শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিলের দাবীতে সারা প্রদেশে হরতাল পালিতঃ ঢাকায় গুলি, লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপঃ একজনের মৃত্যু, শতাধিক আহতঃ অসংখ্য গ্রেফতার

Posted on Posted in 2

<2.28.183-186>

 

 

দি পাকিস্তান অবজারভার
মঙ্গলবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৬২

 

১৯৬২ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবারের “দি পাকিস্তান অবজারভার” এর রিপোর্ট অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সালে “শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট” বাতিলের প্রতিবাদে সারা প্রদেশে হরতাল পালিত হয়। হরতালে ঢাকায় গুলি, লাটিচার্জ ও কাদুনে গ্যাস নিক্ষেপে একজনের নিহত ও শতাধিক আহত হন, এবং অসংখ্য মানুষকে গ্রেফতার করা হয়।

 

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভরত লোকজনের উপর পুলিশের গুলি, টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জে গতকাল (সোমবার) একজন নিহত ও শতাধিক আহত হন। শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিলের দাবীতে ছাত্র-ছাত্রী ও জনসাধারনের বিক্ষোভ ও মিছিলের মধ্য স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়।

শহরের আইন-শৃংখলা রক্ষায় প্রশাসনকে সাহায্যের জন্য দুপুরের দিকে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়; শহরের ও উপশহরের পাঁচ থানাধীন এলাকায় পুনরায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

এদিকে সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হরতাল পালনের খবর আসতে থাকে। যশোরে বিক্ষোভরতদের উপর পুলিশের প্রকাশ্য গুলির খবর পাওয়া যায়। চট্টগ্রামে পুলিশ-জনসাধারন সংঘর্ষের পর সেনা মোতায়েন করা হয়।

গতকাল সন্ধ্যায় সরকার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে একজনের মৃত্যু ও ৭৩ জনের আহত হওয়ার কথা জানায়। এছাড়াও সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ৫৯ জনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে সরকার।

শহরের দোকানপাট, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা ও আধা-সরকারী অফিস এখনও বন্ধ ছিল। হরতালের প্রতি জনসাধারনের সমর্থন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। সরকারী অফিসে উপস্থিতির হার কম ছিল বলে জানা নায়।

বেলা আনুমানিক সাড়ে ১০ টার দিকে সচিবালয়ের সামনের তোপখানা রোডে কিছু পিকেটার জনসাধারনকে হরতাল পালনের ডাক দেন। তারা তখন চলন্ত গাড়ী বাধা দেন। তখনই পুলিশের একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়ে লাঠিচার্জ শুরু করে। ছাত্র-ছাত্রীরা ইট-পাটকেল ছুড়ে জবাব দেন। পুলিশ দৌড়ে সচিবালয়ে ঢুকে গেট বন্ধ করে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ভেতর থেকে বেলা ১১ টার কয়েক মিনিট পুর্বে একটি মিছিল বের হয়।

এরইমধ্যে ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজে পুলিশি অভিযান ও জগন্নাথ কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের উপর টিয়ার-গ্যাস নিক্ষেপের খবর বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়ো হওয়া ছাত্র-জনতার কাছে পৌছায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে জড়ো হওয়া বিভিন্ন দিক হতে আগত মিছিল একসাথে স্লোগান দিতে দিতে আদালতের দিকে যায়।

পুলিশ প্রথম বড় ধরনের একশনে যায় হাইকোর্টের সামনে জড়ো হওয়া ছাত্র-জনতার উপর। এর আগে সেখানে হরতাল সমর্থকরা অনেকগুলো গাড়ী আটকে দেন ও টায়ার পাংচার করেন, গাড়ী ভাংচুর করে রাস্তায় উল্টিয়ে রাখেন, লাঠি হাতে পুলিশের সাথে ঘন্টাব্যাপী ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ায় করেন।

কার্জন হলের মাইন গেইটের সামনে উত্তেজিত বিক্ষোভকারীদের একটি দল প্রাদেশিক মন্ত্রী খাজা হাসান আসকারীর মার্সিডিস বেঞ্জে আগুন ধরিয়ে দেন। সচিবালয়ের দিকে যাওয়ার পথে মন্ত্রী পিকেটারদের কবলে পড়েন। মন্ত্রীকে গাড়ী থেকে জোর করে নামিয়ে দিয়ে গাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মন্ত্রী এরপর হেটেই সচিবালয়ে যান।

এরপর মিছিল পুলিশের বাধা ছাড়াই এগিয়ে যায়। তখন জগন্নাথ কলেজ থেকে কয়েকশত ছাত্র-ছাত্রী মিছিলে যোগ দেন। হাইকোর্ট ভবনের মেইন গেইটে পুলিশী ব্যারিকেড বসানো হয়। হরতাল-কবলিত গাড়ী উদ্ধারগামী ফায়ারব্রিগেডের গাড়ী বিশাল মিছিলে আটকা পড়ে ঘটনাস্থলে পৌছতে ব্যার্থ হয়।

মিছিলটি পুলিশী ব্যারিকেডের মুখোমুখি না হয়ে আব্দুল গনি রোডে অবস্থিত সচিবালয়ের দিকে যেতে থাকে, এবং মিছিলের অর্ধেক কোনরকম পুলিশী বাধা ছাড়াই এগিয়ে যায়। মিছিলকারীদের কেউ কেউ পাথর ছুড়ে মারলে পুলিশ ট্রাক থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে বিক্ষোভকারীদের আক্রমন করে ছত্রভংগ করে দেয়। তীব্র যন্ত্রনায় একজনকে হাটু ধরে কাতরাতে দেখা যায়, এবং তাকে কমিশনার অফিসে জোর করে ঢোকানো হয়। দশ বছরের কম বয়সী এক বালকও আহত হয়। বিক্ষোভকারীরা ইট ছুড়ে জবাব দিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

সংঘর্ষকারীরা পুনরায় জড়ো হয়ে জোর করে আব্দুল গনি রোদের দিকে এগিয়ে যায়। দুই পক্ষের মধ্যে ইট নিক্ষেপ চললেও মিছিলটি প্রায় বিনা বাধায় জিন্নাহ এভিনিউ হয়ে নবাবপুর টালিগড়ের দিকে এগিয়ে যায়।

এদিকে ক্রমেই বড় হতে থাকা ছাত্রদের একটি মিছিল শান্তিপূর্নভাবে দুপুর ১২ টার দিকে রাতখোলা পৌছায়। এইসময়ে ট্রাফিক পুলিশবাহী একটি পিকয়াপ দক্ষিন দিক থেকে মিছিলের দিকে এগিয়ে আসে। পুরো রাস্তাজুড়ে মিছিল থাকায় এটি আর এগুতে পারছিলো না। বিক্ষোভরত অনেকে ইট  ছোড়া শুরু করেন। এসময় কিছু ছাত্র-ছাত্রী এগিয়ে এসে গাড়ীটি ঘিরে ধরলে ইট ছোড়া বন্ধ হয়।

ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তায় গাড়ীটি পূর্ন গতিতে জেলা জজ কোর্টের দিকে পিছু হটে। ছাত্র-ছাত্রীরা সেখানে গাড়ীটি রেখে যান এবং পুলিশ সদস্যরা নিরাপদে আদালত এলাকায় ঢুকে পৌছান। মিছিলের অগ্রভাগ আদালত ভবন নিরাপদে পাড়ি দেওয়ার পর পুলিশ আদালত ভবন থেকে মিছিলে লাঠিচার্জ করে মিছিলকে দ্বিখন্ডিত করে ফেলে।

বিক্ষোভকারীরা তখন পুলিশের ও আদালত ভবনের দিকে ইট নিক্ষেপ শুরু করে। পুলিশ তখন পুনরায় লাঠিচার্জ করে মিছিলটি দ্রুত ছত্রভংগ করে দেয়। এক বালক সহ অনেকেই তখন আহত হন।

ইট, পাথর ও টিয়ার-গ্যাসের খালি শেলে পুরো রাস্তা রণক্ষেত্রে পরিনত হয়।

এদিকে ইপিআর-এর একটি দল ভিক্টোরিয়া পার্ক ক্যাম্পে অপেক্ষমান ছিল। ফায়ার ব্রিগেডের একটি ভ্যান আদালতের দিকে যাওয়ার সময় উত্তেজিত বিক্ষোভকারীদের মুহুর্মুহ ইট নিক্ষেপের কবলে পড়ে। ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যরা, যাদের অনেকেই আহত, ভ্যানটি  ফেলে নিরাপদে আশ্রয় নেন।

এরপরই পুলিশ ভয়ানক লাঠিচার্জ করে ও মুহুর্মুহ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে কয়েক মিনিটের মধ্যে রাস্তা খালি করে দেয়।

বেলা ১২ টা ৪৫ মিনিটের দিকে রুটিন সতর্কবানী দিয়ে পুলিশ বিক্ষিপ্ত মিছিলে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে। তিন রাউন্ড গুলি করা হয় বলে সরকারের এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

মিছিলকারীদের কেউ কেউ পুলিশের দিকে পাথর ছুড়ে মারেন। পুলিশ তখন গনহারে লাঠিচার্জ করে রাস্তা খালি করে দেয়। কালেক্টোরেটের উত্তর গেইটে থাকা সাধারন মানুষের উপরও পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এই নির্বিচার লাঠিচার্জ থেকে কেউ রেহাই পাননি এমনকি ছোট ছোট বালকদেরও ছাড় দেয়নি পুলিশ। ঘটনা কাভার করতে আসা এক সাংবাদিকও রেহাই পাননি; তাকে একটি পুরনো ০১১ দিয়ে আঘাত করা হয়। ঠিক তখনই মেডিকেল কলেজ থেকে একটি এম্বুলেন্স এসে লাঠিচার্জে আহত অনেককে দ্রুত সরিয়ে নেয়।

ছত্রভঙ্গকৃত মিছিলটি চার্চ ও মুকুল থিয়েটার এর সামনে পুনরায় জড়ো হওয়া শুরু করলে দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে পুলিশ তাদের উপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এর কয়েক মিনিট পরই ইপিআরের একটি আর্মড কার এসে ঘটনাস্থলে পৌছায়। এর কিছুক্ষন পরে ১২ টা ৫৫ মিনিটে রাইফেলের শব্দ শোনা যায়। এরপরই কালেক্টোরেট বিল্ডিং এর উত্তর গেইটের উত্তরদিকে সবাই আতংকিত হয়ে ছত্রভংগ হয়ে যান।

পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে পড়লে গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরিহিত এক ব্যাক্তিকে ক্ষত-বিক্ষত পেট নিয়ে কালেক্টোরেট ভবনের বিপরীতে অবস্থিত প্রাদেশিক একুইজিশন অফিস এর বারান্দায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। বেলা ১ টা ৫ মিনিটের দিখে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি এম্বুল্যান্স এসে নিয়ে যায়। দুপুর থেকে বিকেল এমনকি সারা রাত অসংখ্য মানুষ এসে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড ও ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে।

বেলা ২ টা ৩০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের ও আশেপাশের সকল রাস্তার নিয়ন্ত্রন নেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছে সেনাবাহিনীর একটি শক্তিশালি গ্রুপ মোতায়েন করা হয়। বিকেলের ২০ মিনিটের বৃষ্টি পুলিশ ও দর্শনার্থী সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে বাধ্য করে।

যশোরঃ যশোর থেকে এপিপি জানিয়েছে, পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে ৪১ জন পুলিশ সদস্য ও পুলিশ সুপার সহ অন্ততঃ ৪৩ জন আহত হয়েছে।

চট্টগ্রামঃ বিক্ষোভরত ছাত্র-ছাত্রী ও পুলিশের মধ্যে ৫০ জন পুলিশসহ শতাধিক আহত হওয়ার পর প্রশাসনকে সাহায্যের জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ২৭ জন ছাত্র-ছাত্রীসহ প্রায় ১০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।