রমজানের ওই রোজার শেষে

Posted on Posted in 5
শিরোনামসূত্রতারিখ
১২। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে স্বাধীন

বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারিত অনুষ্ঠান

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের

দলিলপত্র

২০ নভেম্বর, ১৯৭১

অফুরন্ত আনন্দের বন্যা নিয়ে ঈদ আসে আমাদের দ্বারপ্রান্তে। রমজানের শেষে এবারও এসেছে ঈদউল-ফিতর। কিন্তু এবারের ঈদ বয়ে আনেনি সেই আনন্দবন্যা।

পাকিস্তানের জঙ্গী শাসকের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বাংলার মাটি বাংলার আকাশ আজ রক্তরাঙা। এবারের ঈদ তাই আমাদের জীবনকে অগ্নিশপথের আলোকে বিচার করার দিন। এগিয়ে চলার মুহুর্ত। এখন শুনবেন রমজানের ওই রোজার শেষে”- একটি স্মৃতি আলেখ্য। -স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঘোষণা।

রমজানের ওই রোজার শেষে

1st Voice (Male)

 বাংলার আকাশে আবার শওয়ালের চাঁদ উদিত। অন্ত্রাণের কুয়াশামাখা দিগন্তে এক ফালি খণ্ড চাঁদে কত আলো আর আনন্দের প্রত্যাশা! কিন্তু সেই আলো আর আনন্দ আজ এমনভাবে নিভে গেল কেন? আকাশে যেন চাঁদ নয়, চাঁদের করোটি। ঈদের আহত চাঁদের গা বেয়ে যেন ঝরছে চাপ চাপ রক্ত। বাংলার আকাশ আজ লাল, মাটি আজ লাল। হেমন্তের পাখি গান গায় না। নবান্নের ধান কুমারী মেয়ের মত বাতাসের প্রথম সোহাগে আর আন্দোলিত হয় না বাংলাদেশের সবুজ ক্ষেত্রে। শওয়ালের চাঁদ, তবু তুমি এসেছে মৃত্যুদীর্ণ বাংলার আকাশে। আলো আর আনন্দের সব পশরা দূরে রেখে। এসেছে রক্তাক্ত দেহে এসেছে নিহত শিশুর আর নারীর লাশের ছবি বুকে গেঁথে –

 2nd Voice (Femal)

“ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ,

এনেছে এজিদ বাংলার বুকে মোহররমের চাঁদ।

এসেছে কাসেম এসেছে সখিনা সারা দেহে হয় তপ্ত খুন

আজ নয় ঈদ,আজ কোটি মুখে ইন্নালিল্লা………রাজেউন।

ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ,

এনেছে এজিদ আবার এদেশে মোহাররমের চাঁদ।”

1st Voice (Male)

শওয়ালের চাঁদ নয়, মোহাররমের চাঁদ। না, তা কি করে হয়? রমজানের পর কি মোহাররম না শওয়াল?

1st Voice (Female)

শওয়াল। কিন্তু বাংলার আকাশে এখন রমজানের পর মোহররম। শওয়ালের চাঁদ পথ ভুলে গেছে। এজিদের তরবারির ভয়ে, বর্বরতার ভয়ে বঙ্গোপসাগরে উকি মারতে এসে সে পালিয়ে যায় তার সব আলো আর

আনন্দ নিয়ে দূরে আরবের মরু বিয়াবানে। এবার দামেস্কে নয়, ঢাকায় হয়েছে এজিদের অভু্যদয়। তার সীমার সেনারা ঘুরছে বাংলার পথে পথে। লুট করছে নারীর ইজ্জত, হত্যা করছে রোজাদার বাঙালীকে। এজিদের বাবা যেমন একদিন বর্শার আগায় পবিত্র কোরান বেঁধে বিভ্রান্ত করেছিল আরবের মুসলমানদের, এ যুগের এজিদ ইয়াহিয়াও তেমনি ইসলাম আর কোরানের দোহাই পেরে বিভ্রান্ত করতে চাইছে বাংলার মুসলমানকে। সে যুগের এজিদ ছিল মুসলমান। এ যুগের ইায়াহিয়াও মুসলমান। এজিদ কারবালায় হত্যা করেছে দশ হাজার মুসলমানকে। আর ইয়াহিয়া বাংলাদেশে হত্যা করেছে কয়েক লাখ মুসলমানকে।

1st Voice (Male)

ঠিক। ঠিক। এজিদ বলেছিল, আরবের মুসলমানকে খেলাফৎ দেব না। আমি চাই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। ইয়াহিয়া বলছে, বাংলার মুসলমানকে আমি গণতন্ত্র ও স্বাধিকার দেব না। আমি চাই মিলিটারী ফ্যাসিজম কায়েম। রাখতে। আলোচনার নামে এজিদের বন্ধু কুফার বিশ্বাসঘাতক মুসলমানেরা মহানবীর নয়নমণি ইমাম হোসেনকে পথ ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কারবালায়। তার পিপাসার্ত স্ত্রী, পুত্র, শিশুকে এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত দেয়নি খেতে। এ যুগের ইয়াহিয়া আলোচনার নামে বাংলার নয়নমণি বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করেছে। আজ তিনি কোথায় কেউ জানে না। কেউ জানে না।

[নেপথ্যে সমবেত কণ্ঠে]

তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব

বাংলাদেশের প্রাণে গানে চিরঞ্জীব

শেখ মুজিব, শেখ মুজিব।

2nd Voice (Female)

বঙ্গবন্ধু আছেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর বুকে। ইয়াহিয়া বা টিক্কার মত নরপশুদের সাধ্য নেই এই নামটি বাঙালীর বুক থেকে মুছে দেয়।

1st Voice (Male)

নবীর নয়নমণি ইমাম হোসেনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল কুফাবাসী বিশ্বাসঘাতক কয়েকজন মুসলমান। বাংলার নয়নমণি বঙ্গবন্ধুর মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বাংলার কয়েকজন কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতক মুসলমান। নুরুল আমিন, হামিদুল হক চৌধুরী, ফরিদ আহমদ, কাসেম, সোলায়মান, খাজা খায়রদি, গোলাম আযম, মাহমুদ আলী গয়রহ। এদের চরম শাস্তির দিন আজ সমাগত। বাংলার বুক থেকে এই নামগুলোর অপবিত্র অস্তিত্ব মুছে দিতে হবে।

2nd Voice (Female)

এবার নিয়ে দু’বার- দু’বছর মোহাররমের চাঁদ এলো আকাশে শওয়ালের চাঁদের পরিবর্তে। গত বছর ঠিক রোজার ঈদের আগে বারোই নভেম্বরের কাল-রাত্রিতে বিশ লাখ বাঙালী নিশ্চিহ্ন হয়েছে প্রচণ্ড ঝড়ে। সেদিনও ইয়াহিয়া পিণ্ডির শাদাসী বালাখানায় বসে হেসেছে। বাংলার মানুষকে বাঁচাতে, বিপন্ন মানবতার ত্রাণে নেবে আসেনি এই মনুষ্যদেহধারী জানোয়ার গোষ্ঠী।

1st  Voice (Male)

গত ঈদেও সারা বাংলা কেঁদেছে । কেউ গায়নি প্রাণভরে- ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুসির ঈদ- গয়েছে মোহাররমের মর্সিয়া,ইদের জামাতে হয়েছে-জানাজার জামাত।

2nd Voice (Female)

বাংলার মানুষের কণ্ঠে শুনেছি তারই আর্ত ক্ষোভ

“বাঁচতে চাইলে বাঁচবে এমন কথা তো নেই

প্রমাণ পেলে তো হাতে হাতে

বিশ লাখ শিশু নারী ও যুবক আজকে নেই

মরে গেছে তারা এক রাতে

বাঁচতে গেলেই বাঁচবে এমন কথা তো নেই।

প্রভু, তুমি এই পুণ্যির মাসে ধন্যি,

ঝড়ে নেভায়েছো লক্ষ প্রাণের বহ্নি

সাগরে ডুবেছে আমার স্বপ্ন-শিশুরা

তোমার ধ্যানেতে নিরত এখনো যীশুরা

নাহলে তোমার পুণ্যমাসের কি রবে?

কাফনে জড়ানো ছাঁদের শরীর গলিত লাশ

দ্বীপাঞ্চলের বাতাস এখন দীর্ঘশ্বাস

গোলাপের মত কত ফোঁটা ফুল লুষ্ঠিত

মৃত্যু মলিন ঠোঁটে চাপা ক্ষোভ কুষ্ঠিত।”

1st Voice (Male)

গেলবার প্রকৃতির হাতে মারা পড়েছে লাখো মানুষ। সেই মৃত্যুদীর্ণ বাংলার বুকে আবার আঘাত হানতে দ্বিধা করেনি রক্তপাগল নরপশু ইয়াহিয়া। এ বছর মরেছে দশ লাখ। ১ কোটি মানুষকে হতে হয়েছে দেশছাড়া। বাংলার ঘরে ঘরে আজ হাজার সখিনার শরীরে শ্বেতবাস। কাসেমের লাশে ভরে গেছে বাংলার প্রান্তর। শওয়ালের চাঁদের ছদ্মবেশ ধরে আবার বাংলার আকাশে উঠেছে মোহাররমের চাঁদ।

2nd Voice (Female)

আবার শয়তান সীমারের ছুরি উদ্যত হয়েছে ঢাকা, চট্রগ্রাম , খুলনা, রাজশাহীর বুকে। পবিত্র রমজান মাসে কারফিউ জারি করা হয়েছে ঢাকা শহরে। ঘরে ঘরে চলছে, সার্চ, হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ। শওয়ালের চাঁদ, তুমি মুখ ঢাকো। তোমার আলোয় যারা মোনাজাতের হাত তুলবে পশ্চিমমুখো হয়ে পবিত্র কাবাঘরকে সাক্ষী রেখে, যারা জামাতে শামিল হয়ে করবে এবাদত, তারা আজ কোথায়? তাদের কঙ্কালের স্তুপে, তুমি কিসের আলো ছড়াবে- আনন্দের, না শোকাশ্ৰুর?

[ নেপথ্যে গান ]

ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দিবি শোন আসমানি তাগিদ।

1st  Voice (Male)

না শোকাশ্রুর নয়, সংকল্পের । এবারের শওয়ালের চাঁদ বাঁকা খঞ্জর হয়ে বাংলার মানুষকে পথ দেখিয়েছে। উঠুক মোহাররমের চাঁদ বাংলার আকাশে। আমরা কাঁদবো না। অশ্রু ফেলবো না। বাংলার তরুণের হাতে আজ অস্ত্র। ঈদের চাঁদের বাঁকা শরীরের মত বাঁকা তলোয়ার। শত্রুনিপাতের সংকল্পে আজ ঐক্যবদ্ধ লক্ষ বাঙালী তরুণ। ওই দ্যাখো, সীমারের চোখে আজ ভয়। এজিদের চোখে ঘনায়মান পরাজয়ের আতঙ্ক।

[আবার গান]

রমজানের ওই রোজার শেষে…………..

2nd Voice (Female)

রমজানের রোজার শেষে এবারের ঈদ খুশীর ঈদ নয়, সঙ্কল্পের ঈদ। সঙ্কল্পবদ্ধ হওয়ার খুশির ঈদ। শত্রুবধের খুশির ঈদ। দেশ ও মাতৃভূমির জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার খুশির ঈদ। আত্মোৎসর্গের ঈদ। শহীদী দরজা খুলে দেওয়ার ঈদ। গাজী হওয়ার-বিজয়ী হওয়ার আনন্দের ঈদ।

[আবার গান]

রমজানের ওই রোজার শেষে……..

1st Voice (Male)

হেমন্তের আর্দ্র কুয়াশামাখা চাঁদের কি সজল মিনতি- বাংলার যুবশক্তি রুখে দাঁড়াও বাংলার আকাশে বজ্রে ও বিদ্যুতে কি গভীর কানাকানি- বাংলার মানুষ, বজ্রকঠিন শক্তিতে আঘাত হানো। ঈদের জামাতে শামিল হয়ে যে হাত উর্ধ্বে তুলে ধরবে মোনাজাতের জন্য, সে হাত দৃঢ়মুষ্টিতে পরিণত করে শেষ আঘাত হানো হানাদার দস্যুদের উপর। বাংলার বাতাস থেকে মোহররমের মর্সিয়া মুছে দাও, বাংলার আকাশ থেকে মোহররমের চাঁদকে বিদায় দাও। আসুক পুণ্য বিজয়ের ঈদ, শওয়ালের চাঁদ। চূড়ান্ত বিজয়ের চাঁদ আলো আর আনন্দ ছড়াক শত্রুমুক্ত বাংলার আকাশে। রমজানের রোজা, ত্যাগ, কৃচ্ছতা, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের শেষে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের জীবনের সত্যি সত্যি আসুক প্রকৃত খুশির ঈদ। গানে গানে ঝঙ্কৃত হোক কোটি বাঙালীর হৃদয়, আর সেই দৃঢ় প্রত্যাশায় বুক বেঁধে বলি- মোবারক হে ঈদ, ঈদ মোবারক।

[গান- রমজানের ওই রোজার শেষে ……।।

(রচনাঃ আবদুল গাফফার চৌধুরী। প্রযোজনাঃ মেসবাহ আহমেদ)