যুদ্ধই একমাত্র পথ

Posted on Posted in 5

যুদ্ধই একমাত্র পথ

 

১৫ অক্টোবর, ১৯৭১

বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষ যুদ্ধ করছে। প্রতিদিন তারা শত্রুর সঙ্গে লড়ছে পাঞ্জা। তাদের কাছে একথা স্পষ্ট যে, যুদ্ধ ছাড়া স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। একই সঙ্গে বাঙালীরা ইতিহাসের এ-সত্যও উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, কোন স্বাধীনতাই অল্প কয়েকদিনের যুদ্ধে অর্জন করা যায় না। কোন দেশে কোন কালে তা সম্ভব হয়নি। সুতরাং আমাদের আবেগ যতই তীব্র হোক না কেন, সত্যকে, অভিজ্ঞতাকে, বাস্তবকে, যুক্তিকে, অস্বীকার করা উচিত নয়, সম্ভবও নয়। যুদ্ধের প্রথমদিকে, আমরা প্রচণ্ড আবেগে বার বার মনে করেছি দু-একদিনের মধ্যেই আমরা সৈন্যবাহিনীকে ধ্বংস করে দিতে পারবো, কিন্তু এখন আমরা অনেক বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, যুদ্ধের বাস্তব কলাকৌশল শিখেছি, এখন আমরা যুদ্ধের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পেরেছি-তাই আমরা জানি যুদ্ধ শুধু আবেগের ব্যাপার নয়, যুদ্ধ যুক্তির ব্যাপার, পরিশ্রমের ব্যাপার, বুদ্ধির ব্যাপার, জীবন উৎসর্গ করার ব্যাপার। শুধু আবেগ থাকলেই যুদ্ধ জয় করা যায় না। কারণ তাহলে এতদিনের বাংলাদেশে হানাদারদের অস্তিত্ব থকতো না। যুদ্ধ শুধু অস্ত্রেরও ব্যাপার নয়, কারণ তাহলে এতদিনের মধ্যে দিশেহারা হয়ে পড়তো না। যুদ্ধজয়ের জন্য পারিপার্শ্বিকতার সাহায্য লাগে। যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে হয় সেই মাটির সমর্থন, যে মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে হয় সেই মানুষের সমর্থন- এ দুটোই হানাদারদের বিরুদ্ধে, আর এ দুটোই আমাদের পক্ষে। কিছু পিছনে তাকালে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাবো যে, আমাদের পাওনা আদায় হবে। দেশের লোক বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্যই শেখ মুজিবুর রহমানকে ভোট দিয়েছিল। শেখ মুজিব আশা করেছিলেন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জনাসাধারণের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত দেশবাসী সেই আশাই করেছিল। দেশের মানুষ বুঝতে পারেনি যে, ধীরে ধীরে তারা এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার শিকার

হতে যাচ্ছে। সে কথা বুঝতে পারলে আমরাই সর্বপ্রথম তাদের ওপর আঘাত হানতে পারতাম। সমস্ত পরিস্থিতিই আমাদের অনুকূলে ছিল। বেসামরিক শাসনব্যবস্থা, বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনী ও বাঙালী সৈন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে শেখ মুজিব সেনানিবাসে আবদ্ধ পাকিস্তানী, সৈন্যবাহিনীকে সহজেই ধ্বংস করে দিতে পারতেন। চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ও যুদ্ধ, যশোরের পরিস্থিতি ও যুদ্ধ ও রংপুর-রাজশাহীর পরিস্থিতি ও যুদ্ধ এবং সিলেটের পরিস্থিতিও যুদ্ধ যাঁরা দেখেছেন ও বিশ্লেষণ করেছেন তাঁরা সহজেই বুঝতে পেরেছেন যে, বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারকারীদের ধ্বংস করার জন্য কেবল প্রয়োজন ছিল পূর্বপ্রস্তুতির। উপযুক্ত প্রস্তুতির নাম অর্ধেক যুদ্ধজয়। চট্টগ্রামের সেনানিবাস থেকে ২৫শে মার্চের আগেই শত শত বাঙালী সৈন্যকে পশ্চিম পাকিস্তানে চালান দেয়া হয়, বহু বাঙালী সৈন্যের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নেয়া হয়। অথচ সে পথ বন্ধ করতে পারলে, চট্টগ্রামে ও চালনা বন্দরে দূরপাল্লার কামনা বসাতে পারলে ও বিমানবন্দর দখল বা অকেজো করে দিতে পারলে পশ্চিম পাকিস্তানীরা সম্পূর্ণ শক্তিহীন হয়ে পড়তো। কিন্তু আমরা কেন তা করিনি? কেন আমরা হানাদারদের তৈরি হওয়ার সুযোগ দিলাম? কেন আমরা অসহায়ের মতো তাদের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হোলাম? এর তত্ত্বগত ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা না করেও বলা যায় যে, জনসাধারণ নেতৃবৃন্দের মতো আশা করেছিলো আলোচনাই একমাত্র পথ।

আমাদের ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা বুঝতে পেরেছি, পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক শাসকবৃন্দ এবং সামন্তপ্রভূ ও বড় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশকে শোষণ করা বন্ধ করতে পারে না। ছয়-দফা বাস্তাবায়িত হলে শোষণের পথ বন্ধ হয়ে যেতো। শেখ মুজিব বার বার চেয়েছিলেন যে-কোন প্রকারে হোক বাংলাদেশকে আর শোষণ করতে দেবো না, বাংলাদেশকে শোষণ করার পথ বন্ধ করতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য গণতন্ত্রের ভক্ত শেখ মুজিব গণতান্ত্রিক পথই বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব যেমন বলেছিলেন কিসের গোলটেবিল, কার সঙ্গে গোলটেবিল, আজ দেশের সাধারণ মানুষও বলছে ‘কার সঙ্গে গণতন্ত্র? পশ্চিম পাকিস্তানী কুচক্রীদের সঙ্গে কি গণতন্ত্রের পথে মিত্রতা করা যায়? তাদের একমাত্র উত্তর হচ্ছে যুদ্ধ। যারা হাতে রাইফেল তুলে নিয়েছেন সেই স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধারা আজ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছেন যে, শত্রুর সঙ্গে কোনরকম আপোষ করা চলে না। বিশ্বাস করার অর্থ অনিবার্য মৃত্যু। শক্রর শেষ রাখতে নেই। শত্রুর বিনাশ সম্পূর্ণ না হওয়ার পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা তাই নিশ্চিন্ত হতে পারে না। একাধিক মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আলাপ করে আমি জানতে পেরেছি যে, তারা সবাই দুটি সত্য অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। একঃ শত্রুকে ছোট করে দেখতে নেই। নিউইয়ক টাইমস’ পত্রিকাই বলেছেন, প্রথম ৪৮ ঘন্টার মধ্যে হানাদররা ৩ লক্ষ বাঙালীকে হত্যা করেছে। এর দ্বারা পশ্চিম পাকিস্তানীদের ধ্বংস করার ক্ষমতা বোঝা যায়। আধুনিক অস্ত্র যেমন এদের রয়েছে তেমনি মনের দিক থেকে তারা সম্পূর্ণরূপে বাঙালী-বিরোধী। তাদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যে, বাঙালীরা ছোট জাত, তারা শাসিত হতেই জন্মেছে, তাদের বিশ্বাস করা যায় না। সাধারণ সৈনিকদের এই মজ্জাগত ধারণার জন্যই তারা দুঃসাহসী হয়ে ইয়া আলী” ধ্বনি দিতে দিতে যুদ্ধের মধ্যে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় ও এগিয়ে আসতে চেষ্টা করে এবং আমাদের সাহসী বুদ্ধিমান মুক্তিযোদ্ধাদের ভেঙ্গে পড়েছে, তবু জয় নিশ্চিত জেনেও শত্রুকে খাটো করে দেখা চলে না। দুইঃ শক্রকোনদিনই অপরাজেয় নয়। কারণ শত্রু রয়েছে অন্যায়ের পক্ষে, অসত্যের পক্ষে, সাধারণ মানুষের বিপক্ষে। আমরা রয়েছি সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, জনসাধারণের স্বার্থের পক্ষে। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ কোনদিনই পাক-সেনাদের অন্যায়ের পক্ষে সমর্থন জানাবে না। কিছু দালাল যা গজিয়েছে তা নতুন কিছু নয়। কারণ ফ্রান্সের মতো দেশেও হিটলার মার্শাল পেতার মতো বন্ধু খুঁজে পেয়েছিল। সুতরাং দালাল নতুন কোন ব্যাপার নয়। তাছাড়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, দালালরা আসলে সুবিধাবাদী। হাওয়া ঘুরেছে বুঝতে পারলেই তারা তাদের ভোল পাল্টে ফেলবে। সুতরাং বিদেশে দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থনশূন্য পাক-সেনারা চরমভাবে পরাজিত হবেই। আঘাতের পর আঘাত হানলে পাহাড়ও ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ইতিহাসের শিক্ষাই তাই। সুতরাং আঘাতের পর আঘাত হানতে হবে।

আজ যারা যুদ্ধ করছে তারা কি কোনদিন যুদ্ধ করেছিল? তাদের কি যুদ্ধের কোন অভিজ্ঞতা ছিল? তাদের হাতে কি আগের থেকেই অস্ত্র ছিল? এর উত্তর হচেছ- না। কিন্তু তবু কেমন করে যুদ্ধ চলছে, কেমন করে অস্ত্র এলো? এর উত্তর হচ্ছে- যুদ্ধ করতে চাইলে,স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে চাইলে অস্ত্র এসে যায়, যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও হয়, যুদ্ধ জয়ও হয়। আলজিরিয়া তর প্রমাণ, ভিযেতনাম তার প্রমাণ। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের ইচ্ছাটাই বড় কথা।

আমাদের যোদ্ধারা, যুবকেরা বার বার বলেছেন যুদ্ধের মাধ্যমেই আমরা স্বাধীনতা সুপ্রতিষ্ঠিত করবো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ঘটনাবলী বিচার করছেন, সে ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন আকর্ষণ নেই। তাঁরা বলছেন, আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবো, যাচ্ছি। আমাদের নেতারাও সেই কথা বলেছেন। কারণ, তাছাড়া বাংলাদেশের শোষণ বন্ধ হওয়ার আর কোন পথ খোলা নেই। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ শোষিত হয়েছে। তাদেরকে শোষণমুক্ত করতে হলে যুদ্ধই একমাত্র পথ। শেখ মুজিব শোষণহীন সমাজব্যবস্থা কায়েম করার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার একমাত্র নাম যুদ্ধ। আমাদের যুবকরা প্রাণ দিয়ে শোষণের সমস্ত পথ বন্ধ করে দিতে আজ বদ্ধপরিকর। দেশের মানুষ চায় বাংলাদেশের টাকা বাংলাদেশে থাকবে, আমরা সবাই সেই টাকা সমানভাবে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবো। কেউ যেন বলতে না পারে, আমি আমরা ভাগ পাইনি, আমি ব্যথিত, আমি শোষিত। সুতরাং সেই মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের সংগ্রাম করে যেতে হবে, আমাদের যুদ্ধ করে যেতে হবে। এ ব্যাপারে যারা সাহায্য করবে তারাই আমাদের বন্ধু।

(‘জাফর সাদেক’ ছদ্মনামে মোহাম্মদ আবু জাফর রচিত)