মুক্তাঞ্চলে

Posted on Posted in 5
মুক্তাঞ্চলে

 

১২ ডিসেম্বর, ১৯৭১

বাংলাদেশ! আমার বাংলাদেশ বাংলাদেশ আজ স্বীকৃত সত্য। বাংলাদেশ আজ প্রতিটি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের আর্তি, বাংলাদেশ আজ সকলের হৃদপিণ্ডের শব্দ হয়ে বাজবে। আমাদের প্রাত্যহিক কাজে, চিন্তায়, স্বপ্নে, জাগরণে সুষুপ্তিতে বাংলাদেশ অবিশ্রাম ধ্বনিত হচ্ছে। আমাদের ভালোবাসায়, বাঙালীর প্রতি মুহুর্তের উদ্বেগ, চিন্তা-অনুরাগে, পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের সহানুভূতিতে বাংলাদেশ জেগে উঠেছে।

কিন্তু শক্র এখনো বাংলাদেশে আছে। শত শত শত্রু আত্মসমর্পণ করছে, অনেকে আবার আত্মসমপর্ণ না করে পালাতে গিয়ে মরছে- মৃত্যু তাদের জন্য নির্ধারিত। এতোদিনের অত্যাচার আজ সমাহিত হওয়ার কালে, অস্ত্র তাদের দিকে উদ্যত হয়েছে, ইতিহাসের এই অমোঘ নিয়ম। তাই শত্রুসৈন্যের পরাজয় এতো দ্রুত, এতো করুণ। কিন্তু পলায়নের পর কি চিহ্ন আমরা পাচ্ছি অতীতের বাংলাদেশের? ছোট-বড় শতেকের মতো শহরে, ৬০ হাজার গ্রামে তারা কি স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে? মিত্ৰশক্তির সহায়তায় মুক্তিবাহিনী একের পর এক গ্রাম ও শহর দখল করে এগিয়ে চলেছে এবং যেখানেই তারা যাচ্ছেন দেখতে পাচ্ছেন শুধু ধ্বংস, ধ্বংস আর ধ্বংস। যেন মানবসভ্যতার শক্রচেঙ্গিশ খাঁর দলিত জনপদ ও গ্রাম, যেন নাৎসী বাহিনীর অত্যাচারে বিক্ষত কোন গ্রাম বা শহরের ওপর দিয়ে পথ চলা- যেন এক অচেনা জগতের পথে, কোন ঝঞ্চাহত গ্রামের ওপর দিয়ে। বাংলার চিরপরিচিত গ্রাম, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, যেদিকে চোখ ফেরাই শুধু ধূ ধূ করে হাওয়া। পরিচিত যশোরের সঙ্গে জনগণের মনে যে কি উল্লাস! তারা আবার সেই হারানো শক্তি ফিরে পাচ্ছে। দুহাত বাড়িয়ে তারা জানাচ্ছে সাদর সম্ভাষণ। বুকের থেকে একটি বিরাট পাথরের বোঝা নেমে গিয়ে তারা পেয়েছে মুক্তির স্বাদ। যেখানে সেখানে পথে পথে ধ্বংসের ছবি লাফিয়ে উঠছে। শত্রুর অত্যাচারের কাহিনী। লজ্জা ক্ষোভ প্রকাশ বুক, স্বজন পরিজন হারানোর ব্যথা, সম্পদ হারানোর দুঃখ, গৃহহীন মানুষের অসহায় কান্না- কিন্তু মুক্তির নিঃশ্বাস টেনে, দুচোখ মেলে বলছে আর গান গাইছে- সাড়ে সাত কোটি নিপীড়িত মানুষের জয়।

কোথাও পথের ওপর দিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ছে পাগল একটি মানুষ। খবর নিয়ে জানা গেলো কিছুদিন আগেও সে ছিলো একজন বেসরকারী অফিসের অধস্তন চাকুরে। শত্রুসৈন্যরা তার পিতা-মাতা সকলকে হত্যা করেছে এবং সে হয়ে গেছে পাগল। মুক্তিবাহিনী থেকে খবর জানতে চাইলো তার, কিন্তু হায়, তার আর পূর্বের সেই সুখের বা দুঃখের স্মৃতি স্মরণে নেই। মুক্তিবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের চোখে দুফোঁটা অশ্রু বেয়ে পড়লো, মিত্র বাহিনীর জওয়ানরা সহানুভূতি জানালো। তারা এগিয়ে চললো। তাদের হাতে অনেক কাজ। আরব্ধ কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে যথাসম্ভব কম সময়ের মধ্যে। পেছনে যারা প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে আসছে তাদের

কর্তব্য সকলের দেখাশোনা করা। তারা দেখবে জনগণের সমস্যা, দুঃখ আর বেদনা। দুঃখের প্রতিকার করবে অসামরিক প্রশাসনের কর্মচারীবৃন্দ এবং সেই কাজটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমি শত্ৰমুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত অসামরিক শাসন ফিরিয়ে আনা, জনগণের মনে পূর্বের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং সুখের সন্ধান দেবার দায়িত্ব তাদেরই, তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে সাধারণ মানুষ। সরকার আর জনগণের সহায়তায় বাংলাদেশ সত্যিকার সুখী-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে।

আরো কিছুদূর যেতে যেতে একটি ছোটখাটো যুদ্ধ হলো শত্রুদের সঙ্গে, শত্রুসৈন্য মরলো, আত্মসমর্পণ করলো বহু কিছুদূরে গিয়ে চোখে পড়লো একজন আহত মানুষ। তার হাতে একটি ষ্টেনগান তখনো, দৃঢ়মুষ্টিবদ্ধ এবং সে তখনো জীবিত। একজন মুক্তিযোদ্ধা তার মুখে জল দিয়ে ডাকলো, জিজ্ঞেস করলো ঠিকানা, নাম। তবু নিরুত্তর সেই পাজামা-পাঞ্জাবি পরা তরুণটি। মুক্তিবাহিনীর মধ্যে কেউ কেউ তাকে রাজাকার বলে সন্দেহ করলো, অনেকে অনেক রকম মন্তব্য করলো। কেউ কেউ বললঃ কেড়ে নাও অস্ত্র, বিশ্বাসঘাতকের উপযুক্ত সাজা হয়েছে, পথের ধারে তাকে ফেলে রাখা, ধুকে ধুকে মরুক। কিন্তু অনেকেই জানতে চাইলো প্রকৃত ঘটনাটি। সহসা ক্যাপ্টেন এলো, আহতের মাথাটি কোলে তুলে নিয়ে গ্লাস থেকে আরেকটু জল মমতা-মাখা হাতে তুলে দিলো, জিজ্ঞেস করলো ঠিকানা। আহত জবাব দিলো, আস্তে আস্তে যেন মাধ্যাহ্ন সূর্য ধীরে ধীরে গ্রাস করছে কালবোশেখীর কালো মেঘ। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় সে বললো তার মনের কথাঃ

ঠিকানা আমার চেয়েছো বন্ধু-

ঠিকানার সন্ধান,

আজও পাওনি? দুঃখ যে দিলে করবো না অভিমান?

                                *              *       *

বন্ধু, আজকে আঘাত দিও না

তোমাদের দেওয়া ক্ষতে

আমার ঠিকানা খোঁজ করো শুধু

সূর্যোদয়ের পথে।

 *     *     *

আমার হদিস জীবনের পথে

মন্বন্তরে থেকে

ঘুরে গিয়েছে যে কিছুদূর গিয়ে

মুক্তির পথে বেঁকে।

*      *      *

বন্ধু, আজকে বিদায়!

দেখেছো উঠলো যে হাওয়া ঝড়ো,

ঠিকানা রইলো,

এবার মুক্ত স্বদেশেই দেখা করো ।

এবার মুক্ত স্বদেশেই দেখা করো  ।।

বলতে বলতে আহত অনামা সৈনিক মুৰ্ছিত হয়ে পড়লো। সকলের মনে প্রশ্ন জাগলো- কে এই অজানা বীর। হয়তো সে একা একা শত্রুকে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করেছিলো, হয়তো মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিলো সে। কিংবা সে একজন গেরিলা বাহিনীর সদস্য।

তাকে তাড়াতাড়ি সামরিক ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে দিয়ে আবার পথ চলা শুরু। কখনো মুক্তিবাহিনীর ক্যাপ্টেনের বার বার মনে পড়তে লাগলো এবং বিড় বিড় আবৃত্তি করতে লাগলোঃ

আমার হদিস জীবনের পথে

মম্বন্তর থেকে

ঘুরে গিয়েছে যে কিছুদূর গিয়ে

মুক্তির পথে বেঁকে।

*      *      *

(বিপ্লব বড়ুয়া রচিত)