বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন।

Posted on Posted in 4

<৪,১৬০,৩০৯-৩২১>

অনুবাদকঃ সৈয়দা ইসরাত জাহান কনক, আল-জাবির মোহাম্মদ,কাজী সাদিকা নূর

          শিরোনাম              সূত্র             তারিখ
১৬০। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন।ক্যালিফোর্নিয়াস্থ প্যাসিফিক স্টাডিজ সেন্টার প্রকাশিত বুলেটিন 

              ১৯৭১

 

                     বাংলাদেশে বিদ্রোহ 

                                               মে ৭. ১৯৭১

                 জুডিথ মিলগ্রম কার্রনো কর্তৃক 

               প্যাসিফিক স্টাডিজ সেন্টারের সদস্য।

 

তীব্র লড়াইয়ের শেষ পর্যায়ে এবং মুক্তিফৌজের আপাত ছত্রভঙ্গে, পূর্ব পাকিস্তানের সংবাদ সামনের পাতা থেকে সরে যাচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তান কখনোই আগের মতো হবে না। ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মত, মিলিয়ন পাকিস্তানি সহিংস হত্যাকান্ডের স্বীকার হল। তবুও যেখানে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের ফলে যে হত্যাকান্ড হয়েছিল তার একটি ধর্মীয় ভিত্তি ছিল, বর্তমানে যা পশ্চিম পাকিস্তানকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিভক্ত করে প্রাথমিকভাবে তা হল পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাত দ্বারা পূর্ব বাংলার অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ। (পাকিস্তানের স্বাধীনতার পূর্বে, পূর্ব পাকিস্তান ব্রিটিশ বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল পূর্ব বাংলা-যা বর্তমানে বাংলাদেশ নামে পরিচিত-হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান। পশ্চিম বাংলা ভারতের অধীনে অবস্থিত)।

 

মূলত নিরস্ত্র বাঙালিরা মোকবিলা করেছিল ৭০,০০০ পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে যারা আমেরিকান, রাশিয়ান, ফ্রান্স এবং চাইনিজ অস্ত্র দ্বারা সুসজ্জিত ছিল। মধ্যপন্থী নেতারা মৃত, কারারুদ্ধ এবং নির্বাসিত হওয়ার ফলে, তাদের সংগ্রাম সর্বোৎকৃষ্ট “জনগণের যুদ্ধ”-এ রূপ নেয়— বাঙালী জনগণের সর্বজনসম্মত সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত ভিয়েতনামীয় মডেলে গরিলা সংঘর্ষ। যেহেতু ভারত ইতিমধ্যে মাওবাদী গরিলার মুখোমুখি হয়েছে তাদের পশ্চিম বাংলা প্রদেশে এবং চায়না পূর্ব বাংলার নিকট প্রতিবেশি, তাই এ যুদ্ধের ফলাফল বিস্তৃত তাৎপর্য্য রয়েছে। ভিয়েতনামে যেমন এর বিচার হয়তো প্রদেশের আনুষ্ঠানিক সীমানা ভঙ্গ করে।

 

পাকিস্তানের অধিবাসীদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বাসস্থান, বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে একটি অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল- এর ৭৫০ মিলিয়ন মানুষ বাস করে লুইসিআনার আকৃতির একটি এলাকায়। ব্রিটিশ শর্তাধীন যুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীনতার ফলে পাকিস্তান সংযুক্ত ছিল হাজার হাজার মাইলের ভারতীয় এলাকার অপর প্রান্তে অবস্থিত পূর্ব বাংলার সাথে, ঐ সকল মানুষের সাথে যাদের সাথে ধর্ম ব্যাতিত তাদের মিল ছিল খুব সামান্য, এমনকি ভাষারও নয়। এখন, পূর্ব ও পশ্চিমের সে উত্তপ্ত শত্রুতার ইতিহাসের পর, উন্মুক্ত যুদ্ধ প্রথম কিছু সপ্তাহেই এক মিলিয়ন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু ঘটিয়েছে।

                     বর্তমান অবস্থা

পাকিস্তান সর্বপ্রথম এক-মানুষ, এক-ভোট নির্বাচনের প্রর্বতন করে গত ডিসেম্বরে, যা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক অনুষ্ঠিত শ্রমজীবী এবং ছাত্র আন্দোলনের মুখে তা অনুমোদন দেয়া হয়, যা তাদের পূর্বসূরি আইয়ুব খানের পতন ঘটায়। এ নির্বাচন অপ্রতিরোধ্য বিজয় আনীত করে পূর্ব ও পশ্চিমের নামমাত্র সমাজতাত্ত্বিক প্রার্থীদের। পশ্চিমে পাকিস্তান পিপল’স পার্টি (পিপিপি)র নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো সহজেই জয়লাভ করে, যেখানে জাতীয় পরিষদ নিয়ন্ত্রণের ভার যায় শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার মধ্যপন্থী আওয়ামী লীগের হাতে। (বাংলায় “শেখ” ইংরেজিতে “স্কোয়ার”র সাথে সমতুল্য।)

নির্বাচনসমূহের জাতীয় পরিষদ মনোনীত করার কথা ছিল যা পাকিস্তানের জন্য নতুন সংবিধান রচনা করবে। এবং ২০ পরিবারের ক্ষুদ্র পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাতরা স্বাধীনতার পর থেকে দুটি প্রদেশ শাসন করে আসছিল, মুজিবের বুর্জোয়া আওয়ামী লীগের ব্যালেট-বক্স ক্ষমতা পূর্ব বাংলা স্বায়ত্বশাসনের দাবি বজায় রেখেছিল। জেনারেল ইয়াহিয়া যদি পূর্বনির্ধারিত তারিখ ২৫ মার্চে সভা আহ্বান করতেন, লীগ সদস্যগণ হয়তো ভারতের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পুনরধিকার প্রতিষ্ঠা করে (যা নিষিদ্ধ হয় ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর) এবং নিজেদের আর্থিক ব্যাপার স্বপরিচালনা করে পূর্ব বাংলাকে আধা-স্বায়ত্তশাসন রাষ্ট্র হিসেবে নির্বাচিত করতো। পশ্চিম পাকিস্তানি প্রদেশ পাঠান এবং বেলুচিস্তানের স্বায়ত্বশাসন খুব সম্ভবত জাতীয় প্রতিরক্ষা এবং বৈদেশিক নীতি থেকে কেন্দ্রিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ত্যাগের অনুসারী হতো।

 

যদিও এখানে পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাতেরা যুদ্ধব্যতীত তাদের সর্বোচ্চ ধনী প্রদেশ ছেড়ে দেবে তার কোনরকম কারণ ছিল না, মুজিবুর নির্বাচন পরবর্তী বেসামরিক অবাধ্যতা এবং কর্মবিরতিকে তাঁর ব্যক্তিগত অনুমোদন দেয়, যা প্রতিবাদ করেছিল তাঁর ভাষায় “সংখ্যাগরিষ্ঠতা দমনের”। তাঁর আওয়ামি লীগ কোন ধরণের সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়নি অন্যদিকে জেনারেল ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের সভা আহ্বান করতে গড়িমসি করছে, শেষ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানের বিজেতা ভুট্টোর সাথে একটি মিটিংয়ের জন্য মুজিবকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যার বুর্জোয়া পিপিপি-এর বাঙালিদের স্বায়ত্বশাসনের অধিকার দেবার কোন ইচ্ছাই ছিল না। মিটিং ব্যর্থ হল এবং ২৬ শে মার্চ ইয়াহিয়া বাংলায় আওয়ামী লীগ এবং  সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। ২৭শে মার্চ, মুজিবুরের নামে বাংলাদেশ গোপন রেডিও থেকে ঘোষণা করা হয় যে, স্বাধীন বাংলাদেশ (বাঙালি জাতি), তার নিরস্ত্র জনগণকে পূর্ব বাংলার রাস্তায় একত্রিত করছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী কঠোর পশ্চিম পাকিস্তানি জেনারেলদের চাপের মুখে, প্রায় সকল অফিসার এবং সৈন্যবাহিনী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি—ইয়াহিয়া বাংলায় অবস্থানরত ৭০,০০০ কেন্দ্রিয় সরকারের সেনাবাহিনীকে আদেশ দিল বিদ্রোহ চূর্ণ করে দিতে। বাইরে থেকে কোন সুদীর্ঘ অভিযান হস্তক্ষেপ করতে পারে এ ভীতিতে, হয়তো তা ভারত থেকে, তিনি তার প্রদেশের কমান্ডার টিক্কা খানকে বললেন তাকে আটচল্লিশ ঘন্টার সময় দেয়া হল এ কাজ সমাধা করার জন্য। সেনাবাহিনীর ঝটিকা অভিযান শুরু হল ২৫শে মার্চ প্রয়াত সন্ধ্যায়।

 

এখানে প্রতীয়মান যে পাকিস্তানি জেনারেল অত্যন্ত সূক্ষভাবে কিছু বাঙালি গোষ্ঠী নির্বাচন করেছিল তাঁদের সমগ্রভাবে বিনাশ করার জন্য। তাদের তালিকায় ছিল আওয়ামী লীগের নেতাগণ, পূর্ব বাংলার পেশাদার মানুষগণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়। ট্যাংক ব্যাটেলিয়নের মধ্যরাতের আক্রমণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় পাঁচ শতাধিক ছাত্রকে হত্যা করা হয়।

“বিশ্ববিদ্যালয়ের দালানের বাইরে তাজা সমাধি স্তুপ” টাইমস অব লন্ডন ২রা এপ্রিলের প্রতিবেদন করে। “প্রতিটি রুমের ভেতর থেকে রক্ত প্রবাহ।” 

 

পাকিস্তানি বাহিনী রাস্তায় চলমান কোন মানুষের প্রতি অথবা তার স্ত্রী এবং সন্তানদের প্রতি নম্র ছিল না । নগর এবং বড় শহরগুলোতে মর্টার, ট্যাংক এবং মেশিন গান ব্যবহার করা হত। গ্রামাঞ্চলে, শরণার্থীরা তাদের ঘর ছেড়ে পালানোর সময়, পাকিস্তানি বিমান বাহিনী বোম, নাপাম ছুঁড়ে দিয়ে আক্রমণ চালাত। বাঙালী দেশজ পোশাক পরিহিত যেকোনো মানুষের জন্য অবস্থা নিরপেক্ষ মনে হয়।

 

শহরগুলো সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। “শহরে একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড হয়েছে” একজন পালিয়ে আসা ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার বন্দরনগরী চট্রগ্রামের বর্ণনা করেন। “যদি বন্দুকবাহী কোন মানুষ রাস্তায় কাউকে খুঁজে না পেত, তারা মর্টার, বোমা ঘরের জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দিত।” 

 

ঢাকাতে সৈন্যবাহিনী শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতা এবং ছাত্রদেরই অন্বেষণ করেনি, পুলিশ এবং অগ্নিনির্বাপক কর্মীদেরও অন্বেষণ করেছে। পায়ে হেঁটে কলকাতা পালিয়ে আসা ছাত্রনেতা সাজাহান সেরাজের মতে,

 

, সৈন্যবাহিনী একটি বাদে প্রতিটি পুলিশ স্টেশনে অভিযান চালিয়েছিল, দেয়ালের বিপরীতে পুলিশ সদস্যদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করেছিল তারা। অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের প্রতিও একই ব্যবহার করা হয়, স্পষ্টত ঢাকার “পুরান শহর” এলাকায় ২৬শে মার্চ সেনাবাহিনী টহলের জন্য রাস্তা ফাঁকা করার উদ্দেশ্যে। সিরাজ কর্তৃক বর্ণিত, প্রধানত হিন্দু কোয়ার্টারগুলোর বাসিন্দারা অগ্নিশিখা থেকে বাঁচতে চেষ্টা করার সময় তারা সেনাবাহিনী কর্তৃক মেশিন-গান দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। শহরের অন্যদিকে, সৈন্যবাহিনী অগ্নিনিক্ষেপকারীদের ব্যবহার করে ৫০,০০০ মানুষ বসবাসরত আবাসিক কমপ্লেক্সগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়, এবং যখন বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে আসে, সিরাজ বলেন, “তাদের হত্যা করা হয়েছিল”।

 

যখন তিনি  শহর ছেড়ে পালানোর জন্য শরণার্থী শিবিরে যোগ দিলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দু’দিক থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে, সিরাজ বলেন, “হাজার” মানুষ হত্যা করে। পূর্ব বাংলার শহরগুলো এখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

 

অন্যত্র যুদ্ধ হচ্ছিল খুবই নির্মমভাবে, যদিও বাঙালিদের অস্ত্র ছিল আদিকালীন। পশ্চিম পাকিস্তানি ৭০,০০০ অস্ত্রে সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ৯,০০০ সদস্য নিয়ে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস সজ্জিত করা হয়, কেবলমাত্র সীমানায় প্রহররত সশস্ত্রবাহিনী এ ক্ষুদ্র বাহিনীকে নিরুৎসাহিত করতে যথেষ্ট ছিল। তারা অবশিষ্ট ৩০০০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মানুষ দ্বারা যোগদান করে, কারণ বাংলাদেশ রেডিও থেকে স্বাধীনতার ঘোষণায় এসেছে ইস্ট বেঙ্গল সেনাবাহিনী এবং তাদের পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসারদের মধ্যকার অগ্নিযুদ্ধের কথা। কিন্তু স্বাধীন বাংলার সমর্থনকারী জনগণ যারা রাজপথে নেমে এসেছে, বাংলার বাতাসে যাদের স্লোগান এবং গ্যারিশন ঘেরাও করে রেখেছে তাদের ছিল শুধুমাত্র শাণিত লাঠি এবং তীর-ধনুক। পশ্চিম বাংলার প্রতিবেশি ভারতের প্রদেশ কলকাতা থেকে বর্ণিত যে-শত শত বাঙালি ভারত সীমান্তে এসে অস্ত্র ভিক্ষা চাইছে।

 

খুব খারাপ প্রস্তুতি থাকা সত্বেও বাঙালিরা কঠোর যুদ্ধ করছে। ভারতীয় প্রেস এজেন্সি(পিটিআই) থেকে বর্ণিত, যশোর শহরে পাকিস্তান নিয়মিত ১৫০০ বাঙালিদের মেশিন-গান দ্বারা হত্যা করতো-অনেকেই সজ্জিত থাকতো সারেঙ্গ এবং অন্তর্বাসে—বিমানবন্দরটি হস্তাগত করার প্রয়াসে তাদেরকে মাস্তুল, অক্ষ, ছোরা, কুঠার প্রভৃতি দিয়ে অভিযুক্ত করা হত। দক্ষিণ যশোরে কুষ্টিয়া জেলার অপারেশন বর্ণনাকালে জানানো হয়, একজন আওয়ামী লীগ নেতা টাইমস অব লন্ডনকে বলেন, যখন পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর ৩০০ জন সৈন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ঘিরে রেখেছিল, তারা তখন ৩০,০০০ বাঙালি কর্তৃক আবৃত ছিল যাদের নিকট ছিল লাঠি এবং পাথর। ভিড়কে লক্ষ্য করে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী কামান এব্য মর্টার ছোঁড়ে, কিন্তু আটাশ ঘন্টা পর যখন তাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসে, তাদেরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

 

যদিও পশ্চিম পাকিস্তানিদের তুলনায় বিমান, ট্যাংক, ট্রাকের ঘাটতি ছিল—অনিয়মিত পূর্ব বাংলা( আনুমানিক ৫০,০০০ মানুষ) গ্রামগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং কেন্দ্রীয় সরকার সৈন্যবাহিনীর নিকট জনহীন নগরী ও বন্দরগুলো ছেড়ে দেয়। এবং যখন তাদের হতাহতের পরিমাণ যখন অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়, তারা সেনাবাহিনীর মুখে নিরস্ত্র জনগণ হয়েও ৩,০০০ পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী(পিটিআই) হত্যা করে এবং অগণিত সংখ্যক প্রচণ্ড আহতদের বন্ধী করে। এমন স্তিমিত অবস্থায়,  ইয়াহিয়া পূর্ব বাংলায় অবস্থানরত তার সৈন্যবাহিনী চাঙ্গা করার জন্য ১০,০০০ অতিরিক্ত সৈন্য এবং অপ্রকাশিত সংখ্যক যুদ্ধবিমান পাঠায়।

 

পর্যবেক্ষকগণ আশা করেছিলেন, পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী যুদ্ধের প্রথম পর্যায় জয়লাভ করেছিল, কিন্তু বাঙালিরা সুযোগ নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে নিতে অপেক্ষা করছিল মৌসুমী বৃষ্টিপাতের এবং গরিলা কার্যকলাপের । গরিলা কর্মকান্ডের জন্য পূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চল ছিল অত্যন্ত উপযুক্ত। বাঙালিদের গৃহস্থ এলাকা, গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপূত্র ব-দ্বীপের হাজার নদী এবং জলস্রোতের বিভ্রান্তিকর মিলন শুষ্ক সমতল এবং পাহাড় হতে আশা পশ্চিমাদের কাছে বিশ্বাসঘাতক এবং সম্বন্ধহীন হয়ে ওঠে। “পশ্চিম শুধু বর্ষার জন্য লিখছে”, এপ্রিল ১৪ কে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন এক বাঙালি অফিসার।

 

“আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না যে তারা পানিতে কি পরিমাণ ভীতসন্ত্রস্ত। আর আমরা সহজেই পানিতে বিচরণ করতে পারি। তারা তাদের কামান এবং ট্যাংকগুলো ব্যবহার করতে পারত না এবং বিমানগুলোও উড়তে পারত না। প্রকৃতি আমাদের দ্বিতীয় সৈন্যবাহিনীতে পরিণত হবে।”

 

কিন্তু যুদ্ধের ফলে প্রধান শস্য ধান বপন সঙ্কুচিত হয়ে গেল যা কিনা আবহাওয়ার সময়সূচীর উপর নির্ভর করতো যদি বাঙালিরা কিছু মাস যাবৎ দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করতে না হয়। বর্ষা বাঙালিদের সামরিক সুবিধা দিবে, কিন্তু অনাহারের মাধ্যমে সে তার শুল্ক আদায় করে নিবে।

 

বাংলা গেরিলা যুদ্ধের নেতৃত্ব এসেছে অনেকটা ভিয়েতনাম থেকে- যেমন প্রাথমিক অবস্থায় জাতীয়তাবাদীর সংযুক্তি এবং অপ-সামাজ্ঞ্যবাদী দল গঠন হয়। অধিকাংশ আওয়ামী দলের নেতা হয় মারা গিয়েছেন নতুবা কলকাতায় নির্বাসিত হয়েছেন। ছোট মাওবাদী পার্টি-পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী) বাংলাদেশি ক্যাডাররা, অথবা ইপিসিপি-এমএল ঝটিকা অভিযানের পূর্ব অনুমান করেছিল এবং ব্রিজ, পাওয়ার স্টেশন এবং টেলিফোন লাইন ধ্বংসের মধ্য দিয়ে আঘাত হানার পূর্বে তারা গা ঢাকা দেয়। এ যুদ্ধে ইপিসিপি-এমএল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গরিলা যুদ্ধে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দান করছে।

 

                   ব্রিটিশ সামাজ্ঞ্যবাদ

 

জাতীয়তাবাদী, অপ-সামাজ্ঞ্যবাদ বাঙালিদের জন্য নতুন নয়। সামাজ্ঞবাদীতার বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম অনেক দীর্ঘ এবং রক্তাক্ত। আঠরো শতাব্দীর মাঝামাঝিতে ব্রিটিশদের থেকে জয়লাভ করে, ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ কমিশন কর্তৃক বর্ণিত বাংলার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন হচ্ছে, “অধিক অগ্রবর্তী ইউরোপীয় জাতিসমূহের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়।” সমগ্র পূর্ব থেকে ইউরোপে এটির কুটির টেক্সটাইল শিল্প রপ্তানি করতো অধিক সংখ্যক উৎকৃষ্ট মানের সুতা এবং সিল্কের কাপড়। স্বনির্ভর কৃষিক্ষেত্রে, বাংলা থেকে রপ্তানি হত চাল, চিনি এবং মাখন। মুঘল শাসনামলে- তাজমহল সভ্যতায়-বাংলা ছিল ইউরোপের সমকক্ষ, হয়তো সবকিছুতে তার চেয়েও উৎকৃষ্ট, অস্ত্র ব্যতীত। ১৯৫৭ সালে বিজয়ী দলের প্রধান, লর্ড রবার্ট ক্লাইভ ঢাকায় প্রবেশ করে বিষ্ময়ের সাথে প্রকাশ করেছেন যে, “এ শহরটি লন্ডন শহরের মতোই ব্যাপক, জনপ্রিয় এবং ধনী।”

 

কিন্তু এক প্রজন্মের মাঝেই, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী শাসকগোষ্ঠী এদেশ বিদ্ধস্থ করে ফেলল এবং মানুষদের দরিদ্র করে তুলল। পশমী বাণিজ্যের ক্ষেত্রে-যাতে বাঙালির কোন হাত নেই-কোম্পানীর প্রতিনিধি তা চাঁদাবাজিতে পরিণত করল। ১৯৬২ সালে ক্লাইভের হাতের পুতুল রাজবংশীয় নবাব কোম্পানীর এজেন্টের নামে অভিযোগ করেছিল যে তারা “জোরপূর্বক দ্রব্য ও পণ্য কৃষক এবং বণিকদের থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে এক-চতুর্থাংশ দামে এবং সন্ত্রাস ও নিপীড়নের মাধ্যমে এক রুপি সমমূল্যের দ্রব্য পাঁচ রুপি দিয়ে কিনতে বাধ্য করছে। ”

 

কিছু বছরের ব্যবধানে কোম্পানি ব্যাপক জলসেচন পদ্ধতির অনুমোদন দেয় ফসলাদি ধ্বংস করার জন্য এবং কর বাড়িয়ে দেয় কৃষকদের উপর বীজ এবং গৃহপালিত পশু পরিত্যাগ করতে সোজাসুজি বাধ্য করা যায়। পরিণামে ১৭৭০ এর পূর্ববর্তী সময়কার দুর্ভিক্ষ যাতে মৃত্যুর কারণ ছিল অনাহার এবং বাঙালি জাতির এক তৃতীয়াংশ তাতে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রাক্ষুসে হারে বাড়ছিল বাংলা লুটতরাজ করার মাধ্যমে, ইংল্যান্ডে শিল্প-সংক্রান্ত বিপ্লবের প্রথম ধাপ পূর্ণ হয়।

 

মৃত্যুর সঙ্গে মোকাবিলা বাংলার পোশাকশিল্পে আঘাত হানে। প্রথমে শুল্ক ব্যবহার এবং ব্রিটিশ ও ইউরোপীয়ান বাজারে বাঙালি পোষাকের সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পর, ব্রিটিশগণ ভারতীয় বাজারে মেশিনে প্রস্তুত দ্রব্যসামগ্রীর পরিচয় ঘটায়। কিছু বছরের মধ্যেই বাংলার কুটির শিল্প মৃত হয়ে পড়ে এবং এর ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব নির্বাহের জন্য তাদেরকে কৃষিক্ষেত্রে প্রেরণ করা হয়।

১৮৫০ সালে এককালের সমৃদ্ধ ঢাকা ক্লাইভের ১৫০,০০০ মানুষের লন্ডন থেকে সংকুচিত হয়ে ২০,০০০ লোকের গ্রামে পরিণত হয়। এবং ভারত আট ভাগের এক ভাগ ইংরেজ শ্রমিক সমাজের কর্মসংস্থান প্রদানের মাধ্যমে ব্রিটেন টেক্সটাইল উৎপাদনের এক চতুর্থাংশ আত্নভূত করে আসছিল।

 

বাঙালির বিখ্যাত পোশাকশিল্পের দক্ষতা এবং কারিগরি শুধুমাত্র অস্পষ্ট স্মৃতিতে পরিণত হয়, আধুনিক বাঙালিরা রপ্তানিজাত কৃষিজ অর্থনীতিতে অভ্যস্থ হয়ে ওঠে। চার-পঞ্চমাংশের বেশি অঞ্চল ধানি জমিতে পরিণত হয়। গড়ে প্রতিটি পারিবার প্রায় সাড়ে তিন একর জমিতে কাজ করে, সাধারণত বিস্তৃত বিচ্ছিন্ন (অকার্যকর জমি) খণ্ডে। জমিগুলো বছরে দুবার ধান চাষের উপযোগী ছিল, কিন্তু কৃষিকাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ- বর্ষার আবহাওয়ায় জমিগুলো প্রতি গ্রীষ্মে বন্যায় প্লাবিত হতো ও প্রতি শীতে শুকাত। গত কয়েক বছর ধরে ইস্ট পাকিস্তানকে এর প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের দশ শতাংশ আমদানি করতে হচ্ছে—যার বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

 

যদিও পূর্ব বাংলায় চা এবং সুপারি উৎপন্ন হতো, অধিকাংশ জমি যেগুলো ধান চাষের জন্য দেয়া হয়নি, সেগুলোতে পাট উৎপন্ন হতো (কৃষকদের প্রধান শস্য)। এ জমি থেকে উৎপন্ন পাট ব্যবহৃত হতো বিশ্বের চল্লিশ শতাংশ দড়ি, ব্যাগ এবং চটের থলে তৈরিতে। প্রধানত ঢাকায় সিভিল সার্ভিস এবং ছোট বাণিজ্য ব্যতীত- পাট ছিল শুধুমাত্র পূর্ব বাংলার শিল্প। পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাতরা, যারা কিনা সরকারের প্রথম এবং দ্বিতীয় পাঁচ বছর মেয়াদী পরিকল্পনাগুলোর জন্য মঞ্জুর হওয়া আন্তর্জাতিক তহবিলগুলোতে একচেটিয়া অধিকার ভোগ করে, এবং পূর্ব বাংলার পাট রপ্তানির দ্বারা অর্জিত আন্তর্জাতিক মূল্য বাজারে পাচার করে-এগুলোই মূলত আংশিকভাবে দায়ী পূর্ব বাংলায় এ শিল্পের অভাব তৈরিতে। স্বাধীনতার পর থেকে, পশ্চিম পাকিস্তানের পুঁজিবাদিরা কলকাতার ধনী হিন্দুদের সরিয়ে দেয় পাট প্রক্রিয়াজাতকরন কারখানা এবং রপ্তানি খামারের মালিক হিসেবে। যদি পূর্ব বাংলা নিজেকে পশ্চিম পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্ত করতে পারত তবে, তবে বাণিজ্যে ক্ষেত্রে তা অনুকূল হতো। এর পাট, বর্তমান সঙ্কটের পূর্বে, পণ্য রপ্তানিতে পাকিস্তানের মোট আয়ের অর্ধেক আয় করত-বছরে প্রায় পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার।

 

তাদের ইসলাম ধর্মের মিল ব্যতীত, বাঙালিদের পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব এবং পাঠানদের সাথে মিল খুব অল্প। এমনকি পূর্ব ও পশ্চিমের ভাষাতেও ছিল অমিল; পশ্চিমের উর্দু ছিল পার্সিয়ান ভিত্তিতে এবং আরবি লেখনী দ্বারা এবং পূর্বের বাংলা ছিল সংস্কৃত ভিত্তি ও লেখনী। যখন ব্রিটিশরা বাঙালিদের সংস্কৃতি ধ্বংস করলো, তারা ভারতীয় ঔপনিবেশে পাঞ্জাবীদের সামরিক, প্রশাসনিক এবং উদ্যোক্তার ভূমিকা পালনের প্রশিক্ষণ দিল। লম্বা এবং গৌরবর্ণের কারণে পাঞ্জাবীরা নিজেদের শ্রেয় মনে করে, অধিকতর খাটো এবং কৃষ্ণবর্ণের বাঙালিদের থেকে এবং পূর্বের মানুষরা তাতে তীব্র বিরক্তিবোধ করে।

 

অনেক বাঙালিরাই সঙ্গতকারনে বিশ্বাস করতো যে তারা তাদের ব্রিটিশদের নিকট ঔপনিবেশিক অধীনতা পশ্চিম পাকিস্তানিদের, বিশেষত পাঞ্জাবীদের নিকট, অধীনতার কাছে বিক্রি করেছে। অবাক হবার কিছুই নেই, বাঙালিরা প্রথম বিদ্রোহের শিকার হয় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, পরবর্তীতে পাকিস্তানি সাম্রাজ্যবাদের। ১৯০৫ সালে বাংলায় ব্রিটিশ পার্টিশন আনয়ন করে কঠোর জাতীয়তাবাদী স্পষ্ট প্রতিবাদ, যদিও ব্রিটিশ পলিসি মেকারগণ তাদের বিভক্তিকরণ ও নিয়মগুলো চাপিয়ে দেয় হিন্দু ও মুসলিম বাঙালিদের রাজপরিবারের উপদেস্টা পরিষদের জন্য পৃথক সদস্য নির্বাচনে ঠেলে দিকে। স্বাধীনতার পর, অনেক পূর্ব বাংলার মানুষ মুসলিম পাকিস্তান গঠনে অস্বীকৃতি জানায় বরং তারা ছিল পশ্চিম বাংলার সাথে ভাতৃত্ব গঠনের পক্ষে। বিভক্তির পর থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি পূর্ব বাংলার জনগণের অসন্তোষ বিভিন্ন সরকারি সঙ্কটের অধঃক্ষেপনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

                                                                      বাংলার রাজনীতি

কিন্তু বাঙালি রাজনীতি ঐতিহ্যগতভাবে হীনচেতা শিল্পপতি যেমন ধনী বণিক সম্প্রদায়, উচ্চবিত্ত পেশাদার মানুষ এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, যার মধ্যে বাঙালি সমাজের উঁচুশ্রেণীর কোন অভিজাত সম্প্রদায় কিংবা পুঁজিবাদী গোষ্ঠী অনুপস্থিত ছিল। আওয়ামী লীগের পক্ষে এই সমাজটি নেতৃত্ব দেয়। যদিও জাতীয় স্বায়ত্ত্বশাসনের পক্ষে দলটির প্রচার আওয়ামীলীগকে পশ্চিম বাংলার মফস্বল এলাকা ও শহরে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়,অনেক বাঙালীই সেনাবাহিনীর ঝটিকা আক্রমণের আগে শেখ মুজিবের মধ্যপন্থী মনোভাবের সমালোচনা করেন।

বাঙালী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের চাহিদাসমূহ ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ পার্টি (এনএপি) এর মাধ্যমে প্রচার করতে লাগল,যাদের উত্তর বাংলার কৃষক সমাজে শক্তিশালী সমর্থন ছিল এবং ট্রেড ইউনিয়নে কিছু প্রভাব ছিল। নামেই বোঝা যায়,এনএপি ছিল একটি জাতীয় দল,যাদের অনুসারীর মধ্যে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষক সমাজ,পাঞ্জাবের শিক্ষার্থী সমাজ,করাচীর শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবি সমাজ। সেনাবাহিনী স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না জেনে, এনএপি ডিসেম্বরের নির্বাচন বর্জন করে।

এনএপি, মস্কো এবং বেইজিং—এই দুই দলে বিভক্ত, যাদের মধ্যে মূল পার্থক্য হয়ে দাঁড়িয়েছে হয় শান্তিময় সমাজতন্ত্রের পথ অনুসরণ করো নাহয় অস্ত্র ধরো। মস্কোর ভাগটি পরিচালিত হয় বাংলার জাতীয়তাবাদী চেতনায় বলীয়ান, ছিয়াশী বছর বয়স্ক মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে। টাইমস অফ ইণ্ডিয়া একবার তাকে বেইজিং এর পক্ষে মনে করে প্রচার করে যে, “ভাসানী বেইজিং এর পক্ষে থাকার কলঙ্ক এখনো বহন করেন তা অবশ্যই ভুলে যেতে হবে”। কারণ, সম্ভবত,তিনি সম্প্রতি ভারতের আসাম প্রদেশ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর চায়না বিরুদ্ধ সরকারের থেকে অস্ত্র জোগাড়ের উদ্দেশ্যে।

তবুও, মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে এনএপি ব্যানারের অধীনে প্রায় ৫৫,০০০ সুসংগঠিত কৃষকের নেতৃত্বে ছিলেন। এবং যেখানে এনএপির কোন নির্ধারিত সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি ছিল না, এটি বাংলার কৃষি সমাজের আবশ্যিক প্রগতিবাদের চিত্র তুলে ধরে।

গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই,পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট দল – মার্ক্স লেনিনপন্থী ক্যাডারদের সাথে যোগ দিয়ে এনএপির কনিষ্ঠ সদস্যেরা আত্মগোপন করেন। মোহাম্মদ তোহা, যশোর এলাকার একজন অভিজ্ঞ সাংগঠনিক,মাওবাদী এপিসিপি এমএল এর নেতৃত্ব দেন। চল্লিশোর্ধ, শিক্ষিত তোহা ছিলেন ভাসানীর ডান হাত এবং ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত, এনএপির সম্পাদক।

এপিসিপি- এমএল বাইরে এর সংখ্যাসূচক শক্তি সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত জানে না। যদিও ধারণা করা হয়,তা খুবই কম ছিল। কিন্তু জানা গেছে,এই মাওবাদীরা সুসংগঠিত, তারাই পাকিস্তানে একমাত্র জ্ঞাত গোপনস্থান গঠিত করেছে।

যখন ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে শেখ মুজিবকে বন্দী করে রাখেন,কলকাতায় আওয়ামী লীগের কর্মকর্তাগণ বাংলাদেশের একটি “অস্থায়ী সরকার” গঠন করেন এবং ভারত ও যুক্তরাজ্যে প্রতিনিধি পাঠিয়ে “স্বাধীনতা যুদ্ধ” শুরু করার জন্য বন্দুক ও অন্যান্য সাহায্য এবং কূটনৈতিক সমর্থন চান।

                      বিদেশী শক্তি

গণহত্যার প্রতি বেশিরভাগ কূটনৈতিক মতবাদই ছিল বাগাড়ম্বরপূর্ণ। যুক্তরাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশে,পশ্চিম পাকিস্তানীদের চালানো গণহত্যার সমালোচনা করে এবং পাকিস্তানের “অভ্যন্তরীণ” সমস্যার একটি “শান্তিপূর্ণ সমাধান” দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রথমে সমস্যাটির প্রতি নিজেদের “উদ্বেগ” প্রকাশ করে,যদিও, তারাও এটিকে বলেছিল “অভ্যন্তরিণ সমস্যা”।  তারপর, এপ্রিলের মাঝখানে,এক আকস্মিক পরিবর্তনে ভারতীয় অবস্থান সমান্তরাল হয়।

নয়া দিল্লীর আমেরিকান রাষ্ট্রদুত কেনেথ কেটিং হত্যাকান্ডের নিন্দা জানান এবং বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা সমগ্র বিশ্বের জন্যে উদ্বেগের বিষয় এবং এটা অবশ্যই শুধুমাত্র পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন সমস্যা না।”

 

ঔপনিবেশিক শক্তি সরে গেলে এশিয়ার অন্যান্য অনেক জায়গার মত পাকিস্তানেও বিগত প্রায় পচিশ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শুন্যস্থান পূরণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে ধারাবাহিক সামরিক শাষন বজায় রাখার জন্যে বিলিয়ন ডলারের উপরে অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান করেছে যাকে জন ফস্টার ডুলস “স্বাধীনতার দুর্গ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। চলমান বছরের জন্যে যুক্তরাষ্ট্র ১৭৫ মিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। বেশির ভাগ সাহায্যই যথারীতি পশ্চিম পাকিস্তানে যাচ্ছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুখ্য সরবরাহকারী এবং ১৯৫০ সাল থেকে ৪,০০০ এরও বেশী পাকিস্তানি অফিসারদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে—যা পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার সেনাবাহিনীর একটি বৃহৎ অংশ। অন্যান্য আমেরিকান নব্য উপনিবেশের মতোই, সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬১ থেকে পাকিস্তানের পুলিশকে সক্রিয়ভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।

 

পাকিস্তানের অত্যন্ত অসামঞ্জস্যপূর্ন উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ ও পাঁচ বছরের পরিকল্পনাগুলোর জন্য সাহায্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের “মানবতাবাদীগণ” ও বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, বিশেষ করে হার্ভার্ড উন্নয়ন উপদেষ্টা সেবা ও স্ট্যানফোর্ডের গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে আসতো, যাদের আর্থিক জোগানদাতা ফোর্ড ফাউন্ডেশন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ বিজ্ঞানীরা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করছিলেন সেখানে পূর্ব বাংলা যুক্তরাষ্ট্রের উপর খাদ্য সহায়তার জন্য বিশেষ করে পিএল ৪৮০ (“শান্তির জন্য খাদ্য”) প্রকল্পের উপর নির্ভর করেছে। নাগরিক বিক্ষোভের কারনে যুক্তরাষ্ট্র সব পিএল৪৮০এর চালান বন্ধ করে দেয়, কারণ তারা বন্টন করতে পারছিল না।

 

পিএল-৪৮০ বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশে মারাত্মক খাদ্যঘাটতি দেখা দেয়। গত শরতের মারাত্মক সাইক্লোন গ্রামের পর গ্রাম নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে, লবণাক্ত পানিতে শষ্যক্ষেত্র ভরে যাওয়াতে আনুমানিক বাৎসরিক খাদ্যের ৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এবং যেহেতু গ্রীষ্মের শষ্য কাটার আগেই যুদ্ধ হয়ে গেছে তাই বিদ্রোহী কৃষকদের জন্য বছরের পরের দিকে নিজেদের খাদ্য জোগান দেওয়া কঠিন ব্যাপার হয়ে যাবে।

 

যদি পশ্চিম পাকিস্তান আর্মি পূর্ব বাংলার বড় শহর ও বন্দরগুলোতে দখল ধরে রাখতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য চালান পুনরায় দিবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করবে। এমন যদি হয় পাকিস্তান আর্মি দ্বারা বন্টিত যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত খাদ্য ও সাধারন জনতার মাঝে বাধা শুধু “কিছু কমিউনিস্ট সন্ত্রাসী”, তবে পাকিস্তানি আর্মির জনগনের সৈন্যদলের উপর তাদের আক্রমণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানকে অস্ত্র, হেলিকপ্টার এমনকি “উপদেষ্টা” সরবরাহকে যথাযথ প্রমাণ করা সহজ হয়ে পড়বে।

 

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সম্ভবত স্বাধীন বাংলাদেশ ছুড়ে ফেলবে না, অন্তত পশ্চিমা অনুকূলে থাকা আওয়ামী লীগের হাতে এমন হবে না। এই ধারনার উপর নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অভিজাত সিদ্ধান্তগ্রহনকারী দলের সদস্য ইতোমধ্যে “একটি বাংলাদেশ লবি” হিসাবে জনসমাবেশ শুরু করেছেন। এদের মধ্যে আছেন পররাষ্ট্র দপ্তর ও বিশ্ব ব্যাংকের লম্বা সময়ের উপদেষ্টা, পাকিস্তানে ফোর্ড-হার্ভার্ড উন্নয়ন প্রকল্পের প্রধান স্থাপতি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এডওয়ার্ড ম্যাসন। সরকার ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে ম্যাসন গনহত্যার পরে এর উপরে প্রতিবেদন লিখেছেন এবং সুপারিশ করেছেন যাতে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তানকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করে দেয় কারন নাহলে “আমরা পূর্ব পাকিস্তানকে অন্য একটা ক্ষমতার অধিনে ঠেলে দিবো – চীন। ”

 

পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদী শত্রু, ভারত, প্রকাশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সহানুভুতিশীল, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মত ভারতও বুর্জোয়া ব্যবস্থায় সবচেয়ে সন্তুষ্ট। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা ধারার বাঙ্গালী জাতি। ভারত এর সীমান্ত খুলে দিয়ে এক মিলিয়ন শরনার্থী আশ্রয় দিয়েছে, তাদের চিকিৎসা, আশ্রয় ও কিছু খাদ্য সরবরাহ দিচ্ছে। ভারত বাংলাদেশী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে গুলি বর্ষন করেছে ভারতীয় সীমান্তের গ্রামগুলোতে—বাংলাদেশী শরনার্থীদের জন্যে দেশান্তরের নিরাপদ আশ্রয়।

 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সরকার—যেখানে মস্কোপন্থী সাম্যবাদীদের নির্বাচনী ক্ষমতা শক্তিশালী—পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু তাদের হাতে সেই সমর্থনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত।

 

পূর্ববঙ্গের মত পশ্চিমবঙ্গও সম্পূর্নভাবে অবাঙ্গালীদের দ্বারা শোষিত। দেশের অন্য যে কোন জায়গা থেকে বেতন এক তৃতীয়াংশ, বেশির ভাগ বানিজ্য ও বিনিয়োগ স্থানীয় নয়। পশ্চিমবঙ্গবাসী মনে করে অবাঙ্গালীরা কলকাতায় আসে শুধুমাত্র টাকা বানাতে এবং তা তারা পরে এই রাজ্য থেকে রপ্তানী করে।

 

এমনকি পশ্চিমবঙ্গবাসীর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উপর সক্রিয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রন নেই। সাম্যবাদী নেতা ই এম এস নামবদ্রিপাদ এপ্রিলের ২৩ তারিখে ব্যাখ্যা করেন যে, যেখানে পশ্চিমবঙ্গ সরাসরি সামরিক শাষনের অধিনে নেই (যেমন পূর্ববঙ্গ ছিলো), রাজ্যের প্রশাসন সেনাবাহিনীই আসলে চালাচ্ছে। যখন থেকে পশ্চিমবঙ্গের নকশাল—যা পূর্ববঙ্গের ইপিসিপি-এমএল এর সহোদর—তাদের মাওবাদী আন্দোলন এক বছরের বেশী সময় ধরে শুরু করেছে, তখন থেকে কয়েক হাজার ভারতীয় সেনা পশ্চিমবঙ্গে নিয়ন্ত্রন আনার জন্যে সংস্থিত করা হয়েছে। ১৯৬৮ সালে ছাত্র এবং কৃষকদের আন্দোলনের মিশ্রণ থেকে জন্ম নেয়া নকশাল কলকাতার বেকার এবং আধ-বেকারদের সহ আশেপাশের গ্রামগুলোর কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন অর্জন করেছে। শহরে নাশকতা বেড়ে চলেছে, এবং জমিদারেরা শহরগুলোতে নকশাল আক্রমণের একটি তরঙ্গের পর গ্রামের কিছু জায়গা ছেড়ে চলে গেছে।

 

ভারতীয় সরকার বাস্তবিক ভাবেই ঝামেলায় আছে। যেখানে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিভক্ত পাকিস্তান ব্যাতিত কিছু চান না, সেখানে তারও সবার চেয়ে বড় আতঙ্ক পূর্ববঙ্গের আন্দোলনটি ইপিসিপি-এমএল এর নেতৃত্বে মাওয়াবাদী হয়ে চলেছে, এবং এই স্বাধীনতা যুদ্ধ ভারতেও ছড়িয়ে পরতে পারে। তিনি সন্দেহাতীতভাবে মনে করেন, ভারতের অস্ত্র হয়তো যারা আওয়ামী লীগ তাদের হাতে না পরে মাওবাদী গেরিলাদের হাতে পরবে এবং, সময় হলে, সেগুলো হয়তো তার সরকারকে হুমকি প্রদানকারী নকশালের হাতে করে ভারতে ফিরবে। যেখানে পশ্চিমবঙ্গের “শান্তিপ্রিয় পথের” সাম্যবাদীরা হাতগুটিয়ে বসে আছে এবং বলছে পূর্ববঙ্গের স্বাধনীতা যুদ্ধে সাহায্যের জন্যে তাদের কিছু করার নেই, সেখানে নকশালপন্থীরা সীমান্ত অতিক্রম করে তাদের পূর্বের ভাইদের সাহায্য করছে। তারা বলছে এটা উভয়, পূর্বের সংগ্রামকে সাহায্য করে এগিয়ে নেওয়া ও তাদের পশ্চিমের সংগ্রামের জন্যে “অভিজ্ঞতা অর্জন” এর জন্য।

 

শ্রীমতী গান্ধী আসামেও একই রকম কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হন, বার্মা ও পূর্ববঙ্গের মধ্যে পাহাড় পরিবেষ্টিত ভারতীয় অঙ্গরাজ্য, যার চীনের সাথে অনেক বড়ো সীমান্ত রেখা রয়েছে। অনেক বাঙ্গালী পালিয়ে আসামে গেছেন, যেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনী কয়েক বছর ধরে বিদ্রোহী এবং চেয়ারম্যান মাও এর চিন্তা ও চাইনিজ একে ৪৭ এ সজ্জিত বিদ্রোহী নাগা ও মিজো উপজাতির লোকের সাথে লড়াই করছে। যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানে সংগ্রাম একটি প্রকৃত গণযুদ্ধে পরিণত হয়েছে, এমন অস্ত্রসস্ত্র নিঃসন্দেহে পাহাড়ি রাস্তা ধরে পূর্ববঙ্গে যাবে।

 

পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলা শুরু করার দশদিন পর, চীনের সতর্কভাবে চয়নকৃত গৃহযুদ্ধ সংক্রান্ত বিবৃতিতে পাকিস্তানের গনহত্যার কোন নিন্দা ছিলো না। অন্যদিকে চীন ইয়াহিয়া খানের সরকারকে সমর্থন দিচ্ছিলো। কিন্তু এখন পর্যন্ত চীনের প্রাথমিক মতামত ছিলো এই যুদ্ধকে নিজেদের অভ্যন্তরীন ব্যাপার বলার এবং ভারতকে এই ব্যাপারে জড়িত না হতে সাবধান করা। ইয়াহিয়া খানকে একটি চিঠিতে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন–লাই প্রতিশ্রুতি দেন যে ভারত আক্রমন করতে হলে পাকিস্তানকে চীন সাহায্য করতে আসবে। এটাও বলেন যে ইয়াহিয়া খানের প্রচেষ্টা পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনবে। চৌ আরো যোগ করেন, “পাকিস্তানের ঐক্যবদ্ধতা…… এর টিকে থাকা ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন।”

 

চীনের পাকিস্তানের সামরিক শাষকের সাথে ভারত বিরোধী ঐক্য ১৯৬২ সালের সিনো-ভারতীয় যুদ্ধের পরেই হয়েছিলো, এবং এরপর থেকেই চীন পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্য দিয়ে আসছে। রেডিও পাকিস্তান সম্প্রতি ঘোষনা করেছে, ইউপিআই এর মতে (নতুন দিল্লী, ২রা মে) চীন ইয়াহিয়া খানের ১৯৭০ এর নভেম্বরে পিকিং ভ্রমনের সময় দীর্ঘমেয়াদে ২১০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল সেই তহবিল “অধিকন্তু” বাড়ানোর প্রস্তাব করছে। পাকিস্তানী বামপন্থীরা অভিযোগ করে যে, এই ঐক্য ন্যাপের জন্যে বাধা সৃষ্টি করছে, যা বিরোধী দলকে সরকারের কাছে হালকা করে তুলছে।

 

চীনের অভিপ্রায় মনে হয় পূর্ববঙ্গে গৃহযুদ্ধের সংগ্রাম চালু রাখা এবং এখন পর্যন্ত যতটা কুটনৈতিকভাবে সম্ভব—ভারতকে (এবং এর পিছনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র) আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন পূর্ববঙ্গে বুর্জোয়াদের সমর্থন দিতে রহিত করা। চৌ তার ইয়াহিয়া খানকে লেখা চিঠিতে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “পাকিস্তানের ঐক্য নষ্টকারী ক্ষুদ্র দলকে বৃহৎ জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা করা প্রয়োজন” পরিস্কারভাবেই যা শেখ মুজিবর ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে যা নির্দেশ করে। মুজিবর নিজেই সতর্কবাণী দিয়েছেন, “আমি একাই পূর্ব পাকিস্তানকে কমিউনিজম হতে রক্ষা করতে পারি।” মাঝে মাঝেই “বাংলাদেশের চিয়াং কাই শেক” হিসাবে পরিচিত মুজিবকে বাঙ্গালী বামপন্থীরা “আমেরিকার দালাল” হিসাবে অবহিত করতো – যা পুরোপুরি সত্য না হলেও রূপক অর্থে সত্য।

 

চীন হয়তো বাংলাদেশকে সমর্থন করবে যখন স্থানীয় নয় জাতীয় নেতৃত্ব ভিয়েতনামের মত জোটবদ্ধ স্বাধীনতা ফ্রন্ট গঠনে সমর্থ হবে তখন। চীনের সবার সামনে ভারতের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থ করা, একই সাথে গোপনে বাঙ্গালীদের অস্ত্রের চালান দেওয়ার সম্ভবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

এপ্রিলের শেষ ভাগে এসে খবর থেকে ভারী যুদ্ধের প্রতিবেদন কমে গেলেও, সিবিএস প্রতিবেদন করেছে যে পশ্চিমবঙ্গের নকশালীরা চীনকে উদ্দেশ্য করে বার্তা দিয়েছে যে, পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতা যুদ্ধ সত্যিকারের জনগনের যুদ্ধ যার নিয়ন্ত্রণ আওয়ামী লীগের হাতে ছিলো না।

 

এর মাঝে, আগামী কয়েকমাসে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানকে সমর্থন করার অর্থ কি হবে তা পরিস্কার না। পূর্ববঙ্গে সেনাবাহিনীর ঝটিকা অভিযানে পাকিস্তানের বিলম্বিত ও বিপর্যস্থ রপ্তানীতে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে, এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী পাকিস্তানের স্বর্ণের রিজার্ভ ৩৫ শতাংশ কমে ৮২ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা নিঃসৃত হওয়ার ফলে, পাকিস্তানের এর আমদানী তীব্রভাবে কমাতে হবে, পশ্চিমের ফ্যাক্টরীগুলো কাঁচামালের অভাবে পড়েছে এবং বেকারত্বের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

 

পশ্চিমের কাটছাট করা প্রতিবেদন (সমগ্র পাকিস্তান মুদ্রন বিবাচনের অধীন) বলছে যে খাদ্য সংকট চলছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাদেশিক অঞ্চলে কিছু প্রান্তিক কৃষক তাদের খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্প কেন্দ্রগুলো কর্মী ছাত্র অস্থিরতার খবর পাওয়া গেছে, এর মাঝে কিছু ধর্মঘটকারীকে সরকারী সৈন্যরা গুলি করার খবরও পাওয়া গেছে। পূর্বে, আওয়ামী লীগ নেতারা বাঙ্গালী কৃষকদের পাটের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ানোর জন্যে ধান চাষের আহ্বান জানিয়েছে, এবং পাট শিল্পের অবস্থা ভয়াবহ বিপর্যস্ত, কিছু প্রক্রিয়াজাতকরন কারখানা যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গেছে। পাকিস্তানের বিশ্ব ব্যাঙ্কের কাছে তিন মিলিয়ন ডলার ঋণ আছে যা এই জুনে শোধ করতে হবে, কোন দেশই ইয়াহিয়ার সমস্যাক্রান্ত সরকারকে সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসবে না। কিন্তু পূর্ববঙ্গে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা বন্ধে এর প্রচেষ্ঠার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রীয় সরকারের উপর বাজী ধরতে পারে। পাকিস্তানের অর্থনীতিতে আরো ধার দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব পুঁজির মাধ্যম্যে পাকিস্তানকে প্রবেশ করাতে পারবে।

 

সার্বিক ভাবে মনে হচ্ছে যে পশ্চিম পাকিস্তানে অস্থিরতা তৈরী ছাড়া সেনাবাহিনী বর্ষাকালে পূর্ববঙ্গে সাহসীভাবে টেকার সম্ভবনা কম। পশ্চিম পাকিস্তানী অভিজাতদের যুক্তিসঙ্গত দাবী পূরন করতে ইয়াহিয়া খান হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানী পিপলস পার্টির নেতা এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী জুলফিকার আলি ভুট্টোকে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্যে পদত্যাগ করবে।

 

ভুট্টো আইয়ুব খানের শাষনামলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলো, ইন্দো-পাক যুদ্ধবিরতির চুক্তি সম্পাদনের প্রতিবাদে সে পদত্যাগ করে। বিপুল পরিমান জমির মালিক যে সমাজতন্ত্রএর কথা বলে- ব্যাংক, ইন্সুরেন্স ও মৌলিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করনের কথা বলে—একই সাথে ভুট্টো এমন পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা বলে যেখানে শিল্প কারখানা ব্যক্তিমালিকানাধীন হবে। পূর্ব বাঙালীদের নিকট অপ্রিয় ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানেও সম্পূর্ণ জনপ্রিয় ছিলো না। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী সাম্প্রতিককালে পাঞ্জাবের বিভিন্ন শহরে ভুট্টোর বিরুদ্ধে ছাত্র ও কর্মজীবিরা প্রতিবাদ সভা করেছে।

 

কিন্তু যেই কেউই বছরের আগামী কয়েক মাস পাকিস্তানের শাষনভারে থাকবে, পূর্ববঙ্গ বাংলাদেশ এর জনগনের যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে আছে, যারা শুধুমাত্র সাড়ে সাত কোটি লোক স্বাধীনতার জন্য একতাবদ্ধ হয়েছে, যাদের বাইরের কোন সাহায্য, কোন অস্ত্র, এমনকি কোন সামরিক প্রশিক্ষনও নেই। যেভাবে আওয়ামী লীগ থেকে নেতৃত্ব আরো বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, চীন হয়ত তাদের সর্বোচ্চ সাহায্য প্রস্তাব করবে। সেটা হোক আর না হোক বাংলাদেশ খুব সম্ভবত স্বাধীন হয়ে যাবে। ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউয়ের টি.জে.এস জর্জকে একজন ন্যাপের নেতা বলেন, “চীন সরাসরি আমাদের সমর্থন করলো কিনা, রাশিয়া মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে কিনা কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ইয়াহিয়া খানকে বদলানোর চেষ্টা করছে কিনা তা নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। আমাদের যুদ্ধ আমাদেরই চালাতে হবে এবং আমরা নিশ্চিত আমরা জয়ী হবো।”

_____________________________________

 

 

এই পুস্তিকা প্যাসিফিক স্টাডিজ সেন্টারের সদস্যগণ, পূর্ব পালো আলতোর একটি অলাভজনক সহকারী গবেষণা সংস্থা, তৈরী করেছে। এই প্রকাশনায় ব্যক্ত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং তা প্যাসিফিক স্টাডিজ সেন্টারের মতামত হিসাবে বিবেচ্য নয়।

 

অনেকগুলো সংখ্যা নিলে প্রতি ৫০০ সংখ্যার জন্যে খরচ সহ ৬.৫০ ডলার খরচ পড়বে। সাহায্য শুল্কমুক্ত।

 

পুনঃমুদ্রন অনুমোদিত (অলাভজনক)।  প্রবন্ধগুলো যথাযথ কৃতজ্ঞতা ও সম্মানী প্রদান করতে অনুরোধ করছি।

 

 

প্যাসিফিক স্টাডিজ সেন্টার নিয়মিত (দ্বিমাসিক) প্যাসিফিক রিসার্চ ও ওয়ার্ল্ড এম্পায়ার টেলিগ্রাম প্রকাশ করে, যেখানে তথ্যসম্বৃদ্ধ এশিয়া এবং প্যাসিফিক অঞ্চলের রাজনৈতিক অর্থনীতির তথ্যসম্বৃদ্ধ বিশ্লেষন এবং গুরুত্বপূর্ন জাতীয় সমস্যা নিয়ে প্রবন্ধ করে। ব্যক্তিগত নিবন্ধন (বারো সংখ্যার জন্য) করার জন্যে পাঁচ ডলার এবং প্রতিষ্ঠানের জন্যে পনের ডলার খরচ পরবে।

অনুসন্ধান এবং আদেশ উদ্দেশ্য করা হচ্ছে-

প্যাসিফিক স্টাডি সেন্টার

১৯৬৩ ইউনিভার্সিটি অ্যাভেন্যু

ইস্ট পালো আল্টো, ক্যালিফোর্নিয়া

৯৪৩০৩

সত্ত্ব মে ১৯৭১, প্যাসিফিক স্টাডিস সেন্টার

নির্বাচিত উৎসঃ

আহমেদ. নাফিস. এন ইকোনমিক জিওগ্রাফি অফ ইস্ট পাকিস্তান, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ১৯৫৮.

আলাভি; হামজা এবং খুসরো, আমির, “পাকিস্তানঃ দ্যা বারডেন অফ ইউ এস এইড ইম্পেরিয়ালিস্ট” এন্ড আন্ডারডেভেলপমেন্ট, এড. রোডস রবার্ট, মানথলি রেভিউ, ১৯৭০.

আলি, তারিক, “ক্লাস স্ট্রাগল ইন পাকিস্তান,” নিউ লেফট রিভিউ. সেপ্ট.-অক্ট. ১৯৭০, ইংল্যান্ড.

আলি, তারিক. পাকিস্তানঃ মিলিটারি রুল অর পিওপল পাওয়ার, মোরোও, ১৯৭০.

ভুট্টো. যুলফিকার আলি. দ্যা মিথ অফ ইন্ডেপেন্ডেন্স, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ১৯৬৯.

দাত্ত, আর. পি. , ইন্ডিয়া টুডে, পিওপলস পাবলিশিং হাউস, বোমবে, ১৯৪৭.

জ্যাক. জে. সি.,ইকোনমিক লাইফ অফ ব্যাঙ্গাল ডিসট্রিক্ট, অক্সফোর্ড, ১৯১৬.

নাটলি, তিমোথি অ্যান্ড লুইস, “পাকিস্তানঃ দ্যা বিজি বি রুট টু ডেভেলোপমেন্ট” ট্রান্সেকশান, ফেব্রুয়ারি ১৯৭১.

পাপানেক, গুস্তাভ, পাকিস্তান্স ডেভেলোপমেন্ট, /হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস. ১৯৬৭.

 

সাময়িক পত্রিকা

ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভেউ, হংকং

ল্যা মন্ডে, প্যারিস, ফ্রান্স

টাইমস অফ ইন্ডিয়া, নিউ দিল্লি, ইন্ডিয়া

ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান, ইংল্যান্ড

নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউ ইয়র্ক

টাইমস অফ লন্ডন, লন্ডন

পেকিং রিভিউ, নাম্বার ১৬

__________________________________

আমার সোনার বাংলা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।

ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,

মরি হায়, হায় রে—

ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা খেতে আমি কি দেখেছি মধুর হাসি।

কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো,

কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,

মা, তোর বদন খানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি।

 

তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে,

তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।

তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কি দীপ জ্বালিস ঘরে,

মরি হায়, হায় রে—

তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি।

 

ধেনু- চরা তোমার মাঠে, পাড়ে যাবার খেয়াঘাটে,

সাড়া দিন পাখি-ডাকা ছায়ায়–ঢাকা তোমার পল্লীবাটে,

তোমার ধানে-ভরা আঙিনাতে জীবনের দিন কাটে,

মরি হায়, হায় রে—

ও মা, আমার যে ভাই তারা সবাই, ও মা, তোমার রাখাল তোমার চাষি।

 

ও মা, তোর চরণেতে দিলাম এই মাথা পেতে—

দে গো তোর পায়ের ধুলা, সে যে আমার মাথার মাণিক হবে।

ও মা, গরিবের ধন যাই আছে তা দেব চরণতলে,

মরি হায়, হায় রে—

আমি পরের  ঘরে কিনব না আর, মা তোর ভূষণ ব’ লে গলার ফাঁসি।