রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাক বাহিনীর হত্যা, লুট ও নির্যাতন

Posted on Posted in 8

৩৫। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাক বাহিনীর হত্যা, লুট ও নির্যাতন (৪১৭-৪১৮)

সূত্র – -দৈনিক আজাদ, ৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২লক্ষাধিক টাকার সম্পত্তি ধ্বংস
জল্লাদ বাহিনীর হত্যা লুন্ঠন ও পাশবিক অত্যাচারের নৃশংস কাহিনী

গত নয় মাস ধরে বর্বর পাকিস্তানী বাহিনী বাংলাদেশে যে অবাধ হত্যালীলা চালিয়েছে সে সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষকসহ ১৮ জন কর্মচারী নিহত হন। ঐ সময় জিনিসপত্রের দিক দিয়ে দখলদার বাহিনী ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২২ লক্ষ ৬৪ হাজার টাকার মত ক্ষতি করেছে।

গত শুক্রবার জনৈক সাংবাদিকদের নিকট বিবরণ দানকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার পাক বাহিনীর হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির অনুসন্ধানের কতিপয় বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বর্বর পাকিস্তানী বাহিনী গত বছর এপ্রিল মাসের তৃতীয় সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে এবং জোহা হল, আব্দুল লতিফ হল, জিন্নাহ হল, আর্টস বিল্ডিং, কেমিস্ট্রি বিল্ডিং, মিলিটারী সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট, এক্সপেরিমেন্টাল স্কুল বিল্ডিং এবং বহু স্টাফ কোয়ার্টারে তাদের ক্যাম্প স্থাপন করে।

বর্বর হানাদার বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে এবং জোহা হল ও অন্যান্য হলসহ কতিপয় বিল্ডিং এর গুরুতর ক্ষতি সাধন করে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় বিল্ডিং হল এবং শিক্ষকদের কোয়ার্টার ও অন্যান্য কর্মচারীদের বাসা থেকে নানাবিধ জিনিসপত্র এবং গৃহস্থালীর মালপত্র লুট করে। এমনকি লাইব্রেরী সমূহের পুস্তকাদি এবং ল্যাবরেটরী সমূহের যন্ত্রপাতিও বাদ যায়নি।

উত্ত সাংবাদিক সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ডঃ হোসেন, অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ও বাংলাদেশ প্লানিং কমিশনের নব নিযুক্ত সদস্য মোশারফ হোসেন, বাংলা বিভাগের রীডার ডঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং অন্যান্য শিক্ষক ও কতিপয় কর্মচারীর সাথে সাক্ষাৎ করে পাকিস্তানী বাহিনীর বীভৎস অত্যাচারের কাহিনী সংগ্রহ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষককে রাতের আঁধারে তাঁদের বাসা থেকে পাকরাও করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। এঁরা হচ্ছেন ম্যাথমেটিক্সের এসোসিয়েট প্রফেসর জনাব হাবিবুর রহমান, ভাষা সাহিত্যের এসোসিয়েট প্রফেসর শ্রী সুখরঞ্জন সমাদ্দার এবং মনস্তত্ত্ব বিভাগের ডেমনেষ্ট্রেটর মীর আব্দুল কাইয়ুম। গত ১৪ই, ১৫ই এপ্রিল এবং ২৫শে নভেম্বর তারিখে তাদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

এছাড়া ১৫ জন নিন্ম পর্যায়ের কর্মচারী শেখ এমাজুদ্দীন (ষ্টেনোগ্রাফার), সাইফুল ইসলাম (ইউডি এসিস্ট্যান্ট), শফিকুর রহমান (ছুতার), কলিমুদ্দিন (ওয়ার্কস এসিস্ট্যান্ট), আবদুল আলী (ড্রাইভার), আব্দুল মজিদ, মোহাম্মদ ইউসুফ (সাইকেল পিওন), মোহাম্মদ আফজাল (গার্ড), আব্দুর রাজ্জাক (গার্ড), আব্দুল ওয়াহার (আর্দালী পিওন), কোরবান আলী (বেয়ারা), আবদুল মালেক (বেয়ারা), নুরু মিয়া (গার্ড), ওয়াজেদ আলী (পিওন) এবং মোহন লালকে তারা হত্যা করে।

তারা সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগের লেকচারার কাজী সালেহ, ম্যাথমেটিক্সের লেকচারার জনাব মুজিবুর রহমান এবং ডঃ আবু হেনা মোস্তফা কামালের উপর বর্বরোচিত অত্যাচার করে। কাজী সালেহ আহমদ ও মুজিবুর রহমানকে বন্দী শিবিরে নিয়ে গিয়ে দীর্ঘ চার মাস ধরে তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। তাদের অমানুষিক অত্যাচারের ফলে জনাব মুজিবুর রহমানের পুরুষাঙ্গ দিয়ে রক্তপাত হতে থাকে। ডঃ আবু হেনা মোস্তফা কামালকে ১৪ ঘন্টা পরে ছেড়ে দেয়া হয় এবং মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে তাঁকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানের প্রধান ডঃ রফিককেও গ্রেফতার করে বন্দী শিবিরে নিয়ে গিয়ে আটক রাখা হয়। প্রায় আট দিন ধরে তাঁর উপর অকথ্য নির্যাতনের পর তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী জানান যে, সেনারা হাবিব ব্যাংকের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা লুট করে এবং কুমারী মেয়েসহ বহু মহিলার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। তিনি বলেন, একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর পত্নী এবং ৩২ বৎসর বয়সের কন্যাকেও তারা রেহাই দেয়নি। তিনি বলেন পাক সেনারা এতই নিষ্ঠুর ছিল যে একজন অধ্যাপককে হত্যা করার পর তাঁর তরুণী মেয়েদেরকে একজন সামরিক অফিসারের গৃহে গান গাইতে বাধ্য করে।

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অসংখ্য কবর রয়েছে যা থেকে আরও বহু লাশ উদ্ধার করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পিওন আবুল বাশার জোহা হলের নিকট বাস করতো। তাকে কবর খনন করতে বাধ্য করা হতো। তার কাছ থেকে জানা যায় যে, জোহা হলের নিকট অন্যূনপক্ষে তিন হাজার লাশের কবর দেয়া হয়েছে।