মুক্তিফৌজের ক্যাম্পে

Posted on Posted in 5
মুক্তিফৌজের ক্যাম্পে

……….অক্টোবর, ১৯৭১

সেদিন একটা মুক্তিফৌজ-এর ক্যাম্পে গিয়েছিলাম রিপোর্ট সংগ্রহের জন্যে। কিন্তু মনের মধ্যে আরো একটা ইচ্ছা সুপ্ত ছিল। সেটা হলো বাংলাদেশের সেই সমস্ত কিশোরদের দেখা, তাদের কথা শোনা, যাঁরা মাবাবা আত্মীয়-পরিজন সবার মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে, দেশের স্বাধীনতা রক্ষার দুর্বার শপথ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন শত্রুর ওপর। সত্যি বলতে কি এটা আমাকে নেশার মত পেয়ে বসেছিল। তাই যখন রিপোর্ট সংগ্রহের ছুতো করে সেই সুযোগটা অকস্মাৎ এসে গেল তখন আর এক মুহুর্ত দেরী না করে ক্যাম্পে যাবার আয়োজন আরম্ভ করলাম।

ক্যাম্পে যখন পৌঁছলাম তখন বেলা সাড়ে তিনটা চারদিকে সারি সারি টেন্ট খাটানো। প্রায় আধমাইল দূরে কোলাহলমুখর বসতি। আমরা এতদূর থেকেও আবছা দেখতে পাচ্ছিলাম প্রতিটি ঘরের চালে ও গাছের ডালে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছিল। ক্যাম্পে দেখলাম এক জায়গায় কতগুলি ছেলে তাদের অস্ত্র পরিষ্কার করছে। কেউ কেউ তাদের জুতোর কাদা ধুয়ে ফিতে পরাচ্ছে, আবার এক জায়গায় কয়েকজন মিলে জয়বাংলা পত্রিকা পড়ছে। সবার চোখে মুখে যেন একটি ভাষাই সোচ্চার, সবার মনেপ্রাণে একই দৃঢ়তা ও প্রত্যয়। দেখে মনে হলো এরা সবাই যেন এখনই জীবনাৰ্ণবের অমৃত উৎসে অবগাহন করে উঠেছে। হঠাৎ দেখলাম পাশের একটা টেণ্ট থেকে একটা কিশোর চপল হরিণের মত চঞ্চল পায়ে বেরিয়ে এলো। ওর দিকে তাকিয়ে আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। ওর গভীর অতল চোখগুলো দেখে মনে হলো যে-কোন মুহুর্তে সেগুলো জ্বলে উঠতে পারে নির্মম দহনে। ছেলেটাকে দেখে আমার এত ভাল লাগল যে আমি আলাপ করার লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম “তোমার নামটা কি?” প্রথমে কোন উত্তর করল না। তার চোখে স্পর্শ দিয়ে আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে রইল। মনে হলো ও যেন আমার কপালের ত্ৰিবলী আর মুখের বিভিন্ন রেখার মাঝে কী এক পাঠ্য খুঁজে পেয়েছে। আর তাই পড়ে নিচ্ছে নিঃশব্দে। কিছুক্ষণ পর একটু আত্মস্থ হয়ে বলল- ‘নাম? আবার একটু থেমে বলল “আমার নাম জানেন না? আমরা তো আমাদের সবার নাম জানি। আমাদের সবার নামই তো এক- বাঙালী” চমকে উঠলাম ওর কথা শুনে। সম্বিৎ ফিরে পেলাম ওর কথায়। ও বলল, “আপনি তো রিপোর্টার।” আমি বললাম, “হ্যাঁ। শুনলাম মুক্তিবাহিনীর মাত্র তেরজন গেরিলা আড়াইশ পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য মেরেছিল। এবং আমিও তাদের মধ্যে একজন ছিলাম। যদি আপনার ইচ্ছা হয়,আমার থেকেও সব ব্যাপার জানতে পারেন।” আশ্চর্য হয়ে গেলাম, এত বড় সাহসিকতার যে সেও একজন ভাগীদার তাতে তাঁর কোন বিকার নেই। এগুলি যেন এখন তাদের কাছে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপার। আমি আরো ঘন হয়ে ঘাসের উপর বসলাম। সে বলতে রইলঃ গত পরশু দিন আমাদের মেজর এসে খবর দিলেন পাকিস্তানী বাহিনীর কয়েক ব্যাটেলিয়ন নিয়ে আড়াইশ জনের মত সৈন্য বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলের অদূরে অধিকৃত এলাকায় ঘাঁটি গেড়েছে। একথা শোনার পর আমরা সবাই তাদের খতম করতে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়ালাম। পেয়েছিল হানাদার বাহিনীর সাথে এল-এম-জি, এইচ-এম-জি প্রভৃতি ছাড়াও তিন ইঞ্চি মর্টার আছে। আমরা সেইভাবে প্রস্তুত হয়ে রওয়ানা দিলাম শত্রুর ঘাটির দিকে। যখন সেই জায়গাটায় পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা হয় হয়। জায়গাটা একটু উচুনিচু ও টিলাবহুল। কিছুটা দূরে কী এক বড় নদীর এক ক্ষীণ শাখা প্রবাহিত। বহু দূরে দেখা যাচ্ছিল শত্রুর ক্যাম্পের নিম্প্রভ ও কম্পিত শিখা জানেন, সেদিকে চোখ পড়তে আমাদের রক্ত এত চঞ্চল হয়ে উঠল, শত্রুহননের জিঘাংসা এত প্রবল হয়ে উঠল তা আপনি বুঝতে পারবেন না। এ তো ভাষায় বোঝান সম্ভব নয়, জন্তু হত্যা করায় এত আনন্দও আছে। কিন্তু আমাদের সে অধৈর্য কমাণ্ডারের আদেশে প্রশমিত করতে হলো। ঠিক হলো রাত সাড়ে এগারটার দিকে আমরা আক্রমণ চালাব। কমাণ্ডার আমাদের দলের দু’জনকে নিয়ে শক্রক্যাম্পের জায়গাটা পরিদর্শন করতে গেলেন।

প্রায় আধঘণ্টা পরে তারা ফিরে এসে আমাদের জানালেন পরিস্থিতি আমাদেরই অনুকূল এবং আমাদের আক্রমণ চালাতে হবে, A.B.C এই তিন পদ্ধতিতে। তখন রাত সাড়ে আটটা। আরো তিনঘণ্টা, ১৮০ মিনিট, কত সহস্র সেকেণ্ড উফ ভাবতেও অসহ্য লাগল। এত সময় কীভাবে কাটাব, ঐ নোংরা পাপী পশুগুলি আরো দুঘণ্টা বাংলাদেশের নির্মল পবিত্র বাতাসে নিঃশ্বাস টানবে। ভাবতেও গা রী-রী করে জ্বলে উঠল। কিন্তু কমাণ্ডারে আদেশ। একচুলও এদিক-ওদিক করার জো নেই। বসে রইলাম দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে। সদ্য পানিতে ফেলা এ্যাসপিরিন ট্যাবলেটের মত চাঁদটা ঝুরো ঝুরো লঘু মেঘের ভেতর ঢুকে গলে যাচ্ছে, আধো আধো হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়েছিলাম। নাকে ভেসে আসছিল অদূরের ঝোপ থেকে কোন বনফুলের গন্ধ। হঠাৎ গ্যাছে।

খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম। জন্তু বধ করার সময় হয়ে গেছে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমরা যাত্রা আরম্ভ করলামকখনো হামাগুড়ি দিয়ে, কখনো পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে নিঃশব্দে, কখনো খর পায়ে। শত্রুক্যাম্পের থেকে একটু দূরে আমাদের নির্দিষ্ট স্থানে এসে আমরা A.B.C পদ্ধতিতে ভাগ হয়ে দাঁড়ালাম। A ও B দুই দল LM-G, H-M-G, S-M-G সাধারণ রাইফেল নিয়ে দাঁড়াল দুই টিলার আড়ালে। এখান থেকে শক্রক্যাম্প মাত্র চারশ গজের মত দূরত্ব। আর C দলের দুইজন রকেট লাঞ্চার নিয়ে আমাদের উল্টো দিকে শত্রুক্যাম্পকে আমাদের উভয়ের মধ্যে রেখে প্রস্তুত হয়ে রইল। ঠিক সাড়ে এগারটা বাজতে সে দল বাদে আমাদের সবার অস্ত্র গর্জন করে উঠল। হঠাৎ-আক্রমণে শত্রুসৈন্যগুলি কিছু বুঝতে না পেরে ক্যাম্পের ভিতরেই চুপ করে বসে রইল। বাইরে যে কয়জন ক্যাম্প গার্ড দেয়ার জন্য ছিল, তারা, সে আবছা আলোতেও দেখলাম মৃত্যুযন্ত্রণায় দাপড়াচ্ছে। ক্যাম্পের ভিতরের সৈন্যগুলোর কোন সাড়া-শব্দ না পাওয়াতে আমরা বুঝতে পারলাম তারা কিছু একটা ফন্দী বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে। চারিদিকে নীরব। আমাদের অস্ত্রগুলিও তখন নীরব। কারণ আমাদের উপরে কড়া নির্দেশ অযথা গুলি নষ্ট করা যাবে না। হঠাৎ ওদিকে যারা বসে ছিল তাদের রকেট লাঞ্চার গর্জন করে উঠল ও একসঙ্গে বহু মর্মান্তিক আৰ্তরব সেই ভয়াল নীরবতাকে খান খান করে তুলল, আর সঙ্গে সঙ্গে তারা কিছুক্ষণ নীরব থেকে এই ফন্দি বের করেছিল যে যেহেতু আমরা সামনে দিয়ে আক্রমণ করছি, তাই তারা নিঃশব্দে ক্যাম্পের পিছন দিক দিয়ে আমাদের অস্ত্রের রেঞ্জের বাইরে চলে যাবে ও সেখান থেকে দূরপাল্লার রকেট ও মর্টারের সাহায্যে আমাদের নিশ্চিহ্ন করে দেবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে তারা যেদিকে পিছন ফিরে সরে আমাদের আক্রমণের চেষ্টা করছে সেখানেই আমাদের দলের দুজন রকেট লাঞ্চার নিয়ে বসে আছে। তাই যখন তারা আমাদের সেই দুজনের রকেট লাঞ্চারের রেঞ্জে এসে পড়ল অমনি আমাদের পক্ষের রকেট লাঞ্চার গর্জন করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আমরা এগারজন ছত্রভঙ্গ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় শত্রুসৈন্যের উপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের কোণঠাসা করে আনলাম। অল্পক্ষণ পরেই আমাদের কমাণ্ডারের আদেশে শত্রুসৈন্যরা অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করল। গুণে দেখলাম চল্লিশজন। মৃতদের সংখ্যা ২১০ জন হয় নাকি আর গুনিনি বলে একটু হেসে আমার দিকে তাকাল। কিন্তু লক্ষ করে দেখলাম সেই হাসিতে কী এক বিষন্নতার ছাপ, যেন একটু ভিজে ভিজে। পরে একটু থেমে আবার বলল, “না গুণে ভালই করেছিলাম। কারণ মৃতের সংখ্যা একটু বেশীই ছিল। আমার দুজন বন্ধুও কাল শহীদ হয়েছে। তার ছলছলে চোখ দুটো দেখে আমার চোখ ভিজে আসলো। দেখলাম চারদিকে গোধূলি থমথমে হয়ে উঠেছে। তাকে আর সান্তনা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। কাল প্রথম সূর্যোদয়ে সে আবার হয়ত ঝাঁপিয়ে পড়বে কোন রণাঙ্গনে। জিঘাংসার মদমত্ততায়ই হয়ত তার কেটে যাবে প্রতিটি সূর্যোদয়, প্রতিটি সূর্যস্ত। এই সময়টুকু যদি দিনান্তের বিধুবতায় সে আত্মবিশ্লেষণে বসে প্রিয়জনের বিয়োগব্যথায় তার চোখ ভরে আসে তবে মন্দ কী !

(লেখকের নাম জানা যায়নি)