মুক্তিবাহিনীর কাছে পাক সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল এবং আত্মসমর্পণের ঘটনাবলীর ওপর একটি প্রবন্ধ

Posted on Posted in 7

৭.১২৭.২৭৯ ২৮৫

শিরোনামঃ ১২৭।যুক্ত বাহিনীর কাছে পাক সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল এবং  আত্মসমর্পণের ঘটনাবলীর ওপর একটি প্রবন্ধ।

সূত্রঃ উইটনেস টু সারেন্ডারঃ সিদ্দিক সালিক

তারিখঃ ১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১

.

আত্মসমর্পণের দলিলের মূল পাঠ

পূর্ব পাকিস্তানের কমান্ডর বাংলাদেশে অবস্থিত পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীকে লেফট্যানেণ্ট- জেনারেল জাগজিত সিং আরোরা কাছে আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হয়েছে। তিনি পূর্ব থিয়েটারের ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশের জেনারেল চীফ কমান্ডিং অফিসার হিসাবে দায়িত্ব প্রাপ্ত। এই আত্মসমর্পণে পাকিস্তানের জমি , বায়ু এবং নৌ বাহিনীর সাথে সাথে সকল আধা সামরিক এবং বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনী অন্তর্ভুক্ত। এই বাহিনীগুলো বর্তমানে অবস্থিত নিকটবর্তী সাধারণ সেনাদল যারা লেফট্যানেণ্ট – জেনারেল জাগজিত সিং আরোরা অধীনে আছে তাদের কাছে অস্ত্র এবং নিজেদের সমর্পণ করবে।

পাকিস্তানের পূর্ব কমান্ডেরলেফট্যানেণ্ট – জেনারেল জাগজিত সিং আরোরা কাছে যত শীঘ্রই  সম্ভব এসে কার্যসম্পাদনে স্বাক্ষর করবে। আদেশ অমান্য কারীদের আত্মসমর্পণ লঙ্ঘনকারী হিসাবে গণ্য করে যুদ্ধের রীতি নীতি দ্বারা আইনত ব্যাবস্থায় মোকাবিলা করা হবে । লেফট্যানেণ্ট – জেনারেল জাগজিত সিং আরোরা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হিসাবে গণ্য হবে। এখানে আত্মসমর্পণের ধারাতে কোন ধরনের সন্দেহ জাগা উচিত নয়। 

লেফট্যানেণ্ট – জেনারেল জাগজিত সিং আরোরাকর্মীগণদের বিধি সম্মত আশ্বাস প্রদান করেছেন, যে আত্মসমর্পণ করবে তাদের মর্যাদা এবং সম্মানের সাথে গণ্য করা হবে, যা জেনেভা কনভেনশনের বিধান মালায় সৈন্যদের জন্য অভিহিত করা হয়েছে এবং পাকিস্তানী সামরিক এবং আধা সামরিক বাহিনীর যারা আত্মসমর্পণ করবে তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। লেফট্যানেণ্ট – জেনারেল জাগজিত সিং আরোরার আদেশে পশ্চিম পাকিস্তানের সকল বিদেশী নাগরিক, জাতিগত সংখ্যা লঘু এবং কর্মীবৃন্দকে রক্ষা করা হবে।

স্বাক্ষর/-

(জগজিৎ সিং আরোরা)

লেফট্যানেণ্ট – জেনারেল

জেনারাল অফিসার কমান্ডিং ইন চীফ

ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশী বাহিনী

পূর্ব থিয়েটার

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১

স্বাক্ষর/-

(আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজি)

লেফট্যানেণ্ট – জেনারেল

সামরিক আইন পরামর্শক জোন বি এবং কমান্ডর পূর্ব কমান্ড (পাকিস্তান)

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১

.

মেজর জেনারেল রহিম চাঁদপুর থেকে পলায়নের সময় ছোটখাটো আঘাতে ভুগছে তাকে জেনারেল ফারমানের বাসভবনে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর ক্রমে স্বাস্থ্য ফিরে পাচ্ছে। তাকে বাড়ির একটি নির্জন অংশে রাখা হয়েছে এবং ফারমান তার সঙ্গে ছিলেন। এটা ছিল ১২ই ডিসেম্বর অর্থাৎ “ অল আউট ” যুদ্ধের নবম দিন। তাদের হৃদয় ও মন স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ বিষয়ে আবর্ততিত হয় : ঢাকা কি সমর্থন যোগ্য ? তারা একটি অকপট মতামত বিনিময় করেছিল। রহিম বিশ্বাস করেছিল যুদ্ধ বিরতি একাই তার উত্তর দিয়েছে। ফারমান , রহিমের পরামর্শ শুনে অবাক হয়েছিল, যে সব সময় ইন্ডিয়ার বিপক্ষে একটি দীর্ঘায়িত এবং নিষ্পত্তিমূলক পরামর্শ দিত। তিনি বিদ্রূপাত্মক আমেজের সাথে বলেন, ( বাস ডানে নিওক গায়ে ইতনিজলদি ) ( আপনি আপনার স্নায়ু এতো তাড়াতাড়ি হারালেন ) রহিম জোর দিয়ে বলেন এটা ইতিমধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

আলোচনা চলাকালীন সময়ে , লেফট্যানেণ্ট – জেনারেল নিয়াজি এবং মেজর জেনারেল জামসেদ “ আহত জেনারেল ” কে দেখার জন্য রুমে প্রবেশ করেন।  রহিম তার পরামর্শ নিয়াজিকে পুনরাবৃত্তি করেন, যাতে নিয়াজি কোন প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তখন থেকে বৈদেশিক সাহায্য গ্রহন প্রশমিত করা হয় নি। বিষয়টি এড়ানোর জন্য ফারমান সংযুক্ত রুমে পলায়ন করেন।

জেনারেল নিয়াজি কিছুটা সময় রহিমের সাথে কাটানোর পর ফারমানের রুমে যান এবং, রাওয়ালপিন্ডিতে সংকেত পাঠানোর  জন্য বলেন।এটা আবির্ভূত হোল যে তিনি জেনারেল রহিমের উপদেশ গ্রহন করেছেন যা তিনি শান্তির সময়ে সব সময় করতেন। জেনারেল নিয়াজি সদর দপ্তর থেকে সরকারী বাসভবনে  স্থগতির নির্দেশ পাঠাতে চেয়েছিলেন।  জেনারেল নিয়াজি পূর্ব কমান্ডে নির্দেশ পাঠাতে জোর দেন। “ না সংকেত এখান থেকে যাক আর ওখান থেকে যাক এটা খুবই অল্প পার্থক্য তোলে । ” আমার অন্য কোথাও আসলেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, তুমি এখান থেকে পাঠাও।  ফারমান পুনরায় “ না “ বলার  পূর্বেই চীফ – সেক্রেটারি মুজ্জাফার রুমে প্রবেশ করেন এবং নিয়াজির কথোপকথন আকস্মিকভাবে শুনে বলেন নিয়াজি আপনি সঠিক। সংকেতটি এখান থেকেই  পাঠাতে  হবে। ” যা সংঘাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ।

জেনারেল ফারমান যুদ্ধ বিরতির বিষয়ে বিরোধিতা করছিলেন না, কিন্তু করতিপক্ষকে বিধিমত প্রতিশ্রুতি  দেওয়ার বিষয়ে বলেছিলেন। তিনি পূর্বেই এই একই বিষয়ে সংকেত দিয়েছিলেন যা রাওয়ালপিন্ডি তে নাকচ হয়েছিল – একবার দংশিত, দ্বিতীয়বার লজ্জিত। জেনারেল নিয়াজি তার “ জরুরী কাজে ” উপস্থিত থাকার জন্য অদৃশ্য হয়ে যায় যখন মুজ্জাফার হোসেন ঐতিহাসিক নোটের খসড়া করছিলেন। এটা ফারমানের দ্বারা লেখা এবং গভর্নরের কাছে প্রেরণ করা হয়, যে  এই ধারনাটি কে অনুমোদন করেন এবং একই সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠান ( ১২ই ডিসেম্বর)। নোটে ইয়াহিয়া খান কে সম্ভাব্য নির্দোষ জীবন বাঁচানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

পরদিন গভর্নর এবং তার প্রধান সহযোগীরা  রাওয়ালপিন্ডি থেকে আদেশ আসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন কিন্তু রাস্ত্রপতিকে দেখে মনে হচ্ছিল সিধান্ত নেয়ার জন্য তিনি খুবই ব্যস্ত ।  পরদিন (১৪ই ডিসেম্বর ) খুবই উচ্চ পর্যায়ের একটি মিটিং বসানো হয়। তিন (৩) ইন্ডিয়ান এম এই জি এস সরকারী বাসভবন আক্রমন করে সকাল ১১তা ১৫ মিনিটে এবং তা প্রধান হলে বিশাল ফাটল সৃষ্টি করে। গভর্নর বিমান আক্রমন থেকে আশ্রয় পাওয়ার জন্য পলায়ন করে এবং তাড়াহুড়ো করে তার পদত্যাগ পত্র লেখেন। প্রায় সকল ক্ষমতায় থাকা আসনের নিবাসীরা এই অভিযানে বেঁচে যান শুধুমাত্র অলংকরনের জন্য থাকা কিছু মাছ ব্যতীত। বাকিরা গরম পাথর কুচিতে এপাশ ওপাশ হয় এবং তাদের শেষ ভরসনাৎকরে।

গভর্নর তার মন্ত্রী সভা এবং পশ্চিম পাকিস্তানী বেসামরিক সারভেন্টরা ১৪ই ডিসেম্বর হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল এ চলে আসে যা আন্তর্জাতিক রেড ক্রস দ্বারা “ নিরপেক্ষ জোন “ হিসাবে নির্ধারিত। পশ্চিম পাকিস্তানী  ভি আই পি যাদের মাঝে চীফ -সেক্রেটারি , পুলিশের ইন্সপেক্টর – জেনারেল, কমিশনার, ঢাকা ডিভিশন প্রদেশের সেক্রেটারি এবং কিছুরা অন্তর্ভুক্ত, তারা লিখিত ভাবে পাকিস্তানী গভর্নমেন্টের সাথে “পৃথক হলো ” নিরপেক্ষ জোনে প্রবেশ করার মাধ্যমে। কারন কোন ব্যক্তি যুদ্ধমান রাষ্ট্রে অবস্থান করলে রেড ক্রস তার নিরাপত্তা অধিকারদান করে না ।

১৪ই ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানী সরকারের ধ্বংসাবশেষে সরকার ও সরকারী বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। শুধুমাত্র জেনারেল নিয়াজি এবং তার বিশৃঙ্খল বাহিনীকে প্রতিরোধ করে সিজারিয়ানের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম দেখার জন্য শত্রুরা ছিল। এখন পর্যন্ত জেনারেল নিয়াজিও  বৈদেশিক সাহায্য পাওয়ার  সকল আশা হারিয়ে ফেলেছিলেন । তিনি অতি দ্রুত তার আগের মেজাজ, নিরাশায় ফিরে আসছিলেন এবং খুব কম তার শক্তিশালী কেবিন থেকে বের হচ্ছিলেন । তিনি গতি বা দিক নিয়ন্ত্রন ছাড়াই যুদ্ধ রথে আরোহণ করেছিলেন। 

সুতরাং তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে তথ্য সংক্রান্ত নীতির অবস্থান থেকে ( যে আরও ছিল কমান্ডর – ইন – চীফ ) এবং গভীর ভাবে নির্দেশাবলীর অপেক্ষা করছিলেন।  আমার উপস্থিতিতে তিনি রাতে আহ্বান করেছিলেন (১৩/১৪ ডি সেম্বর ) এবং বলেন, স্যার আমি কিছু  নিদিরস্তপ্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ করছি। দয়া করে আপনি দেখবেন যাতে শিগ্রই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক কিছু সময় পেয়েছিল তার বহুবিধ কর্মের মাঝে এবং তিনি গভর্নরকে নির্দেশ দেন । এবং জেনারেল নিয়াজি পরের দিন যুদ্ধ বন্ধ এবং জীবন সংরক্ষনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তার শ্রেণী বিভক্ত করা হয়নি এমন সংকেতে জেনারেল নিয়াজি কে বলা হয়েছিল :

গভর্নরের ফ্ল্যাশ বার্তাতে আমাকে উল্লেখ্ করা হয়েছে। তোমরা অস্বাভাবিক অপ্রতি রোধ্যের বিরুদ্ধে বীরত্ব পূর্ণ যুদ্ধ করেছ। জাতি আপনাদের নিয়ে গর্বিত এবং পৃথিবী জুড়ে আপনাদের  তারিফ চলছে। আমি সমস্যার সমাধানের জন্য গ্রহণযোগ্য সম্ভাব্য সকল মানুষোচিত চেষ্টা করছি। আপনারা এখন যে অস্থায় পৌঁছেছেন সেখানে আর মানুষোচিত উপায়ে প্রতি রোধ করা সম্ভব না আর তা না কোন দরকারি উদ্দেশ্যে পরিবেশন করা যাবে। এটা শুধুমাত্র জীবন আর ধ্বংসের দিকে পরিচালিত করবে। আপনাদের এখন সম্ভাব্য সকল ধরনের পদক্ষেপ যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য গ্রহন করা উচিত এবং সশস্ত্র বাহিনীর জীবন সংরক্ষণ করার জন্য যারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসেছে এবং সকল অনুগত উপাদানও ।  এদিকে আমি ইউ এন এ অগ্রগমন করছি ইন্ডিয়া কে প্ররোচনা করার জন্য যাতে পূর্ব পাকিস্তানের শত্রুতা অবিলম্বে বন্ধ করা হয় এবং সশস্ত্র বাহিনীকে নিরাপত্তা দেওয়া হয় এবং অন্য সকল ব্যক্তি যারা বদমাশ হিসাবে টার্গেট হতে পারে।

এই গুরুত্বপূর্ণ টেলিগ্রামটি রাওয়ালপিন্ডি থেকে ১৪ই ডি সেম্বর ১৩৩০ ঘণ্টায় তৈরি করা হয়  এবং ঢাকায় ১৫৩০ ঘণ্টায় পৌঁছে । ( পূর্ব পাকিস্তানের সময়ের মানদণ্ডে )

রাষ্ট্রপতির টেলিগ্রামের তাৎপর্য কি ? তিনি জেনারেল নিয়াজি কি “ আত্মসমর্পণের নির্দেশ “ বুঝিয়েছেন  বা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারো যদি তা তার এতই আকাঙ্ক্ষিত হয় ? আমি উপরের টেলিগ্রামটি পাঠকের নিজের উপর ভাষান্তরিত করার জন্য ছেড়ে দিলাম  এবং নিজস্ব উপসংহার টানার জন্য।

জেনারেল নিয়াজি একই সন্ধ্যায় যুদ্ধ বিরতি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনের সিধান্ত নিয়েছেন । মধ্যস্তাকারী হিসাবে প্রথমে তিনি সোভিয়েত এবং  চীনের কূটনৈতিকদের চিন্তা করেন কিন্তু পরিশেষে মিঃ স্পিভেক, ঢাকার ইউ এস কনসাল জেনারেল কে পছন্দ করেন। জেনারেল নিয়াজি , জেনারেল ফারমান আলীকে মিঃ স্পিভেকের সঙ্গী হওয়ার নির্দেশ দেন কারন তিনি গভর্নরের উপদেষ্টা হিসাবে বিদেশী কূটনৈতিকদের লেনদেন করতেন। যখন তারা মিঃ স্পিভেকের অফিসে পৌছায় ফারমান পূর্ব রুমে অপেক্ষা করছিলেন যখন নিয়াজি ভিতরে প্রবেশ করেন। ফারমান আড়ি পেতে মিঃ স্পিভেকের সহানুভুতি জিততে  নিয়াজির জাঁকালো অসূক্ষ্ম প্রস্তাব শুনতে পায়, যখন তার মনে হয় যে “ বন্ধুত্ব “ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তিনি তাকে তার হয়ে ইন্ডিয়ার সাথে যুদ্ধ বিরতির টার্ম নিয়ে আলচনার অনুরোধ করলেন। মিঃ স্পিভেক সকল সহানুভূতিতে লাথি মেরে কায়দা করে বলেন , “ আমি তোমার পক্ষ হয়ে যুদ্ধ বিরতি নিয়ে মধ্যস্থা করতে পারব না । আমি শুধু মাত্র একটি বার্তা পাঠাতে পারব যদি তুমি চাও। “

জেনারেল নিয়াজি ইন্ডিয়ান আর্মির সামরিক বাহিনীর প্রদানকে ডাকার আহ্বান করে একটি বার্তা খসড়া করেন। তিনি পুরো পেজ জুড়ে তাৎক্ষনিক যুদ্ধ বিরতির নির্দেশ না দিয়ে বরং পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী এবং আধা সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তার জামানত চান। অনুগত বেসামরিক বাহিনী যাতে মুক্তি বাহিনীদ্বারা প্রতিহিংসা মূলক আচরনের শিকার না হয় এবং অসুস্থ  ও আহতদের চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

খুবই তাড়াতাড়ি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়।  মিঃ স্পিভেক বলেন, এটা ২০ মিনিটের মাঝে প্রেরণ করা হবে। জেনারেল নিয়াজি এবং ফারমান ওখান থেকে চলে আসেন এবং ক্যাপ্টেন নিয়াজি সহয়তাকারি শিবিরে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন ।তিনি সেখানে রাত ১০ তা পর্যন্ত বসে থাকেন কিন্তু কিছুই ঘটেনি। ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে তিনি পুনরায় চেক করতে বলেন। রাতের মাঝে কোন উত্তর পাওয়া যায় নি।  

আসলে মিঃ স্পিভেক বার্তাটি জেনারেল ( পরে ফিল্ড মার্শাল ) মানেকসা এর কাছে প্রেরণ করেননি । তিনি ওয়াশিংটনে বার্তাটি পাঠান । যেখানে ইউ এস সরকার কোন ব্যবস্থা গ্রহনের  পূর্বে ইয়াহিয়া খানের সাথে পরামর্শ করতে চান । কিন্তু ইয়াহিয়া খানকে পাওয়া যায় নি । তিনি কোথাও দুঃখে ডুবে ছিলেন। আমি পরে জানতে পারি ডিসেম্বরের ৩ তারিখ থেকেই তিনি যুদ্ধের বিষয়ে সকল আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং আর কখনোই তার অফিসে ফিরে আসেননি। তার সাধারণ সচিব সাধারন্ত একটি মানচিত্র বহন করে নিয়ে আসতেনএবং মার্ক করে যুদ্ধের সর্বশেষ সংবাদ জানাতেন। তিনি মাঝে মাঝে এটার দিকে তাকাতেন এবং একবার তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “ আমি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কি করতে পারি  ? “

মানেকসা ১৫ই ডিসেম্বর একটি নোটে বলেছিলেন যুদ্ধ বিরতি গ্রহন করতে হবে এবং নোটে আরও উল্লেখ করা হয় যে কর্মীদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে যদি পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমার অগ্রগামী সেনাদলের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তিনি কোলকাতায় আরও একটি রেডিও কম্পাঙ্কক দিয়েছিলেন। ইন্ডিয়ান পূর্ণকমান্ডের আসন , বিশদ বর্ণনায় কো – অরডিনেশন এর জন্য যোগাযোগ করা যাবে। মানেকসার বার্তা রাওয়ালপিন্ডিতে পাঠানো হয়েছিল। পাকিস্তান আর্মির চীফ অব স্টাফ ১৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এর উত্তরে বলেন , প্রসঙ্গত সকল শর্ত মেনে আপনি  যুদ্ধ বিরতি গ্রহন করলে তারা আপনার সুপারিশকৃত সব কিছু মেনে নিবে। যা হোক এটা দুই কমান্ডর এর মধ্যে একটি স্থানীয় ব্যবস্থা হবে। যদি জাতিসংঘের সমাধান খুঁজার ক্ষেত্রে কোন সংঘাত হয় তাহলে এটি ফাঁকা এবং শূন্যস্থান ধরা হবে ।

অস্থায়ী যুদ্ধ বিরতি ১৫ই ডিসেম্বর বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত রাখতে সম্মত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা পরের দিন দুপুর ৩ টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ১৬ই ডিসেম্বর যুদ্ধ বিরতি চূড়ান্ত করার জন্য সময় আরও বৃদ্ধি করা হয়। যখন জেনারেল হামিদ যুদ্ধ বিরতি শর্ত মেনে নেয়ার জন্য নিয়াজিকে পরামর্শ দেন। চিঠিটি এর “ অনুমোদন “ হিসাবে নেওয়া হয়। এবং ব্রিগেডিয়ার বাকের চীফ অব স্টাফ কে ডেকে  বিষয়টি গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ তৈরি করতে বলেন । একটি পূর্ণ পৃষ্ঠার সংকেত পাঠানো হয় সেনাদলের কাছে “ বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ “ করার জন্য এবং স্থানীয় কমান্ডরকে ডেকে যুদ্ধ বিরতির ব্যবস্থা করার জন্যইন্ডিয়ান পাল্টা অংশের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়। এটাতে আত্মসমর্পণ বলেনি কিন্তু বাক্যে আই শব্দ ব্যতীত বলা হয়েছে “দুর্ভাগ্যবশত এটা আরও অস্ত্র সমর্পণের সাথে জড়িত। ”

ইতিমধ্যে মধ্য রাত ( ১৫/১৬ ই ডি সেম্বর ) হয়ে গেছে যখন সংকেত পাঠানো হয়। প্রায় একই সময়ে লেফট্যানেণ্ট  কর্নেল লিয়াকত বোখারি , অফিসার কমান্ডিং , ৪ এভিয়েশন দলকে তার শেষ ব্রিফিং করার জন্য তলব করা হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছিল ৮ জন পশ্চিম পাকিস্তানী নার্স এবং ২৮ টি পরিবার নিয়ে এবং একই সময়ে আকিয়ারব ( বার্মা ) থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পার হতে। লেফট্যানেণ্ট  – কর্নেল লিয়াকত আলী নির্দেশটি তার স্বাভাবিক শান্ত ব্যবহারের সাথে গ্রহন করলেন , যা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রায়ই দেখা যেত। তার হেলিকপ্টার যুদ্ধের এই ১২ দিনের মাঝে দেখা যাচ্ছে একমাত্র প্রপ্তিসাধ্য বাহন যার দ্বারা পূর্ব কমান্ডের মানুষদের পার করা যাবে । গোলাবারুদ আব্বং অস্ত্র আঘাতে খারাপ হয়ে গেছে। তাদের একের পর এক দীর্ঘ  দুঃসাহসিক অভিযানের বীরত্ব যা খুবই উদ্দীপক তা এখানে সংকলন করা যাবে না ।

১৬ই ডিসেম্বর খুবই অল্প সময়ের মাঝে ২ টি হেলিকপ্টার চলে যায় যখন ৩য় টি দিবালোকে উড়ছিল । তারা মেজর জেনারেল রহিম খান এবং অন্য কিছু লোককে বহন করছিল কিন্তু নার্সদের পিছনে ফেলে আসতে হয়েছিল কারন তারা তাদেরকে হোস্টেল থেকে সংগ্রহ করার সময় পায়নি । সকল হেলিকপ্টার নিরাপদে বার্মাতে পৌছায় এবং অবশেষে  করাচিতে পৌঁছে। 

ঢাকায় ফিরা যাক, অবশ্যম্ভাবী সময় কাছে চলে এসেছে । যখন শত্রুরা টাঙ্গাইল থেকে টঙ্গীতে আগ্রগামী হল, তারা আমাদের ট্যাঙ্ক ফায়ার দ্বারা গৃহীত হল। দুঃসাহসীদের দ্বারা টঙ্গী – ঢাকা রোড বেশ সুরক্ষিত ছিল । ৬ই ডিসেম্বর কর্নেল ফজলে হামিদ তাড়াহুড়ো করে পশ্চাদপদ অনুসরন করে খুলনা থেকে পরিত্যাক্ত ইন্ডিয়ার পার্শ্বসোপনযুক্ত পথ ধরে মানিকগঞ্জের দিকে অগ্রসর হয় । ফজলে হামিদের সেনাবাহিনীর অবর্তমানে শত্রু মুক্ত জোন হিসাবে  উত্তর- পশ্চিম দিক থেকে ঢাকা শহর মুক্ত হয় । ব্রিগেডিয়ার বশির যে প্রাদেশিক  রাজধানী প্রতিরক্ষার জন্য দায়ী ছিল ( ক্যান্টনমেন্ট  ব্যতীত )। ১৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সে জানতে পারে ঢাকা মানিকগঞ্জ  রোড পুরোপুরি অরক্ষিত । সে রাতের প্রথমার্ধ অতিবাহিত করে ই পি সি এ এফ এর বিক্ষিপ্ত উপাদান জমা করে কোম্পানিকে শক্তিশালী করার জন্য। এবং তাদের মিরপুর ব্রিজ এ মেজর সালামত এর দিকে ঠেলে দেয় যা শুধুমাত্র শহরের বাইরে ছিল। ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীর কমান্ডো বাহিনী যাদেরকে মুক্তি বাহিনী বলেছিল যে ব্রিজটি অসংরক্ষিত আছে। ১৬ই ডিসেম্বর স্বল্প সময়ের মাঝে শহরের দিকে চালিত হয়েছিল এবং সেখানে মেজর সালামতের ছেলেরা অবস্থান করছিল এবং তারা অন্ধভাবে আগমনরত সৈন্যদের দিকে গুলি ছুড়তে থাকে। তারা দাবী করে যে কিছু শত্রু পক্ষের  সৈন্যদের হত্যা করেছে এবং ২ টি ইন্ডিয়ান জীপ বন্দী করেছে ।

১০১ কমিউনিকেশন জোনের মেজর জেনারেল নাগরা  যারা অগ্রগামী কমান্ডো বাহিনীকে অনুসরন করছে । সেতুর প্রতিসংহৃত পাশ থেকে লেফট্যানেণ্ট জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজির কাছে একটি চিরকুটে পাঠান, তিনি লেখেন যে “ প্রিয় আব্দুল্লাহ আমি মিরপুর ব্রিজে আছি, আপনার প্রতিনিধি পাঠান । ”

মেজর জেনারেল জামশেদ , মেজর জেনারেল ফারমান এবং রিয়ার – অ্যাডমিরাল শরিফ তখন মেজর নিয়াজির সাথে ছিল যখন তিনি নোটটি গ্রহন করেন, প্রায় তখন সকাল ৯ টা । ফারমান যে  “যুদ্ধ বিরতি আলোচনার “ বার্তা নিয়ে তখনও আটকে আছেন । তিনি কি নাগরার টীম মধ্যস্থতা করছেন ? জেনারেল নিয়াজি কোন মন্তব্য করেন নি। সুস্পষ্ট প্রশ্নও ছিল তাকে কি গ্রহন করা হবে না প্রত্যাহার করা হবে ? তিনি ইতিমধ্যে ঢাকার সীমাস্থলে ছিলেন ।

 জেনারেল নিয়াজি কে জেনারেল ফারমান জিজ্ঞাস করেন,“ আপনার কাছে কোন মজুদ আছে?  “নিয়াজি পুনরায় চুপ করে থাকেন । রিয়ার অ্যাডমিরাল শরীফ পাঞ্জাবীতে অনুবাদ করে বলেন, “ কুচ পাল্লেমে হেয় , ( আপনার থলের মধ্যে কিছু আছে ?) “ নিয়াজি ঢাকার ডিফেন্ডার জামশেদ এর দিকে তাকালেন , সে মাথা নেড়ে জানালেন “ কিছুই নাই “  যদি তাই হয় তাহলে যান এবং তাই করেন ( নাগরা ) তিনি যা জিজ্ঞাস করেছে । “ ফারমান এবং শরীফ একযোগে বললেন ।

জেনারেল নিয়াজি  নাগারাকে গ্রহন করতে জেনারেল জামসেদকে পাঠান । সে আমাদের মিরপুরের বাহিনীকে যুদ্ধ বিরতির প্রতি সম্মান রেখে নাগরাকে শান্তিপূর্ণ  পথে উত্তরন করানোর জন্য অনুমতি চান। ইন্ডিয়ান জেনারেল কিছু সংখ্যক সৈন্য এবং গর্ব নিয়ে ঢাকাতে প্রবেশ করেন ।এটা ছিল ঢাকার ভার্চুয়াল পতন । এটার অনুভুতি ছিল হৃদ রোগীর মতো শান্ত ভাবে। না এটার অঙ্গ পতঙ্গ কাঁটা হয়েছিল না শরীরে গভীর ক্ষত হয়েছিল । এটি শুধু মাত্র একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে নিরস্ত্র করা হয়েছিল । সিঙ্গাপুর , প্যারিস অথবা বার্লিনের পতনের গল্প এখানে পুনরাবৃত্তি হয় নি ।

এদিকে যুদ্ধ- কৌশল সংক্রান্ত পূর্ব কমান্ডের সদর দপ্তর গুটানো হয়েছিল। সকল অপারেশনের মানচিত্র সরানো হয়েছে। প্রধান সদর দপ্তর থেকে ধুলা সরানো হয়েছে ইন্ডিয়ানদের গ্রহন করতে কারন ব্রিগেডিয়ার বারেক বলেছিলেন, “ এটা আরও ভালো হয় যদি সজ্জিত করা হয়। ” সংযুক্ত অফিসার আগাম সতর্ক করে দিয়েছিলেন “ মেহমানদের ” জন্য খাবার প্রস্তুত করার বিষয়ে। বকর প্রশাসনিক কাজে খুবই দক্ষ ছিল।

মধ্যাহ্নের সামান্য কিছু সময় পর ব্রিগেডিয়ার বারেক এয়ারপোর্ট  গিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান প্রতিরুপ মেজর – জেনারেল জেকবকে গ্রহন করতে। এদিকে নিয়াজি তার জোকস দিয়ে নাগরাকে বিনোদন দিচ্ছে। আমি ক্ষমাপার্থী যে তাদেরকে এখানে রেকর্ড না করার জন্য কিন্তু তার কোনটাই মুদ্রন যোগ্য নয় ।

মেজর জেনারেল জেকব  “ আত্মসমর্পণের দলিল “ বহন করে এনেছিলেন যা জেনারেল নিয়াজি এবং চীফ অব স্টাফ “ খসড়া যুদ্ধ–বিরতি চুক্তি ” বলতে পছন্দ করেছিলেন । জেকব পেপারগুলো বকরের কাছে হস্তান্তর করে যা পূর্বে মেজর জেনারেল ফারমানের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন।  জেনারেল ফারমান লক্ষ করে দেখেন দফাটি , “ ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশের যৌথ কমান্ড ” হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। জেকব বলেন, “ কিন্তু এইটা এই ভাবেই দিল্লী থেকে এসেছে ।” ইন্ডিয়ান সামরিক গোয়েন্দা কর্নেল খেরা যে ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তিনি বলেন , “ ওহ এটা হল ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশ এর অভ্যন্তরীণ ব্যপার। আপনারা শুধুমাত্র ইন্ডিয়ান আর্মির কাছে আত্মসমর্পণ করবেন ।” ডকুমেন্ট গুলো নিয়াজির কাছে দেয়া হয়েছিল, যে কোন মন্তব্য ছাড়াই দেখেছিলেন এবং টেবিলের উপর দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফারমানের কাছে পাঠান ।। ফারমান বলেন , “এটা কমান্ডরের জন্য, যে এটা গ্রহন করবে নাকি প্রত্যাখ্যান করবে ।”  নিয়াজি কিছুই বললেন না , তাই ভাবে এটাকে গ্রহন করা হয়েছে হিসাবে নেওয়া হল ।

বিকালের শুরুতে জেনারেল নিয়াজি এয়ারপোর্টের দিকে গেলেন লেফট্যানেণ্ট – জেনারেল জাগজিত সিং আরোরা , ইন্ডিয়ান পূর্ব কমান্ডের কমান্ডরকে গ্রহন করার জন্য । সে তার স্ত্রী সহ হেলিকপ্টারে পৌঁছেছিলেন । বাঙ্গালিদের বেশ বড় অঙ্কের ভীড় সামনের  দিকে ছুটে  যাচ্ছিল তাদের মুক্তি দাতার দিকে ফুলের মালা নিয়ে এবং তার স্ত্রীর দিকেও । নিয়াজি তাকে একটি সামরিক অভিবাদন এবং হ্যান্ড সেক করছিলেন । এটা খুবই মর্মস্পর্শী দৃশ্য ছিল । বিজয়ী এবং পরাজিতদের পূর্ণ দৃশে  বাঙ্গালীরা দাঁড়িয়ে ছিল। যারা কোন ভুলই করেনি তাদের চরম ভালবাসা এবং চরম ঘৃণা যথাক্রমে  আরোরাএবং নিয়াজিকে প্রকাশের ক্ষেত্রে।

চিৎকার এবং শ্লোগান এর মধ্যে তারা রমনা রেস কোর্স ( সোহরাওয়ারদী  গ্রাউন্ড ) এর দিকে চালিত হয়েছিল, যেখানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের জন্য মঞ্চ তৈরি ছিল। সুবিশাল মাঠ আবেগী বাঙ্গালিদের ভিড়ে পূর্ণ ছিল। তারা সকলেই অধীর আগ্রহে  পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেলের জনসম্মুখে অপমান দেখার জন্য অপেক্ষা  করছিল । অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের জন্ম হিসাবেও বিধি বদ্ধ হয়েছিল।

একটি ছোট শর্ত সাপেক্ষে পাকিস্তানী আর্মির আগমন হয়, গার্ড অব অনার বিজয়ীদের উপস্থাপন করার জন্য অন্যদিকে পরাজিতদের বিচ্ছিন্ন করার জন্য ইন্ডিয়ান সৈন্যরা পাহারা দিয়েছিল। আত্মসমর্পণের দলিলে লেফট্যানেণ্ট – জেনারেল আরোরা ও লেফট্যানেণ্ট – জেনারেল নিয়াজি দ্বারা সাক্ষরিত হয় প্রায় ১০ লক্ষ বাঙ্গালি এবং বিদেশী মিডিয়ার জনসাধারনের সামনে । তারপর তারা উভয়েই উঠে দাঁড়ালেন । জেনারেল নিয়াজি তার রিভলবার বের করে আরোরা কাছে হস্তান্তর করলেন ঢাকার কাছে আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসাবে । এর সাথে তিনি পূর্ব পাকিস্তানকেও হস্তান্তর করলেন ।  ঢাকার সৈন্যদেরকে মুক্তি বাহিনীর কাছ থেকে তাদের নিজ রক্ষার্থে ব্যক্তিগত অস্ত্র রাখার অনুমতি দেওয়া হয় যতক্ষণ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান সৈন্য বাহিনী আছে। পর্যাপ্ত সংখার উপর নিয়ন্ত্রন নেওয়া হয়েছিল ।১৯ শে ডিসেম্বর সকাল ১১ টায় সৈন্যদল আনুস্থানিকভাবে ক্যান্টনমেন্টএর  গলফ কোর্সে আত্মসমর্পণ করেন । ঢাকার বাইরের সৈন্য বাহিনী ১৬ থেকে ২২শে ডিসেম্বরের মাঝে স্থানীয় কমান্ডরের আয়োজিত উপযুক্ত সময়ে তাদের অস্ত্র শায়িত করে ।

ইন্ডিয়ার সকল বেতার ১৪ই ডিসেম্বরের শুরু থেকেই আত্মসমর্পণের খবর সম্প্রচার শুরু করেছিল। এই খবর ঢাকার অবাঙ্গালি এবং অন্য জায়গার লোকদের ভীত করে তুলেছিল । তাদের অধিকাংশই ঘর বাড়ি ছেড়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে চলে এসেছিল পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে তাদের ভাগ্য শেয়ার করার জন্য। মুক্তি বাহিনী দ্বারা এদের হাজার হাজার ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং হত্যা করা হয়।  আমি তাদের গায়ের লোম দাঁড়ানোর মতো  নিরশংসতার কাহিনী শুনেছি। তারা একাই যথেষ্ট  ছিল রক্ত শিতল করার জন্য এবং তাদের তৈরি অনেক তালিকা এখনও আছে।

ইন্ডিয়ার এই নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা করার জন্য কোন সময়ই ছিল না। ইন্ডিয়া তাদের বিজয়ের লুটতরাজ সরানোতে ব্যস্ত ছিল। ট্রেন ও ট্রাকের বিশাল কনভয়ে করে মিলিটারি হার্ড ওয়্যার ,খাদ্য সামগ্রী , শিল্প উৎপাদন ও গৃহ স্থালী পণ্য যেমন  ফ্রিজ, কার্পেট এবং টেলিভিশন সেট নিয়ে যাচ্ছিল । বাংলাদেশের রক্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে শুষে নেওয়ার ফলে শুধু মাত্র এর কঙ্কাল রয়ে গিয়েছিল “ স্বাধীনতার”  ভোর উদযাপনের জন্য এক বছর পরে বাঙ্গালিরা এই বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে পেরেছিল।

যখন ইন্ডিয়া বাংলাদেশের সম্পদ তাদের নিজস্ব অঞ্চলে ট্রান্সফার করেছিল তারা আসলে কি করত বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে ?  তারা ইন্ডিয়ান পি ও ডাবলিউ ক্যাম্পে যুদ্ধ বন্দী পাকিস্তানিদের হস্তান্তর শুরু করে।। এই প্রক্রিয়া ১৯৭২ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ভি আই পি দের মাঝে লেফট্যানেণ্ট– জেনারেল নিয়াজিও, মেজর জেনারেল ফারমান , রিয়ার অ্যাডমিরাল  শরীফ এবং এয়ার কমান্ডর  ইনাম- উল- হক ও ছিল, যাইহোক তারা যে কোন ভাবে ২০শে ডিসেম্বরের মাঝে কোলকাতার দিকে উড়ে । আমিও তাদের সঙ্গে ……

কোলকাতার উইলিয়াম দুর্গে পৌঁছানোর সাথে সাথে আমি যুদ্ধ নিয়ে অলোচনার সুযোগ নিয়েছিলাম । জেনারেল নিয়াজি অতীতের  দিকে দৃষ্টিপাত করেন, পূর্বে হয়ত তার সময় ছিল অথবা প্রয়োজন ছিল পাকিস্তানের অনুসন্ধান কমিশনের জন্য তার যুদ্ধ গননার পুনর্নির্মাণের জন্য । তিনি অকপটে  এবং তির্যক ভাবে কথা বলেছিলেন। সে কোন অনুতাপ করেন নি এবং বিবেকের কাছে কোন সংশয়ও ছিল না । তিনি পাকিস্তানের বিভাজনের জন্য দায়িত্ব গ্রহন করতে অস্বীকার করেছিলেন । এবং এর জন্য সমানভাবে ইয়াহিয়া খান কে দোষারোপ করেছিলেন । এখানে আমাদের কথোপকথনের কিছু নির্যাস রয়েছে । আমি জিজ্ঞাস করেছিলাম , “ আপনি কি কখনো  ইয়াহিয়া খান বা হামিদ কে বলেননি যে মিশনের জন্য বরাদ্দ সম্পদ পর্যাপ্ত  ছিল না ।”তারা কি বেসামরিক নাগরিক নয় ? তারা কি জানত না যে ৩ (তিন ) পদাতিক সৈন্যবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও এর সাথে সাথে বাহ্যিক বিপদের জন্য যথেস্ত নয় ?  যাই হোক আপনার অক্ষমতা রক্ষার জন্য ঢাকা থিয়েটার কমান্ডর হিসাবে আপনার বিরুদ্ধে সব সময় লাল মার্ক থাকবে । যদিও নগরদুর্গ প্রতিরক্ষা এই পরিস্থিতির অধীনে শুধুমাত্র একটা  সম্ভবনা ছিল, আপনি ঢাকাকে নগরদুর্গ হিসাবে বিকশিত করতে পারেন নি। এখানে কোন সেনাদল ছিল না, রাওয়ালপিন্ডিকে এর জন্য দায়ী করা যায়। তার প্রত্তিজ্ঞা করেছিল আট (৮) পদাতিক সৈন্য বাহিনী মধ্য নভেম্বরের মধ্যে পাঠাবে কিন্তু মাত্র পাঁচটি (৫) পাঠিয়েছিল । অবশিষ্ট তিনটি (৩) আমাকে কোন পূর্ব নোটিশ দেয়া ছাড়াই তখন এসে পৌঁছেছিল যখন পশ্চিম পাকিস্তানের  সামনে আর কোন পথই খোলা ছিল না। আমি চেয়েছিলাম বাকি এই ৩ ব্যাটালিয়ানকে ঢাকায় রেখে দিব। কিন্তু যখন তোমরা জানতে ডিসেম্বর ৩ এরপর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আর কিছুই আসবে না। কেন আপনারা আপনাদের নিজেদের সম্পদ  থেকেমজুদ সৃষ্টি করেন নি ? কারন, সকল সেক্টর একই সময় চাপের মুখে এসে পরেছিল।  সৈন্য দল সব জায়গায়ই প্রত্তিজ্ঞা বদ্ধ হয়েছিল। কিছুই বাদ দেয়া যেত না । “  ঢাকাতে অল্প যা কিছু ছিল তা দিয়ে হয়ত যুদ্ধ আরও কিছু দিনের জন্য  দীর্ঘায়িত করতে পারতাম ।” আমি জানতে চেয়েছিলাম, কিসের জন্য ?তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “এর দ্বারা আর ও অনেক মৃত্যু ও ধ্বংস বয়ে আনতে পারত। ঢাকার ড্রেন রুদ্ধ হতে পারত, মৃত দেহ রাস্তায় স্তূপ করে রাখা যেত। নাগরিক সুবিধা প্লেগ এবং অন্যান্য রোগের ধসে ছড়িয়ে পরতে পারত। যদিও এর শেষ একই রকম হতো। ৯০,০০০ হাজার বিধবা এবং অর্ধ মিলিয়ন অনাথ এর মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে আমি ৯০,০০০ যুদ্ধ বন্দী পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যেতে পারতাম । আত্মত্যাগের কোন মূল্যই ছিল না ।” “যদিও এর শেষ একই হতো। পাকিস্তানী আর্মির ইতিহাস ভিন্ন হতো , এটা সামরিক অপারেশনের বর্ষ বিবরণীতে উদ্দীপক অধ্যায় হিসাবে লিখা থাকতো ।” জেনারেল নিয়াজি কোন উত্তরই দিলেন না ।