বিজয় অভিযান

Posted on Posted in 10
বিজয় অভিযান

বিজয় অভিযানে মুক্তিযোদ্ধারা শুধূমাত্র নীরব দর্শকই ছিল না। তাদের একটা নির্দিষ্ট ও উদ্দেশ্যমূলক তৎপরতা অবলম্বন করতে হয়েছিল। এই তৎপরতা নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এরপর টাকি থেকে একশো পঞ্চাশ মাইল দূরে কৃষ্ণনগরে চার্লি সেক্টরে একটা কনফারেন্সে যোগদান করার জন্য আমাকে ডাকা হয়। চার্লি সেক্টর এই সময় ব্যারাকপুর থেকে কৃষ্ণ নগরে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। ব্রিগেডিয়ার এন,এ, সাকিলও ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। ভারত জরুরী অবস্থা ঘোষনা করলে কিভাবে আমাকে সামনে অগ্রসর হতে হবে, এ ব্যাপারে তিনি মোটামুটি একটা ধারনা দিলেন। মিত্রবাহিনীর পরিকল্পনার কথা গোপন রেখে সাতক্ষীরা- দৌলতপুর রোডে এবং আরও দক্ষিণে আমার লোকজন নিয়ে যে কোন সময় অগ্রসর হবার জন্য তিনি আমাকে প্রস্তুত ও সতর্ক থাকতে বললেন। পরিকল্পনার কথা আমাকে না জানালেও আমি অনুমান করলাম যে, সাতক্ষীরার বাঁ দিক থেকে একটা সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে সাতক্ষীরা- দৌলতপুর বরাবর শত্রু ঘাঁটিগুলো নিশ্চিহ্ন করার জন্য যশোরের উত্তর দিক থেকে প্রধান আক্রমণ পরিচালনা করা হবে। তাছাড়া, আমরা মুক্তিযোদ্ধারা পাক-বাহিনী ও মিত্রবাহিনীর গোলাবর্ষণের মাঝখানে পড়ে যাতে বিপর্যস্ত না হয়, সেই জন্য মিত্র বাহিনীর আগে আমার সৈন্য বাহিনী পাঠাতে বারন করা হলো। আমাকে জানানো হলো যে, মিত্রবাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর মুক্তিবাহিনীর উদ্দেশ্য হবে এইরুপঃ প্রথমত, সময়মত মিত্রবাহিনীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য লোকজন দেয়া। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর মিত্রবাহিনী কোন প্রশাসনিক অসুবিধার সম্মুখীন হলে তা দূর করার জন্য তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। তৃতীয়ত, ঘনিষ্ঠ ভাবে মিত্রবাহিনীকে অনুসরণ করা এবং তাদের সংস্পর্শে থাকা। আমাকে বলা হলো যে, যেহেতু ‘বাংলা অঞ্চল’ (বেঙ্গল এরিয়া-ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঘাঁটি) আমার নিকটবর্তী, সেই জন্য আমার সেক্টর এখন থেকে বাংলা অঞ্চলের প্রশাসনিক আওতাধীনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাছাড়া দক্ষিন সুন্দরবন এলাকার সম্পুর্ন জলপথ বাংলা অঞ্চলের অধীনে এনে, এর দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় জেনারেল পি,কে, রায় চৌধুরীর উপর।

সেক্টরে ফিরে আমি আমার নিজস্ব পরিকল্পনা তৈরী করলাম। আবার দুই হাজার গেরিলা সৈন্য ছিল। কিন্তু অস্ত্রশস্ত্র খুবই অপ্রতুল। তবুও আমি মনে করলাম যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা সৈন্য ছিল। কিন্তু অস্ত্রশস্ত্র খুবই অপ্রতুল। তবুও আমি মনে করলাম যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলাদের উপস্থিতিই অনেকটা প্রভাব বিস্তার করবে। কেননা, বিজয় অভিযানের সময় সম্ভাব্য রাহাজানি, ধর্ষন ও অন্যান্য অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটতে পারে সেদিকে আমার লোকজন সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পারবে। কাজেই, পরপর দুরাত্রিতে আঠারোশো গেরিলা সৈনযকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠিয়ে দেয়া হলো। বাদবাকী গেরিলাদের বিজয় অভিযানের সময় অগ্রসর হওয়ার জন্য অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত করে রাখা হলো। সদর দপ্তরে ও আমার সেক্টরের অন্যান্য জায়গায় আমার নিয়ন্ত্রাধীনে যেসব সৈন্য মোতায়েন ছিল, তাদের সদা সতর্ক থাকতে বলেছিলাম। আমার সেক্টর সদর দপ্তরের বিস্তৃতি অনেক দূর পর্যন্ত। অল্প সময়ের নোটিশে এটা গুটিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমি ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হককে বুঝিয়ে বললাম যে, যে সমস্ত আর্মিরা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে হাজির হতে পারবে না, তারা যেন দেশ মুক্ত হওয়ার পরই খুলনায় আমার সাথে মিলিত হয়। হিসাবপত্র ঠিক রাখা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যত্ন নেয়ার জন্যও সার্জেন্ট ফজলুল হককে নির্দেশ দিলাম। কেননা, আমরা চলে গেলে যেসব মুক্তিযোদ্ধা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অন্যান্য যুবক এখানে হাজির হবে তারা নিতান্ত অসুবিধায় পড়বে। সৌভাগ্যক্রমে দবিতীয়বারের মত লেঃ জিয়া এসে গেল। সুন্দরবন এলাকায় সে পাকিস্তানী গানবোটের সামনে শত্রুপক্ষের সাথে প্রচন্ড যুদ্ধ করে তার অঞ্চলকে সম্পুর্নরূপে মুক্ত করেছে হানাদাররা নদী বরাবর তাদের ঘাঁটিগুলো ছেড়ে দিয়ে খুলনার দিকে হেঁটে গিয়ে জড়ো হয়েছে। আমি স্থির করলাম যেসব গেরিলা খুলনার সীমান্ত বরাবর শত্রু হননে লিপ্ত, তাদেরকে খুলনা শহরের চারিদিকে সমাবেশ করে হানাদারদের পিছু হটার রাস্তা সম্পুর্নরূপে বন্ধ করে দেব। মিত্র-বাহিনীর সার্বিক পরিকল্পনা মনে রেখে মাসের ১৫ তারিখে সাব- এরিয়া কমান্ডারদের নিয়ে আমাদের দপ্তরে একটা সম্মেলনে মিলিত হয়ে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলাম। খুলনা শহরের নিকট রূপসা নদীর পশ্চিম তীরে। আক্রমণ ব্যুহ তৈরী করার জন্য লেঃ জিয়াকে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে ঘাঁটি গুটিয়ে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ দিলাম। বাগেরহাটে সুবেদার তাজুল ইসলামের অধীনে যে সমস্ত সৈন্য ছিল তাদেরও লেঃ জিয়ার নিয়ন্ত্রণে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিলাম। শত্রুপক্ষ যাতে নৌ-পথ ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য জনৈক মিঃ নোমানউল্লাহকে তেরখাদা ও মোল্লারহাটে যে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিল, তাঁদের সাথে সমন্বয় স্থাপন করে খুলনার উত্ত্র-পূর্ব দিক থেকে এসে এক জায়গায় জড়ো হয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সতর্ক থাকতে বললাম। আরও যেন পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় সর্বদা প্রস্তুত থাকে। খুলনার দক্ষিনে পাইকগাছা, তালা ও আশাশুনি অঞ্চলে সেকেন্ড লেঃ আরেফিন গেরিলাদের হিসাবে কর্মরত ছিল। তাকে বললাম, সে যেন গেরিলাদের সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে খুলনা শহরের কাছাকাছি কোথাও প্রস্তুত হয়ে থাকে।

ক্যাপ্টেন হুদার অধীনে দুই ব্যাটালিয়নের বেশী যোদ্ধা ছিল। তাকেও সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলাম। বসন্তপুরে শত্রুপক্ষের অবস্থান খুবই সুদৃঢ়। বসন্তপুর আমাদের খুবই নিকটে। একান থেকে হানাদারদের বিতাড়িত করে গুরুত্বপূর্ন সাতক্ষীরা- দৌলতপুর সড়কে শত্রু মুক্ত করে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য ক্যাপ্টেন হুদাকে দায়িত্ব দিলাম। খুলনা শহরের চারিদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের জড়ো করে রাখার প্রধান উদ্দেশ্য হলো,  দখলদার আমলে বিহারীরা বাঙ্গালী মুসলমানদের উপর যে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিল তারই প্রতিহিংসা নিতে গিয়ে অনিবার্য পরিনতি স্বরূপ বযাপক হারে বিহারী নিধন আরম্ভ হবে এবং সারাদেশ জুড়ে নেমে আসবে বিশৃংখলা। এই আশংকা করেই উপরোক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। উল্লেখিত পরিকল্পনা ছাড়াও আমি দুটো দলকে প্রস্তুত করে বেগের নেতৃত্বাধীনে বরিশালের দিকে নৌকায় পাঠিয়ে দিলাম। প্রথম দলটি ক্যাপ্টেন ওমরের সাথে সংযোগ স্থাপন করে বরিশালের উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবেলা করবে আর দ্বিতীয় দলটিকে সেকেন্ড লেঃ মুয়িনের নেতৃত্বে পটুয়াখালী পৌছানো হলো। কথা প্রসঙ্গে বলতে হয় সেকেন্ড লেঃ মুয়িন মিত্র বাহিনীর অধিনে বিহার প্রবেশের ‘মুর্তিহতে বাংলাদেশের ক্রাশ ট্রেনিং কোর্স সমাপ্ত করে আরও চারজন তরুণ অফিসার সহ প্রথম দলে অক্টোবর মাসে আমার কাছে আসে। তারা তিনমাসের ক্রাশ ট্রেনিং প্রোগ্রাম অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ করে। এই তিনজন অফিসার হলো- সেকেন্ড লেঃ মোহাম্মদ অলি, আহসানউল্লাহ এবং শচীন্দ্র। তাঁদের সবাইকে ক্যাপ্টেন হুদার বাহিনীতে কাজ করার জন্য দেয়া হলো। বয়সে সবাই নবীন, কর্মক্ষম ও কষ্টসহিষ্ণু। যাহোক, নির্দেশ মোতাবেক লেঃ জিয়া, নোমান ও আরেফিন স্বস্ব গন্তব্যস্থলের দিকে রওনা হয়ে গেল। বসন্তপুরের  উপর যে কোন সময় আঘাত হানার জন্য ক্যাপ্টেন হুদা প্রস্তুত হয়ে রইল। এই সময়ে লেঃ জিয়াকে একটা বেতার যন্ত্র যোগাড় করে দিলাম। ওদের সবাইকে পাঠিয়ে দিয়ে মনের গভীরে একটা প্রশ্ন উকি দিলে নিজেই বিস্মিত হলাম- এইবার কি সত্যিই আমরা খুলনা যাচ্ছি?

ওদের যে সমস্ত আদেশ দেয়েছিলাম তা আমার কানে অবিশ্বাস্য রকমের প্রতিধ্বনি হতে লাগলো। স্বপ্নাবিষ্টের মত মনে হলো, ওগুলো যেন আমাকেই উল্টো পরিহাস করছে। কেননা, দালালও হানাদার পরিবেষ্টিত খুলনার মত বিপজ্জনক শহরে এত শীগগীর প্রবেশ করতে পারবো- একথা কল্পনাও করতে পারিনি। যদিও স্থানীয় প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও কমপক্ষে পাঁচ হাজার গেরিলা খুলনা শহরকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল, তবুও হানাদারদের প্রকৃত শক্তি সম্পর্কে আমরা ছিলাম সন্দিহান।

সমস্ত শঙ্কা, সমস্ত ভয় উবে গেল। চরম লগ্নটি সমাগত। পবিত্র ঈদের দিন সকালবেলা, ১৯৭১ সালের ২০শে নভেম্বর- ক্রিং ক্রিং করে টেলিফোনে কয়েকবার শব্দ হতেই রিসিভারটা কানের কাছে নিলামঃ অত্যন্ত সুখবর। প্রশংসনীয় তৎপরতা। অবস্থান মজবুত করে টিকিয়ে রাখো। কুত্তাগুলোকে পিছু পিছু ধাওয়া করো।‘

আনন্দ- উত্তেজনায় এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে ফেললাম। ক্যাপ্টেন হুদা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বসন্তপুর, কালীগঞ্জ ও নাজিমগঞ্জে শত্রুর অবস্থানের উপর চরম আঘাত হেনে এই ঘাঁটিগুলো আমাদের কব্জায় এনেছে। কি ভয়ংকর উত্তেজনা। ক্যাপ্টেন হুদা কথা বলতে পারছিলনা। তার বাক রুদ্ধ হয়ে এলো। উত্তেজনা ও চাঞ্চল্যের অফুরন্ত আনন্দে আমরা সবাই বিস্ময়াভিভূত, হতবাক। হুদা ও তার সাথের মুক্তিসেনাদের প্রাণঢালা অভিনন্দন জানালাম। বললাম যে। শত্রুর উপর আঘাতের ক্ষিপ্রতা ও তার গতিবেগ যেন পুরোপুরি রক্ষা করা হয়। আনন্দ ও উত্তেজনায় এতটা আত্মহারা যে কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। এই পবিত্র দিনটিতে বহু প্রতীক্ষিত বিজয় অভিযান শুরু হলো। স্কল শিক্ষক মিঃ শাহাজানকে পারুলিয়া রোডের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলাম। কেননা বসন্তপুর ও কালীগঞ্জ ঘাঁটি থেকে শত্রুবাহিনীকে এই পথ দিয়েই পালাতে হবে এবং এটাই একমাত্র পাকা রাস্তা। একই সংগে মিঃ চৌধুরীর নেতৃত্বে ষাটজন মুক্তিযোদ্ধার একটি দলকে পারুলিয়া ব্রীজটি অক্ষত অবস্থায় অধিকার করার জন্য পাঠিয়ে দিলাম। মিঃ চৌধুরী পাকিস্তান নৌবাহিনীর একজন অভিজ্ঞ নাবিক। বেশ হাসিখূশী। কঠোর প্রকৃতির এই মানুষটি আমার পরিকল্পনায় খূশী হয়ে যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিলো।

প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়ার পর আমি মোস্তফাকে নিয়ে স্থানটা স্বচক্ষে দেখার জন্য বসন্তপুরের দিকে রওনা হলাম। দীর্ঘ ন’মাস যাবত ইছামতির ওপার থেকে বসন্তপুর আমাদের কতবার ইশারায় আহবান জানিয়েছে। এক ঘণ্টা পরে হিংগলগঞ্জে পৌঁছে দু’জন ষ্পীডবোটে নদী পার হয়ে তীরে নামলাম। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার আজ কোন মেশিনগান গর্জে উঠলো না। আগে অবশ্যই কোন অতিথির পদার্পন মাত্র মেশিনগানগুলো মুহুর্তে এক ঝলক আগুন ছূড়ে গর্জে উঠতো।

রক্তলাল সূর্যটাকে বুকে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা যখন পত পত করে উড্ডীন দেখলাম, তখন কি যে উত্তেজনা! ওই সূর্যটাকে স্বাগত জানাতে কত না রক্ত ঢালতে হয়েছে এই ইছামতির তীরে। সমুন্নত পতাকার নিচে দু’ থেকে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা নীরবে দন্ডায়মান। শত্রুর কোন চিহ্ন নেই। বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র। গোলাবারুদ, রেশন এবং চারিদিকে কুৎসিত ধ্বংসাবশেষ রেখে হানাদাররা পালিয়েছে।

স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়াবার জন্য আত্মহুতি দিতে হয়েছিল অনেক মুক্তিপাগল তরুণকে। ওদের মহান আত্মত্যাগের জন্যই আজ স্বাধীন বাংলার পতাকা সমুন্নত শিরে উড্ডীন রয়েছে। পরিত্যক্ত অস্ত্রশস্ত্র দেখে আজ আর আমি উত্তেজিত হই না। আগে মাত্র একটা রাইফেল দেখে চঞ্চল হয়ে উঠতাম। এখন এটা আমার কাছে অস্বস্তিকর লাগলো।

বসন্তপুর অধিকার করে আনন্দ ও উত্তেজনার পরিবর্তে মন আমার বেদনাভরাক্রান্ত হয়ে উঠলো। নভেম্বরের শীতল বাতাসে উঁচু বাঁধটার উপর দাঁড়িয়ে মানুষের এই বীভৎস কংকাল গুলোর দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। কি মর্মান্তিক! ওরা রক্ত দিয়েছে, আমরা ও রক্ত দিয়েছি। সাক্ষী রয়েছে ওদের কংকালগুলো। সবাধীন্তা-পাগল আমার মুক্তিযোদ্ধাদের কংকালও ছড়িয়ে- ছিটিয়ে আছে এখানে-ওখানে।

এই মিশ্র অনুভূতি সম্বল করে কালীগঞ্জ ও নাজিমগঞ্জ পরিদর্শন করলাম। এই জায়গাগুলো কিছু ভাল বলে মনে হলো। কিছুটা প্রানের স্পন্দন এখনও যেন বেঁচে আছে।

এখানে কিছু লোকজন দেখলাম। অনেক বাড়িঘর ধবংস্তুপের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আবার অনেকগুলো নারকীয় অগ্ন্যতসবের বিকলাঙ্গ চেহারা নিয়ে বীভৎসতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এত দুঃখের মাঝেও যে ক’জন লোক আমরা এখানে পেয়েছিলাম, তারা আমাদের স্বাগত জানাতে কার্পন্য করলো না। স্থানীয় লোকজন বললো, গত রাত থেকেই হানাদাররা সাততাড়াতাড়িতে পালাতে শুরু করেছিল পলায়নপর হানাদারদের স্থানীয় লোকজন যখন জিজ্ঞেস করেছে’ আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? তখন ওরা কম্পিত স্বরে জবাব দিয়েছিল, মুক্তিরা আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে, ওপরওয়ালাদের হুকুমমত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছি’। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে হানাদাররা যে ভাবে পালিয়ে গিয়েছিল, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে স্থানীয় লোকজন হাসিতে ফেটে পড়লো। অনেক দামী ও লোভনীয় জিনিস রেখে যাওয়া ছাড়াও হানাদাররা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নদীতে ফেলে দেয়।

ক্যাপ্টেন হুদা রাতে বসন্তপুরের উপর আক্রমণ চালায়। জবাবে সারা রাত ধরে হানাদাররাও প্রচন্ড গোলাবর্ষণ করে। আর এই গোলাবর্ষণের আড়ালে রাতের আধাঁরে গা-ঢাকা দিয়ে শত্রুরা পালিয়ে যায়। ভোরে অবস্থা অত্যন্ত শান্ত ভাব ধারন করায় হুদা, মুক্তিযোদ্ধার একটি ছোট দলকে গ্রামের অভ্যন্তরে পাঠিয়ে, যারা আমাদের গোপনে সংবাদ সরবরাহ করতো, তাঁদের কাছ থেকে প্রথম জানতে পারলো যে, হানাদাররা পালিয়ে গেছে।

সংবাদ পেয়ে হুদা এক কোম্পানী সৈন্য নিয়ে কালীগঞ্জ- সাতক্ষীরা রাস্তা ধরে একরকম দৌঁড়ে বসন্তপুরের দিকে অগ্রসর হতে লাগলো। একটা ভাঙ্গা জীপ ছাড়া তার সাথে আর কোন যানবাহন ছিল না। জীপটা কিছুদিন আগে হানাদারদের কাছ থেকে অধিকার করা হয়। হানাদাররা তখনও পালাচ্ছিল। প্রশংসনীয় উদ্যম ও মনোবল নিয়ে ক্যাপ্টেন হুদা দীর্ঘ বারো মাইল পথ হেঁটে তার বাহিনীসহ মিঃ শাজাহানের লোকদের কাছে পৌঁছে হানাদারদের সম্মুখ থেকে আঘাত হানলো, তখন ওরা দিশেহারা হয়ে পারুলিয়ার দিকে পালাতে শুরু করে। ওদিকে মিঃ শাজাহানের নেতৃত্বে টাকি থেকে যে সৈন্যদলটি এসেছিল, তারা পলায়নপর হানাদার বাহিনীর একটি দলকে মাঝপথে অবরোধ করে ফেললো। এদিকে হুদা জানতে পারলো যে, হানাদাররা পারুলিয়া সেতু উড়িয়ে দিয়ে ওপারে আত্মরক্ষা মূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। সেতুর চার মাইল দূরে অবস্থান নিয়ে ক্যাপ্টেন হুদা দ্রুত মিঃ চৌধুরী ও শাজাহানের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীকে তার লোক জনদের একত্র করে পুনর্বিন্যাস করলো।

ওই রাতেই আমি অগ্রবর্তী এলাকা পরিদর্শন করলাম। তখন পাক-হানাদার ও আমাদের মধ্যে প্রচন্ড গুলি বিনিময় হচ্ছিল। আমাদের বাঁ- দিকে মিঃ মাহাবুবের নেতৃত্বাধীন ৮ নং সেক্টরের সৈন্যদের নিয়োগ করা হয়েছিল। মিঃ মাহাবুব একজন পি-এস-সি অফিসার। কর্মদক্ষতার জন্য তাকে মেজর পদে উন্নীত করা হয়। তিনি সাহসী ও বুদ্ধিমান। আঘাতের পর আঘাত হেনে শত্রুপক্ষকে সর্বদা ব্যস্ত রাখতেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মিত্রবাহিনীর তরফ থেকে আমরা কোন সাহায্যকারী সৈন্য পাইনি।

৭২ নং সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সৈন্যরা আমাদের অধিকৃত জায়গাগুলো, যেমন বসন্তপুর ও কালীগঞ্জের উপরে তদারকী করতো। আর তাদের সাহায্য করতো পিছনে অবস্থানরত আমাদের মুক্তিবাহিনী। সুবেদার মেজর এ, জলিল ও লস্করের অধীনে মুক্তিবাহিনী এখানে কাজ করেছে। আমাদের সাথে মর্টার সজ্জিত মুক্তিবাহিনীর একটি দল ছিল। তারা শুধু হানাদারদের গোলাবর্ষনের জবাবে পাল্টা গুলি ছুড়তো। সুবেদার গফুর নামে একজন অভিজ্ঞ মর্টার শিক্ষক পাক-হানাদারদের গুলির জবাবে দক্ষতার সাথে পাল্টা গোলাবর্ষন করে প্রত্যেকবারই শত্রুদের প্রভুত ক্ষতি সাধন করতো। ভয়ানক ভাবে কোণঠাসা হয়ে হানাদারদের মেশিনগান গুলো সব সময় গর্জন করতে লাগলো। যেহেতু আমাদের অবস্থানের চতুর্দিকে হানাদারদের দৃষ্টির আওতায় সেজন্যে রাত্রে বা দিনের পাহারায় বেরুনোর খুবই কষ্টকর ছিল। কিছুক্ষনের জন্য যুদ্ধ দানবটা দম নিয়ে পুনর্বার আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নিতো।

 

২৩শে নভেম্বর পারুলিয়া থেকে চার মাইল দূরে আর একটা ব্রীজের পেছনে হানাদাররা সরে গেল। সরে যাবার আগে ওরাই এবার নৃশংসতার স্বাক্ষর রেখে গেল। এদিকে আমাদের সৈন্যরা সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলো। স্পষ্ট বোঝা গেল যে হানাদাররা প্রথমে সাতক্ষীরায় ও পরে খুলনার দিকে পালাবার জন্য যুদ্ধে দীর্ঘসূত্রতার কৌশল অবলম্বন করেছে। এই ব্রীজের কাছে এসে ঊভয় পক্ষই মাঝে-মধ্যে মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ার করে গুলি বিনিময় করতো। এখানে মূর্তজা নামে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে হারাতে হয়। সে অত্যন্ত সাহসী এবং অনেক যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিয়েছিল। মাথায় বুলেটের আঘাত লাগার পর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ওকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। কেননা, বুলেটের আঘাতে ওর মগজ বের হয়ে গিয়েছিল। যাহোক, আমরা সব সময় আত্মরক্ষা মূলক অবস্থান থেকে শত্রুর প্রতিটি গতিবিধির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতাম।

 

হানাদাররা যে সমস্ত জায়গা ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তার খবরটা কোলকাতার জনগনের কাছে খুব দ্রুত পৌঁছে গেল। মুক্তাঞ্চল পরিদর্শন করার জন্য সাংবাদিক, টিভি ক্যামরাম্যান এবং আরও অনেক সম্মানিত ব্যাক্তি আসতে লাগলেন। ইছামতীর পশ্চিম তীর লোকে লোকারণ্য, মনে হলো কোন জনাকীর্ণ মেলা। পরিদর্শনকারী দু’একটি দলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনারা এখানে ঘোরাঘুরি করছেন কেন? উত্তর এলো, মুক্তির আনন্দ, মেজর সাহেব- মুক্তির আনন্দ’।

 

মুক্তির আনন্দই যেন বৈধ পাসপোর্ট। শিগগিরই মুক্ত-অঞ্চল লোকের আগমনে সরগরম হয়ে উঠলো। কোলকাতা থেকে শরণার্থীরা দলে দলে তাদের পরিত্যক্ত বাড়িঘরে ফিরে আসতে লাগলো। আবার নতুন করে ঘর বাধাঁর প্রবল ইচ্ছা।

 

এবার সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী সাহেব মুক্তাঞ্চল সফর করতে এলেন। তাঁকে আমি রণাঙ্গনের অগ্রবর্তী এলাকায় নিয়ে গেলাম। কতকগুলো অসুবিধার জন্য সাতক্ষীরা থেকে আট মাইল দূরে আমাদের থামতে হয়েছিল। কি করে এই অসুবিধাগুলো দূর করা যায়, তাঁকে বুঝিয়ে বললাম। আমার পরিকল্পনা ছিল, সাতক্ষীরার পিছনে দু’দিক থেকে সৈন্য পাঠিয়ে হানাদারদের পালানোর পথ বন্ধ করে দেয়া এবং যাতে নতুন সৈন্য আমদানী করে শক্তি বৃদ্ধিকরতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। দু’টো প্রধান রাস্তা দিয়ে সাতক্ষীরার সাথে চলাচল ব্যবস্থার সংযোগ সাধন করা হতো। একটা হলো, যশোর থেকে কদমতলা হয়ে- অপরটা হলো কালিগঞ্জ থেকে যে পথ ধরে আমরা অগ্রসর হচ্ছিলাম, সেই পথ। এ রাস্তাটা সাতক্ষীরার ভেতর দিয়ে দৌলতপুর-খুলনা পৌঁছেছে। স্থির করলাম, প্রত্যেকটি রাস্তায় বাধা সৃষ্টি করবো।

 

২৯শে নভেম্বর, হাবিলদার আফজালের নেতৃত্বে দু’শো মুক্তিযোদ্ধার একটি দল সাতক্ষীরার প্তহে পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু যেভাবে তাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম সেইমত কাজ করতে ব্যর্থ হলো। তারপর লেঃ আহসানউল্লাহর নেতৃত্বে দু’শো মুক্তিযোদ্ধার একটি দলকে ওই একই পথে পাঠানো হলো। আহসানউল্লাহ অত্যন্ত সাহসী যুবক। তার যোগ্যতা ও সামর্থ্য সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত ছিলাম ছিলাম। এগিয়ে যাবার প্রচন্ড শক্তি তার মধ্যে। ডানদিক থেকে একশো মুক্তিযোদ্ধার আর একটি দলকে মিঃ শাজাহানের নেতৃত্বে সাতক্ষীরা-দৌলতপুর রাস্তায় ওঁত পেতে শত্রুকে আঘাত করার জন্য পাঠিয়ে দিলাম। ক্যাপ্টেন হুদাকে বললাম যে, রাতের বেলায় আক্রমণাত্মক পাহারা দিয়ে শত্রুদের উপর চাপ সৃষ্টি করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাতক্ষীরা অধিকার এবং সৈন্যদের দ্রুত পুনর্গঠিত করে পলায়নের পর শত্রুদের পিছু ধাওয়া করতে হবে।

 

ইতিমধ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বৃহদাংশ নদীর ওপার থেকে দেবহাটায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এখানে ভুতপুর্ব সি-এস-পি অফিসার মিঃ আতাউর রহমানের তত্ত্বাবধানে পাঁচশো তরুণ যুবক নিয়ে একটা ট্রেনিং ক্যাম্প খুলে দিলাম। মিঃ আতাউর রহমান যুবক, কর্তব্যপরায়ন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি সর্বান্তকরনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধে তার দান অপরিসীম। শীগগীরই ক্যাম্পের কার্যকলাপ সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র প্রযোজকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। সব মতাদর্শের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ক্যাম্প পরিদর্শনে আসতে লাগলেন। অনেক গণ্যমান্য লোকজন সাথে নিয়ে ও পুনর্বাসন মন্ত্রী মেঃ কামরুজ্জামান এই ক্যাম্প পরিদর্শন করে অত্যন্ত খুশী হলেন। ছেলেরা ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি তুলে মন্ত্রী মহোদয়কে স্বাগত জানালে তিনি অভিভূত হয়ে পড়লেন। কিন্তু এই সৌজন্যমুলক পরিদর্শনে আমি খুশী হতে পারিনি। কেননা, সামনে এখনও অনেক দুস্তর পথ আমাদের অতিক্রম করতে হবে। ২রা ডিসেম্বর পর্যন্ত লেঃ আহসানউল্লাহর কাছ থেকে কোন ফলপ্রসু খবর পাইনি। রাস্তায় ট্যাংক বিধ্বংসী মাইন পুঁতে শত্রুদের একটি জীপ সে উড়িয়ে দিয়েছিল। রাস্তার ধার দিয়ে একটা সুদৃঢ় ব্যাংকার তৈরী করে শত্রুপক্ষ অবস্থান নেয়ায় আহসানউল্লাহ ওদের কাছে ঘেঁষতে পারেনি। শত্রুদের অবস্থান থেকে দু’দিকে প্রায় দু’শো গজ পর্যন্ত উম্মুক্ত ধান ক্ষেতও জলাশয়। সবকিছুই ভালভাবে দৃষ্টিগোচর হতো না। ডান দিকে মিঃ শাজাহানের বেলায় ঠিক একই অসুবিধা। তাছাড়াও, রাজাকারদের কাছ থেকে তাকে তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

 

অবস্থার কোন উন্নতী হলো না। যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেল। শত্রুদের পরিকল্পনা ছিল রাজাকার দ্বারা প্রতিরোধ তৈরী করে রাতের অন্ধকারে আস্তে আস্তে সরে পড়া। সাতক্ষীরা ও তার পার্শবর্তী এলাকার প্রায় শতকরা পচাঁশি জন লোক সামরিক চক্রের দালাল হিসাবে হানাদারদের সক্রিয় মদদ যুগিয়েছে। তার ফলে সবকিছুই মন্থর গতিতে চলতে থাকে। কিন্তু ইতিহাসের ক্রমবিকাশ ও চিরন্তন গতিকে কে রুখতে পারে? পুর্ব রণাঙ্গনেই শুধু পাকিস্তানী জেনারেলরা বিভ্রান্ত ও দিশেহারা হলো না, পশ্চিম রণাঙ্গনে ও রিতিমত হিমশিম খেয়ে উঠলো। ১৯৬৭ সালে ইস্রাইল যে রকম ব্লীসৎক্রীগ’ কায়দায় আরবদের উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ঠিক একই কায়দায় পাক-সামরিক জান্তা তাদের বিমান বাহিনীর মিরেজ ও মিগ নিয়ে ডিসেম্বর মাসের ৩ তারিখ রাত্রে ভারতের উপর হামলা চালায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীও খুব সতর্ক ছিলেন। তিনি ওই রাত্রেই জরুরী অবস্থা ঘোষনা করে পাক হামলার সমীচীন জবাব দিলেন। সুরায় বিভোর জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান মনে করেছিল রাজনীতি সচেতন বাঙ্গালীকে চিরদিনের জন্য দাবিয়ে রাখতে পারবে এবং এই হীন উদ্দেশ্যই সে ভারত আক্রমণ করে সমস্যাটার উপর আন্তর্জাতিক রং চাপিয়ে ভারতের সাথে একটা রাজনৈতিক মিমাংসায় আসতে চেয়েছিল। কিন্তু সে চরম ভাবে ব্যর্থ হলো।

 

৬ই ডিসেম্বর। বেলা ১১ টার সময় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ মারফত ঘোষনা করা হলো যে, ভারত বাংলাদেশকে সর্বভৌম রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। দীর্ঘ ন’মাস যাবত সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী অধীর আগ্রহে দিনটির জন্য প্রতিক্ষায় ছিল। সংবাদটা শুনে মন থেকে চিন্তা ও উত্তেজনা দূরীভূত হলো। হটাত স্বীকৃতির এই ঘোষনা শুনে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর এই বিধ্বস্ত অন্তর গর্বে ফুলে উঠলো। স্বীকৃতি শুধু ফাইলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রইলনা বা বাতাসে মিলিয়ে গেল না। মিত্রবাহিনী মুক্তিবাহিনীর কাধে কাধ মিলিয়ে প্রথম তিন দিনেই যশোর ক্যান্টনমেন্ট অধিকার করে নিল। সুদৃঢ় অবস্থান ছেড়ে দিয়ে পাক হানাদাররা উর্ধবশ্বাসে পালাতে শুরু করলো। প্রত্যেকেই আশা করেছিল যে, পাক বাহিনী যশোরে আমাদের প্রচন্ড বাধা দেবে। কেননা, যশোর ক্যান্টনমেণ্ট দুর্ভেদ্য বলে মনে করা হতো। কিন্তু হানাদাররা তেমন কোন বাধা দিতে না পারায় মিত্রবাহিনী ও আমরা নিরাশ হয়ে পড়লাম। অথচ মিত্রবাহিনীর কমান্ডাররা প্রথমে, মনে করেছিল যে, পাকিস্তানীদের উৎখাত করতে কমপক্ষে ১৫ দিন সময় লাগবে।

 

অপর দিকে আমাদের মুক্তিবাহিনী ডিসেম্বর মাসের ৩ তারিখে সাতক্ষীরা দৌলতপুর রোড ধরে অগ্রসর হতে লাগলো।  সাতক্ষীরা অধিকার করে যে পরিমান অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানী তেল, রেশন ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস পত্র আমাদের হাতে এসেছিল তা দিয়ে পুরা একবছর যুদ্ধ করা যেতো। কিন্ত এই সময় অধিকৃত জিনিসপত্রের প্রতি আমাদের কোন মোহ ছিল না। আমাদের একমাত্র মোহ, একমাত্র উত্তেজনা সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া। পেছনে মুক্তিবাহিনীর উপর ওইসব পরিত্যক্ত জিনিসের হেফাজতের ভার দিয়ে ক্যাপ্টেন হুদা তার বাহিনীর লোকজন নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে অগ্রসর হতে লাগলো।

 

হানাদাররা পালাবার সময় প্রধান সেতুগুলো ধ্বংস করে দিয়েছিল। এর ফলে আমরা খুবই অসুবিধার সম্মুখীন হলাম। দু’একটা জীপ ছাড়া আমাদের কাছে কোন যানবাহন ছিল না। এই জীপ গুলো নানা উপায়ে পার করা হতো। মিঃ ফজলুল হক ও সুলতান উদ্দিন আহমেদ যথাক্রমে সদর দফতর ও গেরিলা ক্যাম্পের সামরিক দায়িত্বে নিযুক্ত ছিল। তাদের শেষ নির্দেশ দেওয়ার জন্য আমি ফিরে গেলাম।

 

চার্লি সেক্টর থেকে সর্বশেষ যে নির্দেশ পেলাম, তা হলো- অস্ত্রপাতি ছাড়া মুক্তিযূদ্ধাদের বিদায় দিতে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, বিভিন্ন যুবকেন্দ্রের ম্যানেজাররা এম সি এ’রা স্বাধীনতার উল্লাসে আত্মহারা হয়ে ছেলেদের ফেলে রেখে যে যার মত আগেই চলে যায়। আর ছেলেরা পড়ে মহাসংকটে। বাংলাদেশে ফিরে যাবার মত কোন সম্বলই ছিল না তাঁদের। তারা আমার হেডকোয়ার্টারের চারিদিকে এসে ভীড় করলো এবং অনুরোধ জানালো যে তাঁদের জন্য যেন কোন বন্দোবস্ত করে দেই। আমার এক বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করে ছেলেদের যাবার বন্দোবস্ত করার জন্য সুলতান ও হককে বলে দিলাম।

 

দিনটা ডিসেম্বরের ৯ তারিখ। সবকিছুই এলোমেলো। কারুর দৃষ্টি নেই। কাজকর্ম ফেলে রেখে সবাই বাংলাদেশের ভেতর চলে যেতে চায়। আমি তাঁদের মানসিক অবস্থা উপলব্দি করতে পারি। কিন্তু পিছনের কাজকর্ম গুছিয়ে দেয়ার জন্য কাউকে অন্ততঃ এখানে থাকতে হবে। পরিকল্পনা মোতাবেক বেগকে তার দলবলসহ গ্ণ-পরিষদ সদস্য মিঃ নূরুল ইসলাম মঞ্জুর সাথে বরিশালে পাঠিয়ে দিলাম।

 

টাকি ও হাসনাবাদের দিকে চেয়ে মনটা কেঁদে উঠলো। মনে হলো, ওরা আজ বড্ড শূন্য, বড্ড নিঃসঙ্গ। দীর্ঘ ন’মাস যাবত অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীর ভীড়ে কর্মচঞ্চল হাসনাবাদ ও টাকি আজ নীরব। যেন ফুঁপিয়ে কাঁদছে আমি ভয়ানক অন্ত জ্বালা অনুভব করলাম। শেষবারের মত ইছামতী ও আমার হেডকোয়ার্টারের দিকে অশ্রুসজল চোখ দুটো বুলিয়ে মোস্তফাকে আমার জীপে উঠতে বললাম। অন্যমনস্কভাবে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলাম, হক ও অন্যান্য সাথীদের দিকে। পরে খুলনায় এসে আমার সাথে যোগ দেয়ার জন্য ওদের নির্দেশ দিলাম এবং আমাদের অগ্রবর্তী বাহিনীর সাথে যোগ দেয়ার জন্য আমি এগিয়ে চললাম। পিছনে পড়ে রইল স্মৃতিবিজড়িত হাসনাবাদ, টাকি- চেনা-অচেনা মুখ ও হাসিকান্নার অনেক গল্প।

 

বিজয়ের আনন্দে আমার গাড়ী চাকাগুলো অসম্ভব দ্রুতবেগে ঘুরতে লাগলো। আমি দৌলতপুর থেকে ১০ মাইল দূরে একটি স্কুলের কাছে আমার লোকজনদের সঙ্গে মিলিত হলাম। এই জায়গাটার নাম শাহপুর। এখান থেকে একটি রাস্তা বের হয়ে যশোর-খুলনার বড় রাস্তার সাথে ফুলতলার কাছে এসে মিশেছে।

 

ডিসেম্বর ৯ তারিখের রাত। স্কুল থেকে অগ্রবর্তী এলাকায় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী মাত্র এক মাইল দূরে। শত্রুপক্ষের অবস্থানের হাজার গজের মধ্যে মিলে এক কোম্পানী সৈন্য মোতায়েন  করা হয়েছিল। ৯ তারিখ রাত্রেই আমি ওদের কাছে যেতে চাইলাম। কিন্তু ওদের কাছে, পৌছানো দুঃসাধ্য ছিল। কেননা, ওরা তখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সুতরাং স্থির করলাম, ১০ তারিখে ভোরে ওদের সাথে মিলিত হবো। রাতটা ভয়ানক রকমের অশান্ত। সারারাত ধরে দু’পক্ষের কামানগুলো অবিশ্রান্ত গর্জন করছিল। স্কুলের ছাদে উঠে আমি, মোস্তাফা, ডাঃ শাজাহান ও হুদা দেখতে পেলাম সারা আকাশটা লালে লাল। কামানের গর্জনে স্কুলের ছাদটা থরথর করে কাঁপছে। খুবই উত্তেজক সন্দেহ নেই। কিন্তু বড় করুন, বড় নির্মম। কেননা, শত্রু মিত্র অনেক মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে হিংস্র কামানের গোলায়। সমস্ত রাত শুধু কামানের গর্জন আর গর্জন।

 

১০ই ডিসেম্বর থেকে ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়টা অতিবাহিত হলো অহেতুক উদ্দীপনা, উত্তেজনা ও এক রকম বিশ্রামের মধ্য দিয়ে। মুক্তিসংগ্রামের শেষ পর্ব। দুঃখ ও আনন্দে আবহাওয়া ভারাক্রান্ত। স্থানীয় লোকজন বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা। নানাভাবে আতিথ্য দেখিয়ে জনগন আমাদের মুগ্ধ করলো। যেন আমরা সবাই একই সংসারের লোক, একই সুখ দুঃখের ভাগী। রাস্তার পার্শে সেই স্কুলটায় যে সপ্তাহটা কাটিয়েছিলাম, তার পূর্নাংগ চিত্র তুলে ধরার জন্য রণাংগনের ডাইরীর কিয়দংশ তুলে ধরছিঃ

১০ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালঃ গতরাতে ঘুমাতে পারিনি। কামানগুলো ঝিমিয়ে পড়েছে। গুহায় আহত সিংহের মত কামানগুলো তবুও মাঝে মাঝে গোঙাতে লাগলো। ভোরে ঘুম থেকে উঠে এক মগ চা দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে অগ্রবতী ঘাটিতে যুদ্ধরত সৈন্যদের কাছে গেলাম।এটা আমাদের দ্বিতীয় অবস্থান্ সাতক্ষীরা দৌলতপুর রাস্তায় প্রায় একহাজার গজ সামনে মেজর ঠাকুরের নেতৃত্ব ১৩নং “ডোগরা”  পদাতিক বাহিনী অবস্থান নিয়েছিল। অগ্রবর্তীদলের মর্টার সজ্জিত সৈন্য দলটি ও এখানে অবস্থান নেয়। রাস্তায় দু’দিক খোলা জলাশয়, সব কিছুই চোখে পড়ে। রাস্তায় কোন রকম চলাচল করলেই শত্রুপক্ষের মেশিনগানগুলি গর্জে ওঠে। রাস্তাটা খুব উঁচু। খুলনায় অয়ারলেস ষ্টেশনের টাওয়ার ও দৌলতপুর পানির ট্যাংক ভালভাবে দেখা যায়। এত কাছ তবু সোজাসুজি যেতে পারছি না। খুলনাকে দেখে আমি খুবই তৃষ্ণার্ত ও উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। যেহেতু পিছন দিক থেকে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হয়, সেজন্য আমাদের সেজন্য সৈন্যরা দু’দিক থেকে অগ্রসর হতে লাগলো। তাছাড়া মিত্রবাহিনীর আগে আমাদের যাবার কথা নয়। কাজেই আমাদের পিছনে থেকে যুদ্ধের গতিবিধি লক্ষ্য করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা  বললাম। ওদের অধিকাংশই খুলনার লোক। দেখলাম, ওদের মনোবল খুবই উঁচু। ওদের ঘরদোরের করুন দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো। স্কুলে ফিরে এসে আমাদের যা কিছু আছে সব একত্র করার জন্য হুদাকে বললাম। স্মভাব্য বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য ট্রেঞ্চ খনন করে তার ভেতর আমরা আশ্রয় নিলাম। কেননা ,এই জায়গা শত্রুক্ষের কামানের আওতায়। স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে সতর্ক হয়ে প্রস্তুত রইলাম। আকাঙ্ক্ষিত চরম লক্ষ্যবস্তুর কত কাছে আমরা-তবু কত দূরে।

১১ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালঃ যে দৃশ্য দেখেছি, তা জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। দেখলাম , সাতক্ষীরা-দৌলতপুর রোড লোকে লোকারন্য। বিভিন্ন যুবকেন্দ্র থেকে ওরা দলে দলে ফিরে আসছে। যতদূর চোখ যায় শুধু লোক আর লোক। কাঁধে ছোট ছোট বোঝা। রিক্ত,নিঃস্ব, সম্বলহীন। ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে আসছে মানুষের কাফেলা। আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ, আমরা ওই রাস্তার উপরই ছিলাম, নইলে ওই রিক্ত মানুষগুলো হিংস্র শত্রুদের খপ্পরে পড়ে যেতো। সামনে অগ্রসর হতে ওদের থামিয়ে দিলাম।

একটা দোতলা দালান থাকার জন্য ঠিক করা হলো। ওদের খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে। ভয়ানক চিন্তায় পরে গেলাম। ওরা প্রত্যেকেই এসে অভিযোগের সুর বললো, ‘স্যার, আমাদের সাথে কোন টাকা পয়সা নেই। এম-এন-এ, এম-পি-এ’ রা আমাদের ফেলে পালিয়ে গেছে।‘ মুখগুলো শুষ্ক, কুঞ্চিত। কেননা পঞ্চাশ মাইল পথ ওদের পায়ে হেঁটে আসতে হয়েছে। মনটা আমার কেঁদে উঠলো। ওদের সান্তনা দিয়ে একটা বড় লংগরখানা খোলার জন্য চৌধুরীকে বললাম। খুলনা মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের এখানেই থাকতে নির্দেশ দিলাম। চৌধুরীকে লংগরখানা দেখাশুনার ভার দিয়ে আমি হেড কোয়ার্টারের দিকে রওনা হয়ে গেলাম এবং ফুলতলা পোঁছে ৯নং পদাতিক ডিভিশনের হেডকোয়ার্টারের সাথে যোগাযোগ করলাম মেজর জেনারেল দলবীর সিং এই ডিভিশনের কমান্ডার।

ফুলতলা থেকে কিছু সামনে খুলনার দিকে যে রাস্তাটা গিয়েছে তার ডানপাশে একটি কলেজের মধ্যে হেডকোয়ার্টারের অফিসাদি। মেজর জেনারেল সিং-এর দেখা না পেয়ে তাঁর ষ্টাফ অফিসারের সংগে দেখা করলাম এই ডিভিশনের একটি ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার থেকে তিনি মাইল সামনে অবস্থান নিয়েছিল।

পাক হানাদাররা এখনে তীব্র প্রতিরোধ দিয়ে খুলনা – যশোর উপর মিত্রবহিনী অগ্রগতি বন্দ করে দিল। অবিরাম গোলাবর্ষন চলতে লাগলো। মনে হলো, খুলনা শত্রুপক্ষ সুদৃঢ় ঘাঁটি গেড়েছে। সীমান্ত ও যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে পাকিস্তানী সৈন্যরা জড়ো হয়েছে খুলনায়। কেননা মুক্তিবাহিনী চতুর্দিক থেকে ওদের ঘিরে রেখেছে। হানাদাররা মিত্রবাহিনীর চাইতে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ ভয় করতো।

১৩ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালঃ আমাদের আত্ম রক্ষামূলক অবস্থানের সামনে শত্রুঘাঁটির উপর বিমান হামলা পর্যবেক্ষন করার জন্য আমি, ডিভিশনের ষ্টাফ অফিসার মেজর ভট্টাচার্‍্য  ভারতীয় বিমান বাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট দত্ত আমাদের দ্বিতীয় অবস্থানে বসে সারা দিন অপেক্ষা করলাম। মিঃ দত্তের নির্দেশে এই বিমান হামলা পরিচালিত হচ্ছিল। বায়ুস্তর ভেদ করে বিমানগুলো উড়ে আসতেই মিঃ দত্ত বেতার যন্ত্র মারফত পাইলটদের সাথে যোগাযোগ করলেন এবং সঠিক লক্ষ্যস্থলের বর্ননা দিয়ে আঘাত হানার নির্দেশ দিলেন। পাইলটদের ঠিকমত নির্ভূলভাবে লক্ষ্য বস্তু চিনে বারবার বিমান নিয়ে ‘ড্রাইভ’ দিতে লাগলো। হানাদারদের কোন বিমান বা বিমানধ্বংসী কামান না থাকায় তার এই বিমান আত্রুমনের কোন প্রত্যুত্তর দিতে পারল না। অসাহায়ের মত শুধু মার খেতে লাগলো।

১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালঃ মেজর জেনারেল দলবীর সিং-সাথে তাঁর হেড কোয়ার্টারে সাক্ষাৎ করলাম। দেখলাম গাড়ীর ভেতর তিনি একটি ম্যাপ দেখছেন এবং খুবই ব্যস্ত। তাঁকে  ভয়ানক বিরক্ত ও রাগান্বিত মনে হলো। কেননা, প্রচন্ড গোলাবর্ষন করার পরও তিনি এগুতে পারছিলেন না। তাঁর অগ্রগতি থেমে গিয়েছিল।

ভারতের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মানেকশ’ অল ইন্ডিয়া রেডিও মারফত ঘোষনা করলেন যে, আত্মসমর্পনকারী সৈন্যদের জীবনের নিরাপত্তা দেয়া হবে। তৎসত্বেও শত্রুপক্ষের আত্মসমর্পন করার কোন লক্ষন দেখা গেল না।

জেনারেল দলবীর সিং তাঁর একটি বাহিনীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার কাজে আমার কাছে কয়েকজন দক্ষ লোক চাইলেন। উদ্দেশ্য, শত্রুদের বাঁদিক থেকে আত্রুমন করে বিভ্রান্ত করে ফেলা। তারাতারি হেড কোয়ার্টারে ফিরে গিয়ে খুলনার পথ-ঘাট যাদের ভাল জানা আছে এ-রকম পাঁচজন আমি নির্বাচিত করলাম।

১৫ই ডিসেম্বর ,১৯৭১ সালঃ গতরাতে মুষলধারে বৃষ্টি থাকায় মিত্র-বাহিনী সামনে এগুতে পারলো না। আজকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হবে। এদিকে লেঃ দত্তের তত্ত্ববধানে দৌলতপুর ও খুলনার কয়েকটা নির্দিষ্ট জায়গায় বিমান হামলা চালানো হলো। বারবার বিমান হামলায় খুলনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেখে মনে ব্যথা অনুভব করলাম এবং পাক হানাদাররা এখনও আত্মসমর্পন না করায় মনে মনে ওদের অভিশাপ দিতে লাগলাম। আজকে একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল। আমাদের একজন মুক্তিযোদ্ধা বুলেটের আঘাতে প্রান হারায়। ক্যাম্পের আর একজন মুক্তিযোদ্ধা রাইফেলের ম্যাগাজিন খালি ভেবে ট্রিগার টিপ দেয়, যার ফলে এই মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারনা হয়। মুক্তিযোদ্ধাটি একজন এস,এস,সি পরীক্ষার্থী। মুকড়া স্কুল প্রাঙ্গনে ওকে সমাহিত করা হয়েছিল। স্থানীয় স্কুল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলাম, তারা যেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তার নামে স্কুলটির নামকরন করে।

১৬ই ডিসেম্বর,১৯৭১ সালঃ দিনটা মেঘাচ্ছন্ন। কিছুটা ক্লান্তি ও বিষন্ন বোধ করতে লাগলাম।গতরাত্রের পরিকল্পনামাফিক মিত্র বাহিনীর এক স্কোয়াড্রন ট্যাংক’ খুলনার দিকে অগ্রসর হলো। কিন্তু ফরাফলের কোনখবর পেলাম না।

সকাল দশটা। শাহপুর স্কুলে কতকগুলো ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে  ছিলাম। ক্যাপ্টন হুদার জীপ এসে থামতেই সে একটা দুষ্ট ছেলের মত লাফিয়ে পড়ে গভীর আবেগে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। এ-রকম করতে আগে তাকে কখনও দেখিনি। তার এই ব্যবহার দেখে খুবই বিস্মিত হলাম। সে এক রকম কাঁপতে কাঁপতে বললো, ‘অত্যন্ত সুখবর স্যার, পাক সৈন্যরা আত্মসর্মপন করেছে এবং ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল জ্যাকপ ইতিমধ্যে ঢাকা অবতরন করেছেন’।

সংবাদটা অবিশ্বাস্য মনে হলো। কেননা, কল্পনাও করতে পারিনি যে, ওই হিংস্র পশুগুলি এত তারাতারি আত্ম সর্মপন করবে। তবুও এ সংবাদটা শুনে আমার সারা দেহে তপ্ত রক্তস্রোত বইতে লাগলো। চিৎকার করে ছেলেদের উদ্দেশ্য বললাম, ‘আমরা যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছি’।

আমার জীবনে সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত। ছেলেরা সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করতে লাগলো। ওদের মধ্যে কেউ কেউ ডিগবাজি খেয়ে ঘাসের উপরে গরাগরি করতে লাগলো। সবাই এক সঙ্গে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো, ‘তোমার নেতা, আমার নেতা- শেখ মজিব।’

আমি এবং হুদা মিত্রবাহিনীর ৯নং ডিভিশনের সদর দপ্তরে গিয়ে মেজর জেনারেল দলবীর সিংহকে তাঁর বাহিনীর অপর দু’জন অধিনায়কসহ খোশ মেজাজে বসা দেখলাম। আমাদের দেখে তাঁরা সবাই উল্লসিত হলেন এবং আমাদের স্বাগত জানালেন।

সময় বেলা ১২টা। কামানগুলি নীরব। আমরা একটা ট্রানজিষ্টারের কাছে বসে ঢাকার খবরাখবর শুনতে লাগলাম। শুনলাম পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনীর অধিনায়ক লেঃ জেনারেল নিয়াজী তাঁর অধীনস্থ সমস্ত সৈন্য নিয়ে সকাল সাতটায় মিত্র-বাহিনীর লেঃ জেনারেল অরোরার নিকট আত্মসমর্পন করেছেন। একদিকে আমাদের ঐতিহাসিক বিজয়ের আনন্দ, অপরদিকে ওদের অপমানজনক পরাজয়ের তীব্র গ্লানি।

যাহোক, এদিকে খুলনাকে নিয়ে বড্ড দুর্ভাবনায় পড়লাম। তখন পর্যন্ত এখানকার শত্রুপক্ষের আত্মসমর্পন করার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। উত্তেজনায় জেনারেল দলবীর সিং টেবিল ধাপরে বললেন, যদি ওই শয়তানগুলো এখন আত্মসমর্পন না করে, তাহলে আমার নিকট যে গোলন্দাজ বাহিনী আছে, তা পাঠিয়ে দিয়ে ওদের মাটির সাথে মিশিয়ে দিব।’

সময়ের চাকাটা ঠিকমতই চলতে লাগলো। কিন্তু আমাদের সামনে যে শত্রুরয়েছে, তারা যেন স্থবির। সবাই আমরা বসে। প্রতি মুহূত আশা করছি এইবার বুঝি হানাদাররা আত্মসমর্পন করবে। সূর্য ডুবে গেল, কিন্তু আত্মসমর্পনের কোন আভাস পাওয়া গেল না। আজ ঢাকার শত্রুপক্ষ আত্মসমর্পন করলো। কিন্তু খুলনায় আত্মসমর্পন করতে ওরা অস্বীকৃতি জানালো। মনে হলো, খুলনায় শত্রুপক্ষের কমান্ডার অত্যন্ত শক্ত লোক। আমি আমার হেডকোয়ার্টারে ফিরে গেলাম।

রাতটা ভয়ানক অস্বস্তিতে কাটলো। আমরা কেউ ঘুমাতে পারলাম না। মিত্রবাহিনীর কামানগুলি আবার সত্রিুয় হয়ে উঠলো। মাঝে মাঝে প্রত্যুত্তরে শত্রুপক্ষের কাছ থেকেও জবাব আসছিল। ওদের গোলাবারুদ হয়তো শেষ হয়ে আসছে। আমি আশাবাদী ছিলাম যে, আগামীকালই আমরা বিজয়ীর বেশে খুলনায় প্রবেশ করতে পারবো। বিগত ন’মাসের স্মৃতিচারন করতে গিয়ে আজ আমার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো।

১৭ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালঃ গত রাতে ক্যাপ্টেন হুদার সাথে পরামর্শ করে ঠিক করলাম যে, মুক্তিবাহিনীর অধিকাংশ লোককে লেঃ মোহাম্মদ আলির তত্ত্বাবধানে দৌলতপুর রোড দিয়ে খুলনায় পাঠিয়ে দিতে হবে। ওদের ভেতর ষাটজন মুক্তিযোদ্ধাকে গাড়িতে চাপিয়ে প্রস্তুত করে রাখলাম, যেন ওরা নির্দেশ পাওয়া মাত্র আমাদের সাথে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারে। সকাল বেলা সবাই প্রস্তুত। চরম বিজয়ের অভিযানের উত্তেজনায় সবাই কাপঁছে। ক্যাপ্টেন হুদা, ডাঃ শাজাহান ও মোস্তফাকে সাথে নিয়ে সকাল সাতটায় মিত্রবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে গিয়ে পোঁছালাম। গাড়ীতে যেসব মুক্তিযোদ্ধা প্রস্তত করে রাখা হয়েছিল তাঁরা আমাদের পিছে পিছে রওনা হলো। রাস্তায় শত শত গাড়ীর ভীর। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কখন মিত্রবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে গাড়ী ছাড়ার সংকেত সবুজ বাতি জ্বলে উঠবে এবং খুলনার দিকে অগ্রসর হবে। মিলিটারী পুলিশ স্ট্যান্ডের নিকট সবার আগে আমাদের গাড়ী দাঁড় করালাম। ৯নং মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসাবে আমাকে স্বীকৃতি দেয়ায় মিত্র বাহিনী আমাকে গাড়ী পার্ক করার অনুমতি দিল। অন্যথায় কোন বেসামরিক লোককে মিলিটারি পোষ্টের একশো গজের মধ্যে গাড়ী পার্ক করার অনুমতি দিল। অন্যথায় কোন বেসামরিক লোককে মিলিটারি পোষ্টের একশো গজের মধ্যে গাড়ী পার্ক করার অনুমতি দেয়া হতো না। পিছন দিকে চেয়ে দেখলাম অসংখ্য দেশী বিদেশী সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার গাড়ীর চারদিকে ভির করে আছে। আমি হেডকোয়ার্টার পর্যন্ত হেঁটে গেলাম। কারও উপর কারো নিয়ন্ত্রন ছিল না। সবাই ব্যস্ত-সমস্ত। বিজয়ের লগ্নটা আজ কত না প্রানবন্ত। প্রতিটি মুহুর্ত উত্তেজনাময়-ঐতিহাসিক। প্রতি শ্বাস-প্রশ্বাস বিজয়ের আনন্দে মুখর। বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্নের ফলশ্রুতি। সবাইকে খুশি মনে হলো। কিন্তু অন্তর খুলে কেউ হাসতে পারলো না। মনের অস্থিরতায় সবাই আড়ষ্ট হয়ে এলো।

জেনারেল দলবীর সিং-এর সাক্ষাৎ করলাম। তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কেননা, প্রধান ষ্টাফ অফিসার ,আত্মসর্মনকারী পাকিস্তানী কমান্ডার নিয়ে ইতিমধ্যেই রওনা হয়েছেন। এখনও এসে পেঁছৈাননি। সময় অতি মন্থর গতিতে চলতে লাগলো। এক একটি মুহূর্ত যেন এক একটি ঘন্টা। মিত্রবাহিনীর ৯নং ডিভিশনের ষ্টাফ অফিসার কর্নেল দেশ পান্ডে জেনারেল দলবীর সিংকে বললেন, ‘বিগ্রেডিয়ার হায়াত খান ও তাঁর সাথের সাতজন এসে পোঁছে গেছেন’।

উত্তেজনার চরম মুহূর্ত। জেনারেল দলবীর সিং গভীর স্বরে হকুম দিলেন , ‘ওদের এখানে নিয়ে আসুন’।  আমরা হেডকোয়ার্টার বিল্ডিং- এর উপরের তলায় বসা ছিলাম। নিচের দিকে চাইতে দেখলাম সাংঘাতিক অবস্থা। সামরিক বাহিনীর ফটোগ্রাফাররা আত্মসর্মনকারী পাকিস্তানি কমান্ডারদের ফটো নেয়ার জন্য, ওরা গাড়ী থেকে নামার সাথে সাথে ঘিরে ধরলো। এত ভীর যে, নিয়ন্ত্রন করা কিছুতে সম্ভব নয়। উৎসাহী সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফাররা এতদিন ধরে পাগলের মত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।

যাহোক, পাকিস্তানী কমান্ডারদের নিয়ে আসা হলো। আমি চারদিকে তাকাচ্ছিলাম ওদের ভেতর আমার চেনা কেউ আছে কিনা। হ্যা ওদের ভেতর আমার চেনা দু’জন ছিল। একজনের নাম লেঃ কর্নেল ইমতিয়াজ ভয়ায়েচ। পাকিস্তানী মিলিটারী একাডেমিতে যখন আমি ক্যাডেট ছিলাম তখন ওখানে তিনি ক্যাপ্টন ছিলেন। অপর জন লেঃ কর্নেল শামস। তার সাথে আমার জানা শোনা ছিল। ব্রিগেডিয়ার হায়াতকে ও একবার কি দু’বার পশ্চিম পাকিস্তানে দেখেছি। তখন তাঁদের মনে হতো খুব ভদ্র, বিনয়ী। কিন্তু বাংলাদেশে তাঁরাই অভদ্র, অযোগ্য প্রমানিত হয়েছে। বসতে তাঁদের চেয়ার দেওয়া হলো। জেনারেল দলবীর সিং অত্যন্ত সৌজন্যমূলক ব্যবহার করলেন তাদের সাথে। বিজয়ী ও বিজিতের কোন সামঞ্জস্য রাখলেন না। তিনি ওদের চা-পানে আপ্যায়িত করলেন। জেনারেল দলবীর সিং-এর মার্জিত রুচিবোধ ও ব্যবহার দেখে সত্যিই আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। ব্রিগেডিয়ার হায়াতের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই যে উনি হচ্ছেন মুক্ত-কমান্ডার। আগে আপনাদেরই একজন ছিলেন।’

আত্মসমর্পনের খুঁটিনাটি বিষয় সমাপ্ত  হলো। ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান তার ব্রিগেড মেজরকে ডেকে বললেন, মেজর ফিরোজ, তুমি এখনই চলে যাও এবং সৈন্যদের হুকুম শুনিয়ে দাও, যে যেখানে আছে সেখানেই অস্ত্র সম্বরন করতে। ওদের বলে দিও আমরা আত্মসমর্পন করেছি’।

শেষের কথাগুলি যখন তিনি উচ্চারন করলেন, তখন তাঁর সারা মুখমন্ডলে বেদনা ও গ্লানির উৎকট রেখাগুলি প্রকট হয়ে উঠলো। বেলা এগারটার সময় মেজর ফিরোজ তার সাথের অন্যান্য অফিসারদের নিয়ে জীপে করে খুলনার দিকে রওনা হলেন। ঠিক তাঁর পিছনেই ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান। তাঁর পিছনে ৯নং ডিভিশনের একটা জীপ আমি ও লেঃ কর্নেল দত্ত পাশাপাশি বসা। মিঃ দত্তকে বেসামরিক গনসংযোগ অফিসারের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। আমাদের জীপের পিছনে ক্যাপ্টেন হুদা, মোস্তফা ও ডাঃ শাজাহান।

আত্মসমর্পনকারী পাক-সৈন্যারা রাস্তার দু’ধারে অবস্থান গেড়ে বসেছিল। এই রক্তপিপাসু নরখাদকরা আজ বন্দী। অবনত মস্তকে মন্থর গতিতে হেঁটে চলেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আত্মসমর্পনকারী ইতালীয় সৈন্যর মত হানাদাররা দীর্ঘ লাইন দিয়ে চলতে লাগলো। ধীরে ধীরে আমরা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের ভেতর ঢুকলাম এখানে ব্রিগেডিয়ার হায়াত খানের হেডকোয়ার্টার। চারদিক শান্ত, নীরব। মিত্রবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ারের তত্ত্বাবধানে আত্মসমর্পনকারী সৈন্যদল মার্চ করে এগিয়ে এলো। চেয়ারে বসে ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘ভদ্রমহোদয়গন, পূর্ব পাকিস্তানে বসে শেষবারের মত এক কাপ চা দিয়ে আপ্যায়ন করা ছাড়া দেবার মত আমার কিছুই নেই।’

‘মৃত পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে বাংলাদেশ বলবেন কি?’  আমি একথা বলতেই ব্রিগেডিয়ার হায়াত অসাহায়ের মত আমার দিকে চেয়ে রইলেন। উপায়ন্তর না দেখে নিতান্ত অনিচ্ছা স্বত্বেও তিনি তাঁর ভুল সংশোধন করে নিলেন। চা খেয়ে আমরা সবাই সার্কিট হাউসে যাবার জন্য প্রস্তুত হলাম। এই যাত্রাটা খুবই আনন্দকর। আমরা খুলনা শহরের কাছাকাছি আসতেই রাস্তার দু’পাশের লোকজন গগনবিদায়ী চিৎকারে আমাদের স্বাগতম জানালো। জয়বাংলা ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত। আজ মনে হলো জয় বাংলা বাস্তব সত্য। প্রত্যেক বাড়ির চুড়ায়, দোকানে বাংলাদেশের পতাকা। প্রতিটি নারী-পুরুষ ও শিশুর হাতেই বাংলাদেশের পতাকা। হাত নেড়ে উল্লসিত জনতার অভিনন্দনের জবাব দিলাম। সবার মূখেই হাসি। শিগগিরই আমরা সার্কিট হাউজে পোঁছালাম। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে এদিকে আসতে লাগলো। সার্কিট হাউসের উপরে বাংলাদেশের পতাকা শোভা পাচ্ছে। বুকটা গর্বে ফুলে উঠলো। সমুন্নত পতাকার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে  রইলাম। হাজার হাজার উৎসুক মানুষ সার্কিট হাউস ঘিড়ে রয়েছে এবং সবাই সামনে আসার জন্য প্রানপন চেষ্টা করছে।

যে পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীরা নিরীহ বাঙালীদের উপর এতদিন অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের একনজর দেখার জন্য জনতা বাধঁভাঙা স্রোতের মত আসতে চাইলো। জনতার অসম্ভব ভীর নিয়ন্ত্রন করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু জনতার চাপ এত বেশী যে, মুক্তিযোদ্ধারা কিছুতেই ওদের সামলাতে পারছে না। সার্কিট হাউজের দরজায় নামতেই এত ভীড়ের মধ্যেও পিষ্ট হতে হতে জনতা আমাদের দেখার জন্য প্রানপন চেষ্টা করতে লাগলো। কেউ আনন্দে হাততালি দেয় কেউ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে, কেউবা পাগলের মত ছুটে আসে চুমু খায়। কি অপূর্ব দৃশ্য। মানবতার কি মহান বহিঃপ্রকাশ। সব হারাবার দুর্বিষহ জ্বালা ভূলে গিয়ে নতুন সূর্যকে কত আপন করে কাছে নিতে চায়। মহামানবের তীর্থসলিলে অবগাহন করে অবহেলিত জনতা আজ যেন নতুন প্রানের সন্ধান পেয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ওরা  আজ মুক্ত, ওরা আজ স্বাধীন। প্রতিটি জিনিস আজ নিজস্ব। ইতিমধ্যেই একটা হেলিকপ্টার জেনারেল দরবীর সিংকে নিয়ে সাকির্ট হাউজে অবতরন করলো। উন্নত চেহারার অধিকারী জেনারেল দলবীর সিং সার্কিট হাউজ পর্যন্ত হেঁটে আসলেন এবং আত্মসমর্প পর্বের খুঁটিনাটি বিষয় ঠিক না করা পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করলেন। সবুজ ঘাসের উপর লাল কার্পেট বিছানো। তাঁর উপর একটি টেবিল ও একটা চেয়ার।

ঐতিহাসিক মুহুর্তটি সমাগত। সুশিক্ষিত আট হাজার পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের কমান্ডারদের আত্ম সমর্পন। যে দাম্ভিক পাকিস্তানী সৈন্যরা হিংস্র কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করতো, তারা আজ নিরীহ মেষশাবকের মত আত্ম সমর্পন করলো। জেনারেল দলবীর সিং চেয়ারে উপবিষ্ট। ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান তার সাথের আটজন কর্নেল নিয়ে মার্চ করে তাঁর সামনে এসে থামলেন। পাকিস্তানী কমান্ডার যখন সাকির্ট হাউস থেকে বেরিয়ে মার্চ করে আসছিল, তখন বাইরে আপেক্ষমান হাজার লোক আনন্দে   ফেটে পড়লো। কেউ হাততালি দেয়। কেউবা শিস দেয়। কি গ্লানিকর পরাজয়। কত বড় শাস্তি মূলক অনুস্ঠান। জেনারেল দলবীর সিং-এর পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম, পাকিস্তানী অপরাধীগুলি এটেনশান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনুষ্ঠান খুবই সাদাসিধা। জেনারেল দলবীর সিং আত্ম সমর্পনের দলিল পাঠ করলেন এবং পাক-বাহিনীর পরাজিত কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান মাথা নুইয়ে কম্পিত হাতে দলিলে স্বাক্ষর দিলেন। সোজা হয়ে ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান ও তাঁর সাথের অন্যান্য অফিসাররা কোমরের বেল্টে খুলে মিত্রবাহিনীর কাছে অর্পন করলেন। এই সময় সমস্ত ফটো গ্রাফার ফটো নেয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগে গেল। দেখে মনে হলো যেন একটা বিয়ের পর্ব। ঊর্ধ্বতন সামরিক অফিসারদের পক্ষে এই রকম গ্লানিকর আত্মসমর্পন আমি আর কখনও দেখিনি। অত্যন্ত অপমানজনক পরাজয়।