বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল্যায়ন

Posted on Posted in 4

<৪,২৪৪,৫৪২-৫৫১>

অনুবাদকঃ রাফিয়া, নিঝুম চৌধুরী, নাবিলা ইলিয়াস তারিন, খন্দকার কাফি আহমেদ

শিরোনামসূত্রতারিখ
২৪৪। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল্যায়নপূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) কমিউনিষ্ট পার্টি………………

      ১৯৭১

 

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের মূল্যায়ন

বাংলাদেশের আন্দোলন–সংগ্রাম সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করেছে । গণতন্ত্র এবং স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন পরিণত হয়েছে সশস্ত্র সংগ্রামে।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমগ্র জাতির সহযোগিতা এবং সমর্থন রয়েছে । মুক্তি সংগ্রামের জন্য জনগণের এরূপ মিলিত সমর্থন ইতিহাসে দুর্লভ।বাংলাদেশের জন্য সংগ্রামের উদ্দেশ্য এবং ধরণ উভয়ই পরিবর্তিত হয়েছে। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে।এটি সম্পূর্ণরূপে একটি নতুন পরিস্থিতি ।

সেই জন্যই, বাংলাদেশের সংগ্রামের প্রকৃতি নির্ধারণ ও এর সঠিক নিরূপণ নিশ্চয়ই অপরিহার্য ।

কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহক সমিতি নির্মিত বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম নিরূপন এবং এর নির্ধারিত কার্যক্রম নিম্নে উল্লিখিত হলঃ

আন্দোলনের প্রকৃতি এবং ধরণঃ

শত্রু এবং মিত্র

আন্দোলনের প্রকৃতি

প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর শাসন ও শোষণের বৈশিষ্ট্য ছিল ঔপনিবেশিক প্রকৃতির; যদিও আধুনিক ধারণা অনুযায়ী । বাংলাদেশ পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের উপনিবেশ না । এই প্রসঙ্গে বলা যায়, বাংলাদেশের সংগ্রামের প্রকৃতি হল বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ।

এই সংগ্রাম প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে যারা সাম্রাজ্যবাদীদের সাহায্য পেয়ে থাকে । অতএব, এই স্বাধীনতা সংগ্রাম সাম্রাজ্যবাদীদেরও আক্রমণ করছে এবং বর্তমানে এটি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সংগ্রামের সম্ভাবণার নিয়ামক ধারণ করছে ।তথাপি, এই সংগ্রাম নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক; কেননা, এর মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি হল গণতন্ত্র ।

 

 

সংগ্রামের ধরণ

এই সংগ্রাম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ও সশস্ত্র সেনাবাহিনীর বিপক্ষে সরাসরি পরিচালিত হচ্ছে । তাই সেনাবাহিনীকে পরাভূত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এর উদ্দেশ্য ।

অর্থাৎ, এই সংগ্রামের প্রধাণ ধরণ হল সশস্ত্র শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম ।

সংগ্রামের শত্রু এবং মিত্র

শত্রুঃ পশ্চিম পাকিস্তানের একচেটিয়া পুঁজিবাদী শাসক শ্রেণি যারা সাম্রাজ্যবাদের মদদদাতা, বিশেষতঃ আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তপ্রথার ভূস্বামী এবং এদেশে তাদের প্রতিনিধিরাই হল বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রু ।

মিত্রঃ ক) বাংলাদেশের সমগ্র জনতাই এই সংগ্রামের মিত্র যাদের মধ্যে রয়েছে শ্রমিক, ভূমিহীন কৃষক, মধ্যবিত্ত; বুর্জোয়া ও জোতদার । এদের মধ্যে বড় বড় সামন্তপ্রভূ সবচেয়ে দুর্বল শাখা প্রমাণিত হতে পারে । সেই জন্য আমাদের বড় সামন্তপ্রভূদেরব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে  (জোতদারদের একটি অংশ) ।

খ) আমরা বিবেচনা করি, পশ্চিম পাকিস্তানের অন্য ভাষাভাষী শোষিত জাতি, বিশেষতঃ ছোট জাতিগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বন্ধু ।  বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পশ্চিম পাকিস্তানীদের স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম একে অপরের নিকট প্রশংসনীয় । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চরম প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত হচ্ছে যা তাঁদেরও উৎপীড়ন ও শোষণ করছে (পশ্চিম পাকিস্তানী)। এইজন্য, পশ্চিম পাকিস্তানের জনগনের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমরথন করা উচিত এবং গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনেভ জন্য তাদের সলল সংগ্রামও আমাদের সমর্থন লাভ করবে ।

 

গ) বাংলাদেশের এই স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্বের শান্তি, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাপ্রেমী এবং প্রগতিশীল জনগণ এমনকি, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও মিত্র হিসেবে বিবেচিত হবে । সংগ্রামের পূর্ণ সাফল্যের জন্য তাদের পূর্ণ সমর্থন ও সহায়তা অপরিহার্য । এই সংগ্রামে সকলগণতান্ত্রিক শক্তির সহায়তা, বিশেষতঃ ভারতের জনগণ ও সরকারেরসাহায্য-সহযোগিতা আবশ্যক । পাশাপাশি, প্রতিবেশী বার্মা, সিংহল ওনেপালেরজনগণ ও সরকারের সহায়তাও অপরিহার্য । আফগানিস্তান এবং আরব রাজ্যের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রগুলোর সাহায্য ও সমর্থনও বাংলাদেশের সংগ্রামের জন্য সহায়ক হবে ।

 

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম এবং বিশ্বের শান্তি, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্ক

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বের শান্তি, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে শক্তিশালী করবে; এছাড়াও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম বিভিন্ন জাতির জাতীয় অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলনের অংশ ।

কেননা; ক) এই সংগ্রামের সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির প্রভাব শক্তিশালী করবে।

খ) এই সংগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে পাকিস্তানের স্বেচ্ছাচারী  স্বৈরতন্ত্রের বিপক্ষে যা সাম্রাজ্যবাদ দ্বারাসমর্থিত । এইজন্যএর সাফল্য পরোক্ষভাবে সাম্রাজ্যবাদকেই দুর্বল করবে ।

গ) বাংলাদেশের সংগ্রামের সফলতা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটাবে এবং ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গঠনে সহায়ক হবে .

(ঘ) এই সংগ্রামে বিজয়ী হলে, সেখানে সম্ভাবনা আছে যে

সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশেরসম্পর্ক উন্নতি হবে।

যদি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীল শক্তি সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারেন এবং যদি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রয়োজনীয় সাহায্য ও সমর্থন দেয়, তবে,বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সফলতা ব্যাপকতর হয়ে যাবে।

শক্তি এবং সংগ্রামের দুর্বলতা

স্ট্রেংথ:

(১) চাহিদা ও স্বাধীনতা সংগ্রাম, বাংলাদেশের সমগ্র জনগণের দ্বারা সমর্থিত।

(২) জনগণের মধ্যে লড়াকু মনোভাব এবং সেনাবাহিনীকে সশস্ত্র সংগ্রামে বিক্ষিপ্ত ভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে। যুবকরা

সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেছে ।

(৩) একটি ছোট মাওবাদী দলা ব্যতীত, সব গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী দলগুলো

সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে সামিল আছে।

(৪) যেহেতু এই সংগ্রাম নিপীড়িত জনগণের শত্রু বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে

এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শোষিত জাতি হিসাবে সেখানে জনগণের সমর্থনে জেতার সম্ভাবনা আছে পশ্চিম পাকিস্তানের নিপীড়িত জাতিকে।

(৫) এই সংগ্রামের পিছনে রয়েছে জনগণের সমর্থন এবং গণতান্ত্রিক শক্তি

ভারত সরকার ।

(৬) সোভিয়েত ইউনিয়নসহ গণতন্ত্র, শান্তি ও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী

বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশে সংঘঠিত পশ্চিমাদের গণহত্যার ব্যাপারে সোচ্চার আওয়াজ তুলেছে এবং তারা এর একটা সুষ্ঠ রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আহবান জানাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংরাম আরোও বেগবান হচ্ছে।

দুর্বলতা:

(১) এখনও সংগঠিত শক্তি ও সামর্থ্যের অভাব ব্যাপক আকারে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মানুষের সমর্থন ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের অভাব ও বর্তমান স্বাধীনতা সংগ্রামে দেখা যাচ্ছে।

 (২) স্বশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেয়া মানুষ এবং বিভভিন্ন সংগঠনের মাঝে অভিজ্ঞতার অভাব দেখা যাচ্ছে।

(৩)জনগণের একটি অংশ,বিশেষ করে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে

স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি বৈরী মনোভাব দেখা যাচ্ছে।

(৪) সমাজতান্ত্রিক শিবির ও আরব বিশ্ব এখনো তাদের শক্ত অবস্থান এবঙ্গ সমর্থন পোশণ করেনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাহায্যে।

(৫) স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সংগঠনের মাঝে এখনো ঐক্য গড়ে উঠেনি।

(৬) বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ইয়াহিয়া সাহায্য সমর্থন ব্যাপ্ত হয়

বিভিন্ন পদ্ধতি দ্বারা । আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের সমর্থন পেয়েই পশ্চিমারা আমাদের শোসন চালিএ যাচ্ছে।। কিন্তু মানুষ এখনো সম্পূর্ণরূপে সচেতন না এই শত্রুদের সম্পর্কে।

(৭) জাতীয় নিপীড়নের ফলে এবং বৈষম্যমূলক আচরণ হিসাবে

পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন চক্রের বাংলা উগ্র নীতি বা বিরোধী পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিতে অতীতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব পশ্চাতপ্রবন সেখানে এখন একটি অ্যান্টি-অ বাঙালি গোষ্ঠী দেখা যাচ্ছে। এর ফলে ষড়যন্ত্র, মিথ্যা প্রচারণা এবং অ্যান্টি-বাংলা উস্কানি শাসক দ্বারা পরিচালিত চক্র এবং অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল চক্র পশ্চিম পাকিস্তানী জনগণের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করছে,

এই কারণে জনগন ও শোসিত জনতার মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরী করা কঠিন হয়ে পরবে।

(৮) যদিও ‘মুক্তি বাহিনীকে’ (লিবারেশন আর্মি) প্রাথমিকভাবে বাইরে গঠন করা হয় এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও পুলিশ, ইত্যাদি দ্বারা গঠিত হয়, তথাপি, তারা বীরের মতো লড়াই করেছে শত্রু সৈন্যদের বিরুদ্ধে। এই মুক্তিবাহিনী রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত না

তাছাড়া, তারা শাসক থেকে গণবিরোধী ভুল শিক্ষা লাভ করেছিলেন

নেতৃত্বের শ্রেণী চরিত্র সংগ্রাম এবং তার শক্তি ও দুর্বলত

নেতৃত্বের শ্রেণী চরিত্র

এই সংগ্রামের প্রধান নেতৃত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ দল  ও তার দ্বারা গঠিত সরকার। তারা প্রধানত বাংলাদেশের উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি।তাদের পশ্চিমা একচেটিয়া পুঁজির সঙ্গে তীব্র এবং মৌলিক দ্বন্দ্ব আছে। এই নেতৃত্বের শক্তি যে তারা না আছে বর্তমান সময়ের মধ্যে রয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের একচেটিয়া পুঁজির কাছে আত্মসমর্পণ করে যে প্রতিক্রিয়াশীল বলতে হয়, চক্রের শাসন করছেন এবং বাঙালির জাতীয় অধিকার প্রশ্নে তারা দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য। এই নেতৃত্বের ব্যাপক বাংলাদেশের জনগণের সমর্থন।

দুর্বলতা

কিন্তু এই নেতৃত্বের দুর্বলতা যে এটা বিপ্লবী অভাব হয়

এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা বর্তমানে সশস্ত্র সংগ্রামের বিধায়ক জন্য প্রয়োজনীয়।

দ্বিতীয়ত, তারা শক্তি মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের কোন দৃঢ় বিশ্বাস আছে এবং

জনগণের শক্তি সংগঠিত উপায়ে মানুষের সংগ্রাম। অন্য দিকে,

তারা আরো এইড এবং কোনো বড় সহায়তায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে আনত হয়

ক্ষমতা কোনো শিবির একাত্মতার। বর্তমানে তারা এইড উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল

ভারত সরকার। তারা এখনও আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের সম্পর্কে বিভ্রান্তি আছে।

তৃতীয়ত, সেখানে নেতৃত্বের পক্ষ থেকে অনুপলব্ধি যে সব ঐক্য বাহিনী যুদ্ধ সাফল্যের এই সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয়। বরং, সংকীর্ণতাএবং সাম্প্রদাযিকতা এখনো নেতৃত্বের মধ্যে বিদ্যমান।

এই সংগ্রামের অন্যান্য দলগুলোর ভূমিকার

(ক) দক্ষিণপন্থী দলগুলোর ইয়াহিয়া চক্রের এজেন্ট ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

(খ) ভাসানী ন্যাপ এখন, এই সংগ্রামে তাদের সমর্থন ঘোষণা করেছে যদিও

তারা ধারাবাহিকভাবে কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করা হয়নি। (বর্তমানে ভাসানী ন্যাপযেমন একটি দল আর অস্তিত্ব নেই; শুধু মওলানা ভাসানী ও তাঁর অনুসারীদের কিছু সংখক এটার সাথে সংযুক্ত করা হয়।)

(গ) তিনটি মাওবাদী সংগঠন এই আন্দোলনে তাদের সমর্থন দ্বারা উপস্থিত রয়েছে।

তারা মৌখিকভাবে ঘোষণা করে আওয়ামী লীগসহ সব বাম বাহিনীর একটি যুক্তফ্রন্ট

প্রয়োজনীয়; কিন্তু আসলে, তারা আওয়ামী লীগ ব্যতীত একটি পৃথক বাম যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে চান।

 (ঘ) অন্য মাওবাদী গ্রুপ (হক –তোহা) একটি বিভেদ সৃষ্টিকারী এবং বিরুধি সংগঠন হিসাবে কাজ করছে।

যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রশ্ন

এই সংগ্রামে দ্রুত এবং নিশ্চিত বিজয়ের জন্য আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ (ওয়ালী-মুজাফফর নেতৃত্বে) সহ সব যুদ্ধ বাজিনীকে নিয়ে একটি ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করা অপরিহার্য শর্ত।

এই ফ্রন্টের সংগঠিত হও্যার ফলে সংগ্রাম আরোও শক্তিশালী, বলিষঢ় রুপ ধারণ করবে। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের জনগনের মাঝে উদ্দিপনা বেড়ে যাবে এবং জয় তরান্বিত হবে। মুক্তিবাহিনী সহ অন্যান্য যুদ্ধরত বাহিনো যত দ্রুত সফল হতে থাকবে ততই উন্নত দেশ সমূহ থেকে সাহায্য এবঙ্গ সহযোগিতে বাড়তে থাকবে।

কিন্তু আওয়ামী লীগের অনমনীয়তা এবং অন্যদিকে, বিরোধী আওয়ামী

কিছু বামপন্থী দলের লীগ বিরোধীতার মনোভাব কারণে এই ফ্রন্ট ঘঠণে বাধা হয়ে দাড়ায়।

অবশ্য আওয়ামী লীগ কর্মিবৃন্দ, বিশেষ করে ছোট ছোট সংগঠন ঐক্য মনোভাবের ফলশ্রুতিতে মুক্তি ফৌজ গঠণ করে। অনেক সমস্যার পরেও এই ফ্রন্ট ঘঠনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। একটি জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট গঠনের জন্য ন্যুনতম যেসব কার্যক্রম নিতে হবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে,

শত্রুর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের সম্পৃক্ততা ।

আন্দোলন যখন বাঁধার সম্মুখীন

১। সংগঠিত এবং বলিষ্ঠদেহী সেনা, গেরিলা যোদ্ধাসহ অনেক কিছুই এখনো গঠিত হয়নি।
২। দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধরত সকল রাজনৈতিকদল এবং গনসংস্থা ধ্বংস করা হয়েছে।
৩। মানুষের জীবনে অর্থনৈতিকসঙ্কট তীব্র রুপ ধারন করেছে । যার ফলে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির লোক নিরাশায় পতিতহয়েছে।
৪। যেই হারে মানুষ নিপীড়নের শিকার হচ্ছে তার তুলনায় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রচারণা অত্যন্ত দূর্বল।

৫। বাংলাদেশের আন্দোলন নিয়ে বাইরেরদেশগুলোতে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। প্রচারণা এবং কূটনৈতিক কার্যকলাপ বৈশ্বিক মতামত ও বিভিন্ন অবস্থার দিকে লক্ষ্য রেখে করা সত্ত্বেও আমাদের লড়াইয়ের দিকটা অত্যন্ত দূর্বল।
৬। চরম নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারতের কাছে আশ্রয় চাইছে। যা আন্দোলনেরপ থে বড় বাধা।
৭। লড়াই এখনও পর্যন্ত কেবলমাত্র ভারতীয় সরকারের একক সাহায্য ও সহায়তার উপর নির্ভরশীল এবং এই সরকার অত্যন্ত রক্ষণশীল হবার কারনে তা আন্দোলনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে

৮। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকচক্রের সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে সমর্থিত সাম্রাজ্যবাদী সমর্থন এইসমস্যা তৈরি করেছে।  তাছাড়া এই প্রতিক্রিয়াশীল ক্ষমতাসীন চক্রকে চীনা মাওয়াবাদী নেতৃত্বের দেওয়া প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থন এবং সামরিক সহায়তায় গনহত্যা এবং নির্মমভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দমনে উৎসাহ সৃষ্টি করছে। চীনা নেতাদের এই লজ্জাহীন কর্মকান্ড বাংলাদেশের আন্দোলন নিয়েবহুদেশে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। পৃথিবীর স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষই এইসব শুরু করেছে।  তাছাড়া,চীনা নেতৃত্বের এই ভুমিকার ফলে,পাক-ভারত উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, এশিয়ার শান্তিবিঘ্নিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।

দলের ভূমিকা

বাংলাদেশের বর্তমান সশস্ত্র যুদ্ধ ও আন্দোলন কম্যুনিস্ট পার্টির উপর কিছু বিশেষ এবং কঠিন ঐতিহাসিক দায়িত্ব আরোপ করেছে। এইসকলদায়িত্বপূর্ণ করার জন্য কম্যুনিস্ট পার্টিকে অবশ্যই নিম্নলিখিত কার্যাবলী পালন করতে হবে-

১।সশস্ত্র সংগ্রামে নিজেদের উদ্যোগে সম্পূর্নভাবে অংশগ্রন করতে হবে।

২।সকল ধরনের সামরিক, রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং অন্যান্য দূর্বলতা থেকে পরিত্রাণ পেতে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে হবে।

৩।যুক্তফ্রন্ট গঠনে সর্বস্তরে উদ্যোগ নিতে হবে

৪। আন্দোলনের আশু উদ্দেশ্য অর্জনের সাথে সাথে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য নেতৃত্ব দিতেহবে।

স্বাধীনতা যুদ্ধে জয় অবশ্যম্ভাবী
পরিশেষে, মনে রাখা দরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকচক্রের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম । এই সেনাবাহিনী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী সরকারের সহায়তায় আধুনিক সমরাস্ত্রে গঠিত এবং পাকিস্তানের শাসকচক্র এখনও এদের তরফ হতে বিভিন্ন সহায়তা পাচ্ছে । উপরন্তু , চীনের মাওয়াবাদী নেতারা অবাধ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সহায়তার ব্যাপ্তি ঘটিয়েই যাচ্ছে । এইরুপ অবস্থায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কঠিন এবং রক্তক্ষয়ী ।
কিন্তু পাকিস্তানি শাসকচক্র বাংলাদেশের জনসাধারণের কাছ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন । যার কারনে বাংলাদেশের অসহযোগ আন্দোলন এবং সশস্ত্র সংগ্রাম, প্রশাসনিক ব্যাবস্থা এবং আর্থনৈতিক কাঠামো সম্পুর্নভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। এত কিছুর পরেও ক্ষমতাসীনচক্র আজ তীব্র সংকটের মুখে । শাসকশ্রেণির এই অবাধ নিপীড়ন এবং নিগ্রহ সাধারন মানুষের মাঝে কেবল তীব্র ঘৃণা আর ক্ষোভ তৈরি করছে । কেবল মাত্র কিছু দালাল ব্যাতিত, বাংলাদেশের মানুষ সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, এই যুদ্ধবাংলাদেশেরসকলমানুষের সহায়তায় হচ্ছে । এইদেশের বড় সংখ্যক তরুন-যুবা সশস্ত্র আন্দোলনে এগিয়ে আসছে । আপামর জনসাধারণের একতাই এই যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার।
তদুপরি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তার পরিমাণ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ মানুষ,গণতান্ত্রিকদল এবং বাহিনীর পাশাপাশি ভারত সরকারও অকুন্ঠ সাহায্য এবং সহায়তা বৃদ্ধি করছে । সোভিয়েত ইউনিয়ন এই অবাধ গনহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে এই সমস্যার আশু সমাধান দাবিক রেছে। বিশ্বশান্তি পরিষদ ও এই গনহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের এইসমস্যার সমঝোতার দাবি জ্ঞাপন করেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশ্বের শান্তিকামি মানুষ এবং প্রগতিশীল শক্তির সমর্থন দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিশ্বজনমত গঠনের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে।
অতএব, পাকিস্তানি শাসকচক্র বাহিনী যত সুসজ্জিত থাকনা কেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ যত দুঃসাধ্যই হোকনা কেন বাংলাদেশের চূড়ান্ত জয় অবশ্যম্ভাবি।

 

গৃহীতঃ
২২.৫.৭১                                             কেন্দ্রিয়কমিটি, কম্যুনিস্টপার্টি                              পূর্বপাকিস্তান (বাংলাদেশ) ।

ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের কর্মসূচি

জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টে গঠনের জন্য নিদেনপক্ষে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারেঃ

১.দখলদার ও প্রগতি বিরোধী পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীকে পরাজিত ও বিতারিত করতে সশস্ত্র সংগ্রামীদের অংশগ্রহণ করতে হবে। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম , গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সমাজতন্তের পথে আগাতে হবে।

২.আইন পরিষদ, জনগন,নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কর্তৃপক্ষের দ্বারা বিশ্বস্ত প্রতিনিধি নির্বাচন করবে; প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের সার্বজনিন প্রয়োগ ও সমন্বিত নির্বাচক মন্ডলী দ্বারা ভোটদান প্রণয়ন; জনগণকে নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রত্যাহার করার অধিকার দেয়া; সংসদীয় গণতন্ত্র বহাল রাখা; এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

৩.জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যেমন:বাকস্বাধীনতা, জাতিগত স্বাধীনতা, তথ্যের স্বাধীনতা ইত্যাদি অধিকার সমূহ যেন মজুর হতে চাষা সকল শ্রেণীর মানুষ ভোগ করতে পারে। সকল অনাচারী আইন বন্ধ করতে হবে, জনগণের সকল সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে যেন তারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীদের সর্বদা সাহায্য করতে পারে।শহর,গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় নানান কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য জনগণের দ্বারা নির্বাচিত স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত  সংস্থা নির্বাচন এবং সরকার চলাকালীন সময়ে প্রশাসনের এসকল সংস্থার সাহায্য গ্রহন।

৪। সকল ধর্ম,বর্ণ এবং লিঙ্গের জাতিকে সম অধিকার দান এবং তাদের আদর্শগত স্থান হতে পক্ষপাতমূলক আচরণ না করা।

৫। সকল নাগরিকদের তাদের নিজস্ব মতামত,ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় আচরণ অনুষ্ঠান পালনে নিশ্চিত করতে হবে; কারও ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকা; সকল প্রকার উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ও যারা শত্রুপক্ষদের সহায়তা করবে তাদের প্রচারণা বন্ধ করা।

৬। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজকর্ম হতে সেই সমস্ত কর্মকর্তাদের বহিস্কার করতে হবে যারা পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর সাথে জড়িত,পোষা বা আঙ্গাবহ এবং বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী;আমলা ও পুলিশের ক্ষমতা সীমিতকরন।

৭। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার জন্য একটি প্রকৃত দেশপ্রেমী ও জনবান্ধব সেনাবাহিনী গঠন করতে হবে।

৮। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।

৯। রাষ্ট্রীয় খাতে ভারী ও প্রাথমিক শিল্প কারখানা বাস্তবায়ন করতে হবে; রাষ্ট্রীয়খাত এমনভাবে গড়তে হবে যেন শিল্পখাত একটি কাঙ্খিত লক্ষে পৌছায়; রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানার প্রতিষ্ঠিত আইন প্রণয়নকারী প্রতিনিধি দ্বারা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানায় শ্রমিকদের যোগদান নিশ্চিত করার লক্ষে একক ব্যবস্থাপনা গ্রহন করতে হবে; রাষ্ট্রীয় খাতে শিল্পকারখানা গড়তে পুজি সংগ্রহ বাড়াতে হবে; ব্যাংক,বীমা,পাট শিল্প কারখানা এবং বাণিজ্য, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা জাতীয়করণ এবং অর্থনীতির ওপর একাধিক্যপত্যবাদী বাজার দখলদারদের নির্মূল করতে হবে।পুঁজিবাদ এবং ক্ষুদ্রপুজির অধিকারী রাষ্ট্রীয় খাতের বাইরে শিল্প কারখানা তৈরিতে  উৎসাহ এবং বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দান করতে হবে

নিরপেক্ষ সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে সকল দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক সৃষ্টি এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে হবে।প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে,বিশেষত ভারতের সংগে।

১০। (ক)ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জরুরী ও প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে।পরিবার প্রতি অধিষ্ঠিত জমির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা(প্রায় ৩৩ একরের ওপর) নির্ধারণ এবং দরিদ্র মানুষ ও কৃষকদের মাঝে অতিরিক্ত জমি প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে।সরকার কর্তৃক যে সমস্ত মালিকদের জমি অধিগ্রহন করা হবে তাদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ে।রাষ্ট্রীয় জমি ভূমিহীন এবং গরীব কৃষকদের মাঝে অবাধে বিতরণ করতে হবে।

(খ)২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকদের ভূমি করের আওতা মুক্ত রাখতে হবে।ভূমিকর সংগ্রহ পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা এবং দানকৃত ভূমি হতে উৎপাদিত দ্রব্যের লভ্যাংশের ওপর আনুপাতিক হারে আয়কর সংগ্রহ করতে হবে।

(গ)পাট ও অন্যান্য অর্থকারী ফসলের ন্যায্য মূল্য নির্ধারন করতে হবে।

(ঘ)কৃষি শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।

(ঙ)কৃষকদের সমবায় কৃষি চাষে উৎসাহিত করা।কৃষকদের জন্য রাষ্ট্রীয় সাহায্য যেমন:আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, সার, নিম্নসুদ, কৃষিঋণ  ইত্যাদি বর্ধিত করতে হবে

(১১)বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলা এবং সেচ ব্যাবস্থাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে ধরতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

(১২)শিক্ষাব্যবস্থাকে সার্বজনিন ও বিনামূল্যে বাস্তবায়ন; কম খরচে উচ্চ শিক্ষার ব্যাবস্থা করা, বিপুল সংখ্যক বিদ্যালয়, গবেষণাগার, মেডিকেল সেন্টার, কৃষি ও প্রযুক্তিগত স্থাপনা নির্মাণ; শিক্ষাব্যাবস্থাকে আমূল ভাবে পুনর্গঠন করতে একটি আধুনিক বৈঙ্গানিক ভিত্তি অনুসরণ করতে হবে

বাংলাদেশের সকল পর্যায়ে বাংলা মাধ্যমে শিক্ষাদান চালু করা এবং বাংলা ভাষার উন্নতি সাধনের লক্ষে রাষ্ট্রের পক্ষ হতে সকল সুযোগ সুবিধা প্রদান করতে হবে।বাংলাদেশে বসবাসরত উর্দুভাষীদের তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের সংস্কৃতি বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

(১৩)রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে রাষ্ট্রের পক্ষ হতে ব্যয় বাড়াতে হবে।জনগণের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সহজলভ্য করতে হবে।

(১৪)শ্রমিকদের জীবন ধারনের জন্য ন্যূনতম মজুরী, চাকরী নিরাপত্তা, সর্বোচ্চ ৮ ঘন্টা কর্মদিবস, ভবিষ্যত নিরাপত্তা এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের পাশাপাশি ধর্মঘট ও যৌথ দর কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।তাদের পরিবারবর্গের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধূলার জন্য বাসস্থান, ছুটি, শিক্ষা এবং চিকিৎসা ইত্যাদি সুবিধাসমূহ নিশ্চিত করতে হবে।তাদের ন্যায্য আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার মানের মিল থাকবে;তাদের বাসস্থান, চাকরি এবং কাজের নিরাপত্তা ও করের বোঝা কমাতে হবে।শ্রমিক ও অফিস কর্মচারীদের জন্য যানবাহন দিতে হবে।

অফিসের কর্মী, বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায় ও অন্যান্যদের জীবন যাত্রার মান অনুযায়ী ন্যায্য আয় সুনিশ্চিতকরণ; তাদের জীবিকা নির্বাহ, চাকরি ও সেবার(চাকুরির)নিরাপত্তা এবং তাদের উপর করের বোঝা কমানোর নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

(১৫)সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। সকল প্রকার বৈষম্য ও সামাজিক নিপীড়ন থেকে নারীজাতিকে মুক্ত করতে হবে। নারীদের মধ্যে শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ।

(১৬)যারা পাকিস্তানের শাসক চক্রকে সহযোগিতা করেছে অথবা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যারা মানুষের বিরুদ্ধে কাজ করেছে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং তাদের যথাপোযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে ।

(১৭) শত্রু দ্বারা দখলকৃত বা বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া। শত্রুদের দ্বারা যেসব ব্যক্তি ও পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে তাদের পুনর্বাসন করা। স্বাধীনতা সংগ্রামে আহত ও নিহতদের পরিবারকে পর্যাপ্ত সাহায্য প্রদান করতে হবে ।

(১৮)পররাষ্ট্র পরিমন্ডলে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করা। যেকোন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের চুক্তিতে যোগদান থেকে বিরত থাকা, সাম্যভাবে সকল দেশের সাথে অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা, ভারতসহ আফ্রো-এশিয়ান দেশ, সমাজতান্ত্রিক শিবির এবং সকল বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপন করা। শান্তিপ্রিয় দেশগুলোর সাথে একই কাতারে দাঁড়িয়ে বিশ্ব শান্তি রক্ষা এবং সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতির মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন করা ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য একটি নীতি অনুসরণ করা।

 

পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা শোষিত মানুষ ও নিপীড়িত মানুষের শুধুমাত্র ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে  পূর্ণ সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য একটি নীতি অনুধাবন করা।

সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির উপর নির্ভরশীলতা এড়ানো এবং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী শর্তমূলক বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ গ্রহণ পরিহার করা।

এই কার্যক্রমটি সংগ্রামের মাধ্যমে যেসব এলাকা স্বাধীন হবে সেসব এলাকায় যতদূর সম্ভব বাস্তবায়ন করতে হবে।