মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাঙ্গালীদের প্রচারিত ‘টু এ্যাপিলস’

Posted on Posted in 4

<৪,২৯৫,৬৯৯-৭০০>

অনুবাদকঃ শিরোনামহীন-১

শিরোনামসূত্রতারিখ
২৯৫।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাঙ্গালীদের প্রচারিত ‘টু এ্যাপিলস’এ এম মুহিত সংকলিত ‘Thoughts in Exile’২৮ মার্চ, ১৯৭১

 

দু’টি আবেদন

২৮ মার্চ, ১৯৭১

প্রেক্ষাপট

       মাত্র চার মাস আগেই বাংলাদেশের (প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তান) মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানা একটি সাইক্লোনের কারণে আধুনিক কালের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগটির সম্মুখীন হয়েছে। সেসময়ে সামরিক শাসকদের চূড়ান্ত ঔদাসীন্য আর চরম অবহেলা প্রত্যক্ষ করেছে পুরো পৃথিবী। আর আজ আধুনিককালের সবচাইতে বড় মানবসৃষ্ট দুর্যোগটিও তৈরি করছে সেই একই সামরিক জান্তা।

       গত তিন দিন ধরে হানাদারবাহিনী মেশিন গান ও বোমা দিয়ে নিরস্ত্র জনগণের ওপর সীমাহীন অত্যাচার চালাচ্ছে। বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে হাসপাতাল, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে শরণার্থী শিবিরসমূহ, নিরস্ত্র মানুষকে কেটে ফেলে দেয়া হছে রাস্তায় – ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিক কর্তৃক বিশ্ব মিডিয়ার কাছে ঠিক এই চিত্রটিই পাঠানো হয়েছে, ধংসযজ্ঞ শুরু হবার পর। এটা হল হানাদারবাহিনীর ভয়ংকর উদ্দেশ্যের একটি অংশ, যেখানে তারা বিদেশি সাংবাদিকদেরকে অস্ত্রের মুখে লাঞ্ছিত করাটাকে জরুরি মনে করছে। যা ঘটছে, তা হল আধুনিক ইতিহাসের একটি নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড।

       অত্যন্ত সচতুরভাবে বাংলাদেশের মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, কারণ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে জেনারেল ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে থাকা সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা তুলে দেয়ার দাবি করার সাহস তারা করেছে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের সময় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই প্রতিজ্ঞাটি করেছিল জেনারেল ইয়াহিয়া এবং গত বছর অক্টোবরে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সমাবেশে তা পুনরায় করা হয়েছিল। এই মাসের ঘটনাসমুহে এটাই স্পষ্ট যে, সামরিক জান্তার আসলে জনগণের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেবার কিংবা বাংলাদেশের ওপর থেকে তাদের ঔপনিবেশিক শাসন তুলে নেয়ার কোন উদ্দেশ্য নেই। জনগণকে হত্যা করে হলেও বাংলাদেশকে তাদের উপনিবেশ হিসেবে রাখার ব্যাপারে তারা দ্বিধাহীন। 

       বাংলাদেশের জনগণও পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকদের হাত থেকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিজেদেরকে মুক্ত করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

       এই যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তারা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সমৃদ্ধ আর আমরা আমাদের নিজ অবস্থানে অপ্রতিরোধ্য বিশ্বাস নিয়ে অনড়। ওরা সম্পদলোভী, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। ওরা সংখ্যায় কম, আমরা অনেক। ওদের নৈতিকতা দূর্বল। আমরা নৈতিকভাবে শক্তিশালী। ওরা কয়েকটি যুদ্ধে জয়ী হতে পারে, কিন্তু মূল সংগ্রামে আমরাই জিতব।

যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও সরকারের কাছে আবেদন

       যে সংগ্রাম এখন বাংলাদেশে চলছে, তাহল বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির সাধারণ আন্দোলনেরই একটি অংশ। দুই শতাধিক বছর আগে মার্কিন জনগণ তাদের দূরবর্তী শাসকদের কাছ থেকে মুক্তির জন্য যে আন্দোলন করেছিল, তার চেয়ে এটি আলাদা কিছু নয়। আমেরিকায় ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর মত, পূর্ব পাকিস্তানেও রক্তপাত ঘটছে হাজার মাইল দূরের ভিনদেশি শাসকদের স্বার্থের জন্য। আপনাদের মতই, আমরাও আমাদের কল্যাণের প্রতি উদাসীন দূরবর্তী এক সরকারকে ভোটপ্রদানের ক্ষমতা ছাড়াই কর প্রদান করে যাচ্ছি। আপনাদের মত আমরাও আত্মসংকল্পের অধিকার চর্চার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আপনাদের মত আমরাও যেকোন উপায়েই হোক কঠোর থাকব।

       মার্কিন জনগণের মহৎ ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার পর বাংলাদেশের জনগণের আর কোন সন্দেহ নেই যে, মার্কিন সরকার ও তাদের জনগণ বাংলাদেশের এই দানবীয় হত্যাযজ্ঞ থামানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। সময় এখন সবচেয়ে দামি। নিরাপরাধ মানুষগুলোকে বাঁচানোর এখনই হল সময়।

       মানবতার খাতিরে আমরা আপনাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে হাজার হাজার নিরাপরাধ নাগরিকদের এই এলোপাতাড়ি হত্যাযজ্ঞ বন্ধের আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

       আমাদের শোষকদেরকে সাহায্য না করলেই আমাদেরকে সাহায্য করা হয়। ইয়াহিয়া শাসকগোষ্ঠীকে সামরিক কিংবা অর্থনৈতিক যেকোন প্রকারের সাহায্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে আমরা আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

বিশ্বের জনগণ ও সরকারের কাছে আবেদন

       যে সংগ্রাম এখন বাংলাদেশে চলছে, তা হল বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির সাধারণ আন্দোলনেরই একটি অংশ। পূর্ব পাকিস্তানেও রক্তপাত ঘটছে হাজার মাইল দূরের ভিনদেশি শাসকদের স্বার্থের জন্য। আমাদের কল্যাণের প্রতি উদাসীন দূরবর্তী এক সরকারকে ভোটপ্রদানের ক্ষমতা ছাড়াই কর প্রদান করে যাচ্ছি। আমরাও আত্মসংকল্পের অধিকার চর্চার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং আমরাও যেকোন উপায়েই হোক কঠোর থাকব।

       বাংলাদেশের জনগণের কোন সন্দেহ নেই যে, আপনার সরকার ও তাদের জনগণ বাংলাদেশের এই দানবীয় হত্যাযজ্ঞ থামানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। সময় এখন সবচেয়ে দামি। নিরাপরাধ মানুষগুলোকে বাঁচানোর এখনই হল সময়।

       মানবতার খাতিরে আমরা আপনাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে হাজার হাজার নিরাপরাধ নাগরিকদের এই এলোপাতাড়ি হত্যাযজ্ঞ বন্ধের আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

       আমাদের শোষকদেরকে সাহায্য না করলেই আমাদেরকে সাহায্য করা হয়। ফ্যাসিবাদী ইয়াহিয়া সরকারের বিরুদ্ধে জারি করে আমাদেরকে সাহায্য করার আবেদন জানাচ্ছি।

       নতুন গঠিত স্থানীয় সরকারকে স্বীকৃতি জানিয়ে আমাদেরকে সাহায্য করুন। তাতক্ষণিকভাবে এই গণতান্ত্রিক সরকারকে স্বীকৃতি জানাতে আপনাদের প্রতি আমার আকুল আবেদন রইল।

যুক্তরাষ্ট্রের বাঙালি সমাজ