদের উদ্ধারে একটি হেলিকপ্টার আসলেও সেটি মাটিতে নামতে পারেনি। অন্যদিকে মেজর আসলাম সাহায্য করতে কোনরকমে রাজশাহী থেকে পাবনা আসতে সক্ষম হন। ১৮ জন সৈন্যসহ তার সাথে ছিল একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, একটি মেশিনগান এবং কিছু গোলাবারুদ। আহতদেরকে তিনি একটি গাড়িতে তুলে রাজশাহীতে অন্য পথে পাঠিয়ে দেন। আর সুস্থ-সবল বাকী সেনাদের তার সাথে নিয়ে নেন রাজশাহীতে ফেরার সময় পথে তার সাথে যুদ্ধ করার জন্যে। কিন্তু পথে প্রচন্ড প্রতিরোধের মুখে তিনি তার দল নিয়ে গ্রামের পথ বেছে নেন, যেখানে তাদেরকে তিনদিন কোন খাবার ও পানি ছাড়া কাটাতে হয়েছিল। সৈন্যদলটি শেষপর্যন্ত পহেলা এপ্রিল সকাল দশটায় রাজশাহীতে পৌছে। তবে মাত্র ১৮ জন সৈন্য ব্যারাকে ফিরতে পেরেছিল। মেজর আসলাম সহ বাকি সেনারা পথেই নিহত হন।

 

এভাবেই চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া ও পাবনা শহরে আমরা সর্বাধিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হই। এই শহরগুলো যথাক্রমে ৬, ১৬ ও ১০ই এপ্রিল দখলে আসে। অন্যান্য এলাকা যেখানে আমাদের শক্তি বেশি ছিল, সেখানে কোন ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই আমাদের সেনারা দখল নেয়।

 

বিদ্রোহীরা শুধুমাত্র পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাদের হত্যা করেই ক্ষান্ত দেয় নি। বরং তারা বেসামরিক লোকজনদের উপরেও চরম নির্মমতা দেখায়। এখানে সব বলা সম্ভব না হলেও এই বিষয়ে অন্তত একটি ঘটনা আমি উল্ল্যেখ করতে চাই।

 

২ ইস্ট বেংগল রেজিমেন্ট এর অবস্থান তখন ছিল ঢাকা থেকে ৩০ কিমি উত্তরের স্থান জয়দেবপুরে। সেখানে তখন বেশ কিছু প্রতিভাবান অফিসার,জেসিও ও এনসিও (টেকনিক্যাল ট্রেডস) কর্মরত ছিলেন। সাধারন পরিকল্পনার অংশ হিশেবে তখন ইস্ট বেংগল রেজিমেন্টকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে দূরে রাখা হয়। কেননা তাতে পশ্চিম পাকিস্তানি ইউনিটের সাথে ঝামেলায় জড়ানোর সম্ভাবনা ছিল। ২ ইস্ট বেংগল রেজিমেন্ট এর তিনটি কোম্পানি ট্রেনিং এর জন্যে টাংগাইল, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ চলে যায়। চতুর্থ কোম্পানিটি জয়দেবপুরে একটি প্রাসাদ ভবনে অবস্থিত ব্যাটালিয়ন হেডকোয়াটার্সে রয়ে যায়। এইটা সেই একই জায়গা যেখানে আমি ‘৭০ এর ফেব্রুয়ারীতে বর্ণিল পুরস্কার বিতরণ দেখেছিলাম।

 

২৮শে মার্চ, অন্যান্য বাংগালী ইউনিট থেকে খবরের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাটালিয়নটি বিদ্রোহ করে বসে। আদর্শগত অবস্থান পরিবর্তনের পরই তাদের প্রথম কাজ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী সহকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নির্মম ও অবৈধভাবে হত্যা করা। একজন সুবেদার, সুবেদার আইয়ুব যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিল, কোনরকমে তাদের নির্যাতন থেকে পালিয়ে এসে ২৮শে মার্চ ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট পৌঁছায়। সেই প্রথম সবাইকে এই খবর দেয়। হেডকোয়ার্টারে পৌছুবার পর আমি তাকে দেখলাম। ভয়ে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে ছিল। সেই সাথে তার শুকনো ঠোটের দুই পাশটাও সাদা হয়ে ছিল। সবাই তাকে অনবরত প্রবোধ দিতে থাকলেও কোন পরামর্শ শোনা বা এক কাপ চা নেবার জন্যেও সে তৈরি ছিল না। সে সাহায্যের জন্যে প্রার্থনা করতে থাকল, তাতক্ষনিক সাহায্য।

 

পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এর কোম্পানি পাঠানো হয়। শক্তিবৃদ্ধির জন্যে প্রেরিত সেই সৈন্যদলের সাথে কিছু তরুন অফিসার স্বপ্রনোদিত হয়ে যোগ দেয়। কিন্তু সেনাদল ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টারে প্রবেশের পর জীবনের সবচেয়ে লোমহর্ষক দৃশ্য দেখে। ময়লার একটি ঢিবির মত করে পাচটি শিশুর মৃতদেহ পড়ে ছিল। তাদের সবাইকে অংগহানি করে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বেয়নেট দিয়ে তাদের পেট খোঁচানো পাওয়া যায়। সেই বাচ্চাদের মা’দের লাশ অন্য একটি ঢিবিতে জবাই করা ও বিকৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সুবেদার আইয়ুব সেইসব লাশের মাঝ থেকে তার পরিবারের সদস্যদের সনাক্ত করে। এই ঘটনার পর মানসিক ধাক্কায় সে আক্ষরিক অর্থেই পাগল হয়ে যায়।

 

প্যালেস কম্পাউন্ড এর ভেতরে ওয়্যারলেস সেট সহ একটি জিপ পার্ক করা ছিল। কিন্তু জিপের টায়ার ছিদ্র ছিল আর গাড়ির সিটগুলো ছিল রক্তে চুপসে যাওয়া। ওয়্যারলেস সেটের উপরেও ছিল ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। বিল্ডিং এর ভেতরে খোঁজাখুঁজি শুরু করার পর একটি বাথরুমে রক্তমাখা কাপড় পাওয়া যায়। পরবর্তীতে এই কাপড় গুজরানওয়ালা’র ক্যাপ্টেন রিয়াজ এর বলে চিহ্নিত হয়। অন্যান্য র‍্যাংকের ফ্যামিলি কোয়ার্টার এর ভেতরে তারা একটি নারীকে মৃত পরে থাকতে দেখে, যেখানে একটি শিশু সেই নারীর বুকের দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছিল। অন্য একটি কোয়ার্টারে চার বছর বয়সী ভয়ার্ত একটি মেয়েকে পাওয়া যায়। সেনাদের পাশে বসেই ‘আমাকে মেরে ফেল না, আমার বাবা বাসায় আসার আগে দয়া করে আমাকে মেরে ফেল না’ বলে মেয়েটি কান্নাকাটি করছিল। তার বাবা আর কোনদিন বাসায় ফিরে আসে নি।

 

সব স্টেশন থেকেই এমন একই রকম খবর আসছিল। তাদের কিছু কিছু শুনতে খুবই অতি-নাটকীয় শোনালেও তার সবই ছিল নির্মম সত্য।

 

কয়েক মাস পর পাকিস্তান আর্মি’র চীফ অফ স্টাফ জেনারেল হামিদ আমাকে বলেন এরকম সকল ফলাফলের দায়ভার অবশ্যই লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুব এর উপর বর্তায়। কেননা সে মার্চের প্রথম সপ্তাহে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের এখানে পৌছুনোর বিরোধিতা করে। সে যদি আমাদের সময়মত সৈন্যদের প্রস্তুত করতে দিত, তাহলে প্রধান শহরে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনারা নি:সন্দেহে এমন বন্য হত্যা প্রতিরোধ করতে পারত।

 

উল্ল্যেখ করা যেতে পারে জেনারেল ইয়াকুব কোন প্রকার বাধা না থাকা সত্ত্বেও কুতসিত ভাবে আর্মি ক্র‍্যাক ডাউন এর বিরোধিতা করে যাচ্ছিলেন। এভাবেই অপারেশন গ্রেট ফ্লাইন খুব দ্রুত শুরু হয়ে যায় (২৬শে মার্চের আগে নয়)। আগত সেনাদের চাপের মুখে দ্রুতই বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

 

মূল শহরের অবস্থা স্বাভাবিক হতে শুরু করলে রাজ্যের অন্যান্য শহরেও শক্তিশালী সেনাদের দল পাঠানো শুরু হয়। এখানে আমি একটি দলের যাত্রা সম্পর্কে বলতে চাই, যেই দলটি পহেলা এপ্রিল ঢাকা থেকে টাংগাইল যাচ্ছিল। আমি তাদের সাথে ছিলাম। ট্রাকভর্তি সেনাদের মূল দলটি মেশিনগান সমেত রাস্তা দিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করে, যেখানে অন্যদুটি কোম্পানী প্রায় ৫০০ মিটার দূরত্ব রেখে রাস্তার দুই ধার দিয়ে তাদের অনুসরণ করতে থাকে। জীবিত বা মৃত বা সম্ভাব্য যে কোন কিছুর জন্যেই তারা প্রস্তুত ছিল। তাদের ক্রোধ থেকে কোন কিছুরই রেহাই ছিল না। ইনফ্যান্ট্রি দলটির পেছনে স্থাপিত হালকা কামান থেকে যাত্রা অভিমুখে কিছুক্ষন পরপর গোলা নিক্ষেপ করা হয়। কামানের এই গর্জন রাস্তা থেকে বিদ্রোহীদের ভীত সন্ত্রস্ত করে সরিয়ে দেবার জন্যে ছিল যথেষ্ট।

 

ইনফ্যান্ট্রি দলটি সামান্যতম অজুহাত বা সন্দেহ হলেই আর চুপ থাকে নি। গাছের নড়াচড়া অথবা আশপাশের বাড়ি থেকে আসা সামান্য আওয়াজই তাদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র অথবা অন্তত রাইফেলের গুলি ছোড়ার জন্যে যথেষ্ট ছিল। আমি করতোয়া থেকে একটু আগে টাংগাইল রোডের একটি ঘটনা মনে করতে পারি। সেখানে খুব ছোট একটি জনবসতি ছিল, যার আদৌ হয়ত কোন নাম ছিল না। কয়েকজন সেনা সেখানে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে খড়ের তৈরি কুঁড়েঘর ও তদসংলগ্ন বাশাঝাড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তারা কিছুদুর সামনে এগোতেই গরমে উত্তপ্ত হয়ে প্রচন্ড শব্দে বাশগুলো ফাটতে শুরু করে। কিন্তু সবাই এই শব্দকে লুকিয়ে থাকা কোন ‘শয়তান’ এর রাইফেলের গুলি বলে ধরে নেয়। ফলাফল সরুপ গোটা সেনাদলের মনযোগ সেই গ্রামের মধ্যে নিবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সকল প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছোড়া হয়। হুমকির উতস দমন হবার পর আদেশ দেয়া হয় সাবধানে পুরো এলাকা খোজার জন্যে। এলাকাটা খোঁজাখুঁজির সময় সেনারা দেখামাত্রই সেই ‘শয়তান’কে গুলি করার প্রস্তুতি নিয়ে ছিল। কিন্তু সেখানে জীবিত বা মৃত কোন জনমানুষের চিহ্ন পাওয়া যায় নি। এটা ছিল আসলে বাশ থেকে আসা শব্দ যার কারনে সেনাদের অগ্রসর হওয়া প্রায় ১৫ মিনিট থেমে যায়।

 

করতিয়া ছিল ঘন ও বণ্য গাছে ঘেরা একটি লাজুক শহর। সেখানের উল্ল্যেখযোগ্য জিনিস হল একসারি দোকানের স্থানীয় বাজার। মানুষজন তাদের বাড়ি ফেলে চলে গিয়েছে। তারা সবাই কোথায় গেল? এটা তদন্ত করা কঠিন ছিল। সেনারা সেখানে থেমে এলাকাটা ঘুরে দেখে, ফিরে আসার সময় তারা বাজারটা পুড়িয়ে দেয় এবং কিছু কেরোসিন এর ড্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। দ্রুতই এটা অগ্নিকান্ডে রূপ নেয়। ধোয়ার কুন্ডলী সবুজ গাছের শাখাপ্রশাখা ভেদ করে উপরে যেতে থাকে। সেনারা তাদের প্রচেষ্টার ফল দেখতে অপেক্ষা না করে দ্রুতই সামনে অগ্রসর হয়। শহরের অন্য প্রান্তে এসে আমি দড়ি দিয়ে বাধা একটি মেষশাবক দেখতে পাই,যার ঘর আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। সে সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে অনবরত চেষ্টা করলেও কোন ফল হচ্ছিল না কেননা তার ঘাড়ের চারপাশে দড়ি দিয়ে আটকানো ছিল। উপরন্তু প্রতিবার চেষ্টায় সেটা আরো শক্তভাবে তার গলায় আটকে যেতে থাকে। ও অবশ্যই নিজেই নিজেকে শ্বাসরোধ করে মারবে।

 

আরো কিছু কি.মি. সামনে এগোনোর পর আমরা রাস্তার পাশে ভি-আকৃতির দুটি তাবু দেখতে পাই, যেগুলো কেবলই খোড়া হলেও দ্রুতই ছেড়ে যাওয়া হয়েছে। সম্ভবত বিদ্রোহীরা এখানে আমাদের মুখোমুখি হবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল কিন্তু গোলাগুলির শব্দে এলাকা ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ যাই হোক না কেন, সেনারা এলাকাটি পরিস্কার না করে এগোতে পারে না। সেনারা যখন এলাকাটি’তে তল্লাশি চালাচ্ছিল, আমি তখন এখানকার মানুষ কিভাবে বাস করে তা দেখার জন্যে একটি মাটির তৈরি কুড়েঘরে ঢুকলাম। সেখানে দেখি ঘরের ভেতরের দেয়ালটা হালকা ধূসর রংের পরিস্কার মাটির আবরন দিয়ে আচ্ছাদিত। ঘরের দেয়ালে দুটি বাচ্চার ছবি ঝোলানো ছিল, সম্ভবত তারা ভাই-বোন। আর ঘরের ভেতর আসবাব বলতে শুধু ছিল একটা চারপায়া আর খেজুর পাতার পাটি। পাটির উপরে একমুঠো সেদ্ধ ভাত পড়ে থাকতে দেখলাম, যেখানে তখনও কারো হাতের ছাপ ছিল। তারা এখন কোথায়? তারা কেন চলে গেল?

 

আমি হঠাত একটি তর্কের আওয়াজ শুনে এই এলোমেলো ভাবনা থেকে জেগে উঠলাম। তর্কটি হচ্ছিল একজন সৈনিক ও এক বাংগালী সিভিলিয়ান বৃদ্ধের মাঝে, যাকে তারা একটি কলাগাছের নিচে খুজে পায়। সহায়তা না করলে বারবার মেরে ফেলার হুমকি দেয়া সত্ত্বেও বৃদ্ধ লোকটি দুর্বৃত্তদের ব্যাপারে কোন ধরনের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল। কি ব্যাপার সেটা দেখতে আমি সেদিকে এগিয়ে যাই।

 

কংকালসার লোকটির কোমরের চারপাশে ময়াল তালিদেয়া একটি লিনেন জড়ানো ছিল। তার দাড়িভর্তি মুখে ছিল ভয়ার্ত চাহনি। আমার চোখ তার অর্ধনগ্ন শরীরের আপাদমস্তক পর্যবেক্ষন করে ময়লা পা’র ফুলে ওঠা শিরা-উপশিরায় এসে স্থির হল। আমাকে প্রচন্ড কৌতুহলী দেখতে পেয়ে সে আমার দিকে ঘুরে বলতে লাগল “আমি একজন গরীব মানুষ। আমি জানি না আমার কি করা উচিত। কিছুক্ষন আগে তারা (দুর্বৃত্ত’রা) এখানে ছিল। আমি যদি কিছু বলি এই জন্যে তারা আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে যায়। আর এখন আমি যদি কিছু না বলি তাহলে আমাকে আবারও সেই ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি এনে দাড় করাচ্ছ।” এর দ্বারাই সাধারন বাংগালীদের উভয় সংকট অবস্থা স্পষ্ট হয়।

 

সেনারা তাদের পরিশ্রমী যাত্রা অব্যাহত রাখে। অবশেষে সন্ধ্যায় তারা টাংগাইল পৌছে। সেখানে তারা সার্কিট হাউজে বাংলাদেশের পতাকা পরিবর্তন করে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা টানিয়ে দেয় এবং তাদের উপস্থিতি জানান দেয়ার জন্যে বাতাসে আটটি গোলা ছুড়ে। রাতের জন্যে সেনারা সেখানেই থেকে যায়। আমি ঢাকা ফিরে আসি।

 

এই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ অত্যন্ত উতসাহের সাথে শত্রুপক্ষের একটি বিশ্ব-সংবাদ এ প্রচার হয়, যদিও ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ওর প্রাথমিক সময়ে এমন কিছুই ছিল না। পরবর্তীতে প্রলম্বিত সিভিল ওয়ার এর বিভিন্ন সময়ে এটা বারবারই ঘটতে থাকে। লক্ষ্য অর্জনের উদ্দ্যেশ্যে ইনফ্যান্ট্রি সেনাদলকে কুমিল্লা, যশোর, রংপুর, সিলেট ও কিছু অন্য এলাকা থেকে পাঠানো হয়েছিল। সেনারা মূলত পাকা রাস্তা ধরে অগ্রসর হয় যেন বিদ্রোহীরা গ্রামের ভেতর দিয়ে সীমানা পার হয়ে যেতে পারে, ফলশ্রুতিতে যেন তারা তাদের ভারতীয় রক্ষাকর্তার হাতে গিয়ে পড়ে। সেনা ও সরঞ্জাম পাবার উপর ভিত্তি করে অভিযানগুলোর দ্রুততা নির্ভর করেছিল।

 

২৬শে মার্চ থেকে ৬ই এপ্রিল এর মধ্যবর্তী সময়ে অতিরিক্ত লোকবল ও সরঞ্জাম হাতে এসে পৌছে। এই সময়ের মাঝে দুটি ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টার (৯ ও ১৬ ডিভিশন), ৫ ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারস, ১ কমান্ডো, ১২ ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন এসে পৌছে। তারা তাদের সকল ভারী সরঞ্জাম পশ্চিম পাকিস্তানে ফেলে আসে, কেননা তারা মূলত এসেছিল বিদ্রোহ দমন করতে, যুদ্ধ করতে নয়। আরো তিনটি ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন ও দুটি মর্টার ব্যাটারি এসে পৌছে যথাক্রমে ২৪শে এপ্রিল ও ২রা মে। ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেস ও ওয়েস্ট পাকিস্তান রেঞ্জার্স এর প্রতিটি থেকে দুটি করে উইং নিয়ে গঠিত প্যারামিলিটারী বাহিনী এসে পৌছে ১০ই এপ্রিল থেকে ২১শে এপ্রিল এর মধ্যবর্তী সময়ে। পাশাপাশি ছিল নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ারের উল্ল্যেখযোগ্য সং্খ্যক স্কাউট। তারা মূলত আসে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও পুলিশের শূণ্য স্থান পূরণ করতে।

 

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত সেনাদের দ্বারা শক্তিবৃদ্ধি সম্পন্ন হলে তাদেরকে অপারেশন সার্চলাইট পুরোপুরিভাবে শেষ করার কাজে লাগানো হয়। যদিও সেটা আনুষ্ঠানিক ভাবে কখনই সমাপ্ত হবার ঘোষণা দেয়া হয় নি। এপ্রিল এর মাঝামাঝি সময়ে প্রদেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ শহর সুরক্ষিত হবার পর এর উদ্দ্যেশ্য অর্জন হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়।

 

গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো নিম্নবর্ণিত তারিখে সুরক্ষিত হয়:

পাকশী (১০ এপ্রিল), পাবনা (১০ এপ্রিল), সিলেট (১০ এপ্রিল), ঈশ্বরদী (১১ এপ্রিল), নরসিংদী (১২ এপ্রিল), চন্দ্রঘোনা (১৩ এপ্রিল), রাজশাহী (১৫ এপ্রিল), ঠাকুরগাঁও (১৫ এপ্রিল), কূষ্টীয়া (১৬ এপ্রিল), লাকসাম (১৬ এপ্রিল), চুয়াডাঙ্গা (১৭ এপ্রিল), ব্রাক্ষনবাড়িয়া (১৭ এপ্রিল), দর্শনা (১৯ এপ্রিল), হিলি (২১ এপ্রিল), সাতক্ষীরা (২১ এপ্রিল), গোয়ালন্দ (২১ এপ্রিল), দোহাজারী (২২ এপ্রিল), বগুরা (২৩ এপ্রিল), রংপুর (২৬ এপ্রিল), নোয়াখালী (২৬ এপ্রিল), শান্তাহার (২৭ এপ্রিল), সিরাজগঞ্জ (২৭ এপ্রিল), মৌলোভীবাজার (২৮ এপ্রিল), কক্সবাজার (১০মে), হাতিয়া ১১ মে।

 

এতক্ষন যাবত বর্ণিত অপারেশন সার্চলাইটের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মাঝে ঠিক কত সং্খ্যক মানুষ হতাহত হয়েছে বা নির্যাতন সহ্য করেছে তার সং্খ্যা আমি জোগাড় করতে পারি নি। কিন্তু আমি আমার অনুমানের জোরে সাক্ষ্য দিতে পারি যা সংঘর্ষের ফলে মৃতের সং্খ্যা বড়জোর চারঘর স্পর্শ করতে পারে। এটা বিদেশি বার্তাসংস্থা যারা পৃথিবীকে বিশ্বাস করিয়েছে কয়েক মিলিয়ন মানুষ সেই রাতে মারা গিয়েছে। এর দায় নিতে হবে তাদেরকে যারা ২৬ শে মার্চ সন্ধ্যায় বিদেশি প্রেসকে ব্যাখ্যা করেছে এবং তাদেরকে ভারতীয় প্রচারমাধ্যম বা একগুয়ে পর্যটকদের খামখেয়ালিপনার উপর নির্ভর করতে বাধ্য করেছে। যদি ২৫ শে মার্চের পরে বিদেশী সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করতে দেয়া হত তাহলে তারা দেখতে পেতেন তাদের মাঝে সবচেয়ে পক্ষপাতদুষ্টের বর্ণনায় যে ভয়াবহতা ও লোমহর্ষক ঘটনা উঠে এসেছে, প্রকৃত ঘটনা ছিল তার চাইতে অনেক কম।