মুক্তিযুদ্ধ কোন পথে

Posted on Posted in 5

মুক্তিযুদ্ধ কোন পথে

৪ অক্টোবর, ১৯৭১

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ছমাস পূর্তি হয়েছে গত ২৫ শে সেপ্টেম্বর তারিখে। এই ছমাসে মুক্তিযুদ্ধ কতটা এগিয়েছে তার খতিয়ান নিতে গেলে দেখা যাবে আমাদের হতাশ হবার কিছু নেই। বরং বাংলাদেশের বর্ষণমুক্ত শারদ আকাশের মতই বাংলার মুক্তিযুদ্ধও এক সফল ও প্রসন্ন প্রভাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পথ আমাদের দুর্গম। যাত্রাপথও বিপদসঙ্কুল। তবুও এই যাত্রাশেষে স্বাধীনতা ও মুক্তির সোনালী উষা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, এই দৃঢ়বিশ্বাসে আজ আমাদের বুক ভরে উঠছে। গত ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ

মুজিবুর বলেছিলেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, তখন আরো দেব-কিন্তু বাংলাদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।” বঙ্গবন্ধুর ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যে হয়নি। সেই সে মার্চ মাস থেকে রক্তদান শুরু, বাংলার মানুষ এখনো জাতীয় স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য রক্ত দিয়ে চলেছে। কিন্তু এই রক্ত ও প্রাণদান এখন আর একতরফা নয়। বাঙালীর হাতে এখন অস্ত্র। বাংলাদেশের যুবশক্তি এখন মুক্তিবাহিনীতে রূপান্তরিত। তাদের হাতে রোজ খতম হচ্ছে শত শত হানাদার সেনা। তাই গভীর প্রত্যয়ে বুক বেঁধে আজ আমরাও বলতে পারি- “রক্ত দিয়েছি, আরো দেব। ইনশাআল্লাহ গোটা বাংলাদেশকে পাকিস্তানী হানাদারদের কবলমুক্ত হয়ে ছাড়বো।”

গত ছ’মাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তিনটি ফ্রন্টে বিস্তৃত হয়েছে। যুদ্ধ এখন আর একটি ফ্রন্টে সীমাবদ্ধ নয়। এই তিনটি ফ্রন্ট হচ্ছে- এক, রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধ এবং দখলকৃত এলাকায় ক্রমবর্ধমান গেরিলা তৎপরতা। দুই অর্থনৈতিক ফ্রন্টে প্রত্যক্ষ অসহযোগিতা। তিন বিশ্বব্যাপী জনমত সৃষ্টি এবং ইসলামাবাদের জঙ্গী ফ্যাসিষ্ট চক্রের উপর ক্রমাগত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি।

হানাদারদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধের সাফল্যের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় সেপ্টেম্বর মাসের শেষ তিনদিনের যুদ্ধের কথা। এই তিনদিনের যুদ্ধে ১১৯ জন খানসেনা নিহত হয়েছে। ঢাকা শহরের অদূরে ইছামতী নদীতে হয়েছে আরো চমকপ্রদ যুদ্ধ। কয়েকটি লঞ্চযোগে সশস্ত্র হানাদার সৈন্যকে যখন নদী অতিক্রমের চেষ্টা করছিল, তখন নদীর উভয় তীর থেকে মুক্তিবাহিনী মেশিনগানের সাহায্যে আক্রমণ চালায়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় দলে দলে গ্রামবাসী। ফলে বহু হানাদার সৈন্য নিহত হয়। পাঁচজন আহত সৈন্যকে গ্রামবাসী পিটিয়ে মেরে ফেলে। অবশিষ্ট লঞ্চগুলো দ্রুত পলায়ন করে। পদ্মা ও ইছমতী নদীতে এ পর্যন্ত হানাদার সৈন্য বোঝাই একুশটি লঞ্চ ও অন্যান্য যান হয় ধ্বংস, নয় ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ঢাকা শহরের অভ্যন্তরীণ অবস্থাও হানাদার সৈন্যদের জন্য খুব ভীতিপ্রদ। শহরের প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার বাঁশ ও লোহার ডাণ্ডা দিয়ে রোড ব্লক করে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। রাতে গেরিলাদের চলাচলে বাধা দেয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা। কিন্তু রাতে গেরিলারা যখন সত্য সত্যই অপারেশনে বের হন, তখন তাদের ভয়ে বীরপুঙ্গব খানসেনারা আর ঢাকার রাস্তায় থাকেন না। তারা ব্যারাকে গিয়ে আশ্রয় নেন। অবাঙালী রাজাকারদের বাধ্য করা হয় এই রোডব্লক পাহারা দিতে।

এটা গেল সম্মুখযুদ্ধ ও গেরিলা তৎপরতার কথা। এবার অর্থনৈতিক ফ্রন্টের যুদ্ধের খবর শুনুন। বাংলাদেশে কোন বাঙালী পশ্চিম পাকিস্তানী পণ্য কিনছে না। ফলে হাহাকার উঠেছে বাইশ পরিবার ও অবাঙালী ব্যবসায়ী মহলে। বাংলার চাষী পাট বুনছে না, ধান বুনছে- ফলে কারখানায় বাঙালী মজুর উৎপাদন চালাচ্ছে না। ফলে কি দাঁড়িয়েছে, তারই একটা হিসাব দিয়েছেন ইকোনমিক টাইমস’ পত্রিকার রিসার্চ ব্যুরো। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “পাকিস্তানের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়তে যাচ্ছে। শিল্পোৎপাদন, কৃষি উৎপাদন, বৈদেশিক মুদ্রা ও বিদেশী মুদ্রা আয়ের পথ ক্রমশ সঙ্কীর্ণ হওয়ায় পাকিস্তান এক দারুণ অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে। বাংলাদেশ থেকে পাট রপ্তানি শতকরা ৮০ ভাগ কমে গেছে। পাকিস্তানের সমগ্র বিদেশী মুদ্রার শতকরা পয়তাল্লিশ ভাগই আসে বাংলাদেশের পাট রপ্তানি করে। এছাড়া আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যে ২৫০ কোটি টাকারও বেশী ক্ষতি হয়েছে। একদিকে এইভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতি অন্যদিকে বাংলাদেশে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ইয়াহিয়ার ফ্যাসিষ্টচক্রের মাসে খরচ হচ্ছে পয়তাল্লিশ কোটি টাকা। ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে যেখানে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিলে ছিল ২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার, ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারে। গত দু’মাসে এই তহবিল আরো শূন্য হয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানির আণ্ডারইনভয়েসিং ও আমদানীর ওভার-ইনভয়েসিং এর দরুণ বিদেশে পাকিস্তানের মূলধন দেদার চলে যাচ্ছে। বৃটেন ও ফ্রান্স পাকিস্তানে রপ্তানি সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। ওদিকে আবার খবর প্রচারিত হচ্ছে, বিশ্বব্যাঙ্ক কনসরটিয়াম ইয়াহিয়া চক্রকে আবারো জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত, তাদের কোন সাহায্য দেয়া সম্ভব নয়।

বিশ্বে জনমত সৃষ্টি ও রাজনৈতিক চাপের ক্ষেত্রে ইয়াহিয়া-চক্রের অবস্থা আরো খারাপ। ভারত ও সোভিয়েট ইউনিয়নের যুক্ত ইস্তাহারে এই প্রথমবারের মত ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটি বাতিল করা হয়েছে এবং পূর্ব বাংলার মানুষের অনপহরণীয় অধিকার রক্ষার দৃঢ়সংকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। সোভিয়েট ইউনিয়নের বিশ্ব শান্তি কমিটি, ট্রেড ইউনিয়ন, আফ্রো-এশীয় কমিটি, সাংবাদিক সমিতি একবাক্যে বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট জঙ্গীচক্রের বর্বরতার নিন্দা করেছেন এবং বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবিলম্বে মুক্তি দাবী করেছেন ‘প্রাভদা ও ইজভেস্তিয়া পত্রিকায় বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নারকীয় বর্বরতার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে। আরব রাজ্য কাতারের প্রধান শাসক বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের প্রধানত্রীর কাছে এক তারবার্তায় তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরূপে উল্লেখ করে কার্যতঃ বাংলাদেশের সরকারকে স্বীকার করে নিয়েছে। সিংহলের ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী পার্লামেন্ট সদস্য মিঃ গুণবর্ধন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তিদাবীতে সিংহলের পার্লামেন্ট সদস্যদের মধ্যে সই সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে। এছাড়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ককালে ভারত বাংলাদেশ সমস্যার যে রাজনৈতিক সমাধান দাবী করেছে, তার প্রতি সোভিয়েট ইউনিয়ন, ফ্রান্স, সুইডেন, ইকুয়েডর ও নরওয়ে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে। উগাণ্ডা, জাম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, নেদারল্যান্ডস এবং চিলিও বাংলাদেশ সমস্যার দ্রুত সমাধান দাবী করেছে।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রাক্তন অধিনায়ক এয়ার মার্শাল আসগর খান আবার মুখ খুলেছেন। তিনি বলেছেন, ঢাকায় নতুন মীরজাফর ডাঃ মালিক ওরফে মল্লিকের নেতৃত্বে যে অসামরিক সরকার বসানো হয়েছে, জনপ্রতিনিধিত্বের কোন যোগ্যতা তাদের নেই। কয়েকজন অখ্যাত ও অপরিচিত লোক নিয়ে এই তাঁবেদার সরকার গঠনর করা হয়েছে। করাচী, পেশোয়ার, তুরঘামের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার পড়েছে জঙ্গশাহী নিপাত যাক। লাহোরের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে। ফলে ইয়াহিয়া-চক্র বেসামাল হয়ে পড়েছেন। চারদিকের অবস্থা দেখে আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস, এদের ভরাডুবির আর দেরী নেই। তাই সাহসে বুক বেঁধে আজ আমরা বলতে পারি –

পূর্ব দিগন্তে রক্ত সূর্য শিশু রোদের জন্ম দিচ্ছে

মেঘনা, পাদ্মা, তিস্তা, কীর্তনখোলা তার প্রতিভাস

আমরা মুক্তি সৈনিক, আমাদের জয় অনিবার্য,

আমাদের হাতের মুঠোয় স্বাধীনতা ও মুক্তির পতাকা।

(আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত)