সাক্ষাৎকারঃ গাজীউল হক

Posted on Posted in 9

<৯, ১২.২, ৩৩৯-৩৪৭>

সশস্ত্র প্রতিরোধ বগুড়া
সাক্ষাৎকারঃ গাজীউল হক
২১-০৮-৮৩

১৯৭১ সাল। ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত সাড়ে তিনটা। এমদাদুল হক নামে এক তরুণ এসে ঘুম থেকে ডেকে তুললো। এক্ষুনি থানায় যেতে হবে; জরুরী খবর আছে। খবর এসেছে পাকসেনা বগুড়ার দিকে এগিয়ে আসছে। দু’মিনিটে তৈরি হয়ে নিলাম। চিন্তা ভাবনার ফুরসৎ নেই। ছুটতে হলো ডাঃ জাহিদুর রহমান (এমপি)তাঁর বাড়িতে ব্যালকনিতে দাড়িয়ে ছিলেন।ডাকতেই নেমে এলেন। তাকে নিয়েই ছুটতে ছুটতে থানায় হাজির হলাম।

 

আধো আলো আধো অন্ধকার বগুড়া কোতাওয়ালী থানার আঙ্গিনায় ২০/২৫ জন লোক দাড়িয়ে। সামনে এগিয়ে এলেন মকবুল সাহেব (ইন্টেলিজেনস ব্যাঞ্চের অফিসার)। তিনি জানালেন অয়ারলেসে খবর এসেছে পাকসেনারা রাজারবাগ এবং পীলখানা আক্রমণ করেছে। রাজারবাগ এবং পীলখানায় প্রতিরোধ চলছে। এদিকে রংপুর থেকে পাকিস্তানী সৈন্য বগুড়ার দিকে এগিয়ে আসছে।

 

নিজেকে ভীষণ অসহায় বোধ করছিলাম। আমি নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলাম না। কোন রাজনৈতিক দলের নেতাও নই। সুতরাং এ অবস্থায় আমার দায়িত্ব কতখানি বুঝতে না পেরে বিব্রত বোধ করছিলাম। ডাঃ জাহিদুর রহমানের অবস্থাও আমার চাইতে বিশেষ সুবিধার নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি সম্পূর্ণ নতুন। ৭০ সালেই নির্বাচনের আগে সক্রিয় রাজনীতিতে এসেছেন এবং পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবুও কর্তব্য সমন্ধে যেন হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠলেন; বললেন; এখন সকলকে ডেকে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় নেই। প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান। সুতরাং আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। “মকবুল সাহেব; অফিসার ইন-চার্জ নিজামউদ্দিন সাহেব এবং থানার অন্যান্য পুলিশ কর্মচারীগণেরও একই মত। সমস্ত দুর্বলতা ঝেড়ে ফেললাম। হঠাৎ যেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো “অল রাইট; আই এসিউম দি কমাণ্ড। উই শ্যাল রেসিস্ট দি পাকিস্তানি আর্মি।”

 

কিছুক্ষণের জন্য আলোচনা হলো বগুড়া থেকে আট মাইল দক্ষিণে আড়িয়া ক্যান্টনমেন্ট। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট উত্তরে। মকবুল সাহেব বললেন; আড়িয়াতে পাকসেনার সংখ্যা খুব বেশী নয়। সুতরাং তারা হঠাৎ কিছু করবে না। তাছাড়া; অয়ারলেসে খবর এসেছে রংপুর থেকে পাক আর্মি আসছে। মনে পড়লো ২৫শে মার্চের সন্ধ্যার সময় ছাত্রলীগের সামাদ এবং ছাত্র ইউনিয়নের রেজাউর রহমান ডিংগুর নেতৃত্বে বগুড়া আড়িয়া সড়কের মাঝখানে কটকির সংকীর্ণ পুলের উপর গাছ কেটে ফেলে এবং ইটের স্তূপ সাজিয়ে ব্যারিকেড দেয়া হয়েছিলো। সুতরাং শহরের উত্তরে বগুড়া-রংপুর সড়কের ব্যারিকেড দিতে হবে। ব্যারিকেড বাধা পেলে হয়তো রাতে তারা আর এগুবে না। শহরবাসীদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অন্ততঃ সকাল পর্যন্ত সময় চাই। (আমাদের চিন্তায় ভুল ছিলনা সেটা পরে প্রমাণিত হয়েছে। শহর থেকে তিন মাইল উত্তরে মাটিডালীতে ব্যারিকেড দেখে পাকিস্তানী সৈন্যরা রাতে শহরে ঢুকতে সাহস করেনি)।

 

দারোগা নিজামউদ্দিন এবং নুরউল ইসলাম তিনজন কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে রাইফেল হাতে নির্দেশমত আজাদ গেস্ট হাউসের ছাদে ঘাটি গাড়লেন। পাকিস্তানী সেনা রেললাইন পার না হওয়া পর্যন্ত তারা আক্রমণ চালাবেন না এই নির্দেশ তাদের দেয়া হলো, পুলিশ ফোর্সের অন্যান্যদের অস্ত্রশস্ত্র পুলিশ লাইনে পাঠিয়ে দিলাম। মকবুল সাহেব চলে গেলেন অয়ারলেসে আর কোথাও যোগাযোগ করা যায় কিনা সে চেষ্টা চালাতে।

 

থানা থেকে বেরোতেই দেখি থানার গেটে ২০/২৫ জন ছাত্র-যুবক জমায়েত হয়েছে। খবর তারাও পেয়েছে। তাদের নিয়ে ডাঃ জাহিদুর রহমান এবং আমি ছুটলাম উত্তর দিকে। যত দ্রুত সম্ভব মাটিডালী পৌছতে হবে। ব্যারিকেড দিয়ে প্রথম বাধার সৃষ্টি করতে হবে। শেষ রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে স্লোগান উঠলো জাগো জাগো বীর বাঙালি জাগো জয় বাংলাঃ বীর বাঙালি হাতিয়ার ধরো; পাকিস্তানীদের প্রতিরোধ করো।

 

ছুটছি, রীতিমতো দৌড়চ্ছি। পাকিস্তানী সেনারা যে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে সে রাস্তা দিয়ে ছুটছি। পাগলের মতো চীৎকার করছি সবাই ঘুম থেকে জেগে উঠুন। পাকিস্তানী সেনারা আসছে। যাদের বন্দুক আছে,তারা বন্দুক হাতে বেরিয়ে আসুন। পাকিস্তানী সেনাদের ঠেকাতে হবে।’

 

মাটিডালী এসে পৌছলাম। শহর থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে। শ্লোগান দিতেই মুস্তাফিজুর (বাবু) সহ অনেকেই রাস্তায় বেরিয়ে এলো। ব্যারিকেড দেবার কথা বলতেই ১৫/২০ খানা কুড়াল নিয়ে গাছ কাটা শুরু হয়ে গেলো। রাস্তার দুপাশে র লোকজনদের বাড়ী ছেড়ে সরে যেতে নির্দেশ দেয়া হলো (পাক সেনারা ব্যারিকেড দেখে ওখানকার অনেক বাড়ীই পুড়িয়ে দিয়েছিলো)। একটা বিরাট গাছ রাস্তা জুড়ে পড়ার পর আবার ছুটলাম শহরের দিকে। মাটিডালীতে তখন আরো গাছ কাটা এবং ব্যারিকেড রচনার কাজ চলছে।

 

২৬শে মার্চের ভোর। পূর্ব আকাশে সূর্য মাত্র উকি দিয়েছে। ডাঃ জাহিদুর রহমানের বাড়ীতে সামনে রাস্তায় মাহমুদ হাসান খান একা দাঁড়িয়ে আছেন। মাহমুদ হাসান খান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আর সবাই কোথায়? জিজ্ঞেস করতে ঘাড় নেড়ে জানালেন, জানেন না। শুধু বললেন হাবিবুর রহমান (এমপি) আত্মসমর্পন করার পক্ষপাতী। (পরবর্তীকালে হাবিবুর রহমান পাক সেনাবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে তাদের সহযোগিতা করেছিলেন)।

 

‘না তা চলবে না।’ ডাঃ জাহিদুর রহমান রীতিমত ক্রুদ্ধ। মাহমুদুল হাসান খানকে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পাঠিয়ে ডাঃ জাহিদুর রহমানসহ দু খানা সাইকেলে ছুটলাম পুলিশ লাইনের দিকে। পথে দেখা করলাম জেলা প্রশাসক খানে আলম খান সাহেবের সঙ্গে; দেখলাম ভীষণ উদ্বিগ্ন। বললেন সম্মুখ যুদ্ধে ওদের সাথে পারবেন না। গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিন। আপনাদের সাফল্য করি।

 

এরপর পুলিশলাইন। পুলিশলাইনে মকবুল সাহেবের সঙ্গে দেখা হলো। জানালেন অয়ারলেসে কুষ্টিয়া ছাড়া আর কোন যোগাযোগ হয় নি। কুষ্টিয়ার শেষ খবর হানাদার বাহিনী কুষ্টিয়া আক্রমণ করেছে। এরপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

 

রিজার্ভ ইন্সপেক্টরের সঙ্গে পুলিশলাইনে কিছুক্ষন আলোচনা হলো। স্থির হলো ট্রেঞ্চ খুঁড়ে পুলিশ লাইনে তারা প্রস্তুত থাকবেন। সেকেণ্ড লাইন অব ডিফেন্স।

 

শহরে যখন ফিরে আসি তখন সকাল সাতটা। রাস্তায় লোক নেমে পড়েছে। কিন্তু অস্ত্রের সংখ্যা অতি নগণ্য। একনলা, দোনলা বন্দুক এবং টু-টু রোব রাইফেলসহ মাত্র ২৮টি। শুধু আজাদ গেস্ট হাউজের ছাদে দারোগা নিজামউদ্দীন এবং তার সঙ্গীর কাছে ৫টি ৩০৩ রাইফেল। যে দুরন্ত ২৭টি ছেলে আমার সঙ্গে ২৬শে মার্চের ভোরে অকুতোভয়ে হানাদার বর্বর পাক বাহিনীকে রুখে দাঁড়িয়েছিলো; তাদের সকলের ভাল নাম হলোঃ

(১) এনামুল হক তপন

(২) আবদুল জলিল

(৩) এমদাদুল হক তরুন

(৪) নুরুল আনোয়ার বাদশাহ

(৫) শহীদ টিটু

(৬) শহীদ হিটলু

(৭) শহীদ মোস্তাফিজ (ছনু)

(৮) শহীদ আজাদ

(৯) শহীদ তারেক

(১০) শহীদ খোকন পাইকাড়

(১১) সালাম (স্বাধীনতার পরে আততায়ীর হাতে নিহত)

(১২) বখতিয়ার হোসেন বখতু (আর্ট কলেজের ছাত্র)

(১৩) খাজা সামিয়াল

(১৪) মমতাজ (বর্তমানে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক)

(১৫) রাজিউল্লা

(১৬) টি এম মূসা (পেস্তা)

(১৭) নান্না

(১৮) সৈয়দ সোহরাব

(১৯) শহীদ বকুল

(২০) বুবলা

(২১) জাকারিয়া তালুকদার

(২২) মাহতাব

(২৩) টাটারু

(২৪) বুলু

(২৫) বেলাল

(২৬) এ কে এম রেজাউল হক (রাজু)

(২৭) ইলিয়াস উদ্দীন আহমদ।

 

কালীতলা থেকে রেললাইনের ২নং ঘুমটি পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে দেয়ালের আড়ালে ছোট ছোট দলে ভাগ করে এদের দাঁড়াবার নির্দেশ দিলাম। কিন্তু এই নির্দেশ ভেঙ্গে টিটু, হিটলু এবং মুস্তাফিজ বড়গোলায় ইউনাইটেড ব্যাংক (বর্তমানে জনতা ব্যাংক) এর ছাদে ঘাঁটি গেড়ে প্রতিরোধ করে এবং সেখানেই তারা শহীদ হন। তপন, সামিয়াল এবং বখতু ও জলিলসহ ৪জনের একটি দল কালীতলার মুখে প্রথম প্রতিরোধের জন্য ঘাঁটি গাড়লো। প্রত্যেককে নির্দেশ দিলাম গুলি করার সঙ্গে সঙ্গে স্থান ত্যাগ করে এক আড়াল থেকে সরে যেতে হবে অন্য আড়ালে। যুদ্ধ চলাকালীন যোগাযোগ রক্ষা; সংবাদ আদান প্রদান এবং নির্দেশ পৌঁছানোর দায়িত্ব নিল একরামুল হক স্বপন, মঞ্জু (শহীদ আজাদের ভাই), ছাত্রলীগের সামাদ, বিলু (মরহুম আকবর হোসেন আকন্দ সাহেবের ছেলে), সৈয়দ কেরামত আলী গোরা (পরবর্তীকালে পাক সেনাদের হাতে নিহত হন) এবং আবু সুফিয়ান (পরবর্তীকালে পাক্সেনাদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন)। সত্যি বলতে কি আমার নিজেকে একজন সেনাপতি সেনাপতি মনে হচ্ছিলো। আমার সেই নির্বোধ সেনাপতির ভূমিকার কথা মনে হলে এখন হাসি পায়।

 

২৬শে মার্চের সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ পাক সেনা সুবিল পার হয়ে বগুড়া শহরে ঢুকলো। সুবিল পার হবার আগে মাটিডালী, বৃন্দাবনপাড়া এবং ফুলবাড়ি গ্রামের কিছু কিছু বাড়ী তারা আগুন জ্বালিয়ে দিল। শহরে ঢুকবার পর পাক সেনাদল রাস্তার দুপাশ দিয়ে দুটো লাইনে এগুতে শুরু করে। সুবিল (করতোয়ার একটি খাল) পার হবার পর কোন প্রতিরোধ না পেয়ে বেশ নিশ্চিন্তেই তারা এগুচ্ছিলো। রাস্তা জনশূণ্য, কোন বাধা নেই। কিন্তু কালীতলা হাট পার হবার পর পরই দেয়ালের আড়াল থেকে তপনের হাতে বন্দুক আচমকা আগুন ঝরালো। অব্যর্থ নিশানা। লুটিয়ে পড়লো একজন পাক সৈন্য। তপনই বগুড়ার প্রথম মুক্তিযোদ্ধা যার অস্ত্র বগুড়ার মাটিতে প্রথম পাক সেনার রক্ত ঝরালো। গুলি করেই তপন এবং তার সঙ্গীরা স্থান ত্যাগ করে দেয়ালের আড়ালে চলে যায়। হঠাৎ আঘাত পেয়ে বিচলিত পাক সেনা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে চালাতে এগিয়ে চলে। জামিলের বাড়ি পার হতেই আবার রাস্তার দুপাশে দেয়ালের আড়াল থেকে পাক সেনাদের লক্ষ্য করে নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধাদের আগ্নেয়াস্ত্র গর্জে উঠলো। এখানে দুজন পাক সেনা গুরুতর জখম হয়। কিন্তু বগগোলা পার হবার পর প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হলো পাকসেনা। ঝাউতলা বোম্বে সাইকেল স্টোরের পাশ থেকে গুলি করে সরে যাবার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হলো আজাদ। স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে বগুড়ার মাটিতে আজাদই প্রথম শহীদ। উক্ত পাকসেনা রাস্তার পাশের ছোট চায়ের দোকানের ঝাপ তুলে দুটো কিশোর কর্মচারীকে গুলি করে মারলো।

 

পাকসেনারা রেললাইনের দু নম্বর ঘুমটির কাছে আজাদ রেস্ট হাউজের ছাদ থেকে দারোগা নিজামউদ্দীন, দারোগা নুরুল ইসলাম এবং তাদের সহযোগীদের ৩০৩ রাইফেল গর্জে উঠলো।সম্মুখ দিক এবং দু পাশ থেকে আক্রান্ত হয়ে হানাদার সৈন্যরা থমকে দাঁড়ালো। কিছুটা পিছু হটে এলো তারা। এমনি সময়ে বড়গোলার ইউনাইটেড ব্যাংকের ছাদের ওপর থেকে তিনটি বন্দুক গর্জে উঠলো। উৎসাহের বলে নির্দেশ অমান্য করে সকলের অজান্তে ব্যাংকের ছাদে পজিশন নিয়েছিল টিটু, হিটলু এবং মুস্তাফিজ (ছনু)।দুজন পাক সেনা জখম হলো। পেছন থেকে হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে হানাদার সেনাদল বিচলিত হয়ে পড়ে। পিছু হটে দ্রুত তারা ব্যাংক ভবনটি ঘিরে ফেলে। টিটু, হিটলু এবং ছনু সরে যাবার সুযোগ পেল না। শহীদ হলো বগুড়ার আর তিনটি দামাল ছেলে। বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ বর্বর হানাদার সেনারা দ্রুত পিছু হটে শহর ছেড়ে গেলো। সুবিলের উত্তর পাড়ে পূর্ব বিভাগের ডাকবাংলো এবং মহিলা কলেজে অবস্থান নিলো তারা।

 

রাস্তায় বের হয়ে এলো বগুড়া শহরের লোক। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম দিনে আমাদের ছেলেরা প্রাণ দিয়েছে। সেজন্য চোখগুলো অশ্রুসিক্ত। কিন্তু তার সঙ্গে মিলে আছে জয়ের আনন্দ, এক অভূতপূর্ব আস্বাদ। বর্বর হানাদার বাহিনীর মোকাবেলা করেছি আমরা। তাদের হটিয়ে দিয়েছি, জয়ী হয়েছি।

 

২৬শে মার্চেরই অপরাহ্নে একরামুল হক স্বপন, ফজলার রহমান (ফুলবাড়ী) এবং চন্দন এসে খবর দিলো যে তারা একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন যোগাড় করেছে। সুতরাং বুলেটিন সাইক্লোস্টাইল করে বিলি করা যায়। বুলেটিনের খসড়া দিলাম। একপাতার বুলেটিন সন্ধ্যের সময় শহরে ছড়ানো হেডলাইন ছিলো ‘‘ প্রথম দিনের যুদ্ধে বগুড়াবাসীর জয়লাভঃ পাঁচ জন পাকসেনা নিহত ।” এরপর ছিলো এক সর্বাত্মক যুদ্ধের আহবান। সবশেষে ছিলো বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ। একটা কথা বলতে ভুলতে গেছি। মাটিডালীতে যখন ব্যারিকেড দিয়ে ফিরে আসছিলাম তখন দত্তবাড়ির সম্মুখে অয়ারলেস অফিসের একজন লোক ডাঃ জাহিদুর রহমানের হাতে একটা কাগজ দিয়ে যায়। মেসেজটি রাতে পেয়েছিলো বলে জানায়। লাল কালিতে লেখা। যতদূর মনে হয় বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়াবেঃ “ এটি আমার নির্দেশ। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। শত্রুসৈন্য আমাদের আক্রমণ করেছে। বাংলার মানুষ তোমরা যে যেখানে আছো; যার হাতে যে অস্ত্র আছে তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও। হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি থেকে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় না পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।” এই নির্দেশটিও বুলেটিনে জুড়ে দিয়েছিলাম। বুলেটিনে অবশ্য আমাদের তরফের ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করি নি। কারণ ভেবেছিলাম তাতে সাধারণ মানুষ ভয় পেতে পারে। এরপর থেকে প্রতিদিন আমরা বুলেটিন বের করতাম। এমনকি প্রচুর গোলাবৃষ্টির মধ্যেও স্বপন ডিকটেশন নিতো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বুলেটিন সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ছাপা হয়ে শহরে ছড়ানো হতো। ২৬শে মার্চ থেকে শুরু করে ১লা এপ্রিল পর্যন্র প্রতিদিন বুলেটিন বের হতো। বুলেটিনের বিশেষ দায়িত্ব ছিলো একরামুল হক স্বপন, চন্দন ধলু এবং সৈয়দ কেরামত (গোড়া) এর উপর।

 

২৬শে মার্চ সন্ধ্যায় বাদুড়তলার একটি বাড়ীতে যুদ্ধ পরামর্শ সভা বসলো। আলোচনা শেষ জনাব মোখলেসুর রহমানের প্রস্তাবক্রমে পাঁচ সদস্যের একটি হাই কমাণ্ড করা হলোঃ

 

১) গাজীউল হক (অদলীয়), সর্বাধিনায়ক; (যুদ্ধের দায়িত্ব)

২) ডাঃ জাহিদুর রহমান (আওয়ামী লীগ) (খাদ্য এবং চিকিৎসার দায়িত্ব)

৩) জনাব মাহমুদ হাসান খান ( আওয়ামী লীগ), প্রশাসন

৪) জনাব মোখলেসুর রহমান (মোজাফফর ন্যাপ), যোগাযোগ

৫) জনাব আব্দুল লতিফ (কম্যুনিস্ট পার্টি) প্রচার। ২৬শে মার্চ রাতেই আমরা সুবিলের দক্ষিণ পাড়ে ঘাটি স্থাপন করলাম।

 

২৭শে মার্চ সকাল আটটা। সুবিলের উত্তর পাড় থেকে পাকসেনারা গুলীবর্ষণ শুরু করে। পাল্টা জবাব দেয় আমাদের ছেলেরা। এই দিন ঝন্টু, মাহমুদ, ডাঃ টি; আহমদের ছেলে মাসুদ, গোলাম রসুল, বিহারীর ছেলে (নামটি মনে নেই), রশীদ খানের ছেলে গুলার, রেডিও, রফিকুল ইসলাম লাল, শহীদ আবু সুফিয়ান রানা এবং আরো অনেকে যুদ্ধে অংশগ্রহন করে। সকাল সাড়ে আটটার দিকে ডঃ জাহিদুর রহমান পুলিশ লাইন থেকে বাহিনীর ৬০ জনের এক দলকে নিয়ে এলেন। ৩০৩ রাইফেল হাতে আমাদের ছেলেদের পাশাপাশি তারাও অবস্থান নিলেন। দুই পক্ষে প্রচণ্ড গোলাবৃষ্টি হলো। গোলাবৃষ্টির মধ্যেই হানাদার বাহিনী সড়ক ধরে এগিয়ে এসে শহরের উত্তর প্রান্তে কটন মিল দখল করলো। (তখন বগুড়া শহরের উত্তর সীমার প্রান্তে ছিল কটন মিল). পুলিশ এবং আমাদের ছেলেদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে শহরের ভিতরে বেশী এগিয়ে আসতে পারলোনা হানাদার। এদিনের যুদ্ধে পাকসেনারা ভারী মেশিনগান ব্যবহার করে এবং মর্টারের গোলাবষণ করে। বিকেল তিনটার মর্টারের গোলার আঘাতে শহীদ হলো তারেক; দশম শ্রেণীর ছাত্র। মৃত্যুর সময়েও তার হাতে ধরা ছিলো একনলা বন্দুক। তারেকের রক্তে ভিজে গিয়েছিলো আমার বুক। মনে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছিলাম।

 

২৭শে মার্চ বিকেলে বাদুড়তলায় খাদ্য ক্যাম্প বসানো হলো এবং তার সঙ্গে একটি প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রও খোলা হলো। খাদ্য ক্যাম্পের দায়িত্ব নিলেন মিউনিসিপ্যাল কমিশনার জনাব আমজাদ হোসেন এবং তাঁকে সাহায্য করার জন্য মোশারফ হোসেন মণ্ডল, বাদুড়তলার আবু মিয়া, আবেদ আলী, মজিবর রহমান এবং আরও কয়েকজনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হলো। এরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করা খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতেন। প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন শহীদ ডাঃ কছিরউদ্দীন তালুকদার সাহেব। তিনি একসময় বগুড়া জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। ঐ সময়ে বৃদ্ধ বয়সে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে যেভাবে তিনি এগিয়ে আসেন একজন চিকিৎসক হিসাবে তা বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য। তাঁর বাড়িটিও আমাদের শেলটার হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পাক সেনাবাহিনীর হাতে তিনি শাহাদৎ বরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে বগুড়ায় প্রয়াত প্রবীণতম মুসলিম লীগ নেতা ডাঃ হাবিবুর রহমানও সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসেন। ২৭শে মার্চ রাতে খবর পেলাম একজন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করছেন।

 

২৮শে মার্চের সকাল। কটন মিলের গেস্ট হাউজের ছাদে পাকসেনারা মেশিনগান বসিয়েছে। তখনো গোলাগুলি শুরু হয়নি। মেশিনগানের পাশে দু’জন পাকসেনা দাঁড়িয়ে। একজন পাকসেনা ছাদের রেলিং এ ভর দিয়ে কি যেন দেখছে। দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে গিয়ে দুরন্ত ছেলে তপন রাইফেল তুললো। অব্যর্থ লক্ষয়। ছাদের ওপর থেকে পাকসেনাটি ছিটকে পড়লো মাটিতে। পিছু হটে তপন লাফিয়ে পড়লো রাস্তার পাশের নর্দমায়। নর্দমার দেয়াল ঘেঁষে সরে এলো আড়ালে।

 

শুরু হলো এলোপাতাড়ি গোলাবৃষ্টি। ২৮শে মার্চে মুকিসেনারাও দলে ভারী। মিন্টু, ডিউক লিয়াকত (পরে রাজাকার হয়ে যায়), আবদুর রহমান, মামুন(হক সাহেবের কম্যুনিস্ট পার্টির), হারুন(ব্যাঙ্ক অফিসার), ধুলু, বজলু, মুকুল, সাত্তার রশীদ(রশীদ গুন্ডা নামে খ্যাত ছিলো) এবং গ্রাম থেকে প্রায় শ’খানেক বন্দুকসহ এসে যোগ দিয়েছে। প্রচণ্ড প্রতিরোধ সত্ত্বেও ভারী মেশিনগানের গুলী এবং মর্টারের গোলাবর্ষণের আড়াল নিয়ে বেলা সাড়ে তিনটার পর পাকসেনারা ক্রল করে শহরে ঢুকতে শুরু করলো। প্রচণ্ড প্রতিরোধের মধ্যেও তা এগিয়ে চললো। বেচলা ডোবার একটু পর পাকসেনারা রেললাইন পার হয়ে থানার মোড়ে পৌছালো। হতাশ হয়ে গেলাম এবার বগুড়ার পতন নিশ্চিতপ্রায়। জলিল বিড়ি ফ্যাক্টরীর পিছনে একটি ছোট বাড়ীতে ছাত্রলীগের সামাদ, মাসুদ, সৈয়দ কেরামত আলী গোরা আমরা কয়েকজন জড়ো হয়েছি। মাসুদকে দেখে একটি ঘটনা মনে হয়ে গেলো। ২০শে মার্চের রাতে মাসুদ এবং মুস্তাফিজুর রহমান পটল আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো স্টেডিয়ামের কাছে তাদের তৈরী বোমার কার্যকারিতা দেখাবার জন্যে। দুটি বোমা ফাটানো হলো। সে কি বিকট আওয়াজ। কিন্তু হতাশ হলো সবাই দেয়ালে একটুও চিড় পর্যন্ত ধরেনি, ধ্বনি সর্বস্ব বোমা।

 

ঘটনা মনে আসতেই মাসুদের কাছে জানতে চাইলাম সেই বোমা আছে কিনা। সামাদ জানালো ২৩টি বোমা আছে। সামাদ এবং মাসুদ ছুটলো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতবোমা দুটো নিয়ে এসে হাজির। বললাম যেমন করেই হোক দত্তবাড়ীর উত্তরে যেকোন জায়গায় রাস্তার ওপর এই বোমা দুটো ফাটাতে হবে। এবং কিছু মুক্তিসেনা কাছাকাছি জায়গায় ফাকা গুলী ছুড়বে এবং সরে পড়বে।

 

শেখ ইনসান হাজী সাহেবের বাড়ীর উত্তর ধারে বোমা দুটি ফাটানো হলো। সে কী বিকট শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে এলোপাতাড়ি, কিছু একনলা দু’নলা বন্দুকের গুলীর আওয়াজ, পেছন থেকে আক্রান্ত হয়েছে ভেবে সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে হানাদার সেনারা ঘুরে দাঁড়ালো। তারপর দ্রুত পিছু হটে কটন মিলের গেস্ট হাউজে এবং সুবিলের উত্তর পাড়ের ঘাটিতে ফিরে গেলো। সেদিনের মতো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এক আনাড়ি মূর্খ সেনাপতির রণকৌশলে বগুড়া শহর সেদিন পতনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলো।

 

২৮শে মার্চ রাতে সুবেদার আকবরের নেতৃত্বে ৩৯ জন ইপিআর এর একটি দল বগুড়া পৌঁছায়। অস্ত্র বলতে তাদের রাইফেল, কয়েকটি গ্রেনেড এবং তিনটি এল.এম.জি। বিনা খবরে ওরা পৌঁছায়। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই সন্দিহান হই। পুলিশ লাইনে ওদের নিরস্ত্র করে নওগাঁয় মেজর নাজমুল হকের সঙ্গে টেলেফোনে যোগাযোগ করলাম। তিনি ইপিআরদের কাজে লাগাতে বললেন এবং ৩০শে মার্চ নিজে বগুড়া আসবেন বলে জানালেন।

 

২৯শে মার্চ। সকাল বেলায় বিস্ময়ে দেখলাম রাতে অন্ধকারে হানাদার পাক সেনা কটনমিলের গেস্ট হাউজ ছেড়ে সুবিলের উত্তর পাড়ের ঘাটিতে ফিরে গেছে। নিশ্চই গুপ্তচর মারফত তারা ই.পি.আরদের পৌঁছানোর খবর পায়। সকাল ৯টায় সুবেদার আকবর এবং মাসুদ রেকী করতে বের হলো। বেলা ১১টায় ই.পিআর-এর কয়েকজন একটি এল.এম.জি পাকসেনাদের দিকে মুখ করে কটন মিলের ছাদে বসালেন। বেলা আনুমানিক বারোটার সময় পাকসেনারা বৃন্দাবনপাড়া প্রাইমারী স্কুলের ঘাঁটি থেকে মর্টারের আক্রমণ শুরু করে। এইবার আমাদের তরফ থেকেও তিনটি এল.এম.জির মুখ দিয়ে পাল্টা জবাব গেলো, সন্ধ্যার সময়ে দুপক্ষের গোলাগুলি বন্ধ হয়। করিম হাওলাদার নামে একজন পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।

 

৩০শে মার্চ। বেলা ৯টায় জেলা প্রশাসক খানে আলম সাহেব খবর পাঠালেন মেজর নাজমুল হক এসেছেন। দেখা হলো মেজর নাজমুল হকের সঙ্গে। মাঝারি গড়নের শ্যামল রং এর একহারা চেহারা। সর্বাঙ্গ একটা দৃঢ় প্রত্যয়ের ছাপ। সংক্ষেপে তার কাগজে সব রিপোর্ট করলাম। শেষে বললাম ‘যুদ্ধ করা আমার কাজ নয়। আমি যুদ্ধের কৌশল জানিনে। আজই এসেছেন। এখন দায়িত্ব আপনার’।

 

মেজর নাজমুল মৃদুস্বরে বললেন, “দায়িত্ব আমাদের সকলের। পলিটিক্যাল হাই কমান্ডের নিযুক্ত সর্বাধিনায়ক হিসেবে আপনিই কাজ করবেন। আমি আপনার সাহায্যের জন্য রইলাম।”

 

অদ্ভুত ভালো লেগেছিলো এই মানুষটিকে। নিরহংকার। কোনদিন ভুলতে পারবোনা। স্বাধীন বাংলাদেশ তিনি দেখে যেতে পারেন নি। কিন্তু তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা, অতুলনীয় সাহস বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

 

৩০শে মার্চ বেলা দশটায় পাকসেনারা মর্টারের প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু করে। মুক্তি সেনারাও পাল্টা জবাব দেয়। বেলা ১টা নাগাদ হঠাৎ পাকসেনারা গোলা বর্ষণ বন্ধ করে।

 

বেলা আড়াইটায় ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী জিন্নাহর বাসায় (নিলিন্দার গ্রামে) হাই কমান্ডের বৈঠক। বৈঠকে আলোচনা শুরু হয়েছে। হঠাৎ উড়োজাহাজের আওয়াজ পাওয়া গেলো। জিন্নাহ এসে খবর দিলো বেশ নীচু দিয়ে দুটো উড়োজাহাজ ছুটে আসছে। একটু পরেই মেশিনগানের গুলীর আওয়াজ এবং তার পর পরই বোমা বর্ষণ শুরু হলো। সবাই বিচলিত হয়ে পড়লাম।

 

বোমাবর্ষণ বন্ধ হবার পর ঘুরে দেখলাম বিশেষ ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কোন লক্ষেই আঘাত করতে পারেনি। মুক্তিসেনাদের মনোবল আলো চাঙ্গা হয়ে গেছে। মেজর নজমুল হক সার্কিট হাউজে কন্ট্রোল রুম বসালেন। সন্ধ্যায় শহীদ খোকন পাইকাড় এবং সালাম একটা খাকী ফুলপ্যান্ট এবং খাকী শার্ট তৈরী করে এনে দিলো। তাদের জেদে পরতে হলো তাই। ষোলকলা পূর্ণ হলো যখন তপন এসে একটা রিভলবার ঝুলিয়ে দিলো কোমরে। হাসি পাচ্ছিলো। সর্বাধিনায়ক, সেনাপতি, জেনারেল-এ জেনারেল অব ড্রিমল্যাণ্ড।

 

৩১শে মার্চ। দিনের বেলা দুপক্ষই নীরব। খবর এলো ক্যাপ্টেন আনোয়ার এবং ক্যাপ্টেন আশরাফের নেতৃত্বে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসেছে এবং ঘোড়াঘাটে অবস্থান করছেন। ৩১শে মার্চ রাতে অসীম সাহসী সুবেদার আকবরের নেতৃত্বে মুক্তি সেনারা মহিলা কলেজের ঘাটিতে গ্রেনেড চার্জ করলো। পেট্রোলের ড্রামে আগুন ধরিয়ে গড়িয়ে দেয়া হলো পাকসেনাদের ঘাঁটির দিকে। পাকসেনাদের ঘাঁটি থেকে লক্ষবিহীন গুলীর শব্দ শোনা গেলো। তারপর অন্ধকারে মোটর কনভয়ের শব্দ। কিন্তু বোঝা গেলো না। ভোরে দেখা গেলো পাক সেনা বগুড়া ছেড়ে অন্ধকারের মধ্যে রংপুরের দিকে পশ্চাদপসরণ করে গেছে।

 

১লা এপ্রিল। সকালেই সারা শহর রাষ্ট্র হয়ে গেলো হানাদার বাহিনী পালিয়েছে। সারা শহরে আনন্দের ঢেউ। হরিগাড়ীর গোপন আড্ডা থেকে সার্কিট হাউজ কন্ট্রোল রুমে এসেছি। সুবেদার আকবর এসে দাঁড়ালেন। স্যার আড়িয়া ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করবো, অনুমতি চাই। কিছু জানিনা বুঝি না। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো, ‘চলুন’।

 

৩৯ জন ইপিআর, ৫০ জন পুলিশ বাহিনীর লোক এবং ২০ জন মুক্তিসেনা। বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ আড়িয়া ক্যান্টনমেন্ট উত্তর, পূর্ব এবং পশ্চিম এই তিন দিক থেকে ঘেরাও করা হলো। দু’পক্ষ থেকে গুলী বৃষ্টি চলছে। এরই মধ্যে বিমান আক্রমণ শুরু হলো। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে গ্রামের হাজার হাজার লোক টিনের ক্যানেস্তারা পেটাতে শুরু করলো। বোমাবর্ষণ বন্ধ হবার পর আবার কিছুটা এগুলাম। কিন্তু পাক সেনারা অবিরাম গুলী চালিয়ে যেতে লাগলো। অবশ্য তাদের সুবিধে ছিলো। ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে আমাদের একটা ফাঁকা মাঠ পাড়ি দিতে হয়। সেদিন ছিলো দক্ষিণের জোর হাওয়া। গ্রামের লোকদের অনুরোধ জানানো হলো তারা ক্যান্টনমেন্টের দক্ষিণ দিক থেকে মরিচের গুড়ো ছাড়তে পারে কিনা। ব্যস আর বলতে হলো ণা। কোথা থেকে এত মরিচের গুঁড়ো ভেসে এলো তা বলা কঠিন। ক্যান্টনমেন্ট এর ৫০০ গজ উত্তরে আমাদের চোখ মুখ জ্বলতে লাগলো। বেলা তখন আড়াইটা। আড়িয়া ক্যান্টনমেন্ট সাদা পতাকা উড়লো। আনন্দের আতিশয্যে রাইফেল হাতে লাফিয়ে অসীম সাহসী যোদ্ধা মাসুদ। আর তৎক্ষনাৎ শত্রুর নিক্ষিপ্ত শেষ বুলেটটি তাকে বিদ্ধ করলো। শহীদ হলো নির্ভীক সেনা, বগুড়ার এক বীর সেনানী। যুদ্ধে জয় হলো। পাকিস্তানী সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে। বন্দী সেনাদের এবং আটান্ন ট্রাক ভর্তি এম্যুনিশন নিয়ে ফিরলাম। কিন্তু চোখের জল বাধা মানছিলো না। মাসুদকে হারিয়ে এলাম চিরদিনের জন্যে। সেদিনই ঘোষণা করেছিলাম আড়িয়ার নাম হবে ‘মাসুদনগর’। রাতে ২১টি গান স্যালুটের মাঝে মাসুদকে কবরে সমাহিত করলাম। দেখলাম ডাক্তার জাহিদুর রহমানের দু’চোখেও জলের ধারা নেমে এসেছে।

 

আড়িয়ার ক্যান্টনমেন্ট একজন পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন (ক্যাপ্টেন নূর) সহ ৬৮ জন সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছে। এরমধ্যে ছিল ২১ জন পাঞ্জাবী সৈন্য। জনতার ক্রুদ্ধ আক্রমণের হাত থেকে এদের রক্ষা করতে পারিনি। জেলখানার তালা ভেঙ্গে ওদের বের করে নিয়ে এসে কুড়ুল এবং বঁটি দিয়ে কুপিয়ে আমার অনুপস্থিতিতে ওদের হত্যা করে। বাঙালি সৈন্য যারা ছিলো তাদের নজরবন্দী করে রাখা হলো। আড়িয়া ক্যান্টনমেন্টে কিছু চাইনীজ রাইফেল ও গুলি পাওয়া যায়। ৫৮ ট্রাক ভর্তি এম্যুনিশন পাই, কিন্তু তা ব্যবহারের অস্ত্র ছিলোনা। অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বললেন, সেগুলো ছিলো ১০৫ গান এবং আর-আর-এর এম্যুনিশন।

 

২রা এপ্রিল। পাবনার এস-পি জনাব সাঈদ এলেন এবং কিছু রাইফেলের গুলি নিয়ে যান। তাঁকে বললাম যেমন করে হোক ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সাহেবকে বগুড়া নিয়ে আসতে।

 

৩রা এপ্রিল। জনাব কামরুজ্জামান, শেখ মনি এবং তোফায়েল আহমদ বগুড়া এসে উপস্থিত হলেন। ডাঃ মফিজ চৌধুরীকে সঙ্গে দিয়ে তাদের সীমান্ত পার করে দেবার ব্যবস্থা করলাম। জনাব শেখ মনির কাছেই জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধু পাক সেনাদের হাতে বন্দী।

 

৪ঠা এপ্রিল। বগুড়া আওয়ামী লীগের জনাব আব্দুর রহিম তালুকদার জীপ নিয়ে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে নিয়ে বগুড়া পৌছালেন। তার সঙ্গে জনাব আবু সাঈদ এম পি। মনসুর ভাইকে বিশেষ করে অনুরোধ করলাম যাতে প্রোভিশনাল গভর্ণমেন্ট এর নাম ঘোষনা করেন। মনে আছে একটা সিগারেটের প্যাকেটের সাদা অংশে বি-এস-এফ-এর কর্নেল মুখার্জীকে লিখেছিলাম মনসুর ভাইকে নিরাপদে তাজউদ্দীনের কাছে পাঠানোর জন্যে।

 

৫ই এপ্রিল। মেজর নাজমুল হক বগুড়া এলেন। জেলা প্রশাসক জনাব খানে আলমের কুঠিতে আলোচনা সভা বসলো। মেজর নাজমুল হক জানালেন যেমন করে হোক ১০৫ কামান এবং আর-আর জোগাড় করতে হবে। তিনি বললেন হিলিতে গিয়ে বির্গেডিয়ার চাটার্জীর সঙ্গে দেখা করতে। তার সঙ্গে আলোচনায় ঠিক হলো, যদি কোন প্রকারে আমরা রংপুর ক্যান্টনমেন্ট দখল করে উত্তরাঞ্চল শত্রুমুক্ত করতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে পাকিস্তানিদের পাল্টা আক্রমণ ঠেকাতে পারবো।

 

৬ই এপ্রিল। সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি এবং জাহিদুর রহমান হিলি যাই। পশ্চিম হিলিতে গেলে আমাদের দু’জনকে এক প্রকার নজরবন্দী করে রাখে সারাদিন। সন্ধ্যায় জানালো রাত তিনটায় ব্রিগেডিয়ার চাটার্জী আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন। রাত তিনটায় ব্রিগেডিয়ার চাটার্জীর সঙ্গে দেখা হলো। তিনি আমাদের দু’পেটি ৩০৩ রাইফেলের গুলি দিয়ে বিদেয় দিলেন এবং ১৬ই এপ্রিল হিলিতে তার সঙ্গে আবার দেখা করতে বললেন। জানালেন তিনি ভারত গভর্ণমেন্টকে আমাদের অবস্থা জানিয়ে অস্ত্র সাহায্য করতে অনুরোধ জানাবেন।

 

৭ই এপ্রিল। প্রায় খালি হাতেই বিকেল বেলা আমি এবং ডাঃ জাহিদুর রহমান হিলি থেকে ফিরলাম। মুক্তিসেনারা সাগ্রহে আমাদের প্রতীক্ষা করছিলো। কিন্তু আপাতত কোন সামরিক সাহায্য না পাওয়ায় কিছুটা হতোদ্যম হলো বলতে হলো। বলতে ভুলে গেছি, ২রা এপ্রিল থেকেই মুক্তি সেনাদের কয়েকটি ক্যাম্পে ভাগ করে দিয়ে সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেছিলাম। করোনেশন স্কুলে একটি ক্যাম্প, সেন্ট্রাল হাই মাদ্রাসার একটি ক্যাম্প এবং জিলা আনসার অফিসের মাঠে একটি ক্যাম্প। ইপিআর বাহিনীর ব্যবস্থা করেছিলাম এডওয়ার্ড পার্কের কম্যুনিটি সেন্ট্রাল হলের এক তলায়। কন্ট্রোল রুম শিফট করেছিলাম দোতলায়। বগুড়া সার্কিট হাউজে প্রশাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। জনাব এম আর আখতার মুকুলকে কেরোসিন, ডিজেল এবং পেট্রোল এ পারমিট ইস্যু করার দায়িত্ব দেয়া হয়। খালি হাতে ফিরে আসার খবর জেনে মুকুল একানে ডেকে নিয়ে বললো, ‘শালা সেরেছে’. এবার আস্তানা গুটাও। পাকিস্তানী খুনীরা এবার তোমার জন্যে ট্যাংক নিয়া আইবো। এদিকে তোমার মুক্তি সেনাদের থামাও। এরা কোন শৃসংখলা মানেনা। এরাই এখন প্রবলেম। দেখলাম তাই। মুক্তি সেনাদের মধ্যে একদল ভীষণ উচ্ছৃংখল হয়ে উঠেছে। এদের নিয়ন্ত্রণ রাখাই মুশকিল। তাছাড়া পাকসেনা সরে যেতেই দলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়েছে। দুষ্কৃতকারীরাও সুযোগ নেবার চেষ্টায় আছে। শৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্যে চেষ্টা চালালাম।

 

৮ই এপ্রিল থেকে ১৩ই এপ্রিল বিশেষ কোন ঘটনা ঘটলোনা। ১৩ই এপ্রিল সিরাজগঞ্জের মহকুমা অফিসার শহীদ শামসুদ্দিন সাহেব দেখা করলেন এবং সিরাজগঞ্জ-নগরবাড়ির ডিফেনসের ব্যবস্থাও বগুড়া থেকে করতে অনুরোধ জানালেন।

 

১৪ই এপ্রিল হিলি থেকে একটা খবর আসে। যেসব এম্যুনিশন আড়িয়া যুদ্ধে পাওয়া গেছে তার নমুনা নিয়ে অতি অবশ্য হিলিতে দেখা করতে হবে। ১৪ই এপ্রিল রাতে সুবেদার আকবরের নেতৃত্বে মুক্তি সেনার একটি দল নগরবাড়ি প্রতিরক্ষার জন্য পাঠানো হলো।

 

১৬ই এপ্রিল, জনাব এম. আর. আখতার মুকুল, জনাব আসাদুজ্জামান, মজিবুর রহমান এমপি, ডাঃ জাহিদুর রহমান এমপি এবং দু’জন ইপি আরকে সাথে নিয়ে এম্যুনিশনের নমুনাসহ বিকেল বেলা হিলি পৌঁছে। সেদিন বিকেলেই কর্নেল ব্লিৎস এম্যুনিশন গুলো পরীক্ষা করেন। ঐদিন রাতেই আমাদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্যে কোলকাতা যেতে বলা হয়। ১৭ই এপ্রিল ভোরে আমরা কোককাতা রওয়ানা হই। ১৯শে এপ্রিল সন্ধ্যায় লর্ড সিনহা রোডে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, অর্থমন্ত্রী জনাব মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব কামরুজ্জামান এবং পার্লামেন্ট সদস্য জনাব আবদুল মান্নান এবং আবদুস সামাদ এর নিকট বগুড়ার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রতিবেদন পেশ করি।

 

২২শে এপ্রিল বগুড়া শহরের পতন ঘটে।