শরণার্থী সমস্যার পাকিস্তানী ব্যাখ্যা

Posted on Posted in 7

৭.১৩৬.৩৪৬ ৩৫২

শিরোনামঃ ১৩৬। শরণার্থী সমস্যার পাকিস্তানী ব্যাখ্যা

সূত্রঃ প্রচার পুস্তিকা – পাকিস্তান দূতাবাস, ওয়াশিংটন

তারিখঃ জুন, ১৯৭১

 

পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ

শরণার্থী সমস্যা

-প্রতিবেদন পটভূমি ৫

 

মুখবন্ধ

.

ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে। ¬ভারত চাইছে তার পছন্দ মতো শরণার্থী সমস্যার একটা রাজনৈতিক সমাধান পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দিতে, যা আসলে বিদ্রুপকারী শোষণের নামান্তর। ভারত শরণার্থীদের বুঝিয়ে এবং ভয় দেখিয়ে ফিরে যেতে নিরস্ত করছে, যাতে তাদের পুনর্বাসনের কথা বলে পূর্ব পাকিস্তানের একটা অংশ দাবী করতে পারে এই বলে যে, তারা পাকিস্তানে ফেরত যাবে না যদিনা বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই দাবী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে না উত্থাপন করে, তাহলে তার ফলাফল কি হবে এই সম্পর্কেও ভারত সতর্ক করে দিচ্ছে।

পাকিস্তান যুদ্ধ চায় না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেশ কয়েকবারই শরণার্থীদের পাকিস্তানে ফেরত যাবার আমন্ত্রন জানিয়েছেন। শরণার্থীরা ফিরলে তাদের পুনর্বাসনের জন্য ইয়াহিয়া সরকার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, আর তাকে সহযোগিতা করছেন জাতিসংঘ মহাসচিব ও জাতিসংঘের অন্যান্য অঙ্গসংগঠন যেমন ইউনিসেফ, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা, ফাও প্রভৃতি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার দ্রুত রাজনৈতিক নিস্পত্তির জন্যও কাজ করে যাচ্ছেন এবং ২৮জুন আরও একবার ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি তিন চার মাসের মধ্যেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন,এমনকি তাঁর আগেও হতে পারে যদি অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান তৈরির জন্য নিযুক্ত কমিশন তাদের কাজ শেষ করতে পারে।

বিশ্ব নেত্রীবৃন্দের দায়িত্ব ভারতকে নিবৃত্ত করা ও যুদ্ধের প্রাদুর্ভাব রোধ করা, যেটা কিনা ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিবের সাম্প্রতিক বক্তব্য মতে, “একটা দুঃখজনক ঘটনা সর্বনাশে রুপ নিতে পারে”।

 

 

                                উদ্বাস্তুঃ পাকিস্তান কী করেছে

বিপদজনক পরিস্থিতিতে যে সকল পাকিস্তানী নাগরিক দেশ ছেড়েছিল তাদের দেশে ফিরতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তান সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলাচ্ছে। এই নিমিত্তে সরকার নিম্নে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছেঃ

-২১মে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট দেশের সকল প্রকৃত নাগরিকদেরকে তাদের বাড়িতে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।

-২৪মে রাষ্ট্রপতি এই আহ্বান নবায়ন করেছেন এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তাদের ক্ষমা প্রদান করেছেন।তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ফেরত আসা সকল শরণার্থী ত্রাণ, পুনর্বাসন এবং সম্পূর্ণ নিরাপত্তা পাবে।

-১জুন, ভারত থেকে ফেরার প্রধান রুটে ২০টি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ত্রাণ শিবিরের প্রধান উদ্দেশ্য হল যারা ফিরে আশ্ছে তাদের পূর্ণ সুরক্ষা এবং পুনর্বাসন সুবিধা প্রদান করা।

– ১০জুন, পূর্বপাকিস্তানের গভর্নর সাধারন ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং বলেন যে এই ক্ষমা সকল স্তরের মানুষের জন্য- ছাত্র, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, নাগরিক কর্মচারী, সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য যেমন পুলিশ যারা পক্ষ ত্যাগ করেছে, পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও এই ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত।

-জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান এবং মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি জনাব ইসমত কিতানি উভয়েই পাকিস্তান সফর করেছেন এবং সকারের তরফ থেকে শরণার্থীদের ফেরা ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে।

– জাতিসংঘ মাসচিবের একজন প্রতিনিধি পূর্ব পাকিস্তানে পৌঁছেছেন এবং ঢাকা থেকে সরসরি পূর্ব পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

-১৯ জুন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট তাঁর ২১মে ও ২৪ মে এর আপিলের কথা স্মরণ করে একটি নতুন আপিল জারি করেন, এবং বিশেষভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে(হিন্দু) বলেন ফিরে আসতে যারা বাড়িঘর সহায় সম্পত্তি ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন। তিনি আশ্বাস দেন যে তাদের পাকিস্তানের অন্যান্য সকল নাগরিকের মতই পূর্ণ নিরাপত্তা এবং সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে এবং জাতি বা ধর্মভিত্তিক কোনও বৈষম্যের কোনও প্রশ্ন নেই। তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে পাকিস্তানের বাইরের কোনও অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হবার জন্য অনুরোধ জানান।

-২৮জুন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট চার মাসের মধ্যে একটি নতুন সংবিধানের অধীনে একটি বেসামরিক সরকার ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধান সর্বোচ্চ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করবে, যেমনটা নির্বাচনী ইশতেহার এ বলা হয়েছে।

 

                                        ২

                        ভারত সমস্যাকে কাজে লাগাচ্ছে

যখন পাকিস্তান শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি ও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারের সাথে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছে, তখন অন্যদিকে ভারত বার বার যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে এবং শরণার্থী সমস্যার তাদের পছন্দমতো রাজনৈতিক নিষ্পত্তির চেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকি ভারত তার খমতার রাজনৈতিক খেলায় এই দুর্ভাগা মানুষগুলোকে দাবার ঘুঁটির মতন ব্যবহার করছে ও তাদের ফিরে যেতে বাঁধা দিচ্ছে।

 

১৬ জুন নয়া দিল্লি থেকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী সংসদে বলেছেন, “ভারত শরণার্থীদের শুধু জীবন নয়, কল্যান নিয়েও চিন্তিত ছিল।” পূর্ব পাকিস্তান সমস্যা নিষ্পত্তির ব্যাপারে তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সকল পরামর্শই নাকচ করে দিয়েছেন। “রাজনৈতিক নিষ্পত্তি হলে তা হবে চাপে পড়া মানুষদের সাথে।“ তিনি বলেন, “ভারত এমন কোনও নিষ্পত্তি মেনে নেবে না যার অর্থ দাঁড়ায় “বাংলাদেশের মৃত্যু” এবং যুদ্ধরত মানুষ ও গণতন্ত্রের খেলাপ।“

 

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “বাংলাদেশে যা হচ্ছে তার ফলাফল ভোগ না করে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমরা চলে যেতে দেব না, তারা সমস্যার নিস্পত্তিতে সাহায্য করুক বা না করুক এই ঘটনার পরিণতিতে তাদের ভুগতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “শরণার্থীদের ভারতে রেখে দেয়ার কোনও উদ্দেশ্য আমাদের নেই, তাই বলে জবাই হয়ে যাবার জন্য তাদের আমরা বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে পারি না।”

 

একই দিনে, ১৬জুন, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন কিছু শরণার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে রিপোর্টারদের বলেন, তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতির উন্নতি লক্ষ্য করেছেন এবং শরণার্থীদের ফিরে আসার কোনও বাঁধা নেই।

 

জাতিসংঘের হাই কমিশনার যদিও বলছেন তিনি সন্তুষ্ট যে শরণার্থীরা এখন পূর্ব পাকিস্তানে ফেরত যেতে পারবে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী জাহির করছেন যে তিনি শরণার্থীদের ফিরে যেতে দেবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত তার পছন্দমত একটা রাজনৈতিক সমাধান পূর্ব পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। তিনি প্রচার করছেন বাংলাদেশের মৃত্যু হয় এমন কোনও নিষ্পত্তি তিনি মেনে নেবেন না এবং এর পরিণতি সম্পরকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হুমকি দিচ্ছেন।এটা বোঝা জাচ্ছে না যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কোন আন্তর্জাতিক আইন বা রীতিতে এই ধরনের কোনও দাবি করছেন।

 

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সরদার স্বরন সিং ১৭জুন ওয়াশিংটনে জাতীয় প্রেসক্লাবে ঘোষণা করেন, “মূল সমস্যা হল রাজনৈতিক” এবং মিসেস গান্ধির বক্তব্যের সমর্থন দিয়ে বলেন, “ভারত বিশেষ করে উদ্বাস্তুদের জীবন ও কল্যাণ নিয়ে উদ্বিগ্ন।” তিনি বলেন, ৬০লক্ষ শরণার্থী পাকিস্তান সরকারের খমার ঘোষণা বিশ্বাস করে না, এবং এই পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন যে, আন্তর্জাতিক তত্তাবধানে পাকিস্তানের একটি এলাকা উদবাস্তদের নিজেদের দারা শাসিত হবে এবং এই অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো সেখানে সরিয়ে নেয়া হতে পারে। মিঃ সিং আরও সুপারিশ করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত পাকিস্তানের সব সাহায্য বন্ধ রাখা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সমঝোতায় আসা, এবং সতর্ক করেন যে, “আমরা চুপচাপ বসে থাকব না।”

 

ভারত দেশভাগের সময় যা অর্জন করতে পারেনি, এখন যুদ্ধের হুমকি দিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে তা অর্জন করতে চায়।

 

এতে কোনও সন্দেহ নেই যে পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের ব্যর্থতায় ভারতীয় নেতারা হতাশ হয়েছেন, কেননা এতে তারা অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। বিদ্রোহের ধ্বসের পর ২০ এপ্রিল তারা কলকাতা অতিথিশালার মদ্ধে তথাকথিত “বাংলাদেশ সরকার” গঠনের জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাহায্য করেছিলেন, দেশ বিহীন সরকারের কল্পকাহিনী বানিয়েছিলেন। এখন তারা সেই তথাকথিত সরকারের জন্য কিছু অঞ্চল নিরাপদ করার চেষ্টা করছেন।

.

.

গেরিলাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া, সীমান্তে অস্থিরতায় উস্কানি দেওয়া এবং ভারতে পাকিস্তানি কূটনীতিকদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে ইতিমধ্যে এর সূচনা হয়েছে। এই সব ঘটনার কারনে দুই দেশের মধ্যে অস্থিরতা তৈরী করছে। এরপরে, গেরিলা যুদ্ধের গল্প প্রচার করা হচ্ছে এবং নৃশংসতার বানোয়াট গল্প বলা হচ্ছে। সীমান্তের জেলাগুলোর নিরীহ মানুষের মাঝে নিরাপত্তাহীনতা তৈরী হচ্ছে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এইভাবেই পূর্ব পাকিস্থান থেকে প্রস্থান শুরু হয়েছে।

সীমানার দাবী সংক্রান্ত সমস্যা ভারত বিবর্ধিত করছে

এটা কৌতুহলোদ্দীপক যে ১৫ই মে, যখন ভারত শরণার্থীদের প্রশ্নে পাকিস্তানকে প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে এমন ঘোষনা হলো, রয়টার্স সংবাদ সংস্থা তখন প্রতিবেদন করেছে একজন ভারতীয় মুখপাত্র কলকাতায় বলেছেন যে পঞ্চাশ থেকে ষাট লক্ষ শরণার্থী খুব জলদিই পাকিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশ করবে।

কলকাতা ও নয়া দিল্লী থেকে রয়টার্স সংবাদ সংস্থা প্রতিবেদনে বলেছে, “ওয়াকিবহাল মহল বলছে যে পাঠানো এই চিঠি হয়তো শরণার্থীদের জন্যে পাকিস্তানের কিছু জায়গা ছেড়ে দেওয়া উচিৎ জানানোর প্রথম পদক্ষেপ।” অন্য কথায় বলতে গেলে, ভারত যখন শরণার্থী সমস্যার কথা তুলেছে, তারা ষাট লক্ষ লোককে জায়গা দেওয়ার অজুহাতে পাকিস্তানী সীমান্ত থেকে জায়গা দাবী করবে যেখানে তারা এই নিরাশ্রয় ষাট লক্ষ শরণার্থীকে জায়গা দিবে। ১৬ জুনের মধ্যে সরকারী সংখ্যা ষাট লক্ষ করে দেওয়া হয়েছিলো বাস্তবতা বা প্রকৃত ঘটনা অগ্রাহ্য করে।

রয়টার্স সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৬ জুনের আগে পূর্ববর্তী ১২ দিন ধরে শরণার্থীদের সংখ্যা কমে খুবই এসেছিলো, কিন্তু ভারতীয় সংখ্যা অবিরত বেড়েই চলেছিলো। ১৮ মে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বলা সংখ্যা ছিলো দশলক্ষের উপরে। এটা দুর্বোধ্য যে ১৮ মে থেকে ২৪ মে-এর মাঝে দশলক্ষ থেকে  কি করে প্রতিদিন গড়ে ৬০০০০ করে বেড়ে পয়ত্রিশ লক্ষ হলো। জুনের ৭ তারিখে ভারতীয় হিসাব বেড়ে ৪৭ লক্ষে দাড়িয়েছিলো। ১১ জুনে এই সংখ্যা ছিলো ৫৫ লক্ষ ও ১৬ জুনে দাঁড়ায় ৬০ লক্ষ যা ১৫ মে-এর নির্ধারিত লক্ষ্য ছিলো।

১৭ জুন সরদার সারয়ান সিং ওয়াশিংটনে জনসম্মুখে ঘোষনা দেন যে,“পাকিস্তানের একটি এলাকা হয়তো শরণার্থী শিবিরের জন্যে আলাদা করে দিতে হবে।” পাকিস্তানের এই জায়গা চাওয়ার পিছনে কারন তিনি ২৫ মে সংসদে দেওয়া বক্তব্যে খোলসা করেন, যখন তিনি বলেন “সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করবে না।” এবং এই সব ব্যাপারগুলো আমলে নেওয়া দরকার ছিলো যেমন “নিয়ন্ত্রিত এলাকার ব্যাপ্তি”।

ড্যানিয়েল পেইরিসের নয়াদিল্লী থেকে করা এক প্রতিবেদন, যা ২৮ মে খ্রিস্টান সায়েন্স মনিটরে প্রকাশিত হয়, বলে যে ভারত তিনটি কার্যধারা অনুসরনের কথা চিন্তা করছেঃ

“১। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রশিক্ষিত গেরিলা সরনার্থী পাঠানো”

“২। ভারতে আশ্রয় নেওয়া ৩,৫০০,০০০ শরনার্থীর জন্যে পূর্ব বাংলায় ৫০ মাইল জায়গার জন্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে “সীমিত যুদ্ধ” চালানোর জন্যে আদেশ দেওয়া।”

“৩। বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সামরিক সাহায্য দেওয়া ও অস্থায়ী সরকারকে পুরো পূর্ব বঙ্গ থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সরানোতে সাহায্য করা।”

অন্যান্য আরো অনেক সূত্র থেকে পাওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী নিশ্চিত করা যায় যে ভারত এই কর্মপন্থাগুলো অনুসরন করছে। তিনি ভিন্নমতালম্বীদের এখন ভারতে সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তিনি পাকিস্তান সীমান্তের একটি অংশ বাজী ধরেছেন এবং বারংবার যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছেন।

গত কয়েকদিনের ধরেই ভারতীয় সশস্ত্র অনুপ্রবেশ ও উপুর্যুপরি সীমান্তে গোলাগুলির তাজা খবর পাওয়া যাচ্ছে যা এটাই ইঙ্গিত করে যে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সময়ে সময়ে দেওয়া যুদ্ধের হুমকি অনুসারে ভারত একটি খন্ড বা পূর্ন যুদ্ধের জন্যে প্ররোচিত করছে।

সমাপ্তি

.

পাকিস্তান যুদ্ধ চায় না।

২৪ মে, মিসেস গান্ধীর হুমকির পরে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের কোন সম্ভবনা রয়েছে কিনা, যখন একজন সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেন তার উত্তরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমি তাকে হুমকি দিচ্ছি না, আমি কোন হুমকিও দেই নি; আমরা তাদের বলে আসছি যে যুদ্ধ কোন সমাধান নয় এবং এটা কোন কিছুর মীমাংসা করবে না। আমরা বারবার বিশ্ববাসীকে বলে আসছি আমরা ভারতের সাথে কোন যুদ্ধ করতে চাই না।”

 পাকিস্তান রাজনৈতিক সমাধানের জন্যে কাজ করছে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি তার জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এমনকি ২৫ মার্চে যখন তিনি সশস্ত্র বাহিনীকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে বলেন তিনি উপরোক্ত মর্মে একটি সুনিশ্চিত আশ্বাস দেন। মে মাসের ২৪ তারিখে তিনি নতুন করে অঙ্গীকার করেন যে জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। গনমাধ্যম প্রতিবেদন করছে যে রাষ্ট্রপতি পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ ও আওয়ামী লীগের চরমপন্থী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের থেকে নিজেদের আলাদা করে নেওয়া নির্বাচিত নেতাদের সাথে পরমর্শ করছে এবং পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক প্রশাসনকে প্রদেশের জন্যে সাংবিধানিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে সহযোগিতা করছে।

রাজনৈতিক সমাধান বন্ধ করতে ভারত যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে।

জুনের ২৮ তারিখে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ঘোষনা করেন। তাই ভারত উদ্বিগ্ন এবং রাষ্ট্রপতির পরিকল্পনা ব্যর্থ করতে বাধা তৈরী করছে। তিনি ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতির ২৮ জুনের প্রতিজ্ঞা প্রত্যাখান করেছেন এবং শরনার্থীদের ফিরতে না দিয়ে তাদের আলাদা রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বপ্ন জীবিত রেখে আটকে রাখছেন। তিনি মানবতাকে একবারেই আমলে না নিয়ে ঘৃনাপূর্ণ রাজনৈতিক খেলা খেলছেন যা শুধুমাত্র শরনার্থীদের কষ্টই বাড়াবে এবং তাদের জন্যে অবর্ননীয় কষ্ট নিয়ে আসবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব

ভারতকে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে নাক গলাতে সংযত করা এবং এর মাধম্যে যুদ্ধ শুরু হওয়া বন্ধ করা, যা, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব যেমন বলেছেন, যা এখন বেদনাদায়ক তা হয়তো মহাবিপর্যয়কারী ঘটনায় রূপ নেবে।

পরিশিষ্ট

ভারতের দেওয়া শরনার্থীর সংখ্যা

২৬ এপ্রিল, ১৯৭১ – রয়টার্স/ কলকাতা

শরনার্থীদের জন্যে প্রাদেশিক কমিশনার জনাব বি.বি. মন্ডলের ভাষ্য অনুযায়ী ৫২৩,০০০ শরনার্থী ভারতে প্রবেশ করেছে।

১৫ মে, ১৯৭১ – রয়টার্স/ নয়াদিল্লী

ভারত আজ পাকিস্তানকে ইচ্ছাকৃতভাবে ২০ লক্ষ পাকিস্তানিকে ভারতে আসতে বাধ্য করেছে এবং এই সমাধান দক্ষিন এশিয়ার শান্তি বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এই ফলাফলের ব্যাপারে একটি কূটনৈতিক মন্তব্য পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছে খবর পাওয়া গেছে। একই প্রতিবেদন পরবর্তীতে বলে, “নির্ভরশীল সূত্র বলেছে এটা হয়তো শরণার্থীদের জন্যে পাকিস্তানের কিছু জায়গা ছেড়ে দেওয়া উচিৎ জানানোর প্রথম পদক্ষেপ।”

১৫ মে, ১৯৭১- রয়টার্স/কলকাতা

ফ্রেড ব্রিজল্যান্ডের প্রতিবেদন, একজন ভারতীয় মুখপাত্র আজ এখানে বলেছেন যে অতিসত্বর পঞ্চাশ থেকে ষাট লক্ষের মত শরনার্থী পাকিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশ করবে। একই প্রতিবেদন নির্দেশনা দেয় যে ভারত পাকিস্তানকে কুটনৈতিক চিঠি দিয়েছে এবং নির্ভরশীল সূত্রকে উদ্ধৃত করে বলে যে, “এই চিঠি হয়তো শরণার্থীদের জন্যে পাকিস্তানের কিছু জায়গা ছেড়ে দেওয়া উচিৎ জানানোর প্রথম পদক্ষেপ।”

১৮ মে, ১৯৭১- রয়টার্স/ওয়াশিংটন – (রাত্র সাড়ে ৮ টার জন্যে অগ্রিম প্রকাশিত)

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, আজ পাকিস্তানকে পূর্ব পাকিস্তানে উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে শান্তি বিনষ্টের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। মিসেস গান্ধী আরো বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে দশ লক্ষাধিক শরনার্থী জায়গা দিয়েছি।” খবর পাওয়া গেছে তিনি আরো বলেছেন, “ভারত লড়াইয়ের জন্যে সম্পূর্ন প্রস্তুত।”

মে ২১, ১৯৭১

পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি সকল প্রকৃত নাগরিককে পাকিস্তানে ফিরতে আবেদন জানিয়েছেন।

২৪ মে ১৯৭১ – রয়টার্স/নয়াদিল্লী – জেরার্ল্ড র‍্যাজিনের প্রতিবেদন

মিসেস গান্ধী যেমন বলেছেন উদ্ধৃতি করে, “৩৫ লক্ষ লোক গত দুই মাসে পূর্ব পাকিস্তান হতে ভারতে পালিয়ে এসেছে এবং প্রতিদিন ৬০০০০ করে আসছে।” তিনি আরো বলেছেন যে, রাজনৈতিক সমাধান তারাই করবে যাদের তা করার ক্ষমতা আছে। এবং যোগ করেন, অধিক ক্ষমতার অধিকারীদের বিশেষ দায়িত্ব আছে।

 

“যদি বাকী বিশ্ব নিশ্চিত নিরাপত্তা দেওয়ার মত অবস্থায় শরনার্থীদের ফেরত যেতে কাজ না করে, ভারত তাহলে এদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের নিরাপত্তা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্যে কাজ করবে,” তিনি বলেন।

পাদটীকাঃ ১৮ মে মিসেস গান্ধী শরনার্থী সংখ্যা বলেন দশ লক্ষাধিক এবং ২৪ মে বলেন ৩৫ লক্ষন যেখানে প্রতিদিন ৬০০০০ লোক প্রবেশ করছে।

২৫ মে,১৯৭১ – রয়টার্স/নয়াদিল্লী

ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরকার সারান সিং বলেন, “বিধানসভাকে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে যে যদি জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন মনে হয় তবে সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করবে না।” কিন্তু জানা যায় তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “কিছু ব্যাপার আমলে নিতে হবে, যেমন পূর্ব পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা ও পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক।”

২৫ মে, ১৯৭১ – রয়টার্স/নয়াদিল্লী

“প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধী আজ ক্ষমতাশীলদের পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করতে বলেছেন যেমন তার পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীরা পাকিস্তানি সৈন্যদের সীমান্ত অতিক্রম করলেই ফেরত পাঠাচ্ছে”

 ৭ জুন, ১৯৭১ – রয়টার্স/নয়াদিল্লী

স্বাস্থ্যমন্ত্রী উমাশংকর দীক্ষিত আজ লোকসভাকে বলেন, সংসদের নিম্নকক্ষ, যে ৪ জুন, শুক্রবারের মধ্যে, ৭৩৮০৫৪ জন শরনার্থী পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রবেশ করেছে।

১১ জুন, ১৯৭১ – রয়টার্স/নয়াদিল্লী – রাম সুরেশের প্রতিবেদন

কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষনা করেছে যে ২৫ মার্চ হতে শরনার্থীদের অন্তঃপ্রবাহ ৫৫ লক্ষ পার করেছে এবং এই সংখ্যাও পুরানো।

১৬ জুন, ১৯৭১ – রয়টার্স/নয়াদিল্লী

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধী ও জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা নিয়ে বিপরীতধর্মী মূল্যায়ন দিলে প্রত্যাবাসন করা প্রায় ষাট লক্ষ শরনার্থীদের নিয়ে বিবাদের ছায়া তৈরী হয়।

১৬ জুন, ১৯৭১ – বয়রা বাজারঃ ইন্দো-পাকিস্তান সীমান্তের উপরে

নতুন করে শরনার্থীরা পূর্ব পাকিস্তানের যশোর জেলা দিয়ে ভারতে ঢুকছে বারো দিনের স্তিমিত শরনার্থী স্রোতের পরে।

পাদটীকাঃ এটা খুব কৌতুহলোদ্দীপক যে, রয়টার্স সংবাদ সংস্থার অনুযায়ী ১৬ জুন পর্যন্ত ১২ দিন শরনার্থী প্রবেশ কমে গিয়ে পানি টিপ টিপ করে পরার হয়ে গিয়েছিলো যেখানে ভারতীয় সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলছিলো। ১৮ মে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী শরনার্থীর সংখ্যা ছিলো দশ লক্ষাধিক, ২৪ মে ২৫ লক্ষ; ৭ জুন ৪৭ লক্ষ; ১১ জুন ৫৫ লক্ষ; ১৬ জুন ৬০ লক্ষ। যেই সংখ্যা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী দিল্লীতে এবং ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী ১৭জুন ১৯৭১, ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবকে দেওয়া ভাষনে বলেন। 

ভারতের দেওয়া শরনার্থীদের সংখ্যা অতিরঞ্জিত বললে পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া যাবে কি?