ময়নামতি ক্যান্টমেন্ট পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞের উপর দুটি প্রতিবেদন

Posted on Posted in 8

১০। ময়নামতি ক্যান্টমেন্টে পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞের উপর দুটি প্রতিবেদন (৩৬৬-৩৭২)

সূত্র – দৈনিক বাংলা, ২১ জানুয়ারি ও ৩ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭২

ময়নামতি ক্যান্টমেন্টে ধীরেন দত্ত ও লেঃ কর্নেল জাহাঙ্গীরসহ শত শত বাংগালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়
সাখাওয়াত আলী খান প্রদত্ত

 

২৫শে মার্চের কালোরাতে জল্লাদ ইয়াহিয়ার দখলদার বাহিনী বাংলাদেশের জনগনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে কি ঘটেছিল? উল্লেখযোগ্য যে হানাদার বাহিনী যে সমস্ত ক্যান্টনমেন্টে সবচেয়ে বেশী হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, ময়নামতি তাঁর মধ্যে অন্যতম। ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে যে সমস্ত বাঙালি সামরিক অফিসার ও জওয়ান আটকা পড়েছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রায় কেউই বেরিয়ে আসতে পারেননি।

বাঙালি সামরিক অফিসারদের পত্নীরা কেউ কেউ বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন, কিন্তু তারাও বন্দী অবস্থায় থাকায় প্রকৃত ঘটনার কথা বেশী জানতে পারেননি। কাজেই অনেক ক্ষেত্রেই ময়নামতির মত কাব্যিক নামের একটা স্থানের নরপিশাচরা যে নারকীয় হত্যালীলা চালিয়েছিল, তার প্রত্যক্ষদর্শী ১ জনার কাছ থেকে আমরা সেখানকার ঘটনার বিবরণ পেয়েছি।

এ দুজনের মধ্যে একজন হচ্ছেন, সাবেক পাকিস্তানী গোলন্দাজ বাহিনীর সেকেণ্ড লেফটেন্যান্ট ইমামুজ্জামান এবং অপর জন হচ্ছেন ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের বেসামরিক কর্মচারী শ্রী রমনীমোহন শীল।

শ্রী রমনীমোহন শীল ক্যান্টনমেন্টে ক্ষৌর কর্ম করতেন। প্রথমোক্ত লেফটেন্যান্ট ইমাম বেঁচেছেন সম্পূর্ণ অলৌকিকভাবে। তিনি জানিয়েছেন যে, তার বেঁচে থাকার এবং মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণের কথা তার বাবা যেন এখনো বিশ্বাস করতে চান না।

২৯শে মার্চ লেফটেন্যান্ট ইমামুজ্জামানকে হানাদার বাহিনীর লোকেরা গ্রেফতার করে নিয়ে আরো ১ জন সামরিক অফিসারের সংগে একটি ঘরে বন্দী করে রেখেছিলো।

৩০ শে মার্চ বিকাল চারটার সময় একজন হানাদার সৈন্য ঘরে ঢুকে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয় অস্ত্রের সাহায্যে এই তিনজন অফিসারের উপর গুলি চালায়। লেফটেন্যান্ট ইমামুজ্জামানের সংগী অপর ২জন অফিসার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ হারান। লেফটেন্যান্ট এর পায়েও গুলি লাগে এবং তিনি মনে করেন যে, তার মৃত্যুও হতে যাচ্ছে। গুলি করে সৈন্যটি বেরিয়ে যাওয়ার পর সেখানে একজন সামরিক হত্যালীলা তদারক করতে আসে।

এ সময় ইমামুজ্জামান মরার ভান করে পড়ে থাকেন। অফিসারটি তাদের দেখতে এসে বলে “ঠিক হ্যায় বাংগালী সব খতম হো গিয়া।“ এরপর পৃথিবীর বুকে নেমে আসে ঘন কালোরাত্রি। লেফটেন্যান্ট ইমাম ও অন্যান্যরা যে ঘরে ছিলেন তার বাইরে সেন্ট্রি পাহারা দিতে থাকে। ইমাম এসময় দেখেন যে, তিনি নড়াচড়া করতে পারছেন। হাতের কব্জী চোখের পাশে এবং কাঁধে গুলি লাগলেও কি আশ্চর্য ইমাম উঠে দাঁড়ালেন। বিস্ময়াভিভুত ইমাম দেখলেন শুধু উঠে দাঁড়ানোই নয়, তিনি হাঁটতেও পারছেন। মুহূর্তে সংকল্প ঠিক করলেন ইমাম যিনি কাকুলের সামরিক একাডেমিতে পাঞ্জাবী ইন্সপেক্টরদের বাঙালি দাবিয়ে রাখার চেষ্টা সত্ত্বেও তার ব্যাচে ৪র্থ স্থান লাভ করে কমিশন পেয়েছিলেন।

তিনি ঠিক করলেন পালাতে হবে, বেরিয়ে যেতে হবে, এই নরক পুরী থেকে। ধীরে ধীরে এগিয়ে মৃত সহকর্মীদের দিকে আরেকবার তাকিয়ে ইমাম পিছনের জানালার কাছে গেলেন। টুক করে জানালা খোলার শব্দ হলো, বাইরে সচকিত হয়ে গেল প্রহরী। মুহূর্ত বিলম্ব না করে বাইরে লাফ দিলেন তিনি। ধপ করে আওয়াজ হওয়ায় লাশ প্রহরারত প্রহরী ভাবল ভূত দেখছে, চিৎকার করে উঠল সে। ইমাম গায়ের শক্তি দিয়ে দৌড় দিলেন, চললেন অন্ধকারে।

এর মধ্যে গুলি হতে থাকল কিন্তু ভাগ্য ভালো ইমামের, একটা গুলিও তার গায়ে লাগেনি। কখনো দৌড়ে, কখনো হেঁটে, কখনো ক্রল করে ইমাম বেরিয়ে এলেন অন্ধকার মৃত্যুপুরী থেকে। সকালের আলোয় তিনি দেখলেন এক বুক সহানুভূতি নিয়ে তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গ্রামবাংলার অনেক মানুষ। যেন মায়ের কোলে ফিরলেন আহত ইমাম। তিনি যত্ন পেলেন, পেলেন সেবা। সীমান্ত পেরিয়ে চলে গেলেন আরো অনেক অনেক মুক্তিযোদ্ধার সংগে যোগ দিতে।

ইমাম আমাকে জানালেন, বন্দী অবস্থায় তিনি ঘরের জানালা নিয়ে বাঙালীদের গুলি করে হত্যা করতে দেখেছেন। এক জায়গায় বাঙালি ছেলেরা ভলিবল খেলছিল, তিনি দেখলেন হঠাৎ একটি হানাদার সেখানে গিয়ে গুলি চালিয়ে সবাইকে ধরাশায়ী করল। তারপর শুরু হলো প্রচণ্ড গোলাগুলি। ইমাম তার সংগীদের আর্তচীৎকার শুনেছেন এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে মরতে দেখেছেন।

তিনি বললেন আসলে শয়তান হচ্ছে গোলন্দাজ বাহিনীর লেঃ কর্নেল ইয়াকুব মালিক। ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে হত্যাযজ্ঞ সেই সংঘটিত করেছিল। মূলতঃ তার নির্দেশেই চলে এই হত্যাযজ্ঞ। এছাড়া মেজর সুলতান, ক্যাপ্টন জাহিদ জামান, মেজর মোহাম্মদ ইয়াসিন খোকার ( এই পশু নিজ হাতে গুলি করে মেজর আনোয়ারুল ইসলাম, লেফটেন্যান্ট সালাহউদ্দিন এবং সেকেণ্ড লেফটেন্যান্ট আতিকুর রহমান সিরাজীসহ আরো অনেককে হত্যা করেছে)।

ক্যাপ্টেন ইকতেখার হায়দার (এই অফিসারের নেতৃত্বে কুমিল্লা পুলিশ লাইনে হামলা চালানো হয়)।

লেঃ কর্ণেল মালিকের নেতৃত্বে ২৯ শে মার্চ কুমিল্লা শহরে গোলা বর্ষণ শুরু করা হয়। ক্যাপ্টেন আগাবোখারি ও সুবেদার মেজর সুলতান এবং আরো অনেক হানাদার নরপিশাচ নারকীয় উল্লাসে মেতে নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালায় বলে ইমাম জানান।

সুবেদার মেজর ফয়েজ সুলতান সম্পর্কে লেফটেন্যান্ট ইমাম বলেন যে, এই নরপশু ক্যাপ্টেন নুরুল ইসলামসহ বহুলোককে হত্যা করেছে। পাগলা কুকুরের মত এই নরখাদক ক্যান্টনমেন্টে যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতো এবং বাঙালি দেখলেই গুলি করে হত্যা করতো।

ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে যে সমস্ত শহীদ বাঙালি সামরিক অফিসারদের কথা বললেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন, লেঃ কর্ণেল জাহাঙ্গীর, লেঃ কর্ণেল আনোয়ারুল ইসলাম, মেজর খালেক, মেজর শহিদুজ্জামান, ক্যাপ্টেন হুদা , ক্যাপ্টেন বদরুল আলম, লেফটেন্যান্ট ফারুক, লেফটেন্যান্ট এনামুল হক, লেফটেন্যান্ট তুর্কে ( ডাকনাম), ক্যাপ্টেন আইয়ুব আলী, লেঃ সালাউদ্দিন, সেকেণ্ড লেঃ হারুনুর রশিদ, ক্যাপ্টেন নুরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন সিদ্দিক প্রমুখ।

 

== প্রত্যক্ষদর্শী রমনী শীলের বিবরণ ==

এরপর আমাদের উল্লেখ করতে হয় নরসুন্দর রমনী শীলের কথা। অত্যাবশ্যকীয় কাজে নিযুক্ত থাকায় সম্ভবতঃ হানাদারেরা অন্যান্যদের সঙ্গে বন্দী করে নিয়ে গিয়েও একে হত্যা করেনি নিজেদেরই স্বার্থে।

হয়ত তারা ভেবেছিল পরে সুযোগ বুঝে এদের হত্যা করা যাবে। ক্ষৌর কর্মের মত অত্যাবশ্যকীয় কাজে নিযুক্ত থাকার জন্য বর্বর পশুরা তাকে বাচিয়ে রেখেছিল, কিন্তু সে সময় হয়তো তারা বুঝতে পারেনি, দেবপুর রমনশীলের চোখ আছে, অনুভূতি আছে। নরপিশাচদের এই ভুলের জন্য হয়তো রমনী শীল আজো বেঁচে আছেন, বিশ্বের ইতিহাসে কলঙ্কজনক নরহত্যার একটি জীবন্ত দলিল হিসাবে। কুমিল্লায় সামসুন নাহার রাবরী শ্রী রমনী শীলের সাক্ষাৎকার গ্রহতণ করেছিলেন, আমরা তার বিবরণ পেয়েছি।

রমনী জানিয়েছেন, কিভাবে বাংলার কৃতি সন্তান স্বনাম ধন্য- শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে হানাদারেরা অত্যাচারের জর্জরিত করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। তিনি জানিয়েছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তিনি গুলি করে হত্যা করতে দেখেছেন।

ধীরেন বাবু সম্পর্কে বলতে গিয়ে রমনী শীলের চোখের জল বাঁধ মানেনি । মাফলারে তিনি চোখ মুছে বললেন আমার সে পাপের ক্ষমা নেই। বাবু স্কুল ঘরের বারান্দায় অতি কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় প্রস্রাব করবেন আমি আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় তাঁকে প্রসাবের জায়গা দেখিয়ে দেই। তখন তিনি অতি কষ্টে আস্তে আস্তে একটি পা ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠানে নামেন। তখন আমি ঐ বারান্দায় বসে এক জল্লাদের দাড়ি কাটছিলাম।

আমি বার বার বাবুর দিকে অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলাম বলে জল্লাদ উর্দুতে বলে, এটা একটা দেখার জিনিস নয় নিজের কাজ কর।

এরপর আর বাবুর দিকে তাকাবার সাহস পাইনি। মনে মনে শুধু ভেবেছি বাবু জনগণের নেতা ছিলেন, আর আজ তার কপালে এই দুর্ভোগ। তাঁর ক্ষতবিক্ষত সমস্ত দেহে তুলা লাগান, মাথায় ব্যাণ্ডেজ, চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় উপর্যুপরি কয়দিনই ব্রিগেড অফিসে আনতে নিতে দেখি।

রমনী শীলের জবান বন্দীতে ময়নামতির মর্মান্তিক কাহিনীর আরো কিছু অংশ এখানে তুলে দিচ্ছিঃ
২৯ শে মার্চে ক্যান্টনমেন্ট

গত মার্চের ২৯ তারিখে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি অফিসার বেসামরিক কর্মচারীসহ প্রায় তিনশত ব্যক্তিকে ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারের তিনটি কামরায় আটক করে রাখে। বিকাল অনুমানিক সাড়ে তিনটায় ৪০ নং ফিল্ড এম্বুলেন্স ইউনিটে কিছু গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। তারপর পরই আমরা দেখতে পাই ক্যান্টনমেন্টের বিভিন্ন এলাকা থেকে সমস্ত বাঙালী অফিসার ও অন্যান্য কর্মচারীকে ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারে নিয়ে জমা করতে থাকে। এবং এই সঙ্গে আমাকেও আমার সরকারী বাসগৃহ থেকে ধরে নিয়ে আসে।“

তিনি বলেন, “বেসামরিক, সামরিক বিভাগের সাধারণ ব্যক্তিদেরকে আটক করা হয়। ৪০ নং এম্বুলেন্স এর ফিল্ড কমান্ডিং অফিসার লেঃ কর্ণেল জাহাংগীরসহ অন্যান্য অফিসারদের এনে আমাদের সঙ্গে আটক করে। পরের দিন দুপুরে প্রাশসনিক জে সি ও সুবেদার আকবর খান, লেঃ কর্ণেল জাহাংগির এর গায়ের জামা খুলে তা দিয়ে তার চোখ বেঁধে ফেলে। তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো।

তার উত্তরে উক্ত জল্লাদদ্বয় তাঁকে ইস্পাহানী স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে বলে জানায়। তারপর তাঁকে ব্রিগেড অফিস প্রাঙ্গণে আনুমানিক ২৫ গজ দক্ষিণে একটি গর্তের পাশে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। তাঁকে এইভাবে গুলি করে হত্যার দৃশ্য আমরা সকল বন্দী ও ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারের ব্রিগেডিয়ার থেকে সকল স্টাফ অফিসার নিজ নিজ কক্ষে বসে অবলোকন করি।

এর পরপরই ১ লা এপ্রিলে অবসর প্রাপ্ত সিলেটের অধিবাসী মেজর হাসিব ( এস এস ও ) এবং শিক্ষা বিভাগের ক্যাপ্টেন মকবুলকে নিয়ে একইভাবে পরপর গুলি করে হত্যা করা হয়। ইত্যবসরে ক্যান্টনমেন্টে মুজাহিদ বাহিনীর অফিসার ক্যাপ্টেন মন্তাজ এসে উক্ত জল্লাদদ্বয়কে শাসিয়ে বলে যে, একজন একজন করে এভাবে হত্যা করলে সময়ে কুলোবে না, কারণ তিনশত এর মত বাঙ্গালিকে হত্যা করতে হবে। ক্যাপ্টেনের ধমক খেয়ে এর পর প্রতি চারজন অফিসারকে এক একটি দড়িতে বেঁধে নিয়ে একই জায়গায় হত্যা করতে থাকে। পরে অন্যান্য সকলকে এক একটি দড়িতে (১৪জনকে) বেঁধে নিয়ে হত্যা করে।

এর মধ্যে কর্ণেল জাহাংগীর, ইয়াকুব আলী, মেজর হাসিব, লেঃ বাতেন, ইঞ্জিনিয়ার্সের একজন ক্যাপ্টেন, ব্রিগেডিয়ারের সহকারী কেরানী, নায়েব সুবেদারসহ ২৫জন কেরানীকে আমি চিনতে পারি। এভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর ১২ জন বেসামরিক লোক থেকে যায়। সন্ধ্যার ঠিক পরপরই একটি পাঞ্জাবী নায়েক আমাদের ঘরের পিছনের জানালা দিয়ে চুপি চুপি ডেকে আমাকে বলে যে, “তুমি ঘাবড়িওনা তোমায় কিছু করা হবে না ব্রিগেডিয়ার সাহেব বলেছেন।“ এ পর্যন্ত বলে রমনী শীল জীবন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার সেই স্মৃতিচারণ করেন। এর মধ্যে নায়েকটি পুনরায় অভয় দিয়ে যায়।

রমনী শীল জানান তার সঙ্গে যে ১২ জন বেসামরিক লোক ছিল তারা হচ্ছেন ইস্পাহানী হাই স্কুলের সহকারী অধ্যক্ষের দুই পুত্র, রমনীসহ চারজন নরসুন্দর ও ছয়জন ঝাড়ুদার। সেই কালো রাত্রি কিভাবে তারা কাটিয়েছে তার বর্ণনা দেওয়া তখন তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

একদিন ভোরে মুজাহিদ বাহিনীর সেই জল্লাদ ক্যাপ্টেন মন্তাজ এসে এই বন্দী ১২ জনের সবাইকে ব্রিগেডের কর্মচারী বলে ছেঁড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়, এবং নিজ নিজ কাজে যোগ দেওয়ার জন্য হুকুম দেয়। সে সময় সহকারী অধ্যক্ষের দুই ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যখন জানতে পারে যে, তারা ব্রিগেডের কর্মচারী নন, ঠিক তখনই তাদেরকে ঐ গর্তের পার্শ্বে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। রমনী শীল জানান যে সারাদিন চোখের সামনে শত শত বাঙালি হত্যার দৃশ্য দেখা এবং সেই সঙ্গে কালো রাত্রিটি অতিবাহিত করা যতটা অসহনীয় ছিল তার চাইতেও কঠিন ও দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ালো যখন তাঁকে ঐ সময়ই উপস্থিত জল্লাদদের দাড়ি কাটার নির্দেশ দেওয়া হলো।

অশ্রুসিক্ত রমনী শীল আরো জানান যে, তিনি শুধু বিগ্রেড হেডকোয়ার্টারের লোকজন হত্যা করতে দেখেননি, ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের লোকজনকে হত্যা করতে দেখননি, ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের বিপরীত দিকে ২৪ নং এফ, এফ, রেজিমেন্টের গার্ডে ক্যান্টনমেন্টের বিভিন্ন ইউনিট হতে জমাকৃত কয়েকশত বাংগালীকে ফতেহ মোহাম্মদ ষ্টেডিয়ামের দক্ষিণ প্রান্তে গুলি করে হত্যা করতে দেখেছেন।

এই কাহিনী বলতে গিয়ে রমনী শীল কখনো হু হু করে কেঁদে ফেলেছেন, কখনো এমন ভাব দেখিয়েছেন যেন এটা একটা মামুলী ব্যবপার , আবার কখনো চুপচাপ “থ” হয়ে গেছেন।

তিনি গভীর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেন “ বোধ হয় এসব দেখার জন্যই আমি শত শত মৃত্যুর মাঝেও বেঁচে ছিলাম এবং এখনও আছি। আমার বাসা ও ব্রিগেড কোয়ার্টারেরর মাঝামাঝি জায়গাতেই লেঃ কর্ণেল জাহাংগীরসহ ২৪ জন অফিসার ও শতাধিক অন্যান্য বাঙালিকে একটি গর্তে মাটিচাপা দিতে দেখি। ওই সব লোককে মাটিচাপা সেওয়ার সময় গর্তের পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে কয়েকজন নরখাদকের ক্ষৌর কর্ম করতে হয়।

সেখান থেকে দেখতে পাই ফতেহ মোহাম্মহ ষ্টেডিয়ামের দক্ষিণ পাশের গর্তে নিক্ষিপ্ত কয়েকশত মৃত দেহের উপর পেট্রোল দিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। পরে বুলডোজারের সাহায্যে গর্তে মাটিচাপা দেওয়া হয়। রমনী শীল বলেন, সে সব মৃত দেহের কংকাল আমি এখনো মাটি খুঁড়ে তুলে দিতে পারব। আড়াই দিন অনাহারে থাকার পর রমনী শীল তার বাসায় পৌঁছার সময় দেখতে পান একটি বৃহদাকার ট্রাক ভর্তি মৃতদেহ ( সম্ভবতঃ কুমিল্লা শহর থেকে আনা) সেই ফতেহ মোহাম্মদ ষ্টেটিডিয়ামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ট্রাকটি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় সমস্ত রাস্তাটি রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। গত এপ্রিল মাস থেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ এফ, আই ও-তে কাজ করার সময় তিনি যে দৃশ্য দেখেছেন তার বর্ণনা প্রসংগে রমনী শীল বলেন, এফ আইওর অত্যাচার থেকে ব্রিগেড অফিসের সামনের হত্যাকাণ্ড অনেক ভালো ছিল। মেজর সেলিমের এফ আইও ইউনিটে যাদেরকে একবার নেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে খুব কম লোকই ফিরে এসেছে।

গত আগষ্ট মাসে রমনী শীল সি এম এইচ –এ বদলী হন। সেখানে তার বাস গৃহের পাশেই হানাদার সৈন্যদের লাশ কবর দেয়া হত। এই সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে রমনী শীল উৎসাহব্যঞ্জক কণ্ঠে বলেন, সারাদিন কাজ করেছি আর সন্ধ্যায় ঘরে বসে পাক হানাদারদের কবরের সংখ্যা গুনেছি। লক্ষ্য করতাম দিন দিন তাদের কবরের সংখ্যা বাড়ছে। রাত্রে এ সমস্ত কবর খনন করা হত। এ দৃশ্য মনে আশার আলো নিয়ে আসত।

মনে মনে ভাবতাম, যে নির্যাতন ও রক্ত ক্ষয় দেখেছি, তা বৃথা যায়নি। প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে। তা নাহলে শত শত পাক সেনা কিভাবে লাশে পরিণত হচ্ছে।

-দৈনিক বাংলা , ২১ জানুয়ারী, ১৯৭২

 

=== শুধু কংকাল আর কংকাল ===

কুমিল্লা, ২৯ শে জানুয়ারী। টিক্কা নেয়াজী ফরমান আলীর নরপশুরা ঠাণ্ডা মাথায় বাঙালি নিধনের পৈশাচিকতায় ইহুদী হত্যাযজ্ঞের নায়ক আইকম্যানকেও হার মানিয়েছে। জল্লাদ পাক বাহিনী যে কি নির্মম, কি বর্বর আর পাষণ্ড ছিল তা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের হাজার হাজার বাঙ্গালির কংকাল, সামরিক, বেসামরিক পোশাক, খসে পা মাথার চুল। হাত, পা বাঁধা অবস্থায় বিকৃত লাশ, চোখ বাঁধা অবস্থায় কংকাল নিজ চোখে না দেখলে অনুমান করাও সম্ভব নয়।

ময়নামতী পাহাড়ের গর্তে লুকায়িত ছিল প্রাচীন সভ্যতার অনেক প্রতীক। ইতিহাসের পণ্ডিত ব্যক্তিগণ প্রত্নতাত্ত্বিকের সভ্য জগতের নিকট গর্বের সঙ্গে এ বহু প্রাচীন সভ্যতার দ্বার খুলে আজকের সুসভ্য মানব জাতিকে দেখাচ্ছেন হাজার হাজার বছর আগেও এ অঞ্চলে ছিল সুসভ্য সংস্কৃতিবান একটি জাতি।

কিন্তু এই ময়নামতিতেই হানাদার বাহিনী গত ২৫শে মার্চের পর থেকে যে হিংস্রতা আর বর্বরতার প্রমাণ রেখে গেছে গভীর কম্যাণ্ড পোষ্ট অগভীর মাটির নীচে, গর্তে এবং জঙ্গলের মধ্যে, আজকের মানুষই শুধু নয়, ভবিষ্যতের মানুষও তা দেখে ঘৃণায় আর ভয়ে শিউরে উঠবে।

বস্তুতঃ গোটা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টই ছিল একটি কসাইখানা। কসাই ছিল হানাদার বাহিনী আর তাদের দালালরা। সেখানে তারা খুব করেছে হাজার হাজার বাঙালিকে। সেই বদ্ধভূমিটা আজ একটা কবরস্থান। ময়নামতি ক্যান্টনমেণ্ট এলাকাটা পাহাড়ি অঞ্চল। উঁচু নিচু। কোথাও কিছুটা সমতল ভূমি। ঘন শণ আর কাশ বনে ভরা।

গত শনিবার শ্রী রমনী শীলকে নিয়ে আমি ক্যান্টনমেণ্ট এলাকায় পৌঁছি। ক্যাণ্টিন পেছনে রেখে কয়েক গজ এগুনোর পরই হাতের ডানদিকে আমাকে দুটো কম্যাণ্ড পোষ্টের গর্ত দেখান।

মাটি সরিয়ে সেখানে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্বাক্ষর দেখতে পাই তা যেমন ভয়ঙ্গকর তেমনি মর্মবিদারক। কংকাল। অনেকগুলোর উপরেই সামরিক পোশাক। আর আছে সামরিক টুপি, কোমরের বেল্ট, সামরিক পরিচয়ের প্রতীক। পরে কুমিল্লা পুলিশ সুপার শ্রী চিত্তাবিনোদ দাস জানান, এ গর্তটিতে পে বুক, চেক বই, কলম, হাতের ঘড়ি, চশমা, টুপি ও নষ্ট হয়ে যাওয়া কিছু টাকা পাওয়া গেছে।

উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসাওরদের পরিচয় প্রতীক। রমনী শীল যে এ ক্যাণ্টনমেণ্টে দীর্ঘ বছর ধরে ক্ষৌর কার্যে নিয়োজিত ছিলো, ও মন্সুর আলী যে দীর্ঘ দিন ধরে এখানে জুতা মেরামতের কাজ করতো, উভয়েই এই বাঙালি নিধন পর্বের প্রত্যক্ষদর্শী। লেফটেন্যাণ্ট কর্ণেল জাহাঙ্গীর, কয়েকজন মেজর, আর্মি এডুকেশন কোরের ক্যাপ্টেন মকবুলসহ মোট ২৪ জনের লাশ একটা স্তর প্রথম গর্তে পাওয়া গেছে।

একটি লাশ মহিলার বলে মনে হয়। সারা দুপুর আমি বিস্তীর্ণ প্রান্তর ঘুরে ঘুরে দেখলাম আমার সঙ্গে নর সুন্দর রমনী শীল আর জুতা মেরামত কারী মনসুর। তারা আমাকে শত শত গর্ত দেখালো। কোন কোন গর্ত হয়ে শেয়াল লাশের কিছুটা টেনে বের করেছে। অনেক গর্ত থেকে ভেসে আসছে পূতি গন্ধ। এখানে সেখানে এলোমেলো পড়ে রয়েছে জামা কাপড়, গেঞ্জির টুকরো। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে একটি মাঠ। সেখানে হেলিকপ্টার উঠানামা করে ।

তার দক্ষিণে আরো একটি মাঠ। সেটা কিছুটা নীচু। সমস্তটা জায়গা জুড়ে রয়েছে গর্তের পর গর্ত। প্রতিটা গর্তেই অসংখ্য কঙ্কাল। আর মাঠটায় ছড়িয়ে রয়েছে শত শত অসহায় বাঙ্গালীর হার আর মাথার খুলি। কোথাও পড়ে রয়েছে খসে পড়া মাথার চুল। পূর্বদিকে বিরাট বিরাট তিনটি ডোবা দেখালো আমাকে রমনী শীল। দেখলেই বোঝা যায় সেখানে মাটি কেটে আবার চাপা দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের লাশ এখানে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে বলে তারা আমাকে জানালো।

জেলা প্রশাশন ও পুলিশের তরফ হতে এ পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি গর্ত খোঁড়া হয়েছে। সবগুলো খুঁড়তে সময় লাগবে। নরসুন্দর রমনী শীল ৩৫/৪০ বছর বয়দের ছোটখাটো মানুষটা আর মনসুর আলী লম্বা হাল্কা গড়নের প্রৌঢ়। উভয়ে দীর্ঘ দিন ধরে এ সামরিক ছাউনীতে কাজ করতো । গত ২৭ শে মার্চ বিকাল ৫ তার দিকে কোয়ার্টার মাষ্টার মিটিং আছে বলে উভয়কে ব্রিগেড অফিসে ডেকে নিয়ে যায়।

সেদিন থেকে উনত্রিশ তারিখ পর্যন্ত তাদের ঐ অফিসে আটকে রাখা হয়। তাদের সঙ্গে আরো ৫০ জন লোক ছিল ঐ কক্ষে বন্দী। ২৯শে মার্চ বিকাল আনুমানিক চারটার দিকে তারা দেখতে পায় ব্রিগেড অফিসের পাশের কুল গাছতার নিচে তাদের প্রিয় বাঙালি উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসারদের গুলি করে নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছে। প্রথমে একজন একজন করে ও পরে তাড়াতাড়ি নিধনযজ্ঞ শেষ করার জন্য ৩/৪ জনকে এক সাথে কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধা ও দড়ি দিয়ে শক্ত করে হাত বাঁধা অবস্থায় ঐ কুল গাছের নিচে নিয়ে এসে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পরদিন ভোর বেলা তাদের মাটিচাপা দেয়া হয়। ওরা সবাইকে জানিয়েছে যে তাদের চোখের সামনেই অন্ততঃ তিনশুতের বেশী লোককে খুন করা হয়েছে। রমনী শীল ও মন্সুরের সাথে যারা বন্দী ছিল আদের মধ্যে অতি আবশ্যক কাজ সমাধানের জন্য দু’চারজনকে রেখে বাকী সবাইকে ৩০শে মার্চে খুন করা হয়। তাদের দুজনকে খুন করা হয়নি কিন্তু হুকুম ছিলো সামরিক ছাউনি এলাকার বাইরে তারা যেতে পারবে না।

সে হুকুমেই তারা সেদিন মেনে নিয়েছিল প্রাণে বাঁচার জন্য। তাদের চোখেমুখে সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর ভয়াল ছাপ আজো বিদ্যমান। এ পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে তাতে দেখা যায় বিশ্বের এ জঘন্যতম পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড শুরু হয় ব্রিগেডিয়ার শফির নেতৃত্বে। হত্যাযজ্ঞে তার সহযোগীরা ছিল কর্ণেল খিজির হায়াত খান, আর্টিলারীর লেফটেন্যাণ্ট মীর, মেজর সুলতান আহমদ, ক্যাপ্টেন বোখারী, ক্যাপ্টেন জাবেদ ইকবাল, লেফটেন্যাণ্ট কর্ণেল বার্কি, সিকিউরিটি বিভাগের মেজর সেলিম, মেজর মোস্তফা, মেজর সিদ্দিকী ও ক্যাপ্টেন কবির। এই নরপশুদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পৈশাচিকতায় সহযোগিতা করে কুমিল্লা ইস্পাহানী পাবলিক স্কুলের প্রিন্সিপাল অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যাণ্ট কর্ণেল এম কে আমীন ও কুমিল্লা স্ট্যাণ্ডার্ড বাঙ্কের অবাঙ্গালী ম্যানেজার আলীম।

সে আজও কুমিল্লায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আলীমকে খুঁজে বের করা হলে আরো তথ্য উদঘাটিত হবে বলে স্থানীয় জনসাধারণ মনে করেন। জুতো মেরামতকারী মনসুর আলী আমাকে জানিয়েছে যে, ১১৭ নং ব্রিগেডের খান সেনারা বহু মহিলাকে এমন কি কোলে নবজাতসহ মহিলাদেরকে ক্যান্টনমেণ্টে ধরে এনেছে। এদের ভাগ্যে কি পরিণতি ঘটেছে তা সে জানে না। সামরিক ছাউনীর পাশে দ্বিতল ইস্পাহানী পাবলিক স্কুলের উপরের সব কয়টি কক্ষে বহু দিন ধরে নির্যাতিত মহিলারা বন্দী ছিলেন। তাদের অনেকের আর্তচীৎকারে আশপাশের লোকজন শিউরে উঠতো বারবার। মিত্র বাহিনী কুমিল্লা ক্যাণ্টনমেণ্ট থেকে ৬০/৭০ জন লাঞ্চিতা মহিলাকে উদ্ধার করেছে বলে কোতোয়ালী পুলিশ সাব ইনেসপেক্টর বজলুর রহমান আমাকে জানিয়েছেন। তাছাড়া ঐ সময় আরো অনেকে পালিয়েও গেছে। কুমিল্লা কোতোয়ালী পুলিশের মত শুধু মাত্র সামরিক ছাউনীতেই চার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

ইস্পাহানী পাবলিক স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ ক্যান্টেনমেন্ট স্কুলের অবাঙ্গালী শিক্ষককে একদিন আলোচনা করত শুনেছেন এখনে ত্রিশ হাজার বাঙ্গালীকে নিধন করা হয়েছে।

ঐ তিন শিক্ষক হচ্ছে, মঞ্জুর , সাইদ ও সোলেমান। মঞ্জুর আর সোলেমান ত্রিশ হাজার বাঙালিকে হত্যা করার ঘটনা সানন্দে প্রকাশ করার সময় সাইদ মন্তব্য করেছিল ‘ইয়ে কুছ নেহী, মামুলী হ্যায়।’ পশুদের কাছ থেকে অন্য কোন মন্তব্য আশা করা যায় কি?