শেখ মুজিবুর রহমানকে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন

Posted on Posted in 2

<2.165.666-667>
 

শিরোনামসূত্রতারিখ
শেখ মুজিবুর রহমানকে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার আহবান জানিয়ে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনপূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন

(প্রচারপত্র)

২ মার্চ, ১৯৭১

 

শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের উদ্দেশে

পূর্ব বাংলা শ্রমিক আব্দোলনের

খোলা চিঠি

পূর্ব বাংলা আন্দোলনের বিপ্লবী পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত

তারিখঃ ২রা মার্চ, ১৯৭১

 

          আপনার ও আপনার পার্টির ছয়-দফা সংগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, ছয়-দফার অর্থনৈতিক দাবীসমূহ বাস্তবায়ন সম্ভব সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন, মুক্ত ও স্বাধীন করে।

 

          আপনাকে ও আপনার পার্টিকে পূর্ব বাংলার সাত কোটি জনসাধারণ ভোট প্রদান করছে পূর্ব-বাংলার উপরস্থ পাকিস্তানের অবাংগালী শাসকগোষ্ঠী ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের অবসান করে স্বাধীন ও সার্বভৌম পূর্ব-বাংলার প্রজাতন্ত্র কায়েমের জন্য।

 

          পূর্ব-বাংলার জনগণের এ আশা-আকাঙ্খা বাস্তবায়নের জন্য পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন আপনার প্রতি ও আওয়ামী লীগের নিম্নলিখিত প্রস্তাবাবলী পেশ করেছেঃ

 

          (১) পূর্ব-বাংলার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে এবং সংখ্যাগুরু জাতীয় পরিষদের নেতা হিসেবে স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ, প্রগতিশীল পূর্ব-বাংলার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করুন।

 

          (২) পূর্ব-বাংলার কৃষক-শ্রমিক প্রকাশ্য ও গোপনে কার্যরত পূর্ব-বাংলার দেশপ্রেমিক  রাজনৈতিক পার্টি ও ব্যক্তিদের প্রতিনিধি সম্বলিত স্বাধীন, গণতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ, প্রগতিশীল পূর্ব-বাংলার প্রজাতন্ত্রের অস্থায়ী সরকার কায়েম করুন।

 

          প্রয়োজনবোধে এ সরকারের কেন্দ্রীয় দফতর নিরপেক্ষ দেশে স্থানান্তরিত করুন।

 

          (৩) পূর্ব-বাংলাব্যাপী এ সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের সূচনার আহবান জানান।

 

          এ উদ্দেশ্যে পূর্ব-বাংলার জাতীয় মুক্তি বাহিনী গঠন এবং শহর ও গ্রামে জাতীয় শত্রু খতমের ও তাদের প্রতিষ্ঠান  ধ্বংসের আহবান জানান।

 

          (৪) পূর্ব-বাংলার জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার জন্য শ্রমিক-কৃষক এবং প্রকাশ্য ও গোপনে কার্যরত পূর্ব-বাংলার দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক পার্টি ও ব্যক্তিদের প্রতিনিধি সমন্বয়ে “জাতীয় মুক্তি পরিষদ” বা “জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট” গঠন করুন।

 

          (৫) প্রকাশ্যে ও গোপনে, শান্তিপূর্ণ ও সশস্ত্র, সংস্কারবাদী ও বিপ্লবী পদ্ধতিতে সংগ্রাম করার জন্য পূর্ব-বাংলার জনগণের প্রতি আহবান জানান।

 

 

 

 

(৬) পূর্ব-বাংলার প্রজাতন্ত্র নিম্নলিখিত কর্মসূচী বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি প্রদান করবেঃ

 

(ক) পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীকে পরিপূর্ণভাবে উৎখাত করা এবং পূর্ববাংলাস্থ তাদের সকল সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়করণ করা। ঔপনিবেশিক সরকারের সকল প্রকাশ শোষণ ও অসম চুক্তির অবসান করা। এদের দালালদের সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়করণ করা। এদের মধ্যে সনাতনদের চরম শাস্তির ব্যবস্থা করা।

 

(খ) পূর্ব-বাংলার জাতীয় বিশ্বাসঘাতকদের সকল নাগরিক অধিকার বাতিল করা। সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে শ্রমিক-কৃষক-দেশপ্রেমিকদের জাতীয় সরকার গঠন করা।

 

(গ) গ্রাম্য এলাকায় উনিবেশিক সরকারের ভূমি শোষণের অবসান করা । সরকারী খাসভূমি এবং বিশ্বাসঘাতক জমিদার-জোতদার ও অন্যান্য দেশদ্রোহীদের ভূ-সম্পত্তি ভূমিহীন ও গরীব কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা। দেশপ্রেমিক জমিদার জোতদারের পরিচালিত শোষণ হ্রাস করা।

 

(ঘ) শ্রমিকদের আট ঘন্টা শ্রম সময়, ট্রেড ইউনিয়ন, অধিকার ; ন্যায্য দাবী প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সমর্থন করা।

 

(ঙ) গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয়করণ করা।

 

(চ) ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবিদের ন্যায্য দাবী-দাওয়া প্রতিষ্ঠা করা।

 

(ছ) ধর্মীয়, ভাষাগত ও উপজাতীয় সংখ্যালঘুদের সকলক্ষেত্রে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা।

 

(জ) পূর্ব-বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের অসম উন্নতির সমতা বিধানের ব্যবস্থা করা।

 

          (ঝ) বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, খরা ও পোকা এবং দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা।

 

          (ঞ) জাতীয় সংস্কৃতি, শিল্পকলা, শিক্ষা, গবেষণা, খেলাধুলা ও শরীর গঠনের ব্যবস্থা করা।

 

          (ট) পঞ্চশিলার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্তানের পররাষ্ট্র নীতি কায়েম করা।

 

          (ঠ) বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুক্তি ও সামাজিক অগ্রগতির সংগ্রাম সমর্থন করা।

 

          (ড) মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পূর্ব-বাংলাস্থ তৎপরতার বিরুদ্ধে সজাগ থাকা।

 

          ইয়াহিয়া-ইয়াকুবের বেয়নেট বুলেটের নিকট আত্মসমর্পন করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ মেনে নেওয়া বা সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার দুটো পথ পূর্ব-বাংলার জনগণের সামনে খোলা রয়েছে।

 

          পূর্ব-বাংলার জনগণ রক্তের বিনিময়ে প্রশাসন করেছে স্বাধীনতার চাইতে প্রিয় তাদের নিকট আর কিছুই নেই।

 

          আপনি ও আপনার পার্টি অবশ্যই উপরোক্ত প্রস্তাবের ভিত্তিতে জনতার এ আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন করবেন। অন্যথায় পূর্ব-বাংলার জনগণ কখনই আপনাকে ও আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করবে না।

          পূর্ব-বাংলার স্বাধীনতা-জিন্দাবাদ।

          পূর্ব-বাংলার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র-জিন্দাবাদ।

          পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী ও তার দালালদের খতম করুন।

          গ্রামে-শহরে জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করুন।

          সমস্ত দেশ প্রেমিকদের-ঐক্যবদ্ধ করুন।