মীর জাফরের রোজনামচা

Posted on Posted in 5
শিরোনামসূত্রতারিখ
১৭। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত জীবন্তিকা অনুষ্ঠানস্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দলিলপত্র……১৯৭১
মিরজাফরের রোজনামচা

১ নভেম্বর, ১৯৭১

ভাগ্নেঃ (ক্ৰন্দন মিশ্রিত কণ্ঠে) মামা- মামাগো-

মামাঃ          কেরে ? কে?

ভাগ্নেঃ দরজা খোল মামা শীগগীর। আমি তোমার ভাগ্নে হাদু।

মামাঃ চিৎকার করিসনে- আসছি দাঁড়া। (দরজা খোলার শব্দ)

ভাগ্নেঃ মামা মামাগো- (ক্ৰন্দন)

মামাঃ ওকি কাদছিস কেন? এই মলো, বলি কাঁদছিস কেন গবেট?

ভাগ্নেঃ মামাগো চোখের সামনে খুন করল।

মামাঃ খুন! মিলিটারী কাকে মারল?

ভাগ্নেঃ না।

মামাঃ তবে মুক্তিবাহিনী কি রাজাকারকে মারলো?

ভাগ্নেঃ বলছি না।

মামাঃ (রেগে) তবে কি তোর সাতগুষ্ঠির পিণ্ডি চটকালো?

ভাগ্নেঃ না।

মামাঃ তবে কে কাকে খুন করল?

ভাগ্নেঃ একজন বাঙালী রাজাকার আর একজন খান রাজাকারকে আমার চোখের সামনে ধরাম করে গুলি করে পেড়ে ফেলে দিল।

মামাঃ এই হতভাগা, শীগগীর আমার টেবিল থেকে মিরজাফরের রোজনামচাটা আর পেনটা নিয়ে আয়।

ভাগ্নেঃ এই নাও।

মামাঃ এবার বল।

ভাগ্নেঃ আমি ওই মোড়ের ওপর দোকানে বসে চা খাচ্ছি। আমার পাশের টেবিলে একজন বাঙালী আর একজন খান রাজাকারের মধ্যে বেশ গরম কথাবার্তা চলছিল।

মামাঃ কি কথাবার্তা হচ্ছিল তোর কানে গিয়েছে।

ভাগ্নেঃ যাবে না মানে? থিয়েটারের অভিনেতাদের যেমন কান প্রমটের দিকে থাকে, এদিকে অভিনয়ও করে যায়,- আমিও তেমনি চা খেতে খেতে ওদের দিকে কান খাড়া করে রেখেছিলাম।

মামাঃ ওরে বাবা হাঁদু, তোকে কতদিন বলেছি বাপ-ইনট্রোডাকশন বাদ দিয়ে কথা বলবি। ইয়াহিয়া খানের মতো যতো আজেবাজে কথার ঝুড়ি উপুড় করে দেবে। আসলে কি ঘটল তাই বল?

ভাগ্নেঃ তারপর? মুখ ছেড়ে হাতাহাতি। খানটা বাঙালীকে কয়েক ঘা বসিয়ে দিল। তারপর বাঙালীটা মুখের রক্ত মুছে নিজের রাইফেলটা হাতে নিয়েই খানের বুকে গুরুম করে গুলি চালালো। খান রাজাকার আল্লা বলে বুক ধরে পড়ে গেল- । তারপর-

মামাঃ তারপর খান পটল তুললো এইতো? একটা আপদ গেছে।

ভাগ্নেঃ কিন্তু মামা, যদি গুলিটা আমার বুকে লাগতো?

মামাঃ লাগেনি তো-তবে আর ভয় কি? এরকম ঘটনা তো রাজাকারদের মধ্যে আকছার ঘটছে। লুটের মাল নিয়ে খুনখুনি, বন্দী রমণী নিয়ে রক্তারক্তি। ইয়াহিয়ার এ এক জ্বালা। ওদিকে দলে-দলে কাতারেকাতারে বহু বাঙালী রাজাকার মুক্তিবাহিনীর কাছে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পা চেপে ধরে আত্মসমর্পণ

ভাগ্নেঃ তাই নাকি মামা?

মামাঃ দুনিয়ার কোন খবরই রাখিসনে? শুধু মামার ভাত রেধেই মলি?

ভাগ্নেঃ তোমার মতো ঘোড়েল সাংবাদিক যার মামা তার চিন্তা কি? আচ্ছা মামা তুমি এসব সংবাদ সংগ্ৰহ করে সরবরাহ কর কোথায়?

মামাঃ কোথায় এ্যাঁ? হা-হা-হা- শোন, গোপনে এইসব সংবাদ সরবরাহ করে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য, বেতার আর প্রচার দপ্তরের কাছে লোক মারফৎ পাঠিয়ে দেই। বাংলার মুক্ত অঞ্চল থেকে এসব খবর প্রচার করা হয় বিশ্বে।

ভাগ্নেঃ এ্যাঁ, বলো কি মামা।

মামাঃ গোপন কথা ফাঁস করে ভুল করলাম নাতো?

ভাগ্নেঃ জান যাবে- তবু কথা বেরুবে না। -হ্যাঁ।

মামাঃ সাবাস ভাগ্নে।

ভাগ্নেঃ তাহলে বাংলাদেশ সরকার সব দপ্তরই একরকম খুলে ফেলেছেন।

মামাঃ আছিস কোথায় রে বেটা হাদু। বাংলাদেশ সরকার এমন কি কাষ্টম ডিপার্টমেন্টও খুলে ফেলেছেন ইতিমধ্যে। বাংলাদেশ কাস্টমকে সকলে নিয়মমতো শুল্ক দিচ্ছে।

ভাগ্নেঃ এসব কথা শুনলে, সত্যি বলছি মামা বুকটা খুশীতে ডগোমগো করে। আচ্ছা মামা শুনলাম, বাংলাদেশ সরকার নাকি বিমান আর নৌবহর গড়েছেন?

মামাঃ গড়েছেন মানে? এইতো সেদিন বাংলাদেশ নৌবাহিনী চাটগাঁর কাছে পাক-সৈন্যের জন্য অস্ত্রশস্ত্র বহনকারী দুটি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে। একটা পাকিস্তানী জাহাজ নাসিম’ আর একটা গ্রীসের। নাম ‘এলভোস’।

ভাগ্নেঃ আনন্দে আমার নাচতে ইচ্ছে করছে মামা।

মামাঃ এই খেয়েছে।

ভাগ্নেঃ          আচ্ছা মামা শুনলাম, ইয়াহিয়া মামু নাকি ভারত আক্রমণ করার জন্যে লুঙ্গি ঝেড়ে ভাল করে গিট মেরে মালকোচা দিয়ে ভারতের সঙ্গে লড়বার জন্যে “ইয়া আলী বলে ডনবৈঠক মারছে আর বুক চাপড়াচ্ছে?

মামাঃ হ্যাঁ। শেষে লুঙ্গি হারিয়ে ল্যাঙ্গট পরে “মাইয়ারে মাইয়া” বলে পিঠে হাত দিয়ে ব্যাক গিয়ারে দৌড়ুতে হবে। বুঝলি হাঁদু, পিপীলিকার পাখা ওঠে মরিবার তরে। গুণ্ডাধিপতি ইয়াহিয়ার পাখনা গজিয়েছে।

ভাগ্নেঃ হা-হা-হা-যথার্থ বলেছো মামা। আচ্ছা লড়াই করে কি জিততে পারবে ইয়াহিয়া মামা?

মামাঃ অসম্ভব। ইয়াহিয়া এখন “কলকে ছোট-তামুক বড়” পান করছেন।

ভাগ্নেঃ সে আবার কি?

মামাঃ বুঝলিনে? মানে গেজা গুলগাট্টি মেরে হামবড়াই ভাব দেখাচ্ছে। ওর ছয় জেনারেল দিনরাত পাম্প দিচ্ছে ইয়াহিয়াকে। কারণ বাংলাদেশ আজ বাস্তব-জ্বলন্ত সত্য। বাংলাদেশে খান দস্যুসেনারা বাঙালীদের হাতে প্যাদানী খেয়ে মরছে-হাড়গোড় ভেঙ্গে বদন বিগড়ে পড়ে আছে।

ভাগ্নেঃ ইয়াহিয়া মামু জান জানে বাংলাদেশ হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। মামাঃ শুধু কি তাই, খান সাহেবের ট্যাক শূন্য। ব্যবসা, বাণিজ্য, আমদানী, রপ্তানী নেই। বিদেশী রাষ্ট্রগুলো একে একে মৌলভী সাহেবের পেছন থেকে কেটে পড়ছে। কেউ আর খান সাহেবকে টাকা, অস্ত্র দিয়ে চোট খেতে রাজী নয়।

ভাগ্নেঃ তাছাড়া তো বাংলাদেশে জাহাজ, রেল, সেতু পোঁ-পো করে চোকের নিমিষে উড়ে যাচ্ছে। পাট লোপাট হয়ে যাচ্ছে। চা বাগানগুলো

মামাঃ চা রপ্তানী করা ছেড়ে এখন আমদানী করতে হচ্ছে। ইয়াহিয়াকে ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচাবার জন্য বোমাবাজ ট্যাটোন খান, বাংলার মামদো ভূত মামুদ আলী, বোতল ট্রেড মার্কা ভুট্টো, কুপুত্তর মালকে বেটা, গুণ্ডা নিয়াজী, টেকো নুরুল চাচা কতো কেমেকারী-কতো কসরৎই না করলেন। কিন্তু কোন ফয়দা হ’ল?

ভাগ্নেঃ মোটেই না। বরঞ্চ আরও পানি ঘোলা হ’ল।

মামাঃ তাই ইয়াহিয়া এখন বাঁচার জন্যে শেষ চেষ্টা করছে। ইয়াহিয়া দেখছে, আমি যদি যাই তাহলে ভোগ করার জন্যে আমিও কাউকে রেখে যাবো না। মরি যদি সবাইকে নিয়েই মরবো। তাইতো ভাগ্যের জুয়াখেলা শুরু করেছেন। তাইতো বাঁচেগা ইয়া মরেগা বলে ভারত আক্রমণ করতে চাইছে।

ভাগ্নেঃ আচ্ছা মামা, ইয়াহিয়া ভারত আক্রমণ করে কিভাবে বাঁচবার পথ পাবে?

মামাঃ এই পরিষ্কার ব্যাপারটা বুঝতে পারলিনি হাদু। ইয়াহিয়া এখন ছাতা দিয়ে মাথা বাঁচাতে চায়। ইয়াহিয়া বেটা ভাবছে ভারতের সঙ্গে চুলকিয়ে ঘা করে যুদ্ধ বাধাতে পারলেই, রাষ্ট্রসঙ্ঘ সাদা পতাকা বাঁধা বাঁশ কাঁধে করে উভয়ের মাঝে এসে দাঁড়িয়ে বলবে- “থাম বাপ-সকল মারামারি করিসনে।” তারপর সিজ ফায়ার। রাষ্ট্রসঙ্ঘের তখন পাক-ভারত মীমাংসার জন্যে মাথা ব্যথা শুরু হবে। আর মুখ্য বাংলাদেশ সমস্যা তখন ধামাচাপা পড়বে। ব্যাস-খেল খতম!

ভাগ্নেঃ ইরি বাপ! খানের মাথায় এতো বুদ্ধি।

মামাঃ শয়তানি বুদ্ধিতে খান সাহেবরা চিরদিনই ওস্তাদ ব্যক্তি। কিন্তু এসব বুদ্ধি লাসটিং করে না বেশীদিন।

ভাগ্নেঃ হা-হা-হা- মামা একেবারে রসে টুইটুম্বুর। বাংলার মানুষ আজ খান সেনার ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত। কিন্তু মামা ঠিক আছে।

মামাঃ ঠিক থাকবো না কেন রে ছোঁড়া? আমিও বিয়ে করিনি-তুইও বিয়ে করলিনে? আমাদের কিসের চিন্তা? প্রয়োজনে অস্ত্র ধরবো। দেশের জন্য যদি মরি তাহলে জানবি-আমাদের বাপ-চোঁদ্দপুরুষের পুণ্যের ফল।

 

(কল্যাণ মিত্র রচিত)