যুদ্ধ পরিকল্পনা

Posted on Posted in 10

যুদ্ধ পরিকল্পনা

 

নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই আমরা বেলুনিয়া থেকে শত্রু বিতাড়িত করি। পাকিস্তান রেডিও অবশ্য তখনও বেলুনিয়া তাদের দখলে আছে বলে সমানে প্রচার করে চলেছিল। পাকিস্তান কতৃপক্ষ একদিকে মিথ্যা প্রচার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিলো অপরদিকে ঢাকা- চট্টগ্রাম রোডের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ কেন্দ্র ফেণী থেকে ক্রমান্বয়ে তাদের সৈন্য সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।

 

 ২১ নভেম্বর ঢাকা থেকে এপি প্রতিনিধি এক বার্তায় বলেন, পাকবাহিনী এবং মুক্তিফৌজের মধ্যে মরনপ্রান লড়াই শুরু হয়েছে।এই লড়াইয়ে পাকিস্তানীদের যে শক্তিক্ষয় হচ্ছে তাতে ভারতের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তারা যে কি করবে বোঝা যাচ্ছেনা। ঢাকা- চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য শহরে গেরিলাদের হামলায় পর্যুদস্ত পাকিস্তানীরা দিশেহারা। এসময়ে মুক্তিফৌজ অন্তত সাতটি থানার উপর আক্রমণ চালিয়ে থানাগুলোকে মুক্ত করেছে।দেশের অধিকাংশ স্থানে মুক্তিবাহিনী বিদ্যুৎ সরবরাহ চরমভাবে ব্যাহত করেছে। বন্দরে কাজকর্ম বন্ধ। শিল্প-কারখানার শ্রমিকেরা যে যার বাড়ির পথ ধরেছে। বিস্তীর্ণ পল্লী অঞ্চল তখন মুক্তিফৌজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। সেখানে তারা নিজেদের শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। রাজাকার এবং দালালদের বিচার শুরু হয়ে গেছে। মুক্তিফৌজের দ্রুত শক্তিবৃদ্ধি অভিযানের তীব্রতায় ইয়াহিয়া খান এবং নিয়াজি বেসামাল। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাকিস্তানীরা বিতাড়িত হচ্ছিল, প্রতিমুহূর্তে লোকক্ষয়ের সংখ্যা বাড়ছিলো।কিন্ত এখানেই শেষ নয়, পূর্ব পাকিস্তান শিগগিরই হাতছাড়া হয়ে যাবে, এই আশংকায় তারা ভীতও সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে।আর এই আশংকা সত্য হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উৎকৃষ্ট কয়েকটি ডিভিশন তাদের হারাতে হবে দীর্ঘদিনের জন্য।

 

ইতিমধ্যেই পাকিস্তান কয়েকবারই পশ্চিম ফ্রন্টে ভারতের আকাশসীমা লংঘন করে।পূর্ব ফ্রন্টে নিয়াজি দুঃসাহসিক একটা কিছু করে তার সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধির চেষ্টা করেন। পাকিস্তানী সৈন্যরা ২১ই নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাটের নিকটবর্তী ভারতীয় বয়রা গ্রামে হত্যা চালায়। ট্যাংক,কামান, জঙ্গিবাহিনী তাদের সহযোগিতা করেছিল।এতে কয়েকজন ভারতীয় সৈন্য নিহত। তবে বেশী মারা যায় বেসামরিক ব্যক্তিরাই বিপুল সংখ্যক লোক আহতও হয়। ভারতের মাটিতেই যুদ্ধ হবে নিয়াজি বোধহয় তার এই দম্ভের যথার্থতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন। ভারতীয় এলাকায় অনুপ্রবেশের অনুমতিও তিনি নিশ্চয়ই ইয়াহিয়ার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। এর খেসারতও তাকে হাতে হাতে পেতে হয়।ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রচণ্ড পাল্টা আক্রমণে তারা শুধু পেছনেই হটে আসেনা, ১৩টি শেফি ট্যাংক এবং৩টি সাবর জেটকে এই সীমিত যুদ্ধে হারিয়ে ফিরে আসতে হয় নিজ এলাকায়। দুজন পাকিস্তানী পাইলট বন্দী হয় ভারতের হাতে।

 

এসব উস্কানিতেও মিসেস গান্ধী ছিলেন স্থির।পাকিস্তানের কামানের গোলায় ভারতের বেসামরিক লোক হতাহত হচ্ছিলো। বিষয়সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ছিল প্রচুর।তা সত্ত্বেও ভারত সরকার সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল তিব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে। মিসেস গান্ধী অবশ্য আশা করেছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত কয়েকটি বৃহৎ শক্তির সুমতি হবে। তারা ইচ্ছা করলে ইয়াহিয়াকে দিয়ে বাংলাদেশের গণহত্যা বন্ধ করিয়ে সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধান করাতে পারবেন।

 

২১ই নভেম্বর পাকিস্তান সমূহ বিপদ টের পেয়ে জাতিসংঘে এক নালিশ দায়ের করে বসে। তার বক্তব্য, ভারতীয় সেনাবাহিনী ১২টি ডিভিশন পূর্ব পাকিস্তানের চারটি সেক্টর আক্রমণ শুরু করেছে। একইদিন ইয়াহিয়া সারা পাকিস্তানে জরুরী অবস্থা জারি করেন।এর চারদিন পর অর্থাৎ ২৫নভেম্বর পাকিস্তান সফররত উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন চীনা প্রতিনিধি দলের ভোজসভায় ইয়াহিয়া বক্তৃতাচ্ছলে জানিয়ে দেন যে, হয়ত দিন দশেকের মধ্যে আমাকে আর এখানে নাও পাওয়া যেতে পারে কারণ সম্ভবত আমাকে যুদ্ধে যেতে হবে।

 

২৭ নভেম্বর পাকিস্তানী গোলন্দাজ বাহিনী পশ্চিম দিনাজপুরের ভারতীয় শহর বালুরঘাটের প্রচণ্ড হামলা চালায়।  কামানের গোলার ছত্রছায়ায় এক বিগ্রেড পাকসেনা হিলিতে ভারতীয় অবস্থানের উপর আক্রমণ করে। পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে ট্যাংক বহরও ছিল। প্রথম দফায় পাকিস্তানীদের৮০ জন্য সৈন্য ও চারটি ট্যাংক ধ্বংস হয় এবং তাদের আক্রমণ প্রতিহত হয়। পরেরদিন দ্বিতীয় দফা হামলার সময় তিনটি পাকিস্তানী ট্যাংক আটক করা হয় এবং তাদের বহু সংখ্যক সৈন্য প্রাণ হারায়। ভারতীয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতিও ছিল ব্যাপক।এবার ভারতীয়রা প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে আসে বিপুল শক্তিতে।তারা আন্তর্জাতিক সীমারেখা পার হয়ে বাংলাদেশের ভেতর কয়েক মাইল ঢুকে পড়ে। ভারত সরকার আগেই তার সৈন্যদের সীমান্ত এলাকায় সীমিত আকারে অভিযান পরিচালনার আদেশ দিয়ে রেখেছিলেন। নির্দেশ ছিল, সীমান্তের ওপার থেকে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার হুমকি দেখা  দিলে সৈন্যরা তা নির্মূল করার জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবে। ভারত তখন শুধু তার সীমান্ত রক্ষাই নয়, প্রয়োজন দেখা দিলে সমুচিত প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য প্রস্তত।

 

পরিস্থিতি বিস্ফোরণোম্মুখ হয়ে উঠলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রস্তাব দেন যে, ভারতও পাকিস্তান দুই পক্ষকেই সীমান্ত এলাকা থেকে সৈন্য সরিয়ে দিতে হবে। ইয়াহিয়া খান বাহ্যত প্রস্তাবে সম্মতি জানান।অপরপক্ষে ভারত এই শর্তে সম্মত হয় যে, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানকে তার সৈন্যদের সরিয়ে দিতে হবে।  সকল সমসসার মূল কারণ  হচ্ছে বাংলাদেশে  পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীর কার্যকলাপ এবং এদেরকে সরিয়ে না নিলে এই অঞ্চলে শান্তি আসবেনা। এইসব প্রস্তাব যখন আদান-প্রদান হচ্ছিল পাকিস্তান তখন পশ্চিম ফ্রন্টে রাতের অন্ধকারে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটিস্থানে সৈন্যসমাবেশ করে। এ ঘটনা ১লা ও ২রা ডিসেম্বর।২রা ডিসেম্বরেই পাকিস্তান সংঘর্ষের বিস্তৃতি ঘটানোর অসৎ উদ্দেশ্যে মরিয়া হয়ে আগরতলার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গোলাবর্ষণ করে। এদিন নয়াদিল্লী কংগ্রেস কর্মী সম্মেলনে বক্তৃতাকালে  মিসেস গান্ধী স্পষ্ট কণ্ঠে ঘোষণা করেন, তথাকথিত বৃহৎ শক্তি যেভাবে চাইবে সেইভাবে কাজ করার দিনশেষ হয়ে গেছে। ভারতের স্বার্থ যাতে রক্ষিত হয় সেইদিকে দৃষ্টি রেখে আজ  আমাদের কাজ করতে হবে।

 

অক্টোবর মাসেই জম্বুকাশ্মীরের পুঞ্চ সেক্টরে পাকিস্তানীদের প্রথম যুদ্ধপ্রস্তুতি লক্ষ্য করা গিয়েছিলো। পশ্চিম পাকিস্তানের সমর প্রস্তুতি এবং তৎসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থার ক্রম অবনতি এবং কোটি কোটি বাঙ্গালীর দুর্দশার প্রতি বৃহৎ শক্তিগুলোর উদাসীনতা লক্ষ্য করে ভারত সরকার তখনই তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে সম্ভাব্য আপৎকালে জন্য পুরোপুরি হুঁশিয়ার থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পাকিস্তান এর আগে তিনবার ভারয়ত আক্রমণ করেছে সেকথা ইন্দিরা গান্ধী ভুলে যাননি।

 

ভারতের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধে পাকিস্তান পশ্চিম ফ্রন্টে প্রথমে অভিযানেই রাজনৈতিক এবং রণকৌশলের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ যতদূর সম্ভব বেশী  এলাকা দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলো।পাকিস্তানের মূল পরিকল্পনায় ছিল, একটি সাঁজোয়া ডিভিশন এবং দুইটি পদাতিক ডিভিশন এগিয়ে নিয়ে  ভারতের উপর হামলা চালাবে।দরকার হলে আক্রমণকারী ডিভিশনগুলোর শক্তি বৃদ্ধির জন্য আরও পদাতিকও সাঁজোয়া বাহিনীর সৈন্য পাঠানো হবে। পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত বাকী অংশের পাকসেনাবাহিনীর দায়িত্ব ছিল সমস্ত ভারতীয় বাহিনীকে স্থানীয়ভাবে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে ব্যস্ত রাখা।ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে অনেকগুলো প্রলুব্ধ হামলার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানীরা আশা করেছিল এইসব প্রলুব্ধ হামলায় বিভ্রান্ত হয়ে ভারত তার সেনাবাহিনীকে বিশেষ করে সেনাবাহিনীর শক্তিশালী রিজার্ভ বাহিনীকে মূল রণাঙ্গন থেকে অন্যক্ষেত্রে নিয়জিত করে ফেলবে। ফলে, পাকিস্তানের মূল আক্রমণকারী বাহিনীর পক্ষে অতি সহজে এবং স্বল্প প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুদ্ধ পরিচালনা এবং জয়লাভ করা সম্ভব হবে।

 

এই লক্ষ্য সামনে রেখে পাকিস্তান তার ১২ পদাতিক ডিভিশনের উপর পুঞ্চ এলাকা দখল করার দায়িত্ব অর্পণ করে। পাকিস্তান আশা করেছিলো, পুঞ্চ এলাকায় হামলা চালালে জম্বুও কাশ্মীরে অবস্থিত ভারতীয় বাহিনী এ এলাকাতে তীব্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়বে ফলে তার আর চেনাব নদীর দক্ষিণে সুযোগ পাবেনা। সেই ফাঁকে পাকিস্তান চেনাব নদীর দক্ষিণে মূল হামলা চালিয়ে সফল হবে।এখানে উল্লেখযোগ্য, পাকিস্তানের এই ডিভিশনটি কাশ্মীরেই অবস্থান করছিল এবং অধিকাংশ কাশ্মীরেই লোক।

 

পাকিস্তান আরো পরিকল্পনা করছিলো যে, রাভি নদী বরাবর সুদৃঢ় প্রতিরক্ষাব্যূহ গঠন করে তারা নওশের রাজৈরি এলাকা দখল করে ফেলবে। একাজের দায়িত্ব দেওয়া হল  গুজরাটে অবস্থিত২৩ পদাতিক ডিভিশনকে।

 

১নম্বর করের উপর দায়িত্ব দেওয়া হল সাকারগড় এলাকায় ভারতকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার। প্রলুব্ধকারী হামলা চালিয়ে ভারতীয় বাহিনীকে ঐ এলাক্য যুদ্ধে নামাবার পরিকল্পনা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল আসল আক্রমণকারী এলাকা সম্পর্কে যেন ভারত কিছুই  বুঝে উঠতে না পারে।

 

লাহোর এবং কাসুর সোলেমনকি এলাকায় ৪নম্বর কোরকে ইরাবতী এবং গ্র্যান্ড ট্যাংক রোডের মধ্যবর্তী চানগানওয়ালা নালা পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল রক্ষা করার দায়িত্ব দেয়া হয়। রহিম ইয়ার খান এবং করাচী সহ কচ্ছের রানের মধ্যবর্তী এলাকা রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয় ১৮ পদাতিক ডিভিশনের উপর।

 

ইয়াহিয়া খান চেয়েছিলেন, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় ভূখণ্ড বিশেষ করে জম্বু কাশ্মীর সেক্টরের বেশকিছু এলাকা প্রথমেই দখল করে ফেলতে। যুদ্ধে পূর্বাঞ্চলের কোন জায়গা খোয়া গেলে ভবিষ্যতে তা উদ্ধারের জন্য পশ্চিমাঞ্চলের এই দখলকৃত জায়গার বিনিময়েও দর কষাকষি করতে পারবেন, এই ছিল তার আশা।

 

লক্ষ্য অর্জনের জন্য পশ্চিমাঞ্চলে তাকে প্রথমেই আক্রমণাত্মক ভুমিকা নিতে হবে এবং পূর্বাঞ্চলে জেনারেল নিয়াজিকে রাখা হবে আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা ।

 

পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার ইস্টার্ন কমান্ড অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য সীমিত সংখ্যক আক্রমণাত্মক অভিযান সহ প্রধানত আত্মরক্ষামূলক তৎপরতার ভিত্তিতে একটি পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলো। গুটিকয়েক আক্রমণাত্মক অভিযানের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো শুধু যুদ্ধটাকে ভারতের মাটিতে গড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে।

 

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিও অন্যান্য সুযোগসুবিধা সীমান্ত রেখার যত কাছে অবস্থান দেয়া যায় ততদুর পর্যন্ত এলাকা নিয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়।

 

ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার যতগুলো পথ রয়েছে সেই সবগুলো পথেই এই ধরনের সুদৃঢ় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং যোগাযোগ কেন্দ্র যেমন-চট্টগ্রাম, ফেনী, লাকসাম, চাঁদপুর, কুমিল্লা, আখাউড়া, দাউদকান্দি, ভৈরব, ঢাকা, খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, এবং বগুড়ার চারপাশে চূড়ান্ত প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা  হয়। যেকোনো মূল্যে ঢাকাকে রক্ষা করাই ছিল পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

 

এই ধরণের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে পাল্টা আঘাত(কাউন্টার অ্যাটাক) হানার জন্যেও প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের বিস্তারিত এই রণপরিকল্পনা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সফরকালে অনুমোদন করেছিলেন। পরিকল্পনা প্রধান লক্ষ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধারা যাতে কোন শহর দখল না করে সেখানে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। কারণ এটা করতে পারলে তারা বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করবে। পাকিস্তানীরা অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলোতে তিন-চার সপ্তাহ চলার মত গোলাগুলি, রসদপত্র রাখার এবং পশ্চাৎপদবর্তী প্রতিরক্ষা অবস্থানসমূহে পর্যাপ্ত পরিমাণে রসদ রাখার ব্যবস্থাও করে। অগ্রবর্তী ঘাঁটি রক্ষা করা দুষ্কর হয়ে পরলে সেখান থেকে যোগাযোগ কেন্দ্র কিংবা গুরুত্বপূর্ণ শহরে পশ্চাৎপসরন করে সেসব স্থান রক্ষা করার জন্য লড়াই করে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

 

কয়েকমাস ধরে পাকসেনা বাহিনী এসব প্রতিরক্ষাবাহিনীর ঘাঁটির সকল ব্যবস্থা নিয়ে বেশ  তৎপর ছিল ।তারা হাজার হাজার কংক্রিটের বাংকার এবং পিলবক্স নির্মাণ করে। ট্যাংক চলাচল ঠেকানোর জন্য সম্ভাব্য পথগুলোতে গভীর  নালা কেটে রাখে।

 

এব্যাপারে পাকিস্তানীদের অর্থের কোন অভাব ছিল না। শরণার্থী সাহায্যও পুনর্বাসন কর্মসূচীর নাম করে ইয়াহিয়া খান বেশ মোটা অংকের অর্থ জোগাড় করেছিলেন।আসলে ভারত থেকে তখনও কোন শরণার্থী ফিরে আসেনি। অল্পসংখ্যক যারা এসেছিলো তারাও সেনাবাহিনীর তথাকথিত অভ্যর্থনা কেন্দ্রে ফিরে আসেনি। তারা জেপথে ভারত গিয়েছিলো সেই গোপন পথেই ফিরে এসেছে। মাঝ থেকে শরণার্থীদের জন্য পাওয়া পুরো টাকাটাই প্রতিরক্ষা  বাজেটের অংশ হিসেবে নিয়াজীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। বেলুনিয়ার একটিমাত্র ট্যাংক বিরোধী নালা তৈরি করতে পাকিস্তানীরা প্রায় ২০ লক্ষ টাকা খরচ করে।  

 

অপরপক্ষে ভারতীয় সেনাবাহিনী পশ্চিম ফ্রন্টে আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা এবং পূর্ব ফ্রন্টে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে বাংলাদেশ মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।অবশ্য পশ্চিম ফ্রন্টে ভারতীয় সেনাবাহিনী অনুকূল পরিস্থিতির সুযোগে কোন কোন সেক্টরে আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যতদূর সম্ভব অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনাও গ্রহণ করে।

 

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সামরিক উদ্দেশ্যও লক্ষ্য নিম্নরূপঃ

 

(১) যথাসম্ভব স্বল্প সময়ের মধ্যে(সর্বাধিক তিন সপ্তাহের মধ্যে) মুক্তিফৌজের সহায়তায় বাংলাদেশ স্বাধীন করা।                   

(২) চীন দেশের দিক থেকে সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে ভারতের উত্তর সীমান্ত রক্ষা।          

(৩) আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সংহতি রক্ষা করা               

(৪) নাগাল্যান্ড, মনিপুর , মিজোরাম এলাকায় বিদ্রোহাত্নক তৎপরতা দমন করা

 

এই কাজ গুলো  মোটেই সহজসাধ্য ছিল না।বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি দ্রুত সৈন্য চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত। পুরো দেশ জুরে রয়েছে নদীনালা, খালবিল। এগুলোর জন্য যেকোনো বাহিনীর অভিযান ব্যাহত হতে বাধ্য।

 

এইসব প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক অবস্থানের মূল্যায়ন করে বাংলাদেশকে পৃথক চারটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। এইসব সেক্টরে ভারতও পাকিস্তানের অবস্থান ছিল নিম্নরূপঃ

 

১। উত্তরপশ্চিম সেক্টরঃ যমুনার পশ্চিমও পদ্মার উত্তর অঞ্চল এই এলাকার অন্তর্ভুক্ত। সেক্টরের আওতাধীন জেলাগুলো ছিল  রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী এবং পাবনা। সেক্টরের হেডকোয়াটার স্থাপন করেছিলো নাটোরে। এই সেক্তরে সর্বত্র এবং বিশেষ করে ঠাকুরগাঁ, দিনাজপুর, হিলিও রংপুরে দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিলো।

 

পাকিস্তানের ১৬ ডিভিশনের মোকাবেলায় ভারত তার ৩৩ কোরের(লে. জেনারেল থাপা) অধীনে দুটি মাউন্টেন ডিভিশনকে নিয়োজিত করে। এই ডিভিশনগুলোর সহায়ক হিসেবে নিয়োজিত ছিল ডিভিশনাল গোলন্দাজ বাহিনী, একটি মাঝারি ট্যাংক রেজিমেন্ট এবং হালকা উভয়চর ট্যাংকের(পি টি ৭৬) আর এক্তি রেজিমেন্ট। ভারতীয় ডিভিশনালগুলো ছিল উত্তরে কুচবিহার জেলায়৬ মাউন্টেন ডিভিশন, বালুরঘাট এলাকায় ২০ মাউন্টেন ডিভিশন এবং শিলিগুড়ি এলাকায় ৭১ বিগ্রেড। বাংলাদেশে অভিজানের দায়িত্ব পালন ছাড়াও ৩৩ কোরকে সিকিমও ভুটানের মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য চীনা আগ্রাসন প্রতিহত করার দায়িত্ব ছিল।

 

২। পশ্চিম সেক্টরঃ পদ্মার দক্ষিণ এবং পশ্চিম এলাকা নিয়ে গঠিত এই সেক্টরের জেলাগুলো হচ্ছে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল এবং পটুয়াখালী। এই সেক্টরের মেজর জেনারেল এম, এইচ আনসারীর নেতৃত্বে পাকিস্তানের ৯ পদাতিক ডিভিশন মোতায়েন করা হয়। এই সেক্টরের হেডকোয়াটার ছিল যশোরে।

পাকিস্তানী ৯পদাতিক বাহিনীর মোকাবেলায় ভারতীয় পক্ষে ছিল জেনারেল রায়’নার কমান্ডে নবগঠিত ২কোর। এই কোরের আওতায় দুটি ডিভিশন ছিল মেজর জেনারেল দলবির সিং এর নেতৃত্বে ৯ পদাতিক ডিভিশন এবং মেজর জেনারেল মহিন্দর সিংবারার নেতৃত্বে ৪ মাউন্টেন ডিভিশন। জেনারেল রায়’নার সহয়তায় আরও ছিল দুটি ট্যাংক রেজিমেন্ট এবং ডিভিশনের সহায়ক গোলন্দাজ বাহিনী।

 

৩। উত্তর সেক্টরঃ এই সেক্টর গঠিত হয়েছিলো ময়মনসিংহ, ঢাকা জেলার কিছু অংশ নিয়ে পাকিস্তানীদের পক্ষে এই সেক্টরের দায়িত্ব ছিল বিগ্রেডিয়ার এ কাদেরের নেতৃত্বে ৯৩ বিগ্রেড এবং এর আওতায় ৩১বালুচও ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট,আধা সামরিক বাহিনী(নবগঠিত ইপিসিএপি এর দুটি উইং)কয়েকটি মুজাহিদ ইউনিট এবং একটি মর্টার ইউনিট। এই এলাকার উত্তরাংশ   পাকিস্তানীদের প্রধান শক্তি ছিল লে. কর্নেল সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বে ৩১ বালুচ রেজিমেন্ট। এদেরকে ময়মনসিংহের উত্তরাঞ্চলে  মোতায়েন করা হয়েছিলো। উল্লেখ্য যে, সুলতান মাহমুদই ছিল সবচেয়ে বেশী বাঙ্গালী হত্যার হোতা।কমলপুর- খকশীগঞ্জ- জামালপুর এবং হাতিবান্ধা শেরপুর, জামালপুর বরাবর যে এলাকা যে এলাকা রয়েছে তার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ছিল এই রেজিমেন্টের উপর।এছাড়া দালু- হালুয়াঘাট- ময়মনসিংহ বরাবর এলাকার দায়িত্ব এরা পালন করতো।

 

এই সেক্টরের বিপরীতে ভারতের মেঘালয় এলাকায় ছিল ১০১ কমুনিকেশন জোন। এই জোনের আওতাধীন ভারতীয় সৈন্যরা আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, অরুণাচল, নাগাল্যান্ড ,মিজোরাম এলাকায় দায়িত্ব পালনরত সৈন্যদের চলাচল ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত সকল প্রকার সহযোগিতা প্রদান করতো। এই এলাকায় ভারতীয়দের যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত না থাকায় বিরাট বাহিনীর পক্ষে এখানে দীর্ঘস্থায়ী তৎপরতা চালানো সম্ভব ছিল না। তাই এই সেক্টরে ভারতীয় সৈন্য ছিল সীমিত। এলাকাটির প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় মেজর জেনারেল গুরুবক্স সিং। তার অধীনে ছিল বিগ্রেডিয়ার হরদেব সিংক্লেয়ারের নেতৃত্বে ৯৫ মাউন্টেন বিগ্রেড গ্রুপ এবং ২৩ পদাতিক ডিভিশন থেকে আনীত একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন। এখানে ভারতীয় বাহিনীকে সহযোগিতা করেছে কাদের সিদ্দিকির নেতৃত্বে টাঙ্গাইল এলাকার সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধারা।

 

৪।ইস্টার্ন সেক্টরঃ মেঘনার পূর্ব পাশের এলাকা নিয়ে গঠিত এই সেক্টরের জেলাগুলো হচ্ছে সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাকিস্তান এই সেক্টরে তাদের ১৪ ডিভিশন এবং অস্থায়ী ৩৯ ডিভিশন মোতায়েন করেছিলো। মেজর জেনারেল আবদুল মজিদের নেতৃত্বে ১৪ ডিভিশনের সৈন্যরা কুমিল্লা পর্যন্ত এলাকার দায়িত্বে ছিল। ২০২ বিগ্রেড সিলেট,২৭ বিগ্রেড ব্রাহ্মণবাড়িয়াও আখাউড়া, ১১৭ বিগ্রেড কুমিল্লা,৩১৩ বিগ্রেড ব্রাহ্মণবাড়িয়া উত্তরাঞ্চলও মৌলভীবাজার এলাকার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ৫৩ পদাতিক বিগ্রেড ছিল লাকসামও ফেনীর দায়িত্বে।

 

চট্টগ্রামও কক্সবাজার এলাকার দায়িত্বে ছিল ৩৯ পদাতিক ডিভিশন। কমান্ডার ছিলেন মেজর জেনারেল  রহিম খান।

 

ভারতের পক্ষে এই সেক্টরের দায়িত্বে ছিল লে. জেনারেল সগত  সিং এর নেতৃত্বাধীন ৪র্থ কোর। তার অধীনে ছিল মেজর জেনারেল কৃষ্ণরাও এর অধীনে ৮ম মাউন্টেন ডিভিশন, মেজর জেনারেল গজভালেস এর ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন এবং মেজর জেনারেল আর, ডি, হিরার অধীনে ২৩ মাউন্টেন ডিভিশন। বাংলাদেশের ৮টি ব্যাটালিয়ন এবং আমাদের ১ থেকে৫ নম্বর সেক্টরের সকল ট্রুপসকে সগত সিং এর অধীনে ন্যাস্ত করা হয়েছিলো। অভিযান সংক্রান্ত দায়িত্ব ছাড়াও ৪র্থ কোরের উপর আগরতলা শহর,  বিমান ঘাঁটিএবং ঐ এলাকার বিমান বাহিনীর সকল প্রতিষ্ঠান রক্ষার ভার ছিল।

 

প্রাথমিক অবস্থায় বাংলাদেশ পাকিস্তানী  ডিভিশনের ১৪ টি ডিভিশনের কেবল ৪টি পদাতিক ডিভিশন ছিল। ২৮ মার্চের মধ্যে ৯ এবং ১৬ ডিভিশন দুটি  এখানে চলে আসে।এরপর বাংলাদেশে আরও তারা দুটি ডিভিশন গড়ে তোলে। এই দুটি ছিল ৩৬ এবং ৩৯অস্থায়ী ডিভিশন। ১৯৭১ এর অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তান এখানকার তার সবগুলো ডিভিশন পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন করে। ডিভিশনগুলোর সাথে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ছিল গোলন্দাজও ভারী মর্টার বহরও ট্যাংক বহর। আমেরিকান শেফি ট্যাংক ছিল ৬০ টি। বিমানবাহিনীতে ছিল ২০খানি এফ-৮৬  সাবর জেট এবং নৌবাহিনীতে ছিল অজ্ঞাত সংখ্যক গানবোট এবং অন্যান্য উপকূলীয় নৌযান।

 

এর মোকাবিলায় ভারত তার ৭ পদাতিক ডিভিশনকে এই এলাকায় যুদ্ধ করার জন্য নিয়োজিত করে। পশ্চিম পাকিস্তানের ফ্রন্টে আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং চীন সীমান্তে সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সৈন্য নিয়োজিত করার পর বাংলাদেশে যুদ্ধ চালনার জন্য ভারতের হাতে এই ৭টি পদাতিক ডিভিশন ছাড়া আর কোন নিয়মিত ফোর্স ছিল না। এইগুলোর মধ্যে ৬টি ছিল পূর্ণাঙ্গ ডিভিশন এবং ২ টি স্বতন্ত্র পদাতিক বিগ্রেড। ডিভিশনগুলোকে যুদ্ধে পূর্ণ সহায়তার জন্য ছিল হালকা এবং মাঝারি পাল্লার গোলন্দাজ বহর, পিটি-৭৬ ধরণের উভচর ট্যাংকের দুটি রেজিমেন্ট এবং টি- ৫৪ ধরণের একটি ট্যাংক রেজিমেন্ট। এছাড়া ৩টি সতন্ত্র ট্যাংক স্কোয়াড্রন এবং দ্রুত চলাচলে সক্ষম( মেকানাইজড) ব্যাটালিয়নকে যুদ্ধের জন্য নিয়োজিত করা হয়।

 

ভারতীয় বিমানবাহিনীর ৭টি জঙ্গি বোমারু বিমানের স্কোয়াড্রন এই এলাকার জন্যে নিয়োজিত করা হয় । এছাড়া ছিল সৈন্য পরিবহনের জন্য কিছু সংখ্যক  হেলিকপ্টার।বিমানবাহিনী জাহাজ আই, এন এস ভীক্রান্ত সহ ইস্টার্ন ফ্লীট ছিল এই অঞ্চলের সমুদ্রে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। বাংলাদেশের উপকূলের  অদূরবর্তী সমগ্র সাগর এলাকা অবরোধের দায়িত্ব ছিল এই ইস্টার্ন ফ্লীটের উপর ন্যাস্ত। যুদ্ধ যদি শুরু হয় তাহলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সমুদ্রপথে সৈন্য কিংবা সরঞ্জাম নিয়ে আসা নিয়াজির পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবেনা।

 

এটা সাধারণ মাপকাঠি হিসাবে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যেকোনো আক্রমণ পরিচালনা করে সফলতা অর্জন করতে হলে প্রতিটি আত্মরক্ষাকারী সৈনিকের বিরুদ্ধে তিনজন আক্রমণকারী নিয়োগ করতে হবে। পূর্বাঞ্চলে ভারত কিন্ত সে অনুপাতে পাকিস্তানের চাইতে শক্তিশালী ছিল না। অনুপাত যেখানে ৩:১হওয়া দরকার ছিল  সেখানে ভারতও পাকিস্তানের অনুপাত ছিল ২:১। কিন্ত ইস্টার্ন লে. জেনারেল অরোরা যে ৭টি ডিভিশন পেয়েছিলেন তার চাইতে আর বেশী সৈনিক পাওয়ার আর কোন আশাই তিনি করতে পারতেন না এবং এই বাহিনী দিয়েই তাকে আরাধ্য কাজ সমাধা করতে হবে। এটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

 

তবে জেনারেল অরোরার আস্থা ছিল জয়ী তিনি হবেনই। বাংলাদেশের সমগ্র বাহিনী তার সহযোগিতায় প্রস্তুত ছিল। এর মধ্যে নিয়মিত বিগ্রেডগুলো ছিল কে ফোর্স, এস ফোর্স, জেড ফোর্স। ৯ সেক্টরের ২০ হাজার বাঙ্গালী সেক্টর ট্রপস অস্ত্র হাতে প্রস্তুত। এক লাখ গেরিলা সর্বত্র শত্রুকে তখন সর্বত্র তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছিল।সর্বশেষ এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ ভারত- বাংলাদেশ যৌথবাহিনীকে সর্বাত্মক সাহায্য প্রদানের জন্য তৈরি হয়েছিলো। ইয়াহিয়া কিংবা নিয়াজির জন্য তাদের অন্তরে করুণার অবশিষ্ট লেশমাত্র ছিল না। যুদ্ধ শুরু হয়ার অনেক আগেই এই ঘৃণা পাকিস্তানের পরাজয় একরূপে নিশ্চিত করে রেখেছিল।

 

জনসমর্থনের উপর ভিত্তি করেই প্রধানত ভারতের বিজয় নিরূপণ করা হয়েছিলো। জনসাধারণের একটি বিশাল অংশ ততদিনে রাইফেল, এল এমজি স্টেনগান ইত্যাদি চালানো কিংবা গ্রেনেড নিক্ষেপের কায়দা কানুন শিখে ফেলেছিল। শত্রুপক্ষের খবরাখবর সংগ্রহ করা এবং প্রায় সকল ধরণের অস্ত্রের পরিচিতি সম্পর্কে তারা মোটামুটি অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিলো। কোন অস্ত্রটি কোন দেশের তৈরি তাও অনেকে বলতে পারতো। আমার ২ নম্বর সেক্টরের আট বছরের একটি ছেলে প্রায় প্রতিটি টহলদের পার্টির সাথেই স্কাউট হিসেবে কাজ করতো। দিনের বেলায় সে একাই চলে যেত শত্রুর সবকিছু দেখে আসার জন্য। ফিল্ড ম্যাপের উপর আঙুল দিয়ে সে আমাদের বুঝাতঃ এই হচ্ছে বল্লভপুর গ্রাম স্যার। এখানে আছে বড় একটা পুকুর। মেশিনগানটি বসানো আছে এখানে। এখানে মাইন লাগানো আছে। কিন্ত গরু বাছুর এখান দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছি কিছুই হয়নি। তাই নিশ্চয় ওটা ভুয়া মাইনক্ষেত্র। এই যে এখানে একটা স্কুল বিল্ডিং, সেখানে অফিসাররা থাকে। এইভাবে যুদ্ধের এলাকার সবকিছু সে আমাদের বুঝিয়ে দিতো।

 

বিভিন্ন অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট বিবেচনা করে জেনারেল অরোরা তার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিলেন। প্রধান লক্ষ্য ছিল যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকা মুক্ত করা। শত্রুর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলো এড়িয়ে এবং যোগাযোগও সরবরাহ লাইন দখল করে দ্রুত গতিতে ঢাকা দখল করাই ছিল মূল পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

 

ঢাকা একবার মুক্ত হয়ে গেলেই শত্রুর বিচ্ছিন্ন অবস্থানগুলো আপনা আপনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। তাহলে অত্যন্ত ধীরে সুস্থে এইসব  এড়িয়ে যাওয়া অবস্থানগুলো ধ্বংস করা যাবে।

 

প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাসমূহ যুদ্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করে। চূড়ান্ত বিজয় লাভ করতে হলে এটা অপরিহার্য হয়ে পড়ে যে, ঢাকাকে আসল লক্ষ্যবস্ত হিসাবে যুদ্ধ চালাতে হবে এবং অন্যান্য লক্ষ্যবস্ত নির্ধারণ করতে হবে প্রাকৃতিক সেক্টর হিসেবে আলাদাভাবে।

 

উত্তর- পশ্চিম সেক্টরে বগুড়া ছিল প্রধান যোগাযোগ কেন্দ্র। সিধান্ত নেয়া হয় যে, এই সেক্টরের সকল জায়গায় শত্রু সৈন্যদের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে শেষ করতে হবে তবে প্রধান অভিযান ঘোড়াঘাট ও গোবিন্দগঞ্জ হয়ে বগুড়া মুক্ত করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হবে।

 

পশ্চিম সেক্টরে যশোর ছিল প্রধান যোগাযোগ কেন্দ্র। ঝিনাইদহ- মাগুরা- ফরিদপুর হয়ে ঢাকার সাথে এর সংযোগ। তাই ঝিনাইদহ এবং মাগুরা দখল করতে পারে যশোরে পাকিস্তানীরা বিপদে পড়বে এবং মিত্রবাহিনীর পক্ষে দ্রুত ঢাকা অভিমুখে যুদ্ধাভিযান চালানো সম্ভব হবে।তাই মূল হামলা ঝিনাইদহ- মাগুরা দখলের উদ্দেশ্যে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে শত্রুকে বিভ্রান্ত করার জন্যে যশোরের দিকে একটি আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

 

উত্তর সেক্টরের মিত্র বাহিনীর একটি বিগ্রেডকে জামালপুর- টাঙ্গাইল সড়ক ঢাকার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়।

 

পূর্ব সেক্টরে লক্ষ্য রাখতে হবে, ঢাকা যেন চট্টগ্রাম কিংবা কুমিল্লা থেকে কোন সাহায্য পেতে না পারে। মেঘনা নদী বরাবর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অর্থাৎ চাঁদপুর, দাউদকান্দি এবং আশুগঞ্জ দখল করতে পারলেই এই উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভব। প্রথম অবস্থায় কুমিল্লা, গ্যারিসন এড়িয়ে গেলেও চলবে।   

 

ঢাকা মুক্ত করার লক্ষ্যে দাউদকান্দি থেকে ভৈরব পর্যন্ত মেঘনা নদীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং জামালপুর- টাঙ্গাইল অক্ষ বরাবর অগ্রসররত দলটির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে রাজধানীর অভিমুখে যুদ্ধাভিযান পরিকল্পনার অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে পড়ে।

 

পশ্চিম  সেক্টরে অগ্রসরমান কলামের জন্য গোয়ালন্দঘাট দিয়ে পদ্মা পার হওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। বিশাল এই নদীটি পার হওয়ার ব্যবস্থা আগে থাকতেই করে রাখতে হবে।      

 

চট্টগ্রাম অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সময় আমার সঙ্গে নিজস্ব এক বিগ্রেড সেক্টর ট্রুপস ছাড়াও ভারতীয় দুটি বাহিনীর ব্যাটালিয়ন এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়ন ছিল। এই সব সেনা নিয়ে গঠিত হয় বিচিত্র একবাহিনী যার নাম দেয়া হয় ‘কিলোফোর্স’’ আমাদের পথ ছিল সবচাইতে দীর্ঘতম অথচ যানবাহনের সংখ্যা ছিল সবচাইতে কম। ফিল্ড আর্টিলারী আমাদের সহায়তায় ছিল বটে, তবে কোন ট্যাংক কিংবা অন্য কোন প্রকার সাহায্যকারী ইউনিট ছিল না। এই সেক্টরে আমি ইতিমধ্যেই শত্রুর পশ্চাৎভাগে দুটি নিয়মিত কোম্পানী পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আমার একটি কোম্পানী মীরেশ্বরাই এলাকা এবং ফটিকছড়ি এলাকায় নিরাপদে ঘাঁটি স্থাপন করে বসেছিল। সমগ্র বেলুনিয়া অঞ্চল কয়েকদিন আগে থেকেই শত্রুমুক্ত হয়েছিলো। ফেনী মুক্ত করার জন্য আমাদের প্রস্তুতি চূড়ান্ত। ১৯৭১ এর ২রা ডিসেম্বরের কথা বলছি। পরেরদিন মিসেস গান্ধী এক জনসভায় বক্তৃতা  দিবেন। আমরা অনেকেই আশা করছিলাম এই সভায় হয়তো তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার কথা ঘোষণা করবেন।