মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের লেখা ১ নং সেক্টর কমান্ডারের একটি পত্র

Posted on Posted in 11
শিরোনামঃউৎসতারিখ
৪৩। মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের লেখা ১ নং সেক্টর কমান্ডারের একটি পত্র১ নং সেক্টরের দলিলপত্র

 

৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১

 

ট্রান্সলেটেড বাইঃ Saima Tabassum Upoma

<১১, ৪৩ , ৪৯৫- ৪৯৮>

 

(গোপনীয়)

সেক্টর হেডকোয়ার্টার

বাংলাদেশ বাহিনী

নং ২বি/আই/এফ/এ

০৪ ডিসেম্বর,৭১

প্রাপকঃ বাংলাদেশ বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ

 

বিষয়ঃ গুরুত্বপুর্ন বিষয়- সরকারী নির্দেশের অপেক্ষা

 

১। একদিকে যখন মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশকে শ্ত্রুর হাত থেকে মুক্ত করছিল ঠিক অন্যদিকে মুক্ত এলাকাগুলোতে নানা রকম সমস্যারও সৃষ্টি হচ্ছিল, যেখানে সকারের তাৎক্ষনিক পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা গুরত্বপুর্ন হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এইসব ব্যপার আমার ১ নাম্বার সেক্টরের মিলিটারি কমান্ডারের দ্বায়িত্বের মাঝে পরে না কিন্তু একজন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমি আমার এই দ্বায়িত্ব থেকে সরে আসতে পারিনা। নিম্নে উল্লেখিত প্রতিটা তথ্য হয়ত সকারের কাছে পৌঁছেও গেছে, আমি শুধু আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি বিষয়গুলো এবং কিছু চিন্তা-ভাবনা জানাচ্ছি, ভবিষ্যতে যদি কাজে এসে যায় এই ভেবে।

 

২। আইন শৃঙ্খলা

 

(ক) গত আট মাসে বাংলাদেশের কোথাও কোনো আইন শৃস্খলা ছিল না, মানুষ আশা করেছিল স্বাধিনতার পরে এখানে শান্তি থাকবে, সাধারণ মানুষ সম্পুর্ন সম্মান এবং নিরাপত্তার সাথে সেই স্বাধীনতা ভোগ করবে- যা থেকে তারা শত শত বছর বঞ্চিত হয়েছে।দুর্ভাগ্যবসত ব্যাপারগুলো অন্যরকম হচ্ছিল। মুক্ত এলাকাগুলোতে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে। নাম মাত্র বাহিনী এবং গণবাহিনীর নামে নানা রকম অভিযোগ উঠছে এবং তাদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে তুলনা করা হচ্ছে। বেদনাদায়ক হলেও অভিযোগগুলো সত্যি।

 

(খ) এর পেছনে কারন

(১) কোনো সিভিল বা সামরিক আইনের অনুপস্থিতিই এর প্রধান কারন। যেখানে একজন অপরাধীর যোগ্য শাস্তি হয়না সেখানে মানুষ নিজের উপর আস্থা অনুভব করে যা তাকে সকল খারাপ কাজ করতে উতসাহ দেয়।

 

(২) দ্বিতীয় কারন হচ্ছে, গণবাহিনী এবং নিয়মিত বাহিনীর প্রত্যেকে নিজেদের শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ মনে করত এবং ভাবত তারা তাদের মতানুযায়ি যে কাউকে শাস্তি দেয়ার অধিকার রাখে। একটি সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা যায়, কিছু গেরিলা ৮জন রাজাকারকে হত্যা করেছিল যারা কিনা ২৫০ জন আত্মসমর্পন করা পাকিস্তানি বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তারা মূলক এখন আর ক্ষতিকারক ছিলোনা। আমি এই দলটির খোঁজ করছি। এরকম আরও অনেক অভিযোগ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে।

 

(৩) তৃতীয় কারন হচ্ছে কিছু কর্মকরতারা নিজেরাই নিজেদেরকে বিমুক্ত এলাকার কমান্ডার বলে পরিচয় দিচ্ছে যা একদমই সত্যি না। বাংলাদেশের সকল অফিসার এবং কমান্ডার শুধুমাত্র সামরিক অপারেশনের জন্য নিয়োজিত, আর এডমিন্সট্রেশনের দ্বায়িত্ব জোনাল কাউন্সিলকে দেয়া হয়েছে। যাই হোক, এখানে জোনাল কাউন্সিলের প্রতিটি জোনের জন্য একজন সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা আছে যে কিনা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত এবং বাহিনীর সাথে বন্ধুত্বপুর্ন সম্পর্ক বজায় রাখে। বিভিন্ন অভিযোগ আসছে গণবাহিনী এবং নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা সাধারণ নাগরিকদের ভয় দেখিয়ে খাজনা, গবাদি পশু-পাখি, মুরগি ইত্যাদি নিজেদের খরচ চালানোর জন্য নিচ্ছে। এটা ঘটতে পারত না যদি না যেখানে সঠিক কমান্ডার থাকত এবং আমরা এটা বন্ধ করার একমাত্র উপায় ঠিক পথ খুঁজে বের করতে হবে। জনগণের সামনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যাবস্থাই হবে এর যোগ্য জবাব।

 

(গ) রাজাকারদের প্রায় ৯৫% পরিস্থিতির শিকার হন। একই অবস্থা বাকি রাজনৈতিক দলগুলোতে যোগ দেয়া মানুষগুলোর জন্য প্রজোয্য। রাজাকার, মুসলিম লীগের দোহাই দিয়ে এই নিরীহ মানুষগুলোকে গণবাহিনী এবং নিয়মিত বাহিনীর মেরে ফেলছে। এমনকি তাদেরকেও যারা পাক-বাহিনীকে সাহায্য করেছে অথচ তারা কেউ জানে না কতটা জোরপুর্বক এই কাজ তাদের করতে হয়েছে। আমি একটি কাহিনি জানি যেখানে ১৬ বছরের একজন বালিকাকে ধর্ষন করা হয় এবং তাকে তার ছোট বোন আর বাবকে জিম্মি রেখে ভারত পাঠানো হয় তথ্য সংগ্রহের জন্য। বাংলাদেশে বসবাসরত মানুষের জীবনের এটাই কঠিন বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা কি একজন বাঙ্গালীকে সঠিক বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই খুন করতে পারি? আমরা কি পারি জাতির জন্য আনা স্বাধিনতাকে অস্বীকার করতে ?যদি তা নাই হয়, তবে আমাদের নিজেদের বিবেককে খুজে বের করা উচিৎ এবং যারা পরিস্থিতির স্বীকার তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া বন্ধ করা উচিৎ। এটা অবশ্যই সত্যি যে কিছু সত্যিকার অপরাধী আছে, কিন্তু তা সবাই নয়। যদি আমরা আইন-শৃঙ্খলা , শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাই এবং আমরা আমাদের সম্মান প্রদর্শন করতে চান তাহলে আমাদের নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিৎ।  অন্যথায় বাংলাদেশ শুধুমাত্র ভৈগোলিক ভাবেই স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিচিত হবে কিন্তু তার মাঝে আদিম বর্বরতা থেকেই যাবে।

 

ঘ) পরামর্শ-

(১) পুলিশ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা। তাদের যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হবে। তাদের পোষাক , অস্ত্র এবং ক্ষমতা অবিলম্বে নির্ধারণ করতে হবে।

 

(২)সরকারকে ঘোষনা দিতে হবে যে, সেক্টার কমান্ডার এবং সিভিল এডভাইসার এর নির্দেশ ছাড়া অন্য যে কোনো বাঙ্গালীকে হত্যা করা যাবে না। তার মানে এই না যে একজন ব্যাক্তি বাংলাদেশের বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করবে। কিন্তু যদি যুদ্ধবন্দী হিসেবে কাউকে এমন পাওয়া যায় তবে তাকে তার সঠিক ও আইনি বিচারের জন্য সঠিক জায়গায় পাঠানো উচিৎ। যে এই আদেশ লঙ্ঘন করবে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। এই ঘোষণাটি শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য নয় বরং পরবর্তি সময়ের জন্যও প্রযোজ্য।

 

(৩) মুক্ত এলাকায় অবস্থানরত গণ বাহিনীর সকল সদস্যদের রেডিও এর মাধ্যমে জানাতে হবে  তারা যেন দ্রুত নিকটবর্তি পুলিশ স্টেশনে / ম্যাজিস্ট্রেট / আর্মি হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট করে। এইসকল স্থানে তাদের গোলাবারুদ জমা রাখার কথা জানানো হয়দেয় এবং নিজ পরিবারকে এবং পারিবারিক বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেয়ার আহ্বান করতে হবে।

 

(৩) সকল উইপেন্স, গোলাবারুদ এবং সরঞ্জাম পূর্নুদ্ধার করতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি এছাড়াও অবিলম্বে দরকার

মনোযোগ। গণ বাহিনীর অনেক সদস্যের কার্যক্রম থেকে এটা আন্দাজ করা যায় যে তারা তাদের বন্দুক আড়াল করার চেষ্টা করবে এবং অপরাধীদের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টা করবে। এই অশান্তি সৃষ্টি করতে বাধ্য করবে  এবং একটি গৃহযুদ্ধের দিকে পরিস্থিতিকে এগিয়ে নেয়া হবে। অস্ত্র আদায় দৃঢ়তার সঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে। একটি বিশেষ অপারেশনের মাধ্যমে সকল অস্ত্র / গোলাবারুদ পুনরুদ্ধার করার ব্যবস্থা নিতে হবে বলে । এই সম্মানার্থে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা অভিষিক্ত সকল কর্তৃপক্ষ কে গেরিলাদের খবর, অস্ত্র/ গোলাবারুদ ইত্যাদির খবর রাখার কথা জানাতে হবে। থানা ভিত্তিক বিস্তারিত জ্ঞ্যান রাখতে হবে যাতে পরে দ্রুত পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব দেয়া যায়। এই তথ্যের বিস্তারিত বিবরণ এর বেশ কিছু কপি নিজেরদের কাছে রাখতে হবে।

 

(৪) রেডিও বাংলাদেশের উচিৎ বাংলাদেশের মানুষের কাছে নিম্নলিখিত নির্দেশ জারী করা ঃ

ক. মুক্ত এলাকার সব সেতু, ইনস্টলেশন ও যোগাযোগ লাইনগুলো কড়া পাহারা দেওয়া।

খ . সেনাবাহিনী থেকে ক্লিয়ারেন্স পাওয়া ছাড়া কোনও বাংকারস ইত্যাদি যেন ঢুকতে না পারে

গ . নাগরিক ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের নির্দেশ দিতে হবে

ঘ . কোন অননুমোদিত ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীর কাউকে ট্যাক্স ইত্যাদি না দেয়া। সব অভিযোগ  বেসামরিক প্রশাসনের নিকট করতে হবে এবং সকল ট্যাক্স তাদের দিতে হবে।

ই . নিজ নিজ এলাকায় গ্রামের অবস্থা এবং রাস্তা ও যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নয়নে ভলান্টারী কাজ করতে হবে।

চ . কাছের পুলিশ স্টেশনে সব অপরাধী ও সক্রিয় সহযোগীদের তুলে দিতে হবে।

 

ছ . কোন অদ্ভুত বস্তু স্পর্শ  করা যাবে না।. এমন বস্তু দেখলে তার কাছে একটি লাল পতাকা দিয়ে রাখা উচিৎ এবং দেরী না করে এই ধরনের বস্তু সম্পর্কে পুলিশ বা সেনাবাহিনী অবহিত করতে হবে।

 

  1. বিমুক্ত এলাকায় ধ্বংস ছাড়া আর কেউ কিছুই দেখা যায়না। নিম্নলিখিত পরিকল্পনা অপরিহার্য ঃ

(ক) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

                (১) আবাসন .

                (২)আসবাবপত্র . 

(৩) সকল উপকরণ . 

(৪) স্টেশনারী

(৫) বই : বাংলাদেশের  ইতিহাসের উপর বিশেষভাবে পুনর্লিখিত করা বই। সব শ্রেণীর জন্য এটি  নির্ধারিত হবে। নিম্নলিখিত ব্যাপারে  বিশেষ জোর দেওয়া হবেঃ

(ক) একটি জাতি হিসেবে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব

(খ) পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং পৃথিবীর বুকে আমাদের নিজের নামে আলাদা ভুখণ্ডের পরিচয়

(গ) সকল অনাত্মীয় দেশের প্রতি আমাদের মনোভাব

 

(খ) স্বাস্থ্য 

(১) হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা  .

                (২) ওষুধ ও অপারেশনের সকল সরঞ্জাম

                (৩) মহামারী প্রতিরোধ . 

(৪) নলকুপ ইত্যাদি

 

(গ)  ত্রাণ ও পুনর্বাসন 

(১) বর্তমান ফসল সম্পর্কে জানা এবং পরিকল্পনা পর্যালোচনার মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ এড়ানো।  

(২) দৈনিক সরবরাহ নিত্যপণ্যের আয়োজন .

(৩) গৃহ নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ . 

(৪) যুদ্ধের সব ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা . 

(৫) এতিমদের পুনর্বাসন . 

(৬) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন .

(৭)তাদের দেখে রাখতে হবে  যারা পরিবারের আয়রত সদস্যদের হারিয়েছেন । এছাড়াও যারা মানসিকভাবে নৃশংসতার কারণে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়েছেন।

(৮)  ভারতে বিভিন্ন লকআপগুলির মধ্যে এখন যেসব বাঙ্গালী রয়েছেন তাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে। .

 

৬. যোগাযোগ ইত্যাদি 

ক. রাস্তা এবং রেললাইন তৈরি এবং মেরামত

খ. সরকারি কাজের জন্য বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে প্রয়োজনে যে কোনো সময় ব্যবহার করা যায়। এটার জন্য বিস্তারিত পরিকল্পানার দরকার

        গ. বিমানঘাঁটি এবং পোর্ট

        ঘ টেলিকমিউনিকেশনঃ এটার জন্য সময় লাগতে পারে। কিন্তু আমাদের থানা পর্যায় থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে।

        ই. বিদ্যুৎ : অপচয়ে এটা ধ্বংস হয়ে যাবে। সব গুরুত্বপূর্ণ শহর ও হাসপাতালে  জেনারেটার সরবরাহ করার জন্য পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা নেয়া অপরিহার্য। 

 

৭. এই বিষয়গুলো গুরুত্বপুর্ন। আমি আশা করি এই ব্যাপারগুলো মনোযোগের সাথে দেখা হবে কেনোনা এগুলি আইন শৃঙ্খলার সাথে সম্পৃক্ত।

                              স্বাঃ / -দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত

মেজর, কমান্ডার সেক্টর ১

( এম রফিকুল ইসলাম)

(গোপনীয়)