সাংবাদিক স্বাধীনতা ও হানাদার অধিকৃত বাঙলাদেশ

Posted on Posted in 5
সাংবাদিক স্বাধীনতা ও হানাদার অধিকৃত বাংলাদেশ

 

৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

……সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পকিস্তানের বিগত চব্বিশ বছরের ইতিহাস মানবসভ্যতার ক্ষেত্রে এক কলঙ্কময় অধ্যায়। এই দীর্ঘ চব্বিশ বৎসর যাবৎ পশ্চিম শাসক ও শোষক গোষ্ঠী তাদের শ্রেণী:স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বার বার শুধু জনগণের কণ্ঠই রোধ করেনি অধিকন্তু জনগণের অন্তরে আশা ও ভাষার মূর্ত প্রতীক নির্ভীক মুখপত্রগুলোর উপরও চালিয়েছে বিবেকহীন ধারলো কাঁচি।

১৯৯৪ সন থেকেই পশ্চিমা শাসক ও শোষক গোষ্ঠী অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই পথটি বেছে নেয়। শুধু তাই নয়, নিজস্ব স্বার্থে তারা জনগণের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির উপরও জঘন্য হামলা চালিয়েছে। বাংলাদেশ তার অনন্য শিকার। আর সেই শাসকচক্র বাংলাদেশে তাদের অন্যান্য রাজনৈতিক দালাল গোষ্ঠীর মতোই সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও কিছু তোষামদকারী ও চাটুকারের দল খুঁজে পেয়েছিল। নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ

করার জন্য তারা সব সময়ই জনগণের স্বার্থকে নিদারুণভাবে বলি দিয়ে গেছে। অপরদিকে স্বীয় স্বার্থের প্রতি নজর দিয়ে যারা শোষিত জনগণের অন্তরের কথাকে তুলে ধরতে চেয়েছিলো, তাদের ভাগ্যে জুটেছে সীমাহীন অত্যাচার, লাঞ্ছনা ও চরম দারিদ্র।

বিগত চব্বিশ বছরে বাংলার জনগণের প্রিয় মুখপাত্র দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ ও জনতার আরো কয়েকটি পত্রিকা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সে সমস্ত দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকের সেদিনকার সে দুরবস্থা কোনদিনই ভোলার নয়। তবু তারা হার মানেনি কোনদিন ষড়যন্ত্রকারীদের কাছেসকল প্রকার দুঃখ-দারিদ্র, জেল-জুলুম, অন্যায় ও নির্যাতনের কাছে। সত্য ও ন্যায়ের পথে তাঁরা ছিল একাত্ম এবং সোচ্চার। অগ্নিক্ষরা ছিল তাঁদের লেখনী।

সরকারী বিধিনিষেধ, জেল-জুলুম এবং সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াও পশ্চিমা শাসক ও শোষক পদলেহী বিছুসংখ্যক এদেশীয় পত্রিকার মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিক তাঁদের প্রভুদের চেয়েও কাণ্ডজ্ঞানহীনতার ক্ষেত্রে অনেক বেশী বর্বরতার পরিচয় দিয়েছেন।…….. তাছাড়া স্থাবর ও অস্থাবরসহ প্রায় কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তির অধিকারী হয়েছে। মালিকপক্ষ ছাড়াও বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কয়েকজন লোক অপ্রয়োজনীয় আগাছার মতো সম্পাদকের আসন গেড়ে বসে আছেন- যারা সবসময়ই জাতীয় স্বার্থ, সাহিত্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে সর্বপ্রকার শোষণ, শাসন ও নির্যাতন চলাকালেও একতা, সংহতি ও ইসলামের জিগীর তুলে বাঙালী জাতির ন্যায্য অধিকারকে নির্দয়ভাবে চাপা দিয়ে গেছেন।…….

এছাড়া বাংলাদেশের বাইরে- পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব সম্পাদক এবং সাংবাদিকই ‘পাকিস্তান টাইমস’ এর দীর্ঘস্থায়ী সম্পাদক জেড, এ, সুলেরীর চেয়ে গুরুত্বের দিক থেকে কোন অংশেই কম নয়। অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বাঙালী জাতিকে দাবিয়ে রাখার ব্যাপারে তিনি তার লেখনীতে সর্বপ্রকার ছলা, কলা ও ভণ্ডামির আশ্রয় নিতে কোনদিন কার্পণ্য করেননি।

সারা বাংলাদেশ আজ একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দিকে দিকে জ্বলে উঠেছে মুক্তির লাখো কোটি মশাল। তার আগুন স্ফলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার দিকে দিকে। স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অগণিত বাঙালী শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবীর দল। তারা প্রত্যেকেই আজ এক-একটি মুক্তিসেনায় পরিণত হয়েছে। জীবনকে বাজি রেখে তারা লড়ে যাচ্ছে মুক্তির জন্য। দুর্জয় সাহসে অপ্রতিরোধ্য গতিতে শত্রুর উপর আঘাতের পর আঘাত হেনে চলেছে। সে আক্রমণে পশ্চিমা জঙ্গীশাহীর তখতে তাউস কেঁপে উঠেছে।

এ মুহুর্তে কি করছেন শত্রুকবলিত আমাদের বাংলাদেশের সাংবাদিকরা? কি আজ তাদের নৈতিক এবং ঐতিহাসিক দায়িত্বে? বিবেকসম্পন্ন মননশীল সেসব সাংবাদিককে কোনকিছু বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ, বাংলাদেশের বিগত চব্বিশ বছরের রক্তাক্ত সংগ্রামের ইতিহাসে তাদেরও ছিল একটি সংগ্রামী ভূমিকা। কিন্তু আজ যখন তারা সম্পূর্ণ পরাধীন-বিবেক যেখানে বিধিনিষেধের বাহুল্যে ক্ষতবিক্ষত- চোখের সামনেই যেখানে ২৫শে মার্চের পর একমাত্র বাঙালী সংবাদ সরবরাহ সংস্থা বলেই Eastern News Agency- কে অন্যায়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ENA ছাড়াও দি পিপল, সংবাদ, স্বরাজ, বাংলার মুখ, একতা, স্বাধিকার, বাংলার বাণী, গণশক্তি, গণবাণী, হলিডে, এক্সপ্রেস ও আরও অনেকগুলো দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা বাঙালী জাতীয়তাবাদ, আওয়ামী লীগের ছয় দফা ও তাদের সংবাদকে অগ্রাধিকার ও প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এহেন অন্যায়কে তারা কিভাবে সহ্য করে যাচ্ছেন? শুধু তাই নয়- হানাদার এহিয়া সরকারের সর্বৈব মিথ্যা সংবাদ কিভাবে তারা দিনের পর দিন প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন? আমরা জানি বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা। তবুও বলবো, আজ যারা বাংলাদেশের নির্যাতিত ও শোষিত জনগণ এবং বাংলাদেশ সরকারের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, তারা তাদের

চেয়েও কি মানসিক দুরবস্থায় আছেন। হার না মানা সেসব বিবেকসম্পন্ন সাংবাদিকরা তো মরে যান নি! মুক্তিপ্রত্যাশী সেসব সাংবাদিকরা দুর্বার আকাংক্ষা নিয়ে এখনো জনগণের সংগ্রামী চেতনা ও মনোবল যোগানোর জন্য লেখনীতে অগ্নি ঝরিয়ে যাচ্ছেন। বাঙালী জাতি তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা কোন দিনই ভুলে যাবে না। মুক্তিসংগ্রামে তাদের অমূল্য অবদান অমর ও অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে বাঙালী জাতির সংগ্রামী চেতনার এবং ইতিহাসে ।

পশ্চিমা হানাদার বাহিনী- যারা পৃথিবীর বুক থেকে বাঙালী জাতিকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিলেন- যাদের আক্রমণে ১৪ লক্ষ নিরস্ত্র লোক নিহত- যাদের অত্যাচকারে ৯০ লক্ষ নিরপরাধ, নিঃসহায় মানুষ নিজেদের আবাসভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে- তাদের ক্ষমা নেই। বাঙালী জাতি তার সমুচিত প্রতিশোধ নিতে আজ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শুধু তাই নয়- বাংলাদেশের যেসব পত্রিকা মালিকপক্ষ ও সাংবাদিক গোষ্ঠী আজো সেই নরঘাতক ঔপনিবেশিক সরকারের নারকীয় কার্যক্রমকে সহায়তা করছেন এবং মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন তাদেরও ক্ষমা নেই। সেদিন খুব বেশী দূরে নয়। এর যথাযোগ্য প্রতিদান তারা পাবেনই। পশ্চিম পাকিস্তানে কোনদিনই তাদের ঠাই হবে না। আত্মশুদ্ধি এবং দোষ স্থলনের পথ এখনো খোলা আছে। আমরা তাদের সংগ্রামী আহবান জানাই তারা যেন হানাদার এহিয়া সরকারের তাঁবেদারী ও দালালী ত্যাগ করে, এখনো জনগণের মুক্তিসংগ্রামে একাত্মতা ঘোষণা করতে এগিয়ে আসেন।

বাঙালী জাতি হানাদার জঙ্গীশাহীর কোন প্রকার চাতুরিতেই আর বিভ্রান্ত হবে না। তারা জানে বাংলাদেশে অসামরিক পুতুল সরকার নিয়োগ, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও আলোচনার জন্য ভারত সবকারকে আমন্ত্রণ জানানোর পেছনে তাদের আন্তরিকতা ও সততা কতটুকু আছে। পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করাই হচ্ছে বাঙালী জাতির শেষ কথা! বাঙালী জাতি তাদের জীবনে আর কখনো ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না, বরং পশুশক্তির সমূলে উচ্ছেদ করাই হচ্ছে তাদের বজ্ৰকঠোর শপথ। সে সংগ্রামে বাংলাদেশের বুদ্ধিদীপ্ত বিবেকসম্পন্ন সাংবাদিক শ্রেণীই বা কেন পিছিয়ে থাকবেন। বাঙালী জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে তাদেরও একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। আজ যখন সে দিন অত্যাসন্ন তখন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য বিনা দ্বিধায় তাদের এগিয়ে আসা উচিত। পূর্ব দিগন্তে উদীয়মান মুক্তিসূর্যের দীপ্ত আভাস ফুঠে উঠেছে। তাকে জীবন্তভাবে প্রকাশের মাধ্যমে জনগণ ও বিশ্ববাসীর সম্মুখে তুলে ধরার অনেকটা দায়িত্বই বাংলাদেশের সাংবাদিকদের উপর ন্যস্ত।

(গাজীউল হাসান রচিত)