বাংলাদেশে শরণার্থী, গণহত্যা ও নির্যাতন প্রসঙ্গে ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

Posted on Posted in 8

৮৮। বাংলাদেশে শরণার্থী, গণহত্যা ও নির্যাতন প্রসঙ্গে ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ (৫৪১-৫৫২)

এখান থেকে এরা কোন ভবিষ্যতে পাড়ি দেবে?

যুগান্তর

-৩ এপ্রিল, ১৯৭১

ইছামতীর তীরে সারি সারি নৌকা নোঙ্গর করেছে অনেক দিন হলো। কিন্তু ঐসব নৌকোর মধ্যে যারা রয়েছে তারা যে এরপর কোথায় পাড়ি দেবে তা তারা জানে না। অন্য কেউই কি জানে?

ঐ নৌকোগুলি করেই তারা পূর্ব বাংলা ছেড়ে এসেছে। ভিটেমাটি, যা সামান্য সম্পত্তি ছিল তা ফেলে রেখে রাতের অন্ধকারে ওরা জন্মভূমি ছেড়েছে। পেছনে খান সেনা আর তাদের সাগরেদদের অত্যাচারের স্মৃতি, সামনে অজানা ভবিষ্যত। ভারতের তীরে এসে যখন নৌকো ভীড়লো তখন নিশ্চয়ই পায়ের তলায় শক্ত মাটি পাওয়ার আশায় ওদের বুকটা দুলে উঠেছিলো। কিন্তু শক্ত মাটি জুটলো কই? এখনও বেশ কিছু বৃদ্ধ প্রৌঢ়, যুবক, নারী ও শিশুর জীবন দিনরাত ইছামতির দোলায় দুলছে। নৌকোর মধ্যেই তাদের সংসার রান্নাখাওয়াশোয়া। নদীর জলে স্নান। আর নদীর ধারেই স্বাস্থ্যরক্ষার সব নিয়মকানুন তুচ্ছ করে মলমূত্র ত্যাগ।

হাসনাবাদের মাটিতে তারা নামছে, কিন্তু সেখানে বা অদূরে টাকীর শিবিরে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই। নতুন করে আর রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে না।

আমরা সবে হাসনাবাদে নেমেছি, দেখি তীর থেকে বোঝামাথায় মানুষের সারি এগিয়ে আসছে। ওরা শুনেছে বারাসতে নাকি নতুন রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে। সেখানে যাবে।

হাঁটবে অতদূর?

আর কী করা বাবু? নৌকোয় আর কদ্দিন কাটে? ছিলো সের পাঁচেক চাল। তাই এক বেলা করে খেয়ে পাঁচ সাত দিন চলছে। শুনছি ক্যাম্পে নাকি চালডাল দিতে আছে।

ঠিক জানো তো যে বারাসতে গেলে জায়গা পাবে?

তা ঠিক জানি না। যাই, দেখি ঘুরে গদি না পাই তবে না খেয়েই মরবো। মরণ যদি কপালে থাকে এ পাড়েই মরবো।

সবাই যে হাঁটা পথ নিয়েছে তা নয়। যারা খোঁজখবর রাখে তারা কাছে রেল স্টেশন থেকে হাসনাবাদবারাসত ট্রেনে চেপে বসেছে। ফলে ট্রেনে ভীড় খুব। স্থানীয় লোকের যাতায়াতে অসুবিধে। কিন্তু সেও তো অজানার উদ্দেশ্যেই পাড়ি। কারণ এতদিন পায়ের নিচে মাটি না থাকা মাথার ওপরে নৌকোর ছই ছিলো। যাওয়ার আগে নৌকোগুলো ওরা জলের দরে স্থানীয় লোকের কাছে বিক্রি করে দিয়ে যাচ্ছে। ইংরেজী জানলে ওরা বলতে পারতো, “উই হ্যাভ বার্ন্ট আওয়ার বোটস”। বারাসাতে বা অন্য কোথাও ঠাঁই না পেলে ফিরে আসার জায়গা সত্যিই ওদের নেই।

তবু এক হিসেবে ওদের ভাগ্যবান বলে মনে করতে পারা যাবে বৈকি? দারুণ দূর্যোগের সময় ওরা একটা আড়ালে থাকতে পেরেছিলো। ছইয়ের ওপর মাদুর, চাদর, কোথাও বা রঙিন লেপ দিয়ে ছিদ্র ঢাকার ব্যবস্থা করেছিলো। কিন্তু আরো এগিয়ে এসে টাকী বাস স্ট্যান্ডের কাছে যাদের দেখা পেলাম তাদের মাথার ওপর ছাউনী বলতে গাছের ডাল।

ওখানে কতকগুলি পরিবার গাছতলায় দিন আষ্টেক ধরে রয়েছে। বর্ষার মধ্যেও ঐ ভাবেই কেটেছে। জলে গা ভিজেছে, যা সামান্য জামাকাপড় আছে তাও ভিজেছে, মাদুরচাদরো ভিজেছে। কাপড় আবার গায়েই শুকোচ্ছে। চাদর বা তোষক এ ক’দিনের মধ্যে আর শুকোয়নি। তার ওপরেই শুতে হচ্ছে, কারণ মাটি তো আরো ভিজে কাদাকাদা। সবচেয়ে কষ্ট তো বাচ্চাগুলোর। ওখানেই তিনটের খুব জ্বর।

আমরা এগোতেই পরিবৃত হয়ে গেলাম। আমরা কি সরকার থেকে আসছি? ওদের যে এখনও টিকেট হয়নি। টিকেট না হলে তো ডোলও পাবে না। অথচ মেডিকেল হয়ে গেছে। কলেরার ইঞ্জেকশন আর বসন্তের টিকা, দুইই। সঙ্গে রয়েছে সেই কাগজ। কিন্তু টাকীর কোন ক্যাম্পেই তো আর নতুন লোক নেওয়া হচ্ছে না।

আমাদের একটা টিকিট করায়ে দ্যান বাবু। অন্ততঃ কয়েকদিন চালডাল দ্যান। তারপর যেখানে পাঠাইবেন সেখানেই যাবো।

টিকিট করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা থাকলে তখুনিই দিতাম বৈকি। ওরা ক’দিন চালডাল পেলে তার পরেই যদি অন্য কোথাও চালান হতে চায়, সেও তো খুব ভালো কথা। গাছতলা ছেড়ে, পশ্চিম বাংলার বাইরে যে কোন মাথা গোঁজবার ঠাঁইই ওদের কাছে প্রিয়তর। যখন পূর্ব বাংলার ভিটে ছাড়তে পেরেছে, তখন পশ্চিম বাংলার গাছতলাটার জন্যেই বা মায়া কিসের?

কিন্তু দেশে ফিরবে না?

না, দেশে আর ফিরবে না। কোথায় ফিরবে? যা কিছু ছিলো লুটে নিয়েছে। যখন লুটে নিলো তার পরেও তো ছিলো কিছু দিন। লুটপাটে বাধা দিতে গিয়ে মার খেয়েছে। হারাধন মন্ডলের হাঁটুতে আর কোমরের কাছে এখনও বল্লমের খোঁচার দাগ। তবুও ছিলো। কিন্তু যখন ঘরে আগুন দিলে, মেয়েদের ধরে টানতে লাগলো, ছেলেদের কাটতে লাগলো, তখনও কি আর থাকা চলে?

কিন্তু যদি আওয়ামী লীগ সরকার করে তা হলেও ফিরবে না? তা হলে ফেরা যায়, কিন্তু এখন কোথায় আওয়ামী লীগ বাবু? এখন তো সবাই মুসলিম লীগ।

আরো খানিক এগিয়ে বাঁ দিকে সৈন্যের বাগান ক্যাম্প। সামনে মারোয়াড়ি রিলিফ সোসাইটির নিশান।

এই ক্যাম্পে প্রায় সাতাশ হাজার নারীপুরুষশিশু। হিন্দুমুসলমানখৃষ্টান। খৃষ্টান পরিবার গোটা চারেক। মুসলমান পরিবার আটশ’র বেশি। ওরা থাকে ওধারে। এদিকে হিন্দুরা। বর্ণ হিন্দু নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ খুলনা জেলার। বেশির ভাগই চাষবাস করতো। একজন বললে, তার জমি ছিলো ৬২ বিঘে। এখন সঙ্গে আসছে শুধু খাজনার রশীদ। দলিলটা সঙ্গে করে আনতে পারে নি। তবে রশীদটা রেখেছে। যদি কখনও ফেরে তবে দাবি করতে পারবে জমিটা এইরকম আশা এখনও বুকের ভেতরে।

এখানে মাথাপিছু বরাদ্দ ৪০০ গ্রাম চাল, ১০০ গ্রাম ডাল আর ১০০ গ্রাম আলুপেঁয়াজ। ছ’দিনের রেশন এক সঙ্গে বিতরণ করে মারোয়াড়ি রিলিফ সোসাইটি।

মাঝে একটা বড় পুকুর। আর গোটা নয়েক নলকূপ। সরকারী কর্মচারীদের ওপর চাপ খুব, কিন্তু এখনও ঐ শিবিরে কোন বড় রকমের রোগ দেখা দেয়নি, এই যা রক্ষা। এই ক্যাম্পের জমিটাও একটু উঁচু। ফলে জল দাঁড়াতে পায় না। তবে স্বাস্থ্যরক্ষার বন্দোবস্ত এমন নয় যে খুব নিশ্চিন্তে থাকা যায়। বিশেষতঃ বর্ষা বাড়লে।

যারা শিবিরে ঠাঁই পায়নি তাদের দেখে আসার পর মনে হতে পারে এখানে এরা যেন সুখে আছে। মাথার ওপর ত্রিপল, রোদ, খাবারের বাঁধা বরাদ্দ। তবে জ্বালানির অভাব। তাই খিচুড়ি ফুটিয়ে নেওয়াই রেওয়াজ। শিবিরে প্রথম দিনটি অবশ্য অনেকের কাছে বিপদের। অনেকটা পথ অর্ধাহারেঅনাহারে হেঁটে এসে অনেকেই প্রথমে লোভের বশে অনেকটা খেয়ে ফেলে। পেট এই অনিয়ম সহ্য করতে পারে না।

সরকারী কর্মীরা যথেষ্ট করেছেন, তবু সমস্যা থেকেই যায়। পরাণ মন্ডলের রেশন কার্ড হারিয়ে গেছে। মাথা খুঁড়লেও কি আর খুঁজে পাবে? সরকারী কেরাণী বাবুর পা ধরে পড়েছে, বাবু আমায় আর একটা কার্ড করায়ে দ্যান।

পরাণের কান্নার সঙ্গে অফিসের ঠিক বাইরে এক বুড়ির কান্নার অবশ্য অনেক তফাৎ। তার বিশেষ জ্ঞান আছে বলে মনে হলো না। একবার করে বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আর ডুকরে কেঁদে উঠছে। চোখ দু’টো প্রায় ঠেলে বেরিয়ে আসে আর কি। বুড়িকে ঘিরে ক্যাম্পেরই কতো লোক ভীড় করেছে। বুড়ী পূর্ব বাংলা থেকে এসেছে কাছাকাছি কোথায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে। ওরা ওকে ক্যাম্পে দিয়ে চলে গেছে। বুড়িকে দেখার কেউ নেই। ওখানেই শুচ্ছে, ওখানেই যা পারে খাচ্ছে এবং মলমূত্র ত্যাগ করছে। ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত অফিসার একটা হতাশা সূচক আওয়াজ করে বললেন, একে নিয়ে কি করি বলুন তো?

বুড়ির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দেখি ওদিকে কিছু ছেলে পান বেচছে। স্থানীয় ছেলে নাকি? না, ক্যাম্পেরই ছেলে। বাজার থেকে কিছু পান, চুন, সুপারি কিনে ঝুড়ি নিয়ে বসে গেছে। কত বিক্রি হয়? সামান্য। আজ তো মাত্র পনেরো পয়সা ব্যাচলাম।

পানওয়ালা ছেলেটা হেসে উঠেছিলো। কেমন যেন নিরুদ্বেগের হাসি। ক্যাম্পের সকলের মুখে অবশ্য সেই নিরুদ্বেগ নেই। প্রধান প্রশ্ন, এরপর কি? প্রায় সকলেই ঠিক করে ফেলেছে, দেশে ফেরা আর নয়। জানি না, সরকার এদের কি করে দেশে ফেরাবেন। সেটাও তো বোধহয় পরের প্রশ্ন। ক্যাম্পে অনেকেরই ভাবনা, এরপর সরকার কোথায় পাঠাবেন? কিছু কিছু লোক যে বাংলার বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা ওরা শুনেছে। ‘তবে যেখানেই পাঠান বাবু ভারতের মধ্যে যেখানেই পাঠান যাবো। সরকার আমাদের জন্য এত করছেন, খেতে দিচ্ছেন, পরতে দিচ্ছেন,আমরা কথা শুনবো বৈকি।’

ক্যাম্পের বাইরে ছোটখাটো জটলা। ক্যাম্পে জায়গার খোঁজে অনেকে এসেছে। কিছু লোক বারাসতের পথে থেমেছে। শুনছি, এই ক্যাম্প থেকে নাকি কাল আরো টিকিট দেবে? আরে না, না, ওসব বাজে কথা। এখানে নতুন লোক নেওয়া বন্ধ। চল, চল, বারাসতেই শেষ চেষ্টা।

ওরা যাবে অবশ্যই, ক’জন বারাসত পৌঁছবে জানি না। পৌঁছলেও হয়ত শিবিরে জায়গা পাবে না। অনেকে তার আগেই এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়বে। কোন পরিত্যক্ত বাড়িতে, অথবা কোনো বাড়ির দাওয়ায় আশ্রয়। কিম্বা হয়ত গাছতলায়। তারপর পথশ্রম বা রোগে মৃত্যু। অথবা কোন অসৎসঙ্গে পড়তেই বা বাধা কোথায়?

ফেরার পথে বারাসতে রাস্তার দু’ধারে এমন অনেককেই দেখলাম। দু’একটা স্কুলবাড়িও এখন বেসরকারী শিবির। অসংখ্য লোক, হৈ চৈ। নোংরা হয়ে উঠছে চারদিক। এদের জন্যে কোথায় কি ব্যবস্থা?

হাসনাবাদ থেকে যারা শেষ আশায় বুক বেঁধে হাঁটতে শুরু করেছে তাদের গন্তব্যের শেষ হবে কোথায়?

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

.

বাস্তুহারাদের মুখে আর্মি বর্বরতার কাহিনী – নারায়ণ দাশ

হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড

-১২ এপ্রিল, ১৯৭১

হরিদাশপুর সীমান্ত চেকপোস্ট, এপ্রিল, ১৯৭১।

রবিবার সকালে পাকিস্তানী বাহিনী ঝিকরগাছা থেকে আরও সামনে অগ্রসর হয়েছে, পথে তারা যশোর রোডের দু ধারে শতশত ভীতসন্ত্রস্ত গ্রামবাসীকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করেছে। রিফিউজিরা পেট্রাপোল রিসিপশন সেন্টারে আশ্রয় নিয়েছে, যা তাদের জন্য কিছুদিন আগে রাজ্যসরকার খুলে দিয়েছে। পাকিস্তানী বাহিনী মুক্তিবাহিনীর কাছে শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ার পর অসংখ্য গ্রামের ঘরবাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং প্রচুর মানুষ হত্যা করে। কিছু স্থানে তারা বন্দুকের মুখে মানুষকে বাধ্য করে তাদের দোকান খোলার জন্য এবং পাকিস্তানী পতাকা ওড়ানোর জন্য।

মুক্তি ফৌজের কিছু সদস্যের সাথে যশোর রোড ধরে হেটে যাবার সময় আমি দেখলাম, অনেক লোক তাদের সহায়সম্বলসহ হরিদাশপুর সীমান্তের দিকে আসছে। কিছু বাড়ীতে, মানুষদের গোছগাছ করতে দেখলাম নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হবার জন্য। হরিদাশপুরের দিকে ফিরে আসার সময় বেনাপোলের বধ্যবয়স্ক তোরাব আলী বললেন– ‘পৈতৃক বাড়ী ছেড়ে যাওয়া কতটা কষ্টের, আপনি কি তা চিন্তা করতে পারেন?’ এরপরেও তোরাব আলীর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে এবং তারা আবার তাঁদের ঘরে ফিরবে।

প্রায় ৫ হাজারের অধিক মানুষ নবারন, ঝিকরগাছা, শারশা, বেনাপোল এবং যশোর শহর থেকে এসেছিল। তাঁদের আশ্রয় দেওয়া হয় পেট্রাপোল ক্যাম্প এবং অন্য একটি ক্যাম্পকে। সেটা ছিল বগুরা বর্ডারের কাছে। মামা ভাগনে গ্রামে। বেশীরভাগ গ্রাম ধ্বংস হয়েছিল। শুধু রবিবারেই তিনশত পঞ্চাশের অধিক পরিবার সীমান্ত অতিক্রম করে।

পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বরতার কাহিনী বলতে গিয়ে এসকল গ্রামের একটির বাসিন্দা জনাবা হোসনে আরা এই রিপোর্টারকে বলেন যেপাকিস্তানী বাহিনী তাঁদের গ্রামের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করে এবং তাঁদের ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে বলে। যদি কেউ স্লোগান দিতে দ্বিধা করে, তাঁকে তৎক্ষণাৎ গুলি করে হত্যা করা হয়। তারা মানুষের সহায়সম্বল লুট করে, মেয়েদের গায়ের গহনা ছিনিয়ে নেয় এবং পরে তাঁদের হত্যা করে। তিনি নিজেকে কিভাবে বাঁচালেন আমার এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন– ‘ যখন পাক আর্মি আমাদের গ্রামের দিকে ধেয়ে আসছিল আমি আমার ৩ বছরের বাচ্চাকে বুকে নিয়ে প্রাণপণ ছুটতে থাকি এবং একটা ঝোপের আড়ালে আশ্রয় নেই, আমি সেখানেই রাত কাটাই এবং পরদিন মুক্তি ফৌজের দেওয়া বাহনে করে বেনাপোলে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় চলে আসি। চার দিন পর আমি সীমান্ত অতিক্রম করি। আমি জানি না আমার স্বামীর কি হয়েছে যে কিনা ঐদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় হাটে গিয়েছিলেন।’ এই বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পরেন।

৬০ বছরের বৃদ্ধ যশোরের হারমত আলী মণ্ডল তার ৩ ছেলেকে হারিয়েছিলেন। তিনি আমার সাথে কোন কথাই বলতে পারেন নি। কারণ তিনি কান্না থামাতে পারছিলেন না। কিছু মানুষ তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।

রিলিফের পদক্ষেপ

এদিকে রাজ্য সরকার, বয়রা ক্যাম্পের অসহায় নিঃস্ব মানুষদের সাহায্যের জন্য ব্যাপক ব্যবস্থা করে। ভারত ‘সেবাশ্রম সংঘ’ অসহায় উদ্বাস্তু মানুষদের খাদ্য এবং অন্যান্য রিলিফ প্রদানের মাধ্যমে। প্রশংসনীয়ভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে । সংঘের একজন স্বামীজী এই রিপোর্টারকে বললেন যে, অসুস্থদের সেবা করার জন্য দুই জন ডাক্তার দিয়ে তাঁরা ক্যাম্পে একটি মেডিক্যাল ইউনিট খুলেছেন। সংঘের দুই ডজনের অধিক ভলান্টিয়ার দিন রাত কাজ করছে রিলিফ অরগানাইজের জন্য।

ক্যাম্পের বেশীরভাগ মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। যথাযথ পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

.

ভারত যাবার পথে ৯০০ শরণার্থী নিহত

অমৃত বাজার পত্রিকা

৩০ এপ্রিল, ১৯৭১

কুচবিহার, ২৮ এপ্রিল, প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানাচ্ছে প্রায় ৯০০ লোক যারা ট্রেকিং(পায়ে হেটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া) করে ইন্ডিয়ার দিকে যাচ্ছিল তাঁদের পাকিস্তানী আর্মি নির্মম ভাবে হত্যা করেছে।

ছয় জন রিফিউজি, একাধিক বুলেটের ক্ষত নিয়ে বাংলাদেশের ডোমার পুলিস স্টেশন থেকে আজ হলদিবাড়ী এসে উপস্থিত হয়েছে এবং এখন হাসপাতালে আছেন। তারা বলেছেন যে তাঁরাও ঐ আক্রান্তদের মাঝে ছিলেন যাদের পাকিস্তানী আর্মি গুলি করেছে কিন্তু কোন মতে বেঁচে পালিয়ে আসতে পেরেছেন।

তারা বলেনএকই এলাকার প্রায় ৮ হাজার মানুষ যখন ইন্ডিয়ার দিকে আসছিল তারা পাকিস্তানী আর্মির বাঁধার মুখে পড়ে এবং আর্মিরা তাঁদেরকে ক্যাম্পে যেতে বাধ্য করে। পাকবাহিনী এরপর সবল দেহের পুরুষদের গ্রুপ থেকে আলাদা করে লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য করে এবং তারপর ব্রাশ ফায়ার করে। ভীতসন্ত্রস্ত বাকিরা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়িমরি করে ছুটতে থাকে।

আমাদের দিনহাটা প্রতিনিধি যোগকরেনকুচবিহার রাজ্যের অন্তর্গত দিনহাটার বনশপচাই ছিটমহলের লুটতরাজসহ বিভিন্ন রিপোর্ট এখন পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে দুই দিনের অনুপ্রবেশকালে পাকবাহিনীর এলোপাথাড়ি গুলি বর্ষণে প্রায় ১৫০ জন মানুষ মারা যায় এবং সব ঘরবাড়ী ধ্বংস হয়। এই ছিটমহলে প্রায় ৩০০ মানুষের বাস ছিল। বেঁচে যাওয়া বাকীরা দিনহাটা সীমান্ত হয়ে ইন্ডিয়াতে চলে আসে।

পাকবাহিনী আজ সকাল ১০টার সময় ইন্ডিয়ান ছিটমহলের পাশ্ববর্তী ধীরখাতা এবং শিবেরকুঠি গ্রামে প্রবেশ করে অনেক সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। দিনহাটা হাসপাতালে বুলেটের ক্ষত নিয়ে আসা কিছু মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

.

শরণার্থী আগমন অব্যাহত: সমস্যা বাড়ছে

যুগান্তর

মে, ১৯৭১

কলকাতা, ৬ মে হলদিবাড়ি শহরে বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য শরণার্থী আসতে থাকায় এক গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে। জেলা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের অনূর্ধ্ব জানিয়ে বলেছেন,দৈনিক গড়ে ১২ হাজার মানুষ হলদিবাড়ি আসছেন। জেলা কর্তৃপক্ষ আরও বলেছেন, শহর ও সীমান্ত পরিদর্শন করে দেখা গিয়েছে বুধবার প্রায় বারো হাজার শরণার্থী এসেছেন এবং সীমান্তের ওপারে আরও বাইশ হাজার মানুষ এপাড়ে আসার জন্য অপেক্ষা করছেন।

কুচবিহার জেলার ছোট শহর হলদিবাড়িতে এ পর্যন্ত দেড় লক্ষেরও বেশী শরণার্থী এসেছেন। বিভিন্ন বিদ্যালয় কিংবা খালি বাড়ীতে প্রথম দিকে এঁদের স্থান দেওয়া হয়েছিল, এখন তাও পাওয়া যাচ্ছে না। বহু শরণার্থীকে আকাশের তলায় রাত কাটাতে হচ্ছে। এই অসহনীয় অবস্থার প্রতীকারের জন্য জেলা কর্তৃপক্ষ রাজ্য সরকারের কাছে তাঁবু এবং ওষুধপত্র চেয়েছেন।

কোচবিহারে সোয়া লক্ষ শরণার্থী

কোচবিহার থেকে প্রতিনিধি হরিপদ মুখার্জি জানাচ্ছেন, বাংলাদেশ থেকে শরণার্থীরা প্রতিদিনই কোচবিহার জেলাতে যথেষ্ট সংখ্যায় আসছে। এ পর্যন্ত কোচবিহার জেলায় বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে সোয়া লক্ষ শরণার্থী এই জেলায় আশ্রয় নিয়েছে। এই জেলার কয়েকটি শিবির ঘুরে দেখলাম, এখনও অনেক সরকারী শিবির দরকার।

সরকারী ব্যবস্থাপনায় ইতিমধ্যে ৩৫টি শিবির প্রায় পঞ্চাশ হাজার শরণার্থীকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই গ্রামাঞ্চলের স্কুলবাড়িগুলোই অস্থায়ী শিবিরে পরিণত হয়েছে, তারপরেও আরও বহু মানুষ রাস্তার পাশে অথবা খোলা মাঠে নিজেদের শতরঞ্জি, চাদর দিয়ে ছাউনি করে কোন মতে মাথা গুঁজবার ঠাই করে নিয়েছে। সরকারী শিবিরে নাম উঠেনি বলে তাঁদের বাইরের সেবা প্রতিষ্ঠান গুলর খয়রাতী সাহায্যের উপর নির্ভর করে থাকতে হচ্ছে।

কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ি ও দিনহাটা সীমান্ত দিয়েই বেশী পরিবার আসছে।

এক অভিন্ন বৈশিষ্ট্য

শরণার্থীদের যারা এপারের আশ্রয় শিবিরে এসে আশ্রয় নিয়েছে, তাঁদের মধ্যে এক অভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে। ধর্ম ও সম্প্রদায়ের কোন পার্থক্য নেইএক পরিচয় ওরা সবাই বাঙ্গালী। পাশাপাশি একই শিবিরে দুই সম্প্রদায়ের লোক একত্রে রান্নাবাড়া করে খাচ্ছে। খোঁজ খবর নিচ্ছে। ওপারের আত্মীয়স্বজনের খবর বিনিময় করছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা লড়াই করছেন, ওদের প্রাত্যহিক খবর নেবার জন্য ওরা ব্যগ্রকবে ঘরে ফিরে যাবে তারই প্রতীক্ষা করছে। তাই এই বাংলার আতিথেয়তায় তারা মুগ্ধ, সামান্য ত্রুটিগুলি তারা ধরছেন না।

মন্টুর কথা

শিলিগুড়ির নিজস্ব প্রতিনিধি লিখেছেন: আট বছরের তয়েব বাবামাকে হারিয়ে আজ ইসলামপুর স্কুলে ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। পাক দস্যুরা গুলিতে তার বাবা ও মাকে হত্যা করেছে।

তয়েবের বাবা রফিক ঠাকুরগাঁ শহরে রিকশা চালাতো। সম্প্রতি পাক সৈন্য ঠাকুরগাঁ শহরে প্রবেশ করে এবং সামনে যাকে পায় তাকেই নির্বিচারে গুলী করে হত্যা করে। পাক সৈন্য আসার পূর্বে বেশীরভাগ লোক শহর ছেড়ে চলে যায়। যারা নিঃস্ব দরিদ্র একমাত্র তারাই শহরে ছিল। মনে করেছিল পাক সৈন্য তাদের কিছু ক্ষতি করবে না। কিন্তু বর্বর পাক সৈন্যের নিকট ধনী দরিদ্রের বিচার নেই।

রফিককে গুলী করে বর্বররা তয়েবের মার দিকে বন্দুক তাক করে। তাই দেখে তয়েব কেঁদে ওঠে এবং সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকের গুলিতে তার মা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই দেখে তয়েব নদীর ঘাটের দিকে পালায়। সেখানে অনেক লোক নদী পার হয়ে ভারত সীমান্তের দিকে পালাচ্ছে। তয়েব তাদের সঙ্গে ভিড়ে পড়ে। তার জীবনের মর্মান্তিক ঘটনা সকলকে স্পর্শ করে। তারা তয়েবকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ নানা গ্রাম ঘুরে ইসলামপুরে আসেন এবংজয় বাংলা সংগ্রাম সংহতি কমিটি পরিচালিত ক্যাম্পে আশ্রয় পান। এখানে ছেলেরা তয়েবের নাম দিয়েছে মন্টু। মন্টুর হৃদয়বিদারক কাহিনী এখন ক্যাম্পের সকলের মুখে। মন্টুর ক্যাম্পবাসী ও কর্মীদের বড় প্রিয়, বড় আপনজন হয়ে উঠেছে।

দেড় লক্ষ শরণার্থী

বাংলাদেশ থেকে ইসলামপুর মহকুমায় দেড় লক্ষের উপর উদ্বাস্তু আগমন হয়েছে। জয় বাংলা সংগ্রাম সংহতি কমিটি অনেক উদ্বাস্তুকে বিনা মূল্যে রান্না করা খাদ্য সরবরাহ করেছেন।

এই ক্যাম্পের বেশীরভাগ লোক এসেছেন বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও অঞ্চল থেকে। এঁদের নিকট পাক বাহিনীর বহু অকথ্য অত্যাচারের কথা জানা গেল।

ত্রিপুরাতেই লক্ষ উদ্বাস্তু

আগরতলা, ৬ই মেবাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪ লক্ষ উদ্বাস্তু সীমান্ত পেরিয়ে ত্রিপুরায় এসে হাজির হয়েছে। ত্রিপুরার নিজস্ব লোকসংখ্যা হল ১৫ লক্ষ। সাবরুম মহকুমায় এসেছে ১ লক্ষ ৩৭ হাজার উদ্বাস্তু। এই মহকুমার নিজস্ব লোকসংখ্যা হল মাত্র ৬০ হাজার। সরকারী সূত্রে এই খবর পাওয়া গেছে।

একটি বিবৃতিতে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শচিন্দ্রলাল সিংহ ত্রিপুরায় আগত উদ্বাস্তুদের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য রাজ্য সরকারগুলিকে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, উদ্বাস্তুদের জন্য কেন্দ্রের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোনও সাহায্য পাওয়া যায়নি।

করিমগঞ্জ থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টে প্রকাশ, প্রায় ৫০ হাজার উদ্বাস্তু গত এক মাসে সীমান্ত পেরিয়ে করিমগঞ্জে এসে হাজির হয়েছে। এঁদের মধ্যে ১৬ হাজার উদ্বাস্তুকে করিমগঞ্জ মহকুমার মোট ২৭টি শিবিরে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার উদ্বাস্তু করিমগঞ্জ সীমান্তে এসে হাজির হচ্ছে।

করিমগঞ্জে বাংলাদেশ ত্রাণ কমিটির পক্ষ থেকে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করে বলা হয়েছে যে, সীমান্তের অপার থেকে আগত উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে উপযুক্ত খোঁজ খবর করার পর ভারতে বসবাসের অধিকার যেন দেওয়া হয়। অন্যথায় সমাজবিরোধীরা এই সুযোগে ভারতে এসে হাজির হতে পারে।

.

আগরতলা হাসপাতালে গণহত্যার প্রমাণ

২২ মে, ১৯৭১

নয়া দিল্লি, ২০ মে- আগরতলার জেনারেল হাসপাতালকে নির্দোষ পূর্ব বাঙালিদের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অমানবিক নৃশংসতার একটি ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা যায়- পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত এলাকা ঘুরে আসার পর এমনটিই লিখেছেন একজন ইউএনআই সংবাদদাতা।

পূর্ববাংলার সীমান্ত থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ২৬০ শয্যার হাসপাতালটিতে রোগীদের স্থান সংকুলান হচ্ছিলো না। যাদের বেশিরভাগই ছিল হিংস্র পাকবাহিনীর শিকার।

যখন ইন্ডিয়ান এবং বিদেশী সাংবাদিকদের একটি দল বুধবার হাসপাতালটি পরিদর্শনে আসে তখন এর প্রতিটি ওয়ার্ড রোগীতে কানায়-কানায় পূর্ণ ছিল। এখানে ৫৩০ জন রোগী আছেন, যা এর ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশী। রোগীরা ব্যবহারযোগ্য সকল জায়গা দখল করে নিয়েছিল। সার্জিক্যাল ওয়ার্ডের ভিড়টা ছিল চোখে পড়ার মত, সেখানে ছিল গুলিতে এবং শেলে আঘাত প্রাপ্ত রোগীরা।

হৃদয়স্পর্শী ঘটনাগুলোর মাঝে ছিল একটি ১৩ বছরের ছেলে এবং একটি ৯ বছরের মেয়ের ঘটনা। দুজনেই পাকিস্তানী শেলিং-এ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে। তাঁদের চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার বলেন- তার যথাসাধ্য চেষ্টার পরেও চোখের দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দেয়া প্রায় অসম্ভব।

জনাব শামসুদ্দিন আহমেদ, একজন রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারের মাথাটি ছিল শক্ত করে ব্যান্ডেজে মোড়া। তার অফিসে ঢুকে পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে গুলি করেছিল। অবসর গ্রহণের দ্বারপ্রান্তে থাকা জনাব আহমেদ বলেন- তিনি ত্রিপুরা সীমান্তের কাছে আখাউড়া জংশনের রেল-রোড ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। গত মাসের এক বিকালে আর্মির লোকেরা তার অফিসে ঢুকে ফাইল পত্র ছুঁড়ে ফেলে দেয়। পরে তারা গুলি বর্ষণ করা শুরু করে। তিনি এবং তার সহকর্মীরা দৌড়ে পালান। কিন্তু পালানোর আগেই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এপ্রিলের ১৮ তারিখ তাঁর স্বজনেরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

আহমেদ সাহেব বলেন, তিনি কখনো কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন না। আবেগজড়িত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি ১০ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কি করবেন তা নিয়ে চিন্তায় পরে যান। এক মুহূর্তের ভিতর তিনি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। কারণ অফিস কম্পাউন্ডের সাথে থাকা তার ঘর এবং আসবাবপত্র পাক সৈন্যরা জ্বালিয়ে দিয়েছে। একমাত্র সান্ত্বনা ছিল এটুকুই যে তার পরিবার নিরাপদ ছিল। ঘটনার সময় তাঁরা গ্রামে ছিলেন। পরে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে উদ্বাস্তুদের সাথে ঘর বাঁধেন।

গণহত্যা

হালিদ হুসাইন সাহেবকে (২৭) তীব্র মানসিক ধাক্কা এবং অবসাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিলো। তিনি ২৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম ছেড়ে আসেন যখন আর্মি শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং নির্বিচারে বাঙালি নিধন শুরু করে। তিনি রাজনীতিতে একেবারেই আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু নিজের লোকেদের হত্যাকাণ্ড দেখার পর তিনি মুক্তি ফৌজে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সুসজ্জিত দখলদার বাহিনীর কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়া কি মুক্তি ফৌজের পক্ষে সম্ভব হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে হুসাইন সাহেব মনে করিয়ে দিলেন, শক্তিশালী ফ্রান্সের সাথে আলজেরিয়ান এবং তিউনিশিয়ান বাহিনীর যুদ্ধের কথা। তিনি বলেন- যদি এই দেশগুলো স্বাধীনতা জিতে নিতে পারে তবে মুক্তি ফৌজও পাকিস্তানী আর্মির কাছ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পারবে।

তিনি বলেন পাকিস্তানী আর্মির মূল লক্ষ এখন শুধু বাঙালি নিধন সে হিন্দু বা মুসলিম যেই হোক না কেন।

১৩ বছরের এক মুসলিম বালিকা জানালো, পাক আর্মি তার বাবা-মা সহ ১২ সদস্যের পরিবারকে ঘরে ঢুকতে বলে। পরে তারা সেই ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং চলে যায়। মেয়েটি অলৌকিক ভাবে পালাতে সক্ষম হয় কিন্তু তার পরিবারের অন্য সকল সদস্য মারা পড়েন। প্রতিবেশী একজন বৃদ্ধা তাকে উদ্ধার করেন এবং আগরতলা নিয়ে আসেন।

গুলিবর্ষণ

নারায়ণ পাল (১১) তার ঘরের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন সে হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ হয়। তার ভাই তাকে কুমিল্লা হসপিটালে নিয়ে যান। পরে তাকে আগরতলা হাসপাতালে নিয়া আসা হয়। তখন তার পুরো পরিবার ইন্ডিয়া চলে আসে। কুমিল্লায় তার স্কুলে ফিরে যাবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে পাল বলে সে যাবে না। সে ক্লাস ফোরের ছাত্র।

আরেকজন শিক্ষার্থী সুবল কান্তি নাথ (১৭)। বুলেট তার হাতের হাড় ভেঙে দিয়েছে। সে তার ঘর থেকে দূরে পালিয়ে যাচ্ছিল যখন আর্মি ঘরে ঢুকে এলোপাথাড়ি চারিদিকে গুলি ছুড়তে থাকে। সে জানে না তার পরিবারের অন্য সদস্যদের কি হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরে তার বাবার একটা মুদি দোকান আছে।

শফিউল্লাহ (৩০) বুক এবং তলপেটে বুলেটের ক্ষত নিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। সৈন্যরা তার বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং পালানোর সময় তাকে গুলি করে। সে নোয়াখালি জেলার ফেনি শহর থেকে এসেছে। সে জানে না তার পরিবারের বাকি সদস্যদের ভাগ্যে কি ঘটেছে। এদের মধ্যে তার স্ত্রী এবং এবং দুই সন্তান রয়েছে। কিছু স্বেচ্ছাসেবী তাকে ত্রিপুরা সীমান্তে বয়ে নিয়ে আসে।

বুদ্ধিজীবীরা

পাকিস্তানী বুদ্ধিজীবীদের একদল ত্রিপুরা শহরের নরসিংহ রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়য়ের একজন মুসলিম প্রোফেসর বলেন- পাকিস্তানী আর্মির লক্ষ ছিল সকল বুদ্ধিজীবী, টেকনিশিয়ান, ব্যবসায়ী এবং শিল্পীদের নিঃশেষ করে দেওয়া। তারা শুধু কিছু গোলাম বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছে।

ভিক্ষু মহাদেব জ্যোতি পাল, পাকিস্তানের বুদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান বলেন যে- তিনি যে আশ্রমে বসবাস করতেন, সেটি এবং তার চারপাশের গ্রাম পাক আর্মি গত মাসে জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাঁরা ৬ জন তরুণ ভিক্ষুকে হত্যা করেছে।

মিস নোমিতা ঘোষ, ঢাকা রেডিওর একজন শিল্পী, তিনি বলেন- ঘরে আগুন লাগানোর পূর্বে সৈন্যরা অল্পবয়সী মেয়েদের ধরে নিয়ে যেত।

সংবাদদাতারা যারা হাসপাতালটি এবং শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করেন তাঁরা গাড়িতে করে দক্ষিণ ত্রিপুরার সাবরুমেও যান। পাকিস্তানী আর্মির নিপীড়নের শিকার মানুষদের জন্য এটা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ পথ। সাবরুম থেকে সংবাদদাতারা ফেনি নদীর ওপারের শহর রামগড়কে কসাইখানা হয়ে থাকতে দেখেছেন। নদী তীরের সব কুঁড়েঘর গুলো পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। একমাত্র অক্ষত কাঠামো হিসেবে সরকারী বিল্ডিঙের উপর একটি একাকি পাকিস্তানী পতাকা উড়ছিল। পতাকাটি ছিল মে মাসের শুরুর দিকে মুক্তি ফৌজের সাথে এক তিক্ত যুদ্ধের পর ঐ এলাকায় পাকিস্তানী দখলদারিত্বের প্রতীক।

–ইউএনআই

.

সন্ত্রাস এবং কসাইখানা থেকে পলায়ন

২৩ মে, ১৯৭১
সংখ্যাগুরু বাংলাদেশী শরণার্থীর স্মৃতিতে আছে নির্মম শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হবার টাটকা ক্ষত এবং সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
লিখেছেন- মনোজিত মিত্র

ত্রিপুরার সীমান্তবর্তী শহর সাবরুম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মাঝে দিয়ে বয়ে চলেছে সংকীর্ণ ফেনী নদী। গত সপ্তাহে এপ্রিল মাসের এক সকালে স্থানীয় নৌকাতে করে নদী পার হচ্ছিলাম। আমি আমার পিছনে দেখতে পাচ্ছিলাম হাজারো বাংলাদেশী শরণার্থী। নদী পার হবার অপেক্ষায় আমার সামনেও ছিল আরও হাজারো মানুষ এবং অগণিত মানুষ অগভীর জল মাড়িয়ে জিনিসপত্র কাঁধে করে অপর পাড়ে যাচ্ছিল। ১৫ কিলোমিটার দূরেই তুমুল গোলাগুলি চলছিল এবং তাঁদের যাত্রা ছিল অব্যাহত।

এটা ছিল সেই দৃশ্যগুলোর মাঝে অন্যতম, যা এক মুহূর্তে সব পরিষ্কার করে দেয়। আপনাকে শুধু দেখতে হবে ভিড় ঠেলে হাজারো মানুষের ছুটে চলা, তাঁদের আতঙ্কগ্রস্থ মুখচ্ছবি এবং একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তাঁদের ব্যাকুলতা এমনকি রাস্তায় রাত কাটানো। পার্বত্য সীমান্তবর্তী শহর রামগড় তখনো মুক্তি ফৌজের দখলে ছিল। কিন্তু পাকিস্তানী আর্মি সামনে এগিয়ে আসছিল। তারা নির্মমভাবে শেলিং করে গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। এই গ্রামগুলো থেকেই হাজারো লোক পালিয়ে এসেছিলেন।

এপ্রিলের ৩য় এবং ৪র্থ সপ্তাহে সাবরুম ছিল ত্রিপুরার সব চেয়ে জনবহুল সীমান্ত। তখন প্রায় ২,০০,০০০ শরণার্থী মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে এসে জড়ো হন। অন্যান্য সীমান্ত এলাকাতে শরণার্থীরা আগেই আসা শুরু করেছিলেন। হাজার হাজার মানুষ সিলেট, কুমিল্লা এবং নোয়াখালী জেলা থেকে সোনামুরা, কমলাসাগর, দবীপুর এবং অন্যান্য সীমান্ত দিয়ে এসেছিলেন। আগরতলা থেকে এই বিভিন্ন সীমান্তে পরিদর্শনের সময় আমি সবখানে দেখি শুধু শরণার্থী আর শরণার্থী; রাস্তার পাশে, তাবুতে, স্কুলে, কলেজে, ব্যাক্তিগত ঘরে, মাঠে, রাস্তায়।

সাবরুমেই আমি সবথেকে করুণ দৃশ্যটা দেখি। হাজার হাজার মানুষ রাস্তা আর থানার আঙিনায় বসবাস করছিল। সেখানে প্রকৃত শরণার্থীদের জন্য ইস্যু করা স্লিপ সংগ্রহের জন্য ছিল দীর্ঘ সারি। যখন আমি থানার ভিতরে গেলাম, তখন স্লিপ নেয়ার জন্য সাহায্য চাইতে কিছু বৃদ্ধা আমার কাছে ছুটে আসলেন। যখন পরিবারের একজন সদস্য স্লিপের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল অন্যরা খাবারের সন্ধানে চলে যায়। নিজেদের বানানো তাবুতে মুরুব্বী লোকেরা ঘুমান। শিশুরা লুকোচুরি খেলছিল, তারা পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারে নি যে তাঁদের উপর কি দুর্যোগ এসে পড়েছে। অনেকেই খাবারের সন্ধান করছিল। কিন্তু তাঁদের সবার কেনার সামর্থ ছিলনা। কিছু পরিবার নদী পাড়ে তাঁদের বাসনপত্র বিক্রির চেষ্টা করছিল। এগুলো ছিল তাঁদের শেষ সম্বল।

খাবার পানির তীব্র সংকট ছিল। জেলা কর্মকর্তারা অস্থির হয়ে ওঠেন। তাদের কেউ কেউ বলেন কলেরার এক বা দুইটা রিপোর্ট ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। আর যদি ভিড় কমানো না যায়, তাহলে অচিরেই এটা মহামারীতে রুপ নিতে পারে। শরণার্থীদের ক্যাম্পে নিয়ে যাবার জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর ট্রাক আসে। যারা সাথে করে সাইকেল নিয়ে এসেছিল, তাঁরা তা ট্রাকের সাইডে বেঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে যায়। নারী, শিশু এবং জরাগ্রস্ত বৃদ্ধেরা হামাগুড়ি দিয়ে ট্রাকে ওঠে। তরুণ ছেলেরা তাদের সাহায্য করে। ওরা এতকিছুর পরেও তাদের উদ্দীপনা ধরে রেখেছিল। কেউ কেউ এত ক্লান্ত ছিল যে কথাও বলতে পারতো না। মাঝেমাঝে এক বা দুজনকে চলন্ত ট্রাক থেকে গলা বাড়িয়ে বমি করে দিতে দেখতাম।

ক্যাম্প গুলো বিভিন্ন এলাকাতে গড়ে তোলা হয়েছিল। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষে ভিড় সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। তাদের অনেকেই বলেন ত্রিপুরার জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুন হবার পথে।

বেশীরভাগ শরণার্থী দরিদ্র এবং চাষী সম্প্রদায়ের ছিলেন। তবে এখানে মধ্যবিত্ত এবং ধনীরাও ছিলেন। তাদের বেশীরভাগই আগরতলা এসেছেন এবং সেখান থেকে কোলকাতা চলে গিয়েছিলেন। আর অন্যরা গিয়েছিলেন আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতদের কাছে। সেখানে সচ্ছল আইনজীবী, ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়াররাও ছিলেন। বর্বর পাক বাহিনীর চোখে ধুলো দেবার জন্য তারা অনেক প্রতিকূল পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। একজন আইনজীবী তার ২টি বাড়ী এবং ৩টি গাড়ী পিছনে ফেলে শুধু বউ আর ছেলেকে নিয়ে আগরতলা প্রবেশ করেন। একজন চলচিত্র অভিনেত্রী ৪৮ ঘন্টা পায়ে হেটে কাঁদা পানি পার করে আগরতলা এসে উপস্থিত হন। উনি আগে ৩টি সিনেমাতে কাজ করেছিলেন। যে কোন মুহূর্তে পথে মৃত্যুর ঝুকি নিয়ে একজন স্থপতি ঢাকা থেকে তার স্ত্রী এবং সন্তানকে নিয়ে এসেছেন।

তাঁদের সকলেই বিষণ্ণ ছিলেন না। বাংলাদেশের কিছু শিক্ষক এবং লেখকদের একটি দলের সাথে আগরতলার পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে দেখা হওয়া আমার জন্য অনুপ্রেরণা দায়ক অভিজ্ঞতা ছিল। তাঁদের কেউ কেউ এসেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারা মুক্তিফৌজের যোদ্ধাদের সাহায্য করেছিলেন এবং সামনাসামনি যুদ্ধ দেখেছিলেন। প্রতিটি পরিবার ইন্সটিটিউটের একটা করে রুমে ছিলেন। ঐ রুমেই রান্না এবং ঘুমের ব্যবস্থা। স্পষ্টতই তারা বাংলাদেশে ভালো জীবন যাপন করে অভ্যস্ত। কিন্তু এ বিপর্যয় তাঁদের এতটুকু দমাতে পারেনি।