বাংলাদেশ শরণার্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে সিনেটর কেনেডিকে প্রদত্ত স্মারকপত্র

Posted on Posted in 4

<৪,২২৮,৫০৩-৫০৪>

অনুবাদকঃ শিরোনামহীন-১                                                 

শিরোনামসূত্রতারিখ
২২৮। বাংলাদেশ শরণার্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে সিনেটর কেনেডিকে প্রদত্ত স্মারকপত্র

 

বাংলাদেশ শরণার্থী বুদ্ধিজীবী১০ আগস্ট, ১৯৭১

বাংলাদেশ শরণার্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে

জনাব এডওয়ার্ড এম কেনেডিকে একটি স্মারকপত্র

জনাব,

বাংলাদেশের দূর্যোগে নৈতিক সমর্থন ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের জন্য আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমরা আপনার নিজস্ব উদ্বেগ ও পাকিস্তানকে অস্ত্র ও সামরিক সাহায্য প্রদানের বিরোধিতা এবং বাংলাদেশের প্রতি সমর্থনের প্রশংসা করি। ভারতে আশ্রয় নেয়া সত্তর লক্ষাধিক হতভাগ্য শরণার্থীকে ত্রাণ প্রদানের লক্ষ্যে আপনার অবদানকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্বীকার করি।

সন্দেহের অবকাশ নেই যে, ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে ৮ম বৃহত্তম সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘটনা সম্পর্কে আপনি অবহিত।

জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান ছিল একটি বিরল রাষ্ট্র, আধুনিক ইতিহাসে যা অনন্য – হাজার হাজার মাইল বিস্তৃত একটি ভিন্ন অঞ্চল দ্বারা পৃথক ছিল এর দু’টি অংশ, যা কেবলমাত্র একইরকম ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে একজোট হয়েছিল। ১৯৪০ সালের পাকিস্তান ইশতেহারে অবিভক্ত ভারত যাকে উপমহাদেশের দু’টি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার “সার্বভৌম রাষ্ট্র” ধরা হয়, সেখানকার মুসলিমদের আশা-আখাংক্ষার কথা বলা আছে।  

 

একটি একক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে তাদের আন্তরিক ইচ্ছে ও উৎসাহে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিজেদের অধিকারকে ইশতেহারে বলা কথা অনুযায়ী সার্বভৌমতা ধরে নিয়ে একক পাকিস্তানের কাঠামো মেনে নিয়ে সমর্পণ করে। স্বপ্নটিকে সত্যি করে তোলার চেষ্টা তারা করেছিল, কিন্তু অগণত্রান্ত্রিক রণকৌশলের কারণে তারা ব্যর্থ হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের সুনামের সুবিধা নিয়ে তারা এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করে, যেখানে বাঙালিদের অবস্থান ছিল গৌণ। গত ২৩ বছর ধরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কারণে যে দুর্দশা, ভোগান্তি আর শোষণ বাংলাদেশের মানুষ সহ্য করতে করতে অবশেষে তারা বুঝতে পেরেছে যে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে তারা বেঁচে থাকতে পারবে না যতদিন না ১৯৪০ সালের পাকিস্তান ইশতেহারে বর্ণিত এলাকাসমূহের স্বায়ত্বশাসন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রণীত আওয়ামিলীগের ছয়দফা কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক শোষণ বন্ধ করা। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে এই কর্মসূচির প্রতি বাংলাদেশের জনগণের যে বিপুল পরিমাণ সমর্থন পাওয়া গিয়েছে, তা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকচক্রকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়ে দিতে তাদের শেষ মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু সামরিক শাসকেরা বাংলাদেশের ওপর তাদের ঔপনিবেশিক শোষণও ত্যাগ করতে চায়নি আবার গণতন্ত্রকেও তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে তারা তৈরি ছিল না। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের দুঃখজনক ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, যেকোন উপায়েই সামরিক শাসকগণ তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। কাজেই বাংলাদেশের মানুষদের কাছে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়াটাই ছিল তখন একমাত্র উপায়।      

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এই বর্বরতা থেকে এটা স্পষ্ট যে, এক জাতি ও এক দেশের ধারণা ইয়াহিয়া খান ও তার সহযোগীরা কখনই মন থেকে গ্রহণ করেনি, কারণ কোন সেনাবাহিনীই এটা সমর্থন করে না যদি না তারা অন্য কোন দেশকে দমিয়ে রেখে ত্রাস সৃষ্টি করতে চায়।

আমরা আপনাদের কাছে এবং আপনাদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে অনুরোধ করছি যেন নিম্নে উল্লেখিত ব্যবস্থাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করা হয় –

১। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া।

২। শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে ইসলামাবাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

৩। বাংলাদেশকে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র আদায়ে সবরকমের সম্ভাব্য সহযোগিতা প্রদান।

৪। পাকিস্তানকে পাইপলাইন সাহায্যসহ যেকোন ধরণের সাহায্য প্রদান বন্ধ করা।

৫। পাকিস্তানের সাথে সমস্ত বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা।

৬। ইয়াহিয়াকে তার গণহত্যা বন্ধ করতে বাধ্য করা।

৭। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা ও নারীপাচার খতিয়ে দেখতে ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বিচারকদের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক কমিশন স্থাপন করা।

বনগাঁ

১০ আগস্ট, ১৯৭১

একান্ত অনুগত

পশ্চিম বাংলায় অবস্থানকারী

বাংলাদেশি শরণার্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে