রণ শিবিরের একটি প্রতক্ষ্য চিত্র

Posted on Posted in 5
রণশিবিরের একটি প্রত্যক্ষচিত্র

১৬ নভেম্বর, ১৯৭১

ছেলেটার কর্মক্ষিপ্রতা এবং কর্মপটুতা আমার প্রথম নজরে পড়ে। অথচ ও আমাকে দেখেনি- এতখানি একান্তচিত্তে সে হাতের যুদ্ধাস্ত্রগুলো নাড়ছিলো। রবিনবাবুর কাছে তার এলাকার কথা শুনতে শুনতে পারি যে বার-তের বছরের ছেলেটার দিকে বেশ মনোযোগী হয়ে পড়েছি তা তিনি লক্ষ্য করে বললেনঃ হ্যাঁ, ও ছেলেটার নাম আলো। ওর বাবা হালিম মাস্টার আমার ছোটবেলার বন্ধু। এই গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন তিনি। ওর আর এক ভাই ছিল। এখন তারা কেউ নেই। ও একা।

আমি আগেই শুনেছিলাম, খুলনার দক্ষিণাঞ্চলের এই গ্রামটার ওপর হানাদার পাকবাহিনী জওয়ানরা দুবার হামলা করে। এবং শেষে এসে গ্রামের কাঁচাবাড়িগুলো পেট্রল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। অবশ্য মুক্তিসেনা ভায়েরা তার মাশুলও আদায় করেছে এদের কাছ থেকে। তবু হানাদারদের অত্যাচারের পরিচয়টা সরেজমিনে জানতে আমি দীর্ঘ এগার-বার মাইল কাঁচা রাস্তা পায়ে হেঁটে সন্ধ্যার সময়ে সেখানে পৌঁছে যাই। গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ভায়েরা আমার পরিচয় জানার পর দলপতি রবিনবাবুর কাছে নিয়ে যায়। রবিনবাবু আমাকে জানালেনঃ আপনার কোন সিকিউরিটির অভাব হবে না। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তবে রাতে গ্রামের ধ্বংসচিত্র দেখানো যাবে না- প্রধানতঃ আমাদের গ্রামের সবাইকে কড়া ডিফেন্স দিতে হচ্ছে। রাতের আঁধারে দেখলাম গ্রামের খানা, ডোবা, নালা, আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের এক-একটা মজবুত বাঙ্কার- সবাই অস্ত্র হাতে অতন্দ্র প্রহরী।

সকালে রবিনবাবুর সাথে বিধ্বস্ত গ্রামের পোড়া বাড়ি, ভাঙ্গা ঘর, শূন্য উঠোন দেখে মনটা খা খা করে উঠলো। অথচ বাংলার এই গ্রাম একদিন নবান্নের ধানে গানে, ছেলেমেয়েদের কলকাকলীতে মুখর ছিল। তাদের অনেকে আজ হানাদারদের হাতে বলী হয়েছে। অনেকে চলে গেছে অন্যত্র নিরাপত্তার সন্ধানে। একটা আশ্চর্য নির্জনতার কালো গ্রামটাকে বিষাদে যেন ঘিরে রেখেছে। তবু, তবু দেখলাম- যারা আছে, যারা এখনো বাপদাদার ভিটে না ছেড়ে সাহসে নির্ভর করে আছে- তারা সেই নির্জনতার বুকে জীবন জাগিয়ে তোলার সাধনায় রত। ধীরে ধীরে তারা সকল প্রতিকূলতার মুখেও তাদের অধিকার রক্ষার সাহসে প্রত্যয় গড়ে তুলেছে মনের ভিতরে, বাইরে।

গ্রামের সবদিকে ঘুরে দেখে বেলা প্রায় সাড়ে বারটা নাগাদ রবিনবাবুর সাথে মুক্তিসেনা বন্ধুদের গ্রামের অফিসে ফিরলাম। টিনের ছাউনি দেয়া একটু ছোট ঘর, দুটো তক্তপোষ, একটা টেবিল, একটা চেয়ার- এই ওদের অফিস। ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে রবিনবাবুর কথা শুনছিলাম। কর্মরত ধবধবে ফরসা ছেলেটার দিক থেকে চোখ তুলে রবিনবাবুর দিকে তাকিয়ে বললামঃ কিন্তু ও একা কেন? রবিনবাবুর মুখের ওপর একটা কষ্টের ছাপ দেখলাম। রবিনবাবু একবার ছেলেটার দিকে এক নজর দেখলেন তারপর স্নান কণ্ঠে বললেনঃ হ্যাঁ, ও একা। ওর ভাই মনি ক্লাস নাইনে পড়তো। সে আমাদের মুক্তিবাহিনীর প্রথম গ্রুপের সাথে যোগ দেয়। মনির ছিল আশ্চর্য সাহস। পাকসেনারা প্রথমবার এসে গ্রামের মোড়ল হাজীসাহবের বাড়িতে আগুন দেয়। মনি আগুন নেভাতে গিয়ে পুড়ে মারা যায়। মনির মা কয়দিন পাগলের মতো হয়ে ওঠে। আলো মুক্তিসেনাদের সাথে আসতে চাইতো। কিন্তু ওর মা ওকে বুকে জড়িয়ে রাখতো সর্বদা। কিন্তু এমনটা ঐটুকু ছেলের ভাগ্যে আছে, কে বলবে বলুন? শেষবার যখন পাকসেনারা সমস্ত গ্রাম ধরিয়ে দিল, তখন একপ্রান্তে ওদের সাথে আমাদের ফাইট চলছে, অন্যদিকে গ্রামের নিরীহ নারী-পুরুষ উর্ধ্বশ্বাসে প্রাণভয়ে ছুটে পালাতে ব্যস্ত। হালিম মাস্টারের স্ত্রী, হালিম মাস্টার ও আলো ইতস্ততঃ দৌড়ানোর প্রাক্কালে অকস্মাৎ এক মিলিটারী ট্রাকের সামনে পড়ে যায়। বেঈমান পাকবাহিনীর লোকেরা হালিম মাষ্টারের ফরসা সুন্দরী স্ত্রীকে জোর করে ট্রাকে তুলে নেয়। বাধা দেওয়ার সাহস দেখাবার অপরাধে হালিম মাস্টারকে গুলি করে মেরে ফেলে। আলো ভয়ে ত্রাসে মা-মা-মা করে চীৎকার করে কাঁদতে থাকে- দস্যু ট্রাকটি ঘর ঘর শব্দ করে আলোর জলভরা চোখের সামনে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। গ্রামের কাঁচা বাড়িগুলো দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে।

রবিনবাবু এখানে থামলেন।

আমি বল্লামঃ তারপর?

রবিন্দ্রবাবু বললেনঃ বহুকষ্টে আগুন আমরা নেভালাম- কিন্তু আপনি তো দেখেছেন এতবড় গ্রামে মাত্র গোটা ছয়-সাত বাড়ি রক্ষা হয়েছে।

আমি আলোর দিকে তাকালাম। রবিনবাবু বললেনঃ আর ঐ আলো- তারপর দিন এলো আমাদের কাছে- বললেঃ আমি মুক্তিসেনা। তোমাদের সাথে যুদ্ধে যাবো।

রবিনবাবু অল্প থেমে বললেনঃ আমার মনে হয়েছিল ওকে ফিরিয়ে দিই। গ্রামের কারো কাছে ও থাক- কেননা ও যে ওর পরিবারের শেষচিহ্ন। কিন্তু ওকে ফিরাতে পারিনি। ওর চোখের জলভরা প্রতিবাদ আমাকে জয় করলো। তারপর থেকে আলো আমাদের সাথে ওই শিবিরের প্রাণ ও ও গুলি ছুড়তে চায় বার বার। কিন্তু ও যে একেবারে বার বছরের শিশু। ওকে আশ্বাস দিয়েছিল আর কিছুদিন পরেই ও গুলি চালাবে। মুক্তিসেনা ভায়েরা সারারাত টহল দিয়ে সকালে প্রত্যেকের অস্ত্র আলোর জিন্মায় জমা দিয়ে যায়। এরপর সারাদিন অস্ত্রের সাথে আলোর খেলা। সে প্রত্যেকটা রাইফেল-ষ্টেনগান খুলবে, পরিষ্কার করবে, তেল দেবে। ওর হাতে অস্ত্রগুলো যেন শাণ পেয়ে চিক চিক করে ওঠে। সন্ধ্যাবেলায় ওই আলোই আবার প্রত্যেকের হাতে জীবন্ত অস্ত্রগুলো তুলে দেয়- এই ওর কাজ। এই কাজেও এত পটু যে বিশ্বাস করাই মুষ্কিল। আলোর দিকে চোখ ফিরে গেল দুজনেরই। আলো আশ্চর্য একাগ্রতায় তখনও কর্মরত। একঝাঁকড়া কালো চুল মাথায়- একটি কচি ফর্সা মুখ, ডগডগে দুটি চোখ- নরম নরম দুটি হাতে কি ভীষণ ব্যস্ততা আলোর। আলো কার মতো দেখতে? হয়ত ওর বাবার মত, নয়তো ওর মায়ের মতো- কিন্তু তারা যে আজ কেউ নেই। এমন অসম্ভব একটি দুঃস্বপ্ন ঐটুকু আলোর জীবনে ঘটেছে ভাবলে বড় পাষণ্ডেরও বোধ করি কষ্ট লাগে।

আলো কাছে গেলাম।

মিষ্টি করে বললামঃ তোমার নাম বুঝি আলো? ষ্টেনগানের খুলে ফেলা অংশগুলি আঙ্গুলের নরম কারসাজিতে এক মিনিটে ঠকাঠক শব্দে লাগিয়ে নিয়ে মুখ তুলে ছোট করে বললেঃ হ্যাঁ তারপর ডানহাতে ষ্টেনগানটা রেখে বামহাতে একটা ৩০৩ রাইফেল নিয়ে একান্ত চেনা ভঙ্গিতে পার্টগুলো খুলে কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগলো।

আমি বল্লামঃ তোমার বাবা-মা কেউ নেই বুঝি?

আলো একটু কাজ থামালো। তারপর বললোঃ ওরা বাবাকে গুলি করে মেরেছে। ডান হাতে একটা বেতের ছড়ি দিয়ে তারপর মাথায় কিছু দেশী তুলো সেঁটে রাইফেলের ব্যারেলটা পরিষ্কার করতে করতে আলো কিছু একটা বলার জন্য মুখ তুললো- কিন্তু কিছু বললো না।

আমি বললামঃ গ্রামে তোমার কোন আত্মীয় নেই? আলো আমার দিকে তাকালে। আমি বললামঃ এই ধরো চাচীমা, খালাম্মা, এমন কেউ? আলোর কচি মুখটা এর পলকের ব্যবধানে অন্য ধাতুর মনে হল। আমার দিকে থেকেও অন্যদিকে তাকালো। বললেঃ আমার মাকে ওরা নিয়ে গেছে- আনতে যেতে হবে। আলোর গলাটা এখন অন্যরকম শোনাল। আমি ওর বাহুর ওপর একটু নাড়া দিয়ে বললাম- ওদের কাছ থেকে আনতে পারবে তুমি? রাইফেলের খোলা ব্যারেলের মধ্য থেকে বেতের ছড়িটা বের করে নেয় আলো, তারপর ব্যারেলের ছিদ্র দিয়ে দূর আকাশের গায়ে চোখ রেখে আলো মাথা নাড়ে। তার সামর্থ্যের ইঙ্গিত দেয়। আলোর দূরে, নীল নীল চোখ মেলে শত্রুহননের সাহসগুলো ঝালিয়ে নিচ্ছে, শত্রুর পরাজয়ের পথগুলি চিহ্নিত করছেমনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে তার বাবা হালিম মাস্টার, ভাই মনির মৃত্যুর বদলা নিতে। প্রস্তুতি নিচ্ছে দস্যুদের নাগাল থেকে তার মাকে ছিনিয়ে আরার প্রতিজ্ঞা রক্ষার।

(লেখকের নাম জানা যায়নি)