সাক্ষাৎকারঃ নাজমুল আহসান মহীউদ্দিন আলমগীর

Posted on Posted in 10
<১০, ১০.৫, ২৯৬-২৯৭>
সাক্ষাৎকারঃ নাজমুল আহসান মহিউদ্দিন আলমগীর*

ভারতের বিহার রাজ্যের চাকুলিয়ায় তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ হয়। সি-কিউ-বি অস্ত্র পাতি এবং স্মল আর্মস-এর ব্যাবহার ও বিস্ফারোকের ব্যাবহার, বিভিন্ন ক্যালিবারের মর্টার ও রকেট লাঞ্চারের ব্যাবহার, বিভিন্ন ফর্মেশান, ম্যাপ রিডিং ও সেনাবাহিনী ফিল্ড সেটআপ ও ম্যানেজমেন্টের উপর প্রমিক্ষণ হয়। ৭ই সেপ্টেম্বর ৫ নং সেক্টরে তৎকালীন কমান্ডার মীর শওকত আলীর নিকট তিনটি এফ এফ কোম্পানীসহ ভোলাগঞ্জ সাব-সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করি এবং ৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের আগেই সিংগার খালের উপর উপকূল পর্যন্ত মুক্ত করি।

ঘটনাবলীর বিবরণঃ-

(১) বাংলাদেশের মাটিতে ভোলাগঞ্জ রেলওয়ে টার্মিনালে হেডকোয়ার্টার স্থানান্তর। কোনরূপ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়নি, ধল্লা নদীর এই চরটিতে তখন কোন লোকজন ছিল না। তবে টারমিনালটি অত্যন্ত বিধ্বস্তাবস্থায় ছিল। যন্ত্রপাতি, ঘরের দরজা-জানালা এমনকি জায়গায় জায়গায় টিনের চালও ছিল না।

(২) পাড়ুয়ায় বর্ডার আউটপোস্ট দখল, সামান্য প্রতিরোধ ছিল। পাকিস্তান বাহিনীর লোকজন ৫টি ৩০৩ রাইফেল ফেলে রেখে চলে যায়।

(৩) টোকের বাজারে এডভান্স পোষ্ট বসাতে কোন প্রতিরোধ পাইনি।

(৪) কোম্পানীগঞ্জে এডভান্স পোষ্ট বসাতে গিয়ে মাঝারি ধরনের প্রতিরোধ সম্মুখীন হই। প্রথম দিন আমাদের একটি ছেলে শহীদ হয় এবং আমাদের একটি ২” মর্টার ছেড়ে আসতে হয়। পরদিন আমমরা চৌকি দখল করতে সক্ষম হই। বিপক্ষের ফেলে যাওয়া অস্ত্রপাতির সংগে আমাদের হারানো মর্টারটি ফেরত পাই। শত্রুপক্ষ দুটি মৃতদেহ ছেড়ে যায়।

(৫)পরপর তিনদিন ক্রমাগত আক্রমণ করে তেলিখাল চৌকি দখল করি। কাটাখাল এলাকায় আমাদের কাট-অফ ছিল। তেলিখাল চৌকিতে বিপক্ষের ফেলে যাওয়া দুটি ৩০৩ রাইফেল ও একটি ২” মর্টার হাতে আসে। এই পর্যায়ে পূর্ব কুরাখোলা, কান্দিগাঁও এবং গোরকি আর পশ্চিমে পারকুল ও শিবপুর বেইজ স্থাপন করি। পিয়াইন গাংএর উত্তর পাড় পর্যন্ত সম্পূর্ণ আমাদের দখলে আসে এবং সদস্য জনাব নুরুল হক টোকের বাজারে জনসভা করেন।

(৬) অপারেশন জ্যাকপটঃ পর পর তিনদিন ক্রমাগত যুদ্ধ করে বিলাজুর ও বার্নি দখল করি। এতে আমার সংগে তিনটি এফএফ কোম্পানী অংশ নেয় ও আমাদের ৩ জন ছেলে শহীদ হয়।

(৭) অপারেশন স্লেজ হ্যামারঃ সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলী শেলা সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হেলাল কে নিয়ে ছাতক আক্রমণ করেন। আমার আর ক্যাপ্টেন নূরনবরি উপর ছাতক গোবিন্দগঞ্জ সড়কে রিইনফোর্সিং কলাম কাট-অফ করার দায়িত্ব ছিল। আমারা সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সফলতার সংগে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখি এবং আমাদের হাতে বিপক্ষের একজন মেজর নিহত হয়।

(৮) অপারেশন লোনরেঞ্জারঃ নভেম্বরের প্রথম ভাগে সেক্টর কমান্ডার নিজে গৌরীনগর চৌকি আক্রমণ করেন। পশ্চিমের ফ্লাক্সে একটি এফ এফ কোম্পানীসহ বার্নিতে ছিলাম আমি, পূর্বের ফ্লাক্সে তিনটি এফ-এফ কোম্পানীসহ ছিলেন লেফটেন্যান্ট সাইফুদ্দিন খালেদ ও লেফটেন্যান্ট তাহেরউদ্দিন আখুঞ্জি। দুইটি কোম্পানীসহ কোম্পানী কমান্ডার কাজী আব্দুল কাদের ও কোম্পানী কমান্ডার ফখরুদ্দীন চৌধুরী কাগাইল ও গৌরীনগরের মাঝামাঝি জায়গায় কাট-অফ লে করেন। সকাল ৪ টায় আক্রমণ শুরু হয়। এই যুদ্ধে আমার সংগের ৫ জন ছেলে শহীদ হয়। আমরা একটি ৮১ মিঃ মিঃ মর্টার ও কিছু গোলাবারুদ ও অস্ত্রপাতি দখল করি।

(৯) এই পর্যায়ে সামান্য প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে আমরা ১০ই ডিসেম্বর নাগাদ সিংগারখালের উত্তর পার বরাবর কুরিগাঁও, বাদাঘাট, মিতিমহল, নোয়াগাঁও, চালতাবাড়ি প্রভৃতি অঞ্চল মুক্ত করি। (৭ই ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনীর কর্নেল রাজ সিং এই সাব-সেক্টরের মদ্ধ্যে দিয়ে সিংগারখাল পার হয়ে আরো দক্ষিণে অগ্রসর হন) বিভিন্ন সময়ের বেইজ স্থাপন ও চৌকি দখলকালে মোট ৬১ জন রাজাকার আমাদের হাতে বন্দী হয়, যারা পরবর্তী পর্যায়ে সিলেট জেলা কতৃপক্ষের হাতে সমর্পিত হয়।

(১০) দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা ১০টি এফ-এফ কোম্পানী ও তিনটি এম-এফ কোম্পানীসহ সিলেট মাদ্রাসায় ক্যাম্প স্থাপন করি।

আমাদের সংগের ১৭ জন শহীদ সহযোদ্ধাকে টোকেরবাজারে কবর দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে আমাদের গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্রের অত্যন্ত অভাব ছিল।

পরে প্রতিপক্ষের চৌকিগুলো দখলের ফলে আমাদের গোলাবারুদের অভাব কিছুটা পূর্ণ হয়। আমাদের সমস্ত রেশন, অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ শেলা হয়ে আসত ভারতের ১০১ কমান্ড এরিয়া থেকে। সবসময়ই খাদ্যদ্রব্য, শীতবস্ত্র, ঔষধপত্র ইত্যাদির প্রচণ্ড অভাব ছিল। আমরা যে সমস্ত অস্ত্রপাতি ব্যাবহার করতাম তা হলোঃ ৩০৩ রাইফেল, ৩০৩ এল-এমজি, ৭.৬২ সি সি এল এল আর, ৯ মিঃ মিঃ এস এম সি। পরবর্তীতে পাকিস্তানিদের হাত থেকে চীনা রাইফেল, চীনা ষ্টেন, ৭২ মিঃ মিঃ মর্টার ও তিনটি ৩০৩ মেশিনগান ও বেশকিছু জি-২ রাইফেল আমাদের হস্তগত হয়।

স্বাক্ষরঃ ন, আ, ম আলমগীর

ই-এস-এস, ৪০৭৫

১৪-৩-৮৩

*গনপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রোকৌশলী থাকাকালে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেন। সাক্ষাৎকারটি ১৪-৩-৮৩ তারিখে প্রকল্প কর্তৃক গৃহীত।