সাক্ষাৎকারঃ নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু

Posted on Posted in 9

<৯, ১৬.৭, ৪৮৬-৪৯০>

ঢাকায় গেরিলা অপারেশন-৪

সাক্ষাৎকারঃ নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু

(পরবর্তীতে ‘ঢাকায় গেরিলা অপারেশন’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত। ঢাকার গেরিলা অপারেশন সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যাদির জন্য বইটি দ্রষ্টব্য।

মানিক বাহিনী গেরিলা ইউনিট প্রধান রেজাউল করিম মানিক হানাদার বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে শাহাদাৎ বরণের পর তিনি উক্ত ইউনিটের অধিনায়কত্ব করেন। সাক্ষাৎকারটি প্রকল্প কর্তৃক ১২-৭-৮৩ তারিখে গৃহীত)

 

২৫শে এপ্রিল আমি সীমান্ত অতিক্রম করি। কাঠালিয়া হয়ে আগরতলা এসে পৌঁছি। সেখানে মেজর হায়দারের সাথে আমার দেখা হয়। মেজর হায়দারের সাথে আলাপ হলো। মেজর হায়দার আমাকে ঢাকা থেকে ছেলে সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে বললেন। এরপর আমি ঢাকায় আসি । ঢাকায় এসে আমি কিছু ছেলে জোগাড় করি এবং পুনরায় ২২শে মে ঢাকা ত্যাগ করি এবং মতিনগরে উপস্থিত হই। আমাদের সেখানে ট্রেনিং নিতে দেয়া হয়নি। এই সময় কামাল লোহানীর সাথে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে আমি দুই সপ্তাহকাল অবস্থান করি। স্বাধীন বাংলা বেতারে আমি কিছু কবিতাও পাঠ করি। সেখানে নওগাঁর জলিল সাহেবের (এম-পি) সাথে আমার দেখা হয়। আমি সরাসরি যুদ্ধ করতে চাই এই ইচ্ছা প্রকাশ করলে আমাকে তিনি তাঁর দিনাজপুর ক্যাম্পে ট্রেনিং নিতে বলেন। আমি সাথে সাথে রাজি হয়ে যাই এবং ২৭ জন ছেলে সহ পশ্চিম দিনাজপুরের বালুরঘাট ট্রেনিং নিতে শুরু করি। আমার ছেলেদের মধ্যে ছিল আসাদ, ওমর, পনির, মঞ্জু, ইফতেখার, তৌফিক প্রমুখ ছাত্র। সেখানে ৪৫ দিনে আমাদের ট্রেনিং সমাপ্ত হয়।

 

এর মধ্যে ট্রেনিং চলাকালে আমি কলকাতায় আসি। কলকাতায় মেজর খালেদ মোশাররফের সাথে আমার দেখা হয়। তিনি তখন ২ নং সেক্টরের অধিনায়ক। ঢাকা যেহেতু ২ নং সেক্টরের অধীনে ছিল, সেহেতু তিনি আমাদের ২৭ জনকেই দিনাজপুর থেকে আগরতলায় তাঁর অধীনে নিয়ে আসেন। এর প্রধান কারণ ছিল আমরা ছিলাম ঢাকার বাসিন্দা।

 

মেজর খালেদ মোশাররফের অধীনে পুনরায় আমাদের ১৫ দিনের একটি ব্রাশ-আপ ক্লাশ হয়। সেখানে তিনি আরো ২৫ জন ছেলে কে নিয়ে মোট ৫২ জনের একটি টিম তৈরী করেন এবং সবাইকে ঢাকা উত্তরের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। আমরা প্রথমে তিতাসের ভেতর দিয়ে ঢুকতে শুরু করি। আখাউড়া-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কের একটি ব্রীজের নিচ দিয়ে আমরা গভীর রাত্রিতে ঢুকতাম। এর পাশের গ্রামটি ছিল মনিহন। সেই সাথে আমরা প্রথম ঢুকি সেপ্টেম্বর মাসে।

 

পাকবাহিনী অই ব্রীজের ওপর মোতায়েন ছিল। একদিন পাকসেনারা ব্রীজের উপর থেকে আমাদের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। আমাদের সাথে ফরিদপুরের একটা দল সেই পথে অগ্রসর হচ্ছিল। এ আক্রমনে অগ্রগামী দলটির ১৪ জন ঘটনাস্থলে মারা যায়। অই ঘটনার দুইদিন পর আমরা পেনিট্রেট করি এবং তিতাসে এসে পৌঁছি। সেখান থেকে আমরা ধামরাই থানার এক গ্রামে এসে উপস্থিত হই।

 

এই গ্রামে আসতে আমাদের সাত দিন সাত রাত লেগেছিল। সেই রাতগুলো ছিল ভীষন ভয়াবহ। দু’দিন দু’রাত আমরা স্রেফ নদীর পানি খেয়ে কাটাই। কারণ, আমাদের রেশন ফুরিয়ে গিয়েছিল। নদীতে যে সমস্ত গয়নার নৌকা যাতায়াত করতো সে সমস্ত নৌকার মাঝিদের সহায়তায় পাটাতনে লুকিয়ে থেকে আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতাম। এ ব্যাপারে মাঝিদের ভূমিকা ছিল খুবই নির্ভীক। বলতে গেলে  এঁরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে সরাসরি জড়িত ছিল।

 

এবার আমরা রোহার একটি ছোট্ট বাজারে উঠি এবং সেখানে যখন আমরা রাত্রিযাপন করছিলাম, তখনই হঠাৎ পাকবাহিনীর আক্রমণ শুরু হয়। আমরা যে সেখানে এসেছি এই কথা ইতোমধ্যেই দালালেরা পৌঁছিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই আক্রমণ আমরা প্রতিহত করি। সেদিনের ঐ পাল্টা আক্রমণে আমাদের দলের আশরাফ নামে এক ছেলে (বি,ডি,আর সুবেদার) অত্যন্ত সাহসের সাথে যুদ্ধ করে। সেই যুদ্ধে আমরা ১৯ জন পাকসেনার প্রাণনাশ করি। পাকবাহিনী নিরুপায় হয়ে সেই স্থান ত্যাগ করে এবং ফিরে যাওয়ার পথে গ্রামের নিরীহ জনগণের উপরে অত্যাচার চালায়, তাদের ঘরবাড়ী লুট ও অগ্নিসংযোগ করে।

 

এরপরে রোহা ছেড়ে আমরা সিঙ্গাইর থানা এলাকার কাছাকাছি একটা গ্রামে ক্যাম্প করি। এখানে আমরা একটি অপারেশন করি। এই অপারেশনে ১৪ জন পাকসেনার একটি রেশনিং কোরকে আক্রমণ করি এবং সবকটা পাকসেনা কে খতম করি। এরপরে আমরা সেই স্থান থেকে আমাদের ক্যাম্পকে নিরাপদ এলাকায় নিয়ে আসি । এই নতুন স্থানটির নাম ছিল শিমুলিয়া। এখানে এসে আমরা ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করি। এভাবে আমাদের আক্রমনের পরিধদি ক্রমশঃ বিস্তার লাভ করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে ২৩ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল নিয়ে মূল ঢাকা নগরীতে প্রবেশ করি। দলটি ঢাকা শহর এলাকায় বেশ কয়েকটি অপারেশন করে। এই দলটির মধ্যে ছিল রইসুল ইসলাম আসাদ, মুনীরউদ্দিন, ফেরদৌস, মাহাবুব আলী, জাহেদ, শফিকুল ইসলাম স্বপন, জন, ফিরোজ, মোহাম্মদ আলী, ওমর, আরিফ, রমজান এবং আরো বেশ কয়েকজন নির্ভীক যোদ্ধা।

 

আমাদের দল ছাড়াও আরো একটি দলকে শাহাবুদ্দীনের (চিত্রশিল্পী) নেতৃত্বে ঢাকা দক্ষিনের কিছু এলাকায় গেরিলা তৎপরতা চালানোর জন্য পাঠানো হয়। এরা বুড়িগঙ্গা ও তার আশেপাশের এলাকা জুড়ে বিভিন্ন সময়ে শত্রুদের নাজেহাল করে। এই দলে ছিল কুতুব, ইমাম হোসেন, বজলু এবং আরো অনেকে।

 

গেরিলা কার্যক্রমের পাশাপাশি আমাদের দলকে আরো একটি দায়িত্ব দেয়া হয়। এটা ছিল ঢাকা শহরে গেরিলা তৎপরতার কথা প্রচার করা। এর উদ্দেশ্য ছিল ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশীদের কে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ব্যাপারে অবহিত করা। এজন্য আমরা প্রথমে ঢাকার সেগুনবাগিচা হাই স্কুল থেকে একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন ছিনিয়ে এনে “গেরিলা” নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিই। পত্রিকাটির ভাষা ছিল ইংরেজী। পত্রিকার মূল দায়িত্বে ছিল ফেরদৌস, ফিরোজ, জন, মোহাম্মদ আলী, জাহেদ, আরিফ এবং আরো কিছু মুক্তিকামী কর্মী। প্রতিমাসে পত্রিকাটির দু’টি করে পরপর সাতটি সংখ্যা বের হয়। এতে মুলতঃ যুদ্ধের খবরাখবর থাকত। পত্রিকাগুলো আমরা ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন বিদেশী সংস্থায় পাঠিয়ে দিতাম।

 

ঢাকায় আমাদের মূল দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল ঢাকার সাথে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা। পাকসেনারা যাতে রসদ সরবরাহ করতে না পারে তার ব্যাবস্থা করা এবং হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য ঢাকা শহরে পাকসেনাদের যে সমস্ত ঘাঁটি ছিল সেগুলো ধ্বংস করা।

 

ঢাকায় আমাদের প্রথম অপারেশন হয় কাকরাইলের মোড়ে। কাকরাইলের মোড়ে যে পেট্রোল পাম্পটি ছিল, আমরা প্রথমেই সেটিকে ধ্বংস করি। তারপরর মাহবুব আলী এবং ফেরদৌসের নেতৃত্বে ঢাকা ডি,আই,টি ভবনে অবস্থিত টেলিভিশন কেন্দ্রটি নষ্ট করে দেয়ার পরিকল্পনা করি। তখন মাহবুব আলী ডি,আই,টি ভবনেই চাকুরি করতেন। সে অফিসে আসার সময় প্রতিদিন কিছু কিছু বিস্ফোরক শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে শত্রুর চোখ ফাকি দিয়ে ডি,আই, টি ভবনেই জমাতে শুরু করল। প্রথমে আমাদের পরিকল্পনা ছিল ৮ পাউণ্ড দিয়ে ডি,আই,টির চূড়া উড়িয়ে দেয়া। কিন্তু পাঁচ পাউণ্ড সরানর পরে শত্রুবাহিনী সন্দেহ করতে শুরু করল। তখন মাহবুব আলী তাড়াতাড়ি আমার কাছে ছুটে আসে। আমি তাকে ধরা পড়ার আগেই ওটা ফাটিয়ে দিতে বলি। মাহবুব আলী তার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডি,আই,টি চূড়ার নিচে ওটা ফাটিয়ে দেয়। তবে বিস্ফোরকের পরিমাণ কম হওয়াতে চুড়াটি সম্পুর্ন্রূপে ধ্বংস করা যায় নি। তবুও চূড়া টিতে চিড় ধরে যায়। ঢাকা শহরে আমাদের এই অপারেশনের উপরে বিদেশি পত্রিকাতেও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল।

 

নভেম্বরের দিকে ঢাকা শহরে পাকবাহিনীর নির্যাতন আরো বেড়ে যায়। তাই আমরা ঢাকা শহরে পাকবাহিনীর উপরে সরাসরি আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেই। এ ব্যাপারে আসাদকে দায়িত্ব দেয়া হয়। এর দু’একদিন পরেই আরিফ, ফেরদৌস ও জন একটি গাড়ী হাইজ্যাক করে বায়তুল মোকাররমে নিয়ে আসে। সেখানে পাকবাহিনীর দু’টি লরির মাঝখানে আমাদের গাড়িটী রেখে বিস্ফোরকে অগ্নিসংযোগ করা হয়। কিন্তু প্রায় ১০ মিনিট চলে যাওয়ার পরেও বিস্ফোরণ হচ্ছে না দেখে আসাদ পুনরায় গাড়িটির ভিতর ঢুকে অগ্নিসংযোগ করে আসে। এই যাত্রায় আমরা সাফল্য লাভ করি। সেখানে ১৬ জন পাকসৈন্য মারা যায়। আমরা এই অপারেশন করি সাড়ে ১২টার দিকে এবং বিবিসির ৩টার সংবাদে এই ঘটনাটি প্রচার করা হয়।

 

অক্টোবরের দিকে আমরা মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাঙ্ক অপারেশন করি। এই অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছিল মুনির। ফ্রোজ, আসিফ এবং আসাদও এর যুক্ত ছিল। মুনির অত্যন্ত সাহসের সাথে একটি মাত্র খেলনা পিস্তল দিয়ে এই ব্যাঙ্ক অপারেশন করেছিল। সেখান থেকে আমরা কিছু টাকা সংগ্রহ করি। এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল শিমুলিয়া ট্রেনিং ক্যাম্পের জন্য।

 

এছাড়া নভেম্বরের দিকে ঢাকা শহরে আমরা আরো কয়েকটি অপারেশন করি। সেগুলি ছিল রেডিও বাংলাদেশ (শাহবাগ), মালিবাগ রেলক্রসিং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি এলাকায় অপারেশন। মালিবাগ রেলক্রসিং- এর কাছে রেললাইন উড়িয়ে দিতে গিয়ে ভোর চারটা থেকে পাকবাহিনীর সাথে আমাদের প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। এতে তাদের একটি সেকশন পুরোপুরিভাবে বিনষ্ট হয়। একই মাসে আমরা বাংলাদেশ রেডিও (শাহবাগ) আক্রমণ করি এবং পাহারারত বহু পাকসেনাকে আঘাত হানি। এই অপারেশনে আমরা কিছু পাকসৈন্যকে খতম করে অন্যত্র সরে যাই।

 

আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণের পরিকল্পনা করি অক্টোবরের দিকে। তখন দখলদার পাক সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ চালু করার চেষ্টা করছিল। আমরা এই সংবাদ পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু এক্সপ্লোসিভ বসাই। প্রথমে সাইকোলজি বিভাগে একটি এবং তিনতলা, চারতলাতেও কিছু এক্সপ্লোসিভ বসাই। এই অপারেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ চলা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আমাকে খোজাখুঁজি শুরু হয় এবং আমার বাড়ি তল্লাশী করে আমার পাঁচ ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

 

আমরা আরো একটি অপারেশন করি অক্টোবরের প্রথম দিকে, সাভারের রেডিও স্টেশনের সামনে। এই পথে আমরা তিনটি পাকিস্তানী লরি আক্রমণ করি এবং প্রায় ৩৭ জন পাকসৈন্য হত্যা করি। এরও আগে স্পেটেম্বরের শেষের দিকে সাভারে আমরা একটা অপারেশন করেছিলাম। এটি হয়েছিল সাভার রেডিও স্টেশন থেকে মানিকগঞ্জের বড়াল ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ৩০ মেইল এলাকা জুড়ে। এই হাইওয়ে অপারেশনে আমরা একদিনে প্রায় চার’শ ছেলে কে কাজে লাগাই এবং ৩০ মাইলের মধ্যে ৩১৯ জন রাজাকারকে আত্মসমর্পনে বাধ্য করি এবং তাদের কাছ থেকে অনেক অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নেই।

 

১৪ই নভেম্বরের ভায়াডুবি ব্রিজ অপারেশন ছিল আমাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গেরিলা অভিযান। এখানে আমরা প্রচণ্ড সংঘর্ষে লিপ্ত হই। শত্রুসেনারা সংখ্যায় ছিল ২০ জন। আমাদের আক্রমণ ভাগে ছিল ৪৪ জন। পাঁচ জনের উপরে দায়িত্ব ছিল ব্রিজ দখলের সে ৫ জন ছিল মেজবাহউদ্দিন সাবু, সুবেদার আশরাফ, সুবেদার ওয়াজেদ, হাকিম আর আমি। আমরা সব শত্রুসেনাকে খতম করে অবশেষে ব্রীজটা দখল করতে সমর্থ হই। আমাদের অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল একটি এলএমজি, একটি ২” মর্টার এবং একটি স্টেনগান। এ দিয়ে আমরা ব্রীজটি দখল করি। তবে আমরা বেশী সময় ব্রীজটি দখলে রাখতে পারি নি। কিছুক্ষনের মধ্যেই তা পুনরায় শত্রুর দখলে চলে যায়। তারা মানিকগঞ্জ থেকে তিনগাড়ি সৈন্যসহ (প্রায় ৭০০ জন) ব্রীজ অভিমুখে রওয়ানা হয়। রাত্রি তখন গভীর। তারা মানিকগঞ্জের দিক থেকে আমাদের উপরে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। আমরা এক ভীষণ সংঘর্ষে লিপ্ত হই। এই যুদ্ধে আমাদের প্লাটুনের অধিনায়ক মানিক শহীদ হয় এবং বেশ কয়েকজন যোদ্ধা আহত হয়। আমরা সেখান থেকে পিছু হটে যাই। এর চারদিন পরে ১৮ই নভেম্বর আমরা পুনরায় ব্রীজটা দখল করি এবং পরবর্তী তে উড়িয়ে দেই। এরই মধ্যে ধামরাই এলাকাও আমরা পুরোপুরি মুক্ত করে ফেলি। ধামরাইতে ১৫০ জনের একটি কোম্পানী মোতায়েন রেখে মূল ক্যাম্প সাভারের জিরাবো তে স্থানান্তর করি। এখান থেকেই আমরা সাভারের মহাসড়ক নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নেই এবং উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। সাভারে তখন পাকিস্তানীদের বড় ধরনের ক্যাম্প ছিল। এই ক্যাম্পটি আমরা ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে দখল করে ফেলি। আক্রমন টি চালানো হয় নভেম্বরের শেষ দিকে। এর পরপরই আমরা সাভার থানা দখল করি, ফলে পুরো সাভার এলাকাই আমাদের নিয়ন্ত্রনে চলে আসে।

 

১৩ই ডিসেম্বর টাঙ্গাইল থেকে ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট মিত্র বাহিনীর চাপে পিছু হটে ঢাকার দিকে আসছিল। আমরা এই রেজিমেন্টকে সাভারের কাছে বাধা দিই এবং ফলে সেখানে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে আমরা পুরো শক্তি কাজে লাগাই এবং ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্টকে আত্মসমর্পণ করাই। এখানে শত্রুপক্ষের প্রায় শতাধিক সৈন্য নিহত হয় এবং একজন পাকিস্তানী সুবেদার মেজর আত্মসমর্পণ না করে আত্মহত্যা করে। আমাদের মুক্তির পুর্ব মুহূর্তের এ যুদ্ধই ছিল এ এলাকার সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে আমরা টিটোকে হারাই। এরপর আমরা ১৬ই ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর সাথে প্রথম ঢাকায় প্রবেশ করি। আমাদের ছেলেদের মধ্যে মানিক, আফতাব, আমজাদ, নেহাল, টিটো এবং মানিক সহ মোট ছয়জন বিভিন্ন সংঘর্ষে শহীদ হয়।