বৃটেনে বাংলাদেশের ছাত্রদের প্রথম জাতীয় সম্মেলনের একটি প্রচার পুস্তিকা

Posted on Posted in 4

<৪,১০১,১৭৬-১৮৪>

 

অনুবাদকঃ অভি সরকার

শিরোনামসূত্রতারিখ
১০১। বৃটেনে বাংলাদেশের ছাত্রদের প্রথম জাতীয় সম্মেলনের একটি প্রচার পুস্তিকাবাংলাদেশ স্টুডেন্ট এ্যাকশন কমিটি,গ্রেট বৃটেন৩০ অক্টোবর, ১৯৭১

 

 

যুক্তরাজ্যে প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্র সম্মেলন

৩০ অক্টোবর ১৯৭১

হেনরি থরটন স্কুল

ক্ল্যাফ্যাম কমন, সাউথসাইড

লন্ডন ডব্লিউ ৪

 

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশে ছাত্রসংগ্রাম কমিটি

৩৫ গ্যামেজেস বিল্ডিং

১২০ হলবর্ন, লন্ডন ইসি১

টেঃ 01-405-5917

 

“এবারের সংগ্রাম,  আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

  • শেখ মুজিবুর রহমান

রাষ্ট্রপতি, গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ

 

“ধ্বংসস্তুপ এর মধ্য থেকে একটি নতুন বাংলাদেশ উঠে আসবে, যা শান্তি, গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বোধের প্রতি অনুগত থাকবে। এই দেশটি তৈরি হবে ধর্মমত, ভাষা, সংস্কৃতি এবং জাতীয়তার ভিত্তির ওপর এবং এটি টিকে থাকবে আমাদের সময়ে হতে থাকা এই মহাসংগ্রামের অভিজ্ঞতার সূত্রে।”

-তাজউদ্দীন আহমেদ

প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ

 

খন্দকার মোশতাক আহমেদ, পররাষ্ট্র ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর পক্ষ থেকে বার্তা:

 

“আমি জানতে পেরে অত্যন্ত খুশি হয়েছি যে, আগামী ৩০ অক্টোবর, লন্ডনে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি ছাত্রগণ আমাদের পবিত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য বিশ্ব জনমতকে আমাদের দিকে ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তোমাদের সম্মেলনের সর্বাঙ্গিন সাফল্য কামনা করছি। জয় বাংলা”। (তারযোগে প্রাপ্ত)

আমরা বাংলাদেশকে এই পাশবিক, সকল নীতিনৈতিকতা বর্জিত পাপীদের দখলদারি থেকে যে কোন মূল্যে মুক্ত করেই ছাড়ব।

হাতের কাছে যা কিছু আছে তা নিয়েই শত্রুকে আঘাত কর। দৃঢ়ভাবে আঘাত কর, ধ্বংস কর, সমস্ত অস্তিত্ব ধুলায় মিশিয়ে দাও। আমাদের দেশের নারীপুরুষের জীবন এবং সম্মান রক্ষার্থে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে জনগণকে এগিয়ে আসতে বল, যেন তারা আমাদের দেশের নাগরিকদের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে পারে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে পারে।

  • কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী

সর্বাধিনায়ক, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী

“আমি জেনে খুশি হয়েছি যে, লন্ডনে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ছাত্রদের একটি সম্মেলন হতে চলেছে। আমি সম্মেলনের সর্বাঙ্গিন সাফল্য কামনা করি। আমি আন্তরিকভাবে চাই, তাঁদের লালিত স্বপ্ন এবং অনুগত প্রচেষ্টা যেন সাফল্যের মুখ দেখে।

দেশমাতৃকার নিদারুণ মনস্তাপ অনুভূত হয় সঙ্কল্প, বীরত্ব এবং সহনশীলতার মাঝেই। দেশের যুবসমাজের সাথে আমার সম্পর্ক খুব গভীর এবং তাঁদের সাফল্যে আমি গর্ববোধ করি। সত্যিকারভাবেই বাংলাদেশের  যুবসমাজ সত্য এবং দেশপ্রেম দ্বারা অনুপ্রাণিত।

আবু সাঈদ চৌধুরী

বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি

 

শুভেচ্ছা বক্তব্য

সম্মানিত বিচারপতি, সুধীবৃন্দ, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বন্ধুগণ এবং প্রতিনিধিবৃন্দ:-

প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশি ছাত্রদের ঐতিহাসিক সম্মেলনে বাংলাদেশের বিপ্লবী ছাত্রজনতার পক্ষে আপনাদেরকে সসম্মানে স্বাগত জানাচ্ছি। এটি ঐতিহাসিক,  কেননা বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে সমর্থন ও ঐক্য প্রকাশের লক্ষ্যে এখানে এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক সমাবেশ।

আমরা যুদ্ধ করছি। আমাদের নিজেদের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে আমরা মূলত যুদ্ধ করছি, এটি সত্যি। কিন্তু এ কথা কেউ যেন ভুলে না যায় যে, আমাদের এ যুদ্ধ মানবতার জন্যও। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাংলাদেশে যেভাবে মানবতাকে এবং মানবসভ্যতাকে কলংকিত করেছে, তা এর আগে কখনও হয় নি। মানবতার বিরুদ্ধে পাকিস্তান জঘন্য অপরাধ করেছে। বিশ্ব এটিকে এড়িয়ে গেলে তা খুবই দুঃখজনক হবে।

মুক্তিযুদ্ধে আমরা প্রত্যেক শুভবুদ্ধির মানুষের সমর্থন এবং বিবেচনাবোধের ঐক্য চাই, কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তার মানবতাবিরোধী আচরণের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সোচ্চার সমর্থন আমাদের কাম্য। এ সম্প্রদায় যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশের ভুক্তভোগী সাড়ে সাত কোটি জনতা মানবতার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেললেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। এবং এর ফলে পৃথিবী পশুদের আবাসস্থলে পরিণত হবে শীঘ্রই। এখানে আমরা যারা আছি, তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের সবারই লড়াই করার একটি কারণ রয়েছে, যেটি আমাদের বিশ্বকে আরও সুন্দর করবে। এটি আমাদের পবিত্র দায়িত্ব, এবং আমাদের এ ভার বহন করতেই হবে, যাতে করে আমাদের বংশধরদের জন্য এ বিশ্ব আরও নিরাপদ হয়ে ওঠে। আমাদের এ সম্মেলন আহ্বান করার এটি একটি প্রধান উদ্দেশ্য।

তবে, বাংলাদেশের লড়াকু ছাত্রজনতার শক্তির অংশ হিসেবে, বিশ্বের সরকার এবং জনগণের এই ফোরামে এটি স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোন রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়। লাখো জনতার আত্মদান বৃথা যেতে পারে না। এছাড়াও আমরা আমাদের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকন্ঠিত। পশ্চিম পাকিস্তানি জান্তার উদ্দেশ্যে আমাদের সাবধানবাণী, শেখ মুজিবুর রহমানের কোন ক্ষতি হলে উপমহাদেশের শান্তির অভূতপূর্ব ক্ষতি সাধিত হবে। আমরা মরতে শিখেছি, আর কোন শক্তি আমাদেরকে শান্তি-গণতন্ত্র-ন্যায়বিচারের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিচলিত করতে পারবে না।

এ সুযোগে আমরা ধন্যবাদ জানাতে চাই বিশ্বের সে সব মানুষদের, যাঁরা আমাদের দুর্দশায় এগিয়ে এসেছেন। আমরা আমাদের এখানে উপস্থিত বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ, সম্মানিত অতিথিদেরকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সুধীমণ্ডলী, আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া এ সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব হতো না।

আপনাদের আবারও সাদর অভ্যর্থনা জানাই।

জয় বাংলা!

 

কর্মসূচী

 

সকাল ১১টা – বেলা ১টা রিপোর্ট এবং পুনরালোচনা (শুধুমাত্র বাংলাদেশের ছাত্রদের জন্য)

বেলা ১টা – ২টা মধ্যাহ্ন বিরতি

বেলা ২টা – বিকেল ৪টা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান (সকলের জন্য)

ক) বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিনিধি এবং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সম্মেলন উদ্বোধন করবেন।

খ) অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখবেন-

 অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জনাব পিটার শোর, এমপি

 জনাব পিটার হেইন, ইয়াং লিবারেলস এর চেয়ারম্যান

 জনাব সিলভিয়া মুর, কমিটি ফ্রান্সিস দে সলিদারিতে আভেক লা বাংলাদেশের প্রতিনিধি

 জনাব ফিলিপ ক্লার্ক, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি

 জনাব সৈয়দ আব্দুস সুলতান, এমএমএ

বিকেল ৪ টা – ৪.৩০ টা চা বিরতি

বিকেল ৪.৩০ টা – ৬টা আলোচনা সভা (সকলের জন্য)

ক) বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সভাপতিত্ব করবেন

খ) আলোচনা শুরু করবেন:

 জনাব রেহমান সোবহান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার এবং ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স এর মাননীয় অ্যাম্বাসাডর

 ড: আজিজুর রহমান খান, বাংলাদেশের একজন প্রথম সারির অর্থনীতিবিদ

 জনাব মার্টিন এডনি, গার্ডিয়ান পত্রিকা

গ) উপস্থিত দর্শকবৃন্দের মধ্যে যে কেউ বক্তব্য রাখতে পারবেন

বিকেল ৬.৩০ – সন্ধ্যা ৭.৫০ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

নৃত্যনাট্য – “অস্ত্র হাতে তুলে নাও”

পরিবেশনায়, বাংলাদেশ জনতা সাংস্কৃতিক সমাজ

সন্ধ্যা ৭.৫০ – ৯.৩০ “ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা” (শুধুমাত্র বাংলাদেশের ছাত্রদের জন্য)

আমাদের সংগ্রাম

পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২৫ মার্চে যখন “৪৮ ঘন্টার মধ্যে” রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব ধূলিসাৎ করার সুস্পষ্ট নির্দেশনাসহ যখন পূর্ব পাকিস্তানে হামলা শুরু করল, প্রায় দশ লক্ষ লাশের কবরে তারা সত্যিকার অর্থে পাকিস্তানের ধারণাটিরই কবর তৈরি করলো, কেননা ১২০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত দু’টো আলাদা অংশ দ্বারা গঠিত পাকিস্তানের ধারণাটিই ছিল পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪৬ সালের জনসম্মতিতে পূর্ব বাংলা প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে নতুন একটি রাষ্ট্র গড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিল, যেখানে পাঞ্জাবে এবং উত্তর পশ্চিমের অন্যান্য রাজ্যসমূহে সমগ্র ভারত কংগ্রেসেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল।

কিন্তু ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চে ঘোষিত লাহোর প্রস্তাবে যে “সার্বভৌম এবং স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র”-এর সঙ্ঘের ধারণা দেয়া হয়েছিল, সেটি আর বাস্তবায়িত হয় নি। ১৯৪৭ সালের আগস্টে স্বাধীনতা লাভের পরপরই “সন্দিহান” এবং জবরদখলকারী লোকজন নিজেদেরকে সদ্যস্বাধীন রাষ্ট্রের নব্যঔপনিবেশিক প্রভুস্থানীয় হিসেবে গণ্য করা শুরু করলো। তারা তাদের শক্তি অর্জন করলো পাঞ্জাবি অধ্যুষিত সেনাবাহিনী থেকে। যে বাঙ্গালিরা রাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে, তাদেরকে ছলে বলে কৌশলে সেনাবাহিনী থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হলো, “তারা যোদ্ধা জাতি নয়” এই অজুহাতে।

পরবর্তী ২৪ বছর ছিল দমন-পীড়ন এবং সাড়ে সাত কোটি মানুষকে মৌলিক অধিকারবঞ্চিত করার দীর্ঘ ইতিহাস। পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে যৌথ নির্বাচনী ব্যবস্থাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান সমর্থন করার সময়, রাষ্ট্রীয় ভাষাগুলোর একটি হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মাতৃভাষাকে গ্রহণ করার দাবিতে, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে তাদের ভোটদানে – যখনই সংখ্যাগরিষ্ঠরা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তাদের মত প্রকাশের চেষ্টা করেছে, তখনই “ষড়যন্ত্র” আবিস্কৃত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে অনিবার্যভাবেই এসেছে নির্মম নিপীড়ন।

“সৈনিকতায় সততার পরাকাষ্ঠা” প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যখন ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে এদেশের সর্বপ্রথম সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেন, তখন হয়তো সারা বিশ্বকে তিনি বিশ্বাস করাতে পেরেছিলেন যে, তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পুনর্বহাল করতে চান। কিন্তু এখন এই “সৎ সৈনিক” এবং তার সামরিক শাসনের পৈশাচিক ক্রোধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে এ বিশ্ব, কারণ তারা যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবে বাঙালিরা ভোট দেয় নি।

পেছন ফিরে তাকালে যুক্তিসংগতভাবেই ধরে নেয়া যায় যে, পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব (যাদেরকে “ঝামেলাবাজ” মনে করা হত), “কাফের” এবং “ভারতের চর” হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। যেভাবে তারা এ নির্দেশ পালন করেছে, তা হিটলার, চেঙ্গিস খান, আটিয়া এদেরকেও লজ্জ্বা দিত। নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে দশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, হাজার হাজার নারী ধর্ষিত হয়েছে, গ্রাম-গঞ্জ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, ৯০ লক্ষাধিক বাঙালি সীমান্ত অতিক্রম করে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করতে বাধ্য হয়েছে।

কিন্তু “৪৮ ঘণ্টার লক্ষ্যমাত্রা” অর্জিত হয় নি। বাঙালিরা লড়তে জানে না, এ ভ্রান্ত ধারণা ভেঙ্গে গেছে। প্রায় সাত মাসেরও অধিক সময় ধরে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী এবং গেরিলারা পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে তটস্থ করে রেখেছে, তাদের বিস্তর ক্ষয়ক্ষতি সাধন করছে। যেখানেই মুক্তিসেনারা ছুটে যাচ্ছে, সেখানেই স্থানীয় জনগণের সর্বাত্মক সহায়তা পাচ্ছে। অন্যদিকে, এমনকি সরকার-নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তানি সংবাদপত্রগুলোতেও দালালদের প্রাপ্য চরম পরিণতির খবরে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

এখন ভীতসন্ত্রস্ত সামরিক জান্তা নিজেদের মুখরক্ষার জন্য এই ইস্যুকে টেনে হিঁচড়ে ধাপে ধাপে আরও বড় করছে। তারা তাদের নিজ কৃতকর্মের জন্য ভারতকে দোষারোপ করে যাচ্ছে। ক্ষমতার রাজনীতির এ খেলায় পরিহাসের বিষয় এই যে, ইতিহাসের সর্ববৃহৎ মানবসৃষ্ট গণদুর্যোগেও যতজন বিচলিত হয় নি, ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যবর্তী আরেকটি যুদ্ধের বিপদসম্ভাবনায় বিশেষ করে সরকারী কর্মকর্তাদের ভেতরে তার চেয়েও বেশিসংখ্যক মানুষ বিচলিত হচ্ছে।

সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু মহাশক্তি মার্চের ১ তারিখের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পক্ষে। কিন্তু সাড়ে সাত কোটি বাঙালি তা চায় না। বাঙালি জাতি মুক্তি চায়, স্বাধীনতার চেয়ে কম কিছু তারা মেনে নেবে না। দশ লক্ষাধিক বাঙালি ভাইবোনকে যে সেনাবাহিনী হত্যা করেছে, সে সেনাবাহিনীকে অস্ত্রসজ্জিত করার জন্য ৬০ শতাংশেরও বেশি খরচ হচ্ছে, এটি জানার পর কি কোন বাঙালি আর এক পয়সাও কর দেবে?

না। পাকিস্তান মৃত, দশ লক্ষেরও বেশি লাশের সাথে সমাহিত হয়েছে পাকিস্তান। মুক্তিবাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে্, আর বেশি দেরি নেই, শীঘ্রই তারা বাংলাদেশের পবিত্র মাটিকে শত্রুছাড়া করবে। এ অলঙ্ঘনীয়, আমেরিকার অস্ত্রসহায়তা একে মুছে ফেলতে পারবে না। কেননা, আমেরিকার সমস্ত সৈন্যসামন্ত, অস্ত্রশস্ত্র এবং সম্মান আমেরিকা ভিয়েতনামে নিয়োগ করে রেখেছে।

আমাদের কার্যক্রম

আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি বাংলাদেশ ছাত্রসংগ্রাম কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে আপনাদেরকে জানানোর জন্য। আমরা আপনাদের অনুরোধ করব, আপনারা ১৯৭১ সালের মার্চের শুরুর দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকান, আপনারা ফিরে তাকান বাংলাদেশে ১৯৬৯ সালের গৌরবময় আন্দোলনের দিনগুলোর দিকে এবং আরও পেছনের সময়গুলোতে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অন্তহীন প্রচেষ্টা, আন্তরিক রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং অক্লান্ত মহানুভবতা ব্যর্থ হয়েছে পাকিস্তানকে বাঁচাতে, যার দুই অংশের মধ্যে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়া আর কোন কিছুতেই কোন মিল ছিল না। এবং বিশ্বাসের এই ঐক্য, আধ্যাত্মিক এবং আত্মিক যেমনই হোক না কেন, সেটি তৎকালীন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর, যাদের সিংহভাগই পশ্চিম পাকিস্তানের, তাদের মধ্যে তিলমাত্র শিষ্টাচার এবং নৈতিকতা জাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলেই পাকিস্তানের এ রক্তাক্ত অবসান সংঘটিত হল।

এই ২৪ বছরে বাংলাদেশে অনেকেই ছিলেন, যাঁদের দূরদর্শিতায় ধরা পড়েছিল আজকের দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো। আমরা সবচেয়ে পরিচিত নামগুলো যদি নাও বলি, আমরা বলতে পারি যে, আমাদের অনেক শুভানুধ্যায়ীরাই বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তান টিকবে না। আবার আমাদেরই অনেক বন্ধু ছিলেন, যাঁরা বিশ্বাস করতেন এবং প্রচার করতেন, তাঁরা প্রথমত বাঙালি এবং তার পর পাকিস্তানি। মূলধারার পাকিস্তানি ছাত্রনেতৃবৃন্দ এ ধরণের প্রচারণাকে উপহাস করতেন। আমরা এখানে দাঁড়িয়ে এসব বলছি শুধুমাত্র এটুকু দেখাতে যে, এমনকি ১৯৭১ সালের শুরুর দিনগুলোতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে কী ধরণের মানসিক এবং পারস্পরিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করতো।

তারপরই, বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নগ্নতম, ঘৃণ্যতম অভিসন্ধিতে জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করা হলো, প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর সার্বজনীন ভোটাধিকারের নীতিতে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জনগণের বিশাল সমর্থন পেয়ে যে সংসদে বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। ঠিক তখনই, মুহূর্তের মধ্যে জাতির বোধোদয় হলো, এখনই সময় পাকিস্তান ফেডারেশনের মিথ্যের মুখোশ খুলে ফেলার। দেশে ছাত্ররাই এ আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছিল। লন্ডনে, আমরা বিশাল সংখ্যক ছাত্ররা র‍্যালিতে যোগ দিলাম, এবং সিদ্ধান্ত নিলাম যে, পাকিস্তানের প্রতি আমাদের বিন্দুমাত্র ভালোবাসা নেই, আমাদের সামান্য শক্তিটুকু দিয়ে হলেও আমাদের নিজেদের ভূমি, স্বাধীন এবং সার্বভৌম বাংলাদেশকে, আমাদের নিজেদের জাতিকে গড়ে তুলতে হবে। পার্টির সাথে সম্বন্ধযুক্ত সকল ছাত্রদের মনেও একই চিন্তার উদয় হলো। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এক বিশাল সম্মেলনে, দু’ঘণ্টার মধ্যে ১১ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ ছাত্রসংগ্রাম কমিটি নামের ছাত্র কমিটি গঠিত হলো। এ কমিটি প্রয়োজনবোধে নিজেরা ভোটপ্রয়োগ করে নতুন সদস্য নির্বাচন করতে সক্ষম।

যদিও ৭ মার্চ এ কমিটি গঠিত হয়, বর্তমান আন্দোলনে আমরা ছাত্ররা ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই সরাসরি নিয়োজিত ছিলাম। ঐ সময় লন্ডনের আওয়ামী লীগ পাকিস্তানি জান্তার জাতীয় সম্মেলন স্থগিত করার কূটকৌশল অনুমান করে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে।

প্রতিবাদ কর্মসূচীর অংশ হিসেবে আমরা মার্চের ১ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত দিনে ২৪ ঘণ্টা পাকিস্তানের হাইকমিশনের ওপর নজর রাখছিলাম। যুক্তরাজ্যে ৭ই মার্চ ছিল এ আন্দোলনের আরও একটি মাইলফলক, যখন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার বাঙালি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে যোগদান করে। আমরা এ সমস্ত সমাবেশ এবং র‍্যালির আয়োজন-যোগদানের অগ্রভাগেই ছিলাম।

এ সংগ্রাম কমিটি সত্যি বলতে গড়ে উঠেছে রাস্তায় এবং ২৫ মার্চ পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে এ সংগ্রাম কমিটি কাজ করে গেছে; আমরা এতোটাই আবেগ দিয়ে সম্পৃক্ত ছিলাম যে, আমরা প্রতিটি পরিস্থিতিতে এমনিতেই সাড়া দিয়েছি, পরিকল্পনা করে সময় নষ্ট না করে। ঐসব দিনগুলোতে বিশ্ববিবেককে জাগিয়ে তোলার অদম্য আকাঙ্ক্ষায় আমরা আমাদের শেষ শক্তিটুকু ঢেলে দিয়েছি। আমরা আমাদের স্মারকলিপি ও আবেদনপত্র নিয়ে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে গিয়েছি। আমরা ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, ভারত, শ্রীলংকা এবং বার্মার দূতাবাসে একাধিকবার গিয়েছি।

ঐ সময়ে আমরা বিভিন্ন জাতিরাষ্ট্রের প্রধানবৃন্দ, জাতিসংঘের মুখপাত্রকে বাংলাদেশের জনগণের দুরবস্থার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছি। ঐ সময়ে আমরা বিশ্বকে এটাই জানাতে চেয়েছি যে, বাংলাদেশে যা ঘটছে তা একান্তই গণহত্যা।

শুরু থেকেই আমরা বাংলাদেশের ব্যাপারে ব্রিটিশ সংসদ সদস্যদেরকে পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিই। আমরা তাঁদের সাথে দেখা করি এবং তাঁদেরকে আমাদের কার্য বিবরণী, সংবাদপত্রের খণ্ডাংশ এবং অন্যান্য দলিল প্রদান করতে থাকি। আমরাই প্রথম গ্রুপ যাঁরা ব্রিটিশ সংসদ সদস্যদের সাথে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু করি। আমরা জনাব পিটার শোরের সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ করার পর তিনি শেখ সাহেবের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এরপর থেকে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য আমাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

জনাব পিটার শোর, জন স্টোনহাউজ, ব্রুস ডগলাস-মান, ফ্রেড ইভান্স, টবি জেসেল এবং অন্যান্য এমপিদের সমর্থন এবং বিবেচনাবোধের জন্য তাঁদের প্রতি আমরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। সংসদ সদস্যদের সাথে আলোচনার সময় আমরা বারবারই স্পষ্ট করে বলেছি যে, বাংলাদেশের জনগণ পূর্ণাংগ স্বাধীনতা চায়। আমরা একই উদ্দেশ্য সামনে রেখে অন্যান্য পার্লামেন্ট সদস্যদেরকেও লিখেছি। আমরা তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটরদের সাথে যোগাযোগ বজায় রেখে চলছি। যেসব সিনেটর ১৯৬১ সালের বৈদেশিক সহায়তা আইনের স্যাক্সবি-চার্চ সংশোধনীর (এস ১৬৭৫) সমর্থনে ছিলেন, আমরা তাঁদের সাথে যোগাযোগ রেখেছিলাম। আমরা সেসব সিনেটরদের কার্যক্রম আনন্দের সাথে উল্লেখ করছি এবং বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপনের কারণে তাঁদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। জুলাইয়ের শেষদিকে আমরা লন্ডনে আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী ৫,০০০ জন আমেরিকান আইনজীবীদের সাথে যোগাযোগ করি। আমরা তাঁদেরকে বাংলাদেশের ওপর কয়েকটি দলিল প্রদান করি, পাশাপাশি তাঁদেরকে মানবতার স্বার্থে এগিয়ে আসার আবেদন জানাই। আমরা আনন্দের সাথে আপনাদের জানাচ্ছি যে, আমেরিকাতে ফিরে গিয়ে তাঁদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট সিনেটর এবং কংগ্রেস সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করেন।

আমাদের রয়েছে বিস্তৃত প্রকাশনা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কার্য বিবরণীগুলো। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সেখানে প্রকাশিত হয়েছে। এই কার্য বিবরণীগুলো সংবাদমাধ্যমে, পার্লামেন্ট সদস্যদের কাছে এবং অন্যান্য সংস্থায় পাঠানো হয়েছে। এ পর্যন্ত আমরা ২০টি কার্য বিবরণী প্রকাশ করেছি। এগুলো ছাড়াও আমরা বিভিন্ন উপলক্ষে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছি। বিশ্ববাসীকে জানানোর জন্য আমরা নিম্নোক্ত পুস্তিকাগুলো পুণঃপ্রকাশ করেছি:

১) প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সৃষ্টি ঘোষণা করে

২) পূর্ব পাকিস্তানে সংঘাত –  পটভূমি এবং সম্ভাবনা

৩) গণহত্যা –  কেন বাংলাদেশেই?

৪) কেন আমরা বাংলাদেশ চাই

৫) ছয় মাসের মুক্তির সংগ্রাম

আমরা স্থানীয় এবং জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছি। প্রথমটি প্রকাশিত হয়েছিল টাইমসে, যেখানে “পূর্ব বঙ্গে গণহত্যা” বন্ধে বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানানো হয়েছিলো। এটি প্রকাশিত হয় ২৫ মার্চের আগে। পরবর্তীটি ২৭ মার্চে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল, “বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন”। ঐ সময়ে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রাদেশিক সরকার ঘোষণা করেন। পরবর্তী বিজ্ঞাপনটি গার্ডিয়ানে ২০ জুলাই “বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের প্রতি খোলা চিঠি” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। শেখ সাহেবের কথিত বিচারের সংবাদে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের পাশাপাশি আমরাও এগিয়ে আসি। আমরা ১৬ আগস্ট “বিশ্ববাসী জেগে উঠুন। এখনই প্রহসনমূলক বিচার বন্ধে কিছু করুন” শিরোনামে টাইমস পত্রিকায় অর্ধপৃষ্ঠাব্যাপী বিজ্ঞাপন দিই। আমরা স্থানীয় সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা “জনমত”-এও একটি বিজ্ঞাপন দেই, যেখানে আরও অনেক কিছুর পাশাপাশি স্থানীয় বাঙালি কূটনীতিকদেরকে পাকিস্তানি হাইকমিশনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার অনুরোধ জানানো হয়। এ বিজ্ঞাপনটি ছাপা হয় ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট তারিখে। ঠিক ঐদিনই “বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন” এ মর্মে বিশাল র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়। ঐ দিনই পাকিস্তান হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ পাকিস্তান হাইকমিশনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেন।

বিভিন্ন সংস্থায় তদবির করার কাজটি ছিল আমাদের জন্য খুব আগ্রহ আর উদ্দীপনার। আমরা এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করবো আমাদের অংশগ্রহণ করা পার্টি এবং ইউনিয়ন অধিবেশনগুলোর কথা। জনাব আনিস আহমাদ এবারডিনে জাতীয় খনি উত্তোলনকারী সমিতির জাতীয় অধিবেশনে যোগদান করেন। সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। তাছাড়াও, জনাব আনিস আহমাদ এবং আমাদের সভাসঙ্গী জনাব এ জেড এম হোসেইন স্কেয়ারবোরোতে পরিবহন এবং সাধারণ কর্মী সমিতির অধিবেশনে তদবির করেন। সে অধিবেশনে কোন প্রস্তাব পাস না হলেও, মহাসচিব জনাব জ্যাক জোনস আমাদের প্রতিনিধিদের কাছে তাঁদের জাতীয় নির্বাহমণ্ডলীর সভায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

আমাদের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত লিবারেল পার্টি, লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টির অধিবেশনে তদবির করেন। লিবারেল এবং লেবার পার্টি অতঃপর বাংলাদেশের ওপর প্রস্তাব পাস করেন। দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা কনজারভেটিভ পার্টির অধিবেশনগুলো থেকে এরকম কোন সাফল্য অর্জন করতে পারি নি।

আমাদের বেশ কয়েকজন বন্ধু বিভিন্ন উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে গিয়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারণা চালান। আমাদের কমিটির সদস্য জনাব ওয়ালি আশরাফ বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে বুদাপেস্টে বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগদান করেন। ঘটনাক্রমে, সেটিই ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক ফোরাম যেখানে বাংলাদেশ অংশগ্রহণের অনুমতি পায়।

খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং নজরুল ইসলাম ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশের আমন্ত্রণে হল্যান্ডে একটি সংবাদ সম্মেলনে যোগদান করতে হল্যান্ড যান। জনাব ওয়ালি আশরাফও একই সম্মেলনে বিচারপতি এ এস চৌধুরীর পক্ষে যোগদান করেন। তাঁরা ইউরোপা কমিটি গঠন করেন এবং তাঁরা বেলজিয়ামে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করেন।

আমরা প্যারিসে আন্তঃপার্লামেন্ট সমিতির অধিবেশনে যোগদান করার জন্যও প্রতিনিধি প্রেরণ করি। তাঁরা হলেন ড: এ এইচ প্রামাণিক, নজরুল ইসলাম, এ জেড এম মোহাম্মদ হোসেন। তাঁদের তদবির সফল হয়। অন্তঃপার্লামেন্ট সমিতি অধিবেশনে ৭০টি দেশ অংশগ্রহণ করে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এবং লাতিন আমেরিকান অনেকগুলো দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ সমস্যা প্রসঙ্গে আগ্রহ এবং বিবেচনাবোধ প্রদর্শন করে। অধিবেশন শেষে বাংলাদেশের ওপর একটি প্রস্তাব পাস করা হয়।

নীতিনির্ধারণী কমিটির অনুরোধে আমরা জনাব এ জেড এম হোসেনকে রোমানিয়ার সিনাইয়ায় পাগ-ওয়াশ বিজ্ঞান এবং বিশ্বশান্তি অধিবেশনে প্রেরণ করি।

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি এ, বাংলাদেশের সমর্থনে আমরা মহাদেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় ইনফর্মিং কমিটির সদস্যদের প্রেরণ করেছি। “ইউরোপা”র আদলে হল্যান্ডে গঠিত কমিটিটি মূলত স্ক্যান্ডিনেভিয়া, জার্মানি এবং বেলজিয়ামে কর্মরত। এছাড়াও আমরা Comite Francais De Solidarite Avec le Bangladesh গঠনেও অংশগ্রহণ করি। আমরা আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, তাঁদের প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। আমরা বাংলাদেশের সমর্থনে অন্যান্য মহাদেশীয় কমিটিগুলোর সাথে ক্রমাগত যোগাযোগ রেখে চলেছি এবং তাঁদেরকে আমাদের প্রকাশনাসমূহ প্রকাশের সাথে সাথেই প্রেরণ করছি।  একই লক্ষ্য সামনে রেখে আমরা বাংলাদেশের সমর্থনে গঠিত আমেরিকার কমিটিগুলোর সাথেও যোগাযোগ রেখেছি। আমরা Systeme Bibliograpique International Sur Le. Genocide, Les Crimes Contre L’Humanite Et Les এদের সাথে যোগাযোগ রাখছি। আমরা আরব অঞ্চলে এবং আরব সাগর তীরবর্তী রাষ্ট্রসমূহে বসবাসরত অনেক বাঙালির সাথেই ক্রমাগত যোগাযোগ রেখে চলেছি।

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত আমাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠীর সাথে অর্থবহ যোগাযোগ রক্ষা করছি। আমরা একটি সার্বজনীন কেন্দ্রীয় কর্মকমিটি গঠনের প্রাথমিক উদ্যোগ নিই। এ উপলক্ষে ১৯ মার্চ আমরা বাঙালিদের একটি বিশাল সমাবেশ আয়োজন করি। অবশ্য আমাদের মধ্যে পারস্পরিক মতামতে সমঝোতা না আসায় আমাদের পক্ষে কমিটিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তাই বলে এ আন্দোলন থেমে থাকেনি। এমনকি সেসব দিনেও আমাদের আন্দোলন আমাদের জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ থেকে সমর্থন পেয়ে এসেছে।

আমরা বেশ কয়েকটি প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছি এবং প্রত্যেকটিতে অংশ নিয়েছি। লন্ডনে আমাদের আয়োজিত প্রথম পাবলিক মিটিং এ বিচারপতি এ এস চৌধুরী এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জনাব জন স্টোনহাউজ বক্তব্য রাখেন। আমরা এর পর থেকে বেশ অনেকগুলো র‍্যালি, মিছিল এবং সমাবেশ আয়োজন করি। আমরা সফররত পাকিস্তানি ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করি। আমার বন্ধু মানিক চৌধুরী এবং আফরোজ আফগান বাংলাদেশের স্বীকৃতি দাবি করে ১০ ডাউনিং স্ট্রীটের সামনে অনশন ধর্মঘট করেন। আমরা যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের* সামনেও অনশন ধর্মঘট আয়োজন করি। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সকল বাঙালির জীবনে ২৫ মার্চ সন্ধ্যা একটি বাঁক নিয়ে আসে। আমরা আরও অনেক বাঙ্গালির সাথে লন্ডনস্থ পাকিস্তানি দূতাবাসের সামনে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে অংশ নিই। তখন থেকেই আমরা প্রত্যেক বাঙ্গালিকে অনুরোধ করেছি পাকিস্তানের সাথে তাদের সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্য এবং এর পর থেকে আমরা আর কখনও পাকিস্তান হাইকমিশনের সম্মুখে প্রতিবাদ সমাবেশে যাই নি। স্থানীয়ভাবে বাঙ্গালিরা সংগ্রাম কমিটি গড়ে তোলে, এর পর আমরা বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রতিটি কমিটির সাথে সহযোগিতা করাকে আমাদের মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি।

বন্ধুগণ, এ রিপোর্টে আমাদের কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া সম্ভব নয়। আমরা আমাদের কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে আপনাদেরকে সংক্ষেপে অবহিত করতে চেষ্টা করেছি। আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছি এবং বিশ্বকে আমরা জানাতে চাই যে, এ অবস্থার কোন নড়চড় হবে না।

জয় বাংলা!

 

 পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র সাহায্য পাঠানোর প্রতিবাদে। জনাব এ হাই খান এবং জনাব রাজিয়া চৌধুরী বিচারপতি এ এস চৌধুরীর অনুরোধে তাঁদের অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন।

যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ ছাত্র কর্মকমিটি কর্তৃক ৩৪ গ্যামেজেস বিল্ডিং, ১২০ হলবর্ন,

লন্ডন ইসি১ থেকে প্রকাশিত

টেলিফোন: ০১-৪০৫-৫৯১৭

লারকুলার লিমিটেড থেকে মুদ্রিত