রণাঙ্গণ ঘুরে এলাম

Posted on Posted in 5
রণাঙ্গন ঘুরে এলাম

১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১

বাংলার স্বাধীনতা এখন অবধারিত সাফল্যের পথে যাত্রা করেছে। প্রতিটি রণাঙ্গনে এখন পশ্চিমী হানাদার বাহিনী আমাদের মুক্তিবাহিনীর কাছে হন্দম মার খাচ্ছে এবং পিছু হটছে। অচিরেই তারা লক্ষ্য করবে কিছু হটার পরিণামে তারা বঙ্গোপসাগরের কলে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসার এবং ফিরে যাওয়ার দুটো রাস্তাই বন্ধ। শেষের সেদিন কি ভয়ংকর আর মাত্র কয়েক দিনেই তারা হাড়ে-মাংসে টের পাবে। বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা এখন এগিয়ে, শুধু এগিয়ে চলেছে। শত্রু এখন ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। খুলনা, বরিশাল, যশোর, দিনাজপুর, রংপুর, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম মুক্তিবাহিনীর কবজার মধ্যে প্রায় এসে গেছে। এসব অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা এ মুহুর্তে মুক্তিবাহিনীর দখলে এবং এসব এলাকার কয়েক কোটি মানুষ এখন স্বাধীন গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীনে শান্তিতে জীবনযাপন শুরু করেছে। প্রতিটি রণাঙ্গন এখন মুক্তিবাহিনীর উল্লাস-ধ্বনিতে মুখরিত- ‘জয় বাংলা’ নিনাদে প্রকম্পিত। খুলনা, বরিশাল এবং পটুয়াখালির যুদ্ধরত মুক্তিফৌজ ভাইদের সাথে আলাপ করে এবং এইসব রণাঙ্গন সফল করে আমার যেন বরাবর মনে হয়েছে- এ কি সেই বিধ্বস্ত বাংলা, না জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারীর ঢাকা? এই বছরের প্রথম দিকে সমগ্র ঢাকার আকাশ-বাতাস নগর বন্দর যে নামে যে ধ্বনিতে কেপে কেপে উঠতো- বরিশাল খুলনার রণাঙ্গনগুলোর জয়ধ্বনি তার সাথে কত আশ্চর্যভাবে একাত্মং যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরার রণাঙ্গনের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে যে ‘জয় বাংলা শেখ মুজিব জিন্দাবাদ ধ্বনি তা যেন বরিশাল-পটুয়াখালি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে থেকেও শোনা যায়। বাংলার সব রণাঙ্গনের রঙ আজ এক, সব রণাঙ্গনের ধ্বনি আজ এক, সব রণাঙ্গনের চিত্র আজ এক মুক্তিবাহিনী সর্বত্র জিতছে, শুধু জিতছে। রণাঙ্গন এবং সেই সাথে বাংলার প্রত্যন্ত পল্লী এলাকা শেখ মুজিব ও জয় বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত, নিনাদিত। সব রণাঙ্গনেই একই রবঃ যাত্রা করো- যাত্রা করো- এগিয়ে চলো- এগিয়ে চলো। বাগেরহাট রণাঙ্গনে এসে মনে হলো সেই

সামনে মনে হলোঃ বীর আলেকজাণ্ডারের গ্রীকবাহিনী যে বিজয়যাত্রার দৃপ্ত পদধ্বনিতে সাফল্যকে অতিক্রম করেছিল এখন সেই বাহিনীরই আরেক রূপ। এদের যাত্রা যেন শুধু সফলতার ইঙ্গিতকেই চেনে। শুধু বিজয়ের যাত্রাকেই স্বীকার করে। একেকটা বাহিনী একেকটি এলাকা থেকে এসে একটু থেমে আবার যাত্রা করছে। শত্রুর সাথে ওরা কেউ হয়তো বারো ঘণ্টা বুঝেছে, কেউ তিরিশ ঘণ্টা। তারপর সে জিতেছে- শত্রুকেহারিয়েছে, বিবেকের সম্মান আদায় করেছে। সবাই এসে মিলিত হয়েছে। এতক্ষণ ওরা লড়েছে। কিন্তু কেউ বিশ্রাম চায় না। তাই আবার ওদের যাত্রা শুরু। অকস্মাৎ একটি রবে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠলো। ওরা যাত্র করছে কোথায়? ওদের ধ্বনিতে ওরা জানায়ঃ চলো চলো, ঢাকা চলো। কুর্মিটোলা ভাঙো, ভাঙো শত্রুদের, হানো হানো। এখানে দীর্ঘ সতের ঘণ্টা পশ্চিমী হানাদাররা লড়ছে। অতঃপর তারা মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। গ্রামের লোকেরা মুক্তিবাহিনীর সাথে সক্রিয় সহযোগিতা করতে এগিয়ে এলেন। এখন ওদের তারা খাওয়ার পালা। এখন ওদের পরাজয়ের পালা। রণবিধ্বস্ত বাগেরহাটের অগ্রবর্তী ঘাঁটিতে আলাপ হল নবম সেক্টরের কমাণ্ডার মেজর জলিলের সাথে। তিনি দেখলাম দারুণ ব্যস্ত। মাথায় একটা সবুজ ক্যাপ, পায়ে বুট, এক হাতে একটা দূরবীন এবং অন্য হাতে একটি ষ্টিক। আমাকে দেখে ষ্টিক উঠিয়ে বললেনঃ জয় বাংলা। আমি তাঁর কাছে গেলাম। জিজ্ঞেস করলামঃ শত্রুদের ক্ষয়ক্ষতি কি পরিমাণ? ছোট্ট জবাবে বললেনঃ বহু। তারপর বামহাত দিয়ে ষ্টিক তুলে হাত বিশেক দূরে নির্দেশ করলেনঃ দেখুন। একটা মিলিটারী জিপ বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তার মধ্যে তিনটে রক্তাক্ত নিম্প্রাণ হানাদার, একজনের মাথাটা আছে কি নেই বোঝা মুস্কিল- দেখা শেষ না হতেই কমাণ্ডার জলিল সাহেব ষ্টিকটা আরেকটু ডাইনে সরিয়ে আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বললেনঃ ঐ বাঙ্কারে ওদের কমপক্ষে বিশটা লাশ পড়ে আছে। একটু সামনে ডাইনে সরে গিয়ে দেখলামঃ হানাদারদের সেই দুর্ভেদ্য বাঙ্কারের মধ্যে থেকে তখনও ধোঁয়া বেরুচ্ছে- আমাদের মুক্তিবাহিনীর সৈনিকদের শেল এসে বাঙ্কারটা দুমড়ে মুচড়ে গুড়িয়ে দেয়। নবম সেক্টরের কমাণ্ডার জলিল সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ এবার আপনি বলুন ক্ষয়ক্ষতি। কমাণ্ডার সাহেব এরপর কয়েকটি গ্রুপকে কারো ফিরে যেতে দেইনি। আমাদের আরো দ্রুত সম্মুখপানে যেতে হবে। ওদের কারো ফিরতে দেয়া হবে না। সুতরাং বাংলার এই মুক্তিবাহিনীর এই অপ্রতিরোধ্য গতিকে না থামিয়ে সামনে চলার গতিকে আরো দ্রুতময় করে তুলবো আমরা। হেসে আমাকে বললেনঃ চলি, জয় বাংলা।

বাংলাদেশের পতাকা হাতে ট্রপ এগিয়ে যাচ্ছে সামনে, পশ্চাতে উড়ছে ধূলি, তার পাশ দিয়ে কমাণ্ডারের গাড়ি এগিয়ে গেল। মুক্তিবাহিনীর পশ্চাতে বিকেলের শেষ সূর্যের বিদায়ী রঙ কাত হয়ে পড়েছে- তারা চলে গেল- দূরে, অনেক দূরে- একসময় চোখের নিশানার ওপারে- এখানে তখনও শত্রুদের বাঙ্কার থেকে কালো ধোঁয়ার রেশ উঠছে, চারদিকে শত্রুদের মৃতদেহ পড়ে, পড়ে বিধ্বস্ত সামরিক যান, তার ওপর চার-চারটি হানাদারের নিম্প্রাণ দেহ আরো ওপাশে হানাদার বাহিনীর একটি তাঁবুর ভস্মাংশ, তারও ওপাশে পশ্চিমা দস্যুর একটা ভগ্নকামান, দুটো বিক্ষত ট্রাক, ট্রাকের ওপর দিয়ে তখনও রাবারপোড়া ধোঁয়া উঠছে। এখানে হানাদাররা ছিল। এখন হটছে তারা। চোখ তার ওপারে এক বৃদ্ধার এবং গ্রামের আরো কতকগুলো পুরুষরমণীর দিকে ফিরে গেল। তারা এতসময় আমাদের মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন কর্মে সহযোগিতা করছিলো। এবার তারা সবাই সমস্বরে ‘জয় বাংলা ধ্বনি দিতে দিতে গ্রামের দিকে ফিরছে। আমি এগিয়ে গেলাম। সবাই গ্রামের দিকে ফিরছে, কিন্তু এক বৃদ্ধা, সাদা একমাথা চুল, নিশ্চপ দাঁড়িয়ে ততক্ষণে। বৃদ্ধার দৃষ্টি তখনও সেই পথপ্রান্তে- যেদিক দিয়ে আমাদের মুক্তিবাহিনীর ভায়েরা এগিয়ে গেছে। বৃদ্ধার মুখের ওপর চোখ পড়তেই দেখলাম, তাঁর চোখে অশ্রুধারা। জিজ্ঞেস করলামঃ কি মা, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বৃদ্ধাটি আমার দিকে না তাকিয়েই বললেনঃ “আমার মণি গেছে যুদ্ধে। খানদের খতম করে ও শহরে ফিরবে।’ তারপর তাঁর কণ্ঠস্বর আর আমি শুনতে পেলাম

না- অথচ লক্ষ্য করলাম যে, তাঁর ঠোঁট দুটো তখনও নড়ছে। আমার যেন মনে হলো বৃদ্ধা মণির মায়ের ঠোঁট দিয়ে ঈশ্বরের আশীর্বাদে হাজার মণিদের মাথায় বর্ষিত হোচ্ছে, মণির মায়ের ঠোঁট দিয়ে ঈশ্বরের সিদ্ধান্ত নির্মিত হোচ্ছে।

(মুসা সাদেক রচিত)