বাংলা বর্ণমালা ও বানান সংস্কার প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বক্তব্য

Posted on Posted in 2

<2.65.372-374>

শিরোনামসূত্রতারিখ
বাংলা বর্ণমালা ও বানান সংস্কার প্রসংগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বক্তব্যদৈনিক পাকিস্তান১৩ আগষ্ট, ১৯৬৮

 

বাংলা বর্ণমালা ও বানান সংস্কার প্রসঙ্গ-

বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্যঃ

বাংলা বর্ণমালা সংস্কার সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যাল্যের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল বলা হয় যে, বাংলা বানানের ক্ষেত্রে যে ক্রমবর্ধমান বিশৃংখলা দেখা দিচ্ছে তার অবসান এবং উচ্চশিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ব্যাখ্যা হিসেবে বাংলার উন্নয়নকে সুগম করার জন্যে এই সংস্কার অনুমোদন করা হয়েছে। বানান-বিশৃংখলা অব্যাহতভাবে এগিয়ে গেলে তা ভাষাকেও দুর্বল করে ফেলবে। বাংলা ভাষার উন্নয়নকে ব্যাহত করা এই সংস্কারের উদ্দেশ্য বলে কোন ইঙ্গিত প্রদান করা হলে একাডেমিক কাউন্সিলের মহৎ উদ্দেশ্য ভুল করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানান ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নিজেই এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কমিটির সব বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। কমিটির রিপোর্টে যেসব সুপারিশ স্থান লাভ করেছে সেসব সুপারিশ গ্রহণের ব্যাপারে কমিটির বৈঠক সমূহে তিনি জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার দরুন রিপোর্টে ডঃ শহীদুল্লাহ স্বাক্ষর দিতে পারেন নি, এই সত্যকে বিকৃত করা চলে না। কর্তৃপক্ষ জানান যে, অনুমোদিত সংস্কারের বিস্তারিত প্রয়োগের ব্যাপারটি ঠিক করার উদ্দেশ্যে নয় সদস্যবিশিষ্ট আর একটি কমিটি গঠনের ব্যাপারেও একাডেমিক কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানান, একাডেমিক কাউন্সিলের উক্ত বৈঠকে ৫০ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র দুজন অনুমোদনের বিরোধিতা করেন। কমিটির তিনজন সদস্যের বিরোধিতামূলক বক্তব্যসহ রিপোর্টটি একডেমিক কাউন্সিলের ৩রা আগষ্টের বৈঠকের আগেই সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল-এর গত বৈঠক ডঃ মুঃ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির রিপোর্ট রদবদলের রায় গ্রহন করেন। বাংলা ভাষায় বানান, ব্যাকরণ ও বর্ণমালা সংস্কারও সহজকরনের উদ্দেশ্যে ১৯৬৭ সালের ২৮শে মার্চ এই কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য ছিলো শিক্ষার সর্বস্তরে যতশীঘ্র সম্ভব বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহন, অফিস আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার এবং শিক্ষা বিস্তারে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের জন্য প্রস্তুতির গতিকে দ্রুততর করা। কমিটি গঠনের ব্যাপারে ডঃ মুঃ শহীদুল্লাহ নিজেই প্রস্তাব দেন এবং একাডেমিক কাউন্সিল কমিটির চেয়ারম্যান ডঃ মুঃ শহীদুল্লাহ ছাড়া আরও ১০ জন সদস্য নিয়ে কমিটি গঠন করেন।

কমিটির এই সদস্যরা হলেন, (১) বাংলা একাডেমীর ডিরেক্টর ডঃ কাজী দীন মোহাম্মদ, (২) প্রাদেশিক জনশিক্ষা বিভাগের পরিচালক জনাব ফিরদৌস খান, (৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ জনাব আবদুল হাই, (৪) বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যক্ষ জনাব সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, (৫) ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ মোহাম্মদ ওসমান গনি, (৬) বাংলা কলেজের অধ্যক্ষ জনাব আবুল কাশেম, (৭) অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ, (৮) ডঃ এনামূল হক, (৯) জনাব মুনীর চৌধুরী (১০) চৌমুহনী কলেজের অধ্যক্ষ জনাব টি. হোসেন।

১৯৬৭ সালের ২৮শে মার্চ অনুষ্ঠিত একাডেমিক কাউন্সিলের এই বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবে কমিটিকে বলা হয় যে, কমিটি তাদের মত প্রণয়নের সময় বাংলা একাডেমী ও অনুরূপ সংস্থাসমূহ এক্ষেত্রে যে কাজ করেছেন তাকে বিবেচনা করার জন্য বলা হয়। গত ডিসেম্বরে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ডঃ মুঃ শহীদুল্লাহ কমিটির বৈঠকসমুহে সভাপতিত্ব করেন।

এ বছরের ২২শে মার্চ রেজিস্টার তিনজন সদস্যের বিরোধী মন্তব্যসহ কমিটির রিপোর্টটি পান।

বিরোধী সদস্যত্রয় হলেন, জনাম এম, আবদুল হাই, জনাব মুনীর চৌধুরী, ডঃ এনামুল হক। ৪ঠা মে রিপোর্টটি একাডেমিক কাউন্সিলে পেশ করা হয়। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে রিপোর্ট এবং বিরোধী বক্তব্যের কপি সব সদস্যকে সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অতঃপর ৩রা আগষ্ট একাডেমিক কাউন্সিল কিছু সংশোধন ও রদবদলের পর নীতিগতভাবে রিপোর্টটি গ্রহন করেন। এর বিস্তারিত প্রয়োগের ব্যাপারটি ঠিক করার জন্য অপর একটি কমিটি নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ফ্যাকাল্টি অব আর্টস এবং ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিনের ডীন পূর্ব পাকিস্তানের ডি,পি,আই, টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ জনাব ওসমান গনি, অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খা, জনাব নুরুল মোমেন এবং ডঃ কাজী দীন মোহাম্মদ এই কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন।

কাউন্সিল কমিটির রিপোর্টটি যেভাবে গ্রহন করেছেন তাতে বাংলা ভাষার উপর আক্রমনের কোন প্রশ্নই ওঠে না।

বানানের সুবিধার জন্য শুধু কয়েকটি অক্ষর বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অক্ষরগুলো হলো ঙ, ণ, ৎ, ষ, ঈ, ঐ, ঔ। এগুলো বাদ দিলে কোমলমতি বালক-বালিকাদের পাঠ গ্রহনে যে বিরাট সুবিধা লাভ করবে সেটাই কাউন্সিলের সামনে ছিল। বর্ণমালার ঐ সব বাড়তি অক্ষর শিক্ষার প্রসারে বাধা সৃষ্টি করেছে।

কাউন্সিল একটি বহুল প্রচলিত প্রয়োগ বাংলা একাডেমী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ডঃ শহীদুল্লাহ, অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খা এবং অন্যান্যদের সুপারিশ ও প্রস্তাবকে আইনসিদ্ধ করতে চেয়েছেন।

পরিতাপের বিষয়, দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি সহজ সরল উদ্যমের ভুল ব্যাখ্যা দান করা হয়েছে। অসুখের জন্য ডঃ মুঃ শহীদুল্লাহ এতে স্বাক্ষর দিতে পারেন নি। অথচ এক্ষেত্রে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে ডঃ মুঃ শহীদুল্লাহ নাকি এরূপ সংস্কারের বিরোধী।

আগেই বলা হয়েছে ডঃ মুঃ শহীদুল্লাহর কথা অনুযায়ী এই কমিটি নিয়োগ করা হয়। তিনি কমিটির বিভিন্ন সভায় রিপোর্টে উল্লিখিত মর্মে ডঃ মুঃ শহীদুল্লাহ সুপারিশ গ্রহণের জন্য জোর সংগ্রাম চালান। একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যগন দায়িত্বশীল শিক্ষাবিদ। তাঁরা বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন কলেজের প্রতিনিধিত্ব করছেন। শিক্ষার সাথে যুক্ত এবং আগ্রহী বিশিষ্ট ব্যক্তিগণই কাউন্সিলের সদস্য। একাডেমিক কাউন্সিলের যে সভায় রিপোর্টটি গৃহীত হয় তাতে উপস্থিত ৫০ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ২ জন সদস্য অধ্যাপক আবদুল হাই এবং আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যক্ষ এ,কে,এম কবির বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে এই যুক্তিতে রিপোর্টের বিরোধিতা করেন।

গোটা একাডেমিক কাউন্সিল বাংলা ভাষার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, এ অভিযোগ দ্বারা সদস্যদের দেশপ্রেম ও উদ্দেশ্যো সত্যতাকে কটাক্ষ করা হয়েছে।

………………………………………………………

অতীতে প্রশ্ন একটাই ছিল কোন পদ্ধতিতে এই সংস্কার করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তরফ থেকে কোন সুনির্দিষ্ট অভিমতের অভাবে বাংলা বানান ক্রমেই জটিল হয়ে পড়েছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই বাংলা বানানের সংস্কার সাধনের দাবীর কথা সবার জানা আছে।

এই জনদাবী পূরণের জন্য ১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কতিপয় সংস্কার সাধন করেন, যা প্রায় সবাই গ্রহন করেছেন। এসব সংস্কার ছিল অসম্পুর্ণ ও আংশিক।

একই ধ্বনির একাধিক অক্ষরের (স শ ষ অথবা জ য) উচ্চারণের দরুণ সমস্যা তার সমাধান হয়নি। অপ্রয়োজনীয় বাড়তি ও কদাচিৎ ব্যবহৃত প্রতীক অথবা বিশেষ চিহ্নবাহীযুক্ত স্বরধ্বনি (অউ এর স্থলে ৌ, কই এর স্থলে কৈ) সমস্যার সমাধান হয়নি।

আজও আগামীতে বাংলা ভাষা যে প্রদেশের প্রধান ভাষা সেই প্রদেশে উচ্চতর শিক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে সমাসীন একটি সংস্থা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বাস, বানান সংস্কারের পথ নির্দেশদানে তার ব্যর্থতা দায়িত্ব এড়ানোর শামিল হবে। বাংলা বানানের জটিলতা অব্যাহত রাখার অর্থ হবে বাংলা ভাষাকে দুর্বল রাখারই নামান্তর।

প্রস্তাবিত সংস্কারের পিছনে বাংলা ভাষার বিকাশ ব্যাহত করার মতলব আছে এরূপ ইঙ্গিত হবে মারাত্মক। এভাবে দেখলে কাউন্সিলের সামগ্রিক উদ্দেশ্যই ভুল বোঝা হবে।