বিদেশী মুসলিম রাষ্ট্রের পত্র-পত্রিকার সম্পাদকীয় অভিমত

Posted on Posted in 5
বিদেশী মুসলিম রাষ্ট্রের পত্র-পত্রিকার সম্পাদকীয় অভিমত

 

৬ জুন, ১৯৭১

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন মুসলিম দেশের পত্রপত্রিকা সুস্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার তেইশ বৎসর পরে এবারই প্রথমবারের মত সারাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের পর থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ঘটনাবলী সম্পর্কে দুনিয়ার বিভিন্ন মুসলিম রাষ্টের পত্রপত্রিকায় যে সম্পাদকীয় নিবন্ধ ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে তাতে বাংলাদেশের শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানুষের প্রতি মুসলিম দেশের জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। এটা আমাদের জন্য অত্যান্ত আশা ও আনন্দের বিষয় যে, স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকে আমরা বিশ্ববাসীর আন্তরিক সহানুভূতি ও সমর্থন পেয়ে আসছি।

* সিরিয়ার আল-তাউরা’ পত্রিাকায় ২৭ শে মার্চ তারিখের এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছেঃ

পূর্ব বাংলায় সামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় এ কথা প্রমাণিত হচ্ছে যে পাকিস্তানের মিলিটারী শাসকগোষ্ঠী দেশে সুষ্ঠু রাজনৈতিক অবস্থা ফিরে আসুক, এটা চাননি। তারা এটাও চানটি যে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে হোক।

* তুরস্কের দৈনিক ‘জমহুরিয়াত’-এ ২৮ শে মার্চ তারিখের এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছেঃ

পশ্চিম পাকিস্তান তাদের কামান-বন্দুক দিয়ে পূর্ব বাংলাকে দমন করতে শুরু করেছে কিন্তু একটু আগে বা পরে পূর্ব বাংলা তার অধিকার অর্জন করতে সক্ষম হবে।

* মালয়েশিয়ার দৈনিক ‘উতশান মালয়েশিয়া’ পত্রিকার ৩০ শে মার্চ তারিখে এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছেঃ

পাকিস্তানের মিলিটারী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্বয়ং বুঝেছেন যে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দ পূর্ব বাংলার জনগণের অবস্থা ও ভাগ্যের প্রতি ক্রমাগত অবহেলা ও উদাসীন মনোভাব পোষণ করায় বাংলাদেশে গণ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। বর্তমানে ইয়াহিয়া খান পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছেন যে, পূর্ব বাংলা কোন স্বাধীন দেশের অংশ নয়- বরং পূর্ব বাংলাকে বলা হয় পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনী।

* সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্রের আরবী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘রোসে আল-ইউসুফ-এর এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছেঃ

অনেক পর্যবেক্ষক এই ভেবে অবাক হয়েছেন যে, পূর্ব বাংলা এতদিন পরে কেন স্বাধীনতা চাইল! পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি লোক বাস করে পূর্ব বাংলায়। অথচ পাকিস্তানের মোট সাধারণ বাজেটের ৪ ভাগের ১ ভাগের চাইতে কম অর্থ ব্যয় হয় পূর্ব বাংলায়। পাকিস্তানের উন্নয়ন সংক্রান্ত বাজেটের তিন ভাগের একভাগের চেয়েও কম টাকা ব্যয় হয় পূর্ব বাংলায়। আর বৈদেশিক সাহায্য ও রপ্তানিজাত আয়ের মাত্র ৪ ভাগের ১ ভাগ পায় পূর্ব বাংলা। সরকারি চাকুরির মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ এবং সামরিক বিভাগীয় চাকুরির শতকরা মাত্রা ১০ ভাগ পেয়েছে পূর্ব বাংলার মানুষ। ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার সময় দেখা গেছে যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব বাংলার চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিটি বেশী নজর দিয়েছে।

*সুদানের দৈনিক আল-সাহাফা’ পত্রিকার ৫ই এপ্রিল তারিখের এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছেঃ

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকচক্র দ্বারা বঞ্চিত ও শোধিক হয়ে আসছিল বলে অভিযোগ করে আসছে। পূর্ব বাংলার এই অভিযোগের কারণ হলো এইঃ

১। পাকিস্তানী সামরিক অফিসার ও সাধারণ সৈন্যদের শতকরা ৯০ ভাগ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নেয়া নেওয়া হয়েছে।

২। বেসামরিক সরকারী অফিসার পদে ৮০% পশ্চিম পাকিস্তানীদের থেকে নিয়োগ করা হয়েছে।

৩। পাকিস্তানের বার্ষিক আয়ের শতকরা ৭০ ভাগ ব্যয় হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।

৪। রপ্তানিজাত আয়ের ৮০% ব্যয় হয় পশ্চিম পাকিস্তানে আর মাত্রা ২০% ব্যয় হয় পূর্ব বাংলায়।

এ সকল কারণেই পূর্ব বাংলার মানুষ নিজেদেরকে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকচক্র দ্বারা শোষিত ও নির্যাতিত মনে করেছে। বর্তমানে পাকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু আয় বেড়েছে পূর্ব বাংলার ১৭% আর পশ্চিম পাকিস্তানে ৪২%। পূর্ব বাংলার অধিকার সচেতন মানুষের কাছে এখন এ বিষয়টি একেবারে খোলাসা হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশের উৎপাদিত পাট, চা ও চাউল বিদেশে রপ্তানী করে যে আয় পাকিস্তানের হয়, তা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নতির জন্যই ব্যয় করা হয়। এ কারণেই পশ্চিম পাকিস্তানী পুঁজিপতিরা পূর্ববাংলার মানুষের কাছে তাদের সম্পদের শোষক ও বঞ্চনাকারী হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন। এ প্রসঙ্গে একথাও উল্লেখযোগ্য যে পূর্ব বাংলার মানুষের টাকা দিয়ে রাওয়ালপিণ্ডিতে যে রাজধানী গড়া হলো হলো তাতেও খরচ করা হয়েছে ৫শ কোটি টাকা।

এ সকল ন্যায্য কারণেই পূর্ববাংলা স্বায়ত্তশাসন চেয়েছে।

* আফগানিস্তানের দৈনিক আফগান মিল্লাত’-এর এক প্রবন্ধে বলা হয়েছেঃ

পশ্চিম পাকিস্তানী একচেটিয়া পুঁজিবাদী এবং ফৌজী নেতারা এ অবস্থা দেখতে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না যে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা বাঙালীর হাতে যাক। এ কারণেই তারা জাতীয় পরিষদের বৈঠক বানচাল করতে সচেষ্ট ছিল। এবং পরিষদের অধিবেশন বসবার আগে একটা কিছু গোঁজামিল দিয়ে বাঙালী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সমঝোতা করতে ফন্দি এটেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের একমাত্র ন্যাপপ্রধান ওয়ালী খানই এসব বেআইনী ও অবৈধ কার্যকলাপের প্রতিবাদ করেছেন। তার দাবি ছিল, যেকোনো সমস্যার সমাধানের পন্থা পরিষদের বৈঠকে বসেই স্থির করতে হবে। পশ্চিমা শাসকচক্র দেখলেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান শুধু পূর্ব বাংলাকে শোষণমুক্ত করতে চান না, একই সময়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য অনুন্নত ও বঞ্চিত প্রদেশগুলোকেও পুঁজিপতি ও সামরিক জান্তার শোষণ থেকে মুক্ত করতে চান। কাজেই ক্ষমতা হাতছাড়া হবার আশঙ্কায় ইয়াহিয়া খান, ভুটো পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি নস্যাৎ করার জন্য আটলেন ভয়াবহ ষড়যন্ত্র-পূর্ব বাংলার এরা পাঠালেন সেনাবাহিনী।

* কুয়েতের দৈনিক আখবার আল-কুয়েত’-এর ৬ এপ্রিল তারিখের এক সম্পাকদীয় নিবন্ধে লেখা হয়েছেঃ

শেখ মুজিবুর রহমান দেশবাসীর কাছে এই ওয়াদা করেছিলেন যে, নির্বাচনের জয়লাভ করলে তার দল পূর্ব বাংলা জন্য স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা করবেন। নির্বাচনের তার দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করলো। শেখ সাহেবের দাবি ছিল ন্যায্য, আইন-সঙ্গত এবং গঠনমূলক। তিনি চাইলেন গণতন্ত্র ও শাসনতান্ত্রিক উপায়ে লক্ষ্যে পৌছতে এবং দেশের সব সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে। কিন্তু ইয়াহিয়া খান পূর্ব বাংলায় সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে

সশস্ত্র ধ্বংসাভিযান চালিয়ে সব নস্যাৎ করে দিলেন। ভাইয়ে ভাইয়ে এই হত্যাকাণ্ড সৃষ্টির অপরাধে ইয়াহিয়া খানকে ভবিষ্যৎ বংশধররা কোনদিন ক্ষমা করবে না।

(আবুল কাসেম সন্দ্বীপ অনুদিত)