রাজশাহী বিভাগের গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ

Posted on Posted in 8

গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণঃ

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গৃহীত সাক্ষাৎকার

ঢাকা বিভাগ (পৃষ্ঠা ১২-৬৬)
রাজশাহী বিভাগ (পৃষ্ঠা ৬৭-১৮২)
খুলনা বিভাগ (পৃষ্ঠা ১৮৩-২৬৯)
চট্টগ্রাম বিভাগ (পৃষ্ঠা ২৭০-৩২৪)

হত্যা, ধ্বংস ও নির্যাতনের বিবরণ

।। রাজশাহী বিভাগ ।।

।। ৩৪ ।।
মোঃ আরশাদুজ্জামান (আশু)
দি ইউনিভারসাল রেডিও হাউস
ঘোড়ামারা, রাজশাহী

২৫শে মার্চ শহরে যখন মিলিটারীদের তৎপরতা বেড়ে যায় তখন আমি ভাঙপাড়া গ্রামে কোন এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেই। পাকিস্তানী বেতার থেকে ঘোষণা করা হলো যে, মালিকবিহীন দোকান পেলে তারা অন্য জনকে দিয়ে দিবে।

তার পরিপ্রেক্ষিতে ২১শে মে আমি রাজশাহীতে চলে আসি এবং ঘোড়ামারায় চাচাতো ভাইয়ের বাসায় উঠি। জুমআর নামাজ পড়ে আসার সময় একজন বাঙ্গালী পশ্চিমাদের দালাল আমাকে দেখে। দেখার পর জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারে যে, আমি বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলাম। এরপর অকস্মাৎ দুজন বর্বর সৈন্য গাড়ীসহ দালালের বাড়ীতে যায়। ইতিপূর্বে সে ফোনে মিলিটারীদের সাথে আলাপ করেছিল। তারপরে আমার ভাইয়ের বাসায় মিলিটারীরা ঢোকে। ঢোকার পরে আমাকে নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন একজন অধ্যাপক সাহেবের রান্নাঘরে নিয়ে যায়। সেখানে অন্য একজন কাস্টম অফিসের আবদুল ওয়াহেদ নামের একজন লোককে দেখতে পাই নামাজ পড়া অবস্থায়। তাকে (ওয়াহেদ সাহেবকে) নানা জিজ্ঞাসাবাদ করায় বাইরে পাহারারত একজন মিলিটারী এসে আমাকে নির্মম্ভাবে বুটের লাথি মারে এবং জৈনক সৈন্য বলে, “আপছমে কৈ বাত কারনে নেহী হোগা”।

তারপরে বেলা তিনটের সময় নওয়াবগঞ্জ কলেজের সহ-অধ্যক্ষ মোনামুল হক সাহেবকে মোটা শিকল দ্বারা দু’হাত বেঁধে নিয়ে আসে। তার কিছুক্ষণ পর কানে বালিওয়ালা লম্বা পাতলা মত একজন মিলিটারী আসে। হাতে কাঠের রোলার দরজা বন্ধ করে উর্দুতে বলে যে, “ত্তুম নবাবগঞ্জ কলেজ কা ভাইস প্রিন্সিপাল হ্যায়?” বলে প্রহার আরম্ভ করে। তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে, আমি নাকি বিহারীগণকে হত্যা করেছি, নারীর ইজ্জত নষ্ট করেছি, সেই জন্য তারা দুই হাজার মাইল দূর থেকে এসেছে। তারপর কাথের রোলার দিয়ে প্রহার করে, লাথি মারে।

রাত আটটার পরে কাষ্টম অফিসের জনার ওয়াহেদ সাহেবকে বের করে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পরে আমাকে ঐ একই ঘরে রাখে এবং জিজ্ঞাসা করে জানতে চায় কাকে ভোট দিয়েছিলাম। উত্তরে আমি বলেছিলাম যে, আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিলাম। প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে ক্যাপ্টেন জাফর। তারপরে হিংস্র পশুর মত আমাকে প্রহার করে। প্রহারের দরুন মাটিতে পড়ে যাই। তারপরে জিজ্ঞাসা করে যে, আমি বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলাম কিনা। আমি সম্মতি জানাই। তারপরে উক্ত ঘরে নিয়ে রাখা হয়।

পরের দিন সকালে মাটিতে একটি রুটি ও এক কাপ চা তিনজনকে খেতে দেয়া হয়। শরীরে অসুস্থতার জন্য দু’জন চা পান করছিল না বলে বর্বর সৈন্যরা লাথি মারে বেপরোয়াভাবে।

৯ টার দিকে আমাকে দিয়ে সৈন্যদের ব্যবহৃত ড্রেন, থালা বাসন, উঠান পরিষ্কার করে নেয়। বেলা তিনটার দিকে আমাকে ও ওয়াহেদ সাহেবের পিছনে হাত বেঁধে খাড়া অবস্থায় প্রায় এক ঘন্টা সময় রাখা হয়। তার পরে ক্যাপ্টেন জাফর উপর থেকে নিচে নেমে আসে। মান ধরে বলে, “তুমহারা নাম আশু হ্যায়, তুম রেডিও কা কাম জানতা হ্যায়?” উত্তরে আমি সম্মতি প্রকাশ করি। জাফর হাত খুলে দেয় এবং পরে নিয়ে যায় তার একটি রেডিওগ্রাম দেখতে বলে। দেখার পর আমি বলি উক্ত রেডিওর কোন যন্ত্রপাতি না হলে দেখা সম্ভব নয়। পরে আমাকে নিচে নামিয়ে হাত বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়। কিছুক্ষন পরে আমাকে জিপে উঠান হয়। পরে জোহা হলের দিকে নিয়ে যায়। গাড়ি থেকে নামিয়ে হলের গেটেই সোজা করে দাঁড় করানো হয়। দাঁড় করানোর পর অনিবার্য মৃত্যু জেনে আমি ওয়াহেদ সাহেবের সাথে শেষ আলাপ করতে প্রয়াসী হই এবং প্রাণভরে বাংলাদেশকে দেখে নেই। ক্যাপ্টেন ইলিয়াসকে জাফর পরিচয় করিয়ে দেয় যে ওয়াহেদ সাহেবের মেয়ে জয় বাংলার গান গেয়েছে এবং আমি বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছি। তখন ইলিয়াস ক্যাপ্টেন জাফরের সাথে দূরে আলাপে বলে যে, বাংলাদেশের পতাকা, বাংলাদেশের সর্বত্রই উড়ানো হয়েছিল। তারপর ক্যাপ্টেন ইলিয়াস আমাকে ছেড়ে দেয় এবং ওয়াহেদ সাহেবকে উপরের তলায় নিয়ে যায়।

১৫ই আগস্ট (১৯৭১) পর্যন্ত আমি স্বগৃহে অবস্থান করি। রাত দু’টায় একটি পুলিশ জীপ এবং সঙ্গে ডি,এস,পি নাছিম সাহেব দরজায় ধাক্কা মারে। পুলিশদের নির্দেশ দেয় বাড়িটিকে ঘেরাও করার জন্য। তারপরে দরজার কাছে আমি আসি। আমার নাম জিজ্ঞেস করে। নাম জিজ্ঞেস করায় কিছুক্ষণ মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারপর ডাক নাম জিজ্ঞেস করে। উত্তরে জানাই যে, ডাক নাম “আশু”। অতঃপর আমাকে গাড়িতে কিছুক্ষণ রাখার পর আরও দু’জন, যথাক্রমে আব্দুর রশিদ ও আব্দুর রাজ্জাক সাহেবকে গ্রেপ্তার করে জীপে তুলে দেয়।

থানায় কিছুক্ষণ গাড়িতেই রাখার পর গাড়ি জোহা হলে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং তিন তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রায় অপরাপর ত্রিশজন বন্দীকে দেখতে পাই।
ভোরবেলা তিনজনকে ৩৪০ নং কোঠায় নিয়ে রাখা হয়। সেখানে ইউনুছ মিয়াকে দেখতে পাই। তিনি সেখানে প্রায় অর্ধপাগল অবস্থায় ছিলেন। আমাকে চেনার পর ইউনুছ সাহেব আমাকে পাঁচটি টাকা দিয়ে বলেছিলেন যে, সৈন্যরাতো জীবন শেষই করবে, আপনি যদি ছাড়া পান তবে টাকাগুলি গরীবদের দিয়ে দিবেন।

পরে বেলা ৯ টার দিকে মেজর সাহেবের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জিজ্ঞাসা করে যে, আমাদের পেশা ও নাম কি? পরে ৩৪০ নং কোঠায় নিয়ে যায়। নিয়ে যাবার সময় ঘর খুলে দেখানো হয়। ঐ ঘরগুলির মধ্যে ছাত্র গোছের কতকগুলি যুবককে ঝুলন্ত অবস্থায় উলঙ্গ করে রাখা হয়েছিল। আশেপাশে ভাঙা হকিস্টিক, বাঁশের লাঠি ইত্যাদি ভাঙা অবস্থায় পড়েছিল। আমাদেরকে বলা হয়েছিল সত্য কথা না বললে আমাদের পরিণতিও ঐ একইরূপ হবে।

এক থালাতে চারজনকে এমনকি সময় সময় মেঝেতে পচা, দুর্গন্ধময়, ভাত খেতে দিত। তাও প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে।

৩৪০ নং কোঠার পাশ্বে একটি সেন্ট্রী রুম ছিল। সেখানে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করত যার কিছু কিছু মাঝে মাঝে শোনা যেত।

একদিন আমাকে জোর করে বিভিন্ন রুমের বন্দীদের নাম ইংরেজীতে লেখার জন্য নিয়ে যায়। ৩৪০ এর কয়েকটি রুম পরে একটি রুমের মাঝে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে বিকৃত অবস্থায় দেখতে পাই। তাদের গায়ের চামড়া ছিল না, মাঝে মাঝে কাটা দাগ ছিল।

২৭শে আগস্ট হল থেকে আমাদের থানায় পাঠানো হয়। থানায় পাঁচদিন থাকার পর ইনকোয়ারী হয়। পরে আমাকে মুক্তি দেয়।
স্বাক্ষর/-
মোঃ আরশাদুজ্জামান (আশু)
১৯/০৮/১৯৭২

।। ৩৫ ।।
মোঃ আব্দুস সামাদ
গ্রাম- নওহাটা
থানা- পবা
জেলা- রাজশাহী

১৯৭১ সালের ২৬শে মে তারিখ পাকবাহিনী নওহাটা হয়ে নওগাঁ যাওয়ার পথে অপারেশন করে যায়। নওহাটায় তারা তিনজন লোককে হত্যা করে অগ্নিসংযোগ করে দেয়। এই খান সেনারা নওহাটা বাজারের সমস্ত দোকান লুটপাট করে অগ্নিসংযোগ করে দেয়। তারপর যে সমস্ত স্থানীয় লোককে ধরে ছিল তাদের কে দিয়ে নদী পার হয়ে যাবার জন্য নৌকা গোছিয়ে নেয় এবং যাতে গাড়ি পার করে নিয়ে যেতে পারে তার সমস্ত ব্যবস্থা করে নেয়।

এরপর প্রায় দিনই তারা রাজশাহী টাউন থেকে হঠাৎ হঠাৎ এসে বাজারে যে সমস্ত লোক পেত, তাদেরকে মারপিট করে টাকা-পয়সা কেড়ে নিত এবং তা দিতে অস্বীকার করলে হত্যা করত এবং সেই সঙ্গে নারীদেরও গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে এসে তাদের প্রতি পাশবিক অত্যাচার করে কাউকে ছেড়ে যেত এবং যে সমস্ত নারী তাদের বেশী ভাল লাগতো তাদেরকে ক্যাম্প পর্যন্ত নিয়ে যেত।

বিভিন্ন পথযাত্রীদের কাছ থেকে তাদের নগদ টাকা-পয়সা কেড়ে নিয়ে তারপর মারপিট করে ছেড়ে দিত। স্থানীয় লোকেরা তাদের অত্যাচারে অতিষ্ট হলে সকলে যুক্তি করে খান সেনাদের অল্পসংখ্যক আসলে তাদের একজনকে ধরে মাথা ফাটিয়ে দেয়। ইহার পর কিছুদিন নওহাটা বাজারের লুটপাট বন্ধ থাকে। কিন্তু ইহার অল্পদিন পরে আবার এক খান সেনার দল এসে উক্ত ব্যক্তিকে এবং তার সঙ্গে আরো কয়েকজনকে ধরে একত্র করে বেঁধে বেদম প্রহার করার পর গুলি করে হত্যা করে।

উক্ত ঘটনার পর তাদের লুটপাট বন্ধ থাকে কিন্তু তাদের অন্যান্য অত্যাচার বেড়ে যায়। তারা প্রায়ই মাঝে মাঝে রাতে আসতো এবং স্থানীয় লোক ধরে নিয়ে তাদের মাথায় গুলির বাক্স ও বিভিন্ন মালামাল বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করত। রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন গ্রাম ঘেরাও করে নিরীহ জনগণকে হত্যা করত, তাদেরকে মারপিট করত এবং তাদের মালামাল লুটপাট করত।

এইভাবে তারা বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ২০০ লোককে হত্যা করে তাদের রাজত্বকে কায়েম রেখেছিল।
স্বাক্ষর/-
মোঃ আব্দুস সামাদ

।। ৩৬ ।।
বীরেন্দ্র কৃষ্ণ রায়
রাণীবাজার, ঘোড়ামারা
জেলা- রাজশাহী

“জুন মাসের ১৩ তারিখে পাক দালালরা ষড়যন্ত্রমূলক আমার শ্বশুরবাড়ির একস্থানে গুলিসহ চাইনিজ রাইফেল রেখে ঐ রাতে তারা আমাদের সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে রাইফেল তোলে। তখন আমাকে আমার দুই ছেলে, আমার সম্বন্ধী ক্ষীতিশচন্দ্র রায় ও নিরোদ কুমারকে থানাতে নিয়ে যায়। ওদের ধারণা ছিল আমাদের কাছে প্রচুর টাকা-পয়সা, সোনা আছে। বন্দী করে সেগুলো আদায় করার পরে হত্যা করবে।
রাত ১-১.৩০ দিকে আমাদের থানাতে নিয়ে যায় স্টেটমেন্ট নিবে বলে। আমাদের পাঁচজনকে চালাকি করে হাজতখানায় বন্দী করে। সারারাত কিছু খেতে দেয়নি। তার পরদিনও না। বিকালে আমার বাড়ি থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসে। ঐদিন শেষ রাতের দিকে আমার স্ত্রী দারোগাকে বহু অনুরোধ উপরোধ করে গায়ের সমস্ত গয়না খুলে দিয়ে নগদ কয়েকশত টাকা দিয়ে বলল যেন সামরিক আইনে তার ভাই, স্বামী, ছেলেকে না দেয়। দারোগাকে টাকা ঘুষ দিলে আমাদের সবাইকে হাজত থেকে বাইরে এনে রাখার ব্যবস্থা করেছিল। হঠাৎ করে একদিন আবার হাজতে পুরতে বলে। আমার দুই ছেলে আমার সাথে কান কথা না বলে পাশের নদীতে ঝাপ দেয় বাঁচবার জন্য। পিছু পিছু পুলিশ ছুটে। ওদের চিৎকারে গ্রামের লোকজন ধরে ফেলে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। থানায় নিয়ে এসে অকথ্য অত্যাচার চালায় আমার দুই ছেলের উপর। একজন কৃষক সে আমার ছেলেদের ধরেনি বলে পুলিশ তাকে থানায় ধরে এনে ভীষণভাবে মারধর করে। এখনই ছেলেদেরকে হত্যা করবে কিন্তু টাকার বিনিময়ে নিরস্ত হয়। চার্জশীটের মধ্যেও পালানোর কথা উল্লেখ করেনি।

১৫ই জুন আমাদের সবাইকে নাটোর চালান দেয়। হাশেম দারোগা চাইনিজ রাইফেল সহ চললো। টাকা পয়সা নেয়া সত্ত্বেও আমাদের হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। পথে পাক বাহিনীর সাথে দেখা হলেই সালাম আলায়কুম জানিয়ে বলে, “দেখিয়ে কেয়া চীজ লেআয়া হ্যায়”। দারোগা বারবার আমাদের দেখিয়ে দেয় মুক্তিফৌজ হিসেবে। থানার ওসি হাশেমকে নিষেধ করেছিল অস্ত্র ঐভাবে খোলা নিয়ে যেতে কিন্তু হাশেম দারোগা তা শোনেনি।

নাটোর কোর্টে নিয়ে যাচ্ছে এমন সময় ইন্সপেক্টর (পুলিশ) জাফর সাহেবের সাথে আমাদের দেখা। জাফর সাহেব আমার ছেলের এবং ছেলের শালার বিশেষ বন্ধু ছিল। সে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে হাশেমকে। সামরিক কোর্টে নিয়ে যেতে বলে উনি জামাকাপড় পরে তাড়াতাড়ি কোর্টে আসেন। সামরিক কোর্টের সামনের মাঠে আমাদের বসিয়ে রাখে। পাকসেনারা আসে, নাম শোনে আর সবাইকে লাথি চড় মেরে চলে যায়। সামরিক কোর্টে ক্যাপ্টেন ও মেজর আসেন। আমরা ২৫ গজ মত দূরে বসে। চাইনিজ রাইফেলের কথা শোনার সাথে সাথে ক্যাপ্টেন খতম করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু পুলিশ ইন্সপেক্টর অনুরোধ করে একটি ইনকোয়ারী করার জন্য কারণ ওরা ভালোমানুষ। মেজর বলেন, কেমন করে চিনলে ওদের? ঐ থানাতে আমি থানা ইনচার্জ ছিলাম বহুদিন, ইন্সপেক্টর বলেন। মেজর আমাদের ডাকেন। আমাদের বক্তব্য আমরা বলি। মেজর সব শুনে কোর্টে পাঠাতে বলে ইনকোয়ারীর ভার দিলেন।

এসডিও জেলহাজতে পাঠিয়ে দিলেন। সামান্য একটু ঘরে আমাদের রাখলো। আমরা ৩০/৩৫ জন ছিলাম, শোয়াতো চিন্তা করা যায় না, ভালো করে বসারও উপায় ছিল না। জেল ওয়ার্ডার মোজাফফর খাঁ (বিহারী) বাঁশের লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করে। বাইরে এম,পি (মিলিটারি পুলিশ) ছিল সেও রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারতে লাগলো। আমাদের মধ্যে কয়েকজন কয়েদি ছিল যারা স্বাধীনতার প্রথম ক্ষণে জেল ভেঙে পালিয়েছিল। তাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার চালায়। চিৎ করে শুইয়ে দুই হাতে লাঠি তুলে শরীরে যত শক্তি আছে তা দিয়ে ঘন ঘন আঘাত করতে থাকে।

সারারাত শুনলাম মানুষের অসহ্য যন্ত্রণার চিৎকার। আমার মত এমনি বহু অধ্যাপক, ছাত্র, অ্যাডভোকেট ইত্যাদিকে সারারাত ধরে নির্যাতন চালায়। কান্না, চিৎকারে জেল প্রকম্পিত হচ্ছিলো। পাক সেনারা মারতো আর হাসতো। লোকজনের উপর অত্যাচারের জন্য একটি স্কোয়াড থাকতো যাদের কালো ব্যাজ থাকতো। জেল ওয়ার্ডার হরমুজ আমাদের উপর অত্যাচার চালাতে থাকে। ১৬/১৭ই জুন আমাদের ১৬ জনকে একসাথে রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেয়।

রাজশাহী জেলে বহু রকমের লোকদের দেখলাম। যাদের আনতো তাদের অধিকাংশ কারো চোখ নাই, কারো হাত পা ভাঙা। বিশেষ করে পাক সেনারা যাদের পাঠাতো তারা প্রায় মৃত বা অর্ধমৃত হয়ে আসতো। জেলে যাদেরকে দেখেছি বেশীর ভাগ শান্তি কমিটির লোকেরাই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলো। একজন কৃষক কয়েদীর সাথে আলাপ করলাম। সে এসেছিল শহরে জমি বিক্রি করতে। মহুরির সাথে বাজারে বেড়িয়েছে এমন সময় কিছু লোক কৃষকটিকে জোর করে এক বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বলে, “তোর ছেলে মুক্তিফৌজ”। সে বলে, “আমার বড় ছেলেই নেই”। তারপর মারধর করে জেলে পাঠিয়ে দেয়।

আমাদের কেস ইনকোয়ারীর জন্য ইন্সপেক্টর গ্রামে যান এবং আমাদের পক্ষে রিপোর্ট দেন। বর্তমান বরিশাল এসপি গোলাম মোর্শেদ তখন রাজশাহী এসপি ছিলেন। তিনি আমাদের ধরিয়ে দেবার জন্য এএসআই হাশেমকে প্রমোশন দিয়ে থানার ওসি করে দেন। নাটোর শান্তি কমিটি জাফর ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে পাকসেনাদের কাছে অভিযোগ করে। জাফর সাহেবের চাকরি যাবার মত। বহু টাকার বিনিময়ে আইনুদ্দিনের (এম,এন,এ মুসলিম লীগ) তদবিরে আমাদের জামিন হয় ২৮শে সেপ্টেম্বর। পরে ইন্সপেক্টর আবার ইনকোয়ারী করে নভেম্বর মাসে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু না পেয়ে মুক্তি দেয়। আমরা আবার গ্রামে চলে যায় (গালিমপুর)। আমাদের বাড়ি জামাতে ইসলামীর সভাপতি দখল করে নেয়, সমস্ত কিছু লুট করে রাজাকারের ক্যাম্প করে। আর একটি কক্ষে জামাতে ইসলামীর সভাপতি থাকতো। আমরা আবার গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পাকসেনারা আবার আমাদের গ্রামে হামলা চালায়। সমস্ত গ্রাম লুট করে বহু জনকে ভীষণভাবে মারধর করে, কিছু লোকজনকে হত্যা করে। আমাদের সব লুটে নেয়।

তারপর দেশ মুক্ত হয়। মালঞ্চ এবং নদীর অপর পাড়ে সকল গ্রামে তখন এমন কোন বাড়ি ছিলনা যে বাড়ির মেয়ে ধর্ষিত হয়নি। পাক সেনাদের চাইতে রাজাকার, আল বদর এরাই বেশি অত্যাচার চালিয়েছে। দালালরা এবং তাদের সহযোগীরা গ্রামকে লুট করেছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।

ডিসেম্বরে যুদ্ধ বাঁধলে আমরা সবাই উল্লসিত হয়ে উঠি। একদিন গোলাগুলির শব্দ না পেলে আমাদের মন খারাপ হয়ে যেত।

১৬ই ডিসেম্বর যখন শুনলাম পাক বর্বর বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে তখন সেই রাতে আমার এই বৃদ্ধ বয়সে সারা গ্রাম হেঁকে বেড়াই পাক সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে। মানুষজন গ্রামকে মাতিয়ে তোলে। স্বাধীনতার আনন্দে সবাই “জয় বাংলা” ধ্বনিতে গ্রামকে মুখরিত করে তোলে।
স্বাক্ষর/-
বীরেন্দ্র কৃষ্ণ রায়
৩০/০৮/১৯৭৩

।। ৩৭ ।।
সালু মিয়া
থানা- সদর
জেলা- রাজশাহী

জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে সাহেব বাজারের নিজস্ব দোকান থেকে জনৈক বিহারীর ইঙ্গিতে আমাকে গ্রেফতার করে বোয়ালিয়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরের দিন বিকাল পর্যন্ত থানাতেই বন্দী ছিলাম। তারপর ডিএসপি নাছিম সাহেব জিজ্ঞাসাবাদ করেন যে আপনি কয়টা বিহারী মেরেছেন; ভোট কাকে দিয়েছেন। তারপর মিলিটারী গাড়ি করে জোহা হলে নিয়ে যায়। ৭ দিন সেখানে বন্দী থাকাকালে আমাকে দিয়ে মাটি কাটিয়ে নিয়েছে এবং ত্রিপলাদি শুকিয়ে নিয়েছে। সেখানে ৭-৮ জনকে একই থালায় বসিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত অপর্যাপ্ত ভাত দেওয়া হতো। ডাল হিসাবে শুধু পানি, লবণ, হলুদ দিয়ে সিদ্ধ করে দেওয়া হতো। আর কোন তরকারি থাকতো না।

৭-৮ দিন পরে আবার আমাকে থানায় নিয়ে আসে। সেখানে আমাকে ১৯ দিন রাখা হয়। প্রথমে ক্ষমা ঘোষণার পর বন্দী সকলেই ছাড়া পেলেও আমি এবং আর একজন অধ্যাপক ছাড়া পাননি। একদিন সিকিউরিটি অফিসার আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং বলেন তোমাকে ইন্ডিয়ায় দেখেছি। না উত্তর দেওয়ায় প্রহার শুরু করে। অতঃপর ডিএসপি নাছিম সাহেব এসে সিকিউরিটি অফিসারকে জানান যে আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর আমাকে ছেড়ে দেয়।

এর ১৬-১৭ দিন পর এক রবিবার রাত দুইটার সময় আমাকে বাড়ি থেকে ধরে জোহা হলে বন্দী করে রাখে। সকালের মধ্যেই রাজশাহী ন্যাপ প্রধান আতাউর রহমানসহ বহুজনকে বন্দী করে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের সবাইকে দিয়ে ঘাস কাটিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে রোজা এসে যায়। সময় মতো তাদের কোন খাবার দেওয়া হতো না। কোন কোন দিন সেহেরীও দেওয়া হতো না।

পহেলা রমজান রাত ১১টায় আমার রুম থেকে দুইজন, ন্যাপ প্রধানের রুম থেকে একজন, পাশের রুম থেকে তিনজনকে, আর এক রুম থেকে সাহেব বাজারের কেতু মিয়াকে হাত ও কালো কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যায়। পরদিন সকালে ঔৎসুক্যের বশবর্তী হয়ে জনৈক সেন্ট্রিকে জিজ্ঞাসা করি যে রাতে ছেড়ে দিলে তারা কোথায় গেছে। তখন উত্তর দেয় যে তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। আমি আবার জিজ্ঞাসা করি হাত, পা কেটে কষ্ট দিয়ে না মেরে গুলি করে কেন মার না। উত্তরে জানায়, গুলি করে মারা হয়না, রাম দা দিয়ে জবাই করে মারা হয়। আমি আবার জিজ্ঞাসা করি রাতে যারাই বেরুবেন তাদেরই কি মারা হবে? উত্তর পাই রাত ১১টার পর যারা বেরুবে তাদের সবাইকেই বাংলাদেশে পাঠানো হয়। এর ৪-৫ দিন পর থেকে প্রায় প্রত্যহ রাতে ৭-৮ জন করে লোক উধাও হয়ে যেতো।

২৬-২৭ দিন পর একদিন বেলা দেড়টার সময় আমাকে ছেড়ে দেয়। আসার আগে আমি আমার কাছের দশটি টাকা অন্যান্য বন্দিদের ইফতারি কেনার জন্য দিয়ে আসি। কারণ সেখানে কোন ইফতারি দেওয়া হতো না।

ছেড়ে দেয়ার দুইদিন পর পুলিশ আবার আমাকে খোঁজাখুঁজি করে এবং গ্রেফতার করে জোহা হলে মেজরের নিকট নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদে মেজর আমাকে বলেন, “উপার যায়েগা না ঘার যায়েগা”? শেষ অবধি আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

জোহা হলে বন্দী থাকা অবস্থায় সারাদিন প্রশ্রাব করতে দেওয়া হতো না। তাই বাধ্য হয়ে আমি নিজের জুতার মধ্যে প্রশ্রাব করে তিন তালা থেকে ফেলতাম। পৌর এলাকার ১ নং ওয়ার্ডের ৯৮ জন ধৃত ব্যক্তির মধ্যে আমিই শুধু বেঁচে আছি।

স্বাক্ষর/-
সালু মিয়া

।। ৩৮ ।।
মোঃ আবুল ওয়াহেদ
গ্রাম- সুলতানাবাদ (বেলদার পাড়া)
ঘোড়ামাড়া, রাজশাহী

২৫শে মার্চের পরে রাজশাহী শহরকে পাক বাহিনী তাদের আয়ত্তে আনে। বাংলাদেশের স্বপক্ষের বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কর্মীবৃন্দকে খুজতে থাকে এবং ধরে নির্দয়ভাবে হত্যা করে। এপ্রিলের প্রথম দিকে বেলদার পাড়ার দুজন যুবক যথাক্রমে বাদল ও অন্যজনকে প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তার উপরে গুলি করে হত্যা করে।

বর্বর সৈন্যদের এলোপাতাড়ি গোলাগোলির আওয়াজে গ্রামবাসী প্রাণের ভয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। আমি এপ্রিল মাসের ১২ তারিখে মা সহ ভারতে আশ্রয় নেই এবং জুন মাসের ১ তারিখে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদেরকে নেবার জন্য বেলদার পাড়ায় আসি।

৩ দিন পর পাক বাহিনী রাত ৯টার সময় বাড়ি ঘেরাও করে আমাকে গ্রেফতার করে। অবশ্য শান্তি কমিটির দালালদের কুপ্ররোচনায়। গ্রেফতার করার সময় বাড়ির চারিদিকে এবং ছাদের উপর থেকে গোলাগোলি করে এক বিভীষিকাময় পরিবেশের সৃষ্টি করে। গ্রেফতার করার পর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। পরে গুলি করার জন্য আমাকে লাইনে দাঁড় করায়। কয়েকজন সৈন্যের উদারতার জন্য গুলি করতে বিরত হয় কিন্তু শারীরিক নির্যাতন চালায়। অতঃপর আমাকে জিপে করে হাত বাঁধা অবস্থায় স্থানীয় সার্কিট হাউজে নিয়ে যায়। সেখানে অন্ধকারময় বন্ধ ঘরে পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায় দেয়ালের দিকে মুখ করিয়ে সারারাত দাঁড় করিয়ে রাখে। এবং যাতে বসতে না পারি তার জন্য সামরিক বাহিনীর লোকেরা কড়া পাহারা দিতে থাকে। সকালের দিকে এক কাপ চা ও একখানা রুটি খেতে দেয়। ঐ সার্কিট হাউজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রকে বন্দী অবস্থায় দেখতে পাই। তাদের উপরে বর্ণনাতীত শারীরিক নির্যাতন চালায়।

নির্যাতনের এক পর্যায়ে জনৈক পদস্থ কর্মচারী ছাত্রদ্বয়কে চাকু লাগাতে নির্দেশ দেয়। কিম্ভূতকিমাকার বিশাল বপু বিশিষ্ট একজন সৈন্য অফিসারের নির্দেশের মর্মানুযায়ী তাদের পেটে কুকুরের মতো কামড়িয়ে মাংস ধরে টানাটানি করতে থাকে। ছত্রদ্বয় আর্তচিৎকার করতে থাকে। তিনজনই পূর্বপরিচিত হলেও কেউ কাউকে পরিচয় দেবো না বলে একমত হই।

পরের দিন আমিসহ দু’জন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টার ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। নিয়ে যাবার পর ক্যাম্পের খোলা আঙ্গিনায় আমাদের গায়ের জামা খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়। জামা খোলা হলে ১০/১২ জন বর্বর সৈন্য বেত, চাবুক দ্বারা এলোপাতাড়িভাবে প্রহার শুরু করে। রক্তাক্ত অবস্থায় যতক্ষণ না তারা অজ্ঞান হয় ততক্ষণ ঐ অবস্থা চালাতে থাকে। অতঃপর পা ধরে টেনে পাশের একটি ছোট কোঠায় পাশাপাশি রেখে দেয়। কিছুক্ষণ পর ছাত্রদের মধ্যের একজনকে যিনি বেশ স্বাস্থ্যবান ছিলেন তাকে পুনরায় টেনে আঙ্গিনায় নিয়ে যায় এবং পায়ে দড়ি বেঁধে উল্টোভাবে রডের সাথে টাঙ্গিয়ে দেয়। “তুমলোক লিডায় হ্যায়” বলে চাবুক দিয়ে মারতে শুরু করে। তার শরীর দিয়ে দর দর করে বিগলিত ধারায় রক্ত গড়াতে থাকে। অত্যাচারের এক পর্যায়ে হঠাৎ ছেলেটির পায়ের দড়ি ছিঁড়ে পড়ে যায়। তখন তারা সাময়িকভাবে অত্যাচার বন্ধ করে দেয়। অজ্ঞান অবস্থাতেই পুর্বোক্ত ঘরে পুর্বোক্ত পদ্ধতিতে রেখে দেয়া হয়।

সারা দিন ও রাত অভুক্ত অবস্থায় রেখে দেয়া হয়। পরদিন সকালে শুধু এক কাপ চা পান করতে দেয়। তারপর এক এক করে পাশের ঘরে সিকিউরিটি অফিসার সেলিমের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি প্রথমবারের মত বিবৃতি নিলেন। বিবৃতি নেয়ার মাঝে মাঝে অফিসারটি নিজের হাতে গ্লাভস পরে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে থাকে। এর ফলে মাটিতে পড়ে গেলে বুট দিয়ে শরীরে চড়ে নির্যাতন করতে থাকে। এবং জ্বলন্ত সিগারেট শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঠেসে ধরে। বলাবাহুল্য, অত্যাচার করে তারা পাশবিক আনন্দ উপভোগ করে। এবং নিজেদের খুশিমতো বিবৃতি তৈরী করে। বিবৃতি নেবার পর পুর্বোক্ত ঘরে আবার বন্দী করে রাখে এবং দুপুরে কোন রকম তারকারি ও প্লেট ছাড়াই মাটিতে লবন দিয়ে কিছু ভাত দেওয়া হয় এবং বলা হয় “তুমলোক বাঙ্গালী হ্যায়, চাউল খাও”।

পরের দিন সকাল আটটায় জিপে করে উক্ত সিকিউরিটি অফিসারের তত্ত্বাবধানে তিনজনকেই জুবেরী হাউসের দোতলার একটি কক্ষে রাখা হয়। এবং সেখানে কড়া সামরিক পাহারা ছিল। সেখানে পাশের কক্ষে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর একজন দারোগাসহ ১০/১২ জন পুলিশের লোক ইউনিফর্মসহ বন্দী ছিলেন। এদের অনেকেই আমার পরিচিত ছিলেন। আমাদের কক্ষে একজন ইউসি চেয়ারম্যানসহ আরো ৬/৭ জন সাধারণ মানুষ ছিলেন। সেখানে তিনদিন থাকাকালে কোন শারীরিক নির্যাতন করা না হলেও অপমানজনক অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে। যেমনঃ- “তুমলোক গাদ্দার হ্যায়, তুমলোক বেইমান হ্যায়, তুমলোক হিন্দু হ্যায়।”

ঐ তিনদিনের এক রাতে আমাকেসহ আরো দুজনের (উপরোক্ত ছাত্রদ্বয় নন) নাম ডেকে দোতলা থেকে নামিয়ে আনে এবং সাহসে ভর করে আমি তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “হাম লোগকো কাঁহা লেয়ে যায়েংগে?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “তুমলোক কালমা পড়নে পড়নে চলো, তুমলোগকো খতম করেগা।”

নীচে আসার পর সাথী দুজনের নাম ধাম জিজ্ঞাসাবাদের পর দু’জনকে নিরুদ্দেশের পথে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সম্ভবত তাদেরকে হত্যা করা হয়। পুনরায় বিবৃতি নেওয়া হবে এই উক্তির প্রেক্ষিতে আমাকে ফিরিয়ে আনা হয়। পরের দিন বেলা তিনটায় দুজন ছাত্রসহ আমাকে এক সঙ্গে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় মিলিটারি ট্রাকে নাটোরের পথে নিয়ে যাওয়া হয়। পথে বুট দিয়ে আমাদের উপর সীমাহীন অত্যাচার করে। জেল গেটের খাতায় “ফাইট এগেইনেস্ট গভর্নমেন্ট” লিখে নেয়। জেল গেটের আঙ্গিনায় তখন তিনজনের উপরে বেয়নেট, লাঠি, বেত, বুট ইত্যাদি দ্বারা নির্যাতন করতে থাকে।

নির্যাতনের পর বিকাল পাঁচটায় আমাদেরকে গলা ধাক্কা দিয়ে একটি কুঠুরীতে বন্দী করে। সেখানে আরো দুজনকে বন্দী অবস্থায় দেখা যায়। অবশ্য জেল গেটেই তাদের হাতের বাঁধন ও চোখের পট্টি খুলে দেয়।

নাটোর জেলখানায় তিনটি কোঠায় তিনশ জনের মত কয়েদী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ সালেহ আহমদ, অধ্যাপক মুজিবর রহমানসহ অনেক বুদ্ধিজীবীও ছিলেন। বলা প্রয়োজন যে ইপিআরদের জন্য তিনটি কোঠার একটি রিজার্ভ ছিল। প্রত্যহ পানি আনা, রাস্তা মেরামত, পুকুর পরিষ্কার, মিলিটারিদের খেলার মাঠ তৈরীসহ বিভিন্ন ধরণের কাজ তাদের দিয়ে করিয়ে নেওয়া হতো। এবং সে সময়ে তাদের উপর অত্যাচার করা হতো।

জেলখনায় মাস দুয়েক কাটানোর পর আমাকে জনৈক এফআইটি অফিসারের নিকট বিবৃতি দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সেখানে বিবৃতি আদায়ের ফাঁকে ফাঁকে বৈদ্যুতিক চাবুক দ্বারা প্রহার করে। শেষ পর্যন্ত যে বিবৃতিতে তারা সই করিয়ে নেয় তাতে সত্য অপেক্ষা মিথ্যাই ছিল বেশী।

নাটোর জেলখনায় মিলিটারীদের অত্যাচারের সময় জেলখানাতেই জনৈক কয়েদী মারা যান।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আবুল ওয়াহেদ
১৬/০৮/১৯৭২

।। ৩৯ ।।
মোঃ আফজাল আলী মন্ডল
গ্রাম- পারনাথপুর
পোঃ- রাণীনগর
রাজশাহী

“ভাদ্র মাসের শেষ সপ্তাহ মঙ্গলবার ভোর বেলায় গাড়ি থামিয়ে পাক সৈন্যরা চকউজির, বাহাদুরপুর, চক বিলাকী গ্রাম ঘেরাও করে। আমি সেদিন চক বিলাকী গ্রামে আত্মগোপন করেছিলাম। আমাকে এবং আরো দুজনকে ধরে বেঁধে রাখে। উল্লিখিত দুজনের একজনের চাচাকে বাড়িতে গুলি করে হত্যা করে রেখে তাকে বেঁধে নেয়। নদীর ধারে ঢাকা থেকে আগত কামলা ৯ জন ছিল। এরা তাদেরকেও ধরে ফেলে। আমার স্বাস্থ্য ভাল বিধায় আমাকে মুক্তিবাহিনীর নেতা বলে অকথ্য শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং জানতে চায় মুক্তিফৌজ কোথায় এবং রাইফেলাদি কোথায়?

ইতিমধ্যে আরও তিনজনকে ধরে আনে। তাদের প্রহার করে ও আমি মুক্তিবাহিনীর নেতা কিনা তা জানতে চায়। এরপর সকলকে নদীর ধারে নিয়ে যায় গুলি করার জন্য। সে জায়গা খর স্রোতা নয়, লাশ জলে আটকে থাকবে এজন্য স্থান পরিবর্তন করে আর এক জায়গায় নেওয়া হয়। সেখানে ‘ওয়্যারলেস’ এর মাধ্যমে কথাবার্তা হতো। তারপর আমাদের একটি আম বাগানে নেওয়া হয়। সেখানে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করে, যারা মিলিটারীকে দেখতে এসেছিল। এদের একজন অত্যাচারের অসহ্যতার জন্য বলে যে আমি আওয়ামী লীগের নেতা। যাহোক জনৈক রাজাকারের সামান্য সুপারিশে আমাকে ও উল্লিখিত দুজনকে ছেড়ে দেয়। কিছু দূর যাবার পরে আমার মনে হলো যে এ ছেড়ে দেওয়া মানে কিছু দূর যাবার পর গুলি করে হত্যা করবে। এসব ভাবতে ভাবতে আমি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাই। পরবর্তিকালে জ্ঞান ফিরলে দেখতে পাই যে আমি বাড়িতে আছি।

পাক বাহিনী ঐদিন গ্রামগুলি ঘেরাও করে অন্যূন ২৫০/৩০০ জন লোক ধরে এবং তাদের মধ্যে সাতজনকে গুলি করার জন্য আত্রাই নিয়ে যায়। তাদের সবাই মারা গেলেও ভাগ্যক্রমে আক্কেল আলী নামে জৈনক ছেলে গুরুতর আহত অবস্থায় বেঁচে যায়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আফজাল আলী মন্ডল

।। ৪০ ।।
মোঃ হামিদুর রহমান
গ্রাম- কুমাইল, পোঃ- কাশিমপুর
থানা- রাণীনগর, রাজশাহী

রাণীনগর থানার আতাইকুলা গ্রামে অপ্রত্যাশিতভাবে জুন মাসে ২৯ তারিখে প্রায় ৮০ জন পাক সৈন্য প্রবেশ করে। পাক বর্বরদের সাথে বিহারীরাও ছিল। সেদিন বেলা দশটার সময় উল্লেখিত পাক বর্বররা ধ্বংস, বীভৎসতা চালানোর জন্য গিয়েছিল। গ্রামে প্রবেশ করার আগে গ্রামের সংলগ্ন যমুনা নদী পার হয়ে সশস্ত্রভাবে দৌড়ে গিয়ে গ্রামটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। অবশ্য গ্রামের পাল পাড়া ধ্বংস করাই উদ্দেশ্য ছিল বলে আমার মনে হয়। গ্রামের অন্যান্য পাড়ায় গুরুত্ব না দিয়ে উক্ত গ্রামের পাল পাড়াতেই বেশি তৎপরতা চালায়। পাল পাড়ায় সমস্ত জনগণকে একত্রিত হতে পাক হানাদাররা আদেশ করে। আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত পাড়ার হিন্দু জনগণ এক জায়গাতে একত্রিত হয়। পরে পাক হানাদাররা তল্লাশি করে ও জোরপূর্বক টাকা-পয়সা, সোনার গহনা, ব্যবহারিক সৌখিন জিনিস লুট করতে থাকে। অন্যূন ৬০ হাজার টাকা উক্ত গ্রাম থেকে লুট করে নিয়েছে। বেলা ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত লুট পর্ব চলে। পড়ে উল্লিখিত ধৃত ব্যক্তিগণকে এক লাইনে দাঁড় করায়। লাইনে দাঁড় করানোর পরে মেশিন গানের গুলিতে ৪০ জন লোক নিহত হন।

উক্ত হত্যাকাণ্ডের আগে পাক বর্বররা গ্রামের প্রায় ৫০ জন কুলবধূকে অন্য এক জায়গায় বন্দী করে রাখে। কুলবধূগণকে গুলি করে না মারলেও তাদের অধিকাংশের শ্লীলতাহানি করে। বলা প্রয়োজন উক্ত হত্যালীলা ও ধর্ষণ চালানোর পরে উক্ত পাড়াতে ব্যাপকভাবে অগ্নিসংযোগ করে। ফলে উক্ত পাড়ায় শতকরা ৩০ ভাগ বাড়িঘর সম্পুর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। অবশ্য গ্রামে প্রবেশ করার পূর্বে ও পরে মাঠের দিকে বিক্ষিপ্তভাবে গুলি চালালে ইরি ক্ষেতের মাঝে লুকায়িত ৬/৭ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।

কিছুদিন পরে পশ্চিমা বর্বর বাহিনী পুনরায় উক্ত আতাইকুলা গ্রামে পাল পাড়ায় প্রবেশ করে। প্রবেশ করার আগে গ্রামের জনগণ নারী, পুরুষ নির্বিশেষে প্রাণের ভয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। পরে কোন মানুষকে না পেয়ে কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে পাক পশুরা তাদের নির্দিষ্ট স্থানে চলে যায়।

আত্রাই থানায় তখন বর্বরদের ধ্বংস ও বীভৎসতা চরম ভাবে চলেছিল। বলা প্রয়োজন আতাইকুলাতে দুইবার অভিযান চলার পর পার্শ্ববর্তী গ্রামের কিছুসংখ্যক যুবক ঐ গ্রামে অভিযান হবেনা ভেবে রাত্রিতে অবস্থান করতেন। কিন্তু গ্রামে স্বার্থান্বেষী পাকিস্তানী দালালদের প্ররোচনায় তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছিল। পরে দালালদের আমন্ত্রণে পাক বর্বররা তৃতীয়বার উক্ত আতাইকুলা গ্রামে প্রবেশ করে পাল পাড়াতেই। বলা প্রয়োজন উক্ত পাল পাড়ায় প্রাণের ভয়ে কয়েকজন যুবক আশ্রয় নিয়েছিল। তখন কয়েকজন যুবক পাক দস্যুদের তৎপরতায় ধরা পড়ে। পাক বর্বররা উক্ত ধৃত যুবকদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ হামিদুর রহমান

।। ৪১ ।।
মোঃ ছালামত আলী
গ্রাম- সফিকপুর
ডাকঘর- পালসা
রাণীনগর, রাজশাহী

নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে বর্বর নরপশুরা রাজাকারসহ সশস্ত্র অবস্থায় আকস্মাত গ্রামে প্রবেশ করার পূর্বেই গ্রামের জনসাধারণ স্ত্রী-পুত্র, কন্যাসহ বিক্ষিপ্তভাবে প্রাণের ভয়ে পলায়ন করতে থাকে। পড়ে সৈন্যরা এবং রাজাকাররা নৌকা থেকে নেমেই গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ি তন্ন তন্ন করে তল্লাশী চালাতে লাগলো, তাদের ধারণা ছিল হয়তো কোন আওয়ামী লীগার, মুক্তিযোদ্ধা কিংবা কোন স্বেচ্ছাসেবক গ্রামের মাঝে আত্মগোপন করে আছেন। কিন্তু তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল লুট করা। ঘরের মাঝে যে সমস্ত মূল্যবান আসবাবপত্র ছিল তা নষ্ট করে দেয়, কতকগুলি শৌখিন জিনিস নিয়েও যায়। ট্রাংক, সুটকেস খুলে খুলে কিংবা উপর থেকে আছাড় মেরে তার ভেতরে যা পায় যেমন দামি কাপড় চোপড়, গহনা পত্র, রেডিও, ঘড়ি সমস্ত লুট করে নিয়ে যায়। পঞ্চান্ন বছর বয়স্ক মজিবর রহমান নামক এক বৃদ্ধকে বেদম প্রহার করে। সেই প্রহারের ক্ষণকাল পর আমাকে ধরে চোখ বাঁধে। চোখ বাঁধা অবস্থায়ই আমাকে নৌকায় তোলে। অনেক অবাঞ্চিত কথা বলার পর পাক বাহিনীর লোকেরা আমাকে আত্রাই স্টেশনে নিয়ে যায়। আত্রাই স্টেশনে নামিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দেয়। স্টেশন সংলগ্ন একটি কোঠায় আমাকে বন্দী করে রাখে। সেখানে আমি নাম না জানা অপরিচিত বারজন লোককে দেখতে পাই। দুদিনে দুইখানা রুটি খেতে দিয়েছে নরপশুরা। অবশ্য কোন থালা বা প্লেটে দেয়নি। হাতে হাতে দিয়েছে।

যে বার জন লোক উল্লিখিত কুঠুরিতে ছিলেন তাদেরকে নিয়ে কয়েকজন মিলিটারী প্রায় দুইশ গজ দূরে নিয়ে যায়। তখন অন্ধকার রাত ছিল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। সেই অন্ধকারের মাঝে ব্রিজের উপরে বার জন লোককে তুলে নেয়। অবশ্য ব্রিজের নিচে অথৈ পানি ছিল। একসময় গুলি করে বার জন লোককে হত্যা করে। আমি স্পষ্ট গুলির শব্দ শুনতে পাই। পরে বর্বর সৈন্যরা নির্দিষ্ট জায়গাই চলে আসে।

উল্লিখিত ঘটনার পড়ে পালা এলো আমাকে হত্যা করার। আমি চাকুরিজীবী বলে পশুরা আমাকে হত্যা করে না। আর পকেটে ছিল পরিচয়পত্র। সেই পরিচয়পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে রাত ৯টার সময় আত্রাই স্টেশন ক্যাম্প থেকে হানাদাররা মুক্তি দেয়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ ছালামত আলী

।। ৪২ ।।
মোঃ আবুল হোসেন
থানা- সদর, জেলা- রাজশাহী

পাকবাহিনী রাজশাহী প্রবেশের পূর্বে বিমান মহড়া শুরু করে জনমনে ত্রাসের সঞ্চার করে। বিমান থেকে যে দিন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বোমাবর্ষণ করা হয় সেদিন আমি প্রাণের ভয়ে সপরিবারে দুর্গাপুর থানার পাচুবাড়িয়া স্কুলগৃহে আশ্রয় নেই। সেখানে প্রায় মাসাধিককাল ছিলাম। ইতিমধ্যে গোটা শহর সামরিক বাহিনীর লোকেরা নিজেদের দখলে নেয়। বাজারের দোকান লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে পুড়িয়ে দেয়। জনবসতি এলাকায় বাসাবাড়ি ও লুটপাট করে। এতে আমাদের বাড়ি ও দোকান লুট হয়।

সামরিক বাহিনীর লোকেরা শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে যখন তৎপরতা শুরু করে তখন আমরা শহরে ফিরে আসি। নিজের বাড়ি বাসোপযোগী না থাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় উঠি (বেলদার পাড়া)। এর দশ বারদিন পর হঠাৎ একদিন রাতে কারফিউ এর মধ্যে রাত দশটার সময় বাসা ঘেরাও করে আমাকে গ্রেফতার করে। পালাবার চেষ্টা করলে গুলি করে। গুলি পেটে লেগে পিছলে বেরিয়ে যায়।

গ্রেফতারের পর প্রথমে এক বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে আকারে ইঙ্গিতে শলাপরামর্শের পর আমাকে স্থানীয় সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায় সারারাত অত্যাচার করে। কেউ ঘুষি মারে, কেউ চড় মারে, কেউ বা লাথি মারে।

পর দিন সকাল ৯টার সময় জোহা হলে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যায়। একটি অন্ধকার কক্ষে উলঙ্গ করে হাত বাঁধা অবস্থায় রাখে। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের পর হলের আঙ্গিনায় ইলেকট্রিক তার, হান্টার ও লোহার রড় দ্বারা বিরামহীনভাবে ৮ ঘন্টা ধরে অত্যাচার করা হয়। এর মধ্যে আমি ৯ বার জ্ঞান হারিয়েছিলাম। পিপাশায় পানি ও দেওয়া হয়নি। বিকাল বেলা আমাকে আবার ঘরে নিয়ে আসে। রাতে খিচুড়ি জাতীয় সামান্য কিছু খাবার দেওয়া হয়।

পরের দিনও আমাকে ঐ একইভাবে অত্যাচার করে ও নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসাবাদ করে। বিকালের দিকে এক বাঙালি দালাল বাসা থেকে এক হাজার টাকা মুক্তিপণ হিসেবে নেয়। এবং পরের দিন সকালে সৈন্যরা আমাকে পূর্বোক্ত বাসায় রেখে যায়। ছেড়ে দেওয়ার সময় বলা হয় তোমার উপর যা ঘটলো তা যদি কাউকে বলো তাহলে তোমার গোটা পরিবারকে শেষ করে দেওয়া হবে।

জোহা হলে বন্দী অবস্থায় আমি বহু সংখ্যক নারী কন্ঠের চিৎকার, কাকুতি মিনতি ও করুণ কান্নার শব্দ শুনেছি। যদিও কিছুই দেখতে পাইনি তবে এটা বুঝেছি যে নরপশুদের অমানুষিক অত্যাচার চলছে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আবুল হোসেন

।। ৪৩।।
হরিদাসী
গ্রাম- রামজীবনপুর
থানা- পুটিয়া
জেলা- রাজশাহী

৮ই বৈশাখ বৃহস্পতিবার ৮০/৯০ জন পাক সৈন্য সমস্ত রামজীবনপুর ঘিরে ফেলে। এ সময় আমার সেজ ছেলে কানাইলাল হেমন্ত ঘুমিয়ে ছিল। ওদের সাড়া পেয়েই ও চেতন পায়। ইতিমধ্যে পাক সৈন্যরা দরজায় রাইফেলের গুঁতা এবং পায়ের লাথি মারে এবং ঘর থেকে বেরোবার নির্দেশ দেয়। আমার ছেলে যখন দরজা খুলে বেরোয় তখন তাকে এবং তার ছেলে-মেয়েকেও ঘরের বারান্দায় বসায়। আমি এবং আমার স্বামী তখন পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে কান্নাকাটি ও তাদের অনুরোধ করতে থাকি। তারা আমাকে “আন্দর যাও” বলে শাসাতে থাকে।

অতঃপর আমার ছেলের কাছে রাইফেল, বন্দুক, সোনা, সাইকেল, ঘড়ি, টাকা-পয়সা চাইতে থাকে।

তারপর আমার উক্ত ছেলেকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে রশি দুই দূরে জমির মধ্যে নিয়ে যায়। তারা পাশের বাড়ি থেকে আরও দুজনকেও (পিতা-পুত্র) ধরে নিয়ে যায়। এবং সেখানে তাদের গুলি করে হত্যা করে।

গুলি করে হত্যা করার পর তারা আবার আমার বাড়ি আসে এবং আমার বেটার বৌ এর কাছে বলে যে তোমার স্বামীকে শেষ করে দিয়েছি। এখন তোমরা বাড়ি থেকে বেরোও। বাধ্য হয়ে আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে তারা বাড়িতে আগুল লাগিয়ে দেয়। তারা আগুন লাগানোর আগে আমার গরুগুলি ছেড়ে দেয়। অতঃপর তারা চলে যায়। এদিন সমস্ত পাড়ায় তারা আগুন এবং অন্যূন ৮ জন লোককে হত্যা করে। এর দুই দিন পর আমি ভারতে চলে যায়। আমার চলে যাবার পর আমার বাড়ির অবশিষ্ট সম্পদ লুন্ঠিত হয়।

স্বাক্ষর/-
হরিদাসী

।। ৪৪ ।।
মোঃ আব্দুর রাজ্জাক
আনছার কমান্ডার
গ্রাম- গৌরশহরপুর
থানা- চরঘাট, রাজশাহী

১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল পাক সৈন্যরা ৬০/৭০ খানা গাড়িযোগে সারদা আসে। এবং অবশেষে সারদার পতন ঘটে। তারা এসেছে এ খবরে এবং তাদের দেখে সারদা এলাকার লোকজন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা প্রাণের ভয়ে আত্মরক্ষার্থে চরে আশ্রয় নেয়। পাক সৈন্যরা পিটিসিতে ঢুকে আগ্নেয়াস্ত্র দখল করে এবং বেপরোয়াভাবে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। তারা চরে আশ্রয় নেয়া লোকদের ধরে একত্রিত করে। তাদের সংখ্যা ছিল অন্যূন ১০০০/১৫০০। এদের মধ্যে আনসার, পুলিস, সাধারণ মানুষ ছিল। একত্রিত লোকগুলিকে জমা করা হলে তারা সারি করে সকলকে গুলি করে হত্যা করে।

এক একটা দলকে ধরে এনে তারা গুলি করে হত্যা করে। ইতিমধ্যে আর একটি দল জমা হয়। তাদেরকে দিয়ে মৃত লাশগুলি জমা করে। অতঃপর তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে। অপর ধৃত লোকগুলি দিয়ে তাদের লাশ জমা করে। শেষাবধি মৃত দেহগুলিকে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

আড়াইটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত তারা এই কাজ করে। অতঃপর তারা সন্ধ্যার মধ্যেই এলাকা ত্যাগ করে চলে যায়। এসময় তারা বিরামহীনভাবে বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করতে থাকে।

এ সময় আমি আর সকলের সাথে চরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাপার বেগতিক দেখে চর থেকে পালিয়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকি এবং নিজেকে মুক্ত রেখে পাক সৈন্যদের কার্যকলাপ দেখছিলাম।

সন্ধ্যার মধ্যেই এখানে থাকা নিরাপদ নয় ভেবে ছেলে-মেয়েসহ অন্য গ্রামে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেই। পরদিন অত্র থানার নন্দনগাছি নিমপাড়া ইউনিয়নে আশ্রয় নেয়। কয়েকদিন সেখানে থাকার পর বুঝতে পারলাম যে সেখানে থাকা নিরাপদ নয়। পাক মেজর এবং শান্তি কমিটির লোকেরা আমাকে খুঁজছে। তাই সেখান থেকে জামনগর গ্রামে যাই। সেখানে থাকা অবস্থায় নন্দনগাছির কতিপয় লোক খবর দেয় যে চেয়ারম্যান আমাকে ডেকেছে, আমার কোন ভয় নেই। তাদের কথামতো নন্দনগাছি পৌছালে তারা আমাকে বন্দী করে এবং পরদিন সকালে জয়েন সরকারের বাড়িতে বন্দী অবস্থায় হাজির করে। সেদিন ছিল ২৯শে মে। সেখানে পৌছার কয়েক মিনিটের মধ্যে ক্যান্টনমেন্ট থেকে হাবিলদার মেজরসহ কতিপয় সামরিক লোক গিয়ে আমাকে বন্দী অবস্থায় ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে আসে। নিয়ে যাবার সময় পিছনে হাত এবং ন্যাকড়া দিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। সেখানে মেজর শফি আহমেদের কুঠিতে বন্দী করে রেখে দেয়।

বিকেলে মেজর আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করে। সে জিজ্ঞেস করেছিল যে তুমি গোপালপুরে কতোজন মিলিটারী মেরেছো এবং কতো রাইফেল নিয়ে গিয়েছিলে? উত্তরে তারা সন্তুষ্ট হতে না পেরে আমার উপর শারীরিক অত্যাচার শুরু করে। বুটের লাথি, চড়, কিল, ঘুষি মারছিল। এ অবস্থায় অত্যাচার করার পর চোখ আবার বাঁধা হয়। হাত তো আগে থেকেই বাঁধা ছিল। এ অবস্থায় গেস্ট হাউসের উপর তলায় রাখে।

রাত আটটার দিকে আবার নতুন করে হাত কষে বাঁধে। পায়ের গিটে বেঁধে হাঁটুর মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে ঘাড় এবং হাঁটু পেঁচিয়ে শক্ত করে বাঁধে। অতঃপর ঐ অবস্থায় আমাকে হৃদয়হীনভাবে প্রহার শুরু করে। হাত, লাঠি, রুলার দ্বারা প্রহার করতে থাকে। রাইফেলের বাঁট দিয়ে গর্দানে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রহার করে। এই প্রক্রিয়ায় পালাক্রমে সারারাত ধরে অত্যাচার করে। শেষ রাতের দিকে সেই পশুরা যখন অণ্ডকোষ ও মলদ্বারে লাঠি মারে সে সময় আমি চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।

সকাল ৭/৮ টার দিকে যখন আমার জ্ঞান ফিরে তখন আমি ঐ বসা অবস্থায় কুণ্ডলী পাকিয়ে নিজেকে পড়ে থাকতে দেখতে পাই। এবং ঐ অবস্থায় অভুক্তভাবে সারাদিন ঐখানেই পড়ে থাকি।

বিকেল বেলা আমার হাত এবং পায়ের বাঁধন খুলে দেয়। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই গাড়িতে তুলে নিয়ে মেজর আমাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে নিয়ে যায়।

সন্ধ্যার পর চোখ ও হাত পা খোলা অবস্থায় কর্নেল রেজভীর সামনে আবার পূর্বোক্ত প্রশ্নগুলি জিজ্ঞাসা করতে থাকে। আমি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করি।

রাত ১১ টার দিকে আমাকে একটি ঘরে বন্দী করে। সেখানে আমি ১০/১২ জন লোককে বন্দী অবস্থায় দেখতে পাই।

পরদিন সকালে কয়েকজন সেপাই আমাকে দেখে প্রহার শুরু করে। পালাক্রমে তারা এই কাজ করে। তাদের রীতি ছিল যে ঐ ঘরে কোনো লোক গেলে তারা বলতো “তোম কাহাসে আয়া, কব আয়া?” আর তার সাথে প্রহার করতো। দুপুরের দিকে ২টা রুটি এবং কিছু তরকারি দেয়। পায়খানা প্রসাব অথবা গোসলাদির কোন ব্যবস্থা ছিল না।

সেখানে তের দিন বন্দী অবস্থায় ছিলাম। এবং সে সময় আমি লক্ষ্য করেছি যে সারাদিন ধরে লোক জমা হতো এবং রাতে অস্ত্রশস্ত্র সহকারে একজন হাবিলদার এবং তিনজন সেপাই আসতো। তাদের সাথে মোটা দড়ি থাকতো। কাগজে নাম লিখা থাকতো। নাম ধরে ডাকতো এবং বলতো “তোম খাড়া হো যাও।” খাড়া হয়ে গেলে পিছনে ঐ দড়ি দিয়ে কষে হাত বাধতো এবং টেনে মাঠের মধ্যে ১০০/১৫০ গজ দূরে নিয়ে যেত। তারপর শোনা যেত গুলির আওয়াজ। যতগুলি লোক ধরে নিয়ে যেত ঠিক ততটি গুলি করতো। প্রত্যেক রাতে ৭/৮/৯/১০টা করে লোক এমনি করে হত্যা করেছে। এ সময় প্রত্যেক দিন আমার উপর অমানুষিক অত্যাচার করেছে।

১৩ দিন পর বিকেলে নাকে লোহার পাত দিয়ে পিছনে হাত বেঁধে (ডাবল হ্যান্ডকাফ দিয়ে) জাহাঙ্গীর পরিবহনে (রাজশাহীর একটি বাসের নাম যা এখনো আছে) করে নাটোর এম, পি, এইচ, কিউ ফুল বাগানে পাঠায়। বাসের দরজা জানালা বন্ধ অবস্থায় ছয়জনের গার্ডে নাটোর পৌঁছায়। সেখানে প্রায় আধ ঘন্টা ছিলাম। সে সময়ই এমপিরা (MP = Military Police) পালাক্রমে প্রহার করে এবং অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় গালি গালাজ করে। তারপর নাটোর জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়।

জেলখানায় হাত খোলা অবস্থায় হাজত ঘরে বন্দী করে রাখে। সেখানে আরও ৫০/৬০ জন লোক ছিল। ৫/৭ দিন আমি সেখানে ছিলাম। সেখানে একজন এফআইটি প্রত্যহ আসত এবং পালাক্রমে সকলের জবানবন্দী নিত। জবানবন্দী নেবার আগে এক পশলা প্রহার করে নিতো। সকাল, বিকাল ও দুপুরে এই কাজ করতো। জবানবন্দী হয়ে গেলে ঐ সময় আমাকে জেল ঘরে পাঠায়। সেখানে আমরা ৬২ জনের মত লোক ছিলাম।

জেলখানায় থাকার সময় আমাকে একদিন বের করে মেঝের উপর হাঁটুর মধ্যে দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে কান ধরে রাখতে বলে এবং ঐ অবস্থায় ৫০/৬০টি বেত মারে। আমি পড়ে গেলে আমাকে আবার তুলে উপুড় করে শুইয়ে দেয়। এছাড়া কখনো হাত-পা ফাঁক করে দাঁড় করিয়ে রাখতো। কখনো বা টান উপর করে বুকডন দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ঘন্টা খানেক করে রাখতো। তাছাড়াও উপুড় করে শুইয়ে রেখে দুজন সিপাই একই সঙ্গে পিঠের উপর খুচত। বেত পিটানো তো নিয়মিতই হচ্ছিল। প্রত্যেক দিন বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ১৬২ জন ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, মাস্টারসহ বিভিন্ন ধরণের লোককে অত্যাচার করতো। মাঝে মধ্যে ২০/২৫ জন লোককে ধরে ফুল বাগানে নিয়ে গিয়ে পাথর বালি বইয়ে নিত।

এ সময় নামাজ পড়তে চাইলে তারা বলত “তোম লোগ কাফের হ্যায়, নামাজ কিউ পড়তা হ্যায়?” তাছাড়া নামাজ পড়তে দেখলে তারা দাঁত বের করে হাসতো।

পরবর্তীকালে এফ,আই,ও রা আবার নাটোর রিক্রিয়েশন ক্লাবে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। সে সময় এক ধরনের কালো রাবারের পাইপ দিয়ে প্রহার করতো। ৫ই সেপ্টেম্বরের সপ্তাহখানেক আগে সামরিক আইনের ১৮ ধারা মতে (সামরিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করা) চার্জশীট দাখিল করে। বিচার শুরু হবার আগেই ইয়াহিয়ার সাধারণ ক্ষমায় আমি ছাড়া পাই।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

।। ৪৫ ।।
মোঃ ওমর আলী শেখ
গ্রাম- গৌরসহর পুর
থানা- চারঘাট
জেলা- রাজশাহী

১৯৭১ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে খান সেনারা গোলাগোলি করতে করতে বাড়ি ঘর জ্বালাতে জ্বালাতে আসতে লাগলো। পাক সেনাদের ভয়ে আমরা নিরাপদ জায়গায় আত্মগোপন করে তাদের গতি লক্ষ করতে থাকলাম। তারা সারদা পুলিশ ট্রেনিং একাডেমীতে যায়। প্রাণভয়ে যে সমস্ত লোক পদ্মানদীর ধারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরকে ঘেরাও করে ধরে প্রায় আনুমানিক ১২০০/১৩০০ লোককে গুলি করে হত্যা করে এবং পড়ে সকলকে একত্রিত করে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ইহার দুই ঘন্টার মধ্যেই তারা রাজশাহীতে চলে যায়।

পরের দিন সিএফ পুলিশ নিয়ে এসে এখানে রাখে এই অঞ্চলকে তাদের আয়ত্তে রাখার জন্য। শুধু তাই নয় তাদের সাথে আরো কিছু মিলিশিয়া জমায়েত করে রাখলো।

ইহার ২/৩ দিন পড়ে ভারী ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে পুরা ক্যান্টনমেন্ট স্থায়ী করে। তারা বাজার লুট করতে লাগলো, গ্রামে গ্রামে গিয়ে যারা পালিয়ে গিয়েছে তাদের বাড়িঘর ভাঙ্গতে লাগলো এবং মালামাল লুট করতে থাকে।

খান সেনারা পূর্ণ ক্যান্টনমেন্টে স্থায়ী করার পর শান্তি কমিটির সদস্যরা তাদের স্বার্থসিদ্ধিতে অক্ষম হলে ঐ সমস্ত ব্যক্তিদেরকে ধরে মিলিটারীর হাতে দিতো। তাছাড়া পাশবর্তী গ্রাম থেকে সন্দেহজনক লোককে ধরে এনে খান সেনাদের হাতে দিত। তাদেরকে বিভিন্ন দোষে দোষারোপ করে জরিমানা করা হতো, যদি জরিমানা দিতে অক্ষম হতো তাহলে তাকে জবাই করে হত্যা করা হতো। আর যারা জরিমানা দিতে পারতো তাদেরকে তখনকার মতো ছেড়ে দেওয়া হতো।

খান সৈন্যরা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে নারীদের উপর পাশবিক অত্যাচার করতো। এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ কিছু নারী নিয়ে এসে তাদের যৌনক্ষুধা নিবারণ করতো। এইভাবে তারা ৮ মাসে প্রায় ২৬০০/২৭০০ লোককে হত্যা করে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ ওমর আলী

।। ৪৬ ।।
মোঃ আনিসুর রহমান
গ্রাম- বাজে গোয়ালকান্দি
ডাকঘর- গোয়ালকান্দি
থানা- বাগমারা
জেলা- রাজশাহী

১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে শান্তি কমিটির সদস্যরা গাঙ্গোপাড়া হিন্দু বর্ধিষ্ণু গ্রামে হানা দেয়। সেখানে গ্রামে মুসলিম লীগ ও জামাতে ইসলামী পন্থীদের সহায়তায় তারা হিন্দুদের বাড়িঘর লুটপাট করে। সমস্ত কাপড়-চোপড়, সোনাদানা, থালাবাসন লুটপাট করে। এমন কি ঘরে মেঝে, পুকুর ঘাটের সিঁড়ি কোদালী, পাশ দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে। তাদের ধারণা সেখানে লুকানো সম্পদ আছে। ঘরের জানালা কপাট খুলে নিয়ে যায়। ধানচাল, গরুবাছুর ইচ্ছামত নিয়ে নেয়। তাদের অনেকে বাস্তুভিটা ত্যাগ করার আগে পাকশাক করে শেষবারের মতো সকলে মিলে চারটি খেতে চেয়েছিল। কিন্তু শান্তি কমিটির লোকেরা তাদের সে সুযোগটুকুও দেয়নি। এমনকি অনেকে যখন ভাত থালে বেড়ে নিয়ে খেতে বসেছিল ঠিক সে সময় তাদের থালাতে লাথি মেরে থালা ফেলে দিয়েছে, খেতে দেয়নি। বলেছে, “পাকিস্তানের ভাত তোদের জন্য হারাম, শীঘ্র পালা, প্রাণে মারলাম না, সেটা শুধু আমাদের দয়া।”

অনুরূপভাবে জিনিসপত্র গরুবাছুরের তালিকা করে হিন্দুদের উচ্ছেদ করা হয় সেন পাড়া, ভবানীগঞ্জ, খাজাপাড়াসহ থানার সমস্ত হিন্দু এলাকা থেকে।

২৩শে এপ্রিল, ৯ই বৈশাখ বিকাল চারটার দিকে শান্তি কমিটির আমন্ত্রণে পাক সৈন্যরা তাহিরপুরে আসে। ঐ দিন ছিল তাহিরপুরের হাটবার। সৈন্যরা হাটে এসে সমগ্র হাটে বিক্ষিপ্তভাবে পজিশন নেয় এবং ১৩ জন লোককে ধরে গুলি করে হত্যা করে। এদের অধিকাংশই হিন্দু ছিল। মিলিটারীরা দাড়িয়ে থেকে হাট লুট করার নির্দেশ দেয়। কেউ অস্বীকার করলে বেদম প্রহার করে। ফলে হাট যথেচ্ছভাবে লুট হয়।

যে সকল হিন্দু দেশের মায়া ত্যাগ করতে না পেরে তখনো ছিল তাদের জোরপূর্বক মুসলমান করা হয়।

মুসলমান হবার সময় দেওয়া হয় মাত্র ৪৮ ঘন্টা। এতে নিরুপায় হিন্দুরা গত্যন্তর না দেখে মুসলমান হয়। একদিনেই ৩০০/৩৫০ জন হিন্দু সপরিবারে মুসলমান হয়। একমাত্র গোয়ালকান্দি ও উর্দুপাড়া গ্রামেই ১৩০ জন হিন্দু মুসলমান হয়। ধর্মান্তরিত করার পরেও তাদের মনের ঝাল মিটেনি। হিন্দুদেরই চালডাল, গরু ছাগল জবাই করে গোয়ালকান্দির মাদ্রাসা মাঠে ঘটা করে মজলিশ করে। উদ্দেশ্য ছিল, হিন্দুদের গোমাংশ ভক্ষন করিয়ে চিরতরে ধর্মচ্যুত করা।

মে মাসে সেন পাড়া গ্রাম থেকে বাঙ্গাল পাড়ার ইয়াছিন আলীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ইয়াছিন আলী সেন পাড়ায় তার শ্বশুরবাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন। তারপর তার আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। সেই এই থানার প্রথম শহীদ ব্যক্তি। বাংলা আষাঢ় মাস ছিল তখন।

শান্তিকমিটি গঠিত হবার পর পরই শান্তিকমিটির লোকেরা দুষ্কৃতিকারীর তালিকা তৈরি করে। আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রথম শ্রেণির একনিষ্ঠ কর্মীদের নামের তালিকা তৈরি করে। তাতে জনাব সরদার আমজাদ হোসেন এমপি, বাজে গোয়ালকান্দি গ্রামের আনিসুর রহমান, খামার গ্রামের কাজী সাজেদুর রহমান, থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল ইসলামসহ প্রায় ২২/২৩ জনের তালিকা তৈরি করে। সরদার আমজাদ হোসেন সাহেবকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে ১৫ হাজার টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়। এছাড়া আনিসুর রহমানসহ আরও কতিপয়কে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫ হাজার টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়।

মে মাসের মধ্যেই রাজাকার তৈরি করা হয়। এতে বহু ক্ষেত্রে জোরজবরদস্তি ও ভীতি প্রদর্শন করা হয়। প্রতিটি ইউনিয়নে রাজাকার মোতায়েন করার কথা থাকলেও তাহিরপুর এবং থানা ছাড়া কোথাও মোতায়েন করা সম্ভব হয়নি। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতায় তারা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

৩রা আশ্বিন রাতে রায়পুরা গ্রামে হানা দিয়ে সরদার ওসমান আলী সাহেবের বাড়িঘরের সমস্ত জিনিসপত্র লুটপাট করে এবং তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেয়। আগুন লাগিয়ে দিতে থাকাকালে অন্য আর এক রাজাকারের কৃপায় বেঁচে যান। তাঁর পাটের গুদামে আগুন লাগিয়ে দেয়। এমনিভাবে থানার বিভিন্ন স্থানে লুটপাট করে। বেউকালীতেও অপারেশন করে লুটপাট করে, বেলসিংহেও লুটপাট চালায়।

পাক মিলিটারীরা থানার বিভিন্ন স্থানে অপারেশন করে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নরহত্যা ও নারী নির্যাতন করে। মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের খবর পেয়ে মিলিটারীরা ভবানীগঞ্জ অভিমুখে যাত্রা করে। আগস্ট মাসের পর কোন এক সময়ের ঘটনা। সমস্ত ভবানীগঞ্জ বাজার লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ভবানীগঞ্জ গ্রামের বেশ কিছুসংখ্যক মহিলার উপর নির্যাতন চালায়। বলা প্রয়োজন উক্ত গ্রাম ধর্মভীরু গোঁড়া মুসলমান বসতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে তারা প্রায় সকলেই পাকিস্তানী সমর্থক ছিল। তবুও খান সেনারা তাদের পাশবিক অত্যাচার করে। তারা উত্তর একডালা গ্রামের শাহ মুহম্মদ জাফর উল্লাহ এম, এন, এ-র বাড়ি সম্পূর্ণ ভস্মীভুত করে দেয়।

খান সেনা ও রাজাকার দল হাজিরকুশলা গ্রামে সরদার আমজাদ হোসেনের বাড়ি অপারেশন করতে যাওয়ার পথে গোয়ালকান্দির নওমুসলিম পাড়া অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেয়।

বাগমারা থানায় রাজাকার ও আধা মিলিটারীদের ক্যাম্প ছিল তাহিরপুর, বাগমারা থানা এবং বালানগর মাদ্রাসা। উল্লিখিত স্থানে সমানে লোক হত্যা করা হতো। জবাই করে, গুলি করে এবং বস্তায় পুরে পানিতে ফেলে দিয়ে লোক হত্যা করতো। বহুসংখ্যক লোক উক্ত তিন স্থানে তাদের হাতে পাশবিকভাবে মারা যায়।

স্বাক্ষর/-
মোহাম্মদ আনিসুর রহমান
১৭/০৯/১৯৭২

।। ৪৭ ।।
দেলজান বিবি
সাং- বাগমারা
জেলা- রাজশাহী

রমজান মাসের রোজা ছিলাম। বহুসংখ্যক পাকিস্তানী বর্বর সৈন্য আসে এবং কোন রকম পালানোর সুযোগ না দিয়েই তারা আমার ঘরে ঢোকে এবং ধরে পাশবিক অত্যাচার শুরু করে। চিৎকার করবার অথবা সাহায্যের জন্য ডাকাডাকি শুরু করলে তারা আমাকে হস্তদ্বারা প্রহার করে এবং গুলি করে হত্যা করবে বলে ভয় দেখায়।

টিপসহি/-
দেলজান বিবি
সেপ্টেম্বর, ১৯৭২

।। ৪৮ ।।
সোনাভান খাতুন
সাং- বাগমারা
জেলা- রাজশাহী

রমজানের ১২/১৪ দিনের দিনে একদিন দুপুরে দুজন মিলিটারী যখন গ্রামের মধ্যে আসে তখন গ্রামের আর সকলের সাথে আমিও পালাতে চেষ্টা করি। কিন্তু বর্বর পশুরা আমাকে পথের মাঝখান থেকে তাড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসে এবং আমাকে ধরে। কাঁদলে অথবা চিৎকার করার চেষ্টা করলে তারা রাইফেল উচিয়ে বলে চেঁচালে গুলি করে হত্যা করবো।

আমার উপর দুজন নরপশু অমানুষিক হৃদয়হীনভাবে পাশবিক নির্যাতন করে। আমি মাটির তলে লুকালে তারা সেখান থেকে আমাকে টেনে বের করে।

টিপসহি/-
সোনাভান খাতুন
সেপ্টেম্বর, ১৯৭২

।। ৪৯ ।।
এল, পাইনস
বনপাড়া মিশন
থানা- বড়ইগ্রাম
জেলা- রাজশাহী

২০শে এপ্রিল ১৯৭১ সাল। মিলিটারীরা বনপাড়ার আশেপাশে আসে এবং বিক্ষিপ্তভাবে গোলাগুলি চালালে হারোয়াতে চারজন লোক মারা যায়। তারপর থেকে মাঝে মাঝে পাক নরপশুরা অপারেশন চালাতে থাকে। তার প্রতিক্রিয়ায় বনপাড়া এলাকার বিভিন্ন গ্রাম থেকে অমুসলমানরা পালিয়ে আসে মিশন হাসপাতালে। মিশন হাসপাতাল কতৃপক্ষ তাদের খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা যত্নসহকারে করতে থাকেন। তখন অবশ্য পাক সৈন্যরা নাটোর ও রাজশাহীতে চলে গিয়েছিল। তখন স্থানীয় দুষ্কৃতিকারীরা হিন্দুদের ক্ষতিসাধন করে। তাদের পরিত্যাক্ত বাড়ি-ঘর লুট করে। তখন থেকেই ২/১ জন অমুসলমান ওপার বাংলায় পালিয়ে যেতে থাকে।

২রা মে রাতে অমুসলমানরা ওপার বাংলায় চলে যাবে বলে স্থির করেছিল। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের দরুণ সেদিন যেতে পারেনি।

৩রা মে। বিকাল সাড়ে তিনটার সময় মিশনের ফাদার লক্ষ্য করলেন যে, মিশন হাসপাতালের চারিদিক মিলিটারীরা ঘিরে নিয়েছে। তার কিছুক্ষণ আগে বনপাড়া সংলগ্ন অন্যান্য গ্রাম থেকে খৃস্টান পুরুষদের ধরে নিয়ে এসেছে। ধরার অভিযান পরিচালনা করেছিল মেজর শেরওয়ানী। পড়ে ফাদারের সুপারিশে সমস্ত খৃস্টানদেরকে নরপশুরা ছেড়ে দেয়।

তারপর নরপশুরা মিশনের অফিস, স্কুলঘর, মহিলা হোস্টেল তল্লাশি করে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও হিন্দুদেরকে খুঁজতে থাকে। খোঁজাখুঁজির পর সর্বমোট ৮৬ জন মানুষকে বের করে ও বন্দী করে। অবশ্য অল্প বয়সের ছেলেরা ও বৃদ্ধেরা রেহাই পেয়েছিল তাদের মনোভাবের উপর নির্ভর করে। তারপর বন্দী লোকদেরকে ধরে নিয়ে মোড়ে ট্রাকের অপেক্ষায় পথপানে চেয়ে থাকে। সত্যি সত্যিই যখন সামরিক ট্রাক এসে হাজির হলো তখন ট্রাকে তুলে ৮৬ জন মানুষকে নিয়ে যায় হত্যা করার জন্য। পথিমধ্যে এক বৃদ্ধকে রেহাই দিয়ে অন্যান্য বন্দীদেরকে নির্মমভাবে প্রহার করতে করতে নিয়ে যায় তাদের নির্দিষ্ট স্থানে। ৮৫ জন লোককে নিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে অনিল নামক একজন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। এ ঘটনা অবশ্য ফাদারের শোনা। দোয়াদপাড়া ব্রিজে নিয়ে হত্যা করা হয়। অনিল ফাদারকে বলে যে, এখান থেকে মাইল দুই নিয়ে যেয়ে রাইফেলের গাদা দিয়ে অমানুষিকভাবে ট্রাকের উপরেই প্রহার করা শুরু করে। দেয়াদপাড়া ব্রিজের কাছে একটি জলাশয়ে নিয়ে যেয়ে উপরে উল্লিখিত মানুষগুলোকে ২/৩ জন করে ধরে নিয়ে গুলি করতে থাকে। আনিলকে গুলি করে কিন্তু সে আঘাতে মরেনি। নাটোরের হাফিজ আবদুর রহমান অন্যান্য অপারশনের মত এখানেও উপস্থিত ছিল। সবশেষে আহত লোকদের উপর মেশিনগানের স্প্রে শুরু করে। অনিলের উরুতে মেশিনগানের একটি গুলি লাগে। এতেও সে খুব বেশী আহত হয় না। ফলে রাতে বর্বররা সরে গেলে সে আস্তে আস্তে স্বগ্রামে ফিরে আসে।

পাক বাহিনী যাবার আগে গ্রামবাসী মুসলমানদের ডেকে এনে এই স্তূপীকৃত মানুষগুলির উপর মাটিচাপা দিতে নির্দেশ দেয়। পরবর্তীকালে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী অত্যাচার করতে সুযোগ পায়নি এই কারণে যে পাক সৈন্যদের সাথে একজন খৃস্টান মেজর ছিলেন যিনি প্রায়ই আসতেন। গীর্জার ফাদারের অনুরোধে, মেজরের সক্রিয় হস্তক্ষেপে অত্র এলাকার মানুষ যথেষ্ট রক্ষা পেয়েছে। একবার ৬ জনকে এ এলাকা থেকে নাটোরে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তারা আর ফিরে আসেনি। পরবর্তীকালে তিনজনকে ধরে নিয়ে যাবার পর ফাদারের সুপারিশে তারা রেহাই পান। পরবর্তীকালে আবার পাঁচজনের উপরে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি হলে ফাদারের সুপারিশে তারাও মুক্তি পান।

স্বাক্ষর/-
এল, পাইনস
২৭/০৯/১৯৭২

।। ৫০ ।।
কদভানু বেওয়া
গ্রাম- দুর্গাপুর
থানা- দুর্গাপুর
জেলা- রাজশাহী

২৪শে আষাঢ় মঙ্গলবার খুব ভোরে পাক সৈন্যরা গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং সাথে সাথে ফাঁকা গুলি করে এবং লোক দেখেও গুলি করে।

আমার বাড়ির সামনে সামরিক গাড়ি দাঁড় করায় এবং আমার বাড়ি ঢোকে। এবং বন্ধু বন্ধু বলে ডাকে। আমাদের চেতন পাবার আগেই ঘরের দরজা ভেঙ্গে ফেলে। ইতিমধ্যে আমরা চেতন পেয়ে যাই। আমি সাড়া দিলাম এবং তারা কে জানতে চাইলাম। তারা বলে যে তারা থানার লোক। অতঃপর তারা আমার স্বামীকে ঘরের ভিতর থেকে টেনে বের করে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে। দুজন আমার স্বামীকে ধরে রাখে এবং একজন আমার পিছু নেয় এবং সে বার বার আমাকে ঘরের মধ্যে যেতে বলে। আমি পায়খানায় যেতে চাই কিন্তু সে পায়খানায় যেতে হবেনা বলে জানায়। কিন্তু সকাল বেলা পায়খানা প্রশ্রাব করতে দেবে না এ কেমনতর কথা বলে রেগে উঠি এবং একটি পানির বদনা নিয়ে মেয়েকে নিয়ে বাড়ির বাইরে যাই এবং অন্য এক বাড়ির গোয়াল ঘরে আশ্রয় নেই। আমি যখন যাচ্ছিলাম তখন ঐ লোকটি “কাঁহা যাতা হ্যায়” বলে পিছে পিছে যেতে থাকে।

বহুক্ষণ এখানে লুকিয়ে থাকার পর যখন বেরিয়ে আসি তখন আমার স্বামীকে চোখ খোলা অবস্থায় পশ্চিম দিকে মাথা পড়ে থাকতে দেখি এবং তখনই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। বলা বাহুল্য আমার স্বামীকে তারা গুলি করে হত্যা করে যায়।

টিপসই/-
কদভানু বেওয়া

।। ৫১ ।।
আবদুল মালেক
দুর্গাপুর
রাজশাহী

“শান্তিকমিটি ও রাজাকারদের সবরাহকৃত তথ্যের উপর ভিত্তি করে মিলিটারীরা বিভিন্ন এলাকায় এসে অপারেশন করেছে। তারা লুটপাট করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, নারী ধর্ষণ করেছে এবং মানুষ হত্যা করেছে। তাদের অপারেশনগুলির মধ্যে নিম্মোক্তগুলি প্রধানঃ

তারা মে মাসের মাঝামাঝি যোগীদের পালশায় অপারেশন করে ৪২ জন হিন্দুকে হত্যা করে। সেখানে মেয়েদের উপর অত্যাচার করেছে।

জুন মাসে তারা দুর্গাপুরে অপারেশন করে ৮/৯ জনকে হত্যা করে। এখানেও তারা হৃদয়হীনভাবে নারী নির্যাতন করে। তাদের নির্যাতনের ফলে জনৈক অফিসারের একটি মেয়ে মারা যায় এবং অপর একজন পঙ্গু হয়ে যায়। এখানে তারা লুটপাট করে।

১লা রমজান শুক্রবার পাক সেনারা গগণবাড়িয়ায় অপারেশন করে। এখানে ত্রিমুখী অভিযান চালিয়ে ১০/১১ শত জন লোককে ধরে এনে তাদের দিয়ে গর্ত করিয়ে নিয়ে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়ে রাখে। এখানে কচি শিশুদের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। তাদের অপরাধ তাদের মায়ের উপর যখন পশুরা অত্যাচার করছিল তখন তারা কাঁদছিল। এখানে ১০০ বছরের উপর বয়স্ক অন্ধ একটি বৃদ্ধকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। গ্রামে আগুন দিলে মেয়েরা যখন প্রাণভয়ে মাঠে পালায় তখন সেখানেও তাদের ধরে শ্লীলতাহানি করে। বাপের সামনে মেয়েকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে নির্যাতন করেছে।

স্বাক্ষর
সরদার আবদুল মালেক

।। ৫২ ।।
মোঃ সাজ্জাদ হোসেন
নওগাঁ
রাজশাহী

“একদিন বিকেল বেলা আমি দৈনন্দিন কাজ সেরে বাসায় ফিরছিলাম। বাসায় ফিরে বিপুলসংখ্যক পাক সৈন্য ও বিহারীদেরকে দেখতে পাই। কয়েকজন বিহারী আমার বাসার গুরুত্তপূর্ণ মূল্যবান উপকরণগুলো খুলে নিচ্ছিল। আমি সরলভাবে প্রতিবাদ জানাই জনৈক পরিচিত বিহারীকে। উক্ত কুখ্যাত বিহারী আমার জীবনের ক্ষতির হুমকি প্রদান করে এবং ঘরের ভিতরে অবস্থানরত কুখ্যাত মেজর বাংলাদেশের পতাকা হাতে রাখে ও আমাকে অভিযুক্ত করে কারণ আমি আওয়ামী লীগের নেতা ছিলাম বলে উক্ত মেজরের ধারণা ছিল। পরে বিহারী ও পাক সৈন্যরা আমার বাসা লুট করে অনেক মালামাল নিয়ে যায়। বলা প্রয়োজন ঐ দিনই আমাকে ধরে ইপিআর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে আমার অফিসের একজন কর্মচারীর সুপারিশে সেবারের মত মুক্তি পাই। কিন্তু আমাকে কাজে যোগদান করতে বাধ্য করা হয়।

ঘটনা প্রবাহের অবনতির সাথে সাথে আমি জনগণের ভাগ্যের সাথে ভাগ্য মিলিয়ে আমার অফিসের কাজ করতে থাকি। কিছুদিন পর অত্র শহরের পাঞ্জাবী এসডিও দুষ্কৃতকারীদের হাতে নিহত হন। উক্ত এসডিওর হত্যার পরে বিহারী ও পাক সৈন্যদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। পাক দস্যুরা বিহারীদের যোগসাজশে হত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। হঠাৎ জুলাই মাসের ১৫ তারিখে আমার বাড়ি ঘেরাও করে। ঘেরাও করার পরে কুখ্যাত মিলিটারী ও বিহারীরা তথাকথিত এসডিওর হত্যাকারী বলে বিবেচনা করে। এখানে প্রকাশ করা প্রয়োজন যে জনৈক বিহারী দৃঢতার সাথে বলে যে, উক্ত এসডিওকে দুটি ছোরা দিয়ে আমি নিহত করেছি এবং ছোরার সাথে তাজা রক্তের ছাপ ছিল। তার সাক্ষ্যে পরে আমার দুই হাত বেঁধে নিহত এসডিওর বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে একজন কর্ণেল, একজন মেজর ও কিছুসংখ্যক সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিল। তারা আমাকে বেদম প্রহার করে। রাইফেলের বাঁট, কিল, ঘুষি, লাথি মারতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ প্রহার করার পর আমি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাই। পরে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আমাকে নওগাঁর ইপিআর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ক্যাম্পে যাবার পরে আমি অনেক বিহারী ও মিলিটারীদের দেখতে পাই। পুনরায় পাক কুকুরেরা আমাকে প্রহার করতে থাকে। প্রহার করার পরে আমাকে ক্যাম্পের সংলগ্ন একটি ছোট প্রকোষ্ঠে রেখে দেয়। সেখানে ৪/৫ জন লোক থাকার মত জায়গা ছিল অথচ উক্ত প্রকোষ্ঠে প্রায় ২৪/২৫ জন বাঙ্গালী নিরীহ মানুষকে আটকিয়ে রেখেছিল। সেখানে আমি আটদিন অবস্থান করেছিলাম। আটদিনের প্রায় প্রতিদিনই বেদমভাবে প্রহার করতো। পাক বর্বররা পরিমিত খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় সরবরাহ করতো না। ২/৩ দিন পরে পরে কিছু কিছু করে খাবার দিতো কিন্তু তা খাবার অযোগ্য আহার্য ছিল।

বন্দীখানায় অবস্থান করার পর আমি প্রত্যেক দিনই ফুটো দিয়ে দেখতাম যে ২০/২৫ জন করে নিরীহ লোকজনকে মারধর করার পর হাত উল্টো করে বেঁধে ও চোখ বেঁধে বেয়োনেট দিয়ে বুক চিরে রাস্তায় ফেলে রাখত। পরে মৃতদেহগুলিকে নিকটস্থ নদীতে নিক্ষেপ করত। উপরে উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় আটদিনে তারা ২৫০ জন নিরীহ বাঙ্গালিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে বলে আমি অনুমান করি। একমাত্র আমিই অফিসের কতৃপক্ষের সুপারিশে মুক্তি পাই।“

স্বাক্ষর
মোঃ সাজ্জাদ হোসেন
এস, ডি, ও অফিস, নওগাঁ

।। ৫৩ ।।
জয় মণ্ডল
গ্রাম- চকরামপুর
নওগাঁ
রাজশাহী

“২৫শে মার্চের ঘটনাপ্রবাহ অত্র গ্রামের জনগণের জীবনে হতাশা নিয়ে এসেছিল। শান্তাহারে সাম্প্রদায়িক ঘটনার ফলে অত্র গ্রামটিকে পাক বর্বররা ক্ষতি করতে দ্বিধা করেনি।

৯ই বৈশাখ রোজ শুক্রবার শান্তাহার রোড হয়ে চকরামপুর গ্রামে পাক বর্বররা প্রবেশ করে। প্রবেশ করার আগে বিক্ষিপ্তভাবে চারিদিকে গোলাগুলি চালাতে থাকে। এতে জনগণের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। ফলে ধন, মাল রেখে পাইকারী হারে অত্র গ্রামের জনসাধারণ অন্যত্র পালাতে থাকে। অতঃপর পাক বর্বররা চকরামপুরের অধিকাংশ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে ও লুটতরাজ চালায়। বলা প্রয়োজন, অত্র গ্রামের সংলগ্ন খৃস্টান মিশনের সাহেবের বাড়িতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। উক্ত ঘাঁটিতে পাক বর্বররা অন্য জায়গা হতে সুন্দরী মেয়েদেরকে ধরে এনে মিশনে সাহেবের বাসার উপর তলাতে আটকে রাখত। পাশবিক অত্যাচার ও ধর্ষণ করার পরে গলা কেটে হত্যা করেছে। হত্যার পরে তাঁদের রক্ত চৌবাচ্চার নল দিয়ে স্থানীয় তুলসী গঙ্গা নদীতে পড়তো। তা ছাড়া অত্র চকরামপুর গ্রামের প্রায় ৪০ জন লোককে গুলি করে হত্যা করেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে গলা কেটে হত্যা করেছে এবং বহুসংখ্যক আহত অবস্থায় এখনো বেঁচে আছে। এক মাস অবস্থানকালে অত্র গ্রাম হতে পাক বর্বররা গরু, খাসি, হাঁস, মুরগী, যাবতীয় তরিতরকারী লুট করে খেয়েছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে অত্র গ্রামের জনসাধারণ মুক্তিবাহিনীকে খাদ্যদ্রব্য ও সর্বতোভাবে সাহায্য করেছে।“

স্বাক্ষর/-
জয় মণ্ডল
গ্রাম- চকরামপুর
নওগাঁ, রাজশাহী

।। ৫৪ ।।
মোঃ মোসলেম উদ্দিন
গ্রাম- দিঘাপতিয়া, নতুনপাড়া
পোঃ দিঘাপতিয়া, নাটোর
জেলা- রাজশাহী

“আমি ছিলাম বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সিপাহী। চার বৎসর আমি পশ্চিম পাকিস্তানে চাকুরী করেছি। পঁচিশে মার্চের কিছুদিন আগে আমি ভলান্টারী সার্ভিসে আমি চিটাগাংয়ে আসি। সেখান থেকে আমি ছুটিতে বাড়িতে আসি। তারপর বঙ্গবন্ধুর আহবানে চাকুরীতে চট্টগ্রামে যোগ দেই। ওখান থেকে ষোলশহর, কালিঘাট, ৭ নং জেটীতে পশ্চিম পাকিস্তানী বর্বরদের সাথে সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করি এবং তাদেরকে পর্যুদস্ত করি। পরবর্তীকালে সেখানের পতন ঘটলে এপ্রিল মাসের (৭১) ৫ তারিখে অনেক সঙ্গীসহ ওপার বাংলার আগরতলায় পৌছি। সেখান থেকে কিছু অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে কুমিল্লার ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ডিফেন্স দেই। তারপর পাক সৈন্যরা বিমান আক্রমণ চালালে সকলে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। এপ্রিল মাসে ২২ তারিখে স্বগ্রাম দিঘাপাতিয়ায় পৌছি।

২৪শে এপ্রিল আমার বাড়িতে একদল পাক সৈন্য এসে ঘরের দরজা ভেঙ্গে আমাকে ধরে লাথি মারতে মারতে স্থানীয় কালীবাড়িতে নিয়ে যায়। বলা প্রয়োজন, এখানে অত্যাচারের কেন্দ্রভূমি ছিল। তারা সেখানে আমার হাত পা বেঁধে পা উপরের দিকে তুলে লটকিয়ে অত্যাচার করে। সে অত্যাচারের ভিতর ছিল বেত দিয়ে প্রহার, চাকু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান কাটা। শরীর কেটে তারা আনন্দ পেত। তারা জানতে চাচ্ছিল যে চট্টগ্রামে আমি কতজন পাঞ্জাবিকে হত্যা করেছি, কতটি রাইফেল কোথায়, কিভাবে লুকিয়ে রেখেছি, বাংলাদেশ সম্পর্কীয় কি কি তথ্য আমি জানি।

আমার কাছ থেকে কোন তথ্য উদঘাটন করতে ব্যর্থ হলে তারা আমাকে কালীবাড়ি থেকে নাটোরের ফুলবাগানে অপারেশন ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে বৈদ্যুতিক শক আমার গলায় দেওয়া হয়। হাত-পা বেঁধে ডেকচির মধ্যে করে পানির হাউজে নিক্ষেপ করে। ১০-১২ মিনিট সেখানে রাখার পর অর্ধমৃত অবস্থায় সেখান থেকে তুলে আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। সেখানেও তারা ব্যর্থ হবার পর আমাকে বেয়োনেট চার্জ করতে নিয়ে যায়। এ সময় ছিল সন্ধ্যার কিছু আগে। তখন আমার হাত পিছনে বাঁধা ছিল। বলা প্রয়োজন, এর কিছু আগে আমার সাক্ষাতেই চারজন লোককে গুলি করে হত্যা করে। পরে আমাকে নিয়ে যায়। বেয়োনেটের সামনে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলাম কৌশলে হাতের বাঁধন খুলবার চেষ্টা করছিলাম। এক সময় আমি আমার হাতের বাঁধন তাদের অগোচরেই খুলতে সমর্থ হই। ফুলবাগানের মধ্যস্থ পুকুরের চারিদিকে মিলিটারীরা তখন সশস্ত্র পাহারায় ছিল। হাতের বাঁধন খুলেই ঘুরে সঙ্গীন উচানো সিপাইয়ের হাতের রাইফেল কেড়ে পুকুড়ে ফেলে দেই এবং বক্সিং মেরে তাকে ধরাশায়ী করি। তারপর পুকুরে ঝাপ দেই। ইতিমধ্যে অবশিষ্ট সৈন্যরা পুকুরের চারিদিকে সচেষ্ট হয়ে উঠে এবং আমাকে লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলি চালানো শুরু করে। যখন পুকুরের পাড়ে উঠছিলাম ঠিক সে সময় একটি গুলি এসে আমার ডান কানে লাগে। সাথে সাথে আর একটি গুলিও আমার বাম বাহুর নিচে লাগে। এতে আমি অবশ্য খুব বেশি আহত হই না। তাদের সকলের সব রকমের অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে বর্বরদের ব্যূহ ভেদ করে পালিয়ে আখের জমির ভিতর দিয়ে ক্রলিং করে নাটোরে পৌঁছাই। শরীর থেকে তখন দরবিগলিত ধারায় রক্তপাত হচ্ছিল। উলঙ্গ অবস্থায় যখন নাটোরের সিনেমা হলের মোড়ে পৌঁছাই তখন একদল বিহারী আবার আমাকে ধরে ফেলে। সেখানেও তারা বেদম প্রহার করতে শুরু করে। পূর্বোক্ত বক্সিং প্রক্রিয়ার বদৌলতে তাদের হাত থেকেও রেহাই পাই। এবং শহরের মাঝখানে মামারবাড়িতে প্রথমে আশ্রয় নেই। কিছুক্ষণ পর আমার শ্বশুর ডাক্তার আঃ লতিফের কাছে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেই। সেখান থেকে ঐ রাতেই মেয়ের পোষাকে এক গ্রামে আশ্রয় নেই। তার ১০ দিন পর ভারতে আশ্রয় নেই। এবং সেখানে সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেই।

ফুলবাগান থেকে উধাও হবার পর পাক পশুরা আমার বাড়ি ঘেরাও করে এবং আমার বৃদ্ধ বাবা এবং মাকে মারধর করে এবং বলে যে তোমার ছেলেকে বের করে দাও, তাকে চাকুরী দেব এবং তোমার মেয়েকে আমার সাথে (জনৈক সুবেদার) বিয়ে দাও। পরবর্তী সময়ে তারা আমার বাড়ি লুটপাট করে।

আমার মতে, ফুলবাগানে ন’মাসে অন্ততঃ ১৫-১৬ হাজার লোককে পাক পশুরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ মোসলেম উদ্দিন
গ্রাম- দিঘাপতিয়া, নতুনপাড়া
পোঃ দিঘাপতিয়া, নাটোর
জেলা- রাজশাহী

।। ৫৫ ।।
ডি, এম, তালেবান নবী
প্রতিনিধি, ‘দৈনিক বাংলা’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী

“৩রা আগস্ট রাত্রি প্রায় ১১ টায় পাঞ্জাবী পুলিশ, স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর প্রধান, শান্তি কমটির সদস্য ও ভি ডি পার্টির সভাপতিসহ আমার বাড়ি ঘেরাও করে এবং প্রবেশ করে আমাকে গ্রেফতার করে। অবশ্য গ্রেফতারের পূর্বে সমস্ত বাড়ি তছনছ করে। গ্রেফতার করে সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে যায়। নিয়ে যাবার পর মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগাযোগকারী ওয়্যারলেস ও রিভলবার কোথায় রয়েছে তা জানাতে বলে। সদুত্তর না পেলে আমাকে পা ফাঁক করে বাঁশ দেয়। অতঃপর চাবুক দ্বারা বেদম প্রহার শুরু করে। প্রায় ঘন্টা তিনেক একের পর এক হাত বদল করে এমনি অত্যাচার চালায়। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি। এরপর গভীর রাতে ঐ অবস্থাতেই উঠাবসা করতে নির্দেশ দেয়। হয়তো একশ বার ঐ প্রক্রিয়া চালাতে বললে ৪০ বার করার পর বলে যে পাঁচবার হয়েছে। কিছু সময় এ অবস্থা চালিয়ে অসমর্থ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে আমাকে লাথি মেরে উঁচু বারান্দা থেকে নিচে ফেলে দেয়। সেখান থেকে আবার তুলে নিয়ে আসে এবং আবার উঠাবসা করায়। আবার পড়ে গেলে আবার লাথি মেরে ফেলে দেয় ও তুলে আনে। এমনি করে সকাল হয়ে গেলে ক্যাম্পের ভিতরে প্রধান রাস্তায় হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখে। সেখান দিয়ে যে সমস্ত সামরিক লোক চলাচল করেছে তারা সকলে আমাকে যথেচ্ছভাবে লাথি মেরে পায়ের ঝাল মিটিয়ে নেয়। সারাদিন আমি ঐ অবস্থায় ছিলাম এবং খোলা জায়গায় রোদে সমানভাবে অত্যাচারিত হয়েছি। সন্ধ্যার দিকে ঐখানেই জিজ্ঞাসা করে যে তুমি মুসলমান না হিন্দু। মুসলমান বললে আমাকে কালেমা বলতে বলে। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কালেমা বলা থেকে বিরত থাকি। তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, এখানের কলেজে কালেমা পড়া হয় কি না। উত্তরে না বললে আমাকে কাপড় খুলতে নির্দেশ দেয় এবং উলঙ্গ করে। উলঙ্গ অবস্থাতেই আমাকে ঘন্টা দুই রাখা হয়। অতঃপর পূর্ব পদ্ধতিতে আবার উঠাবসা করতে বলে। কিন্তু বসতে পারলেও কিছুতেই উঠতে পারছিলাম না। কারণ খুব নিস্তেজ হয়ে গেছি। সে অবস্থাতেও আমাকে মারধর করা হয়। তারপর আমাকে টাঙ্গানোর নির্দেশ দেয়। তখন দু’পা উপরের দিকে বেঁধে টাঙ্গিয়ে দেয়। হাত যেন কোন বাঁধার সৃষ্টি না করে সে জন্য হাত দুটিও বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর একজন সিপাইকে ডেকে চাবুক মারতে নির্দেশ দেয় এবং সেরূপ চলতে থাকে। একজন ক্লান্ত হলে আর একজন চাবুক মারত। এমনি করে তিনজন চাবুক মারার পর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। অত্যাচারের এক পর্যায়ে পানি পান করতে করতে চাইলে মুখে সজোরে লাথি মারে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। রাতের কোন এক সময় জ্ঞান ফিরে পাই। পুনরায় পানি পান করতে চাইলে পাহারারত দুইজন সিপাহীর একজন প্যান্টের বোতাম খুলে এবং মুখে প্রস্রাব করে দেয়। প্রস্রাব করে দিয়ে সিপাইটি তার নিজের আসনে ফিরে যায়। পরের দিন সকাল পর্যন্ত ঐ টাঙ্গানো অবস্থাতেই থাকি। এর মধ্যে মাঝে মাঝে সামান্য জ্ঞান ফিরে আসে এবং পর মুহূর্তেই আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। সকালের দিকে আমাকে নামানো হলে বলে যে তুমি লিখে দাও, রিভলবার ও ওয়্যারলেস কোথায় আছে, তাহলে তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। নেতিবাচক উত্তর দিলে তারা আমাকে চড়-থাপ্পড় দেয়। তারপর আমাকে এক ঘরে বন্দী করে রাখা হয়। সেদিন দিবাগত রাতে একজন মাস্টারসহ তিনজন মুক্তিফৌজকে ধরে নিয়ে আসে। রাতে তাদেরকে পিটানোর পরে তাদের কাছে স্বীকৃতি আদায় করার জন্য আমার ঘরে দেয়। রাত দুইটার দিকে জিজ্ঞাসা করলে তারা (মুক্তিযোদ্ধারা) স্বীকার করেনি বলে আমি জানাই। সারা রাত তারা আমার কাছেই থাকেন। পরের দিন রাত ১২টার দিকে সেলে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাপড় ও পায়ের জুতা খুলতে বলে এবং খুলে লুঙ্গি পড়া অবস্থায় বাইরে ক্যাম্পের পিছনে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরে বিকট আ…… চিৎকার ভেসে আসলো। এতে অনুমান করা গেল যে, বেয়োনেট অথবা ছোরা দিয়ে গুঁতিয়ে তাদের হত্যা করা হয়েছে।

এভাবে পাঁচদিন প্রায় অভুক্ত অবস্থায় থাকার পর ৭ই আগস্ট দিবাগত রাত ৯টার সময় আমাকে শর্তসাপেক্ষে ছেড়ে দেয়। শহরের বাইরে কোথাও যেতে পারব না এটাই ছিল তাদের প্রধান নির্দেশ।

২৩শে এপ্রিল {আগস্ট বা সেপ্টেম্বর হবে}শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে গোমস্তাপুরে পাক মিলিটারীরা অপারেশন করে। থানার পাশের বাজারপাড়া হিন্দু বস্তিতে গিয়ে ৩১ জন পুরুষকে ধরে নিয়ে আসে। অতঃপর সমস্ত গ্রাম পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ধরে আনা লোকদের থানার পিছন দিকে মহানন্দা নদীর তীরে ১৫ জনের প্রথম দলকে দাঁড় করায় এবং গুলি করে হত্যা করে। অপর দলের ১৬ জনকেও ঐ একইভাবে হত্যা করে। হত্যা করার পর লাশগুলিকে পেট্রোল দিয়ে জ্বালাবার নির্দেশ দিলে মৃত ৩১ জনের মধ্য থেকে অমিল কর্মকার নামে এক ব্যক্তি পুড়িয়ে দেয়ার ভয়ে লাফিয়ে ওঠে। তৎক্ষণাৎ তাকে গুলি করে হত্যা করে।

১৯শে অক্টোবর, রবিবার দিবাগত রাত্র প্রায় তিনটার দিকে পাঞ্জাব বাহিনীর দুটি ব্যাটেলিয়ান সীমান্তবর্তী গ্রাম বোয়ালিয়া ঘেরাও করে। মেজর ইউনুসের নেতৃত্বে ব্যাটেলিয়ান দুটি সকাল হওয়ার অল্প কিছু আগে মোহসীন মুন্সী আজান দেয়ার জন্য মিনারে উঠেছেন এবং আল্লাহু আকবর উচ্চারণ করেছেন ঠিক তখনই তাকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলি চালায়। সাথে সাথে গ্রামের উপর বৃষ্টির মত গুলিবর্ষিত হতে থাকে। এ গ্রামে তিন ঘন্টায় প্রায় ৬৫০ জনকে হত্যা করে। এদের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ, যুবক ও নারীও ছিল। ১৬৮০টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে। এরপর বোয়ালিয়া গ্রামসংলগ্ন নরশিরা, শাহপুরা, পলাশবোনা, দরবারপুর, কালোপুর ও ঘাটনগর বঙ্গেশ্বর গ্রামেও হামলা চালায়। এখানেও ১২০০ লোককে হত্যা করে। এ সমস্ত গ্রামও পুড়িয়ে দেয়। পাক বাহিনী হামলার সময় অসংখ্য মহিলার উপর বলাৎকার ও লুটপাট করে।

পরবর্তীকালে নরপশুরা উপরোক্ত হত্যা চালায়। এরপরে বিধ্বস্ত এ গ্রামগুলি পাঞ্জাব বাহিনী ও তার তাবেদাররা সংলগ্ন থানার নিরীহ জনসাধারণকে ধরে নিয়ে এসে হত্যামঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে। দেশ স্বাধীন হবার পর দেখা যায় যে, সমস্ত গ্রামগুলিই বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি কুয়া নরকঙ্কালে ভর্তি। অপর দিকে গ্রামগুলিতে যে সমস্ত দেওয়াল ঘর ছিল, সেসব ঘরে জনসাধারণকে হত্যা করে দেওয়াল ভেঙ্গে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। এসব গ্রামগুলির এমন বাড়ি খুজে পাওয়া যাবে না কাউকে না কাউকে সে বাড়ি থেকে হত্যা করা হয়নি। এমনও অনেক বাড়ি রয়েছে, যে বাড়ির সকলকেই পাক জল্লাদরা হত্যা করে। এমনি একটি পরিবার সেকান্দার আলী। অপর একটি পরিবার সোলেমান মিয়ার যেখানে শুধুমাত্র ছোট ছেলে বেঁচে রয়েছে। মা-বাবা, ভাইবোন সকলকে হত্যা করা হয়েছে।

স্বাক্ষর/-
ডি, এম, তালেবান নবী
প্রতিনিধি, ‘দৈনিক বাংলা’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী

।। ৫৬ ।।
মোহাম্মদ মোছাওয়ার হোসেন
গ্রাম- মাইজপাড়া, ডাকঘর- রাজারামপুর
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী

“৭১ এর ৪ঠা আগস্টের রাত সাড়ে তিনটার সময় আকস্মাৎ শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের নির্দেশে প্রায় ৫০ জন শান্তি কমিটির সদস্যসহ পুলিশ আমার বাড়ি ঘেরাও করে। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেও তাদের হাত থেকে রেহাই পেলাম না। ধৃত হওয়ার পরে আমাকে কঠোর পাহারার মাধ্যমে পথে নিয়ে এসেছে এবং থানাতে সোপর্দ করে। সেখানে আমি প্রায় ১৫ জন বন্দীকে দেখতে পাই। অবশ্য তারা অনেক আগেই ধৃত হয়েছিলেন।

পরের দিন দিবাগত রাত ৭টায় উপরোক্ত ১৫ জনকে থানায় হাজির করে এবং পাঁচজন করে করে এক একটি ব্যাচ তৈরি করে। পাঁচজনকে একটি ম্যাপ তৈরির ব্যাপারে অভিযুক্ত করে আলাদা করে রাখে এবং একমাত্র আমাকে অবাঙ্গালী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করে এবং যাদের কে হত্যা করা হয়েছে তাদের নামের তালিকা চায়। পাঁচজনের ভিতর যে দুজন বেশি দোষী বলে বিবেচনা করেন তাদেরকে থানার মধ্যেই মেজর শেরওয়ানীর নির্দেশে নির্মমভবে রোলার দ্বারা, বুকে লাথি মেরে প্রহার শুরু করে। ঐ সময় শেরওয়ানীর নির্দেশে অপর একজন সিপাহী আমাকে প্রহার করে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি অজ্ঞান হয়ে না যাই ততক্ষণ পর্যন্ত উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় অত্যাচার চালাতে থাকে। জ্ঞান হবার পর পুনরায় হাজতে নিয়ে যায়। তার পরের দিন ম্যাপ তৈরির অভিযোগে গালাগাল করে। পরের দিন সন্ধ্যায় মেজর শেরওয়ানী ১৫ জনকে জেলখানা থেকে বের করে আনার হুকুম করে। আমার তন্দ্রার ভাব হওয়াতে আমি বের হতে পারলাম না। আমি উদ্বেগের ভিতর সময় কাটাতে থাকি। প্রকাশ থাকে যে, উল্লেখিত ১৪ জনকে গুলি করে হত্যা করে মহানন্দার নদীতে ফেলে দেয়। তারা জলে ভাসতে থাকে।

পরের দিন আমি যেখানে ছিলাম সেখানে প্রায় ১০-১২ জন আসামী এলো। তাদের কাছ থেকে বিবৃতি ও জিজ্ঞাসাবাদের পর কয়েক দিনের ভিতরেই অন্যান্য সবাইকে গুলি করে হত্যা করে। এর পরবর্তী ব্যাচে জেলখানাতে উকিল, মোক্তার ও শিক্ষিত ছাত্রসহ প্রায় ৭ জন এলো, তারপর উক্ত ৭ জনসহ আমাকে আঘাত হানতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে বিবৃতি নিয়ে তাদের সবাইকে তাদের সবাইকে রাজশাহী জেলে চালান করা হচ্ছে বলা হয়। অবশ্য এটা ছিল নিছক ভাঁওতা। নবাবগঞ্জ নিউমার্কেটের একটি আলো-বাতাসহীন প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ করে রাখল। সেখানে আবদ্ধ করার পর রাত ৯টার সময় সবাইকে বাইরে নিয়ে এসে জিপে তুলে অন্যত্র নিয়ে যেতে চায় এবং কঠিনভাবে হাত বন্ধন করে। জিপে তুলে রাস্তায় নিয়ে যাবার পথে জিপ থেকে ১২ জনকে নামিয়ে রাখে এবং বেদম প্রহার করতে থাকে। পরে সারারাত ধরে নিউমার্কেটের উল্লিখিত প্রকোষ্ঠে বন্দী করে রাখে। তার আগে জিপের অন্যদেরকে মেজর শেরওয়ানী গুলি করতে নির্দেশ দেয়। তাদেরকে রেহাই ঘরের শ্মশান ঘাটে মেরে ফেলে। পরের দিন সকালে উক্ত নিউমার্কেটের আসামীগুলিকে জেলখানায় নিয়ে আসে। দুইদিন পরে মেজর শেরওয়ানী নিজেই জেলখানায় গিয়ে আমার কাছে অঙ্গীকারপত্র লিখে নিয়ে মুক্তি দেয়। ইতিপূর্বে আমার পিতার নিকট থেকেও অনুরূপ অঙ্গীকারপত্র লিখে নেয়া হয়েছিল।

স্বাক্ষর/-
মোহাম্মদ মোছাওয়ার হোসেন

।। ৫৭।।
মোঃ আল এমরান
গ্রাম- আজাইরপুর, পোঃ- রাজারামপুর
নবাবগঞ্জ, রাজশাহী

“১৯৭১ এর জুন মাসের ১৬ তারিখে রাত দুটোর সময় আমার বাড়ি ৫০-৬০ জন পাক দস্যু ঘেরাও করে। ঘেরাও করার পর বাড়ির অভ্যন্তরে প্রায় ৪০ জন পাক দস্যু ঢুকে পড়েছিল। বাড়ির সমস্ত ঘর তল্লাশী চালিয়ে আমাকে ধরে ফেলে। ধরে দু’হাত পিছনে বেঁধে নিয়ে যায়। জেলখানায় আমি ধৃত ৩০ জনকে দেখতে পাই। সেখানে দিনভর রাখার পর থানাতে নিয়ে যায়। সেখানে কুখ্যাত মেজর শেরওয়ানী আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বলা প্রয়োজন, সেখানে আরও অনেক মিলিটারী উপস্থিত ছিল। জিজ্ঞাসাবাদ করার পর মোটা বেতের লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করে। অনেকের হাত-পা ভেঙ্গে চুরমার হয়েছিল।

আমার পা হতে রক্ত ঝরছিল। পুনরায় সবাইকে জেলখানায় নিয়ে এলো। নিয়ে আসার পর রাত ১২টার পরে গুজর ঘাটের শ্মশানপুরীতে নিয়ে যায়। নিয়ে সবাইকে লাইন ধরার নির্দেশ দিল। লাইনের ভিতর থেকে ১২ জনকে বেছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। বাকি লোকগুলিকে পুনরায় জেলখানায় নিয়ে সকালের দিকে মেজর শেরওয়ানী জেলখানায় আসে। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করার পরে বেদম মারধর আরম্ভ করে জেলে যত লোক ধৃত হয়েছিল সবাইকে। শ্মশানঘাটে সন্ধ্যার সময় গুলি করার জন্য ৭ জনকে নিয়ে যায়। বধ্যভুমিতে ৭ জনকেই গুলি করে হত্যা করে। রাত ১১টার সময় উক্ত জেলখানায় দু’জন যুবতীকে ধরে নিয়ে আনে। রাত অনুমান ৪টার সময় সে কক্ষের যুবতীদের করুণ কান্নার সুর শোনা যায়; অনুমিত হয় যে তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করা হয়েছিল।

সকাল ৮টার সময় জেলখানা থেকে কয়েকজন বর্বর সৈন্য বেরিয়ে যাবার ঘন্টাখানেক পরে মেজরসহ কয়েকজন মিলিটারী যুবতীদ্ধয়কে নিয়ে বাইরে চলে যায়। শেষ পরিণতি জানা যায়নি। সন্ধ্যা ৭টার সময় বাকি সমস্ত বন্দী লোকজনকে শ্মশানঘাটে গুলি করার জন্য নিয়ে যায়। নিয়ে যাবার পর দু’জন করে লাইন করিয়ে গুলি করতে থাকে। আমাকেসহ অন্য তিনজনকে গুলি করার পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। তখন চারজনকে এক সাথে গুলি করার জন্য দাঁড় করালো। সেই মুহুর্তে একখানা সামরিক গাড়ি এসে শ্মশানঘাটে উপস্থিত হলো। গাড়ির কাছে অন্যান্য মিলিটারী যারা গুলি করছিল, তাদের হাজির হওয়ার নির্দেশ দিল। সেখানে কানা-ঘুষা হল। গুলি করা থেকে সাময়িক বিরতি নিল। পরের দিন আনুমানিক ১০টার সময় তিনজনকে ছেড়ে দেয়। আমি তাদের একজন। তিন দিনে প্রায় ৪০-৫০ জনকে গুলি করে পাক বর্বর বাহিনী হত্যা করেছিল।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আল এমরান

।। ৫৮।।
এলাহী বক্স
ফিরোজা হাউস
শিব্বাটা, বগুড়া

এপ্রিলে পাক বাহিনী রংপুর, শান্তাহার, শেরপুর – এই তিন দিন থেকে বগুড়া শহর আক্রমণ করে। তা ছাড়া বিমান থেকেও পাক বাহিনী বগুড়া শহরের উপর আক্রমণ করে। ঐ সময় শহরের লোকজন জীবনের ভয়ে কোন দিকে দৌড়াতে না পেরে পুর্বদিকে মুক্ত দেখে নদী সাঁতরিয়ে চেলোপাড়ার দিক রওয়ানা হয়। পাক বাহিনী আক্রমণ করার সাথে সাথে সমস্ত শহর ঘেরাও করে ফেলে। কাজেই জনসাধারণ পালানোর সুযোগ পায় না। পাক বাহিনীর গুলির মুখে অসংখ্য লোকজন প্রাণ হারায়। আমি নিজের বাড়ী ছেড়ে চেলোপাড়ার দিকে রওয়ানা হই। চেলোপাড়ায় যাবার সময় আমি যে দৃশ্য দেখেছি ইতিহাসে তার নজির বিরল। চার থেকে পাঁচ শতের মত লোক মৃত অবস্থায় রক্তের মধ্যে ডুবে আছে। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় তাদের মৃতদেহ পড়ে আছে। আর কুকুরেরা তাদের রক্ত পান করছে। পালিয়ে যাবার কোন উপায় ছিল না আমার। আমার মাথায় একটি টুপি ও হাতে একটি পাকিস্তানী পতাকা ছিল। আরও একজন মৌলভী এবং দুইজন লোক আমার সঙ্গে ছিল। তাদেরও মাথায় টুপি এবং হাতে পাকিস্তানী পতাকা ছিল। হঠাৎ করে একদল পাকসেনা আমাদের দেখে ঘিরে ফেলে। পাক বর্বর বাহিনী জিজ্ঞাসা করে তোমার কে? অবশ্য উর্দূতে।

জবাবে আমি বলি যে আমরা পাকিস্তানী বাঙ্গালী মুসলমান। তখন পাকসেনা কিছু সময় পর আমাদেরকে ছেড়ে দেয় এবং বলে যে তোমরা আগামিকাল সকাল ৮ টার পর আমাদের সঙ্গে দেখা করবে। কারন সন্ধ্যা ৬ টা থেকে ভোর আটটা পর্যন্ত কার্ফিউ থাকবে। পাকবাহিনীর কার্ফিউ দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, সকাল ৮ টার পর জনসাধারণকে একত্রে একযোগে হত্যা করে। আমি সেটা বুঝতে না পেরে পরের দিন আবার বাসাবাড়ী দেখার জন্য শহরের দিকে রওয়ানা হই। আসার সময় অন্য তিনজন লোক আমার সাথে ছিল। ঐ সময় কয়েকজন পাঞ্জাবী আমাদের ধরে ফেলে। ধরার পরপরই একত্রে লাইন করে রাইফেল দিয়ে গুলি করে। গুলি করার সাথে সাথে দুজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। অপর একজন বাম হাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় গর্তের ভিতরে পড়ে যায়। একজন পাঞ্জাবী এসে বেয়োনেট দিয়ে তার বুকটা চিরে দেয়। আমি সৌভাগ্যবশত গুলি না খেয়ে রক্তের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। একজন পাঞ্জাবী আমাকে পুনরায় দাঁড় করে পরপর দুই বার গুলি করে। প্রথম গুলিটি ফায়ার না হওয়ার জন্য দ্বিতীয়বার গুলি করে। ভাগ্যবশত গুলিটি আমার বাম পার্শ্বে দিয়ে চলে যায়। পাকসেনা কি যেন মনে করে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলে যে তোর হেঁয়াছে ভাগ যাও বাঙ্গালী। তখন আমি নিজের বাসার দিকে রওয়ানা হই। বাসায় আসার সময় আমি দেখতে পাই শুধু মানুষের মৃতদেহ। শহরের সমস্ত রাস্তা যেন রক্তে লাল হয়ে আছে। কুকুর তাদের মৃতদেহ নিয়ে টানাটানি করছে। আমি দেখতে পেলাম যে প্রথম দিনে খান দস্যুরা যে সমস্ত লোকজন হত্যা করেছিল সেগুলোকে শহরের রাস্তার পার্শ্বে গর্ত করে ৭-৮ জন করে পুঁতে রেখেছে। তাঁদের কারো হাত বা মাথা দেখা যাচ্ছে। কুকুরেরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাচ্ছে এই বীভৎস ও করুণ দৃশ্য দেখে চোখের পানি মুছতে আমার শিব্বাটী বাসভবনে উপস্থিত হই। বাসায় গিয়ে দেখতে পেলাম যে, একজন মেজর ও তিনজন বেলুচী সৈন্য আমার নিজস্ব ক্যাম্প খাটটি পেতে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে তারা রাইফেল নিয়ে দাঁড়ায়। আমি বকি যে, আমি পাকিস্তানী বাঙ্গালী মুসলমান। এটা আমার বাসা এবং বাসাবাড়ী দেখতেই আমি এসেছি। তখন তারা আমাকে বলে যে এটা তোমার বাসা? তোমার খুব সাহস? এই বলে আমাকে বসতে বলে এবং মাংস ও রুটি খেতে দেয়। তা ছাড়া আমাকে বলে যে তোমার কোন ভয় নাই। রাত্রিতে তুমি তোমার ঘরে শুয়ে থাকবে। আমি কোন রকমে প্রথম রাত্রি অতিবাহিত করি। এখানে উল্লেখ করা হয় যে, পাক সেনা শহরে ঢুকেই অবাঙ্গালীদেরকে ৭২ ঘন্টা সময় দিয়েছিল; বাঙ্গালীদের ধন- দৌলত লুট করার জন্য। পরের দিন সকালে খান সেনারা আমাকে সংগে করে শহরে চলে আসে। খানসেনারা আমাকে লুট করার কথা বলে। তখন আমি বলি যে, আমি লুট করব না বা আমার কোন প্রয়োজন নাই। এইভাবে তিনদিন কেটে গেল। খান সেনার চার জনের মধ্যে একজন ছিল মেজর জাকি। ৪র্থ দিনে তারা আমার বাসা ছেড়ে দিয়ে রংপুর চলে যায়। পুনরায় মেজর শাকিরিয়া আমার বাসায় চলে আসে। এসে আমাকে বকে যে, তুমি এখান থেকে চলে যাও। এই বলে আমাকে সাথে করে সার্কিট হাউসে নিয়ে আসে। সেখানে গিয়ে আমি দেখতে পেলাম, রাজশাহী ভার্সিটি থেকে ধরে আনা কয়েকজন ছাত্রী। তারা বসে বসে কাঁদছে। পাক হায়েনারা তাদের উপর অমানুষিক পাশবিক অত্যাচার করে । তাদের সারা দেহে ধর্ষনের চিহ্ন বিদ্যমান। ঐ দৃশ্য দেখে আমি মর্মাহত ও অভিভূত হয়ে পড়ি। দুই ঘন্টা পর মেজর শাকিরি আমার নিজের বাসায় ফিরে যাবার অনুমতি দেয়। কোন রকমে আমি নিজের বাসায় ফিরে আসি। এরপরেও মাঝে মাঝে খান সেনারা আমার বাসায় এসে তদন্ত চালায় এবং বলে যে তুমি মুক্তিফৌজকা লিডার বা মুক্তিদের সর্বরকমের সাহায্য কর। আমি সম্পূর্ন অস্বীকার করলে আমাকে দারুণ নির্যাতন ও প্রহার করে । দিনে-রাতে সব সময় আমার বাসায় এসে খান দস্যুরা অমানুষিক অত্যাচার করত। আমার দুই ছেলে মুক্তিযোদ্ধা ছিল বলে খান সেনারা সব সময় দুই ছেলেকে খুঁজে বেড়াত । এরপর আমার বাসায় একটানা এপ্রিলের ২০ তারিখ থেকে সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ পর্যন্ত অতিবাহিত করি। ১৪ ই সেপ্টেম্বর তারিখে নিজ ছেলে-মেয়ে এবং পরিবার বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে আসি। এরপর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সহায়তায় বগুড়া শহর মুক্ত হয়ে যায়। বগুড়া শহর ও বাংলাদেশের জয়ের পতাকা উত্তোলিত হয়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ এলাহী বক্স

।। ৫৯।।
শ্যামল রায়
মালতী নগর, থানা- সদর
জেলা-বগুড়া

প্রবল গুলি ও গোলাবর্ষনের ভেতর দিয়ে বর্বর পাক বাহিনী ট্যাঙ্ক সহকারে বগুড়ায় প্রবেশ করে। শুরু হলো নরপিশাচদের ‘বাঙালী চোষা’ বিহারী বেঈমান সহযোগে শহরের বুকে তান্ডব নৃত্য। লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, খুন, তৎসহ ধর্মীয় স্থান কলুষিত ও বিধ্বস্ত করায় মত্ত হয় তারা।

২৫ শে এপ্রিল রবিবার হঠাৎ করেই গ্রামের বাসা হতে গুলি ও ব্রাশফায়ারের শব্দ শুনে বুঝতে দেরী হয়েছিলো না যে, পাকবাহিনী বগুড়া হতে বড় রাস্তা ধরে এদিকে এগিয়ে আসছে (সিরাজগঞ্জ ও উল্লাপাড়ার দিকে)। কিছুক্ষন পর দক্ষিন-পূর্ব কোণ হতে কালো ধোয়ার কুন্ডলী আকাশে উথিত হতে দেখা গেল। অনেকে বললেন কুমারেরা হাঁড়ি পোড়াচ্ছে। কিন্তু সব ধারনার অবসান হল তখনই, যখন শুধু এক জায়গাতে নয়, সমস্ত পশ্চিম দিক হতে ধোঁয়া আর আগুনের লাল আভা দেখা যেতে লাগল। যতই আধাঁর নামছিল আগুনের লেলিহান শিখা ততই প্রকট হয়ে ফুটে উঠছিল চোখের সামনে। আগুনের সঙ্গে সঙ্গে গুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল উল্লাপাড়ার দিক হতে।

পরের দিন শুনলাম চাঁদাইকোনার প্রত্যক্ষদর্শীর এক বিবরণ। তারা লোকজন ডেকে এনে লুট করিয়েছে বাজার এলাকা। অনেক স্বেচ্ছায় এসেছে লুট করার লোভে। লুট করার সময় তারা ছবি তুলেছে। লুটপাট হয়ে গেলে আগুন ধরানোর পালা। আগুনও দিয়েছে লোকজনের সহায়তায়। আগুন ধরানোর সময় তারা ছবি তুলেছে। আর সব কাজ হাসিল করার পর বিক্ষিপ্তভাবে গুলিবর্ষণ করে জনসাধারণকে করা হয়েছে হত্যা। এরকম আরও ঘটনা। খাওয়ানোর নাম করে ডেকে এনে লাইন করে গরীব গ্রামবাসী নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

পরের দিন শুরু হলো সিরাজগঞ্জে ঐ একই দৃশ্যের অবতারণা। ৩-৪ দিন ধরে চলে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, খুন ইত্যাদি। বাসার এত কাছে ঐ সব হচ্ছিল যে, ছাই এসে পড়ছিল বাসার মধ্যে। গ্রামের ও আশেপাশের অনেক লোক শহরে গিয়ে আর ফিরে আসতে পারেনি। এর সংগে সংগে গ্রামে গ্রামে ডাকাতি, লুটতরাজ, রাহাজানি প্রকটভাবে দেখা দেয়। দিনে মিলিটারীর ভয়, রাত্রে ডাকাতের ভয় সবসময় তটস্থ থাকতে হয়েছে। দিনে গ্রামছাড়া আর রাত্রে পাটের ক্ষেত – এভাবে প্রতিটি ক্ষণ কেটেছে। দৌড়ানোর জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়েছে।

একদিন শুনলাম মিলিটারী আসছে। তবুও থাকলাম বাসায়। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, কাছের এক হাট হতে আগুন আর ধোয়া। অনেকে পালিয়ে যেতে লাগল।গ্রামের কিছু দূর দিয়ে উঁচু মাটির রাস্তা। দাঁড়িয়ে ছিলাম মিলিটারীদেরকে দেখবার জন্য। দেখলামও, আমার কাছে ছোট একটা দূরবীন ছিল। তাই স্পষ্ট দেখলাম, একে একে ৭৯ জন সৈন্য পার হয়ে গেল। আমের সময় গাছে কাঁচা আম ছিল। তাই তারা খেতে খেতে চলছে। কি তাদের উল্লাস, এতটুকু অনুশোচনা নেই মনে তাদের এই ধ্বংসলীলার জন্য।

অবশেষে নানান কারনে সে গ্রাম আমাদের ছাড়তে হলো ২৬ শে মে বুধবার। নৌকায় চললাম উল্লাপাড়ার অভিমুখে। দুপুর ২ টার দিকে বুধগাছা নামক গ্রামে আশ্রয় নিলাম। যে বাড়ীতে ছিলাম সে বাড়ীর এক ছেলে সৈন্য বিভাগে কাজ করত। শুনলাম সে ছুটি নিয়ে এসেছিল। মার্চের পর পাক বাহিনীর পক্ষ হতে কাজে যোগ দেবার জন্য আবেদন আসে। কিন্তু বর্বর বাহিনীর সঙ্গে সে যোগ দেয়নি। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাকে বাংলা মাকে উদ্ধার করার জন্য সে এতটুকু দ্বিধাবোধ করে নি। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সে যোগ দিয়েছিল।

ঐ বাড়ির ধারেই রাস্তা (বগুড়া- উল্লাপাড়া) । সাহস করে বসলাম এক গাছের ধারে। কিছুক্ষনের মধ্যে মোটরের শব্দ পেলাম। বুঝতে দেরী হলো না মিলিটারীদের গাড়ী আসছে। দেখলাম এক এক করে নয়খানা গাড়ী পার হয়ে গেল। কোন গাড়ীতে শুধু দু-একটা পেট্রোলের ড্রাম। আবার কোন গাড়ীতে মিলিটারী ও গোলাগুলির বাক্স। হাটের দিন দু’একজন করে পাকা আম,কলা এসব নিয়ে যেত হাটে। ওরা জোর করে কেড়ে নিত, আম কলা ইত্যাদি, পয়সা চাইলে মারার ভয় দেখাত।

পরের দিন ২৭ শে মে দুপুরের পর আর এক গ্রামে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে শুনলাম, যুবক ছেলেদের জোর করে ধরে নিয়ে মেরে ফেলেছে। ভয় পেলাম শুনে। এ গ্রামে আসার পথে কিছুক্ষণ বড় রাস্তার উপর দিয়ে হাঁটলাম খুব ভোরের দিকে। দেখলাম জ্বালিয়ে দেওয়া বহু বাড়ি। রাস্তা থেকে নেমে আধ মাইলের মত হেঁটে এসে বর্বরেরা পুড়িয়ে দিয়েছে বহু গ্রাম। রাস্তায় শুনলাম বাড়ী জ্বালিয়ে দেওয়ার কাহিনী। প্রথমে তারা নাকি কি একটা তরল পদার্থ ‘স্প্রে’ করত। তারপর একটা সাদা কাঠির মত জিনিসে আগুন ধরিয়ে ফিকে মারত ঘরের মধ্যে। আগুন ধরে যেত সমস্ত ঘরে। খেয়াল-খুশী মত দু-একটা বাড়ীও তারা বাদ দিয়েছে। মনে হয় খেলেছে তারা, আগুন আগুন খেলা।

যে গ্রামে আমরা থাকতাম, তার আশপাশের গ্রাম হতে ছেলেদেরকে ধরে নিয়ে গেছে। ধরে নিয়ে গিয়ে উল্লাপাড়া বাজারে খালের মধ্যে বুকজলে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাদেরকে। ট্রেনে করে যাতে মিলিটারীরা না আসতে পারে সে জন্য গ্রামের লোকজন লাইন তুলে ফেলেছে। ফলে তাদেরকে হারাতে হয়েছে ঘরবাড়ী।

মুক্তিবাহিনীর লোকেরা মাঝে মধ্যেই রেল লাইন, ব্রীজ উড়িয়ে দিত। একদিন মোহনপুরের কাছে এক গ্রামে, রাত্রিবেলা দু’জন দালালকে মুক্তিবাহিনীর লোকেরা মেরে ফেলে। পরের দিন পাক সৈন্যরা সে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়।

২৬ শে জুন শনিবার আমি ও একজন লোক বগুড়া বাড়ী দেখবার জন্য রওনা হই। একটা বাস রাজশাহীর ও একটা বাস বগুড়ার ছিল। বাসে একটা পাঠান ব্যক্তি বাসের সমস্ত পয়সা নিত। কণ্ডাক্টরের হাতে লাগান ছিল শান্তি কমিটির লাল ব্যাজ। পথে মিলিটারীর যাতায়াত চোখে পড়ল।

১-৪৫ মিঃ বগুড়ার পুলিশ লাইনে গাড়ী সার্চ করবার জন্য থামান হয়। অনেকের সঙ্গে আমাকেও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কি করি, কোথায় থাকি ইত্যাদি। দেখলাম, পুলিশেরা রাইফেলের বাঁট (দুইজন) উপর দিকে ও নল নিচের দিকে দিয়ে পাহারা দিচ্ছে। ‘বগুড়া কারিগরি মহাবিদ্যালয়কে তারা ঘাঁটি বানিয়েছিল। শহরে ১৮% জন জনসাধারণ তখন এসেছে। দোকানপাট বন্ধ। রাস্তার দু পাশের দোকান, বাড়ীঘর পোড়ানো। যারা বাইরে থেকে শহরে আসে, তখনই কিছু জিনিসপত্র কিনে নিয়ে তারা চলে যায়। বগুড়া জেলা স্কুল ও হয়েছিল তাদের ঘাঁটি। ঐ স্কুলের হোষ্টেলে বারান্দায় ব্যাটারী চার্জ দেওয়া হতো। ষ্টেশনে কোন বাঙ্গালীকে যেতে দেওয়া হতো না।

বগুড়া পিটি স্কুলের কাছে নামলাম ২-১০ মিঃ। নেমে হেঁটে বাড়ীর দিকে আসছি। বাড়ীঘড় পোড়া। রাস্তা জনমানবশূন্য। প্রায় ১ মাইল রাস্তার মধ্যে মাত্র ৪ জন লোকের সঙ্গে দেখা হয়। রাস্তা চলতে ভয় ভয় হচ্ছিল। যেখানে একদিন ছিল উৎফুল্ল প্রানের স্পন্দন, আজ সেখানে শুধু পোড়া মাটির স্তূপ। দেখে কান্না এসে যাচ্ছিল। বাড়ীর কাছে আসলাম, একই অবস্থা আমাদের বাড়ীর ও তবে সম্পূর্ণ নয়। কেননা জামায়াতে ইসলামীর এক লোক বেদখল করার জন্য বর্বরদের কাছে অনুরোধ জানালে তারা সম্পূর্ন বাড়ী ধ্বংস করেনি। প্রতিটি মন্দির ধর্মীয় স্থান তারা হয় ধ্বংস, না হয় ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমি একটুর জন্য প্রাণে রক্ষা পাই বিহারীদের হাত হতে, এক মুসলমান ভাইয়ের সহায়তায়। প্রাণ নিয়ে ফিরি ঐ গ্রামে।

কিছুদিন পর দালালদের ভয়ে ও নানান কারনে কোন গ্রামেই থাকা সম্ভপর না হওয়ার জন্য ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৭১ ভারত অভিমুখে নৌকায় রওয়ানা হই। মাঝে মধ্যেই সিরাজগঞ্জ, পাবনার দিক হতে গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসত।

৩রা সেপ্টেম্বর নৌকা থেকে দেখলাম কাজীপুর এলাকার অগ্নিসংযোগের দৃশ্য। ৪ দিন পর মানকর চরে (আসাম) পৌঁছাই যমুনা পথে।

স্বাক্ষর/-
শ্যামল রায়
১৬.৯.৭৩

।। ৬০।।
বাদশা মিয়া
মালতী নগর
সদর থানা, বগুড়া

পাক বাহিনী চারদিক থেকে অসংখ্য গোলাগুলি বর্ষণ করতে শহরের মধ্যে প্রবেশ করে। শহরের মধ্যে প্রবেশ করেই অগণিত লোকজন হত্যা করে। অসংখ্য দোকান পাট লুট করে। বগুড়া শহরের মালতীনগর ও চক লোকমান গ্রামে অসংখ্য বাড়ীঘরে অগ্নি সংযোগ করে ভস্মীভূত করে দেয়। আমি আড়াল থেকে সবকিছু স্বচক্ষে দেখেছি। কার্ফিউ উঠিয়ে দেবার পর জনসাধারণ যখন শহরের মধ্যে এসেছিল পাক সেনারা সেই সময় মেশিনগানের গুলিতে ৩/৪ শত লোক হত্যা করে। আমিও শহরে এসেছিলাম ঐ দৃশ্য দেখে অতিভূত হয়ে পড়ি। কোন রকমে জীবন নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হই।

১৯৭১ সালের ৩১ শে অক্টোবর রোজ রবিবার বেলা ১১ টার সময় ১৩ জন খান সেনা ও ৫ জন রাজাকার এসে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। ধরার সময় আমার বাড়ী থেকে হাতঘড়ি ও আমার স্ত্রীর ঝুমকা ও গলার মালা রাজাকারেরা লুট করে নিয়ে যায়। ইহাতে অনুমান করি যে, খান সেনারা আমার তিন হাজার টাকার মত সোনার গহনা ও কাঁসার থালাবাটি লুট করে নিয়ে যায়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে পাক সেনা শহরে প্রবেশ করেই অবাঙ্গালীদের ৭২ ঘন্টা সময় দিয়েছিল। বাঙ্গালীদের ধন সম্পদ লুটতরাজ করার জন্য। প্রথমে আমাকে স্থানীয় সার্কিট হাউজে নিয়ে আসে। খান সেনার বিগ্রেডিয়ার আমাকে উর্দুতে জিজ্ঞাসা করে যে, ব্যাঙ্ক লুট করেছে কারা, মুক্তি ফৌজ কোথায়, আওয়ামী লীগের লিডার কে কে ইত্যাদি বিষয়। আমি খুব ভালো উর্দু জানতাম। তাছাড়া আমাকে দেখতে অবাঙালীর মত দেখায়। তাই উর্দুতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করি। তখন বিগ্রেডিয়ার সার্কিট হাউজ থেকে আমাকে জেল খানায় পাঠায়। জেল খানায় আমি অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করি। সিগারেটের আগুন, লোহার রড, রাইফেলের বাঁট, বুট জুতার লাত্থি ইত্যাদির সাহায্যে খান পিচাশেরা নির্মম নির্যাতন চালায় আমার দেহের উপর। জ্বলন্ত সিগারেটের আগুনের চিহ্ন এখনও শরীরে বিদ্যমান। এইভাবে আমি ১৩ দিন জেল খানায় বন্দী ছিলাম। অনুমিত হয় যে, এক মাত্র ভাল উর্দু জানায় এবং দৃঢ় মনোবলের জন্য খান সেনারা আমাকে হত্যা করেনি।

স্বাক্ষর/-
মোঃ বাদশা মিয়া

।। ৬১।।
আব্দুস সামাদ
চক সুত্রাপুর, বগুড়া

১৯৭১- এর আগষ্ট মাসের ২২ তারিখ। আমার জীবনে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এই দিন আমি যখন শহরে আমার নিজের কাপড়ের দোকান থেকে ফিরছিলাম তখন ষ্টেশনের সন্নিকটে তিন চারজন খান সেনা ঘিরে ফেলে। এসময় আমাকে হিন্দু না মুসলমান জানতে চায়। আমি মুসলমান বললে আমাকে বলে যে তুমি মুক্তিফৌজ। আমি তা অস্বীকার করলে আমার গালে প্রথমবারের মত থাপ্পড় মারে। অতঃপর আমাকে গ্রেফতার করে জন্য জনৈক সৈন্য নির্দেশ দেয়। তার পর আমাকে ডানা ধরে নিয়ে যেতে থাকে। কিছুদুর নেবার পর আমাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বলে। আমি তাদের নির্দেশ পালন করার পর জিজ্ঞাসা শুরু করে তুমি তো মুক্তিফৌজ এবং ধরা যখন পড়েছ তখন স্বীকার কর তোমার আর দলবল কোথায় আছে। তোমার অস্ত্রশস্ত্রই বা কোথায় আছে।

স্বাভাবিকভাবে আমি অস্বীকার করি। তখন আমাকে চড় থাপ্পড় লাথি মারতে থাকে। এর সাথে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। কিছুক্ষন এমনিভাবে মারার পর কয়েক মুহূর্ত মারের বিরতি ঘটায়। এ সময় আবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে এবং স্বীকার না করলে আমাকে হত্যা করে ফেলা হবে বলে হুমকি দেখায়। যেহেতু আমি কিছুই জানি না, সমস্তই অস্বীকার করি।

অতঃপর আমাকে অনুরুপভাবে আবার মারধোর শুরু করে। এবার রাইফেলের গাদ দিয়েও মারতে থাকে। মারের চোটে অস্থির হয়ে পড়ছিলাম। নাকমুখ দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। এক পর্যায়ে মাটিতেও পড়ে যাই। এ সময় আমার পকেট থেকে টাকা মাটিতে পড়ে যায়। তখন আমার কাছে ৫৬৫ টাকা ছিল। উক্ত টাকা গুলো তারা তুলে নেয় এবং আমার পকেট হাতিয়ে যে টাকা পয়সা ছিল তা নিয়ে নেয়। টাকা তাদের হস্তগত হবার পর তারা নিজেদের মধ্যে কি সব আলোচনা করলো। শেষে আমাকে যেতে বলে মিলিটারীরা হাসিমুখে অন্য দিকে চলে যায়।

স্বাক্ষর/-
আব্দুস সামাদ

।। ৬২।।
আমির আলী খান
গ্রাম- তেঘর, থানা- জয়পুরহাট
জেলা- বগুড়া

তখন ৫ই এপ্রিল কিংবা ১০ ই এপ্রিল হবে। চারিদিকে খান সেনারা টহল দিয়ে ঘুরে ফিরছিল আওয়ামী লীগের লোকজনকে ধরার জন্য। আমার বড় ভাই ছিল আওয়ামী লীগের ৩৬ কমিটির একজন সদস্য। আমি কৃষিকাজ করে খাই। আমার ভাই আমার থেকে পৃথক। খান সেনাদের ধরার ভয়ে বাড়ী থাকে না। কোথায় কোথায় থেকে শুধু সংগ্রাম আর সংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। একদিন হঠাৎ ২৫/২৬ জন খান সেনা রাত্রিতে এসে আমার বাড়ী ও ভাইয়ের বাড়ী ঘেরাও করে। ভাইকে না পেয়ে তারা আমাকে ধরে এবং বেদম প্রহার করতে শুরু করে আর বলে তোর ভাই কাঁহা উছকো বোলাও। আরো কি কি বলে আমি বুঝতে পারি না। আমি তাদেরকে বললাম ভাইয়ের সাথে কথা বলতে পারবো না সে আমার থেকে আলাদা। আমি কৃষক মানুষ সারাদিন মাঠে পরে থাকি কিন্তু তারা আমাকে কিছুতে ছেড়ে দিল না। কিছু দূরে তাদের গাড়ি ছিল। ধরে নিয়ে তাদের গাড়িতে উঠিয়ে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে গেল। আমাকে যে ঘরে রাখল তার পার্শ্বে আরো কয়েকটি ঘর ছিল। সেখানেও আমার সমান বয়সী এবং কম বয়সী লোক বিভিন্ন ধরনের লোক সেখানে ছিল। সেখানে তাদের বড় ক্যাপ্টেন আসলো, আমাকে জিজ্ঞাসা করলো আমার ভাইয়ের কথা কিন্তু তার খুশি মত জবাব না পাওয়ায় সে নিজে খুব মারলো এবং শেষ পর্যন্ত কখন তারা মার বন্ধ করেছে তা আমি বলতে পারবো না জ্ঞান হলে দেখি আমার শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে সমস্ত শরীর কেটে ফেটে গেছে। এইভাবে দু দিন ধরে পর পর আমাকে মারতো আর ভাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতো। শেষ পর্যন্ত যখন তারা আর কিছুই আমার কাছ থেকে জানতে পারলো না তখন একদিন রাতে আমাকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে আমাকে এক রাস্তায় নিয়ে যায়। সেখানে তারা আবার মারতে শুরু করে। তাদের মারের চোটে অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান হলে দেখি তাদের ক্যাম্প থেকে অনেক দূরে এক গর্তের মধ্যে পড়ে আছি। অনেক কষ্টে সেখান থেকে উঠে করিম নামে এক লোকের সাহায্যে বাড়ী পৌঁছি।

স্বাক্ষর /-
আমির আলী খান

।। ৬৩।।
মোঃ আব্দুল মালেক মণ্ডল
গ্রাম ও থানা- সারিয়া কান্দি
জেলা- বগুড়া

১৪ ই আগষ্টে পাক বাহিনী সারিয়া কান্দিতে চলে আসে। সারিয়া কান্দিতে কালো পতাকা ও বাংলাদেশের পতাকা দেখে অসংখ্য বাড়ীঘর ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ আরম্ভ করে। অতঃপর আমার দোকানে চলে আসে। দোকানে আসার পর আমার ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করে। তা ছাড়া মুক্তিবাহিনী কোথায় আছে এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা জিজ্ঞাসা করে। উত্তরে আমি অস্বীকার করি অতঃপর সেখান থেকে চলে গিয়ে থানায় ঘাঁটি করে। ঐ দিন বিকেলের দিক কতিপয় খান সেনা ও রাজাকারেরা পুনরায় আমার দোকানে চলে আসে। তারা সরাসরি আমার দোকানের ভিতর ঢুকে পড়ে। খান সেনারা দোকানের বাক্সের ভিতর একটি বাংলাদেশের পতাকা পায়। পতাকা দেখে তৎক্ষণাৎ তারা দোকানের সমস্ত মালাপত্র লুটপাট করে নিয়ে যায়। আমি ঐ সময়ে দোকানে উপস্থিত ছিলাম না। তবে অনুমান করি যে, একমাত্র দোকান থেকে ৭০/৭৫ হাজার টাকার মাল পত্র খান দস্যু ও রাজাকারেরা নিয়ে যায়। অতঃপর দুষ্কৃতকারীদের চক্রান্তে খান পশু ও রাজাকারেরা আমার বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। সেখানে গিয়ে তারা আমার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে ভস্মীভূত করে দেয়।

১৫ ই আগস্ট বিকাল বেলায় আমার ছেলে বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ কর্মী আবজল হোসেনকে ধরে নেয়। তাদের ক্যাম্পে নেওয়ার পর বুট, লাথি, লোহার রড ও রাইফেলের বাঁটের সাহায্যে তার দেহে ভীষন আঘাত করে। তাছাড়া সিগারেটের জ্বলন্ত আগুন দিয়ে তার শরীর পুড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, পায়খানার ভিতর অনাহারে তিন দিন যাবৎ তালাবদ্ধ অবস্থায় রেখে দেয়। তিন দিন পর খান সেনারা তাকে ছেড়ে দেয়। খান পশুরা যেভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়েছিল, ইতিহাসে তার নজির নেই।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আব্দুল মালেক মন্ডল
১৯/৯/৭৩

।। ৬৪।।
খোন্দকার ইউনুস আলী
থানা- সারিয়া কান্দি
জেলা- বগুড়া

আগষ্টের ১৯ তারিখে সারিয়াকান্দি থেকে খান সেনারা দ্বিতীয় বার চন্দনবাইশা চলে আসে। গ্রামের জনসাধারণ একত্রে ডেকে হিন্দুর জমির লোভ দেখিয়ে এবং টাকা পয়সার লোভ দেখিয়ে রাজাকারে আসার নির্দেশ দেয়। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় আছে এবং কে কে ইত্যাদি খোঁজখবর জানতে চায়। এরপর খান সেনারা রাজাকারে জোর করে লোক নেবার জন্য ২১ তারিখ মঙ্গলবার দিন ধার্য্য করে আসে। অতঃপর সারিয়াকান্দিতে চলে আসে। আসার পর খান সেনারা বগুড়া থেকে বহুসংখ্যক রাজাকার ও খান সেনা সারিয়া কান্দিতে সংবাদ নিয়ে আসে।

২১ তারিখ মঙ্গলবার ১১ টার সময় প্রায় ২ শত জন খান সেনা ও ৭৫ জন রাজাকার চন্দনবাইশায় চলে আসে। স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে ঘাঁটি করে এবং প্রয়োজনীয় বাঙ্কার তৈরী করে উক্ত স্থানে ঘাঁটি করে। খান সেনারা রাত্রি যোগে জনগণের বাড়ী থেকে হাঁস, মুরগী, গরু, খাসী ইত্যাদি নিয়ে যায়। অযথা যে কোন লোক জনকে ধরে ভীষণ নির্যাতন করত। গ্রামে ঢুকে মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচার চালায়। একদিন উক্ত গ্রামে জনৈক ব্যাক্তির স্ত্রীকে খান সেনারা জোর করে ধরতে যায়। ঐ সময় স্বামী তার স্ত্রীর উপর অত্যাচারের ভাব দেখে সহ্য করতে না পেরে তাকে আঘাত করে। খানসেনা তৎক্ষণাৎ তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং মাটি চাপা দেয়। অতঃপর কয়েক রাউন্ড গুলি এদিক ওদিক ফায়ার করে। খান সেনারা চর চন্দনবাইশার আইনুল হককে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঐ সময় কয়েকজন গ্রাম্য লোক আহত হন। এরপর খান সেনারা প্রকাশ্যে নারী নির্যাতন করতে আরম্ভ করে। অকারনে যে কোন লোক জনকে ধরে নিয়ে খান সেনারা খেত। সেই কথা বলতে গিয়ে উক্ত গ্রামের লোক শাহ মনসুর আলী খান সেনাদের হাতে ভীষন নির্যাতন ভোগ করেন। ঐ সংগে তার ছেলেকে খান সেনারা ভীষণভাবে মারপিট করে। খান সেনারা তাদের দুইজনকে লাঠি, রাইফেলের বাঁট, বুট জুতার লাত্থি ও লোহার রড দিয়ে ভীষণভাবে নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। সংগে সংগে তার বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে বহু টাকার ধন-সম্পদ ভস্মীভূত করে দেয়। রাজাকারেরা বহু টাকার ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমার পার্শ্ববর্তী বাড়ীর বাসিন্দা শওকৎ হোসেন মুনসীর মিথ্যা চক্রান্তে আমাকে খান সেনারা ধরে নেয়। ধরার সময় চড় ও রাইফেল দিয়ে ভীষণ আঘাত করে এবং খান সেনারা আমাকে ছেড়ে দেয়। পরের দিন আমার নিজ বাড়ী ও বড় ভাইয়ের বাড়ী খান পশুরা লুট করে যথা সর্বস্ব নিয়ে যায়। খান সেনারা আমাদের দুই ভায়ের ৪,০০০ (চার হাজার) টাকার ধনসম্পদ অপহরণ করে নিয়ে যায়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, উক্ত এলাকার চতুর্দিকে খান সেনাদের ঘাঁটি থাকায় অসংখ্য বাড়ীঘর লুটতরাজ ও নারী নির্যাতন চালায়। আরও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সারিয়া কান্দি থানার মুক্তিযোদ্ধাদের একমাত্র ট্রেনিং সেন্টার এবং কেন্দ্রস্থল ছিল চন্দনবাইশা গ্রাম।

স্বাক্ষর/-
খন্দকার ইউনুছ আলী
২০/৯/৭৩

।। ৬৫।।
মোঃ আজাদুর রহমান মণ্ডল
গ্রাম- হামিদপুর
থানা- গাবতলী
জেলা- বগুড়া

খান সেনারা হঠাৎ একদিন হামিদপুর গ্রামে ঢুকে পড়ে। আমি কোন উপায় না দেখে অতি চতুরতার সাথে শরীরে কাদামাটি মেখে নিজের জমিতে চাষ করতে যাই। সেখান থেকে একজন খান সেনা আমাকে আক্রমণ করে। তখন আমি হাত থেকে গরু তাড়ানোর লাঠি মাটিতে ফেলে দু হাত তুলে খান সেনার কাছে আত্নসমর্পণ করি। অতঃপর খান সেনা আমার গ্রামের নাম, মুক্তিবাহিনী এবং নিজে মুক্তি কিনা ইত্যাদি প্রশ্ন উর্দুতে জিজ্ঞাসা করে। জিজ্ঞাসা করার পর আমি উর্দুতে সমস্ত কথা তাকে বুঝিয়ে দেই। কিন্তু খান সেনা অবিশ্বাস করে এবং আমাকে মুক্তি ধারনা করে গুলি করার প্রস্তুতি নেয়। এরপর আমি মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে ভাল করে পাকিস্তানী জাতীয় সঙ্গীত উর্দুতে ও বাংলাতে বলি। তারপর আমি আল্লাহর নিকট পাকিস্তানের জন্য এবং পাকিস্তানের সৈন্যদের দীর্ঘায়ু কামনা করি। তখন খান সেনারা গুলি না করে আমার বাড়ীর ভিতর নিয়ে আসে। অতঃপর স্ত্রী পুত্র আছে কিনা ইত্যাদি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে। স্ত্রীকে ডেকে আনে। ঐ সময় আমার ঘরের ভিতর একজন পাঞ্জাবী সৈন্য ডেকে নেয়। ঠিক ঐ সুযোগে ঐ খানটি আমার স্ত্রীর ৫ ভরী সোনার দুইটি বালা বাক্স খুলে নেয়। এরপর তারা ছেলের নাম জিজ্ঞাসা করে। তখন আমি পিস্তল ও জান্টার পর পর দুই ছেলের নাম বলি। তখন পিস্তলের কথা শুনে তারা পজিশন নেয় । আমি তাহা উর্দুতে বুঝিয়ে দেই। কারণ পিস্তল ও জান্টার আমার ছেলেদ্বয়ের ডাকনাম ছিল। এত বলা সত্ত্বেও খান সেনারা আমাকে ভারতের দালাল বলে বিবেচনা করে। আমি মুসলমান কিনা তা দেখার জন্য আমার লুঙ্গী খুলতে বলে। একজন বেলুচী সৈন্য তা নিষেধ করে। ঐ বেলুচী সৈন্যটি আমাকে বারবার সাহায্য করে আসছে। আমি তখন বলি যে, আপনি আমাকে গুলি করে মেরে ফেলেন। তবুও আমি নিজের ইজ্জত দেখাব না। আরও বলি যে, আমি যদি প্রকৃত মুক্তি হয়ে থাকি, তাহলে আপনাদের ক্যাপ্টেনের কাছে নিয়ে চলুন। তিনিই বিচার করবেন। অতঃপর আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে আসে। ক্যাম্পে এসে কিছু সময় পর দেখতে পাই যে হাত বেঁধে একটি ছেলেকে রাস্তার উপর নিয়ে আসছে। বিগ্রেডিয়ারের নির্দেশ মোতাবেক তাকে লাথি মেরে ক্যাম্পে নিয়ে আসে। পরপর কয়েকবার বুট জুতার লাথি মেরে তাকে নিষ্ঠুরভাবে মেরে ফেলে। এরপর আমাকে গুলি করার নির্দেশ দেয়। তখন আমি বলি খান সাহেব মৃত্যুর আগে আমি কয়েকটি কথা বলব, তখন আমাকে বলার জন্য সময় দেয়। অতঃপর আমি চতুরতার সাথে পাকিস্তানী জাতীয় সঙ্গীত গাই এবং পাকিস্তানী ফৌজ ও পাকিস্তানের দীর্ঘায়ু কামনা করি। এরপর বিগ্রেডিয়ার আমার লেখাপড়া কতটুকু জানতে চায় আমি আরও চতুরতার সহিত বলি যে দ্বিতীয় শ্রেণীতে। ব্রিগেডিয়ার বলে যে, তা হলে তুমি এত ভালো উর্দু কেমন করে শিখলে? জবাবে আমি বলি যে, ভাষা আন্দোলনের সময় উর্দু ভাষার উপর যখন জোর দেওয়া হয়েছিল, সেই সময় আমি উর্দু ভাষা শিক্ষা করেছি। বার বার একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার পর ব্রিগেডিয়ার পুণরায় গুলির হুকুম দেয়। তখন আমি কোন উপায় না দেখে বলি যে, খান সেনা আপনার মত আমারও একজন পাক ফৌজের ক্যাপ্টেন আছে। যার নাম কুদরতে খোদা (বাবলু)। ১৯৬৫ সনের যুদ্ধে তিনি কুদরতে খোদা খেতাব পেয়েছেন। এই কথা শুনে তিনি ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করেন। এরপর সেখান থেকে সঠিক খবর নিয়ে আমাকে ছেড়ে দেয়। ছেড়ে দেওয়ার পর খান সেনাদের সাহায্য করার কথা, পাকিস্তানের হেফাজতের কথা এবং মুক্তিদের খোঁজ খবর দেওয়ার কথা বলে। এরপর আমি বাড়ী চলে যাই।

এর কিছু দিন পর খান সেনারা নাড়ুয়া মালা হাটে জনসাধারণ নিয়ে মিটিং এর জন্য নাড়ুয়া মালা হাটে চলে যায়। মিলিটারির কথা শুনে হাটের লোকজন দৌড়ে চলে যায়। আমি একটি গ্রেনেড নিয়ে জঙ্গলের ভিতর শুয়ে পড়ি খানসেনারা সেখান থেকে আমাকে দ্বিতীয়বার ধরে। আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি কেন জঙ্গলের ভিতর। নিশ্চয়ই তুমি মুক্তিফৌজ এই বলে আমাকে গাড়ীতে তুলে পুনরায় হাটে নিয়ে আসে। হাটের ভিতর ব্রিগেডিয়ার জনসাধারণের মধ্যে ভাষণ দিলেন এই বলে যে, তোমাদের কোন ভয় নেই, তোমারা আমাদের সাহায্য কর, মুক্তিফৌজের খোঁজ খবর দাও এবং ভারতের দালাল ধরে দাও ইত্যাদি বিষয়। এরপর আমি ব্রিগেডিয়ারের অনুমতি নিয়ে ঐ সমস্ত কথাগুলি পুনরায় বলি। আমি আরও বলি যে পাক ফৌজ কেন আমাদের মা বোনের ইজ্জত ধ্বংস করছে? তারা আমাদের হেফাজতের জন্য এসেছে। আমাদের অন্নে প্রতিপালিত হয়ে আমাদের উপর গুলি করা আল্লাহপাক বরদাস্ত করবে না। মুসলমানদের ধর্ম কি তাই? একজন নিরীহ লোককে হত্যা করা এটা বিধর্মীয় কাজ ইত্যাদি ভাষণ দেই। এই ভাষণ শুনে ব্রিগেডিয়ার আমাকে ডেকে ঘরের ভিতর নিয়ে যায়। ঘরের ভিতর নিয়ে জোর করে ৫০ টি টাকা বকশিস দিয়ে কোরআন ছুঁয়ে শপথ করায় যে, আগামী কাল আমি যেন তাদের ক্যাম্পে দেখা করি। পরের দিন সেই মোতাবেক তার কথা ও ধর্ম রক্ষার্থে ক্যাম্পে গিয়ে দেখা করি। তখন ব্রিগেডিয়ার বলে যে, তোমাকে ১০০০ (এক হাজার) করে টাকা দিতে ইচ্ছুক এবং সমস্ত বগুড়া জেলার রাজাকারের কমান্ডার বানিয়ে দিতে চাই, তুমি কি ইচ্ছুক? তখন আমি বলি যে, স্যার আমি রাজাকার হতে চাই না। এরপর আমাকে অনেকগুলি ৫০০ (পাঁচশত) টাকার নোট দেখায় এবং বলে যে, তুমি যদি রাজাকার কমান্ডার হও তাহলে তোমাকে বহু টাকা দেওয়া হবে। আমি সমস্ত কিছু অস্বীকার করে কোন রকমে বাড়ী চলে আসি। রমজান মাসে আমি নাড়ুয়া মালা হাট থেকে আসছিলাম। তখন দেখতে পেলাম একজন খানসেনা একটি লোকের নিকট থেকে জোর করে টাকা পয়সা কেড়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। লোকটি তখন আমার কাছে ঐ কথা বলে দেয়। তখন আমি প্রতিবাদ করলে আমার পকেটে যত টাকা ছিল খানসেনা তা কেড়ে নেয়। গাবতলী বাজারের ভিতর এসে একখানা চাকু সংগ্রহ করি। অতঃপর বাজারের ভিতর খান সেনাকে রাইফেলসহ জড়িয়ে ধরি। অতঃপর আমি লোকজন ডাকলাম খান সেনাকে চাকু মারতে। কিন্তু কেউই আমাকে সাহায্য করতে আসল না। ১০ মিঃ আমাদের এ লড়াই চলে আমিও সুযোগ পাইনা চাকু মারতে। অতঃপর খান সেনাটি তার টাকা এবং তার সাথে আরও বিশটি (২০) টাকা দেয়। আমি খান সেনাকে ছেড়ে দিয়ে দৌড় দিয়ে প্রাণ বাঁচাই। এই রকম ভাবে আমি তিনবার খান সেনাদের হাতে নির্যাতিত হই। প্রত্যেক বারই আমি সাহস ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে রেহাই পাই।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আজাদুর রহমান মণ্ডল
ইং ২৪/৯/৭৩

।।৬৬ ।।
মোঃ জজবর রহমান
ষ্টেশন মাষ্টার
জয়পুরহাট রেলষ্টেশন, জেলা-বগুড়া

হানাদার বাহিনী ২৪ শে এপ্রিল শনিবার রাত্রিতে জয়পুরহাট চলে আসে। আসার সময় রেলষ্টেশনের অনতিদূরে একটি রেল সেতুর কাছে গুলি করে ৩ জন নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করে। ইতিপূর্বে আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে জয়পুরহাট থেকে তিন মাইল দূরে এক গ্রামে রেখে আসি। প্রত্যেক দিন ঐ গ্রাম থেকে সকালে ষ্টেশনে আসতাম এবং সন্ধ্যায় ফিরে যেতাম।

খান সেনাদের আগমনের সাথে সাথে আমি জীবনের ভয়ে কাজ ফেলে দূরে গিয়ে পালাতে বাধ্য হই। আর অফিসে আসি নি। খান সেনারা এখানে এসে স্কুল কলেজ এবং সরকারী বেসরকারী অফিস আদালত খোলার ব্যবস্থা করে। ষ্টেশন মাষ্টার সাহেবের খোঁজ করতে থাকে। বহু গুপ্তচরকে আমার পিছুনে লাগিয়ে দেয়। স্থানীয় এক বুকিং ক্লার্ক (অবাঙ্গালী) আমার তল্লাশী চালায়। শেষ পর্যন্ত তারা আমাকে ধরতে না পেরে এই মর্মে চিঠি লিখে পাঠায় যে, যদি আমি নিজ কার্যে যোগদান না করি , তবে ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে ধরে এনে হত্যা করা হবে। সত্য সত্যই কয়েকদিন পর সেই অবাঙ্গালী বুকিং ক্লার্ক এবং আরও কয়েকজন অবাঙ্গালী খোলা তলোয়ার হাতে আমার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়। উপায় না দেখে আমি ধরা দিতে বাধ্য হই। অতঃপর মহকুমা প্রশাসক কার্যে যোগদান করেছেন কিনা তা জানার উদ্দেশে তাদের সাথে তার কাছে যাই। মহকুমা প্রশাসন আমাকে কাজে যোগদান করতে আদেশ দেন। আমি মেজরের সাথে দেখা করি। দেখা করার সময় একজন পাঞ্জাবী আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি দেয়। মেজর কার্যে যোগদানের জন্য আদেশ দেন। অতঃপর অফিসে চলে আসি। অফিসে আসার পথে প্লাটফরমে একজন পাক সেনা আমাকে ধরে পকেট থেকে টাকা-পয়সা নিতে চেষ্টা করে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, অফিসের বেশ কিছু টাকা খান সেনাদের ভয়ে সরিয়ে ফেলেছিলাম। খান সেনাটি আর কিছু না বলে ছেড়ে দেয়। দিনের পর দিন খান সেনারা অত্যাচার আর গনহত্যা চালাতে থাকে। পূর্ব উল্লেখিত খান সেনার সাথে আমার বেশ বন্ধুত্ব জমে উঠে। ঐ খান সেনার সহযোগীতায় আমি বহু নিরীহ লোকজনকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করি। অত্র এলাকার ঘাঁটি করে থাকাকালীন খান পশুরা অসংখ্য লোক জনকে হত্যা করে। খান সেনারা অবাঙ্গালীও ধরে আনে রেল মিস্ত্রীর সাহায্যে। রেললাইন মেরামত করে স্বাধীনতা পূর্ব পর্যন্ত শান্তাহার থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ করে। এরপর ভারতীয় মিত্র বাহিনীর প্রবল আক্রমণে বাংলাদেশ মুক্ত হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে জয়পুরহাটও মুক্ত হয়ে যায়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ জজবর রহমান
১১/১০/৭৩

।।৬৭।।
মোঃ আবুল কাসেম
থানা-গাবতলী
জেলা- বগুড়া

২৫ শে মার্চ পাক হানাদার বাহিনী বগুড়া শহরে আক্রমন করে ব্যর্থ হলে অতঃপর ১৩ ই এপ্রিল তারিখে ত্রিমুখী আক্রমন ও বিমান আক্রমন করে বগুড়া শহর তাদের আয়ত্ত্বে নিয়ে আসে। অতঃপর কয়েক দিন পর এক দল খান সৈন্য গাবতলী থানায় চলে আসে। গাবতলীর সি, ও, অফিসে তারা ঘাঁটি স্থাপন করে। এরপর খান সেনারা চারিদিকে টহল দিতে থাকে। হঠাৎ করে একদল খান বর্বর বাহিনী সুখান পুকুর রেলষ্টেশনে এসে উপস্থিত হয়। পর পর বহু দোকান পাট ও বাসাবাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে। বাজারের অসংখ্য দোকানপাট ও বাসাবাড়ীতে লুটপাট আরম্ভ করে দেয়। যাকে যে অবস্থায় যেখানে পায় খান হায়েনারা তাকে সেখানেই বেয়োনেট চার্জ করে অথবা রাইফেলের গুলি দিয়ে হত্যা করে। এক সংগে ৭২ জন নিরীহ জনগণকে একত্রে দাঁড়া করে মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ার মেরে হত্যা করে। গাবতলী থানার ভিতর সুখান পুকুরে এত গণহত্যার নজির আর কোথাও পাওয়া যায়নি। বাজারে ঢুকে সর্বপ্রথম কয়েকটি মালজাত গুদাম ঘরে তারা অগ্নিসংযোগ করে বহু টাকার ধান চাল ভস্মীভূত করে দেয়। তাছাড়া বাজারের বহু দোকানদারকে ধরে ভীষণ নির্যাতন করার পর গুলি করে হত্যা করে। এদিনই পাক সেনারা আমার বাড়ীতে বহু টাকার ধনসম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। খান বর্বর বাহিনী আমার বাড়ি থেকে ৭/৮ হাজার টাকার জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। বহু সংখ্যক হিন্দুর বাড়ী অগ্নিসংযোগ করে ভস্মীভূত করে দেয়। গ্রামে ঢুকে মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে। বাজারের সমস্ত দোকানপাট ও ঘরবাড়ী অগ্নিসংযোগ করে পাক হায়েনারা আবার গাবতলী সি, ও, অফিসে যায়। গাবতলি থেকে খান পশুরা প্রত্যহ সুখান পুকুরে যাওয়া আসা করতে থাকে। প্রত্যেক বারই তারা দু’চারজনকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। স্বাধীনতার ১২/১৩ দিন পূর্বে মুক্তিবাহিনীর প্রবল আক্রমণে গাবতলী থানা তথা সুখান পুকুর শেষ বারের মত শত্রুমুক্ত হয়। স্বাধীনতার পতাকা সর্বত্র ঊড়াতে থাকে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আবুল কাসেম
২৫/৯/৭৩

।।৬৮।।
আরিফুর রহমান (বাদশা)
সন্ধ্যাবাড়ী, থানা- গাবতলী
জেলা-বগুড়া

জৈষ্ঠ্য মাসের একদিন রাতে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে পাক সৈন্যরা আমাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগে অবশ্য আমার বাড়ীর দামী জিনিসপত্র ও সোনাদানা লুটপাট করে। মিলিটারীদের সাথে কতিপয় অবাঙ্গালীও ছিল। তাদের মধ্যে বাঙ্গালীও থাকা সম্ভব।

গ্রেফতার করার পর আমাকে সার্কিট হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। বলা প্রয়োজন, আমার হাত বাঁধা অবস্থাতেই নেয়া হয়। পথের মধ্যেই কয়েক দফা চড় থাপ্পড় মারা হয়।

সার্কিট হাউসে নেয়ার পর আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, আমি মুক্তিবাহিনীকে খবর সরবরাহ করি। তারা আমার কাছ থেকে জানতে চায় যে, মুক্তিবাহিনী কোথায় আছে, তাদের সংখ্যা কত এবং তাদেরকে কিভাবে খবর সরবরাহ করি? আমি মুক্তিবাহিনীর লিডার না অন্য কেউ লিডার আছে? তার নাম কি? মুক্তি বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র কোথায় আছে?

আমি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করলে আমার উপর দৈহিক নির্যাতন শুরু করে। কয়েকজন মিলে পর্যায়ক্রমে আমাকে নানানভাবে অত্যাচার করতে থাকে। রুলার দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জোড়ায় বেদম প্রহার করে। শরীরের গিট ছাড়াও বিভিন্ন অংশে হৃদয়হীন ভাবে অত্যাচার করে।

এ ছাড়া খাড়া করে পা টান করে রেখে পিঠ কুঁজো অবস্থায় ঘাড় টান করে হাতের কব্জি দিয়ে ঘাঁড়ে মারত। শরীর একটু এদিক ওদিক করলে অথবা যন্ত্রণায় কাতরালে আরো বেশী করে অত্যাচার করতে থাকে। মারের সাথে সাথে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এই অবস্থায় এত বেশী করে আমার উপর অত্যাচার করা হয়েছিল যে, আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। এ ছাড়া রাইফেলের বাঁট, গাদা, গুতা আর পিটান দিতে থাকে। এ ছাড়া লাত্থি তো আছেই।

অত্যাচারের সময় তারা কয়েক পদে অত্যাচার করে। এরা উনিশ পদে অত্যাচার করত। তাদের সুবিধা মত কখনও তারা আমার হাত বেঁধে রাখত আবার কখনও পা খোলা রাখত।

দু দিন বন্দী থাকার পর শান্তি কমিটির সুপারিশে ছাড়া পাই। অবশ্য এ জন্য আমার আত্নীয়স্বজনকে আড়াই হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে।

স্বাক্ষর/-
আরিফুর রহমান।

।।৬৯।।
ডাক্তার মোঃ হাবিবুর রহমান
সুখানপুকুর ষ্টেশন বাজার
থানা-গাবতলী, জেলা-বগুড়া

প্রথমবারে (২৬শে মার্চ) পাক হানাদার বাহিনী ব্যর্থ হওয়ার পর ১৩ ই এপ্রিল ত্রিমুখী আক্রমণ চালিয়ে বগুড়া শহর পূর্ণ দখলে আনে। কয়েকদিন পর একদল হানাদার বাহিনী গাবতলী সি, ও, অফিসে ক্যাম্প স্থাপন করে। গাবতলী থাকাকালীন হঠাৎ একদিন খান পশুর অত্র সুখানপুকুরে হানা দেয়। হানা দিয়ে অসংখ্য দোকানপাট ও ঘড়বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। ৭২ জন নিরীহ জনগণকে একত্রে লাইন করে মেশিনগান দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যায় যে, খান সেনারা বাজারে ঢুকেই সর্বপ্রথম আমার বাসায় অগ্নিসংযোগ করে ভস্মীভূত করে দেয়। আমি অনুমান করি যে, খান সেনারা প্রায় এক লক্ষ টাকার ধন-সম্পদ ভস্মীভূত করে দেয়। রাজাকার ও বিহারীরা বাজারের বিভিন্ন দোকানপাট লুট করে নিঃশেষ করে দেয়। জনসাধারণকে ডেকে খান সেনারা মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের খোঁজ জানতে চায়। জনগণ অস্বীকার করলে তাদেরকে ধরে ভীষন নির্যাতন করার পর বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাদেরকে হত্যা করে। গ্রামে গ্রামে ঢুকে খান কুকুরেরা নিরীহ অবলা বালার প্রতি পাশবিক অত্যাচার শুরু করে। প্রথম দিনের মত খান সেনারা গাবতলীতে পুনরায় ফিরে যায়। এরপর প্রত্যেক দিন গাবতলী থেকে বর্বররা গাড়ীযোগে সুখানপুকুরে টহল দিতে থাকে। প্রত্যহ আসার পথে অথবা যাওয়ার পথে বর্বর দস্যু বাহিনী ২/৪ জনকে হত্যা না করে ফিরে যেত না। খান সেনারা গাবতলী তথা সুখানপুকুরের আশেপাশের সমস্ত জনগণের মনে ত্রাশের সৃষ্টি করেছিল। প্রত্যেকদিন গ্রামের অভ্যন্তরে ঢুকে মেয়েদেরকে জোর করে বা তাড়িয়ে ধরে পাশবিক অত্যাচার চালায়। কাউকে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যেত। এদের প্রায়ই মরে যেত।

আবার কেউ কেউ পশুদের হাত থেকে বেঁচে কোন রকমে বাড়ী চলে আসত। দীর্ঘদিন নির্যাতন চলার পর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর আক্রমণে শত্রুর হাত থেকে নিস্তার পাই।

স্বাক্ষর/-
ডাক্তার মোঃ হাবিবুর রহমান।

।।৭০।।
সুকচান
গ্রাম – সাইন্দ্রা
পোঃ- শান্তাহার
জেলা- বগুড়া

বগুড়া জেলার অর্ন্তগত আদমদিঘী থানার শান্তাহার ইউনিয়নের অধীন সাইন্দ্রা গ্রামটি পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য ও বিহারদের দ্বারা অত্যাচারিত। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য সাইন্দ্রা গ্রামে পাক বর্বররা প্রবেশ করে। উক্ত গ্রামে প্রথমে লুটতরাজ এবং পরে অগ্নিসংযোগ করে। অগ্নিসংযোগের ফলে প্রায় ৩শ বাড়ি পুড়ে যায়। উক্ত ৩শ বাড়ির যাবতীয় মালামাল ভস্মীভূত হয়। এখন ও ধ্বংসের সাক্ষ্য বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। উল্লিখিত গ্রামে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে।

এই গ্রামে ঢুকে পাক বর্বররা ছাগল, গরু, হাঁস, মুরগী ও তরকারী ইত্যাদি লুট করেছে। কয়েকজন নারী যারা পালাতে সক্ষম হয়নি তাদেরকে ধর্ষন করে ও ধরে ক্যাম্পে নিয়ে আসে। ক্যাম্পে আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। এই গ্রামের প্রায় ১৫০ জন লোক পাক বর্বরদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন।

স্বাক্ষর/-
সুকচান।

।।৭১।।
ওমর আলী প্রামাণিক
গ্রাম-নাপুরগাছি,
থানা-পাঁচবিবি
জেলা-বগুড়া

এপ্রিল মাসের শেষের দিকে আমি আমার বাড়ী দেখার জন্য নাপুরগাছি চলে আসি। এবং নিজ বাড়িতে গিয়ে দেখি পাক হানাদার বাহিনী বাড়ীর আশেপাশে বাঙ্কার করে বাঙ্কারের মধ্যে মেশিনগান বসিয়ে পজিশনে আছে। আমি বাড়ীতে ঢুকে দেখতে পাই আমার বাড়ীতে খাট চৌকি ইত্যাদি সবকিছু পাক হানাদার বাহিনী নিয়ে তাদের কাজে ব্যবহার করেছে। তারপর আমি বাড়ী হতে খিড়া পাথার রওনা হয়ে যাবার সময় পথে এক জঙ্গলের মধ্যে পাক হানাদার বাহিনী ও বিহারীরা আমাকে দেখে ফেলে। এবং আমাকে পাঞ্জাবী একজন সৈন্য ডাকে। আমি তার নিকট গিয়ে দেখতে পাই জঙ্গলের মধ্যে হানাদার বাহিনী দুটি গর্ত করে রেখেছে, তার গভীরতা প্রায় ২০/৩০ হাত এবং দৈর্ঘ প্রায় ৩০/৪০ হাত। আমি সেখানে পৌছালে একজন পাক সেনা বিহারীদেরকে নির্দেশ দেয় আমাকে উক্ত একটা গর্তের মধ্যে ফেলে দিয়ে জ্যান্ত কবর দিতে। তারপর বিহারীরা ও একজন পাক সেনা আমাকে উক্ত গর্তের মধ্যে নামতে বলে। আমি গর্তের মধ্যে নামার সাথে সাথে আমাকে চিত হয়ে টান হয়ে শুইতে বলে। আমি ভয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে থাকি। তারপর পাক হানাদারদের মধ্যে একজন বিহারীদেরকে নির্দেশ দেয় জ্যান্ত অবস্থায় আমাকে মাটিচাপা দিয়ে রাখতে। দুইজন বিহারী কোদাল হাতে করে একজন মাথার দিকে গিয়ে দাঁড়ায় আর একজন পায়ের দিকে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর তারা কোদালে মাটি তুলে আমার শরীরের উপর মাটিচাপা দিবে। এমন সময় একজন পাক সেনাদের ক্যাপ্টেন ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস দেয় যে, এই লোকটাকে কেন তোমারা জ্যান্ত কবর দিচ্ছ। তারপর ক্যাপ্টেন আমাকে গর্ত হতে তুলে জিজ্ঞাসাবাদ করে তোমার বাড়ী কোথায়, কোথায় যাবে তুমি? আমি ভয়ে ভয়ে তার প্রশ্নের জবাব দিই। তারপর ক্যাপ্টেন তার সিপাইদেরকে ও বিহারীদেরকে বেশ শাসন করে। এবং আরও বলে এ লোক একজন বুড্ডা আদমী, একে তোমরা কেন জ্যান্ত কবর দিচ্ছিলে। এ তো কোন অপরাধ করে নাই। তারপর ক্যাপ্টেন আমাকে জিজ্ঞাসা করে তুমি কোথায় যাবে। আমি জবাব দেই আমি পূর্বদিকে যাবো। তারপর ক্যাপ্টেন আমাকে পূর্বদিকে যেতে নির্দেশ দিলে আমি রওনা হয়ে চলে আসি। এবং খিড়া পাথার গিয়ে আমার পরিবার পরিজনের সাথে সাক্ষাত করি এবং ঘটনাদি খুলে বলি। তারপর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আমি নিজ বাড়ী চলে আসি।

স্বাক্ষর/-
ওমর আলী প্রামাণিক
৬/১১/৭৩

।।৭২।।
ফকির মামুদ মন্ডল
গ্রাম-দানেজপুর
ডাকঘর- পাঁচবিবি
থানা- পাঁচবিবি
জেলা- বগুড়া

১৯৭১ সালের বাংলা আষাঢ় মাসের ২০/২৫ তারিখে ৫০/৬০ জন রাজাকার পুলিশ বিহারী ও পাক মিলিটারী মিলে আমার বাসায় যায় এবং বাসা ঘেরাও করে এবং আমাকে বাসা হতে ধরে ফেলে। বাসার বাইরে নিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। তোমার চার নাতী মুক্তিযোদ্ধা তাদেরকে যদি তুমি এনে না দাও তাহলে আমরা তোমাকে গুলি করে হত্যা করব। তার প্রতি উত্তরে আমি জবাব দেই তারা কোথায় গিয়েছে তা আমি বলতে পারবো না, আর আপনারা যদি তাদেরকে কোথাও খুঁজে পান তা হলে তাদেরকে আপনারা গুলি করে মেরে ফেলবেন আমার কোন আপত্তি থাকবে না। কিন্তু আমার নাতিরা কোথায় গিয়েছে তার জন্য তো আমি দায়ী হতে পারি না। কারন তারা এখন বড় হয়েছে নিজ নিজ স্বাধীনতা নিয়ে তারা যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে পারে। আমি এখন বৃদ্ধ হয়েছি আর কি তাদের খোঁজখবর আমার পক্ষে রাখা সম্ভব। তারপর পাক হানাদার বাহিনীরা আমাকে চোখ বেঁধে পাঁচবিবি রেল লাইনের উপর নিয়ে আসে। এনেই স্থানীয় বিহারীদের নেতারা আলাপ-আলোচনা করার পর চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে রেল লাইনের উপর ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। আমি বাড়ী চলে যাই।

ঐ ঘটনা ঘটার ৭/৮ দিন পর আয়ুবের নির্দেশে ২০/২৫ জন রাজাকার বিহারী ও পাক সেনা মিলে আবার আমার গ্রামের বাসায় গিয়ে ঘেরাও করে আমাকে ধরে পাঁচবিবি নিয়ে আসে। এসেই সেই একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে, আমি আমার জবাবে একই কথা বলি। তারপর সেদিনও পাক হানাদার বাহিনী কুখ্যাত বিহারী নেতার সাথে আলাপ আলোচনা করে আমার চোখ বেঁধে সি,ও, অফিসের নিকট নিয়ে ছেড়ে দেয়। আমি বাড়ী চলে যাই। তারপর আমি আমার পরিবার পরিজনের সবাইকে নিয়ে ভারতে চলে যাই। সেখানে আমার পরিবারের সকলকে রেখে ৮/১০ দিন পর আমি বাংলাদেশে চলে আসি। এর মধ্যে দালাল বিহারী নেতা আমার গদিঘর দখল করে নিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে সেখানে বসবাস করছিল।

আষাঢ় মাসের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনী পাঁচবিবি হতে কান্দি যাবার পথে কান্দিয়া ব্রীজে ৪/৫ টা চীনা মাইন ব্রীজ হতে উদ্ধার করে। এবং মাইন কারা পুঁতে রাখে তাদের খোঁজ করতে থাকে। কুখ্যাত আয়ুব পাক হানাদার বাহিনীকে জানিয়ে দেয় যে, উক্ত মাইন পাতার মূলে রয়েছে ছমির উদ্দিন মণ্ডল ও মামুদ মন্ডল।

শ্রাবন মাসের তিন তারিখে ৪০/৫০ জন পাক সেনা রাজাকার ও বিহারী মিলে আমাদের বাসায় যায় এবং বাসা ঘেরাও করে আমাকে এবং আমার ছোট ভাই ছমির উদ্দিন মণ্ডলকে ধরে দুই ভাই- এর হাত একত্র করে বেধেঁ কোমরে দড়ি দিয়ে বেধেঁ পাঁচবিবি থানায় নিয়ে যায় এবং বলে ব্রীজে তোমরা মাইন পুঁতেছিলে, তোমরা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। তোমার চার নাতি মুক্তিযোদ্ধা তাদেরকে এনে দাও। নতুবা তোমাদের দুই ভাই কে গুলি করে হত্যা করবো। তারপর আমরা দুই ভাই মেজরকে বলি আমরা মাইন কেমন দেখা যায় চিনি না এবং মাইন পাতা সম্বন্ধে কিছুই বলতে পারবো না। আর আমার নাতীদের খোঁজখবর আমরা কিছুই বলতে পারবো না। তারপর আমাদের দুই ভাইকে মেজর পাঁচবিবি থানায় চালান দিয়ে যায়। পাঁচবিবি থানায় সেই সময় পাঞ্জাবী পুলিশেরা থাকতো এবং বিহারীরা থাকতো। আমাদের দুই ভাইকে থানার হাজতে রাখে। আমরা হাজতের মধ্যে ঢুকে দেখতে পাই মুজাফফর ন্যাপের একজন কর্মী নাম বছির মিয়া (বাড়ী আটুয়া পাঁচবিবি থানা) আধা মৃত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। তাকে একজন পাঞ্জাবী পুলিশ এমন প্রহার করেছে যে, প্রহারের দরুণ তার সমস্ত শরীর হতে রক্তপাত হচ্ছে। আমি জেলে ঢুকেই তাকে দেখে বললাম বছির মিয়া তুমি এখানে। বছির আমাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। আমি তাকে সান্ত্বনা বাণী শুনিয়ে বলি আল্লাহ আল্লাহ করো।

আল্লাহ ছাড়া আর কোন গতি নাই। তারপর আমরা দুই ভাই জেলের মধ্যে থেকে যাই। সেই দিন রাত ৮ টার পর একটা পাক হানাদার বাহিনীর গাড়ি গিয়ে থানায় উপস্থিত হয় এবং একজন পাঞ্জাবী জেলের দরজায় গিয়ে বছিরকে ডাক দেয়। বছির নড়তে-চড়তে পারে না, দুই তিনজন বিহারী ও একজন পুলিশ বছিরকে হাজত হতে বের করে গাড়ীতে তুলে দেয়, গাড়ী চলে যায়। তার আধ ঘন্টা পরেই আমরা সি, ও, অফিসের সম্মুখে একটা ফায়ারের শব্দ শুনতে পাই। আমরা মনে করলাম বছির হয়তো বাংলাদেশের মাটিতে হানাদার বাহিনীর গুলিতে মিশে গেল। আমরা দুই ভাই আল্লাহর নাম স্মরণ করতে থাকি। এবং মনে মনে বলতে থাকি এরপর মনে হয় আমাদের পালা। কোন মতে রাত্রি কেটে যায়।

তার ৫/৭ দিন পর মেজর আবার আমদের সাথে জেলে দেখা করে এবং বলে শালা বাঙ্গালীকা জাত, বড় হারামীহায়। শালা মাইন পোঁতে হাম লোককে মারতে চায়। এবং আমাকে আরও বলে তোম লোককা দুনিয়াছে নেকাল করদেগা, আজ রাতমে তোম বিদায় নিয়ে গা। তারপর জয়পুরহাট চলে যায়।

এর মধ্যে আমি জেলের একজন বাঙ্গালী পুলিশের মারফত শুনতে পাই যে, আমাদের দুই ভাই- এর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছে সি, ও, অফিসের পার্শ্বে। এটা শোনার সাথে সাথে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে থাকি। কিন্তু আয়ুব বিহারীর নির্দেশে জেলের মধ্যে আমার উপর কোন শারিরীক ও মানসিক অত্যাচার করা হয় না।

মেজর চলে যাওয়ার ৮/১০ দিন পর একজন বেলুচ মেজর পাঁচবিবি আসে। এসেই জেলে গিয়ে আমাদেরকে দেখতে পায়। তারপর কাগজপত্র দেখে ও,সি, কে নির্দেশ দেয় যে, এখনই আমাদেরকে বগুড়া সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুই ভাইকে গাড়ীতে করে বগুড়া সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেয়। আমরা জেলে ঢুকে দেখতে পাই জেলের মধ্যে ৮০/৯০ জন বাঙ্গালী পড়ে আছে। তাদের কারোর শরীরের শত শত লাঠির আঘাতের চিহ্ন। আবার কারুর শরীরে শত শত বেয়োনেটের খোঁচার চিহ্ন। কারোর শরীর হতে অঝোরে রক্ত ঝরছে। দ্রুত সব দৃশ্যাবলী দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জেলের দারোয়ান আমাকে বলতে থাকে বুড্ডা তুম আর নেহি বাচেগা। তারপর আমরা জেলে ঢুকার মধ্যে ঢোকার আধ ঘন্টা পর একজন পাঞ্জাবী লাঠি হাতে করে জেলের মধ্যে ঢোকে। সকলেই তাকে দেখে ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে সড়ো চুপচাপ হয়ে বসে। তারপর পাঞ্জাবীটা ঘরের মধ্যে ঢুকেই কোন কথা না বলে এক এক করে সবার পিঠে একটা করে লাঠির আঘাত করে। তারপর আমার নিকট গিয়ে থমকে দাঁড়ায় এবং আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বুড্ডু তুম কাহাছে আয়া। আমি জবাব দিই আমি পাঁচবিবি হতে এসেছি। আমার কোন দোষ নেই আমাকে বিহারীরা ধরিয়ে দিয়েছে। তারপর মিনিট পাঁচেক চুপ করে থাকে এবং আমাকে বলে বুড্ডা তোমার কোন ভয় নেহি। তারপর আমার ভাই এর নিকট গেলে আমি বলি আমার ছোট ভাই। তারপর তাকে কিছু জিজ্ঞাসা না করে জেল হতে বেরিয়ে চলে যায়। তারপর সন্ধ্যা নেমে এলে ৪/৫ জন লোককে জেল হতে বের করে কোথায় যেন নিয়ে যায়। তাদেরকে আর জেলে ফিরে নিয়ে আসে না। এইভাবে প্রতি দিন ৪/৫ জন করে জেল হতে বের করে নিয়ে হত্যা করতো। কয়েকদিন পর বগুড়া শহরে আমার আত্নীয়ের তদ্বীরের দরুন মুক্তি পাই।

স্বাক্ষর/-
ফকির মামুদ মণ্ডল
৭/১১/৭৩

।।৭৩।।
মোঃ জালাল উদ্দিন
সারিয়াকান্দি
জেলা- বগুড়া

১৯৭১ এর জুলাই আগষ্ট মাসের দিকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অধিক সামরিক শক্তি সরঞ্জাম নিয়ে সারিয়াকান্দিতে তাদের ঘাঁটি ফেলে। হানাদার বাহিনী বাঁধে যাওয়ার পথে বেণীপুর চরের তমিজউদ্দিন প্রামাণিকের ভগ্নিপতিকে সাপাড়ার রাস্তায় ধরে এবং রাইফেল দ্বারা আঘাত করে হত্যা করে। তারা প্রত্যেক দিন সকালে দল বেঁধে বিভিন্ন গ্রামে রুটিন মোতাবেক হামলা করত। নারী নির্যাতন, হত্যা, মারধোর ও লুন্ঠন করে মূল্যবান জিনিসপত্রাদি নিয়ে বিকালে তাদের ঘাঁটিতে ফিরত। এমনি একদিন গণকপাড়ায় যেয়ে তারা মুক্তি বাহিনীর হাতে আটকা পড়ে। সারাদিন সারারাত দু’দলের মধ্যে যুদ্ধ হয় কিন্তু মুক্তি বাহিনীর গুলি ফুরিয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানী বাহিনী রক্ষা পায়।

অতর্কিতে হানা দিয়া পাক বাহিনী দেলুয়াবাড়ী গ্রাম হতে মুক্তিযোদ্ধা নজির হোসেন, সাহায্যকারী কোরবান আলী, মন্তেজার রহমান ও বাবু খাঁকে আটক করে। বাঁধের নিকট নিয়ে হাত পাঁ বেঁধে নজির হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে এবং অপর তিনজনকে নিয়ে ঘাঁটিতে আসে। অতি কষ্টে পরে তারা মুক্তি পায়। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর প্রায় সপ্তাহখানেক তাদের দু’জনকেই অজ্ঞান অবস্থায় দেখা গেছে। বাঙ্গালীর পশ্চিম পাড়, রামচন্দ্রপুর গ্রামে অপারেশন চালাতে গিয়ে মুক্তি বাহিনীর গুলিতে ছোট দারোগা নিহত হয় এবং সামরিক বাহিনীর একজন গুরুতররূপে আহত হয়।

মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা রীতিমতো বেড়ে যায়। হানাদার বাহিনী বাইরে যাওয়া কম করে ফেলে। তাদের অত্যাচারে পলাতক বাড়িওয়ালাদের খাসী, মোরগ কুড়াতে থাকে। একদল হানাদার বাহিনী বগুড়া থেকে আসার পথে ফুলবাড়ী খেয়াঘাটে মুক্তিবাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হয়। খেউনিরুপী মুক্তিযোদ্ধা খেয়ার নৌকা নদীর মধ্যে আসলে গুলি ছুড়তে থাকে। ঘটনাস্থলেই তিনজন কনষ্টেবল প্রাণ হারায়। তারপর শুরু হয় স্থানীয় দোকানপাঠ লুন্ঠন। তবিবর মণ্ডলের দোকানের সম্মুখে ট্রাক রেখে মালপত্র বোঝাই করে সেগুলো রংপুরের গাইবান্ধায় পাচার করে। হাবিবুর প্রামাণিকের দোকান লুট করে এবং তাকে পর পর দুই দিন দোকানের মধ্যেই বেদম প্রহার করে। নৌকাতে পাঠ উঠানোর অভিযোগে দৌলতুজ্জামান তরফদার সাহেবকে ভীষণ মারধোর করে। তখন মুক্তি বাহিনীর আর সহ্য হয় না। এদিকে সোজাসুজিও তারা মিলিটারীদের ঘাঁটিতে হানা দিতে পারে না। কারন পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাম্পে হানা দিলে আশেপাশের গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় এবং লোকজন মেরে সাফ করে ফেলে। তবুও সময় ঠিক করে একদিন মুক্তি বাহিনীর তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তানী বাহিনীর এই খবর বগুড়ায় তাদের ঘাঁটিতে পৌঁছিয়ে দেয়ার পর সামরিক বাহিনীর লোককে সারিয়াকান্দি পাঠিয়ে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে। সারিয়াকান্দি বাজারের সমস্ত বাড়ী ও দোকানপাট তল্লাশী চালিয়ে মালেক মণ্ডলের দোকান হতে বাংলাদেশের পতাকা উদ্ধার করে। ফলে তার দোকানের সমস্ত মালপত্র থানাতে উঠাবার আদেশ দেয়। তারপর মন্তেজা রহমান মণ্ডলকে পাকিস্তানী পতাকা না উঠাবার অভিযোগে আটক করে তাদের সামরিক গাড়িতে উঠায়ে নেয়। মফিজ মাষ্টার সাহেবের বাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং তার বাড়ীতে পাহারারত কামলা খটটুর বাবাকে আটক করে এবং গাড়ীতে তুলে নেয়। জামাল ডাক্তারের শ্বশুর ময়েজ ডাক্তার, জামাল ডাক্তার, মালেক মণ্ডলের ছেলে এবং অন্যান্য বেশ কিছু লোককে হানাদার বাহিনীর জোয়ানরা আটক করে। সামরিক বাহিনীর উক্ত দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল লেফটেন্যান্ট আতিক। মালেক মণ্ডলের ছেলেকে থানায় তার বুকে পায়ের শক্ত জুতার দ্বারা বার কয়েক আঘাত করে। ফলে সে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায় এবং তার মুখ হতে রক্ত বের হতে থাকে। সকলকে নিয়ে বাউলে আটা ঘাঁটিতে চলে যায় এবং রাতে তাদের প্রতি অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায়। তাদের ঘাঁটিতে রেখে জামাল ডাক্তারের বাসায় পুনরায় আসে এবং তার স্ত্রীকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। তার স্ত্রীকে না পেয়ে তার শ্বাশুড়ীকে ধরে মোটরে উঠায় ও তার মেয়েকে বের করে দেয়ার জন্য ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে। রাত্রিতে মুক্তিবাহিনী অতর্কিতে থানা আক্রমণ করে। তখন সারিয়াকান্দি থানায় মিলিটারী ছিল। থানা আক্রমনের পরপরই ভীষণ বৃষ্টি আরম্ভ হয়। দুই পক্ষের ভীষণ গোলাগুলি হয় কিন্তু বৃষ্টির বেগ আরো প্রবল হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়। তারপর প্রায়ই খবর পাওয়া যেতে লাগল আজ এ দালাল খতম, কাল ও দালাল খতম। পাকিস্তানী বাহিনী তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখতে লাগল। ইতিমধ্যে থানায় পশ্চিম ও,সি কে পাঠানো হয়েছে। তার চেষ্টায় প্রায় ৭০/৮০ জন রাজাকার সংগ্রহ করা হয়েছে। এলো পশ্চিমা পুলিশ। এদের বাবা-মা মানুষ কিনা আমার জানা নেই। তবে এরা আকৃতিতে মানুষ হলেও আসলে ছিল কুকুর। মুক্তিবাহিনীর তৎপরতায় তাদের যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হল। রাজাকাররূপী একজন মুক্তিবাহিনীর ছেলেকে তারা টের পেয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে এবং হাত-পা কেটে নদীতে ফেলে দেয়। সারিয়াকান্দি এক্সচেঞ্জ হতে পাকবাহিনীর সংখ্যা এবং তাদের গোলা বারুদের খবর জেনে ভোর পাঁচটায় সারিয়াকান্দি আক্রমণ করা হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ উক্ত যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর দুইজন যুবক প্রথমেই নিহত হওয়ায় তারা ফিরে যেতে বাধ্য হন। বগুড়া ও গাবতলী থেকে হানাদার বাহিনীদের ডাক আসে এবং তাদেরকে থানা ছেড়ে অতিসত্বর বগুড়া চলে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু ইতিমধ্যেই মুক্তিবাহিনী কতৃক রাস্তা বন্ধ হওয়ায় তারা চলে যাবার কোন পথ পেল না।

১৯৭১ সালের ২৬ শে নভেম্বর সকাল ঠিক এগারটায় মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে সারিয়াকান্দি থানাতে অবস্থানরত হানাদার বাহিনীদেরকে আক্রমণ করে। বিকাল তিনটার সময় এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত বাহিনীদের পতন ঘটে। সারাদিন এবং সারারাত যুদ্ধের পর ২৭ শে নভেম্বর সকালে হানাদার বাহিনীসহ থানার পতন ঘটে। শতাধিক রাজাকার ও পুলিশ মুক্তিবাহিনীর দ্বারা আটক হয়। আটককৃত পুলিশদেরকে ভারতে বিচারের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়। রাজাকারদের বিচার করা হয় যমুনা নদীর পাড়ে। বিচারে কিছু রাজাকার রক্ষা পায় এবং অবশিষ্ট গুলো যমুনা নদীতে তাদের সলিল সমাধি লাভ করে। থানার পতনের পর শুরু হয় উড়োজাহাজ থেকে বোমা বিস্ফোরণ ও মেশিনগানের গুলিবর্ষণ । উক্ত এমনি গুলিতে নিহত হয় পাকুড়িয়া গ্রামের পুকরা মণ্ডলের ছেলে দুদু মণ্ডল। সে মুক্তিবাহিনীদেরকে নিয়ে ভারতে যাচ্ছিল এবং মেশিনগানের গুলিতে নৌকা থেকে নদীতে পড়ে যায়। বর্বর পাক বাহিনীর রাইফেলের গুলিতে নিহত হয় উক্ত গ্রামের জাফর সরদারের ছেলে জহির উদ্দিন। মেশিনগানের আর একটি গুলিতে সারিয়াকান্দির আছমতের মা নিহত হয়।

দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় সারিয়াকান্দি থানা পতনের পূর্ব রাত্রিতে পাকিস্তানী বাহিনীর অধিকাংশ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং তার কিছু অংশ রাস্তায় মারা পড়ে। বাকীগুলো সমন্ধে কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি। ফলে অত্র থানার অনেক অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিবাহিনীর হাতে আসে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ জালালউদ্দিন
২২/০৯/৭৩

।।৭৪।।
মোঃ ছানোয়ার হোসেন
গ্রাম- বালীস্বর্বা
ডাকঘর- পাঁচবিবি
জেলা- বগুড়া

১৯৭১ সনের ২২ শে জুলাই রাজাকারদের হাতে গ্রেফতার হলে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাবার পর আমাকে গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে দেয়। তারপর আরম্ভ হয় দৈহিক নির্যাতন। প্রায় ১৫/২০ জন পাঞ্জাবী ফুটবল খেলার মত লাথি মারতে থাকে। একজন লাথি মেরে আরেকজন এর কাছে দেয়, সে আবার আর একজনের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে কিল ঘুষি, রাইফেলের বাঁটের বাড়ি চলতে থাকে। প্রায় ৪০ মিনিট তারা আমার উপর নির্যাতন চালায়। শেষের দিকে আমি জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। সারা শরীর ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। আমার উপর দৈহিক নির্যাতন চালাবার পর প্রায় জ্ঞানশূন্য অবস্থায় থানাতে পৌছে দেয় এবং হাজতে চোখ, হাত বাঁধা অবস্থায় বন্দী করে রাখে। রাত্রি ৮ টার দিকে একজন বাঙ্গালী পুলিশ আমার চোখ ও হাতের বাধন খুলে দেয় এবং কিছু ভাত খেতে দেয়। এই সময় আমি দেখতে পাই হাজতের ভিতর আরও ৮ জন বন্দী আছে।

অতঃপর আমাকে ১০ দিন থানা হাজতে বন্দী করে রাখে। প্রত্যেকদিন বহু পাঞ্জাবী সৈন্য ও বিহারীরা আমাকে দেখার জন্য থানা হাজতে আসতো কেননা তারা নাকি মুক্তিফৌজ কেমন দেখা যায় তা জানে না। তারা এসে নানাভাবে আমাকে গালিগালাজ দিত এবং লাঠি দিয়ে হাজতের ভিতরেই আমাকে খোঁচাতো। অনেকে আবার উপহাস করে আমাকে বন্ধু বলে ডাকতো।

আগস্ট মাসের ১ তারিখে আমাদেরকে থানা হাজত থেকে বের করে এবং আমার দুই পার্শ্বে দুইজনকে দাঁড় করে আমার দুই হাত দুই জনের হাতের সঙ্গে বেঁধে মাজায় দড়ি বেঁধে টেনে রেল স্টেশনে আনা হয়। তারপর গাড়ীতে করে বগুড়া নিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। বগুড়া জেলে দুইটা পাঞ্জাবী কে “জেল” দেয়া হয়েছিল। এই পাঞ্জাবী দুটি জেলের ভিতর যখন তখন আমাদেরকে মারধোর করতো।

৩ রা আগস্ট আমাকে জেল থেকে বের করে বগুড়া কটন মিলের নিকট একটা ছোট ঘরের ভিতর নিয়ে যায়। এখানে নিয়ে প্রথমে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়। এই সময় তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে-
‘তুমি কত বিহারী ও পাঞ্জাবী মেরেছো? কোথায় মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং দিয়েছো, তোমাদের লিডার কে, কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছো, ভারতীয় সৈন্য বর্ডারে যুদ্ধ করছে, কিনা, মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা কত? পাক বাহিনীর প্রশ্নের জবাবে আমি শুধু এ কথা বলি যে, আমি এ সব কিছু জানি না। আমি ভারত থেকে পালিয়ে আসছিলাম, আমি ট্রেনিং নেই নি।

আমার কাছ থেকে কোন কথা বের করতে না পেরে ৩ জন মিলে এক সঙ্গে আমাকে মারতে আরম্ভ করে। কিল, ঘুষি, লাথি, রাইফেলের বাটের বাড়ি এবং লাঠি দিয়ে ভীষণভাবে পিটানো আরম্ভ করে। প্রায় দেড় ঘন্টা যাবত এইভাবে মারধোর করার পর আমাকে পায়ের ভিতর হাত দিয়ে কান ধরে রাখতে নির্দেশ দেয়। আমি যখন তাদের কথা মত নিচু হয়ে পায়ের ভিতর হাত দিয়ে কান ধরে থাকি তখন পিছন থেকে চাবুক দিয়ে পিটান হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকে। সময় সময় বাইরে থেকে যারা দেখতে আসে তারাও হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়ে পিটায়।

প্রায় ৩ ঘন্টা যাবত এইভাবে নির্যাতন চালানোর পর সন্ধ্যা ৭ টার দিকে আমার পায়ে চিকন রশি শূন্যে ঝুলিয়ে দেয়। এই সময় এমন লাগতে থাকে যে জীবন বোধ হয় পা দিয়ে বের হয়ে যাবে। ঝুলে থাকা অবস্থায় মোটা রোলার দিয়ে প্রত্যেক গিরায় গিরায় মারতো এবং মাথার পিছনের দিকে আঘাত করতো। প্রায় ২০ মিনিট রাখার পর আমি বলি যে, আমাকে মাটিতে নামানো হলে আমি সব কথা বলবো। তখন তারা আমাকে নিচে নামায় এবং তখনই বলার হুকুম দেয়। কিন্তু আমি জিরিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে আবোল তাবোল বলতে থাকি। আমার চালাকি বুঝতে পেরে বর্বর সৈন্যরা আমাকে লাথির পর লাথি মারতে থাকে। কিছুক্ষন পিটানোর পর পুনরায় আমাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং পূর্বের চেয়ে আরও বেশী প্রহার করতে থাকে এবং প্রশ্ন করতে থাকে। আমার ঐ একই উত্তর যে আমি জানি না।

২য় বার আমাকে ঝুলানোর প্রায় ১৫/২০ মিনিট পর পাশের রুম থেকে পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন বের হয়ে আসে এবং আমাকে বলে “ছানোয়ার, আমি একজন মুসলমান তুমি বিশ্বাস কর?” আমি তার জবাবে বলি যে। “হাঁ আপনি মুসলমান।“তখন ক্যাপ্টেন সাহেব আমাকে পুণরায় বলে যে “আমি মুসলমান হয়ে আর এক মুসলমান এর কাছে প্রতিজ্ঞা করছি যে যদি তুমি আমার কাছে সত্য কথা বলো তবে তুমাকে আর মারা হবে না, এবং আমি চেষ্টা করবো তোমাকে ছেড়ে দিতে।“তখন আমার তার কথা বিশ্বাস হলো এবং আমি প্রতিশ্রুতি দিলাম যে “আমি সত্য কথা বলবো?” এই সময় আমাকে মাটিতে নামান হয় এবং বলে যে তুমি “খাওয়া দাওয়ার পর বলবে না এখনই বলবে?” আমি বলি যে আপনি যা বলেন সেই হিসাবেই আমি কাজ করবো। তখন আমাকে রুটি ও তরকারি এনে খেতে দেওয়া হয়।

খাওয়ার পর ক্যাপ্টেন সাহেব আমাকে জানায় যে তুমি আজ বিশ্রাম কর কাল তোমার কাছ থেকে সব কিছু শোনা হবে। এই বলে আমাকে পুনরায় জেলে নিয়ে একটা সেলের ভিতর বন্দী করে রাখে। এই সময় আমি এত কাহিল হয়ে পড়েছিলাম যে আমি মোটেই নড়াচড়া করতে করতে পারতাম না।

৪ ঠা আগষ্ট সকাল ৯টার দিকে আমাকে জেল থেকে বের করে পূর্বের সেই ঘরে ক্যাপ্টেন সাহেবের কাছে নিয়ে যায়। ক্যাপ্টেন সাহেব আমাকে প্রশ্ন করে যে, বল তুমি কি করেছো? তার উত্তরে আমি জানাই যে আমি ৭দিন ট্রেনিং নিয়েছি। তারপর অপারেশনের জন্য আমরা বগুড়া যাবার পথে “গয়েশপুর” এসে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং আমার দলের লোক আমাকে রেখে বগুড়া চলে যায়। তখন আমি পুনরায় ভারত চলে যাই এবং কিছু দিন পর যখন ইয়াহিয়া খান সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করেছেন তখন আমি দেশে ফিরে আসার সময় রাজাকারদের কাছে ধরা পড়ি। ক্যাপ্টেন আমার কথা লিখে নেয় এবং আরও বহু প্রশ্ন করে, ভয় দেখায়, লোভ দেখায় উত্তর দেবার জন্য। আমি বলি যে যদি আমাকে মারতে মারতে মেরেও ফেলা হয় তবুও আমি এর বেশি আর কিছু বলতে পারবো না।

৭ ই আগস্ট আমাকে বগুড়া জেল থেকে বের করে ” মিলিটারী পুলিশ “হাত বেঁধে গাড়ীতে করে রেল স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের কথা থেকে আমি বুঝতে পারি আমাকে নাটোর সামরিক জেলে পাঠান হচ্ছে। গাড়ী আসার পর মিলিটারী পুলিশ আমাকে অন্য মিলিটারীর হাতে তুলে দেয়।

গাড়ীর ভিতর তুলে আমাকে ও অন্য আরও একটি ছেলেকে ছিটের নিচে বসিয়ে আমাদের ঘাড়ের উপর পা তুলে বর্বর সৈন্যরা বসে থাকতো এবং প্রত্যেক স্টেশনে গাড়ী থামলে বিহারী ও অন্যান্য সৈন্য রা এসে আমাদের দুই জনকে ভীষণভাবে মারধোর করতো। প্রত্যেক ষ্টেশনে আমাদের এই ভাবে নির্যাতন চলতে থাকে।

নাটোর রেল স্টেশন থেকে আমাদের নাটোর সামরিক জেলের কাছে নিয়ে যায় এবং বলে যে এদেরকে নতুন “মেহমান” হিসাবে প্রাথমিকভাবে কিছু “খেদমত” করে দেওয়া হোক। এই বলে ভীষণ মারধোর আরম্ভ করে। মারতে মারতে প্রায় জ্ঞানশূন্য অবস্থায় আমাকে জেলের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়।

প্রত্যেক দিন জেল থেকে বের করে কাজ করানোর জন্য নাটোর ফুল বাগানে নিয়ে যেত। প্রত্যেক দিন ৬ ঘন্টা কাজ করতে হতো। সকাল ৮টা থেকে রাত ১২ টা এবং ৩টা থেকে ৫ টা একটানা কাজ করতে হতো এর ভিতর কোন বিশ্রাম নিতে দিতো না। সব সময় “ডবল” হিসাবে কাজ করাতো। এরপরও বর্বর সৈন্যরা চাবুক দিয়ে আমাদের প্রহার করতো।

জেলখানার ভিতর যে ঘরে আমাদের রাখা হতো সে ঘরে খুব বেশি হলে ১০/১২ জন থাকতে পারে। সেখানে আমাদের ৬০ জনকে রাখতো। রাত্রিতে শোবার কোন ব্যবস্থা ছিল না। আমি যে ঘরে ছিলাম সে ঘরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার ডঃ কাজী সালেহ আহম্মেদ, লেকচারার মজিবর রহমান, ওয়াপদার ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার এম, ডি, ছারোয়ার হোসেন (রাজশাহী) ছিলেন। আমাদের মত এদের উপরও চলতো সমানভাবে নির্যাতন এবং আমাদের মতো এদেরও কাজ করতে হতো। জেলের ভিতর সর্বমোট ১৫০ জন কয়েদী বন্দী ছিল।

মোট ২৮/২৯ দিন আমি নাটোর জেলে ছিলাম। আমাদের খাবার দেবার জন্য জেল থেকে বের করে লাইন ধরাতো। আমরা যখন নিচু হয়ে খাবার নিতাম তখন বর্বর সৈন্যরা চাবুক দিয়ে আমাদের প্রহার করতো। মার ছিল আমাদের একমাত্র সঙ্গী। প্রত্যেক দিন সকালে ছোট একটা পুরি ও একটু চা। দুপুরে দেয় ছটাক চাউলের ভাত ও পানির মত একটু ডাউল অথবা একটু নিরামিশ তরকারী। বিকালে ২ টা ছোট রুটি ও একটু আলুর ঝোল। কোন সময়ই আমাদের খাবার খেয়ে পেট ভরতো না। আমরা সবাই সব সময় ক্ষুধার জ্বালায় ভুগতাম।

প্রত্যেকদিনই দেখতাম জেল থেকে ২/৩ জন লোককে নিয়ে যেত জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। বিকালে তাদের যখন জেলে ফিরিয়ে আনতো তখন তাদের দেহ ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় দেখা যেত- সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতো।

এত বিপদের মধ্যেও রাত্রির বেলা জেলখানার ভিতর গান বাজনা করতাম। কেউ গান গাইত কেউবা তালি বাজাত। এইভাবে আমরা আমাদের দুঃখ ভুলে থাকার চেষ্টা করতাম।

আমাদের কাছ থেকে ‘চুক্তি পত্র’ লিখে নেওয়া হয় যে যদি পুনরায় ভারত চলে যাই তবে আমার অবর্তমানে আমার পরিবারের উপর নির্যাতন চালানো হবে। জেল থেকে আমাদের বের করে প্রত্যেককে ৫ টা করে টাকা ও একটা করে সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়। মুক্তি পাবার পর আমি ৭ই সেপ্টেম্বর পাঁচবিবি হয়ে আমার বাড়ীতে পৌঁছি।

মুক্তি পেয়ে আমি বাড়ী আসার পর প্রায়ই পাক বাহিনী আমাকে চাপ দিত রাজাকারে ভর্তি হবার জন্য কিংবা বর্ডার স্পাইং করার জন্য। কিন্তু আমি অসুস্থ বলে বাড়ীতে থাকতাম এবং বলতাম যে আগে ভালো হয়ে নেই।

২৮ শে নভেম্বর বিকাল ৪ টার দিকে একজন রাজাকার আমার বাড়ীতে গিয়ে বলে যে, এখনই থানায় যেতে হবে। আমি যদিও বুঝতে পারি যে আমাকে বন্দী করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তবুও আমি তার সঙ্গে থানায় রওনা হই কিন্তু রাস্তায় নেমে দেখতে পাই যে পাক বাহিনী গাড়ি নিয়ে আমার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। রাস্তার ভিতর থেকেই আমাকে তুলে নেয় এবং জয়পুরহাটে নিয়ে যায়।

আমাকে যখন বন্দী করে গাড়ীতে তোলা হয় তখন গাড়ীর ভিতর লেঃ আলতাফ (বিহারী) বসে ছিল। আমাকে জয়পুরহাট বি, আই, ডি, সির শিক্ষানবীশ আবাসিক এলাকায় ২ নং ব্যারাকে পাক বাহিনীর প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যায়। এখানে আমাকে “মেজর আফজালের” কাছে নিয়ে যায় এবং লেঃ আলতাফ আমার নামে বহু মিথ্যা অভিযোগ মেজর সাহেবের কাছে বলে এবং বলে যে আমি নাকি ২ জন বিহারীকে হত্যা করেছি তা লেঃ আলতাফ দেখেছে। মেজর আমাকে এই সব কথার সত্যতা জিজ্ঞাসা করে। এক কথায় আমি সব অস্বীকার করি। তখন মেজর সাহেবের সঙ্গে আমার কিছুটা কথার কাটাকাটি হয়। এই সময় মেজর সাহেব একজন সৈন্যকে ডাকে এবং আমাকে ধোলাই দেবার জন্য বলে। এই সময় আমাকে এমনভাবে প্রহার করা হয় যে আমি প্রায় জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি।

আমাকে বহু সময় মারধোর করার পর লেঃ আলতাফ আমাকে মেরে ফেলার জন্য মেজর সাহেবের কাছে এজাজত চায়। মেজর সাহেব লেঃ আলতাফ কে এজাজত দেয় আমাকে মেরে ফেলার জন্য।

এই সময় আমাকে হত্যা করার জন্য লেঃ আলতাফ হোসেন আমাকে করে খোঞ্জনপুর রাস্তার উত্তর পারে মাঠের ভিতর পাক বাহিনীর ডিফেন্স- এর কাছে নিয়ে যায়, ৩/৪ জন মিলিটারীর হাতে তুলে দেয় এবং বলে দেয় যে একে চাকু দিয়ে জবাই করে কিংবা বেয়োনেট দিয়ে হত্যা কর। বর্বর সৈন্যরা আমাকে হত্যা করার জন্য প্রায় ১০০ গজ দূরে নিয়ে যায়। রাস্তাটা ছিল উঁচু, আমাকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তারা আমার চোয়ালে ঘুষি মারতে থাকে। আমি পড়ে যাই, তারা আবার টেনে তোলে।

আমাকে হত্যা করার জন্য যখন সুবেদার সাহেব একটা চাকু বের করে এবং টেনে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায় আমি তখন সুবেদার সাহেবের কাছে একটু নামাজ পড়ার জন্য সময় ভিক্ষা চাই। কিন্তু সুবেদার সাহেব আমাকে সময় দিতে অস্বীকৃতি জানায়। আমি তখন জোরে চিৎকার করে সুবেদারকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকি যে, “যদি আমাকে আল্লাহর এবাদত থেকে বঞ্চিত করে হত্যা করা হয় তা হলে রোজ হাসরের ময়দানে আল্লাহর সামনে আপনাদের বিচারের জন্য ফরিয়াদ করবো এবং বলবো এরা আমাকে তোমার (আল্লাহ) এবাদত থেকে বঞ্চিত করে হত্যা করেছে আমি এর বিচার চাই।”

আমার এই কথা শোনার পর সুবেদার সাহেব কিছুক্ষন নীরব থাকে এবং পরে নামাজ পরার জন্য এজাজত দেয়।

নামাজ পড়ার জন্য আমার এক হাত খুলে দেয় এবং এক জগ পানি এনে দেয়। আমি যখন নামাজ পড়ার জন্য দাঁড়িয়ে যাই তখন পাক সেনারা তিন দিকে এল, এম, জি নিয়ে পজিশন নিয়ে থাকে। তারা আমাকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেয় যে পালানোর চেষ্টা করলে গুলি করে হত্যা করবে।

অতঃপর এক মনে ক্বাজা নামাজসহ এশার নামাজ আদায় করতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লেগে যায়। নামাজের মাঝখানে আমি একবার টেলিফোন বেজে ওঠার শব্দ শুনতে পাই। নামাজ শেষে মোনাজাত করে আমি বর্বর বাহিনীকে বলি যে এই বার আমি প্রস্তুত এখন আমাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করতে পারো। এই সময় একজন সিপাই আমার কাছে এসে বলল যে খোদা আপনার দোয়া কবুল করেছেন। আপনাকে আর মারা হবে না কেননা এইমাত্র হেড অফিস থেকে ফোন এসেছে, আপনাকে সেখানে এখনই নিয়ে যাবার জন্য হুকুম দিয়েছে।

অতঃপর আমাকে হাত বাঁধা অবস্থায়ই একটা গাড়ীতে করে বি, আই, ডি, সি, অফিসের পাক বাহিনীর হেড অফিসে নিয়ে যায় এবং এক ক্যাপ্টেন সাহেবের কাছে হাজির করে।

শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের তদবীরের ফলে ২৮ শে নভেম্বর আমি রাত্রিতেই আমি মুক্তি লাভ করি।

স্বাক্ষর /-
মোঃ ছানোয়ার হোসেন
১০/১১/৭৩

।।৭৫।।
দারাজ উদ্দিন আহমেদ
থানা- জয়পুরহাট, জেলা- বগুড়া

২৬ শে এপ্রিল পাক সৈন্য জয়পুরহাট পৌঁছে এবং ২৭ শে এপ্রিল তারা ট্রেনযোগে পাঁচবিবি যাবার পথে পুরানোপৈল রেল ষ্টেশনের উত্তরে রেল গুদামটির কাছে ট্রেন দাঁড় করিয়ে রেখে তারা নির্দেশ দেয় গ্রামের লোকদের “মালাউনকা ঘর জ্বালাদো” বলে। তারা নিজেরাও একটি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। গ্রামের লোকেরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গ্রামের সমস্ত হিন্দু বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দেয়। অবশ্য হিন্দুরা ইতিপুর্বেই দেশত্যাগ করে ভারত চলে যায়।

২৮ শে এপ্রিল তারিখে পাকসৈন্য মুসলিম লীগারদের খবরে জয়পুরহাট থেকে তিন মাইল পুর্ব উত্তর কোণের হিন্দু প্রধান গ্রাম করোই কাদিপুর ঘেরাও করে অপারেশন করে। এখানকার সমস্ত অধিবাসী হিন্দু এবং তারা কুমার ছিল।

গ্রাম ঘেরাও করে তারা উক্ত গ্রামের ১৮৫ জন পুরুষ-মহিলা এবং বাচ্চাকে হত্যা করে। গ্রাম ঘেরাও করার পর গ্রামের লোকজন প্রাণভয়ে পালাতে থাকে তখন তাদের উপর বেপরোয়া গোলাগুলি নিক্ষেপ করে উক্ত সংখ্যক লোকজনকে হত্যা করে। এ ছাড়া কিছুসংখ্যক লোককে তারা ধরে আনে এবং তাদের মধ্যে ৩/৪ জনকে জনৈক মুন্সি জবাই করে হত্যা করে। উক্ত মুন্সিকে পাক সৈন্যরা জবাই করতে বাধ্য করে। পাক সৈন্যরা উক্ত গ্রামের ৬/৭ জন লোক যারা প্রাণভয়ে কচুরীপানার মধ্যে ডুবিয়েছিল তাদেরকে দেখতে পায় এবং সেখানেই গুলি করে তাদের হত্যা করে। হত্যাযজ্ঞ শেষ হবার পর তারা সমস্ত গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়।

উল্লিখিত তারিখেই বিকাল ৪ টায় পুরানোপোল হাটে জনৈক হিন্দু মুচিকে গুলি করে হত্যা করে।

ডিসেম্বরের যুদ্ধকে মানুষ স্বাগতম জানিয়েছে। তারা এই যুদ্ধকে মুক্তির পথ বলে মনে করে।

স্মরণীয় ঘটনাঃ

২৭ শে এপ্রিল আমি বাজার করার জন্য জয়পুরহাট পৌঁছি। রাতে যে মিলিটারী এসেছে তা জানতাম না। বাজারে পৌঁছার পর তিনজন মিলিটারী আমাকে ধরে নিয়ে বাজারে যায় এবং একটি কাপড়ের দোকানের তালা ভেঙ্গে আমাকে লুট করতে বলে। আমি তাতে অস্বীকৃতি জানালে আমাকে তারা চড় মারে। তখন বাধ্য হয়ে একথান কাপড় নেই। অতঃপর আমাকে নিয়ে রেল ক্রসিং -এর পাশ দিয়ে যেতে থাকে। সে সময় জনৈক ভদ্রলোক সাইকেল চড়ে যাচ্ছিলেন। তাকে তারা থামিয়ে দেয় এবং তার হাতের ঘড়িটি চায়। তিনি দর্পভরে বলেন যে, ” আমি জীবিত থাকাকালে আমার কোন জিনিস খানরা তোমরা পাবে না। “

অতঃপর তাকে লাথি দিয়ে ফেলে দেয়। তিনি উঠবার চেষ্টা করলে রাইফেল দিয়ে বাড়ি দিতে থাকে শেষ পর্যন্ত তারা তাকে গুলি করে হত্যা করে ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। জনৈক বিহারী ছেলেকে বলে তার সুপারিশে আমি মুক্তি পাই।

স্বাক্ষর/-
দারাজ উদ্দিন আহমেদ।

।।৭৬।।
মোঃ গোলাম মোস্তফা মণ্ডল
গ্রাম- জয়পুরহাট
জেলা-বগুড়া

পাক সেনা জয়পুরে পৌঁছার পর তাদের অত্যাচারে জনগণ ভীষণভাবে অতিষ্ট হয়ে পড়ে। জানমালের নিরাপত্তা তথা ইজ্জতের ভয়ে জনগণ ভারতে চলে যেতে থাকে।

মে মাসের মাঝামাঝি এমনিভাবে কতিপয় লোককে গাড়োয়ানরা বাংলাদেশের সীমানায় রেখে আসার পথে রাজাকাররা ঐ সমস্ত ১৬/১৭ জন গাড়োয়ানকে গ্রেফতার করে জয়পুরহাট শান্তি কমিটির অফিসে নিয়ে আসে। রাতে সেখানে বন্দী করে রেখে পরদিন ট্রাকে করে শামীম বিহারীর নেতৃত্বে তাদের আক্কেলপুর মিলিটারী ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের ভালক্যা বাঁশের মোটা গোড়া দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে ঐ সমস্ত গাড়োয়ানকে হত্যা করে।

যুগীপাড়ার মিঃ আলেক উদ্দিনকে একদিন ধরে জয়পুরহাট কলেজ ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তিনি একজন গোঁড়া আওয়ামী লীগার ছিলেন। তাকে শারীরিকভাবে অমানুষিক অত্যাচার করেছে কিন্তু তিনি কিছুতেই “পাকিস্তানী” একথা স্বীকার করেননি। তিনি সর্বদাই বলেছেন যে আমি আওয়ামী লীগার। তাকে বেদম প্রহার করে। কিছুতেই পাকিস্তানের কথা স্বীকার করাতে পারেনি। তখন তার দুই পায়ের পিছনে গোড়ালীর রগে ফুটো করে রশি লাগিয়ে খাশি বকরীর খাল খোলার মত উল্টো করে টাঙ্গিয়ে গায়ের চামড়া খুলে হত্যা করে।

অত্র এলাকার প্রখ্যাত হোমিও ডাক্তার আবুল কাশেম যুদ্ধকালে ৭ মাস পালিয়ে ছিলেন। তিনি একজন প্রথম শ্রেনীর আওয়ামী লীগার ছিলেন। তিনি একদিন রাতে গরুর গাড়িতে করে বাড়ী পৌঁছেন। সে রাতেই মিলিটারীরা বাড়ী ঘেরাও করে তাকে গ্রেফতার করে। তাকে জয়পুরহাট ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তার নিম্নাংশ মাটির নিচে পুঁতে তাকে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করে। এ ছাড়া তাকে পায়ের গোড়ালীর রগে ছিদ্র করে উল্টো করে রশি বেঁধে টাঙ্গিয়ে রেখে গায়ের চামড়া কেটে লবণ লাগিয়ে দেয়। অতঃপর তাকে হাত পা পুটলি করে বেঁধে ট্রাকে ধপাস করে ফেলে সেখান থেকে আবার নীচে ফেলে দেয়। তারপর তার দুই চোখ উপড়ে ফেলে দেয় এবং সেখানে পেট্রোল মাখানো তুলো দিয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে হত্যা করে। এক কথায় যত প্রকার অত্যাচার করার সবই তার উপর প্রয়োগ করা হয়।

লতিফ টি ষ্টলের মালিক ছিলেন লুৎফর। ২৫ শে মার্চের পর এখানে যে সামরিক প্রশিক্ষন শুরু হয় সেখানে তিনি প্রশিক্ষন নেন। বলা প্রয়োজন তার ডান হাত সম্পূর্ণ অকেজো ছিল। তবুও তিনি দেশের ডাকে বাম হাতেই রাইফেল চালনা করতেন।

পাক সেনারা এখানে আসলে তিনি দেশের অভ্যন্তরে পালিয়ে যান। কিন্তু পালানোর অবস্থাতেই মুসলীম লীগের পাণ্ডাদের চক্রান্তে ও সক্রিয় সহায়তায় তিনি ধরা পড়েন। সে সময় মিলিটারীদের ক্যাম্প ছিল ষ্টেশনে। সেখানে তাকে নিয়ে এসে টাঙ্গিয়ে হৃদয়হীনভাবে নির্যাতন করে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে জ্বলন্ত সিগারেট ঠেসে ধরে। তাছাড়া লোহার রড আগুন দিয়ে পুড়িয়ে লাল শিক চোখের মধ্যে ঠেসে দিয়ে চোখ গালিয়ে ফেলে। সমস্ত প্রকার নির্যাতন চালানোর পর তার পা বেঁধে কুণ্ডলী পাকিয়ে রেল গাড়ীর ইঞ্জিনের জ্বলন্ত বয়লারে ফেলে দিয়ে জীবন্ত হত্যা করে। তার কোন অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।

স্বাক্ষর/-
মোঃ গোলাম মোস্তফা মণ্ডল ।

।।৭৭ ।।
আবু বকর আকন্দ
গ্রাম- কাটাবাড়ী
জেলা- বগুড়া

বৈশাখ মাসের দিকে একদিন ২৫/৩০ জন পাক সৈন্য কাটাবাড়ী এলাকায় আসে এবং আড়িয়া পালপাড়া ঘেরাও করে ৬ জন লোককে হত্যা করে।

আমি এসময় অন্যত্র পালিয়ে অন্যত্র ছিলাম। কিছুক্ষণ থেকে ছেলেমেয়ে বাড়ীতে কেমন আছে দেখার জন্য গোপনে বাড়ী আসি। বাড়ী আসার পর একজন পাক সৈন্য বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করে এবং আমি হিন্দু না মুসলমান তা জানতে চায়। আমি মুসলমান বললে উক্ত সৈন্য তৎক্ষণাৎ পালিয়ে যেতে বলে। তাই করছিলাম। কিন্তু আবার একজন বাঁধ সাধে। আমাকে ধরে নিয়ে একটি ঘরে বন্ধ করে এবং টাকা দাবী করে। টাকা দেবার অস্বীকৃতি জানিয়ে বলি যে, “স্যার আমার টাকা পয়সা নেই। “জোড় হাত করে উক্ত কথাগুলো বলি। একথা শোনার সাথে সাথে উক্ত সৈন্য ঠাস করে এক চড় কষে দেয়। ৪/৫ টি ঘুষি মেরে আমাকে কাহিল করে ফেলে।

নিরুপায় হলে বলি যে আমার টাকা পয়সা বৌ ছেলেমেয়ের কাছে এবং তারা কোথায় পালিয়ে আছে। তখন সৈন্যটি বলে যে চল তোমার বৌয়ের খোঁজে। টাকা দাও।

তারপর আমাকে নিয়ে যেতে থাকে। আবার অন্য দিক থেকে আরও দু’জন সৈন্য আসছিল। রাস্তার উপর এক বুড়ো জোব্বাজুব্বি গায়ে দিয়ে বসেছিল। তারা তাকে কয়েকটি ঘুষি হৃদয়হীনভাবে মারে এবং টাকা দাবী করে। লোকটি বলে যে বাড়ীতে আছে। তখন তাকে নিয়ে তার বাড়ী যায়। তার কাছে মসজিদ নির্মানের টাকা গচ্ছিত ছিল, তা এবং গয়নাপাতি নিয়ে নেয়।

অপর দিকে আমার কোন টাকা পাবার সম্ভাবনা না দেখে ছেড়ে দেয়। কিন্তু যেই যাবার জন্য পা বাড়িয়েছি অমনি রাইফেলের গাদা দিয়ে সজোরে ২/৩ বাড়ি দেয় এবং এতে অজ্ঞান হয়ে যাই। জনৈক মহিলার সেবায় আমি জ্ঞান ফিরে পাই।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রথমে মিলিটারী আমার বাড়িতে ঢুকেছিল, তার পূর্বমুহূর্তে দুজন মুসলমান মেয়ে বাড়ীতে ঢুকে। আশ্রয় প্রার্থনা করে। আমি তাদের কচুর আদারের মধ্যে লুকিয়ে রাখি এবং সেখানে নিঃশ্চুপ হয়ে থাকতে বলি।

মিলিটারীটি যখন আমাকে হিন্দু না মুসলমান জিজ্ঞাসা করছিল এবং ধমকাচ্ছিল তখন মেয়ে দুটি ভীত হয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে। তখন মিলিটারীটি আমাকে ছেড়ে উক্ত মহিলার একজনের হাত ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে যায় এবং তার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। অত্যাচার করে সৈন্যটি চলে যায়। সৈন্যটি মেয়েটিকে ঘরে নিয়ে যাবার পূর্বে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।

স্বাক্ষর/-
আবু বকর আকন্দ।

।। ৭৮।।
মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী
একাউন্ট ইনচার্জ, তিস্তা বীমা কর্পোরেশন
সেন্ট্রাল রোড, রংপুর

আমি ১৯৭১-এর ২৫ শে মার্চের পরপরই রংপুর শহর সেনাবাহিনীর কবলিত হবার সঙ্গে সঙ্গে শহর ত্যাগ করে নিকটবর্তী গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করি। যুদ্ধকালীন সময়ের প্রথম কয়েক মাসে সেনাবাহিনীর রংপুর শহর ও শহরের আশে পাশে বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে বাঙ্গালী নিধন যজ্ঞের আমি একজন উৎসাহী পর্যবেক্ষক ছিলাম। বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী কর্তৃক মৃত ব্যাক্তিদের সংখ্যা এবং সঠিক তারিখ আমি সযত্নে আমার ডায়েরীতে লিপিবিদ্ধ করেছি। তথ্যগুলোর সত্যতা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত।

৮ এপ্রিলঃ রংপুর শহর থেকে আড়াই মাইল পশ্চিমে নাড়িরহাট গ্রামের ৪৭ জন গ্রামবাসীকে বর্বর বাহিনী ধরে এবং উক্ত স্থানে খোলাহাটে তাদের নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে আমার পরিচিত জনৈক ব্যক্তি দূর থেকে এ করুণ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন।

১৫ ই এপ্রিলঃ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে দক্ষিন পূর্ব দিকে দেওভোগ গ্রাম থেকে ২২ জন ক্ষেতে কর্মরত কৃষক এবং উক্ত এলাকার মসজিদ থেকে ১৫ জন নামাজরত ব্যাক্তিকে খান সেনারা ধরে এবং গুলি করে হত্যা করে। মসজিদ থেকে লোক ধরে নির্মমভাবে হত্যা এলাকার গণমনে গভীর হতাশা এবং ক্রোধের সঞ্চার করে। এই হিংস্র কার্যকলাপের দরুন বহু গ্রামবাসী বাড়ী ঘর ত্যাগ করে ভারতে কিংবা দূর- দূরান্তের আশ্রয় গ্রহণ করে।

১৭ ই এপ্রিলঃ এই সময়ে মাহীগঞ্জের (রংপুর শহর) ২ মাইল উত্তরে সাহেবগঞ্জের নিকট একটি ক্যানেলের উপর বর্বর সেনা বাহিনী ১৭ ব্যাক্তিকে হত্যা করে। এদের মধ্যে বেশ সংখ্যক ছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীর জোয়ান পোশাক পড়া অবস্থায় তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গ্রামবাসীরা লুকিয়ে এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে এবং পাকিস্তানী দস্যু সৈন্যরা চলে গেলে তারা (গ্রামবাসী) বেঙ্গল রেজিমেন্টের লাশগুলো নিয়ে আসে এবং দাফন করে। মৃত জওয়ানদের প্রতি গ্রামবাসীদের ছিল অপূর্ব মমত্ববোধ। সবাই তাদের রুহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করেন।

১৯ শে এপ্রিলঃ রংপুর ক্যান্টনমেন্টের নিকট ঘাঘট নদীর তীরে ১৫২ জন সাবেক বাঙ্গালী ই,পি,আর,কে খান সেনারা হত্যা করে। পিছনে হাত বেঁধে দাঁড় করিয়ে মেশিনগানের ব্রাশফায়ারে তাদেরকে হত্যা করা হয়। পরে (মৃত) লাশগুলোর অধিকাংশ বাঁশ দিয়ে গেঁথে ঘাঘট নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এদের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিশিষ্ট শিল্পী জনাব শাহ আলী সাহেবের বড় ভাই-র ছেলে (ঈ,পি, আর) কেবলমাত্র সৌভাগ্যক্রমে রক্ষা পান।

২৮ শে এপ্রিলঃ দমদমা ব্রীজের নীচে সরকারী কারমাইকেল মহাবিদ্যালয়ের ৪ জন অধ্যাপককে গুলি করে হত্যা করা হয়। জনৈক অধ্যাপকের স্ত্রীকেও এখানে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। রংপুর শহরে সাবেক জনতা ইন্সুরেন্স কোম্পানীর অফিস ১১-৩০ মিনিটের সময় খান সেনারা তছনছ করে দেয়। আওয়ামী লীগের গোপন কাগজপত্র এ অফিসে রাখা হয়েছে সন্দেহে সৈন্যরা হানা দেয়।

২৯ শে এপ্রিলঃ সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সমস্ত অফিস আদালতের হিসাব নিকাশ বন্ধ করে দেয়া হয়। রংপুর শহর ক্যান্টনমেন্টের কাছে সৈয়দপুরগামী পাকা রাস্তার পাশে ২১ জন নিরপরাধ বাঙ্গালীকে সেনাবাহিনী ধরে এবং গুলি করে হত্যা করে। তন্মধ্যে একটি অত্যন্ত কম বয়সী ছেলেকে বর্বর সৈন্যরা হত্যা করে। ছেলেটি হানাদার বাহিনীর সর্বপ্রকার যাতায়াত সংবাদ গোপনে গেরিলা ঘাঁটিতে সরবরাহ করতো। পাকিস্তানপন্থী কুচক্রীরা এই ছেলেটিকে সেনাবাহিনীর নিকট ধরিয়ে দিয়েছিল।

৬ই মেঃ সামরিক কর্তৃপক্ষ শহরের অভিজাত দোকানপাট গুলো চালু না রাখার অভিযোগে সিল করে দেয়। সেনাবাহিনীর লোকেরা এই সিব দোকানপাটের বহু মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। একই তারিখে সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্টের নিকটবর্তী দেওভোগ গ্রাম লুট করে।

১১ই মেঃ পাক সৈন্যরা শহরের অদূরে নাড়ীরহাট গ্রামে অতর্কিত হানা দিয়ে ৪৮ জন ব্যক্তিকে হত্যা করে।

১৬ ই মেঃ স্থানীয় কুখ্যাত দালালদের সহযোগীতায় বর্বর সৈন্যরা শহরের রাধাবল্লভ ইউনিয়নে রাত্রি ৯ টা থেকে ১ ঘন্টা পর্যন্ত তল্লাশী চালায় তারা নারীদের উপর অত্যাচার করে। জনগনকে অসহায় অবস্থায় ধরে হত্যা করে এবং গৃহস্ত বাড়ী থেকে মূল্যবান আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যায়।

এই সময় রংপুর শহরের বিশিষ্ট মারোয়াড়ী ধনী পাট ব্যবসায়ী রামরিক আগরওয়ালার কাছ থেকে নগদ টাকা পয়সা, মিলের মেশিনারী দ্রব্যাদি এবং দালালদের দ্বারা জমাকৃত পাট নিয়ে যায়। হানাদাররা উক্ত মারোয়াড়ী ব্যবসায়ীর উপর দৈহিক নির্যাতন করে।

৩১ শে মেঃ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১২৪ জন বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং সাবেক ই, পি, আর, কে সামরিক কর্তৃপক্ষ বেতন দানের প্রলোভন এবং কাজে যোগদানের নির্দেশ দিয়ে ডেকে নিয়ে আসে। তাদের সবাইকে ঘাঘট নদীর তীরে নিয়ে গিয়ে মেশিনগানের গুলিতে নির্মমভাবে হত্যা করে। সামরিক পোশাক পরিহিত অবস্থায়ই এদেরকে হত্যা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে এদের মধ্যে কয়েকজন কোনক্রমে ছুটে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

২ রা জুনঃ রংপুর সদর থানার বুড়িরহাট নিবাসী জনৈক ব্রাক্ষ্মণ পরিবারসহ হানাদার সেনাবাহিনীর ভয়ে গরুর গাড়ী করে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যাবার সময় ঘাঘট নদীর তীরে সৈন্যদের নিকট ধরা পড়ে। হানাদাররা উক্ত ব্রাক্ষ্মণের স্ত্রীকে ধর্ষণ করে। ব্রাক্ষ্মণ সহ তার স্ত্রী এবং শিশু কন্যাকে হত্যা করে এবং ঘাঘট নদীর উপর জাফরগঞ্জ ব্রীজের নিচে তাদেরকে ফেলে দিয়ে চলে যায়।

রংপুর শহর সাবেক ইসপিক এর পাশে আর্মি হেডকোয়ার্টার সংলগ্ন জনৈক মেজরের বাস ভবনে রাত্রি ১১ টার দিকে জলসা বসতো। বিভিন্ন স্থান থেকে ধৃত তরুণীদের দিয়ে জোরপূর্বক নাচ এবং গানের আসর করানো হত। তখন তরুনীদের যথেচ্ছ ধর্ষণ করা হত। ধর্ষিতা মেয়েদেরকে শুকনো রুটি এবং রাত্রে সামান্য ভাত দেয়া হত।

রংপুর ক্যান্টনমেন্টের সেনাবাহিনীর মেজর বশীর ছিল নারী ধর্ষনের হোতা। প্রতি রাত্রে তার চিত্ত বিনোদনের জন্য ৩ থেকে ৪ জন বাঙ্গালী তরুণী সরবরাহ করা হতো।

সেনাবাহিনীর অফিসাররা বিভিন্ন স্থান থেকে ধৃত শিক্ষিতা তরুণীদের সাথে নিয়ে ফিরতো। রাজশাহী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন শিক্ষিতা তরুণীকে একদিন কালো বোরখা পরিয়ে জনৈক অফিসার ওরিয়েন্টাল সিনেমায় নিয়ে আসে। অফিসারটি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে বাইরে যায়। পাশের ছিটে আমি বসা ছিলাম। একজন তরুণী সরাসরি আমার সাহায্য চায়। তিনি নিজেকে বাংলা বিভাগের ছাত্রী বলে জানান। ইত্যবসরে অফিসারটি এসে পড়ে। উক্ত হতভাগিনী তরুণীদ্বয়ের জন্য আমি কিছুই করতে পারি নি।

স্বাক্ষর/-
মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী ।

।। ৭৯।।
মোঃ আরব আলী মিয়া
চার্চলেন, জুম্মাপাড়া, রংপুর

৩ রা জুন (১৯৭১) বৃহস্পতিবার বিকেলে পৌনে পাঁচটায় বাসা থেকে আমাকে সিকিউরিটি ব্রাঞ্চের লোকেরা স্থানীয় লোকের সহায়তায় ধরে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়।

সন্ধ্যার পর সেখানে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। মুক্তিবাহিনীর লোকদের আড্ডা কোথায় এবং তাদের গোলাবারুদ কোথায় রক্ষিত আছে। আমার সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক আছে ও তারা প্রায়ই আমার কাছে আসা-যাওয়া করে।
দ্বিতীয়তঃ আমার বাসা জেলা আওয়ামী লীগের অফিস ছিল। সেখানে তাদের গোপন মিটিং হতো। তাদের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, কাজেই তাদের গোপন দলিলপত্র কোথায় রক্ষিত আছে তা আমি জানি। আমি সমস্ত অভিযোগ করলে ভীষণভাবে ধমকি দেয় এবং সেখানে আমাকে রাত ৯ টা পর্যন্ত বসিয়ে রাখে। অতঃপর আমার উপর দৈহিক নির্যাতন শুরু হয়।

একটি নির্জন ঘরে দরজা-জানালা বন্ধ করে আমার দুজন সিকিউরিটি ব্রাঞ্চের লোক ইউসুফ খান ও হাবিলদার গোলাম রসুল দাঁড়ায়। একজনের হাতে লোহার রড এবং অপর জনের হাতে শাল কাঠের দরজার খিল (যা দিয়ে দরজা বন্ধ করা হয়) দিয়ে আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে হৃদয়হীনভাবে প্রহার শুরু করে। ঘন্টা দেড়েক আমার উপর সমানে দুজনে উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় অত্যাচার চালায়। অত্যাচারের সময় ও আমাকে উল্লিখিত বিষয়গুলি সমন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করে। অত্যাচারের ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিশেষ করে থুতনি দিয়ে দরবিগলিত ধারায় রক্তপাত হচ্ছিল।

রাত এগারটা সাড়ে এগারটা দিকে এবং তা ছাড়া আরও দুবার দু’লোক এসে একই প্রক্রিয়ায় অত্যাচার করে। এ সময় আমাকে “বাইনচোদ, তোমলোগ জয় বাংলা নারায়ে লাগাতা হ্যায়। তুমলোগ লাখো লাখো মুসলমানকো খতম কর লেগা, সময় নেহি আতা হ্যায়। আবি কাঁহা গিয়া তোম লোগ কো জয় বাংলা। তোম লোগ আওয়ামী লীগকো বহুত মদদ দিয়া।” এছাড়া শ্লীলতাবর্জিত গালিগালাজ করতে থাকে।

রাত দেড়টার দিকে আমার হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং বলে যে ” গুলি কি নিশানা বানগিয়ে। কুচ বাতানে হ্যায় তো বাতাও।” আধ ঘন্টা খানেকে পর তারা আমার বাঁধন খুলে দেয়। এবং উক্ত ঘরেই দুদিন বন্ধ করে রাখে এবং তৃতীয় দিন থানায় পাঠায়।

থানা থেকে দুদিন ক্যান্টনমেন্টে মেজরের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় আমাকে অকথ্য, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। ৫ দিন বন্ধ করে রাখার পর মঙ্গলবার আমাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির বিনিময়ে তারা ১৫ হাজার টাকা নেয়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আরব আলী মিয়া

।। ৮০।।
আলতাফ হোসেন
নাগেশ্বরী, রংপুর

হানাদার বাহিনী নাগেশ্বরী এসেই প্রথমে ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে। কিছুদিন পর তারা জনগণকে হত্যা ও নির্যাতন শুরু করে।

পাক বর্বর বাহিনী একদিন নাগেশ্বরী থানার বাইরে থেকে একজন লোক ঘরে নিয়ে আসে। প্রথমে মারপিট করে, পরে হানাদাররা উক্ত লোকটিকে নির্মমভাবে ভলিবল এবং ফুটবলের ন্যায় কিল-ঘুষি এবং বুট জুতোর লাথি মেরে হত্যা করে।
সাধারণতঃ কিল,ঘুষি, লাথি, রাইফেলের বাঁট প্রভৃতির দ্বারা নির্মমভাবে বর্বর সৈন্যরা নির্দোষ জনগণের উপর নির্যাতন চালিয়েছে।

হানাদার দস্যু বাহিনী নাগেশ্বরী দখলের তিন দিন পর একদিন সকাল ১০ টায় নাগেশ্বরী বাজারের উত্তর-পূর্ব দিকের গ্রামে প্রবেশ করে। জনৈক আছমত মিয়ার গৃহে পাক সৈন্যরা ঢুকে আছমত মিয়া ও অন্য পুরুষদের বের করে দিয়ে তার পুত্রবধূর (২০) উপর পাশবিক অত্যাচার করে।

নাগেশ্বরী থানার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের আনছার হাটে একদিন মুক্তিযোদ্ধারা পাক সৈন্যদের মারার জন্য মাইন পুঁতে রাখে। দুর্ভাগ্যবশতঃ জনৈক রাখাল ও তার গরু উক্ত মাইনের শিকার হলে খবর পেয়ে নাগেশ্বরী থেকে কিছু সংখ্যক পাক সৈন্য আনছার হায়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে অনেক লোক ধরে। বর্বর সৈন্যরা আনছার হাটের নিকটস্থ বাড়ি থেকে কিছুসংখ্যক মেয়েছেলে ধরে এবং বাছাই করে অপেক্ষাকৃত কম বয়স্কা মেয়েছেলেদের উক্ত হাটের নিকটবর্তী হাবিবর রহমানের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে ছেড়ে দেয়। ঐ দিন ঐ এলাকা থেকে মোট ১০ জন পুরুষকে হানাদাররা ধরে নিয়ে এসে নাগেশ্বরী ঈদগাহ মাঠে বিভিন্ন স্থান থেকে ধৃত আরো কতিপয় লোকসহ মোট ৩৬ ব্যাক্তিকে মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করেছে।

হানাদার সৈন্যরা বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে মেয়েদের ধর্ষণ ছাড়াও তাদের শরীর থেকে নানা প্রকার স্বর্ণের অলঙ্কার নিয়ে আসত।

২৭ শে মে হানাদার বাহিনী নাগেশ্বরী থানায় প্রবেশের পরপরই ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে। হানাদাররা নাগেশ্বরী বাজারে প্রবেশ করে প্রথমেই হিন্দু পট্টিতে দোকান ও বাড়ীঘর অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত করে। অতঃপর হানাদাররা ঢাকাইয়া পট্টি অগ্নিসংযোগে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

ঐ দিনই বাজারসংলগ্ন সাঞ্জুয়ার ভিটার মুক্তিযোদ্ধা মোসলেমের বাড়ী এবং প্রতিবেশী রমজানের বাড়ী তারা পুড়িয়ে দেয়। উক্ত দিন হানাদার সৈন্যরা নাগেশ্বরী বাজার জামে মসজিদের নিকট পপাটুয়া (টমেটু) নামে একটি পাগলকে গুলি করে হত্যা করে। অপর একটি পাগলিনীকে ঐ দিন দস্যু সেনারা হিন্দু পট্রি সংলগ্ন আজিজার মিয়ার গৃহে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে। নাগেশ্বরী বাজারে হিন্দুপট্টি এবং ঢাকাইয়া পট্টিতে অগ্নিসংযোগের ফলে পার্শ্ববর্তী বহু ব্যবসায়ী ও গৃহস্থের বাড়ীঘর ভস্মীভূত হয়েছে।

পাক হানাদার বাহিনী নাগেশ্বরী থানায় পৌঁছেই ডাকবাংলা এবং হাইস্কুলে ঘাঁটি করে। কিছুদিন পরেই এখান থেকে তারা জনগণকে নির্যাতন শুরু করে। পাক সৈন্যরা বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে পড়তো এবং লোক ধরে এনে দৈহিক নির্যাতন চালাতো। সাধারণত দৈহিক নির্যাতনের প্রক্রিয়া ছিল কিল, ঘুষি, বুট জুতার লাথি, রাইফেলের বাঁট এবং বেয়নেট দিয়ে আঘাত হেনে তীব্রভাবে অত্যাচার করে।

মুক্তি ও মিত্রবাহিনী নাগেশ্বরী মুক্ত করার জন্য এগুতে থাকলে নাগেশ্বরী বাজার ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জনতা ও তাদের পরিবারবর্গ নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ের জন্য চলে যেতে থাকে। পাক বর্বর সৈন্যরা নাগেশ্বরী বাজারের চটাৎ ও জম মাঝিকে একদিন ধরে নিয়ে গিয়ে জবাই করে মেরে ফেলেছে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আলতাফ হোসেন (দুলু)

।। ৮১।।
মোঃ আজিজুর রহমান
গ্রাম- বেরুবাড়ী
থানা- নাগেশ্বরী
জেলা- রংপুর

হানাদার বর্বর বাহিনী চর বেরুবাড়ীর দুধকুমোর নদীর পশ্চিম তীরের গ্রামে অগ্নিসংযোগে লিপ্ত হয়। নিরীহ জনসাধারণের প্রায় একশত একুশটি বাড়ী দস্যু বাহিনী জ্বালিয়ে দেয়। এরপর গ্রাম থেকে লোক ধরে হানাদাররা উক্ত বেরুবাড়ী ফ্রি প্রাইমারী স্কুলের পিছনে নিয়ে আসে এবং লাইন করে দাঁড় করিয়ে মেশিনগানের গুলি দ্বারা ১৮ ব্যক্তিকে হত্যা করে। তিনজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় রেখে যায়। তন্মধ্যে একজন এক সপ্তাহ পর মারা যায়। অতঃপর বর্বর বাহিনী গ্রাম থেকে প্রায় আড়াই শত যুবক ও বৃদ্ধকে ধরে এনে বেরুবাড়ী বাজারের পূর্বে এক জায়গায় সমবেত করে এবং তাদেরকে নির্মমভাবে ডবল (শাস্তিমূলক দৌড়) করাতে থাকে। পরে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। সংঘর্ষের পর হানাদার বাহিনীর এরূপ অমানবিক কর্মকাণ্ডে জনসাধারণ যখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ীঘর ছেড়ে পালাচ্ছিল, তখন এদিকে রাজাকাররা এ সুযোগের ব্যবহার করে। বিভিন্ন পরিত্যক্ত বাড়ীতে ঢুকে তারা লুট করে বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী এবং গবাদিপশু নিয়ে যায়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আজিজুর রহমান
৩/৬/৭৩

।। ৮২।।
মোঃ আজিম উদ্দিন
গ্রাম-গাছিডাঙ্গা
থানা- ভূরুঙ্গামারী,রংপুর

পাক বর্বর বাহিনী ভূরুঙ্গামারী থানা পূর্ণ দখলে নেবার দুই মাস পর গাছিডাঙ্গা গ্রামের দিকে ধাওয়া করে। পাক দস্যুদের সংখ্যা ছিল ৭ জন। তারা উক্ত গ্রাম গাছিডাঙ্গায় ঢুকে স্থানীয় (মৃত) হাজী আবদুস ছাত্তার সাহেবকে ধরে আনে। ধরে এনে তাকে গ্রামের আরও অন্যান্য লোকজনকে তাদের কাছে নিয়ে আসার জন্য হুকুম করে। তখন হাজী সাহেব জীবনের ভয়ে গাছিডাঙ্গার নিম্নলিখিত জনসাধারণকে খান দস্যুদের সামনে হাজির করতে বাধ্য হন। নিম্নে তাদের নাম দেওয়া হলঃ
(১) মোঃ ফরিদ
(২) পনির উদ্দিন
(৩) মঈন উদ্দিন
(৪) আবুল কাশেম
(৫) ফটিক
(৬) আইন উদ্দিন
(৭) আজিম উদ্দিন
(৮) নাছের উদ্দিন
(৯) নুরুল ইসলাম
(১০) নাছু শেখ
(১১) ময়েত উল্লাহ প্রমুখ।
অতঃপর আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি মুক্তিফৌজ এবং মুক্তিদের সহায়তা কর। অবশ্য এসব কথাগুলি উর্দুতে জিজ্ঞাসা করে। পরপর সবাইকে এইসব কথা জিজ্ঞাসা করে। তখন আমি ও সঙ্গীরা অস্বীকার করি। তখন খান দস্যুরা রাইফেলের বাঁটের সাহায্যে আমাদের ভীষণভাবে আঘাত করতে থাকে। তাছাড়া কিল, ঘুষি ও বুটের লাথিতে সবাইকে ভীষণভাবে আঘাত করে। পর মুহূর্তে আমাদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করে কলেমা পড়তে বলে। তখন আমরা সবাই জীবনের ভয়ে ভুল করে কলেমা পড়তে আরম্ভ করি। তখন খান সেনারা বলে যে, তোমরা মালাউন এবং তোমরা নিজেরা মুক্তিদের লীডার এবং মুক্তিদের সাহায্য কর। এই মনে করে খান দস্যুরা পুনরায় কিল, ঘুষি ও রাইফেলের সাহায্যে আঘাত করে। আমি আমার সঙ্গীরা অচেতন হয়ে পড়ি। পাশে অবস্থানরত মুক্তিরা জানতে পেরে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে ফাঁকা গুলি করতে থাকে। খান দস্যুরা সব বুঝতে পেরে পুনরায় ভূরুঙ্গামারীর দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিছু সময় পর আমাদের জ্ঞান ফিরে। খান দস্যুদের আর আমাদের পাশে দেখতে পাই না। তখন আমরা কোন রকমে আধা মরা অবস্থায় দূর দূরান্তে আত্নগোপন করতে বাধ্য হই। খান দস্যুদের হাতে বেদম মারপিট খেয়েও আমি কোন রকমে বেঁচে আছি।

টিপসহি/-
মোঃ আজিম উদ্দিন

।। ৮৩।।
মোঃ তালেব মুন্সী
গ্রাম- গাছিডাঙ্গা
থানা- ভূরুঙ্গামারী
রংপুর

২৬ শে মার্চের পূর্বে আমি আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলাম। ২৬ শে মার্চের পর অত্র গাছিডাঙ্গা মৌজার সংগ্রাম পরিষদের আমি সদস্য ছিলাম। পাক হানাদার বাহিনী ভূরুঙ্গামারী থানা দখলের প্রায় ২ মাস পর একদিন আমাদের গ্রামে আসে। তারা সংখ্যায় ৫০ জন ছিল। হানাদার সৈন্যরা গ্রামে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমি গ্রামের মেয়েছেলেদের আমার বাড়ীর পিছেনের একটি বড় বাঁশঝাড়ের জঙ্গলে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করি। প্রাণভয়ে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র মোঃ আব্দুর রহমান নিকটে একটি বাঁশের ঝোপে বাঁশের আগায় উঠে আত্নগোপন করে। হানাদাররা আব্দুর রহমানকে দেখে ফেলে এবং তাকে বাঁশ গাছ থেকে নামিয়ে এনে মারপিট শুরু করে তাকে রাইফেলের বাঁট, কিল, ঘুষি এবং জুতা দ্বারা আঘাত ও নির্যাতন করে। অতঃপর আব্দুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা আমার বাড়িতে আসে এবং আমাকে ধরে ফেলে। তাঁরা আমার উপর আব্দুর রহমানের ন্যায় উপরোক্ত অবর্ণনীয় অত্যাচার শুরু করে। অতঃপর আমার বাড়ীতে বিভিন্ন ঘর অনুসন্ধান করে মেয়েছেলেদেরকে দেখতে না পেয়ে তাঁরা বাড়ির পিছনে বাঁশঝাড়ে আত্মগোপনকারী মেয়েছেলেদের খোঁজ করতে থাকে। তাঁদের খোঁজ করে না পেয়ে হানাদাররা রাইফেলের ফাঁকা আওয়াজ করলে মেয়েছেলেরা চিৎকার করতে থাকে এবং বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে পালাতে থাকলে পাক সৈন্যরা তাদের পিছনে ধাওয়া করে। আমি এ অবস্থায় থাকতে না পেরে পাক সৈন্যদের কাছে ছুটে যাই এবং মেয়েছেলেদের উপর নির্যাতন না করার জন্য কঠোর প্রতিবাদ করি।এ সময় হানাদারদের কয়েকজন মেয়েছেলেদের পিছনে ধাওয়া করতে থাকে এবং অপর কয়েকজন আমার উপর মারপিট শুরু করে। পাক ফৌজ কতৃর্ক প্রহৃত হওয়াকালীন আমার দুইজন আত্নীয়া মোছাম্মৎ আছিয়া খাতুন (চাচাতো বোন, বয়স ২৫ বছর) এবং মোছাম্মৎ মজিরন নেছা (ভাগনে বউ, বয়স ২৭ বৎসর) আমার দিকে ছুটে আসলে পাক হানাদাররা তাদেরকে ধাওয়া করে আমার বাড়ীতে ঢুকে পড়ে। আমিও তাদের পিছনে পিছনে বাড়ীতে ঢুকে পড়লে তারা পুনরায় আমার উপর কিল, ঘুষি, রাইফেলের বাঁট এবং জুতার আঘাত প্রভৃতি নির্যাতন করতে থাকে। আমি তখন সরাসরি তাদের সঙ্গে হাতাহাতি সংঘর্ষে অবর্তীণ হই। এই সময় আমার চাচাতো বোন এবং ভাগনে বউ পালাতে সক্ষম হয়ে ঘরে আশ্রয় নেয়। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করার পর আমাকে মুমূর্ষ অবস্থায় রেখে হানাদার দস্যুরা ঘরে ঢুকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও অনেক চিকিৎসা করা সত্ত্বেও বর্তমানে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় দিন যাপন করছি ।

স্বাক্ষর/-
মোঃ তালেব আলী মুন্সী
১৯/৪/৭৩

।। ৮৪।।
নারায়ন প্রসাদ
সৈয়দপুর বাজার
জেলা-রংপুর

২৭ শে মার্চ আমার বাবাকে বাড়ী থেকে ধরে কারফিউ চলাকালে সকালবেলা একটি সামরিক জীপে করে ৪ জন সামরিক লোক এবং ২ জন স্থানীয় অবাঙ্গালী অস্ত্রসহ এসে নক করে। দরজা খুললে তারা বাড়ীতে ঢুকে সিন্দুক খুলে সমস্ত সোনাদানা, টাকা-পয়সা নেয় এবং বাড়ীতে অথবা দোকানে ওয়্যারলেস আছে বলে বলে অভিযোগ করে। তাঁদের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের জন্য দোকান খুলেও দেখান হয়। পরিশেষে আমাকে একটি লাথি মেরে ফেলে দিয়ে আমার বাবাকে জীপে করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়।

৯ই এপ্রিল বেলা সাড়ে এগারটার দিকে জনৈক অবাঙ্গালী এসে আমাকে টেলিগ্রাফ অফিসে সামরিক কর্তৃপক্ষ ডাকছে বলে জানায়। সাথে আমার ছোট ভাইকেও নেবার নির্দেশ দেয়। ধৃত অবস্থায় আমার ছোট ভাই এবং আমাদেরই ভাড়াটে একজন স্বর্ণকারকে উল্লিখিত স্থানে জনৈক মেজরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। নাম ধাম জিজ্ঞাসা করার পর মেজর আমাদেরকে বন্দি করার নির্দেশ দেয়। তারপর থানায় নেয়া হয়। সেখানে কিছুক্ষণ পর ঐ টেলিগ্রাফ অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট (টি এণ্ড টি) হাতিম আলী খালিফাকে ধরে আনে। রেলওয়ে ওয়ার্কশপ থেকে শ্রমিক ও চার্জম্যানসহ কিছু লোককে ধরে আনে। সর্বমোট ২৪-২৫ জনকে একত্রে বন্ধ ওয়াগনে করে কড়া সামরিক পাহারায় ক্যান্টনমেন্টে নেয়া হয়। ক্যান্টনমেন্টে নামানোর সাথে সাথে সকলের এক হাত করে বেঁধে দাউন গেঁথে স্থানীয় অবাঙ্গালী ও পাক সৈন্যরা বেদম প্রহার করা শুরু করে। বেল্ট, বেত, লাথি, চড়, কিল, ঘুষি এবং রাইফেলের বাঁট, বৈদ্যুতিক তার দিয়ে প্রহার করতে থাকে এবং বলতে থাকে “আচ্ছা চিজ মিলা “। মারের পর্ব শেষ হলে ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে ছোট ছোট ঘরে ১০-১২ জনকে একই ঘরে ঢুকায়।

তারপর সকলকে আবার বারান্দায় বের করে দেয়ালের দিকে মুখ করে হাত দেয়ালের সাথে ফাঁক করে রেখে দাঁড় করায় এবং ঐ অবস্থায় ওয়াপদার মোটা বৈদ্যুতিক তার দিয়ে প্রহার করতে থাকে। এ অবস্থায় অত্যাচার চলার পর প্রাচীরের সাথে যে বাঁশ টাঙ্গানো ছিল সে বাঁশের সাথে কোমরে দড়ি বেঁধে উল্টো অবস্থায় টাঙ্গিয়ে দেয় এবং পিঠে প্রহার করতে থাকে। প্রহারের ফলে অজ্ঞান হলে অথবা অজ্ঞান হবার উপক্রম হলে ছেড়ে দেয়।

এ সময় টিএণ্ডটি ডিপার্টমেন্টের ঐ ভদ্রলোকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যে, এখানে আমার কে কে আছে। আমি আত্নীয়দের সাথে আমার যুবতী মেয়ের কথাও বলি। তখন ঐ পশুরা বলে যে তোমার সেই ১৫-১৬ বছরের মেয়েকে এখনই এখানে নিয়ে আসা হচ্ছে এবং এদের সামনে তোমাকে তোমার মেয়ের সাথে ‘সহবাস’ করতে হবে। অস্বীকৃতি জানালে আমার উপর এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী অত্যাচার করে। শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে দরবিগলিত ধারায় রক্ত ঝরতে থাকে। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঐ খানেই সকলে ছিলাম। যে আসত সে-ই মারত এবং কাফের লোক কো খতম করো বলে গাল দিত। এ সময় কয়েকজন দাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তোমরা মুলমান কি না এবং নামাজ পড় কিনা? হ্যাঁ-বাচক উত্তর দিলে তাদেরকে কলেমা পড়তে বলে। কলেমা পড়তে থাকলে তাদেরকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয় এবং বলে যে, ‘তোম লোগ কাফের হ্যায়, তুম ঝুটা বলতা হ্যায়। ‘

সন্ধ্যার পর একটি ঘরে সকলকে বসায় এবং শুকনো রুটি ও ডাল এনে দেয়। খাওয়ার পর মুসলমানেরা নামাজ পড়তে চাইলে তাদেরকে মসজিদে না যেতে দিয়ে সেখানেই নামাজ পড়তে নির্দেশ দেয়। নামাজ পড়া যেই শেষ হয়েছে, অমনি জনৈক কোয়ার্টার মাষ্টার বেত হাতে এসে প্রহার শুরু করে। তোম লোগ নামাজ পড়তা হ্যায়। তোম লোগ বাঙ্গালী মুসলমান, তোম লোগ কাফের হ্যায়।

সেখান থেকে অতঃপর আর এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অনেকগুলো বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোক বন্দি অবস্থায় ছিল। সেখানে দরজা খুলে সকলকে ঢুকিয়ে দেয়। সেখানে বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোকদের মুখে জানতে পারি যে, তারা সীমান্তবর্তী এলাকায় ছিলেন। ডিউটি অন্যত্র দেয়া হবে নিয়ে এসে বন্দি করে। তারা সংখ্যায় প্রায় ৫০-৬০ জন ছিলেন। ঘন্টাখানেক পর উল্লিখিত কোয়ার্টার মাষ্টার দরজা খুলে সিভিলিয়ানদের বেরিয়ে আসতে নির্দেশ দেয় এবং বেরিয়ে আসলে অন্য আর একটি ছোট ঘরে নিয়ে যায়। ঘরের সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ ছিল এবং ঘরের ভিতর কোন আলো ছিল না। কেউ যেন না বসে এমন নির্দেশ দিয়ে সে চলে যায়। তার কিছুক্ষণ পর ঐ একই ব্যক্তি এক এক করে ঘরের বাইরে ডেকে নেয় এবং আমার প্রতি অকথ্য অত্যাচার করতে থাকে। যখন আমার পালা আসে তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, শহরের কে কে বাংলাদেশের পতাকা তুলেছিল, কে কে মুজিব ত্রাণ ফান্ডে চাঁদা দিয়েছে এবং কে কে নেতা?

পরদিন সকালে আমাদের দিয়ে একটি পুকুরের বাঁশ উঠিয়ে নেয়া হয় এবং মাঠের ঘাস পরিষ্কার করে নেয়া হয়। তারপর অপর একজন এসে আমাদেরকে বন্দি করতে নির্দেশ দেয়। তখন আমার পূর্বে ধৃত আমার বাবার খবর জানতে চাইলে তাদের সকলকে যে ঘরে আমার বাবা এবং স্থানীয় এমসিএ জিকরুল হকসহ ১৫-১৬ জন বন্দি ছিলেন সেখানে বন্দি করে রাখে।

কিছুক্ষণ পরে মেজর জাভেদ এসে সকলকে একদিক থেকে ঐ ঘরেই প্রহার করে। ডাঃ জিকরুল হককে প্রহার করার সময় সে বলে ‘ডঃ জিকরুল তোম বলতা হ্যায় মিলিটারী ফাঁকা ফায়ার করতা হ্যায়। তোম হিয়াসে মব লাগাতা হ্যায় ? বানচোত, তোম সবকো গুলি কর দিয়ে গা।’ তারপর ক্যাপ্টেন বখতিয়ার লাল আসে এবং একই প্রক্রিয়ায় অত্যাচার করে।

পরদিন সন্ধ্যায় ক্যাপ্টেন গুল এসে তার মাথায় শিরোস্ত্রাণ খুলে তা দিয়ে সকলকে প্রহার করে। মারের চোটে কেউ চিৎকার করতে চাইলে সে বলতে চীৎকার মাৎ কারো। এদিন ডাক্তার সাহেবকে বেশী অত্যাচার করে ও অকথ্য এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করে। তাঁকে লাথি দিয়ে বাইরে ফেলে দেয় এবং সেখানে তার প্রতি গুল ও অন্যান্য মিলিটারীর হৃদয়হীনভাবে অত্যাচার করে। এতে তার চশমা ভেঙ্গে যায়; মাথা ফেটে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। অতঃপর তার মাথা ব্যান্ডেজ করে লাথি মেরে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়।

ডাক্তার সাহেব ঘরে ঢুকলে সকলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ডাক্তার সাহেব সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ওরা অত্যাচার করুক না। আর না হয় কাল দিন আসবে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে।

১২ তারিখ সেণ্ট্রি এসে জানায় যে, আপনাদের যা খাবার খেয়ে নেবেন, আপনাদের আজ কোথাও যেতে হবে। ১২ টার দিকে দরজা খুলে বাইরে বেরোলেই উল্লিখিত কোয়ার্টার মাষ্টার সকলকে একটি দুটি করে লাথি মেরে ট্রাকে ঊঠতে নির্দেশ দেয়। ট্রাকে উঠলে তিনজন করে একত্রে পেছনে শক্ত করে হাত বেঁধে দেয়। তিনটি ট্রাকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোকসহ প্রায় ১৫০ জনকে ঊঠায়। ট্রাক রংপুরের রাস্তা ধরে আস্তে আস্তে যাচ্ছিল। যাবার পথে পাহাড়ারত সামরিক লোকেরা বেল্ট দিয়ে, রাইফেলের বাঁট দিয়ে অথবা বুট দিয়ে খুঁচিয়ে অত্যাচার চালাতে থাকে। শেষাবধি রংপুর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছার পরই সকলের উপর অকথ্য অত্যাচার করে। তারপর অফিসার এসে সকলের নামের তালিকা বের করে সকলের নাম মিলিয়ে নেয়। তারপর রংপুর উপশহরের দিকে অফিসাররা জীপে যাত্রা করে এবং পিছনে পিছনে ট্রাকগুলোও যেতে থাকে। উপশহরের পাশে বালি তোলা খাদের কাছে নিয়ে গাড়ি দাঁড় করায় এবং সেখানে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৬ জন ৬ জন করে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তারপর সিভিলিয়ানদের এক একজন করে পাশাপাশি একবারে ছয়জন করে দাঁড় করায়। তাদের সামনে খুব নিকটে ছয়জন বন্দুকধারী সিপাই থাকে এবং পাশে জোড়া লাগানো কালো প্যান্ট-শার্ট পরিহিত একজন সিপাই। দাঁড় করিয়ে দেয়া হলে ঐ কালো কাপড় পরিহিত লোক বলল ‘সিঙ্গল ফায়ার’ বলে রাইফেল উপরে তুলে গুলি করত আর গুলি করার সাথে বলত ‘স্টার্ট ফায়ার’। সাথে সাথে উল্লিখিত ছ’জনকে দাঁড় করানো হতো।

আমি ও আমার ছোট ভাই কমলাপ্রসাদ ঐরুপ তৃতীয় গ্রুপে ছিলাম। আমরা নিজেদের মধ্যে কিছু সলাপরামর্শ করে গুলি করার পূর্বমুহূর্তেই ইচ্ছাকৃতভাবে পড়ে যাই। ফলে গুলি লক্ষ্যভেদ হয়ে আমার হিপে(উরুর উপরে) এবং আমার ছোট ভাইয়ের হাঁটুর উপরে উরুতে লাগে। আমরা মরার ভান করে পড়ে থাকি এবং সমস্ত লক্ষ্য করতে থাকি।

এ হত্যাযজ্ঞের মাঝামাঝি সময়ে ডাঃ জিকরুল হককে একাই দাঁড় করায় এবং জিজ্ঞাসা করে যে, ‘এই তোমহারা জিন্দেগী আওর মউত কো স্যোয়াল হ্যায়। হাম জনতা হ্যায় তোমস্যে মুজিবরস্য ফোন মে বাত হোয়া।’ তিনি উত্তর দিলেন আমি মরার সময় মিথ্যা কথা বলে গুনাহগার হব না। আর এ কথা বলার সাথে সাথে তাকে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পড়ে যান এবং বলেন ‘আল্লাহ তোমার এখানে বিচার নেই, বিচার কর।’ এটাই তার শেষ কথা। শেষের দিকে স্থানীয় প্রভাবশালী ডাঃ শামশুল হককেও ঐ একা দাঁড় করিয়ে হত্যা করে।

এ অবস্থায় সকলকে হত্যা করতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে অন্ধকার হয়ে যায়। এবং আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ও মেঘ ডাকতে থাকে।

হত্যাপর্ব শেষ হলে সকল মৃত ব্যক্তিকে ৫-৭ জনে পা ধরে টেনে উল্লিখিত খাদে ফেলে দেয় এবং আর ১০-১২ জনে মাটির উপর থেকে মাটিচাপা দিচ্ছিল। সে সময় অনেকে জীবিত ছিল। তারা গগনবিদারী করুণ চিৎকার করে আর্তনাদ করছিল। কেউ বা শেষবারের মত এক গ্লাস পানি পান করতে চাইছিল। আবার কেউ বা এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবার জন্য আর একটা গুলি ভিক্ষা করছিল।

মাটি চাপা দিতে দিতে ভীষণ বৃষ্টি শুরু হয়। ফলে তারা আমার শরীরের অর্ধাংশ মাটি চাপা দিয়েই পরবর্তী সময়ে মাটি চাপা দেয়া হবে বলে চলে যায়।

ওরা চলে যাবার পর আমি ঐ গর্ত থেকে একজনকে উঠে দৌড়ে পালাতে দেখি। সে সময় আমার ভাই উক্ত পলায়নরত ব্যাক্তিকে লক্ষ্য করে বলে যে মিঠু আমাকে বাঁচা। আমার কেউ নেই এখানে। কিন্তু ঐ ব্যক্তি শুনতে না পেয়ে চলে যায়।

এদিকে আমি যেখানে ছিলাম সেখান থেকে উঠবার চেষ্টা করছিলাম। আমার নড়াচড়াতে আমার দেহের উপর থেকে বেশ ক’টি লাশ গড়িয়ে পড়ে যায়। সে সময় আমার পাশেই এক বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোক জীবিত ছিলেন। তার একটি হাত ছিল না। তিনি আমাকে পালিয়ে যেতে বলেন এবং অপর হাত দিয়ে আমার হাতের বাঁধন খুলে দেয়ার শেষ চেষ্টা করেন; কিন্তু তিনি তা পারেন নি। কারন তার হাত অবশ হয়ে যাওয়ায় তা সামনে আসেনি।

আমি নিজে নিজে বহু চেষ্টা করে হাতের বাঁধন খুলে ফেলি এবং আমার ভাইকে সাথে করে নিয়ে গর্তের উপর উঠতে চেষ্টা করি। উপরে ওঠার পর হঠাৎ পা পিছলে নিচে পড়ে যাই। গর্ত থেকে আমি ভাইকে গ্রামে আশ্রয় নেবার নির্দেশ দেই।

গর্ত থেকে উঠে আমার ভাইকে আর পাই না। অতি কষ্টে কিছু দূরের গ্রামে একটি বাড়ীতে আশ্রয় নেই। সেখানে থাকা নিরাপদ নয় ভেবে আরও দূরে এক গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেই। উক্ত গ্রামের জনৈক মহিউদ্দিনের আন্তরিক সেবা-যত্নে কিছুটা সুস্থ হই। তারপর সেখান থেকে উক্ত ব্যাক্তির সাহায্যে প্রথমে তার এক আত্নীয়ের বাড়ী এবং পরবর্তীকালে জলঢাকা (নীলফামারী) যাই এবং সেখান থেকে মুক্তিবাহিনীর গাড়িতে করে ভারতের জলপাইগুড়ি পৌঁছি।

অপর পক্ষে আমার ভাই উক্ত ব্যাক্তির অক্লান্ত সেবা-যত্নের ফলে সুস্থ হয়ে ওঠে। রংপুর হাসপাতালে চিকিৎসার পর তাকেও ভারতে পাঠানো হয়।

এখানে উল্লেখ্যোগ্য যে, উক্ত গর্ত থেকে সেদিন মাত্র চার ব্যাক্তি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল।

স্বাক্ষর/-
নারায়ণ প্রসাদ

।। ৮৫।।
মোঃ মনোয়ার হোসেন
গ্রাম- মোল্লাপাড়া
পোঃ কুড়িগ্রাম
জেলাঃ রংপুর

পাক হানাদার সৈন্যরা ১৯৭১ সনের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে ট্রেনযোগে কুড়িগ্রাম নতুন শহরের (খলিলগঞ্জ) ষ্টেশনে পৌঁছে। ষ্টেশনে পৌছেই প্রথমে তারা ষ্টেশনের পশ্চিম দিকের জনসাধারণের পরিত্যাক্ত বাড়ীগুলোতে আগুন লাগিয়ে ভস্মীভূত করে। এরপর হানাদার সৈন্যরা খলিলগঞ্জ বন্দরে ঢুকে পড়ে। ঐ সময় খলিলগঞ্জের ছফর উদ্দিন (এলোপ্যাথি) ডাক্তার বাসাই ছিলেন। বন্দরসংলগ্ন তার বাসগৃহ ছিল। পাক সৈন্যরা বন্দরে ঢুকে পড়ায় তিনি নিরাপত্তার জন্য বাসার পেছনে একটি খালে আত্নগোপন করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পাক সৈন্যরা তাকে দেখে ফেলে এবং গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনার পূর্বদিন আমি ঘোষপাড়ার চায়ের দোকানে ছিলাম। পাক সৈন্যরা খলিলগঞ্জ উক্ত চারজন লোককে হত্যা করে সেদিনই ট্রেনযোগে তিস্তা চলে যায়।

হতভাগ্য চারজনকে খান সেনারা বন্দরসংলগ্ন দিঘীর পাড়ে একত্র করে মেশিনগানের গুলিতে হত্যা। কয়েকদিন পর হানাদার সৈন্যরা ট্রেনযোগে কুড়িগ্রাম নতুন শহরে প্রবেশ করে এবং জেলখানায় প্রহরারত ৫ জন পুলিশরে হত্যা করে দ্রুত চলে যায়।

বুড়ির মেলা বাজারের কাছে একটি উঁচু স্থানে খান সেনারা নিরপরাধ বাঙালিদের গুলি করে হত্যা করে এবং তাঁদেরকে শূন্যে নিক্ষেপ করে বেয়োনেট দিয়ে গাঁথে।

কুড়িগ্রাম পুরাতন শহরের রিভারভিউ স্কুলের কাছ দিয়ে সন্তর্পণে হেঁটে ধরলা নদী অতিক্রমের সময় হঠাৎ হানাদার বাহিনীর মর্টারের গুলি পায়ে, হাঁটুতে এবং পিছন দিকে কোমরে লেগে আমি আহত হই। সঙ্গী সশস্ত্র তিনজন বাঙ্গালী ইপিআর আমাকে নদীর তীরে চানমারীতে অপেক্ষা করতে বলে দ্রুত শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ধরলা নদীর খেয়া তখন বন্ধ ছিল। চানমারীর কাছে একটি বাঙ্কারে আমি ঢুকে পড়ি এবং ক্রমেই আমার অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। বাঙ্গালী ইপিআর তিনটি আর পুনঃ আমাকে খোঁজ করতে আসে নি।

গুরুতর আহত অবস্থায় আমি উক্ত বাঙ্কারে ১১ দিন অনাহারে ছিলাম। হানাদার বাহিনী সমগ্র কুড়িগ্রাম দখল করে। এই এগার দিন আমি দৃঢ়তার সঙ্গে অতিবাহিত করি। কখনো জ্ঞান হারাই নি। ১২ দিন পর ৩ জন খান সেনা ৩ জন দালালসহ উক্ত স্থান অতিক্রমের সময় আমাকে দেখে ফেলে। খান সেনারা আমাকে কুড়িগ্রাম ডাক বাংলোয় নিয়ে যায়। ডাক বাংলোর দিকে যাবার পথে বর্তমান ইউনিয়ন কাউন্সিলের কাছে কুড়িগ্রাম রেলওয়ে অফিসের এক বৃদ্ধ দারোয়ানকে বিহারী নেয়ামত কসাই জবাই করছে দেখতে পাই। এ দৃশ্য আমার নিকট ছিল পৈশাচিক।

ডাক বাংলোয় পৌঁছে আমি ডাক বাংলোর কাছে স্যানিটারী অফিসের বারান্দায় ৮ জন লোককে চোখ ও পেছনে হাত বেঁধে কোমরে দড়ি লাগিয়ে বারান্দার খামে দাঁড়ানো অবস্থায় বেঁধে রাখতে দেখি। ডাক বাংলোয় খান সেনারা অবস্থান করত। আমি পৌঁছামাত্র আমার চোখ, পেছন দিকে হাত বেঁধে দড়ি লাগিয়ে অপর একটি খামে বাঁধা হয়। বারান্দায় বেঁধে রাখা সবাইকে মেজর গুলি করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল। পরদিন ভোরে আনুমানিক সকাল আটটার দিকে নেয়ামত কসাই আসে এবং সবাইকে জবাই করবে বলে জানায়। নেয়ামত কসাই এক একটি জবাইয়ের বিনিময়ে ৬০(ষাট) টাকা পায় বলে জানায়। বেঁধে রাখা ব্যক্তিদেরকে মেজরের নির্দেশে বিকাল পাঁচটার সময় গুলি করে হত্যা করা হবে জানালে নেয়ামত কসাই চলে যায়।

বিকাল ৫ টায় ২ জন খান সেনা সবাইকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় ধরলা নদীর তীরে চানমারীর পেছনে আমাকেসহ হতভাগ্য ১১ জনকে নিয়ে আসে। বাঁশঝাড়ের ভিতর দিয়ে চানমারীর পেছনে যাবার সময় অসংখ্য মৃত লাশ আমার গায়ে লাগছিল। চানমারীর পেছনে সবাইকে লাইন করানো হয় এবং সবাইকে বুকটান দিয়ে দাঁড়াতে বলা হয়। এক এবং দুই গোনার সঙ্গে সঙ্গে আমি পেছন দিকে হেলে পড়ি। সঙ্গে সঙ্গে মেশিনগানের গুলি বর্ষিত হয় আমি তৎক্ষণাৎ মাটিতে শুয়ে পড়ে নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে মৃতবৎ পড়ে থাকি পাঞ্জাবীরা সবাইকে মৃত ভেবে চলে যায়। আমার তন্দ্রা কেটে গেলে বুঝতে পারি সৌভাগ্যক্রমে গুলিতে আহত হই নি। তবু আমি ভয়ে ৪-৫ ঘন্টা মৃতবৎ পড়ে থাকি। চারিদিকে একই সঙ্গে কুকুর এবং শৃগালের তুমুল কোলাহল চলছিল। রাত ১২ টার দিকে হঠাৎ দড়িতে টান পড়লে আমি জ্ঞান ফিরে পেয়ে উঠে বসি, কে দড়ি টানছে। জিজ্ঞাসা করলে অপর প্রান্ত থেকে একজন জীবিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। তার বাড়ী রংপুর জেলার গাইবান্ধা বলে জানায়। তাঁর গায়ে গুলি লাগেনি বলে সে জানায়। অতঃপর উভয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পরস্পরের সম্মুখীন হই এবং পরস্পরের হাতে বাঁধন খুলে দিতে সাহায্য করি। উভয়ে মুক্ত হবার পর চোখের বাঁধন খুলি এবং চারিদিকে তাকিয়ে কমপক্ষে ৪ শত লাশ দেখতে পাই শৃগালগুলো চারপাশে ছোটাছুটি করছিল। উভয়ে নদীর তীরে উপস্থিত হই। গাইবান্ধার লোকটি সাঁতার দিতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। অতঃপর আমি তার হাত ধরে গা ভাসিয়ে দেই। নদীতে কয়েকবার লোকটি আমার হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল কিন্তু অতি কষ্টে পরস্পর পরস্পরকে ধরে রেখে নদী পার হতে সক্ষম হই। তীরে পৌঁছতেই ভোর হয়ে আসে। উভয়েই ভারতে আশ্রয় গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এবং ভারতের পশ্চিম বাংলার চৌধুরী হাটে প্রবেশ করি।

স্বাক্ষর/-
মোঃ মনোয়ার হোসেন
৩০/০৭/৭৩

।। ৮৬।।
ডাঃ আব্দুল করিম আহমদ
গ্রাম- সাপটানা
লালমনিরহাট, রংপুর

৪ ঠা এপ্রিল ১৯৭১, হানাদার বাহিনীর লালমনিরহাট প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত লালমনিরহাট বাসভবনে ছিলাম। হানাদার বাহিনী প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে আমি পূর্বদরজা গ্রামের বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহণ করি। কয়েক দিন পর গোপনে আমি আমার পরিত্যক্ত বাসভবন এবং ডিসপেনসারি দেখতে আসি। লালমনিরহাট শহরের পথিমধ্যে আমি অবাঙালিদের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল দেখতে পাই। আমার বাসবভনে ঢোকার কিছুক্ষণ পর জনৈক ব্যক্তি আমাকে জানায় যে অবাঙ্গালীদের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল দেখতে পাই। আমার বাসবভনে ঢোকার কিছুক্ষণ পর জনৈক ব্যক্তি আমাকে জানায় যে অবাঙ্গালীরা আমাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছে। এ খবর পেয়ে আমি পূর্বদিক দিয়ে দ্রুত
বের হই। অবাঙ্গালীরা আমার খোঁজ নিয়ে আমার পিছু নিয়েছিল।

৭ ই জুলাই আমি যখন আমার পূর্বদরজা গ্রাম বাসভবনে কার্যরত ছিলাম, তখন বহু হানাদার সৈন্য বিভিন্ন দলবদ্ধভাবে তিন দিক থেকে আমার বাসভবন ঘিরে আসছে দেখতে পাই। হানাদার বাহিনীর সাথে স্থানীয় কুখ্যাত অবাঙালিরা ছিল। পূর্বেই নিরাপত্তার জন্য পরিবারবর্গকে দূরে নিরাপদ স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। হানাদার বাহিনী স্থানীয় অবাঙ্গালীদের নিয়ে আমার বাড়ী ঘিরে ফেলে এবং লুটতরাজ শুরু করে। যাবতীয় মূল্যবান সামগ্রী তারা নিয়ে নেয়। ইত্যবসরে অপর একটি দল এসে পড়ে। উক্ত দলে লালমনিরহাট থানার জনৈক অবাঙালি জমিদার ছিল। এ জমিদারটি জানায় যে, আমি কেন এখনও গ্রেফতার হইনি এবং আমাকে পাকিস্তানী পতাকা প্রজ্বলন এবং আওয়ামী লীগের একজন লীডার বলে অভিযুক্ত করে। হানাদার সৈন্যরা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ধরে ফেলে এবং কিল, থাপ্পড়, ঘুষি, লাথি প্রভৃতি দ্বারা অবর্ণনীয় দৈহিক পীড়ন শুরু করে। অবাঙ্গালী চরেরা আমার গৃহ থেকে দুটি ভারতীয় ঔষুধ বের করে আনে। হানাদার বাহিনী আমার গ্রেফতার এবং লুটের সামগ্রীসহ মোঘলহাট রেলওয়ে স্টেশনের নিকটবর্তী রেলওয়ে সেতুর কাছে অপর একদল সৈন্যের নিকট নিয়ে আসে। এখান থেকে লালমনিরহাটে ফোন করা হয়। কিছুক্ষণ পর দুটি কামরাসহ একটি রেল ইঞ্জিন সেখানে এলে হানাদার বাহিনীর কতিপয় লোক আমাকে লালমনিরহাটে নিয়ে আসে। এখান থেকে আমার চোখ বেঁধে এরোড্রাম ঘাঁটির নিকট হানাদার বাহিনীর ঘাঁটিতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এখান থেকে শুরু হয় আমার উপর দৈহিক নির্যাতন। এখানে আরো বহু লোককে নিয়ে আসা হয়েছিল।

এই ঘাঁটিতে ১৪ দিন বন্দি জীবনযাপন করি। এই সময় আমাকে দিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার, মাঠের কাজ, কঠোর পরিশ্রমমূলক কাজ ইত্যাদি করিয়ে নেয়া হতো। তা ছাড়া চড়, কিল,ঘুষি, লাথি প্রভৃতি অতি সাধারণ ব্যাপার ছিল।

এরপর আমাকে স্থানীয় রেলওয়ে ট্রেনিং স্কুলে আনা হয়। সেখানে কয়েকটি হাজত কামরায় আরো ধৃত বাঙ্গালীদের দেখতে পাই। এখানেও আমাকে দৈহিক পীড়ন এবং কায়িক পরিশ্রমশীল কার্যে নিয়োগ করা হয়। এখানে অবস্থানকালে আমি দেখতে পাই বিভিন্ন স্থান থেকে নিরপরাধ বাঙ্গালীদের ধরে আনা হতো। বিহারীরা এদের উপর নানা প্রকার অশ্লীল মন্তব্য করতো। কখনো কখনো বিহারীরা ধৃত বাঙ্গালীদের উপর মিথ্যা অভিযোগ আনতো। সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গালীদের ধরে নিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনী হত্যা করতো। এভাবে গণহত্যা ছিল নিত্যদিনের অতি সাধারণ ঘটনা।

স্বাক্ষর/-
ডাঃ আব্দুল করিম আহমদ

।। ৮৭।।
মোঃ লুৎফর রহমান
গ্রাম- মুন্সিপাড়া
থানা ও জেলা – দিনাজপুর

জুলাই মাসের প্রথম দিকে ভারত হতে ফিরে আসার পরে লিলি সিনেমা হলের সামনে রাত্র ৮ টার সময় ২ জন অবাঙ্গালী আবার আমাকে আটক করে। তারা বলে যে, তুমি মুক্তিযোদ্ধা, তোমার কাছে বোমা আছে, তুমি কতজন অবাঙ্গালীকে মেরেছ ইত্যাদি। তারা আমাকে মারতে মারতে তদানীন্তন সার্কিট হাউসে নিয়ে যায় এবং খান সেনাদের হাতে তুলে দেয়। খান সেনারা প্রথমে আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে তুমি কি কাজ কর? তার উত্তরে আমি বলি যে আমি ‘পটকা, আতশবাজী’ তৈরি করি। আমার উত্তরে খান সেনারা পুনরায় জিজ্ঞাসা করে যে, পটকা কেয়া চিজ হ্যায়? উত্তরে আমি বলি যে, পটকা বিয়ের অনুষ্ঠানে ফুটানো হয় আমোদ-প্রমোদ করবার জন্য। কিন্তু খান সেনারা বলে যে, “তোম জুট বলতা হ্যায়, তোম বোম বানাতা হ্যায়।” এই বলে তারা ভীষণ মারধর আরম্ভ করে এবং সিগারেট খেয়ে জ্বলন্ত সিগারেট আমার শরীরে চেপে ধরে। ঐ সময় ছোট চাকু আমার হাতের তালুর ঢুকিয়ে দেয়। হাত পিছনে বাঁধা অবস্থায় একটা অন্ধকার কক্ষে বন্দী করে রাখে। এ অবস্থায় দুই দিন আটকে রাখে। দ্বিতীয় দিনে আমাকে কিছু রুটি খেতে দেয়।

তৃতীয় দিনে আমাকে কোমরে রশি বেঁধে জেলখানায় নিয়ে আসে। আসার সময় তারা কিল, ঘুষি, লাথি যে যা পারে মারতে থাকে। জেলখানায় আসার পর আমার দুই হাতে রশি বেঁধে একটা বীমের সাথে ঝুলিয়ে দেয়। এক সময় আমাকে উলঙ্গ অবস্থায় রাখা হয়। ঝুলানো অবস্থায় হান্টার ও রাইফেলের বাঁট দিয়ে প্রহার করতে থাকে। প্রহার করার সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, “মুক্তিযোদ্ধা কাঁহা হ্যা? হাম লোক তোমাকে বোম দেগা, তোম যাকে উলোকো মার ছাকেগা।” উত্তরে বলি যে আমি যেতে পারব না। এতে আমার শাস্তি আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। মারধর করার পরে আমাকে জেলখানাতেই বন্দি করে রাখে।

বলা প্রয়োজন যে, এই সময় একজন খান সেনা রাইফেলের বাঁট দিয়ে আমার মুখে আঘাত করে। ফলে আমার সামনের চারটা দাঁত ভেঙ্গে যায়। এই অবস্থায় আমার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক মনে করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এই অবস্থায় আমাকে চার মাস জেলে আটকে রাখে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি জেল হতে বের হয়ে আসি।

স্বাক্ষর/-
লুৎফর রহমান`

।। ৮৮।।
নূর মোহাম্মদ
দিনাজপুর কারাগারের সিপাই

সরকারী ও বেসরকারী কর্মচারীদের কাজে যোগদানের জন্য পাক সরকার যখন নির্দেশ দেয়, তখন আমি দারুণ আর্থিক কষ্টের মধ্যে অজো পাড়াগাঁয়ে অবস্থান করছিলাম। পেটের দায় বড় দায়। কাজেই উপায়ন্তর না দেখে আমি কাজে যোগদানের জন্য শহরে আসি এবং অন্যান্য সহকারীরা যোগদান করেছে কিনা দেখার জন্য জেলখানার সামনের গেট দিয়ে আসবার চেষ্টা করি। কিন্তু সেখানে কালো পোষাক পরিহিত পাঞ্জাবী পশু ও তাদের অনুগ্রহপুষ্ট পদলেহী অবাঙ্গালীরা পাহারা দিচ্ছিল। সাহসে না কুলানোর জন্য আমি পিছনের অপ্রশস্ত রাস্তা দিয়ে ঢুকবার চেষ্টা করি। আর সে সময়ই জনৈক অবাঙ্গালী জেল হেড ওয়ার্ডার হানিফ খান আমাকে ধরে ফেলে জেল গেটে নিয়ে এসে হাত বেঁধে অমানুষিকভাবে হৃদয়হীন পদ্ধতিতে প্রহার শুরু করে। কিল, ঘুষি ও বুট দিয়ে লাথি মারে। প্রহারের চোটে আমি যখন অত্যন্ত কাতর হই, তখন আমাকে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায়। যাবার পথে আমাকে সমানে প্রহার করা হয়। রাস্তার মাঝে আমার নাক ও মুখ জুড়ে এমন এক ঘুষি মারে যাতে আমার নাক ফেটে দরবিগলিত ধারায় রক্তপাত শুরু হয়। সে অবস্থায় আমাকে যখন থানায় নেয়া হয় তখন ঐ পশুরা আমি তখনও পান চিবোচ্ছি বলে রহস্য করে এবং প্রহার করতে থাকে। সেখানে ঘন্টাখানেক ঐরূপে বিরতিহীনভাবে মারধর করার পর আমাকে ক্যান্টনমেন্টে খান সেনাদের হাতে সোপর্দ করে।

ক্যান্টনমেন্টে নেবার পর জেলখানার অবাঙ্গালী সিপাই যারা মুক্তিফৌজের হাতে নিহত হয়েছে, তাদের পরিবারের মহিলারা জবানবন্দি দেয় যে, “ইয়ে শালা সতরা-আঠারো আওরতকো বেওয়া কিয়া। ইয়ে হামারা শওহরকো মারা, হামারা ভাইকো মারা।”

এ বক্তব্য শোনার পর পাক সৈন্যরা আমার উপর অমানুষিকভাবে প্রহার শুরু করে। আমাকে কেটে লবণ লাগিয়ে আস্তে আস্তে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়। তারা আমাকে নিয়ে ফুটবল খেলার মত বেশ কিছুক্ষণ খেলাও করে। এ সময় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। অত্যাচারের এ পদ্ধতিতে তারা যখন তুষ্ট হয়ে যায়, তারপর আমাকে মেজর কামরুজ্জামানের নিকট নিয়ে যায়। সে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে এবং বলে যে তুমি কতজন বিহারী মেরেছ? নেতিবাচক উত্তর দিলে আমার বাঁধন খুলে দিতে বলে এবং আমাকে, একজন ডাক্তার ও আর এক ব্যক্তিকে জীপে তুলে নিয়ে মেজর নিজে গাড়ি চালিয়ে জেলখানায় আসে। আমাকে আলাদা রুমে বন্ধ করে রাখার নির্দেশ দেয়। সেখানে দুমাস বন্দি থাকার পর একদিন চা খাবার নাম করে বাইরে এসে পালিয়ে যাই।

স্বাক্ষর/-
নূর মোহাম্মদ

।। ৮৯।।
মঈনুদ্দিন আহমদ
গ্রাম- আবদুলপুর
থানা- চিরিরবন্দর
জেলা- দিনাজপুর

১৪ ই আগস্ট তারিখে আমি যখন দিনাজপুরে গিয়েছিলাম তখন মহারাজা স্কুলের সামনে খান সেনাদের ক্যাম্পের কাছে রাস্তায় আমাকে গ্রেফতার করে। প্রথমে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে পাশবিক অত্যাচার করে। সেখানে বেদম প্রহার করে। রাইফেলের নল ও গাদা দিয়ে, বেত দিয়ে অমানুষিকভাবে অত্যাচার করে। অত্যাচারের নির্মমতায় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। উল্লিখিত পদ্ধতিতে আমাকে বহুক্ষণ ধরে অত্যাচার করে। এ সময় শরীরের বিভিন্ন স্থানে রাইফেলের বাঁট দিয়ে গুঁতাতে থাকে। রাইফেলের বাঁটের আঘাত আমার মুখের ডান দিকের দুটি দাঁত ভেঙ্গে দেয়। অত্যাচারের পর আমাকে ক্যাম্পের অদূরে জঙ্গলে গুলি করে হত্যা করবার জন্য নিয়ে যায়। জনৈক বাঙ্গালী ইপিআর সে সময় সক্রিয় সহযোগিতা করে গুলির হাত থেকে আমাকে রক্ষা করে। ক্যাম্পে সারা দিন সারা রাত অনাহারে রাখার পর আমার সাথের সমস্ত টাকা-পয়সা ও পায়ের জুতা কেড়ে নিয়ে পরদিন কোতোয়ালিতে স্থানন্তরিত করে। পরে সেখান থেকে ছেড়ে দেয়।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে অবাঙ্গালীরা মাঝে মাঝে গাড়ি করে বিভিন্ন এলাকায় যেত এবং গাড়ি থামিয়ে লুটপাট করত, মানুষ হত্যা করত, মেয়েদের উপর পাশবিকভাবে নির্যাতন করত এবং তাদের প্রভু খান সেনাদের জন্য উপঢৌকন হিসেবে ধরে নিয়ে যেত। তারা মেয়েদের উপর প্রথমে অত্যাচার করত, তারপর তারা গুপ্তাঙ্গের ভিতর রাইফেল-বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দিত। এক একটি মেয়ের উপর ৭-৮ জন অত্যাচার করত। অত্যাচারের পর নির্যাতিত মহিলাদের বহুজন এমনি মারা যেত। তারা প্রকাশ্যেই এ অত্যাচার করত।

রাস্তার পথিকদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যেত এবং সেখানে নির্দয় অত্যাচার করত এবং গুলি করে হত্যা করত। ঝোপ-ঝাড়ে কাউকে দেখলে সেখানেই গুলি করে হত্যা করত। তার খাসী-মুরগী-হাঁস-গরু ধরে নিয়ে যেত, ভাল ভাল কাপড়-গয়নাগাটি নিয়ে যেত।

স্বাক্ষর/-
মঈনুদ্দিন আহমদ

।। ৯০।।
মোঃ আছির উদ্দিন মুন্সী
গ্রাম- চিরিরবন্দর মাজাপাড়া
থানা- চিরিরবন্দর,
জেলা- দিনাজপুর

বৈশাখ মাসের প্রথম দিকে খান সেনারা চিরিরবন্দরে ক্যাম্প করে। সেখানে ক্যাম্প করার পর স্থানীয় গ্রামবাসীরা প্রাণের ভয়ে কতক ভারতে ও কতক গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে চলে যায়। এই সময়ে আমি স্ত্রী-পুত্রদের সঙ্গে নিয়ে দুই মাইল দূরে আমার শ্বশুরবাড়ি বালুপাড়ায় চলে যাই। আমি একদিন বালুপাড়া সন্নিকটে মরা নদীর ব্রিজের কাছে একদিকে চিরিরবন্দর হতে অপরদিকে পার্বতীপুর হতে এই দুই দিক হতে দুটি পাক সৈন্য বোঝাই গাড়ি এসে থামে। এখানে বলা প্রয়োজন যে, উক্ত ব্রীজটি এর পূর্বেই ইপিআর বাহিনী ভেঙ্গে দেয়। উক্ত বালুপাড়া গ্রামের ২০-২১ জন লোক ঐ গাড়ি দুটিতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট আছে ভেবে তাদের অভিনন্দন জানানোর জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু নিকটে যাবার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক হতে খান সেনারা তাদেরকে ঘিরে ফেলে। উক্ত ২০-২১ জনকে পরে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় হত্যা করে এবং লাশগুলি কাঁকড়া নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এই ঘটনার ৩-৪ দিন পরে বালুপাড়া গ্রামটি খান সেনারা তিন দিক হতে ঘিরে ফেলে। খান সেনাদের উপস্থিতি সম্পর্কে গ্রামবাসীরা পূর্বেই টের পেয়েছিল এবং তারা আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। ফলে খান সেনারা সেদিন গ্রাম থেকে কাউকে ধরতে পারে না। এদিকে গ্রামবাসীরা তাদের আর উক্ত গ্রামে থাকা উচিৎ নয় ভেবে অন্যত্র যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং খান সেনারা গ্রাম হতে চলে যাওয়ার পর গ্রামবাসীরা তাদের পোটলা-পুটলি আনার জন্য রাতের অন্ধকারে প্রবেশ করে। আমি উক্ত বালুপাড়া গ্রাম হতে আমার নানাশ্বশুরের বাড়ি দুর্গাপুর (২ মাইল) যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। এবং শেষ রাতের দিকে রওয়ানা দেই। এদিকে খান সেনারা বালুপাড়া গ্রাম ও দুর্গাপুর গ্রামের মাঝখানে ঐ রাত্রের অন্ধকারে মিশন স্কুলে পজিশন নেয়। আমি ও আমার ভাই গরু বাছুর নিয়ে যখন মিশন স্কুলের নিকটে পৌঁছাই তখন হঠাৎ করে ১৮ জন খান সেনা ও ৪ জন অবাঙ্গালী রাজাকার আমাদের দুজনকে ঘিরে ফেলে এবং একজন আমাকে লক্ষ্য করে এক রাউণ্ড গুলি ছোড়ে। কিন্তু খোদা মেহেরবান, গুলি আমাদের দুজনের একজনকে ও না লেগে আমাদের সঙ্গে আনা একটি গরুর পায়ে বিদ্ধ হয়।

পূর্ব হতেই আর ও দুজন দাড়িওয়ালা মুরব্বী গোছের লোককে উক্ত স্কুলের সামনে বেঁধে রেখেছে। খান একজন আমাকে বলে যে, “ইয়ে মৌলভী সাব, আপ কাঁহা যাতে হে?” জবাবে আমি বলি যে আমি গরু বাছুর নিয়ে জমিনে কাজ করতে যাচ্ছি। খান সেনারা পুনরায় বলে যে, “তোম ইন্ডিয়ামে বাগ যাতে হে?” জবাবে বলি যে, না ভাই আমি ইন্ডিয়া যাচ্ছি না। আমি জমিনে কাজ করতে যাচ্ছি। খান সেনারা পুনরায় আমাকে প্রশ্ন করে যে, “ইয়ে মৌলভী সাব আপ সাচ্ছা বাত বলেগা তো আপকো হাম ছোড় দেগা, আপ বলিয়ে আওয়ামী লীগকা পার্টি কাঁহা, স্কুল কলেজ কাঁহা, ছাত্র কাঁহা, মালাউন কাঁহা।” উত্তরে আমি বলি যে, যারা আওয়ামী লীগ, ছাত্র এবং মালাউন সবাই ভারতে পালিয়ে গেছে। যারা এখানে আছে তারা সকলেই খাঁটি পাকিস্তানী। এই সময় খান সেনাদের সাথী অবাঙ্গালী রাজাকাররা আমাকে বাংলায় বলে যে, “আপনি ভয় পাবেন না। আমরা ভারতীয় সৈন্য। এখানে বিহারীরা আসবার চেষ্টা করছে। তাদের বাঁধা দেওয়ার জন্য আমরা এখানে পজিশন নিয়েছি।”

আমি সরলমনে এটা বিশ্বাস করি এবং বলি যে, “ভাই আমি থাকব না। আমাকে ভারত পাঠাবার ব্যবস্থা করেন।” উত্তরে রাজাকাররা আমাকে আশ্বাস দেয় এবং বলে যে আপনি কোন চিন্তা করবেন না, সে ব্যবস্থা আমরা করছি। ঠিক সেই মুহুর্তে আমি লক্ষ্য করি যে, পূর্বেই আনা সেই দুজন মুরব্বী লোককে খান সেনারা চতুর্দিক হতে ফুটবলের মত লাথি মারছে। এভাবে মারার পর লোক দুটিকে আমার কাছে নিয়ে আসে। এবং আমার কাছ থেকে গরু বাঁধার রশি নিয়ে উক্ত মুরব্বী দুজনকে মজবুত করে বাঁধে। অতঃপর আমাকেসহ ৪ জনকে কিছু দূরে ক্যাপ্টেনের কাছে নিয়ে যায়। ক্যাপ্টেন আর্মি লোকদের কাছে জানতে চান যে, ধৃত ব্যক্তিরা কারা। জবাবে তারা বাঙ্গালী জানতে পারলে উল্লিখিত দুই বৃদ্ধকে প্রহারের নির্দেশ দেয় এবং তাদের উপর হৃদয়হীন নির্যাতন চলতে থাকে। নির্যাতন চলা অবস্থায় উক্ত ক্যাপ্টেন তাদের জয় বাংলা বলার নির্দেশ দেয়। তারা তা না বলে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বললে তাদের উপর আরও প্রবলভাবে অত্যাচার করে। এই সময় আমাকে জয় বাংলা বলতে বলা হয়। আমি তা বলি, ক্যাপ্টেন আমাকে বলে, “ঠিক হায় মৌলভী সাব আপকো হাম ইন্ডিয়া ভি লিয়ে যায়গো।”

অতঃপর ৪ জনকেই পূর্ব দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে। এবং একটি খালের কাছে গিয়ে থেমে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এ সময় একটি বেয়নেট দিয়ে উক্ত বৃদ্ধদুটির শরীরের সমস্ত কাপড় কেটে উলঙ্গ করে। এবং তাদের তলপেটে থাপড়িয়ে বলে, “বাঙ্গালী আদমী খাড়া হায়, আওর ভুঢ়িনে তেল লাগাতা হায়।”

এরপর ঐ দুজনকে গুলি করে। একজন একটু মাথা আছড়াতে থাকলে তার মাথা লক্ষ্য করে আবার গুলি করে। ফলে তার মাথার মগজ ছিটকে চলে যায়। এ সময় দক্ষিণ দিক থেকে দুজন গাড়োয়ানকে গাড়িসহ ধরে আনে এবং আমার কাছ থেকে “মৌলভী সাব হামকো একটা রশি দিজিয়ে আপ” বলে রশি চেয়ে নেয় এবং তাদের হাত বাঁধে। অতঃপর তাদের একজনকে যে ৩০-৩৫ বছরের যুবক ছিলেন তাকে মারতে থাকে। মারের চোটে সে জ্ঞান হারাবার উপক্রম হলে তাকে জোর করে তুলে ধরে উলঙ্গ করে এবং তার গুহ্যদ্বারে নড়ি ঢুকিয়ে দেয়। এ পদ্ধতিতে কিছুক্ষণ অত্যাচার চালাবার পর তার হাত বেঁধে গাড়ির পিছনে বেঁধে দেয় এবং অপর ব্যক্তিকে জোরে গাড়ি হাঁকাবার নির্দেশ দেয়। এ সময় তারা আমাকে বলে, “ মৌলভী সাব আপ চালিয়ে ইন্ডিয়া।” রেল লাইনে সকলে আশা শুরু করে। রাস্তার মাঝ থেকে বেশ কয়েকটি খাসি ধরে গাড়িতে তুলে নেয়। মরা নদীর ভাঙ্গা ব্রীজের কাছে এসে জনৈক খান আমাকে তার কাছে ডেকে বসায় এবং জিজ্ঞাসা করে, “মৌলভী সাব, আপ সাচ সাচ বাতলাইয়ে আওয়ামী পার্টিকো লোক কাঁহা, স্কুল কো ছাত্র কাঁহা, মালাউন কাঁহা।” উত্তরে আমি জানাই যে “সব ইন্ডিয়ামে চল গিয়ে, কোই আদমী নেহি হ্যায়। জোভি হ্যায় ওভি পাকিস্তান কো নাগরিক হ্যায়।” এতে আমাকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করে। এ সময় আমাকে একটি সিগারেট খেতে দেয় এবং উক্ত প্রশ্ন গুলি আবার জিজ্ঞাসা করে।

অতঃপর ইন্ডিয়ায় পৌছে দেবার নাম করে আমাকে, সঙ্গীত ও গাড়ির দুজনকে এবং গাড়ির গরু দুটিসহ ক্যাম্পের দিকে আসতে থাকে। ক্যাম্পের নিকট ব্রীজের কাছে এসে হুইসেল দিলে ৫০-৬০ জন খান সেনা সেখানে যায়। তারপর সকলে স্টেশনে আসে। স্টেশনে পরিচিত জনৈক অবাঙ্গালীকে দেখে আমি খানদের কাছে সুপারিশের জন্য অনুরোধ করলে সে আমাকে আওয়ামী লীগের কর্মী বলে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং গুলি করে হত্যা করার জন্য খানদের অনুরোধ জানায়।

সেখান থেকে ধৃত সকলকে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। গাড়োয়ান দুজনকে একটি আলাদা কুঠুরিতে বন্দী করে রাখে। এবং আমাদের ব্রীজে যে সিপাই জিজ্ঞাসা করেছিল তার ঘরে বসতে দেয়। এবং চা খেতে দেয়, সিগারেট খেতে দেয়।

কুঠুরিতে বন্দী দুজনকে পাশবিকভাবে মারা শুরু করে। উলঙ্গ অবস্থায় লাঠি, রড, রাইফেলের গাদা দিয়ে পর্যায়ক্রমে হাত বদল করে পিটাতে থাকে এবং পরিশেষে তাদেরকে ফুটবলের মত লাথি মারতে থাকে। বেলা ৪ টার দিকে লোক দুটিকে ছেড়ে দেয়।

অতঃপর আমাদের দুজনকে ওই ঘরে ঢুকায়। সেখানে একজন গুলিবিদ্ধ ভীষণভাবে আহত লোক হাত বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। সন্ধ্যার সময় ঐ আহত লোককে ঘর থেকে বের করে পশ্চিম দিকে পুকুরের ধারে নিয়ে যায়। যাবার পথে তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে সারা পথ নিয়ে যায় এবং পুকুরের ধারে নিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। আমি এ দৃশ্য উক্ত ঘরের জানালা খুলে দেখেছি।

এশার নামাজের জন্য অজু করে আসছিলাম, তখন ক্যাম্প ইনচার্জ আমার পড়ার খবর শুনে কেরআত পাঠ শুনতে চায়। আমি তিন ঘন্টা ধরে মুখস্ত কোরআন পাঠ করে শুনিয়ে সন্তুষ্ট করি এবং পরদিন বিকাল চারটায় আমাকে মুক্তি দেয়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ আছির উদ্দিন মুন্সী

।। ৯১।।
মোঃ সোলায়মান গণি
গ্রাম- নান্দারাই
থানা- চিরিরবন্দর
জেলা- দিনাজপুর

১৯৭১ সনের ১১ ই রমজান রোজ রবিবার বেলা ১১-৩০ মিনিট খান সেনারা ও রাজাকাররা আমাকে গৃহ থেকে গ্রেফতার করে। শান্তি কমিটির সদস্যদের ইচ্ছার আমার হাতের পিছনে দড়ি বেঁধে রাজাকার, খান সেনা ও শান্তি কমিটির সদস্যরা মিছিল সহযোগে থানায় নিয়ে যায়। রাস্তার মধ্যে রাইফেলের গাদা ও হাত দিয়ে বেদম প্রহার করে। প্রহারের সময় তারা বেয়নেট দেখাচ্ছিল এবং উল্লাস করছিল। ৪ মাইল রাস্তা তারা বিরামহীনভাবে উল্লিখিত পদ্ধতিতে প্রহার করছিল। আনার সময় আমার চোখ-মুখে চুল কালি মেখে কিম্ভুতকিমাকার চেহারায় রুপান্তরিত করে এবং শরীরের সমস্ত জায়গায় ছাপ দিতে থাকে।

এখানে বলা প্রয়োজন, ওরা আমাকে গ্রেফতার করা ছাড়া ও আমার বাড়িঘর সমস্ত লুটপাট করে এবং সবশেষে আগুন লাগিয়ে দিয়ে সমস্ত বাড়ি ভস্মীভূত করে দেয়। আমার অপরাধ, আমি আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ট কর্মী ছিলাম এবং অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিশেষ কর্মতৎপরতা প্রদর্শন করেছিলাম।

থানায় নেবার পর পা উপরের দিকে তুলে লটকিয়ে লোহার রড দিয়ে মারতে থাকে। এর সাথে কিল, ঘুষি ও লাথি সমানে চলতে থাকে। এ অবস্থায় ৪-৫ ঘন্টা টাঙ্গিয়ে রাখে ও উল্লিখিত পদ্ধতিতে অত্যাচার করতে থাকে। চার দিন, চার রাত্রি থানায় ছিলাম এবং উল্লিখিত পদ্ধতিতে অত্যাচার করে। রোজার দিন হওয়া সত্ত্বেও তারা সেহেরী ইফতারের জন্য কোন খাবার দেয়নি। ঐ কদিন না খেয়েই রোজা থাকতে হয়েছে। বহুবার তাদের কাছে পানি চাওয়া হয়েছিল, তবুও তারা দেয়নি।

চতুর্থ দিনের দিনে ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে আমাকে ছেড়ে দেয়।

স্বাক্ষর/-
মোঃ সোলায়মান

।। ৯২।।
মোঃ হাবিল উদ্দিন আনছারী
গ্রাম- পালপাড়া
ডাকঘর- বাংলাহিলি
থানা- হাকিমপুর
জেলা- দিনাজপুর

২২ শে এপ্রিল পাক বাহিনী হিলি বাজার দখল করে নেয়। হিলি দখল করার পর চারদিকে অগ্নিসংযোগ এবং ব্যাপক হারে গণহত্যা চালিয়ে যায়।

২৩ শে এপ্রিল পাক বাহিনী ও বিহারীরা আমাদের পালপাড়া আক্রমণ করে। তারা বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। নিরীহ জনসাধারণকে ধরে নির্বিচারে মারধর করতে থাকে। এই সময় তারা ৭ জন লোককে হত্যা করে। এইসব লোককে প্রথমে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, পরে গুলি করে হত্যা করে। আমি এবং আরও একজন গুরুতররূপে আহত হই। আমার সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। বহু লোককে এই সময় দেখতে পাই পাঞ্জাবীরা কিল, ঘুষি এবং ফুটবলের মত “কিক” করছে এবং নানারুপ অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিচ্ছে। এই সময় ৩ জন ছেলে ঘরের ছাদের উপর উঠে আশ্রয় নিয়েছিল। তারা ৪ দিন পর্যন্ত ঐ ছাদের উপর বসে থাকে। কোনরূপ নড়াচড়া বা খাবার-দাবার নাই। ৫ দিন পর আমাদের এখানে থেকে তাদের ক্যাম্প তুলে নিলে তারা মাটিতে নেমে আসে।

অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রাণকৃষ্ণপুর (চার) গ্রাম পাক বাহিনী চারিদিকে থেকে ঘিরে ফেলে। সমস্ত পুরুষ লোকদেরকে বেছে এক লাইন করে এবং অকথ্য নির্যাতনের পর ১৪৯ জনকে লাইন করে মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করে। তাদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। গ্রাম থেকে সুন্দরী মেয়েদের ধরে নিয়ে যায় এবং অনেককে সবার সামনেই ধর্ষণ করে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ হাবিল উদ্দিন আনছারী
০৮/১১/১৯৭৩

।। ৯৩।।
রফিকুল ইসলাম
গ্রাম- সোনাপুকুর
থানা- পার্বতীপুর
জেলা- দিনাজপুর

২৫ শে মার্চের পর দিনাজপুর যখন ইপিআর কর্তৃত্বে ছিল সে সময় আমি ইপিআর বাহিনীদের গাড়ি করে স্থান থেকে স্থানান্তরে নিয়ে যেতাম। আর এ অপরাধের জন্য আমাকে এপ্রিলের ৬ তারিখে পাক হানাদাররা দিনাজপুর শহর থেকে গ্রেফতার করে কোতোয়ালি থানার পাশের জঙ্গলে নিয়ে যায়। উদ্দেশ্য, আমাকে সেখানে হত্যা করা হবে। আমাকে ঐ খানে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকজন সামরিক লোকজন ও কতিপয় অবাঙ্গালী দালাল। সেখানে আমাকে জবাই করার জন্য ছোরা বের করে। ঠিক সে সময় শেষবারের মত পানি পান করার সুযোগ দেয়ার জন্য তাদের প্রতি অনুরোধ জানাই। অনুরোধে তাদের মধ্যের একজন দয়াপরবশ হয়ে আমাকে পানি পান করে আসার অনুমতি দেয়। থানার প্রাচীরের পাশের টিউবওয়েলে পানি পান করি এবং বাঁচার শেষ অবলম্বন হিসাবে তাদের বোঝার আগেই প্রাচীর টপকে অপর দিকে চলে যাই। সেখানেও খান সেনারা ছিল। তারা আমাকে পুনরায় গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে বেদমভাবে হুইপিং করা হয় এবং মুক্তিফৌজ কোথায়, ‘সুন্দরবন’ গাড়িটি কোথায়, কতজন বিহারীকে হত্যা করেছ ইত্যাদি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে। কিছুক্ষণ হুইপিং সহ্য করার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফেরার পর ঐ দিন বিকালে আমাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। সে সময় কিছুসংখ্যক অবাঙ্গালী মেয়ে থানায় এসে জবানবন্দী দেয় যে আমি তার স্বামী, ভাই অথবা বাবাকে হত্যা করেছি। ফলে পুনরায় আমার উপর প্রহার শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে আমি পানি পান করতে চাই। তখন আমাকে প্রস্রাব খেতে দেওয়া হয়।

রাত বারটায় আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম। অতঃপর আমাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওসির কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে জনৈক মেজরসহ, একজন ক্যাপ্টেন ও ডিএসপি ছিল। সেখানে আমার নামধাম ও আত্মীয়স্বজনের খবরাখবর আদায় করে নেওয়া হয়। সেখানে অবশ্য আরও ছয়জন আসামী ছিলেন। এরপর অফিসাররা নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কিছু বলবার পর উল্লিখিত ছ’জনকে পেছনে হাত ও চোখ বেঁধে জীপে উঠিয়ে নিরুদ্দেশের পথে নিয়ে যায়। এরপর আমাকে আবার বন্দীশালায় বন্দী করে রাখে। এ অবস্থায় আমাকে থানায় রেখে দুবেলা জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রহার করত। প্রথম সাত দিন আমাকে কিছুই খেতে দেয়নি। পানি চাইলে প্রস্রাব দিত। কয়েক দিন পর সামান্য পানি পান করতে দিত। তাও কর্তৃপক্ষের অগোচরে।

তেরদিন পর বেলা দশটায় জনৈক পাঞ্জাবী হাবিলদার এসে আমাকে দিনাজপুর কুঠিবাড়ী ক্যান্টনমেন্টে হাত পিছনে ও চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে যাবার পর আমার দু’পায়ে এবং দু’হাতে কড়া বেঁধে হাত পা ফাঁক করে টানা দেয়। টানা দেওয়া অবস্থায় সিনার উপর বুট দিয়ে পাড়া দেয় এবং কতজন লোককে মেরেছি ও গাড়ি কোথায় আছে তা জানতে চায়। দু’ঘন্টা এ অবস্থায় রেখে অত্যাচার করে। এর ফলে আমার নাকমুখ দিয়ে রক্ত উঠে; আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।

ক্যান্টনমেন্টে নির্যাতন পর্ব শেষ হলে আমাকে পুনর্বার সন্ধ্যার দিকে থানায় পূর্বোক্ত পদ্ধতিতে পাঠায়। সারারাত বন্দী অবস্থায় রেখে পরদিন বেলা এগারোটার দিকে অন্য ছ’জনের সাথে আমাকে কোর্টে নিয়ে যায়। কোর্ট থেকে আমাকে জেলখানায় স্থানান্তরিত করা হয়।

দু’দিন পর জেল খানার ভিতরে ক্যাপ্টেন কয়েকজন অনুচরসহ যায়। সে সময় খাবার খেতে বসেছিলাম। না খেয়েই আমি এবং অপর একজন তার কাছে চলে যাই। সেখানে আবার একই কথাগুলি জিজ্ঞাসা করে। সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে আমাকে দু’ঘন্টা গাছে উল্টো দিকে করে লটকাবার নির্দেশ দেয়। নির্দেশ মোতাবেক আমাকে পা উপরে এবং মাথা নীচে করে লটকিয়ে দেওয়া হয়। ঐ অবস্থায় ওরা খুব পাশবিক উল্লাস করেছে, হাসাহাসি করেছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুতো দিয়ে মশকরা করেছে। দু’ঘন্টা পর অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে নামানো হয়।

পরদিন আবার জনৈক অফিসার এসে ডেকে চেম্বারে নিয়ে যায়। সেখানে এক বন্ধ ঘরে উলঙ্গ অবস্থায় পা ফাঁক করে দাঁড় করিয়ে রাখে এবং পুরুষাঙ্গে দুটো ইট বেঁধে দেয়। ঐ ইটের উপর আবার পানি ঢালা হয়েছিল। সামান্য নড়াচড়া করলে লাথি, ঘুষি ও বেত প্রহার করত। এই প্রক্রিয়ায় আমাকে দেড় থেকে দুই ঘন্টা রাখা হয়। একইভাবে আরও দু’জনকে এদিন শাস্তি দেয়।

এর দু’দিন পর রাত তিনটার সময় পাঁচজন সামরিক লোক এসে আমাকে সহ ২১ জনকে ডাকে। গেটে আসার পর সকলের হাত বাঁধা হয় এবং কালো কাপড় দিয়ে চোখ, কান কষে বাঁধা হয়। অতঃপর আমাদেরকে ট্রাকে করে কোথাও নিয়ে গিয়ে নামানো হয়। অবস্থাদৃষ্টে স্থানটিকে নরম মনে হয়েছে। দু’একটি ঘাস অথবা ছোট ঘাস জন্মেছিল। সেখানে নেয়ার পর এক একজনকে সারি থেকে খুলে নিয়ে যাতে থাকে। নিয়ে যাবার পর শুধু খাসি, গরু জবাই করলে যেমন শব্দ হয় তেমনি করুন ও হৃদয়বিদারী শব্দ শোনা যেত। তারপর হাত-পা আছড়ানোর মত শব্দ কিছুটা কানে ভেসে আসত। এমনি করে ১৯ জনকে সারি থেকে নিয়ে যাবার পর আমাকেসহ আর একজনকে জেলখানায় নিয়ে আসে। সেখানে চোখ ও হাত খুলে দেয় এবং সেখানেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেঃ দলে কে কে আছে তাদের নাম বল এবং ‘সুন্দরবন’ গাড়ি কোথায় আছে বল। সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে মাথার চুলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে প্রাচীরের সাথে আঘাত করতে থাকে এবং বুট দিয়ে ২/৩টি লাথি বুকে মারে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে আমি মুখে রক্ত দেখতে পাই। ডাক্তার এসে আমাকে ঔষধাদি খাওয়ানোর পর পুনরায় হাজত খানায় পুরে রাখে। আমার সাথে জনৈক মেকানিক সিরাজ মিয়াকে ধরে অনুরূপভাবে অত্যাচার করে। হাত-পায়ে পেরেক মেরে পাছার মাংস কেটে কুকুরকে দিয়েছে। সে অবশ্য এখনো জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে আছে। জেলখানার ভিতর তিনজন যুবতী মেয়েকে দেখেছি। তাদের করুণ কান্না ও চিৎকার ধ্বনি শুনেছি।

এ অবস্থায় ৭ মাস ৩ দিন থাকার পর ১৬ই ডিসেম্বর ভোর পাঁচটায় মুক্তি বাহিনীর জোয়ানরা জেলখানার তালা ভেঙ্গে আমাকে সহ সকল বন্দীকে ছেড়ে দেয়। বর্তমানে পঙ্গু অবস্থায় আছি। আমি কোন রকম কাজ করতে পারি না।

স্বাক্ষর/-
রফিকুল ইসলাম

।। ৯৪।।
হাসিনা বেগম
প্রযত্নেঃ আফছার আলী খান
গ্রাম- সাধুপাড়া,
থানা ও জেলা- পাবনা

২৮ শে মার্চ, ১৯৭১। আমার স্বামী তখন বাড়িতে। বেলা ১১/১২টায় একটি পাক সেনাদের গাড়ি এসে থামে, জোর করে তারা বাড়িতে ঢুকে স্বামীকে যেতে বলে। তখন উনি মটরসাইকেল পরিষ্কার করছিলেন। লুঙ্গি পরা অবস্থায় মটরসাইকেল নিয়ে যেতে বলল। কিছুক্ষণ পরেই খবর পেলাম চাচড়ার মোড়ে আমার স্বামীকে গুলি করে মেরেছে। লাশ আনতে গেলে পায় না, মটরসাইকেল ও তারা নিয়ে যায়। তারপর বাসায় থাকা নিরাপদ মনে করলাম না। আমার দুটি ছেলে নিয়ে পথে নামি। যশোর থানা, কালিগঞ্জ থানা, কোটচাঁদপুর শ্রীপুর থানা, মাগুরা থানা, বেলেডাঙ্গা থানা, শৈলকূপা থানা, কাতলাপাড়া থানা ইত্যাদি থানাতে তখন কাজে নামি। কাজ শুরু করি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে।

আমার আব্বা ডি,এস,পি ছিলেন। সেই বরাত দিয়ে উপরিউক্ত থানাগুলিতে গেছি। পরিচয় দিয়েছি, থেকেছি এবং সেখানে থেকে থানার বর্তমান ফোর্স কত, অস্ত্র কত ইত্যাদি খবর আমি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পরিবেশন করতাম। তারপর মুক্তিবাহিনী ঐসব থানাগুলিতে অপারেশন চালাতো। এতে করে কাজ এগিয়ে চলছিলো। আমি বিভিন্ন থানা ঘুরে ঘুরে কাজ করতে থাকি, সাফল্য ও বেশ আসে। আমার দুটি বাচ্চা নিয়ে ঐভাবে জীবনের ঝুকি নিয়ে কাজ করছিলাম। আমি তখন শৈলকুপা থানাতে আছি এক বাড়িতে। লোকজন কেউ নেই আমি একাই ছিলাম বাচ্চা দুটি নিয়ে। চারদিকের ঘরবাড়ি সব বিধ্বস্ত, শূণ্য। নিঃসঙ্গ ভৌতিক একটি অবস্থা।

ভাদ্র মাস (তারিখ মনে নেই)। তখন বেলা ১০/১১টার দিকে ভাত রান্না করছিলাম। হঠাৎ করে ২জন পাক সেনা এবং ৪ জন রাজাকার এসে আমাকে থানাতে যেতে বলে। তারপর জোর করে ছোট বাচ্চাটিসহ থানায় নিয়ে যায়। অপর বাচ্চাটি পাক সেনা দেখে পালিয়ে যায়। থানাতে নিয়ে গিয়ে মারধোর শুরু করে। থানাতে তখন বহু পাক সেনা ও রাজাকার ভর্তি ছিল। তখন অন্য পাঁচটি ছেলেকে ধরে এনেছিল। তাদের সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে। ঐ গুলি ছুটে এসে আমার পায়ে লাগে। পরে অপারেশন করে আমার গুলি বের করে। মারতে মারতে আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়তাম। দারোগা আনিসুর রহমান আমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেন। তাঁর অনুরোধে আমাকে গুলি করে না।

ডানাতে ও মাজাতে দড়ি বেঁধে শৈলকূপা ব্রীজের পানিতী ডুবিয়ে রাখে ১৪/১৫ ঘন্টা। এ অবস্থায় আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। তার পরদিন পানি থেকে তুলে থানার মাঠে ফেলে রাখে। আমার তখন নড়বার মত অবস্থা ছিল না। ঐ ভাবে আছি। একজন রাজাকার এসে ‘এখনো মরেনি’ বলে আমার উপর লাথি মারে। আমার জ্ঞান ছিল না। দারোগার বারবার অনুরোধে আমার প্রাণ ভিক্ষা দেয়। আমার চিকিৎসা করায় ক্রমশ আমি সুস্থ হয়ে উঠি। আমার সেই পুরাতন বাড়িতে ফিরে আসি।

স্বাক্ষর/-
হাসিনা বেগম
২৫/০৭/১৯৭৩

।। ৯৫।।
নাজির উদ্দিন মিয়া
গ্রাম- নাজিরপুর
থানা ও জেলা- পাবনা

শান্তি কমিটির লোকদের কুমন্ত্রণা ও সরবরাহকৃত তথ্যের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তানী সৈন্যরা উল্লেখিত গ্রামটি অপারেশন করে। প্রায় ২০০/২৫০ পাক সৈন্য ও রাজাকার, আল বদর ভোরের দিকে সমস্ত গ্রাম ঘিরে ফেলে। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে ইতিপূর্বে আরও দুবার ঐ একই গ্রাম মিলিটারীরা অপারেশন করে।

লোকজন ঘুমিয়ে ছিল। এ জন্য তাদের অধিকাংশ লোকই এই ঘেরাও জানতে পারেনি। তাই পাক সৈন্যরা প্রথমে গ্রামের লোকদের ধরা শুরু করে। তারা লোকজন ধরে তাদের মধ্য থেকে যারা অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যবান অর্থাৎ যাদের তারা মুক্তিবাহিনীর লোক বলে সন্দেহ করেছে তাদেরকে আলাদা করে। অতঃপর তাদের একটি নালার নিকট নিয়ে যায় এবং গলা কেটে উক্ত নালার মধ্যে ফেলে রাখে। এছাড়া বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়েও হত্যা করে। অবশ্য কিছু লোককে গুলি করেও হত্যা করে। এমনি করে তারা সেদিন ৫৭ জন লোককে হত্যা করে।

ধৃত ব্যক্তিদের মধ্যে আমিও ছিলাম। কিন্তু আমার চেহারা রোগা হওয়ায় আমাকে বৃদ্ধ ও অপছন্দ লোকদের সারিতে রাখে। আমি পাক সৈন্যদের হত্যাযজ্ঞ নিজের চোখেই সংঘটিত হতে দেখেছি।

পাক সৈন্যদের অপর একটি দল এই সময় বাড়িঘর লুটপাট করে। প্রায় ৫০০ ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এ পোড়া বাড়িগুলির মধ্যে পূর্বে পোড়া বাড়িও ছিল। পূর্বের পোড়া বাড়ি যেগুলি মেরামত করেছিল সেগুলিও আবার পুড়িয়ে দেয়।

তারা বহুসংখ্যক মহিলার উপর হৃদয়হীনভাবে নির্যাতন চালায়। এই নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয় ছেলেমেয়ের মা, সদ্য বিবাহিতা এবং কুমারী মেয়েরা। একাধিক পাক সৈন্য কারো উপর অত্যাচার করেছে বলে শোনা গেছে।

পাক সৈন্যরা ফেরার পথে গ্রাম লুট করে সোনা-দানা, টাকা-পয়সা, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী ধরে নিয়ে যায়। এ ঘটনার কয়েকদিন পরই দেশ স্বাধীন হয়।

স্বাক্ষর/-
নাজির উদ্দিন

।। ৯৬।।
আবদুল হামিদ
গ্রাম- নাজিরপুর
থানা ও জেলা- পাবনা

৪ ঠা রমজান ভোর রাতে ১২৫ জনের মত পাক সৈন্য ও রাজাকার আমাদের গ্রাম ঘিরে ফেলে। শান্তি কমিটির লোকেরা তাদের খবর দিয়েছিল যে মুক্তি বাহিনীর লোক ঐ গ্রামে থাকে এবং গ্রামবাসীরা তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করছে। শান্তি কমিটির লোকদের দেখিয়ে দেওয়া বাড়িঘর প্রথমে লুটপাট করে। তারপর আগুন লাগিয়ে অন্যূন ৮/৯ টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়।

এ সময় দুজন লোক বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছিল। মিলিটারীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি করে। ফলে তারা দুজনই মারা যায়। গ্রাম থেকে অন্যান্য জিনিসপত্রের সাথে গরু, ছাগল, মুরগী ধরে নেয় তাদের উদর পূর্তির জন্য।

এই অপারেশনে আমি ধৃত হই। তারা আমাকে মুক্তিবাহিনীর লোক সন্দেহে গ্রেফতার করে। ধরার পর প্রথম পর্যায়ে আমাকে চড়, থাপ্পড়, কিল, ঘুষি এবং লাথি মেরে প্রহার করতে থাকে। তারপর তারা আমার দু’হাত পিছনে বেঁধে তাদের সাথে করে সার্কিট হাউস ক্যাম্পে নিয়ে আসে।

ক্যাম্পে নিয়ে আসার পর তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। আমি মুক্তিবাহিনী কি না? আমি কত জনকে হত্যা করেছি এবং আমার দলে কতজন আছে? আমার সেই সমস্ত সঙ্গীরা কোথায় আছে এবং আনার অস্ত্রশস্ত্র কোথায় আছে তা জানতে চায়। আমি মুক্তিবাহিনীর লোক নই এবং তাদের কোন খবর জানিনা বললে আমার উপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। বেতের লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে মারতে থাকে। পর্যায়ক্রমে ২/৩ জন আমাকে মারে। এর সাথে চড়, ঘুষি, লাথি তো আছেই।

কিছুক্ষণ পর পর ৩/৪ ঘন্টা এমনিভাবে আমার উপর অত্যাচার চলে। অত্যাচার চলার সময় আমার হাত পিছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। অত্যাচার চালানোর পর আমাকে একটি ঘরে তিন দিন বন্দী করে রাখে। অত্যাচারের এক পর্যায়ে আমি একবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।

বন্দী অবস্থায় তারা আমাকে রুটি ও লাবড়া জাতীয় তরকারি খেতে দেয়। প্রসাব পায়খানার সময় তারা আমাকে কড়া পাহারা দিত।

তিনদিন পর আমার আত্মীয়স্বজন টাকার বিনিময়ে শান্তি কমিটির দ্বারা আমাকে মুক্ত করে নিয়ে আসে।

স্বাক্ষর/-
আবদুল হামিদ

।। ৯৭।।
মোঃ হাসেম আলী তালুকদার
গ্রাম- রামচন্দ্রপুর
থানা ও জেলা- পাবনা

১৯৭১ সালের রমজান মাসের প্রথম দিকে পাবনা শহর থেকে বহু খান সেনারা এসে গ্রাম ঘেরাও করে রাত্রির অন্ধকারে। আমার বাড়িতে আমি ও আমার রুগ্ন স্ত্রী ছাড়া কেউ ছিল না। খান সেনারা গিয়ে আমাকে ডেকে ঘর থেকে বের করে। ধরার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুইজনকে বেদম প্রহার করে আর বলে “তুই মুক্তিবাহিনীকে খেতে দিস, বল তারা কোথায়।” সেই সঙ্গে আমাদের গ্রামের আরো লোককে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে আসে এবং সেখানে কয়েকজনকে হত্যাও করে। স্ত্রীর পরিণতি কি তা আর জানতে পারি নাই। ক্যাম্পে নিয়ে এসে আমাকে এবং অন্যান্য জায়গার ৫ জনকে এক ঘরে রাখলো। দৈনিক সকাল, দুপুর ও বিকাল এবং ১১/১২ টার দিকে দুই থেকে তিনজন এসে পরপর ঘর থেকে একজন করে বার করে নিয়ে যেত এবং নানা জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তাদের খুশীমত কাউকে মারতে আবার কাউকে না মেরেই ঘরে রেখে যেত।

আমাদের কয়েকজন কড়া পাহারাদার ছিল। রোজা তারা রাখতে দিত না। বলতো রোজা আবার কি জিনিস। দৈনিক দুইবার করে আমাদের ৬ জনকে একই জায়গাই কাপড়ে অথবা মেঝের উপর খাবার দিত। পুরাতন রেশন চাউলের ভাত এবং খেসারী কলাইয়ের ডাল। গন্ধে আমরা কেউ খেতে পারতাম না। প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক ধরে আনতো এবং রাত্রি বেলা তাদের ক্যান্টনমেন্ট থেকে কিছু দূরে শব্দ শোনা যেত। অনেক চেনামুখ আর দেখতে পেলাম না। ১৪ দিন আমাকে তারা প্রহার করার পর ১৫ দিনের দিন তাদের অফিসারসহ ৫ জন এসে ঘর থেকে আমাকে বার করে নিয়ে যায় এবং আমাকে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে ও এম, পি, এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর কোন সন্ধান না পাওয়ায় মোটা রশি নিয়ে এসে আমার দুই হাত গাছের দুই ডালের সাথে এবং দুই পায়ে রশি লাগিয়ে মাটিতে খুঁটি পুঁতে ভীষণ প্রহার করে। তাদের প্রহারে অজ্ঞান হলে তারা কি করেছে জানি না। তবে যখন আমার জ্ঞান হয় তখন দেখি আমার হাতের ও বাম উরুর চামড়া ছিলিয়ে আছে। ১৭ দিনের দিন রাতে আনুমানিক ২ টার সময় আমার ঘরের ও পাশের ঘর হতে ২৪/২৫ জনকে তাদের ক্যান্টনমেন্ট থেকে কিছু দূর নিয়ে যায়। সবাইকে লাইন করে একসঙ্গে গুলি করে হত্যা করে। আল্লাহর ইচ্ছায় আমার গায়ে গুলি লাগেনা তবু ও মরার মত পড়ে যাই। খান সেনারা চলে গেলে প্রায় ভোরের দিকে কোন রকমে এক লোকের বাড়িতে আশ্রয় নেই এবং সেখান থেকে আমার আত্মীয়কে খবর দিই নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাড়ি গিয়ে আমার স্ত্রীর সাথে আর সাক্ষাৎ ঘটে নাই। তখন সে মারা গিয়েছিল।

স্বাক্ষর/-
মোঃ হাসেম আলী তালুকদার

।। ৯৮।।
মোসাম্মৎ মনোয়ারা খাতুন
গ্রাম- সলঙ্গা মধ্যপাড়া ভরমহনী
থানা- রায়গঞ্জ
জেলা- পাবনা

১৯৭১ সালের ভাদ্রমাসের ১৫ তারিখ মুসলীম লীগের অন্যতম দালাল দূরবতী তারাশ থানার ক্যাম্প থেকে একদল পাকিস্তানী খান সেনাদের সলঙ্গা বাজারে ক্যাম্প অপারেশন করার জন্য সলঙ্গা বাজারের দিকে লেলিয়ে দেয়। বলা প্রয়োজন, সেই সময় কিছু সংখ্যক মুক্তিবাহিনী সলঙ্গা বাজারে রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন করার জন্য গোপনে চারিদিক ছড়িয়ে ছিল। ঠিক ঐ তারিখেই আরও ২০/২৫ জন খান কুকুরেরা লাহড়ী মোহনপুর থেকে স্পীড বোট যোগে সলঙ্গা বাজারের দিকে চলে আসে। সলঙ্গা বাজারে এসে তারা বাজারের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করে। কোন রকম দুষ্কৃতিকারীকে না পেয়ে তারা আপন ক্যাম্পের দিকে রওয়ানা হয়। যাওয়ার পথে পাক সৈন্যরা আমাদের বাড়িতে ঢুকেই আমাকে ও আমার শ্বাশুড়িকে দেখতে পায়। ইতিপূর্বেই আমার স্বামী জীবনের ভয়ে বাড়ি থেকে সরে পড়ে। পাক সৈন্য আমার শাশুড়িকে উর্দুতে বলে যে, “ইয়ে বুড়ীমা, তোম জলদী হেয়াছে ভাগ যাও।” বুড়ী জীবনের ভয়ে বাড়ির বাইরে চলে যায়। আমি তখন পাক ফৌজের হাতের তল দিয়ে দৌড়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেই। পাক ফৌজ তখন দৌড় দিয়ে সেই বাড়িতে ঢুকে পড়ে। আমি তখন উক্ত বাড়িওয়ালার যুবতী মেয়েকে জড়িয়ে ধরি। পাক ফৌজ তখন উক্ত যুবতী মেয়েকে না ধরে আমাকে জোর করে তার হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। আমি তখন বলি যে বাবা তুমি আমার মান হানি কোরোনা, তোমার পায়ে ধরি, মিনতি করি। তখন পাক ফৌজ উর্দুতে বলে যে, তুমি আমাকে বাবা বলো না, আমি তোমার ভাই আর তুমি আমার মায়ের পেটের বোন। এই কথা কয়টি বলে আমার হাত ধরে জোর করে পরবর্তী বাড়ি হারু কবিরাজের পাকের ঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর আমার উপর পাশবিক অত্যাচার আরম্ভ করে। আমার শরীরের উপর অমানুষিক উপায়ে ধর্ষণ ও মর্দন করতে আরম্ভ করে দেয়। আমি তখন অচৈতন্য অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকি। খান পিশাচ তার বাসনা তৃপ্তি করে অপরাপর খান সেনাদের তাদের কাম বাসনা চরিতার্থ করার জন্য হুকুম দেয়। এই সংবাদ শুনে খান কুকুরদের আরও চারজন আমার কাছে এসে পড়ে। আমাকে তারা আরও বলে যে, তোমার স্বামী কোথায়, সে নাকি মুক্তি ফৌজ, সে নাকি লুট করেছে? অবশ্য সব কথা উর্দুতে জিজ্ঞাসা করে।

তখন আমি বলি যে, না না, সব মিথ্যা। বাবা, আমার স্বামী ওসব কিছুই করে নাই বা সে কোন মুক্তি ফৌজ নয়। তখন দস্যুরা আমার ঘরে ঢুকে তল্লাশী চালায়। ঘরে ঢুকে কোন রকম লুটের মালপত্র তারা দেখতে পায় না। তারা শুধু তামাক ও তামাক তৈরির মসলাদি দেখতে পায়। কারণ আমার স্বামী একজন দরিদ্র তামাক ব্যবসায়ী। খান সেনারা আমাকে জানায় যে, তুমি এখানে থাক, আমরা বাইরে থেকে এখনি আসছি। তাদের কুমতলব বুঝতে পেরে আমি দূরে একটা বাড়ির দিকে ছুটে যাই। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই যে আরও একদল খানসেনা একটি হিন্দু মেয়েকে জোর করে টানাটানি করছে তাদের কামবাসনা মিটানোর জন্য। ঐ দেখে আমি আরও দূরের বাড়িতে আশ্রয় নেই। এর পরপরই তারা বাজার ছেড়ে ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হয়।

টিপসহি/-
মনোয়ারা খাতুন

।। ৯৯।।
শ্রীমতি সাবিত্রী দেবী
গ্রাম- সোনাপুকুর
থানা- পার্বতীপুর
জেলা- দিনাজপুর

চৈত্র মাসে সামরিক তৎপরতা শুরু হলে অত্র গ্রামের প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই আত্মরক্ষার জন্য বাঙ্কার করে। এই সময় একদিন পাকবাহিনী ও অবাঙ্গালীদের দল সৈয়দপুর থেকে দিনাজপুর পথে আমাদের গ্রামের সমস্ত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। প্রাণভয়ে যারা পালিয়ে গিয়েছিল তারাই শুধু বেঁচেছে কিন্তু যারা সাহসে ভর করে জরুরী আত্মরক্ষার তাগিদে উল্লিখিত বাঙ্কারগুলির মধ্যে আত্মগোপন করেছিল তাদের কেউই বেঁচে নেই। ঐ দিন আমাদের পাড়ায় অন্যূন ৭ জন পুরুষ এবং মহিলা মারা যান।

এমন একটি গর্ত ছিল আমাদের বাড়িতেও। আমি এবং আমার দুই দেবর ও একজন ভাগিনাকে নিয়ে সেই গর্তে আত্মগোপন করি। অতি অল্প দূর থেকে খান সেনারা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি করে। ঐ গুলিতে ঐ গর্তের তিনজন মারা যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় আমি বেঁচে গেছি।
টিপসহি/-
সাবিত্রী দেবী

।। ১০০।।
মোঃ রজব আলী
গ্রাম- সোনাপুকুর
থানা- পার্বতীপুর
জেলা- দিনাজপুর

বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়ে খান সেনারা আমাদের গ্রাম ঘেরাও করে। আমাকে সহ আরও চার জনকে ধরে। খান সেনারা মুক্তিবাহিনীর খোঁজে এই গ্রাম ঘেরাও করে। সামরিক বাহিনী ও অবাঙ্গালীদের যৌথভাবে গঠিত এ দলটি আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে যে আওয়ামী লীগ নেতা কে এবং কোথায়? মুক্তিবাহিনী কোথায়? আমাদের টাকা দাও। সাথে ৪৫ টাকা ছিল। তা তারা ছিনিয়ে নেয়।

অতঃপর ধৃত পাঁচজনকে আমাদের আঙ্গিনায় প্যারেড করতে নির্দেশ দেয়। ঐ অবস্থায় সামনে থেকে লাইনে গুলি করে। চারজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আমার বুকের উপর এবং বা হাতে গুলি লাগে এবং ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাই।

পশুরা ঐ দিন মেয়েদের উপর অত্যাচার করেছে। গ্রামের বাড়িঘর লুটপাট করে সম্পদ অপহরণ করতেও তারা কার্পণ্য করেনি।
স্বাক্ষর/-
মোঃ রজব আলী

।। ১০১।।
শ্রীমতি পদ্মমণি
গ্রাম- সোনাপুকুর
থানা- পার্বতীপুর
জেলা- দিনাজপুর

চৈত্র মাসের একটি দিনে আমি ভাতিজা সহ বাড়ির গর্তে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সামরিক পশুরা যখন আমাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে লোক খুঁজতে খুঁজতে আসছিল তখন আমাদের দেখতে পেয়েই কোন রকম সময়ক্ষেপণ না করে অথবা কোন বাক্য ব্যয় না করেই গুলি করে। পরপর চারটি গুলি করে গর্তের সকলকে হত্যা করে। ভাগ্যক্রমে গর্তের আর সকলে মারা গেলেও গুরুতরভাবে আহত হয়ে বেঁচে গেছি। পরবর্তী সময়ে অনেক কষ্ট করে ভারতে আশ্রয় নেই এবং দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম।
টিপসহি/-
শ্রীমতি পদ্মমণি

।। ১০২।।
আক্কাস আলী
গ্রাম- সাধুপাড়া
থানা- পাবনা
জেলা- পাবনা

২৫ শে মার্চ রাতে আমি যখন ঘুমাচ্ছি, তখন ঐ এলাকার আপামর মানুষ বড় বড় গাছ কেটে, ইট দিয়ে বেরিকেড তৈরি করে। সারা রাত ধরে তারা এই কাজ করে।

পরদিন শুক্রবার ফজরের নামাজ পড়ার জন্য আমি ঘুম থেকে উঠে মসজিদে ফজরের আজান দেই। আজান শেষে আমি যখন সুন্নত নামাজ পড়ছিলাম ঠিক সে সময় ৭ ট্রাক মিলিটারী আসে। তারা আমাকে নামাজ পাঠরত অবস্থায় গ্রেফতার করে। আমি ফরজ নামাজ পড়ার জন্য সময় প্রার্থনা করলেও পাক বর্বররা আমাকে সে সময় দেয় নি। আমাকে গ্রেফতার করে মারধর শুরু করে। তারপর বাইরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। বেরিকেড কারা তৈরি করেছে এবং তাঁরা কোথায়? আমি জানিনা বলে অস্বীকার করলে সৈন্যরা আমার উপর বেতের লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি বেদম প্রহার শুরু করে। শরীরের এমন কোন জায়গা ছিল না যেখানে তাদের প্রহারের আঘাত পৌছেনি। মারের চোটে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত ঝরতে থাকে এবং বাম হাত ভেঙ্গে যায়।

মারের চোটে আমি চিৎকার করে এক সময় বলেছিলাম যে আল্লাহ যেনো এর বিচার করেন এবং তা তিনি করবেন। একথা শুনে তারা আমাকে ছেড়ে দেয়। এই সুযোগে আমি আমার বাড়ির ভিতর প্রবেশ করি।

বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে আমি দেখতে পাই যে আমি গুলি করার জন্য ২/৩ জন সিপাই রাইফেল নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে। সুতরাং আমি বিলম্ব না করে প্রতিবেশী জনৈক মহিলার সাহায্যে বাড়ির পিছন দিক দিয়ে পালিয়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নেই। এবং তিন মাস বাইরে থেকে আমি আত্মরক্ষা করি।
স্বাক্ষর/-
আক্কাস আলী

।। ১০৩ ।।
মোছাম্মৎ এসবাহাতুন
গ্রাম- নতুন ভাঙ্গাবাড়ী
থানা ও ডাকঘর- সিরাজগঞ্জ
জেলা- পাবনা
১৯৭১ সালের জুলাই মাসে পাক বাহিনী আমার বাবার বাড়ি নতুন ভাঙ্গারাড়ীতে প্রায় ৫০/৬০ জন অপারেশনে যায়। আমি আমার বাবার বাড়িতে পাঁচ মাসের একটি ছেলে নিয়ে ঘরের মধ্যে বসে আছি। আমার সাথে আরও ৮/১০ জন মহিলা ঘরের মধ্যে বসে গল্প করছে। এমন সময় আমাদের বাড়ির মধ্যে দুই জন পাক সেনা ঢুকে পড়ে। তারা ঢুকে পড়ার সাথে সাথে অন্যান্য যে মেয়েরা ছিল তারা মিলিটারী দেখে দৌড়াদৌড়ি করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু আমার কোলে বাচ্চা থাকার জন্য আমি বেরুতে পারি নি। পাক সেনারা দুই-দুইজন আমার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আমার বাবা ও ভাই এসে বাঁধা দিতে চাইলে একজন পাকসেনা তাদের বুকে রাইফেল ধরে রাখে আর একজন আমাকে ঘরের মধ্যে ধরে ফেলে আমার নিকট হতে আমার পাঁচ মাসের বাচ্চা ছিনিয়ে নিয়ে বিছানার উপর ফেলে দিয়ে আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। আমার শিশু সন্তান কাঁদতে থাকে। তারপর সে আমার বাবা ও ভাইয়ের বুকে রাইফেল ধরে। অন্য জন এসে আবার পাশবিক অত্যাচার শুরু করে। দুইজন মিলে প্রায় এক ঘন্টা আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। তারপর তারা চলে যায়। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকি। তার আধ ঘন্টা পর আমার জ্ঞান ফিরে পাই।

স্বাক্ষর/-
মোছাম্মৎ এসবাহাতুন

।। ১০৪।।
মোছাম্মৎ রহিমা খাতুন
গ্রাম- আউনদাউন
ডাকঘর- বাগবাটি
থানা- সিরাজগঞ্জ
জেলা- পাবনা

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে একদিন ভোররাতে প্রায় ৫০/৬০ জন পাক সেনা আমার স্বামীর গ্রামে অর্থাৎ আউনদাউন নামক গ্রামে যায়। আমি ৭ মাসের শিশুসহ ঘুমিয়ে আছি। ভোর রাত্রিতে আমার স্বামী মিলিটারীর শব্দ পেয়ে ঘর হতে বেরিয়ে পালিয়ে যায়। ৭ জন পাক সেনা আমার বাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং ঘরের দরজায় লাথি মেরে দরজা খুলে ফেলে এবং আমার শিশু সন্তানকে আমার নিকট থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে মাটির সাথে আছাড় দিয়ে হত্যা করে। তারপর আমাকে এক এক করে ৭ জন পাক সেনা পাশবিক অত্যাচার করে। প্রায় ২/৩ ঘন্টা আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তার আধঘন্টা পর আমি জ্ঞান ফিরে পেয়ে শুনতে পাই যে আমার তিনজন জা’কে পাক সেনারা জোর করে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আর তাদের কোন খোঁজ খবর পাওয়া যায় নাই। একই দিনে ঐ গ্রামের প্রায় ১০/১২ জন মহিলার উপর পাশবিক অত্যাচার করে এবং প্রায় ৭ জন মহিলাকে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেশ কিছু দিন চিকিৎসা হবার পর আমি সুস্থ হয়ে উঠি/

টিপসহি/-
মোছাম্মৎ রহিমা খাতুন
১৭/১০/১৯৭৩

।। ১০৫ ।।
মোঃ নজরুল ইসলাম বুলবুল
গ্রাম- চরনবীপুর
থানা- শাহাজাদপুর
জেলা- পাবনা

২৬ শে এপ্রিল পাক বাহিনী বাঘাবাড়ী ঘাঁটি অতিক্রম করে বগুড়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বাঘাবাড়ী থেকে বগুড়া যাওয়ার পথে বিরাট সাঁজোয়া বাহিনীর এই দলটি প্রতিরোধের আশঙ্কায় রাস্তার দু’ধারে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগুতে থাকে। ২৬শে এপ্রিল সকাল ৮টার দিকে পাক বাহিনীর একটি দল করতোয়া নদীর পাড়ে গাড়াদহ খেয়াঘাটে তাবু খাটায়। এবং এখান থেকে পাশবর্তী গ্রামসমূহে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করবার চেষ্টা করে। এদিকে পাক বাহিনীর অপর একটি অগ্রগামী দল উল্লাপাড়া স্টেশন থেকে বিশেষ ট্রেন নিয়ে সিরাজগঞ্জের দিকে যাত্রা করে। পথে ঘাটিনা ব্রিজের কাছে তারা মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। মুক্তিবাহিনী ব্রিজের অপর পাড় থেকে গেরিলা কায়দায় গুলি ছুড়তে থাকে। পাক সেনারা মুক্তিবাহিনীর এই অতর্কিত আক্রমণ বুঝতে পারেনি। ফলে যে ক’জন পাক সেনা ব্রিজ ভাল আছে কিনা দেখার জন্য ট্রেন থেকে নিচে নেমেছিল তারা সবাই নিহত হয়। এখানে নিহতের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ জনের মত জানা গেছে।

এরপর ট্রেনটি উল্লাপাড়া স্টেশনে ফিরে যায় এবং বিরাট একটা দল নিয়ে পুনরায় মুক্তিবাহিনীকে আক্রমণ করে। মুক্তিবাহিনী তখন সেখানে ছিল না। ফলে আশেপাশের চার পাঁচটি গ্রাম তারা পুড়িয়ে দেয়।

গাড়াদহ খেয়াঘাট থেকে ঘাটিনা ব্রিজের দূরত্ব প্রায় ৫ মাইল। পাক বাহিনী মুক্তিবাহিনীর মোকাবেলায় রকেট শেল ছুড়বার জন্য গাড়াদহে আস্তানা গাড়ে। এবং একদিন সকাল থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত একটানা রকেট শেল ছুড়তে থাকে। এদিকে আশেপাশের গ্রামের জনসাধারণ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে থাকে। আশেপাশের গ্রাম থেকে লোকজন সরে যাওয়ায় লুটপাট যাতে না হয় সেজন্য চরনবীপুর প্রগতি সংঘের সদস্যবৃন্দ গ্রাম পাহারা দিতে থাকে। এসময় তারা গাড়াদহ বাজার লুট করে এবং বাজারের দোকানপাট পুড়িয়ে দেয়। এই গ্রামের প্রায় এক ডজন (১২) নিম্ন ও মধ্য শ্রেণীর হিন্দু বাড়ি পাক বাহিনী জ্বালিয়ে দেয়। এবং রাস্তার আশেপাশে যাদেরকে পায় তাদের মারধর করে।

এসময় অগ্রবর্তী দলটি উল্লাপাড়া স্টেশনে সি, এন্ড, বি এর ডাক বাংলোয় তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। একদিন গাড়াদহ থেকে উল্লাপাড়া যাওয়ার দুর্গানগরের কাছে রাস্তায় এক বৃদ্ধকে পাক বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। আমাদের চরনবীপুর গ্রামের প্রাথমিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুস সামাদ তার শ্বশুরবাড়ি চড়িয়াতে ছিল। পাক বাহিনী এই গ্রামে ঢুকে গ্রামের প্রায় ৩০ জন লোককে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। আব্দুস সামাদ নিজেকে বাঁচানোর জন্য একটি পুকুরের মধ্যে নেমে পড়ে এবং মাথা ডুবিয়ে রাখে। তার ছোট ছেলে বাবার খোঁজে পুকুর পাড়ে যায় এবং আব্বা আব্বা বলে ডাকতে থাকে। ঠিক এই সময় একজন পাক সেনা পুকুরের পাড়ে আসে এবং আব্দুস সামাদকে পুকুর থেকে ডাঙ্গায় তুলে। তাকে মুসলমান কিনা জিজ্ঞাসা করা হলে সে মুসলমান বলে পরিচয় দেয় এবং পবিত্র কোরআন শরীফ থেকে পড়ে শোনায়। এতেও পাক সেনাদের বিশ্বাস হয় না। পরে তাকে অজু করতে বলে। আব্দুস সামাদ যথারীতি অজু করে এবং তার গায়ে রাখা হাজী রুমালটি দিয়ে মাথা ঢাকে ও কালেমা পড়তে থাকে। কিন্তু এতে করেও পাক বাহিনী তাকে রেহাই দেয়নি। এই গ্রামের অন্য ত্রিশ জনের (৩০) সাথে তাকেও লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ নজরুল ইসলাম বুলবুল
০৮/০৫/১৯৭৪

।। ১০৬ ।।
সামছুজ্জোহা আলমাজী
শাহজাদপুর
পাবনা

১৯৭১ সালের ৬ ই সেপ্টেম্বর ৬/৭ জন রাজাকার আমাকে দিভার রোডে ধরে এবং অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে এবং আমাকে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে গিয়ে আমার দুই হাত একত্রিত করে বাঁধে। তারপর রাজাকার কমান্ডার মজিবর রহমান আমাকে জিজ্ঞাসা করে তোমার কাছে কয়টা রাইফেল আছে? কয়টা গ্রেনেড আছে ও কয়টা হাত বোমা আছে এবং তুমি মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করো। এবং তাদের কাছে আমাদের গোপন খবরাখবর পাঠিয়ে দাও। আমি তার জবাবে উত্তর করি আমার কাছে দুইটা বন্দুক আছে তা আমার নিজস্ব এবং তার মধ্যে একটা থানায় জমা দেওয়া হয়েছে এবং অন্যটা আমাদের বাসায় আছে। তারপর দুইজন রাজাকার এসে আমাকে কিল, চড়, ঘুষি মারতে থাকে। বেশ আধা ঘন্টা শারীরিক নির্যাতন চালানোর পর আমাকে একটা ঘরের মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে গিয়ে দুইজন রাজাকার আমাকে লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রহার করে। তারপর সন্ধ্যা হয়ে আসাতে তারা প্রহার করা বাদ দিয়ে উক্ত ঘরের মধ্যে একটা জানালার শিকের সাথে বেঁধে রেখে ঘরে একটা বাতি জ্বেলে রেখে যায়। তার ১০/১৫ মিনিট পর একজন রাজাকার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেই বাতি নিভিয়ে দিয়ে যায়। তার ৫/৭ মিনিট পর এক এক করে ৪/৫ জন রাজাকার আমার উপর চড়, কিল, ঘুষি, লাথি ও লাঠি দিয়ে প্রহার করার পর তারা চলে যায়। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তার আধা ঘন্টা পর আমি জ্ঞান ফিরে পাই। পরদিন সকাল বেলা পাক সেনাদের দুটি গাড়ি রাজাকার ক্যাম্পে এসে পৌঁছে। এসেই আমাদেরকে হাত বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেয়ে পাক সেনারা রাজাকারদের সাথে আমাকে নিয়ে হাস্যরস করে। তারপর রাজাকার কমান্ডারের সাথে আলাপ-আলোচনা করার পর তাদের গাড়িতে করে আমাকে ও আরও একজনকে উল্লাপাড়া নিয়ে যাবার সময় রাস্তায় পাক সেনারা কিল, ঘুষি, চড়, লাথি মারে। কিন্তু হাবিলদারের আমার প্রতি কঠোর দৃষ্টি থাকার জন্য আমাকে বিশেষ প্রহার করার সুযোগ সুবিধা পায় না। আমাকে উল্লাপাড়া নিয়ে গিয়ে একটা রুমের মধ্যে নিয়ে বন্দী অবস্থায় রেখে দেয়। রাত্রিতে ২/৩ জন পাক সেনা আমার নিকট যায় এবং লাথির পর লাথি দেবার পর আমাকে মেঝেতে শুইয়ে পাক সেনারা বুট পায়ে দিয়ে আমার বুকের উপরে উঠে পাড়াতে থাকে। এইভাবে ৪/৫ জন পাক সেনা আমার শরীরের উপর উঠলে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তারপর কখন যে তারা আমার উপর নির্যাতন করা বাদ দিয়েছে তা আর আমার স্মরণ নেই। রাত্রি দুইটার সময় আমি জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখতে পাই যে কোন লোক রুমের মধ্যে নেই। পর দিন সকালে হাবিলদার আমার সাথে দেখা করে। আমি তাকে আমার নির্যাতনের ঘটনার কথা খুলে বলি। তারপর সে ক্যাপ্টেনকে সাথে করে আমার রুমে আসে এবং আমার শরীরে শত শত প্রহারের দাগ দেখে তার সিপাহীদেরকে শাসিয়ে দেয় এবং আমার উপর যেন কোন অত্যাচার বা নির্যাতন না করা হয় তাও বলে দেয়। তারপর ক্যাপ্টেনের নির্দেশে একজন ডাক্তার ঔষধপাতি নিয়ে আমার রুমে ঢোকেন এবং আমার শরীর পরীক্ষা করার পর কয়েকটা ইঞ্জেকশন ও কিছু মালিশ দিয়ে যান। তারপর আমি ঐগুলি ব্যবহার করতে থাকি। তারপর হতে আমার উপর শারীরিক কোন নির্যাতন করা হয় না। তিন দিনের দিন একজন হাবিলদার আমার নিকট যায় এবং আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আপনার নিকট রাইফেল নাই, গ্রেনেড নাই। তার জবাবে আমি না বলাতে সে চলে যায়। তার কিছুদিন পর আমাকে বন্দীশালা হতে বের করে বাইরে নিয়ে যায়। সেই দিন শাহজাদপুর হতে একজন লোককে ধরে নিয়ে যায়। ক্যাপ্টেন খালেক আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে, বাবলু এই লোকটাকে তুমি চেনো? আমি উত্তর করি না। তারপর আমাকে আমার বন্দী ঘরের মধ্যে নিয়ে রেখে দেয়। আর আমার সাথে যে লোকটা বন্দী ছিল তাকে বের করে বাইরে রাখে।

১৩ ই সেপ্টেম্বর কয়েকজন পাক সেনা বন্দী ঘর হতে বের করে নিয়ে যায় এবং আমাকে বলে তোমাকে ক্যাপ্টেন ডাকে। আমি তাদের সাথে যাই। গিয়ে দেখি সেখানে ক্যাপ্টেন, রাজাকার কমান্ডার ও হাবিলদার বসে আছে। আমি সেখানে যাওয়ার সাথে সাথে কেঁদে ফেলি। ক্যাপ্টেন আমাকে ধমক দিয়ে বলে যে তুমি পাকিস্তান জিন্দাবাদ, কায়েদ আযম জিন্দাবাদ ইত্যাদি জোরে জোরে বল। আমি উক্ত কথা বলাতে ক্যাপ্টেন আমাকে মুক্তি দেয়। এবং আমার একটা আংটি তার নিকট ছিল তাও দিয়ে দেয়। আমি বাড়ি চলে আসি। আমাকে ধরার প্রধান কারণ ছিল আমি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে গোপনে খেতে দিতাম এবং তাদেরকে জায়গা দিতাম এবং পাক সেনা ও রাজাকারদের গোপন সংবাদ তাদের নিকট পৌঁছে দিতাম। যার ফলে রাজাকাররা আমাকে বন্দী করে এবং নিজেরা নির্যাতন করার পর পাক সেনাদের হাতে তুলে দেয়।

স্বাক্ষর/-
সামছুজ্জোহা আলমাজী (বাবলু)
শাহজাদপুর
দ্বারিয়াপুর
পাবনা
০৮/১২/১৯৭৩

।। ১০৭ ।।
গোলজার হোসেন
গ্রাম- পূর্ব মহেশপুর
ডাকঘর- দুর্গানগর
থানা- উল্লাপাড়া
জেলা- পাবনা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমি, ইয়াকুব ও আবু সামা গেঞ্জির ব্যবসা শুরু করি।

আগস্ট মাসে আমরা গেঞ্জি বিক্রয় করার জন্য উল্লাপাড়া হাটের উদ্দেশ্যে বাড়ি হত্র রওয়ানা হয়ে যাই। উল্লাপাড়া পেট্রোল পাম্পের নিকট পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল, তারা আমাদেরকে ধরে ফেলে এবং আমাদের অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসাবাদ করে। যেমন
(ক) ভোট কাকে দিয়েছ?
(খ) নৌকায় কেন ভোট দিলে?
(গ) শেখ মুজিবকে কেন ভোট দিলে?
ইত্যাদি জিজ্ঞাসাবাদ করার পর আমাদের তিনজনের টাকা পয়সা মিলে প্রায় ১৫০ টাকা চার্জ করে নেয়। সেখানে ৪/৫ জন বিহারী উপস্থিত ছিল। তারপর আমাদের ছেড়ে দিলে আমরা ক্যাম্প পার হয়ে ৯/১০ গজ অতিক্রম করার সাথে সাথে উক্ত বিহারী কয়জন দৌড়িয়ে আমাদের নিকট যায় এবং আমাদেরকে ডেকে নিয়ে উল্লাপাড়া স্টেশন ঘরের মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে বিশ্রামাগারের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাইরে এসে আলাপ আলোচনা করে আমাদেরকে মেরে ফেলবে না বাঁচিয়ে রাখবে। আমরা দরজার নিকট এসে তাদের কথাবার্তা সব শুনতে পাই। তারপর সিদ্ধান্ত নেয় আমাদেরকে হত্যা করবে। আমরা তিনজন চিন্তা ভাবনা করি কি করা যায় এখন। এমন সময় দরজা খুলে আবু সামাকে রুম হতে গলায় দড়ি লাগিয়ে বের করে নেয় এবং আমাদেরকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে যায়। তারপর আবু সামার সমস্ত শরীরে বেয়োনেট চার্জ করে পরে গরু জবাই করার মত গলায় ছুরি দিয়ে জবাই করে তাকে হত্যা করে।

তারপর আবার এসে দরজা খোলে এবং ইয়াকুবকে বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় আমি বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি এবং আমাকে ২/৩ জন ধরে রাখার চেষ্টা করলে মরণপণ লড়াই করে জোরপূর্বক ৪/৫ টা লাথি মেরে এক দৌড়ে বালসা বাড়ি এসে পড়ে যাই এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। উক্ত গ্রামের তিনজন ছেলে আমার ক্লাসমেট ছিল। তারা আমাকে দেখে সেবা যত্ন করে। জ্ঞান ফিরে পেলে আমাকে আমাদের বাড়ি এনে রেখে যায়। ইয়াকুব তাদের হাত হতে মুক্তি পায়নি। তারা ইয়াকুবকে নিয়ে গিয়ে আবু সামার মত একই পদ্ধতিতে হত্যা করে দুইজনকে একই স্থানে ফেলে রাখে এবং আমাদের তিনজনের প্রায় ১৫০/২০০ টাকার গেঞ্জি তারা নিয়ে যায়।

আমি বাড়ি আসার পর সমস্ত ঘটনা খুলে বলি। গ্রাম হতে ৪/৫ জন লোক মিলিটারী ক্যাম্পে যায় উক্ত লাশগুলো এনে কবর দেবার অনুমতির জন্য। তারপর একটা ট্রাকে করে উক্ত লাশগুলো মহেশপুর লাইনে এনে রেখে যায়। গ্রামবাসী সেখান হতে লাশ দুটো তাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। বাড়ি আনার পর আমরা দেখতে পাই আবু সামার ও ইয়াকুবের সমস্ত শরীরে প্রায় শতাধিক বেয়োনেটের চিহ্ন এবং গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যা করেছে তার চিহ্ন দেখা যায়। তারপর তাদেরকে গ্রামবাসী কবর দেন। আবু সামার স্ত্রী বর্তমানে ৪/৫ জন ছেলে মেয়ে নিয়ে বিধবা হয়েছে। আর ইয়াকুব আই,এ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। আমি ইনশা আল্লাহ পাক হানাদার বাহিনীর সহযোগীদের হাত হতে কোন প্রকারে রক্ষা পেয়েছিলাম।

স্বাক্ষর/-
গোলজার হোসেন
২৪/১১/১৯৭৩

।। ১০৮ ।।
মৌলভী মোঃ বছির উদ্দিন আহমেদ
গ্রাম- বড় মনোহারা
পোষ্ট- দুর্গানগর
থানা- উল্লাপাড়া
জেলা পাবনা

একদিন (জুলাই মাসে) উল্লাপাড়া রেল স্টেশনে দাড়িয়ে ছিলাম। এমন সময় একজন রাজাকার ও ৭/৮ জন পাক আর্মি আমাকে ধরে ফেলে এবং বলে যে আমি ভণ্ড ধার্মিক, আমি “মুক্তিকা স্পাই”। আমাকে প্রথমে উল্লাপাড়া মিলিটারী ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে প্রথমে জিজ্ঞাসা করে যে তুমি কাকে ভোট দিয়েছ। আমি উত্তরে বলি যে “নৌকায়”। এই সময় আমাকে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলার জন্য বলে। কিন্তু আমি তা বলি না। আমার মুখে একই বুলি ছিল যে “যা হবার তা হয়ে যাবে আল্লাহ”, “জোর করে কয়দিন রাখবে আল্লাহ”, “নৌকা মার্কায় ভোট দিছি আল্লাহ” ইত্যাদি।

তখন পাক বর্বর বাহিনী আমার হাত পিছনে বেঁধে দুই পা বেঁধে উল্টো করে গাছে সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়। এবং চাবুক দ্বারা প্রহার করতে থাকে। কিন্তু আমার মুখে ঐ এক কথা।

দুদিন পর আমাকে সিরাজগঞ্জ নিয়ে যায়। সেখানে আমি দাড়ি-চুল ছোট করে দেওয়া হয়। আমাকে দিয়ে সিমেন্টের বস্তা টানায়। এই সময় আমাকে নামাজ পড়তে দিত না। তারা নিয়মিতভাবে প্রহার করত। ফলে আমার পিঠে তিনটা বড় রকমের গর্ত হয়ে যায়। আমি ভীষণ ভাবে কাতর হয়ে পড়ি, তবুও আমাকে রেহাই দেওয়া হত না। আমার মুখে চুন ও কালি মেখে রাজাকাররা শহরের মধ্যে ঘুরতো। আমার কপালের উপর খাপড়া রেখে সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করিয়ে রাখতো। এই সময় আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতো।

১৫ দিন পর একটা মেজর এসে আমাকে বলে যে আমি আপনাকে বহুদিন আগে থেকেই চিনি। আপনি যে একটা “দরবেশ” লোক তাও আমি জানি। কিন্তু এরা আপনাকে না জেনে ধরে এনেছে এবং মারধর করেছে। তার জন্য আমি দুঃখিত। আমরা খাঁটি মুসলমানদের উপর কোনরূপ অত্যাচার করব না। আমরা শুধু কাফের ও হিন্দুকে মারব। এই বলে আমাকে ছেড়ে দেয় ও সিরাজগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়।

স্বাক্ষর/-
বছির উদ্দিন আহমেদ

।। ১০৯ ।।
মোঃ ফজলুল করিম তালুকদার
গ্রাম- চর মোহনপুর
থানা- উল্লাপাড়া
জেলা- পাবনা

ভাদ্র মাসের ৩ তারিখে ভোর ৬টার সময় পাক দালালদের সহযোগিতায় নৌকাযোগে চর মোহনপুর গ্রাম ঘেরাও করে। গ্রামের চারিদিকে ঘেরাও করে মোট ১৭ জনকে ধরে। এর মধ্যে একজন ছিল হিন্দু। ১৭ জনকে ধরে প্রথমে লাহিড়ী মোহনপুর স্টেশনের একটা ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখে। তারপর ব্রেক গাড়িতে উঠায়। তারপর তাদেরকে প্রথম প্রশ্ন করে যে তোমরা ভোট দিয়েছো কাকে। তার জবাবে তারা উত্তর দেন যে আমরা সবাই বাঘে ভোট দিয়েছি। তখন তারা বলে যে শালারা সবাই বাঘে ভোট দিয়েছো তবে এই এলাকায় বাঘে ৬ ভোট পেলো কি করে। এই বলেই পাক কুকুরেরা রাইফেলের বাঁট দিয়ে ও মাজার বেল্ট দিয়ে মারতে থাকে। পর্যায়ক্রমে ১০/১২ জন মিলিটারী মারধোর করে।

সারা রাত্রি তাদেরকে গাড়ির ভিতর আটকে রাখে। সকাল বেলা উল্লাপাড়া ক্যান্টনমেন্টে মেজরের সামনে হাজির করে। সেখানে তাদেরকে বলে যে তোমরা মুক্তিযোদ্ধা। তোমরা বিহারীদেরকে মেরেছো ইত্যাদি ইত্যাদি বলে তাদেরকে প্রহার করতে থাকে। একদিন পর তাদেরকে নিয়ে যায় পাকশী, সেখানে একটা অন্ধকার কক্ষে তাদের সবাইকে আটকিয়ে রাখে। ২ দিন পর একটা রুটি খেতে দেয়। যেখানে থাকা সেখানেই পায়খানা প্রশ্রাব করতে হত। তাদেরকে দুই পা ফাঁক করে এবং দুই হাত ফাঁক করে দাঁড় করিয়ে রাখতো ৫/৬ ঘন্টা করে। পাকশীতে তারা ৫ দিন ছিল। এই সময় প্রত্যেক দিন তাদের উপর অকথ্য অত্যাচার করা হত। তাদেরকে প্রশ্ন করত যে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানকেকে হত্যা করেছে। কার কার ছেলে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। কে কে আওয়ামী লীগের লিডার, কে কে হিন্দু ইত্যাদি। কিন্তু তারা সে কথা বলতে অস্বীকার করাতে তাদের উপর চালাতো অকথ্য নির্যাতন। ৫ দিন পর ২ জন বিহারী ও একজন খান তার নাম হান্নান খান তাদের সহায়তায় তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২ জন বিহারী ও খান সাহেব পাকশীতে গিয়ে মেজরের কাছে বলে যে এই সব লোক ভাল। এরা আমাদেরকে রক্ষা করেছে। এরা সৎ লোক। এই লোকগুলোকে যদি মারেন তাহলে আমাদের তিনজন অবাঙ্গালীকে আগে মারেন। এদের কথার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ছেড়ে দেয়।

তাদের যখন ছেড়ে দেয় তখন বলে দেয় যে তোমরা শান্তি কমিটির সাথে যোগাযোগ রাখ এবং লোকজনকে বুঝাও। যদি তা না কর তবে তোমাদেরকে পুনরায় ধরব এবং সেবার তোমাদেরকে হত্যা করব। চেয়ারম্যানের কথা মত সব কাজ করবে।

স্বাক্ষর/-
মোঃ ফজলুল করিম তালুকদার

।। ১১০ ।।
শ্রী তারাপদ কুন্ডু
গ্রাম- আগ মোহনপুর
থানা- উল্লাপাড়া
জেলা- পাবনা

জুন মাসের মাঝামাঝি একদিন ভোর ৬ টার সময় আগ মোহনপুর গ্রামে পাক বর্বর বাহিনী ঘেরাও করে। তারা প্রথমে লুটতরাজ ও পরে অগ্নিসংযোগ করে। এই সময় আগ মোহনপুর গ্রাম হতে ৮/৯ লোককে পাক বাহিনী আটক করে। তার মধ্যে আমি ছিলাম একজন। আমার একমাত্র অপরাধ আমি তাদের কথায় “মালাউন”। আমাকে প্রথমে লাহিড়ী মোহনপুর দুধের মিলের নিকট আর্মি ক্যাম্প ছিল সেখানে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে হাত-পা বেঁধে দুপুরে রোদের ভিতর চিৎ করে শুইয়ে রাখে এবং পরে আমাকে চাবুক দ্বারা প্রহার করে। আমাকে যখন প্রহার করে তখন আমি মাঝে মাঝে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। সবার ভিতর হতে একজন বর্বর আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে, ম্যায় জান্তাহু তোমহারা বড়া বড়া দো লাড়কি হ্যায়। যদি তুমি তাদের এখানে ডেকে আনতে পারো তবে তোমাকে ছেড়ে দেব।

দুইদিন আমাকে এইভাবে পিঠমোড়া করে বেঁধে রাখে। এই দুই দিন আমাকে কিছুই খেতে দেয় নাই। আমি তাদেরকে অনেক অনুনয় বিনয় করেছি যে আমি বৃদ্ধ মানুষ, আমাকে এইভাবে কষ্ট দিলে ভগবান নারাজ হবে। তবুও আমাকে খেতে দেয়নাই। দুইদিন পর আমাকে একটা রুটি খেতে দেয়।

তিনদিন পর আমাকে সিরাজগঞ্জ চালান করে দেয়। সিরাজগঞ্জ যাবার পর আমার উপর পর্যায়ক্রমে অমানুষিক অত্যাচার চলতে থাকে। আমার মত বৃদ্ধ মানুষও ঐ পাক বর্বরদের হাত থেকে রেহাই পায় নাই। সিরাজগঞ্জ জেলে থাকা অবস্থায় আমি অনেক লোককে শুধু পিটিয়ে মেরে ফেলতে দেখেছি। চাকু দিয়ে সারা শরীর ফেড়ে লবণ লাগিয়ে দিতেও আমি দেখেছি।

দুই মাস আমি জেলে ছিলাম। এই সময় আমাকে যখন তখন পিটাতো। দুই মাস পরে যখন আমি ধীরে ধীরে পীড়িত হয়ে পড়ি তখন আমাকে ছেড়ে দেয়। আমার সারা শরীরে এখনও ক্ষতের চিহ্ন বর্তমান।

স্বাক্ষর/-
শ্রী তারাপদ কুন্ডু

।। ১১১ ।।
মোঃ হাবিবুর রহমান
গ্রাম- মাছিয়াকন্দি
থানা- উল্লাপাড়া
জেলা- পাবনা

১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের ১৯ তারিখে সকাল বেলা দূরবর্তী ধানগড়া ক্যাম্প থেকে একদল পাকিস্তানী খান সেনা আমার বাড়ি ঘেরাও করে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। ধানগড়া ক্যাম্পে নিয়ে যাবার সময় বুটের লাথি, রাইফেলের আঘাত এবং অসংখ্য ঘুষি ও চড় মারে। খান সেনাদের ভীষণ আঘাতের ফলে আমি মাটিতে পড়ে যাই। পুনরায় বুটের লাথিতে জীবনের ভয়ে আধমরা অবস্থায় তাদের সাথে ক্যাম্পে যেতে বাধ্য হই। ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে পুনরায় লোহার রড ও রাইফেল দিয়ে মারপিট করে। খান কুকুরেরা আমাকে এমনভাবে মেরেছিল যে আমার শরীর মাংস ঝলসে যায়। বুকে রাইফেল দিয়ে জোরে আঘাত করার ফলে আমার বুকের হাড়খানা সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে যায়। প্রথম সিনে ক্যাম্পে নিয়ে যাবার পর একবারই ভীষণভাবে মারপিট করেছিল। পরে সেদিনের মত খান কুকুরেরা আর মারপিট না করে ক্ষান্ত রাখে। পরের দিন অর্থাৎ ২০ তারিখ সকালে আবার ভীষণভাবে দেহে বাঁশ দিয়ে চাপা দিয়ে শরীরের উপর দুইজন খান সেনা উঠে দাঁড়িয়ে থাকে। আমার কাছে মুক্তিদের সন্ধান চাইলে আমি অস্বীকার করার দরুন এইরূপ শাস্তি প্রদান করত। উক্ত ক্যাম্পে আমি দুই রাত ছিলাম। এই দুইদিনের ভিতর আমি অনুমান করি যে, ২৫ থেকে ৩০ জন লোক প্রত্যহ ধরে এনে বেয়োনেট এবং রাইফেল দিয়ে সারিবদ্ধ অবস্থায় গুলি করে হত্যা করে। খান সেনারা আমাকে বলে যে, তুমি যদি মুক্তিদের সন্ধান না দিতে পারো তাহলে তোমার অবস্থাও এমনি হবে। ২১ তারিখে সকাল বেলায় আমি মুক্তি পাই।

স্বাক্ষর/-
মোঃ হাবিবুর রহমান

।। ১১২ ।।
খন্দকার জিল্লুর রহমান
গ্রাম- রামেরচর
থানা- উল্লাপাড়া
জেলা- পাবনা

১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের ১৮ তারিখে মুসলিম লীগের দালালদের চক্রান্তের ফলে ধানগড়া খান সেনাদের ক্যাম্প থেকে ১৭ জন খান সেনা ও ৭/৮ জন রাজাকার রাত্রি ৩ টা ৩০ মিনিট সময় আমার বাড়ি ঘিরে ফেলে। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, আমি স্থানীয় সলঙ্গা বাজারে একটি সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলি, তাছাড়া আমার বাড়িতেই মুক্তিরা গোপনে আসা যাওয়া করত এবং আমি সর্বরকমে তাদেরকে সহায়তা করতাম। এই সংবাদ শ্রবণমাত্রই দালালরা আমার বাড়িতে খান কুকুরদের লেলিয়ে দেয়। দূর্ভাগ্যবশত আমি ঐ রাত্রে নৌকা থেকে বাড়ির উপর উঠতেই খান দস্যুরা আমাকে ধরে ফেলে। অতঃপর তারা আমাকে কিছুপথ নৌকায় ও অবশিষ্ট রাস্তা পায়ে হাঁটিয়ে ধানগড়া ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ধরার সাথে সাথে আমার বাড়ি থেকে ২০/২৫ হাজার টাকার সোনার গহনা খান কুকুরেরা নিয়ে যায়। ক্যাম্পে নেয়ার পর আমার চোখ-মুখ তোয়ালে দিয়ে বেঁধে মাথার উপর বালতি ভরে ভরে পানি ঢালা আরম্ভ করে। মুখ বেঁধে মাথার উপর পানি ঢাললে মানুষের কি অবস্থা হতে পারে ভুক্তভোগী ছাড়া কেউই বুঝতে পারে না।

এমতবস্থায় আমি আর নিঃশ্বাস ফেলতে পারছিলাম না, ঠিক ঐ সময় সাহসের উপর ভরসা করে বা জীবন যায় যাবে এই মত করে আমি তোয়ালে মাথা থেকে টেনে ছিঁড়ে ফেলি। অতঃপর খান কুকুরেরা আমাকে মোটা একটি বাঁশ দিয়ে পিঠের উপর ভীষণভাবে আঘাত করতে থাকে। তাছাড়া রাইফেল ও বুটের লাথিতে আমার পিঠের চামড়া ছিঁড়ে যায়। পিঠে রক্ত জমে যায়। খান কুকুররা এমনভাবে বুট দিয়ে লাথি মারে যে, ঐ লাথি খেয়েই উপুর হয়ে পড়ে যাই এবং আমার ডান হাতখানি সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে যায়। এইভাবে আমাকে ভীষণ প্রহার করত। আমি যখন খান দস্যুদের ভীষণ মারপিটের ফলে অজ্ঞান হয়ে পড়তাম তখন কুকুরেরা মারপিট বন্ধ করে দিত। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে যে, আমার সাথে আমার ছোট ভাই তোতাকেও ধরে নিয়ে যায়। এবং তাকেও রাইফেল, বুট ও লোহার রড দিয়ে ভীষণভাবে মারপিট করে। এমনভাবে তারা মেরেছিল যে, আমার ছোট ভাইটি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। তার সারা দেহে জখমের দাগ ছিল। খান দস্যুরা আমার ছোট ভাইকে দিয়ে লোহার রডের সাহায্যে আমাকে পিটাত। যখন সে অস্বীকার করত তখন তাকেও বেদম মারপিট করত। বাধ্য হয়ে সে সম্ভবত বড় ভাইকে মারপিট করত। অতঃপর দুই ভাইয়ের নিকট থেকে মুক্তিদের খোঁজ খবর জানার জন্য খানেরা আমাকে নিয়ে পুনরায় সলঙ্গা বাজারের দিকে চলে আসে। সেখানে গোলবার ডাক্তার নামক এক ব্যাক্তিকে ধরে ভীষণভাবে মারপিট করে ছেড়ে দেয়। পরপরই তারা মাছুয়াকান্দি গ্রামে ঢুকে পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরার জন্য। কোনও রকম মুক্তিযোদ্ধাকে না পেয়ে পুনরায় আমাদেরকে ধানগড়া ক্যাম্পে নিয়ে যায়। নেওয়ার পরেও দু’ভাইকে আবার বুটের লাথি দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে দেয়। প্রায় দুই রাত থাকার পর শান্তি কমিটির সদস্য মৌঃ আব্দুল করিম, মৌঃ গোলাম মাহমুদ ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের সহায়তায় আমি ও ছোট ভাই কোনরকমে প্রাণে বেঁচে বাড়ি চলে যাই। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, উপরোক্ত ব্যাক্তিরা যদি সহায়তা না করতেন তা হলে কোন ক্রমেই খান দস্যুদের হাত থেকে আমাদের রেহাই হত না।

স্বাক্ষর/-
খন্দকার জিল্লুর রহমান

।। ১১৩ ।।
এস এম আফতাব হোসেন
সাব ইন্সপেক্টর, টি এন্ড টি
গ্রাম- চর মোহনপুর
পোস্ট- লাহিড়ী মোহনপুর
থানা- উল্লাপাড়া
জেলা- পাবনা

মে মাসের ১৩ তারিখে বেলা ১০ টার সময় আমি বাড়িতে বসে ছিলাম। এমন সময় পাক বাহিনী ও অবাঙ্গালী মোট ১০০ জন আমার বাড়ি ঘেরাও করে। আমাকে প্রথমে জিজ্ঞাসা করে যে তুমি ডিউটি থেকে পালিয়ে এসেছো কেন? তার উত্তরে বলি যে সবাই কাজ ছেড়ে পালিয়ে এসেছে আমিও সেই সঙ্গে পালিয়ে এসেছি। এই কথার পরে আমাকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায় এবং রেল গাড়িতে উঠায়। বলা প্রয়োজন যে অবাঙ্গালী ও পাক বাহিনী ট্রেন যোগে মোহনপুর আসে। ট্রেনে তোলার পর আমার উপর অমানুষিক অত্যাচার আরম্ভ করে। কিল, ঘুষি, লাথি এবং চাবুক মারতে থাকে। তারা আমাকে বলে যে,তুমি রাইফেল ট্রেনিং নিয়েছ, তুমি কর্নেল ওসমানীর আদেশ মোতাবেক ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে ১১ জন পাইলটকে গুলি করে মেরেছো এবং আরো চারজন অবাঙ্গালীকে ছুরি দিয়ে হত্যা করেছো। এবং তুমি টেলিফোনের সাহায্যে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছো। এই সব কাজের জন্যই তুমি ভয়ে ডিউটি ছেড়ে পালিয়ে এসেছো। এই সময় কয়েকজন অবাঙ্গালী এই সব কথার উপর সাক্ষ্য প্রদান করে যারা আমারই অধীনস্থ কর্মচারী ছিল।

এই সময় আমাকে দিয়ে এই সমস্ত কথা স্বীকার করায় এবং আমাকে দিয়ে এই কথার উপর একটি লিখিত স্বীকারোক্তি আদায় করে নেয়। আমাকে পাবনাতে তিনদিন রাখে। এই সময় আমাকে একটা অন্ধকার কক্ষে বদ্ধ করে রাখে এবং সময় সময় বের করে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় গাছের সঙ্গে উল্টোভাবে ঝুলিয়ে চাবুক মারত। এখানে তিনদিন রাখার পর আমাকে নাটোর (রাজশাহী) জেলে স্থানান্তর করে। সেখানে ১৪ দিন রাখে। এই সময় আমাকে একই প্রক্রিয়ায় মারধর করে এবং পাক বাহিনীর বাঙ্কার করিয়ে নেয়।

এখানে ১৪ দিন রাখার পর আমার নামে একটা চার্জশিট দিয়ে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে প্রথমে এমুনিশন এরিয়াতে রাখে।

এই সময় আমাকে প্রত্যেক দিন ২ ঘন্টা করে কাজ করাত। এই কাজের মধ্যে ছিল মাটি কাটা, ঘাস কাটা, বাঙ্কার কাটা ইত্যাদি। এছাড়া যখন তখন যে সে এসে আমাকে ভীষণভাবে প্রহার করত। এক এক জন আমাকে এক এক রকম প্রশ্ন করত। আমাকে বলতো, “তোম লোক বাঙ্গালী হ্যায়, তোম লোক হিন্দু হ্যায়, তোম লোককা সর্দার মজিব ভি হিন্দু হ্যায়, ও হামারা পাছ হ্যায়, থোরি দের বাদ ঘর মে লাকে কাপড়া খোলকে দেখিয়ে।” এইসব কথা বলতো আর আমাকে মারধর করত। আমি দেখেছি যে এই অবস্থায় যদি কেউ মারা যেত তবুও তাকে মৃত অবস্থায় গড়াতে গড়াতে ওয়ালের পাশে নিয়ে যেত এবং উক্ত মৃত ব্যাক্তির লাশ মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিত। এই সময় আমাকে এক বেলা খাবার দিত। পায়খানা প্রস্রাবের কোন জায়গা ছিল না। যেখানে থাকা সেখানেই খাওয়া ও পায়খানা প্রস্রাব করতে হতো। এখানে উল্লেখ্য যে, যে ঘরে আমাকে বন্দী করে রেখেছিল, সেখানে আমার খাবার থালায় পায়খানা-প্রস্রাব করতে হতো। সকাল বেলায় তা পরিষ্কার করে তাতেই ভাত খেতে হতো।

আমার সম্মুখে সিরাজগঞ্জের এসডিও জনাব শামসুদ্দিন সাহেবকে মেরে ফেলা হয়। তাকে মাগরেবের দুই রাকাত নামাজ আদায় করার পর কুকুরেরা পিটিয়ে হত্যা করে।

আমাদের যে ঘরে রেখেছিল সে ঘরে খুব বেশী হলে ২০০/২৫০ জন রাখা যায়। সে ঘরে ৭০০ লোককে রেখেছিল।

সময় সময় ঢাকা থেকে ক্যাপিটাল ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চে নিয়ে যেত ইন্টারোগেশন করার জন্য। এখানে নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করা হত যে তোমার উপর যে কেস আছে তা সত্য কিনা। এই সময় একটা ছোট কক্ষে আমার হাত উপরে একটা রডের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে দিত। এবং চোখের ৫/৬ ইঞ্চি দূরে দুই চোখের উপর দুইটা ৬০০ পাওয়ারের ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বালিয়ে রাখতো, সেই লাইটের দিকে চেয়ে থাকতে হত। এই অবস্থায় কোন কোন সময় চাবুক মারতো।

এইভাবে ৬ মাস আমাকে আটকে রেখেছিল এবং প্রত্যেক দিনই আমাকে মারধর করত। ৬ মাস পরে একদিন আমাকেসহ আরও ৬০ জনকে ছেড়ে দেয়। এই সময় তারা বলে যে তোমাদের সবাইকে মাফ করে দেওয়া হল। পুনরায় যেন তোমরা আর ভুল না কর।

স্বাক্ষর/-
এস এম আফতাব হোসেন

।। ১১৪ ।।
মোঃ লালচাঁদ খান
গ্রাম- চড়িয়া মধ্যপাড়া
ডাকঘর- সলংগা
থানা- উল্লাপাড়া
জেলা- পাবনা

১৯৭১ সালের ২৫ শে এপ্রিল পাকবাহিনী অতর্কিত আমাদের গ্রাম আক্রমণ করে। চড়িয়াসিকা সি,এন্ড,বি রাস্তায় থেকে পাকবাহিনী রকেট শেলিং আরম্ভ করে। চার দল পায়ে হাঁটিয়া আমাদের গ্রামে চলিয়া আসে। তাদের দেখিয়া আমাদের গ্রামবাসী মাঠের মধ্যে নামিয়া পড়ে। যখন গ্রামবাসী মাঠের মধ্যে নামিয়া পড়িল তখন পাকবাহিনী শিকার করার মত গুলি আরম্ভ করিল। আর একদল গ্রামের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। অনেক লোক জংগলে পলাইয়াছিল। তাহাদের জংগল হইতে বাহির করিয়া এবং অনেক বাড়ি হইতে বাহির করিয়া লাইন হইতে বলিল। অনেকে প্রাণের ভয়ে লাইন হইতে না চাহিলে তাহাদের গুলি করিয়া হত্যা করে।

১৯৭১ সালের ২৫ শে এপ্রিল রোজ রবিবারের এই দিনটিতে পাকবাহিনী অতর্কিত আমাদের গ্রাম আক্রমণ করে এবং ৫৬ জনকে লাইন করিয়া গুলি করিয়া হত্যা করে। এই তারিখে আমাদের গ্রামের ১৫০ খান বাড়ি জ্বালাইয়া ভস্মীভূত করিয়া দেয়। কোন মহিলার ইজ্জতহানি করে নাই।

স্বাক্ষর/-
মোঃ লালচাঁদ খান

।। ১১৫ ।।
আব্দুল মজিদ মিয়া
গ্রাম- কওয়াক
ডাকঘর- উল্লাপাড়া
জেলা-পাবনা

চাঁদপুরে যখন পাকবাহিনী আসে আমি ওখানে উপস্থিত ছিলাম। চৈত্র মাসের ২২তারিখে এই ঘটনা ঘটে। আমাকে প্রথমে পাকবাহিনী ধরে চোখ বাঁধিয়া পেছন থেকে বেতের লাঠি দিয়ে বেদমভাবে প্রহার করে এবং আমাকে সঙ্গে করে আমাদের গ্রামের বাড়ির দিকে চলে আসে। আমাকে প্রথমে আমার বাড়ী নিয়ে আসে এবং আমাকে বলে তোর বাড়ী থেকে আমাদের হাঁস, মুরগী দিতে হবে। তখন আমি বলি আমার হাঁস মুরগী নাই। এই কথা বলার সাথে সাথে আমাকে এমন প্রহার করল যে তখন আমার আর কোন জ্ঞান ছিল না, আমি তখন অজ্ঞান হয়ে আমার বাড়ীর মধ্যে পড়ে রইলাম। পাকবাহিনী আমাকে তাদের পাদুকা দ্বারা সমস্ত শরীর খোঁচাতে আরম্ভ করল। এবং এমনভাবে প্রহার করল যে আমার নাক, মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসল। পরে আমার প্রাণের ভিক্ষা চাইলাম এবং বললাম আমার দুইটা খাসী আছে আপনারা আমার খাসী দুইটা নিয়ে আমাকে মুক্তি দিয়ে দেন। তখন পাকদস্যু দল আমার দুইটা খাসী নিয়ে আমার বাড়ী থেকে চলে যায়। পাকদস্যু যাওয়ার পর আমার স্ত্রী এসে আমাকে দেখে চিৎকার আরম্ভ করল, চিৎকার শুনে পাড়া প্রতিবেশীরা এসে আমাকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে গেল। আমাকে পাকদস্যু ধরে চৈত্র মাসের ২২ তারিখে সকাল ১০ টার সময়।

এ তারিখে আবার বিকাল ৪ টার সময় পাকদস্যুর অন্য একদল আমার বাড়ীতে আসে। পাকদস্যুদের আসার পূর্বে আমার স্ত্রী অন্য জায়গায় চলে যায়। পাক বর্বররা এসে আমাকে বলে তোর স্ত্রী কোথায়। এই কথা শুনে আবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকি। আবার জ্ঞান যখন ফিরে পাই তখনও দেখি পাক দস্যু আমার বাড়ীর মধ্যে রয়েছে। আমার স্ত্রীকে না পেয়ে আমাকে বাঁশের ফালটা দিয়ে আঘাত আরম্ভ করল। আমি আহত অবস্থায় বললাম আমার স্ত্রী আপনাদের আসা দেখে পালিয়ে অন্য বাড়ীতে গিয়েছে। এই কথা বলার সঙ্গে আমার বাড়ী থেকে অন্য বাড়ীতে চলে গেল।

চৈত্র মাসের ২৬ তারিখে পাকবাহিনী আমাদের গ্রামে আসে। রাস্তার পার্শ্বে আমার বাড়ী প্রথমে আমার বাড়ীতে পাকদস্যু এসে উঠে। উক্ত তারিখেও আমাকে সেই কথা তোর স্ত্রী-পুত্র কোথায়? আমি জবাব দেই আমার স্ত্রী-পুত্র কেউ নাই। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে আবার বেত দ্বারা প্রহার করল এবং পায়ের পাদুকা দ্বারা লাথি মারল। এই লাথি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে থাকি। এইভাবে পাকদস্যু আমাকে দুইবার শারীরিক অত্যাচার করে।

টিপসহি/-
আব্দুল মজিদ মিয়া

।। ১১৬ ।।
শ্রী রথিকৃষ্ণ সাহা
গ্রাম- ভেংড়ী
থানা- উল্লাপাড়া
জেলা- পাবনা

আমি বাড়ীর সবাইকে নিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিলাম উল্লাপাড়া থেকে ৩ মাইল দূরে ভেংড়ী গ্রামে। আমাদের গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারই প্রায় আশ্রয় নিয়েছিল। হারিয়ে গেল আমাদের বাড়ীঘর আর গড়ে তোলা জনসেবা শিবির।

মা-বোনদের পল্লীতে রেখে পালিয়ে পালিয়ে উল্লাপাড়া এসে দেখলাম দস্যুরা বাঙ্গালী ভাইদের ধরে নিয়ে লুট করাচ্ছে ইচ্ছামত আবার গুলি করে বাঙ্গালী ভাইদের মারছে। বিকাল চারটার দিকে দেখতে পেলাম উল্লাপাড়ায় আগুনের লেলিহান, মনে হচ্ছে আগুনও যেন ওদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। সমস্ত পাটের গুদাম, কলেজ, স্কুল, বাড়ীঘর দাউ দাউ করে জ্বলছে। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে মানুষের আর্তনাদ।

এই আগুনের লেলিহান ৩/৪ দিন উল্লাপাড়া, ঝিকিড়া, ঘোষগাতী, ঘাটিনা, চরঘটিনা ও অন্যান্য গ্রামকে এক এক করে গ্রাস করেছে, গাছপালাগুলো পুড়ে পুড়ে হা করে দাঁড়িয়ে আছে। এমন হয়েছে যেন উল্লাপাড়াতে একটা পাখি পর্যন্ত দস্যুদের দেখে ভয়ে সবাই পালিয়ে গেছে।

এইভাবে ৭ দিন কাটতে না কাটতেই একদল কুচক্রীর দল দস্যুদের পিছু নিয়েছে। তারাও যেন দস্যু হয়ে গেল। ১ মাসের মধ্যে দেখতে পেলাম দস্যুর দল বেশ ভারী হয়ে দানা বেঁধে উঠেছে। আমার বহু বন্ধুদের ধরে নিয়ে নিয়ে পাক দস্যুদের হাতে দিচ্ছে আর দস্যুদল আমার বন্ধুদের একটু একটু করে তিলে তিলে মেরেছে। বাঙ্গালী দস্যুদল ওদের নাম দিয়েছিল শান্তি কমিটি, শান্তির নাম নিয়ে কত মা-বোনকে যে ওদের হাতে তুলে দিয়েছে তার হিসাব নাই। এই শান্তি কমিটির নায়ক ছিল কয়েকজন স্থানীয় অবাঙ্গালী ও কয়েকজন বাঙ্গালী।

এইভাবে আমাদের স্মরণীয় দিনগুলো কাটতে লাগলো। ১ মাস,২ মাস কেটে গেল। স্বাধীন বাংলার খবর শুনি, বুকে একটু বল পাই। জুনের ২৭ তারিখ ভোর ৫ টার সময় দেখতে পেলাম একদল লোক ছুটে আসছে। ভাইরা মন্তব্য করল পাক মিলিটারী হতে পারে? দেখতে না দেখতে ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে গেল। সবাই ছুটে পালাতে লাগলাম কিন্তু হায় দেখি ভেংড়ী গ্রামের চারদিক দস্যুদল ও বাঙ্গালী দস্যুদল (শান্তি কমিটি) ঘিরে ফেলেছে। ছুটে গেলাম ব্যবসাইত পাড়ার ভিতর, ছোট জঙ্গলের ভিতর শুয়ে পড়লাম, কিন্তু দেখি আমাদের সুপরিচিত উল্লাপাড়ার কয়েকজন গুণ্ডা আমাকে দেখেই চিনে ফেলল। বলল শালা মালাউন পালিয়েছিস, বেরিয়ে আয়। নিরুপায় হয়ে এসে দেখলাম আমার বাবাকে ধরেছে, ভাইকে ধরেছে, বন্ধু অরুণকে ধরেছে, বন্ধু জীবনকে ধরেছে ও আর ৪ জনকে ধরেছে। দারুণ মার শুরু করে দিল। আমার বৃদ্ধ পিতাকে মারছে, বৃদ্ধ পিতা মার সহ্য করতে না পেরে আমার কোলে এসে আশ্রয় নিল। তখন আমাকে যে কতক্ষণ কি দিয়ে মেরেছে বলতে পারব না। ঘন্টাখানেক পরে জ্ঞান ফিরলে দেখলাম আমাদের সমস্ত জিনিসপত্র লুট করে এনে জড়ো করেছে এবং দস্যুদল খাওয়া দাওয়া করেছে। দস্যুদল খাওয়া শেষ করে আমাদের দড়ি দিয়ে বেঁধে টানতে টানতে ১২ মাইল হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে সলঙ্গা নামক স্থানে নিয়ে গেল। ওখানে দেখতে পেলাম ৭০/৮০ জন পাকদস্যু ট্রাক নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমাদের পেয়ে মনে হয় জীবিত মানুষগুলোকে খেয়ে ফেলবে। কিন্তু দেখলাম আমাদের ট্রাকে তুলে উল্লাপাড়া ষ্টেশন ক্যাম্পে নিয়ে এলো। হাজার হাজার মিলিটারী দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখে একজন পাক ক্যাপ্টেন বেরিয়ে এলো, বললো তোমাদের নাম লিখে দাও এবং একটি পেন ও ১ টি কাগজ দিয়ে গেল। লিখে দেওয়ার পর আমাদের চারহাত-বাই চারহাত ঘরে রেখে দিল। এমনকি দরজায় পর্যন্ত তারকাটা এঁটে দিল। মনে হলো আর কোনদিন দরজা খুলবে না। সারারাত্রি বসে বসে কাটাতে লাগলাম আর শুনতে পেলাম নারী কন্ঠের আর্তনাদ, বুকফাটা কান্না, চাবুকের সপাং সপাং শব্দ , মদ্যপানের জড়ান জড়ান কথা, শুনে মন ভয়ে শিউরে উঠল।

শুধু মনে হতে লাগল, এরা বেশী দিন টিকতে পারবে না। নারী ধর্ষনে কোন জাতি টিকতে পারে নাই, পারবেও না। এইভাবে সারা রাত্রি কেটে গেল। সকাল ৮টার সময় দরজা খুলে বের করল আমাকে নিয়ে গেল ক্যাপ্টেনের কাছে। ক্যাপ্টেন বলল জয়দেব কে? আমি বললাম আমার ছোট ভাই। সে কি করে? বি, এ পড়ে। কোন পার্টি করে? আওয়ামী লীগকে ভালোবাসে। সে কোথায়? বলতে পারব না। কেন পারবে না? জানি না। এই প্রশ্নের উত্তরে ক্যাপ্টেনের মুখ দিয়ে আগুন ছুটতে থাকলো। বললো যদি বাঁচতে চাও বল জয়দেব কোথায়। কিন্তু আমার একই উত্তর জানি না। নিজে রাগ সামলাতে না পেরে একজন জোয়ানকে ডাক দিল এবং বলল চাবুকে গায়ের চামড়া তুলে ফেলতে। জোয়ান চাবুক মারতে আরম্ভ করে দিল। ওদিকে আমার বাবা চিৎকার করছে, ওকে আর মের না, আমাকে মার। কখন জ্ঞান হারিয়ে গেছে, জানি না। জ্ঞান ফিরে দেখি উল্লাপাড়ার এক পরিচিত ঘরে বিচার হচ্ছে। আমার রক্তাক্ত দেহ দেখে কারও দয়া হল, কেই বলল ভালো, কেউ বলল কিছু খারাপ, এতে শাস্তি হলো, আবার ১০ বেত। আমার বাবাকে ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দিল। ছোট ভাইকে চাবুক মারল, জীবনকে চাবকাতে চাবকাতে গায়ের চামড়া ক্ষতবিক্ষত করে ফেলল আর আমার সেই সুপ্রিয় বন্ধু অরুণকে গুলি করে হত্যা করল। এদিকে আবার নতুন রাজাকার তৈরী করছে। বিচারে রায় দিয়েছিল উল্লাপাড়ায় থাকতে হবে নইলে গুলি করে মারবে। নজরবন্দী অবস্থায় থাকতে লাগলাম। এখন মনে হচ্ছে কেনই বা ওদের এত জয়দেবকে দরকার। জয়দেব আমার ভাই, আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী, উল্লাপাড়াতে যত বড় আওয়ামী লীগের নেতাই আসুক না কেন, জয়দেব কে সবাই চিনতো এবং ভালোবাসতো। সে একদিন বলেছিল আমি হয়তো থাকবো না কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। এতে কোন দ্বিমত নেই। কুচক্রীর দল সাবধান হয়েই থাকে। কিন্তু হায় জয়দেব আজ আর আমাদের সামনে নেই।

ক্ষতবিক্ষত দেহে বাড়ী ফিরলাম। নজরবন্দী অবস্থায় উল্লাপাড়ায় থাকতে লাগলাম। উল্লাপাড়ার দুঃখ দুর্দশা দেখে ঘরে বসে ডুকরে ডুকরে কাঁদতাম।

আমি দেখেছি প্রতিদিন পাক সৈন্যরা কোথা থেকে যুবক ধরে এনে মুক্তিবাহিনীর নাম দিয়ে বহু যুবককে গুলি করে মেরেছে। একদিন দেখতে পেলাম একটি যুবককে ধরে এনে আমার বাড়ীর পিছনে গুলি করে চলে গেল কিন্তু যুবকটির পেটের পার্শ্বে গুলি লেগেছে। সে শুধু বলছে আমার হাত টা ছেড়ে দেও, আমি বাঁচব,আমি কোন অপরাধ করিনি। যদি বাঁচতে না দাও আর একটা গুলি করে মেরে ফেল, যন্ত্রণা সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু কোন লোক তাঁর কথায় কান দিল না। অবশেষে সন্ধ্যায় যুবকটি আর্তনাদ করতে শুরু করল- একটু পানি দেও, কেউ একটু পানি দাও। কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। কারণ দস্যুদের পা-চাটা গোলাম রাজাকারদের পাহারায় রেখেছিল যেন যুবকের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তার পাহারায় থাকে। সন্ধ্যার পর রাজাকারদের বেয়নেটে তার প্রাণ হারায়, তার স্মৃতি চিহ্নস্বরূপ সেই অন্তিম স্থানের নাম দেওয়া হয়েছে “মা পানি জনপথ “।

স্বাক্ষর/-
শ্রী রথিকৃষ্ণ সাহা
উল্লাপাড়া
পাবনা

।। ১১৭ ।।
ভাগলু ঘোষ
থানা-ঈশ্বরদী
জেলা- পাবনা

১ লা বৈশাখ (রবিবার) প্রথম মিলিটারী এখানে আসে। তারা গাড়ীতে করে টহল দিয়ে এরোড্রামে যায়। বিকেল ৬টার দিকে মিলিটারীরা স্থানীয় বিহারীদের দিয়ে রেলওয়ে ডিপো থেকে কেরোসিন তেল লুট করায়। তারপর তাদের ঈশ্বরদী বাজার নির্দয়ভাবে লুট করায়। লুটপাট করার পর তারা বাজারের অনেকগুলি ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

অপরদিকে লাইনের পশ্চিম পাশে বিহারীদের ছেলেরা হামলা করে এবং লুটপাট করে ও লোক হত্যা করতে থাকে। আমার মহাজন কৃষ্ণ শর্মাকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে। আমার বাসাও লুটপাট করে।

পরদিন সকালে আমি পালিয়ে যাই। বনবাদাড় দিয়ে যাবার পথে আমি দেখতে পাই ৩০/৩৫ জন বাঙ্গালী ও হিন্দুকে বিহারীরা হত্যা করেছে।

আমি আমার বাড়ী লুট হবার পর যখন পালিয়ে যাচ্ছিলাম তখন দেখতে পাই যে পশ্চিম টেংরা হিন্দু মন্দির “শিব মন্দির” বিহারীরা সম্পূর্নরুপে ধ্বংস করে। ভেঙে ফেলে মন্দিরের ভিতরের সমস্ত বিগ্রহগুলি।

টিপসহী/-
ভাগলু ঘোষ

।। ১১৮।।
জয়েন উদ্দিন
গ্রাম- মাঝদিয়া
থানা-ঈশ্বরদী
জেলা- পাবনা

পাক সৈন্য ঈশ্বরদীতে তাদের অবস্থান মজবুত করে নেবার পর আশেপাশের এলাকায় অপারেশন করা শুরু করে। এ সময় উল্লিখিত এলাকায় কোন বাঙ্গালী ছিল না। তারা প্রাণ ভয়ে ভারতে এবং অভ্যন্তরে গ্রামাঞ্চলে আত্নগোপন করেছিল। এ খবর সৈন্যরা বিহারীদের মাধ্যমে জানতে পারে। পাক সৈন্যেরা আসার পর তাদের সহায়তায় বিহারীরা সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তারাই বাঙ্গালীদের অবস্থানের কথা পাক সৈন্যদের কাছে বলে এবং তাদের অপারেশনের জন্য প্ররোচিত করে।

বিহারীদের প্রচারণায় এবং তাদের সহযোগীতায় পাক সৈন্যরা এপ্রিলের শেষের দিকে মাঝ দিয়া গ্রামে অপারেশন করে। পাক সৈন্য ও তাদের সহযোগী বিহারীরা গোটা গ্রাম ঘেরাও করে। গ্রাম এমনভাবে ঘেরাও করে যে গ্রামের প্রায় কেহই পালাতে পারেনি। গ্রাম ঘেরাও করে গ্রামের সমস্ত লোকজন জমা করে। লোকজন ধরার মাখখানেই সমস্ত গ্রাম লুটপাট করে। বেশ কিছু বাড়ীঘর জ্বালিয়েও দেয়।

ধৃত ৪০০/৫০০ লোককে তারা হৃদয়হীনভাবে হত্যা করে। তারা ঐ সমস্ত লোককে অধিকাংশ লোক জবাই করে হত্যা করে। তারা একই জায়গায় এবং একই খাট্যার উপর ১১৫ জনকে জবাই করিয়া হত্যা করে। সমস্ত গ্রাম লাশ, লাশ আর লাশে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। যেদিকে চাওয়া যায় শুধু লাশ আর জমাট রক্তের ঢেলা ছাড়া আর কিছু দেখা যেত না।

এই গ্রামে অপারেশনে বহু সংখ্যক রমণীর শ্লীলতাও তারা হানি করে।

স্বাক্ষর/-
জয়েন উদ্দিন

।। ১১৯।।
আবদুল্লাহ খান
গ্রাম-পুবপাড়া
থানা-ঈশ্বরদী
জেলা-পাবনা

পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর পদলেহী শান্তি কমিটির সহায়তায় পাক সৈন্যরা ২৮শে জুলাই তারিখে আমাকে ঈশ্বরদী থেকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারের পর আমার দুই হাত পেছনে বেঁধে দেয়। মোটা রশি দিয়ে এমনভাবে এঁটে বাঁধে যে হাতের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বাঁধনের অসহ্য যন্ত্রণা বোধ হতে থাকে। কিন্তু তখন ও বোঝা যায় নি যে এর চেয়ে ভয়াবহ এবং কষ্টকর শাস্তি অপেক্ষা করছে।

গ্রেফতার করার পর আমার উপর নির্দয়ভাবে প্রহার শুরু করে। চড়, লাথি, কিল, ঘুষি এবং রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটান শুরু করে। এ সময় যে সমস্ত অবাঙ্গালী ও শান্তি কমিটির লোক ঐখানে ছিল তারা এ শাস্তি প্রাণ ভরে দেখছিল এবং তাদের তাদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল তারা উক্ত শাস্তি বিধান দেখে তৃপ্তি বোধ করছিল। কিছুক্ষণ এমনিভাবে প্রহার করার পর আমাকে জীপে করে পাবনা জেলখানায় নেয়া হয়। জেলখানার একটি ছোট্র আলো বাতাসহীন প্রকোষ্ঠে বন্দী করে রাখে। জেলখানার উক্ত ঘরে ঢোকার পর তিনজন সামরিক লোক আমার কাছে আসে। তারা এসে আমাকে দেওয়ালের পাশে নিয়ে যায় এবং প্রথমে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বলে। তারপর ঐ অবস্থায় আমার মাথাকে মাটিতে ঠেকতে বলে। এ সময় আমার পাছা অসম্ভবভাবে টান হয়ে থাকতে হবে বলে তারা নির্দেশ দেয়।

যাহোক, তাদের নির্দেশ মত আমি ঐভাবে পজিশন নিলে ঐ সমস্ত লোকেরা আমার উপর অত্যাচার শুরু করে। প্রথমে আমার ঐ টান পাছার উপর ধান ভানা চাকা যে ফিতায় টানে ঐ ফিতা (সম্ভবতঃ অথবা ঐ জাতীয় মোটা ফিতা) দিয়ে শটাশট প্রহার করতে থাকে। প্রহারের যন্ত্রনায় চিৎকার করতে লাগলে অথবা শরীরকে সোজা বা মোড়া দিতে লাগলে তারা অকথ্য ভাষায় গালাগালি দিত ও প্রাণনাশের হুমকি দিত এবং ঐ রুপ না করতে বলত।

এ অবস্থায় প্রহার কিছুক্ষণ চলার পর আমি অবসন্ন হয়ে পড়ি। আমি মাটিতে পড়ে যাই। ইতিমধ্যেও যে সৈন্যটি প্রহার করছিল সম্ভবতঃ সেও ক্লান্ত হয়ে পড়ে । তখন মাটিতে পড়ে যাওয়া অবস্থায় একটি সিপাই রুলার দিয়ে আমার শরীরের বিভিন্ন জোড়ায় পেটাতে থাকে। পেটানোর যন্ত্রনার চোটে যখন আমি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মুখোমুখি তখন আমাকে সাময়িকভাবে প্রহার বন্ধ করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। কতজন মিলিটারী মেরেছি, বিহারী মেরেছি, মুক্তিবাহিনীর লোকেরা কোথায় আছে, অস্ত্রশস্ত্র কোথায় রেখেছি ইত্যাদি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে।

স্বাভাবিকভাবে আমি সমস্ত কিছু অস্বীকার করি। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের ফাঁকে ফাঁকে তারা প্রহার করে। প্রহার ও জিজ্ঞাসাবাদের পালা শেষ হলে আমাকে পুনর্বার বন্দী করে রাখে।

অনুরূপভাবে আরো কয়েকদিন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে প্রত্যেকদিনই আমার উপর অত্যাচার চালানো হয়েছে। প্রত্যেকবারই আমাকে বলা হয়েছে যে আমার সমস্ত খবরই তারা জানে। সুতরাং আমি স্বীকার না করলে হত্যা করা হবে।

বলা প্রয়োজন, আমি যে ঘরে থাকতাম এ সময়ের মধ্যে সে ঘর থেকে তিনজনকে সন্ধ্যার পর হাত রশি দিয়ে বেঁধে কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে কোথায় যেন নিয়ে গেছে। তাঁরা আর কখনো ফিরে আসে নি। সম্ভবতঃ তাঁদের হত্যা করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার প্রেক্ষিতে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

স্বাক্ষর/-
আব্দুল্লাহ খান

।। ১২০।।
দীপক প্রসাদ গুপ্ত
গ্রাম- পশ্চিম টেংরী
থানা- ঈশ্বরদী
জেলা-পাবনা

পাক মিলিটারী এবং অবাঙ্গালীদের অত্যাচারে অত্র এলাকার নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, শিশুরা দেশ ত্যাগ করে বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে ভারতে চলে যায়। ১লা বৈশাখ তারিখে পাক সেনারা এখানে প্রবেশ করে। তারা আসার পরই এলাকায় বাড়ীঘর পুড়িয়ে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে। অবাঙ্গালীরাও এ সময় রীতিমত লুটপাট শুরু করে। অবস্থার প্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে জনগণ এলাকা ত্যাগ করেন। পলায়ন লোকদের উপর হানা দিয়ে লুটপাট করে ঘরের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেয় এবং অনেককে হত্যা করে।

এক দুমাসের মধ্যে শান্তি কমিটি গঠিত হয়। তারা মিলিটারীদের সাথে যোগাযোগ করত।তারা উৎসাহ দিয়ে রাজাকার তৈরি করেছিল।

রাজাকাররা গ্রামে লুটপাট করেছে, লোক ধরে মিলিটারীদের দিত। মারধর করত। গরু-বাছুর, হাঁস-মুরগী ধরে নিয়ে যেত।

মুক্তিবাহিনীদের লোকেরা গ্রাম এলাকায় থাকত। জনগন তাদের থাকতে দিত।

মিলিটারী গ্রামে এবং বিভিন্ন এলাকায় অপারেশন করত, মানুষ হত্যা করত; মেয়েদের উপর অত্যাচার করেছে। অবাঙ্গালীরা যে সমস্ত অমুসলিম পরিবার ছিল তাদের জোর করে ভয় দেখিয়ে মুসলমান করেছিল।আমি নিজেও উক্ত শিকারে পরিণত হয়েছিলাম। এমনি ১২/১৩ ঘরে ৮০/৯০ জনকে মুসলমান করেছিল। বিহারীরা মন্দির ভেঙে ফেলেছিল এবং মন্দিরের ইট দিয়ে রাস্তা করেছিল।মন্দিরের বিগ্রহগুলি হৃদয়হীনভাবে ভেঙে ফেলেছে।

ডিসেম্বরের যুদ্ধকে মানুষ স্বাগত জানিয়েছেন।এই যুদ্ধ স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করবে এই বিশ্বাস সকলের মনে ছিল।

স্বাক্ষর/-
দীপক প্রসাদ গুপ্ত

======================

গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণঃ

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গৃহীত সাক্ষাৎকার

ঢাকা বিভাগ (পৃষ্ঠা ১২-৬৬)
রাজশাহী বিভাগ (পৃষ্ঠা ৬৭-১৮২)
খুলনা বিভাগ (পৃষ্ঠা ১৮৩-২৬৯)
চট্টগ্রাম বিভাগ (পৃষ্ঠা ২৭০-৩২৪)