সাক্ষাৎকারঃ এ, মাসুদ (চুল্লু)

Posted on Posted in 9

<৯, ১৬.৭, ৪৮০>

ঢাকায় গেরিলা অপারেশন-২
সাক্ষাৎকারঃ এ মাসুদ (চুলু)

(‘রোববার’ বিজয় দিবস সংখ্যা, ১৯৮১-সালে,প্রকাশিত জিল্লুর রহিম রচিত ‘ঢাকা শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম সকল অভিযান শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে সংকলিত)

 

আগষ্টের প্রথম সপ্তাহে ফার্মগেটে আমরা সামরিক বাহিনীর ক্যাম্পে এক সফল গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করেছিলাম। এই অপারেশনের দিনটি আমার কাছে এই জন্য স্মরণীয় যে সেদিনের ঘটনার সবকিছু আজো চোখের সামনে ভাসে। তখন গুলশানে আমাদের শেলটার ছিলো। ফার্মগেটে সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প কিছু সিপাইসহ একজন ক্যাম্পেট র্যাংকের অফিসার থাকতো। ফার্মগেট দিয়ে চলাচলকারী সকল গাড়ি ও লোকজনকে তারা তল্লাশী করায় আমরা চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখিন হচ্ছিলাম। তাই এই ক্যাম্প আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথমে রেকি করলাম আমি, মায়া, বদি ও কাজী। রেকির পর সিদ্ধান্ত হলো যে, ক্যাম্প আক্রমণ করতে আমরা সক্ষম হবো। ফার্মগেট আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেবার পর দ্বিতীয় দফা রেকির জন্য পাঠানো হলো উলফত ও দুলালকে। প্রথম ও দ্বিতীয় রেকি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা আক্রমণের কৌশল নির্ধারণ করি।

সামাদ ভাইয়ের তৎকালীন মগবাজারের বাড়িতে আমাদের অপারেশন গ্রুপের অবস্থান ছিলো। অপারেশনের আগে ফার্মগেট সামরিক ক্যাম্পের খুব কাছে একটি বাড়ি থেকে দুলাল টেলিফোনে সামরিক ক্যাম্পের সর্বশেষ তৎপরতা এবং অবস্থান সম্পর্কে আমাদের অবহিত করছিলো। অপারেশনে আমরা দুটি গাড়ি ব্যবহার করেছিলাম। অপারেশনের গাড়িটি ছিলো সামাদ ভাইয়ের। চালাচ্ছিলেন সামাদ ভাই নিজেই। তার সঙ্গে ছিলো আলম, কাজী, পুলু, উলফত ও বদি। সামাদ ভাইয়ের গাড়ি চালনার ভেতর সেদিন যেনো যাদুর স্পর্শ ছিলো। সে এক অকল্পনীয় কৌশল। আমি পিছনে কভার গাড়িতে ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলো গাজী দস্তগীর, জিয়া ও আনু। এখন যেখানে ফার্মগেট ওভারব্রীজ সেখানে রাস্তার দু’পাশে সামরিক বাহিনীর কড়া পাহারা ছিলো। অপারেশনের জন্য আমরা ত্বরিত কৌশল গ্রহণ করেছিলাম।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এমন সময় অপারেশন স্থলে পৌঁছে লক্ষ্য করলাম সেনাবাহিনীর কয়েকজন লোক টুলের উপর বসে গল্প করছে ও কয়েকজন দাড়িয়ে রয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো আকস্মিক আক্রমণ পরিচালনা করা যাতে হানাদার বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। প্রথমেই ২টি এসএমজি দিয়ে আলম ও পুলু দুদিকে গার্ড দুজনকে বুলেটবিদ্ধ করে গাড়ি থেকে ক্যাম্পের ভিতর ব্রাশফায়ার শুরু করে। এই ত্বরিত আক্রমণে পাকসেনারা হতভম্ব হয়ে যায়। আতংকে তাদের ছোটাছুটিতে এক বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় পাল্টা আক্রমণের সুযোগ নিতে তারা সক্ষম হয়নি। এরই ভিতর সামাদ ভাই গাড়িটাকে দাড়ানো অবস্থায় রাস্তার সেই স্বল্প পরিসর জায়গায় মুহুর্তের ভেতর এমনভাবে ঘুরিয়ে নিলেন যা আমার কাছে আজো বিস্ময়কর, অলৌকিক মনে হয়। গাড়িটাকে তিনি এমনভাবে ঘুরিয়েছিলেন, ঠিক যেনো ডিগবাজির মতো। এই অস্বাভাবিক গাড়ি ঘুরানোর সাথে সাথেই আলম ও পুলু গাড়িতে উঠে পড়ে এবং গাড়ি থেকে পাক বাহিনীর প্রধান ক্যাম্প লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। সফল আক্রমণ পরিচালনা করে চোখের পলকে সামাদ ভাইয়ের গাড়ি অদৃশ্য হয়ে যায়। সামাদ ভাই নিরাপদে আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মতিঝিলের নাভানা ওয়ার্কশপে পৌঁছে জামান ভাই ও আনোয়ার ভাইয়ের হেফাজতে আর্মস সহ গাড়ি রেখে ফিরে যান বাড়িতে। কভার গাড়ি নিয়ে আমরা গুলশানের শেলটারে পৌঁছাই। পরে জানতে পেরেছিলাম এই অপারেশনে ১জন অফিসারসহ ১৭ জন পাকসেনা নিহত হয়েছিলো।